Articles by "স্বভিমানের স্বদেশ"
Showing posts with label স্বভিমানের স্বদেশ. Show all posts

বেবি চক্রবর্তী, সাংবাদিক ও লেখিকা, কলকাতা:

পথের ধারে অজস্র রক্তপাত বয়ে ছিল মৃত্যুর ঢল উঠেছিল স্লোগান, ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায় - লাখো ইনসান্ ভুখা হ্যায়।

মাতৃভূমির বুকে বেজে ছিল শঙ্খ ধ্বনি - উড়েছিল পতাকা মধ্যরাতের অন্ধকারে রাত্রি বারোটায় অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা।

সূর্যালোকে আসেনি ভারতের স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম মধ্যরাতের অন্ধকারে। ঘড়িতে তখন রাত বারোটা| অখন্ড ভারতের বারোটা বাজিয়ে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছিল| মাঝরাতে দু’টুকরো হয়ে গেল দেশ| কিন্তু ভারত ভেঙে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম নেয়নি| জন্মেছিল দু’টি পৃথক ডোমিনিয়ন| ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসের ঠিক মাঝামাঝি ১৪ – ১৫ ই আগষ্ট বাস্তবে কি ঘটেছিল তাঁর ছোট একটা বিবরণ ইংরেজিতে তুলে দিলাম —

New Delhi, Aug 15 :- Two new Dominions , India and Pakistan , were born at zero hour today, ushering in political freedom to 400 million people constituting one – fifth of the human race. At a special session of the Indian Constituent Assembly, the House assumed full powers for the administration of the Indian Dominion.

সূর্যডোবা সেই রাতে এসেছিল ভারতের বুক চিরে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান নামে আলাদা দুই ডোমিনিয়নের জন্ম| সেইসঙ্গে ক্ষমতার হস্তান্তর|

মুক্তিযুদ্ধে দুই প্রধান নায়কই ছিলেন ওই দৃশ্যে অনুপস্থিত| ১. মহাত্মা গান্ধী, যিনি কলকাতার বেলেঘাটায় বস্তি এলাকায় মুখ লুকিয়ে ওই রাতটি কাটিয়েছিলেন| ২. নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (নেতাজি স্বয়ং থাকলে বোধ হয় এটি হত না)|

স্বাধীনতা দেশভাগ একসঙ্গে জড়িয়ে গেল। কিন্তু দেশভাগ ছিল যতটা নিরেট সত্য, স্বাধীনতা ততটা নয়| দেশভাগের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল কোটি কোটি মানুষের চোখের জল| রক্তের স্রোত বয়েছিল| জাতির চেয়ে বড় হয়েছিল সম্প্রদায়| যেখানে সম্প্রদায় বিশেষ জেহাদ ছাপিয়ে গিয়েছিল জাতীয় সংগ্রামকে। শুরুতেই গড়ার চেয়ে ভাঙাই পেল মর্যাদা| দেশপ্রেমকে বিদায় জানিয়ে মান্যতা দেওয়া হল ক্ষমতার কাড়াকাড়িকে|

কে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হবেন!

সেইরাতে গান্ধিজিও নাকি নিরবে কেঁদেছেন। পরে স্বীকার করছিলেন ১৫ ই আগষ্ট ছিল তাঁর পরাজয়ের দিন| গ্লানিভারে নুয়ে পড়েছিলেন তিনি| গান্ধিজি বলেন –“জওহরলাল, সর্দার প্যাটেল, মৌলানা আজাদ সবাই তাঁর দূরের মানুষ| এরা এতকাল আমাকে মই হিসেবে ব্যবহার করেছে| কাজ ফুরোলে ছুঁড়ে ফেলেও দিয়েছে| গান্ধিজি পরে স্বীকার করেন যে “যদি সুভাষ ফিরত তবে দেশভাগ হত না|”

স্বাধীনতা ও দেশভাগ একই সময়ে ব্রিটিশ আইনের আওতায়| আইনের নাম The Indian Independence Act, 1947 …

কিন্তু ৫নং ধারায় এসে থলির বেড়াল বেড়িয়ে পড়েছিল|

For each of the new Dominions, there shall be a Governor General who shall be appointed by His Majesty and shall represent His Majesty for the purposes of the Govenment of the Dominion.

ব্রিটিশ যে ভারত থেকে বিদায় নেবে সুভাষচন্দ্র তা জানতেন। যাবার আগে তারা যে অখন্ড ভারতকে খন্ডিত করে দিয়ে যাবে তা তিনি যুদ্ধ শুরু হবার আগেই বুঝেছিলেন| কংগ্রেস সভাপতির ভাষণে সে বিষয়ে তিনি জনসাধারণ ও শিক্ষামন্ডলীকে হুঁশিয়ার করেও দিয়েছিলেন| তারপর যখন তিনি দেশের বাইরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় স্বাধীনতার যুদ্ধ চলা কালীন তখন বেতার ভাষণে গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল প্রমুখ নেতৃমন্ডলীর কাছে বারবার তিনি আবেদন জানিয়েছিলেন, মাতৃভূমিকে দ্বিখন্ডিত হতে দেবেন না| কেউ শোনেনি তাঁর কথা। তাই আজ সমগ্র ভারতবর্ষের রাজনীতি যেন জাতির অন্ধ বিবেচিত নির্বাচিত প্রার্থী কূটনীতিকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে দুর্নীতির দিকে ক্রমশ অগ্রসর হয়েছে| অর্থনীতি সাম্যতা কমে দিনে দিনে বেকারত্বের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে| স্বাধীনতার নতুন সূর্য কখনও দেখতে চায়নি ক্ষুধার্ত অসহায় শিশুর কান্না আর বেকারত্বের অবহেলিত নীরব নোনাজল!

ব্রিটিশ ভারতকে দীর্ঘদিনের  নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের পর ১৯৪৭ এর ১৫ ই আগষ্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত (India) - পাকিস্তান (Pakistan) নামে দুটি স্বাধীন অধিরাজ্যে বিভক্ত হয়| সারা দেশ যখন মুক্তির আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছে, তখন দেশে একটি নতুন শ্লোগান ওঠে ---- "ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় | ভুলো মাৎ ভুলো মাৎ" এই স্বাধীনতা মিথ্যা, ভুলো না, ভুলো না। বলা বাহুল্য, এ অভিযোগ যথার্থ নয়, বরং বলা য়ায় ---- অর্ধ - সত্য | ড. অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন, "এ আজাদি একেবারে ঝুটা না হলেও জন্মসূত্রে প্রতিবন্ধী|" আসলে স্বাধীনতা লাভের ফলে ভারত দু- টুকরো হয়ে যায়| ভারতের দুটি সমৃদ্ধিশালী প্রদেশ ---- বাংলা ও পাঞ্জাব দ্বিখন্ডিত হয়| দেশজুড়ে শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, লুন্ঠন, নারী নির্যাতন, ধর্মান্তর এবং লাখ লাখ ছিন্নমূল মানুষের দেশান্তর গমন| ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ায় পাকিস্তান ভারত - ভুক্ত পাঞ্জাব থেকে লাখ লাখ মানুষ ভারতে চলে আসতে থাকে| এইসব দেশত্যাগী মানুষদের জন্য বাসস্থান, খাদ্য ও কাজের ব্যবস্থা করা কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়| দেশ ভাগের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিও বিভক্ত হয়ে যায়| ভারতে দেখা যায় চরম বেকার সমস্যা| ১৯৪৭ এর অখন্ড ভারত ভাগ নতুন দেশের গৃহহীন ও বাস্তুুচ্যুত| ১৯৪৭ সালের এপ্রিলেও বোঝা যায়নি আগষ্টে দেশভাগ হবে| এপারের মানুষ ওপারে যাবে। ওপারে মানুষ এপারে| মুর্শিদাবাদ, খুলনার মানুষ বিভ্রান্ত হবে তাদের অংশে ভারত না পাকিস্তানের পতাকা উড়বে। সিলেটের করিমগঞ্জে পাকিস্তানের পতাকা উড়েও নেমে যাবে| প্রাক্তন এক ইংরেজ বিচারক স্যার সেরিল র‍্যার্ডক্লিফ যিনি আগে কোনদিন ভারতবর্ষে আসেনি, ভালো করে ম্যাপ পড়ার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা (Cartographic Knowledge) যার নেই, প্রত্যক্ষ কোনও অভিজ্ঞতা নেই এ অঞ্চলের মানুষের জীবন সংস্কৃতি, ভাষা ও আনন্দ - বেদনার তাকে কিনা দায়িত্ব দেওয়া হল বাংলাকে বিভক্ত করার বাউন্ডারি কমিশনের| স্যার লর্ড মাউন্টব্যাটেন দেশভাগের জন্য তাড়াতাড়ি করে ধরে এনেছিল তখনকার রাজনৈতিক চাপের পরিস্থিতি সামাল দিতে তার আঁকিবুকি ও নানা কূটকৌশলের রাজনৈতিক সমীকরণে কোটি কোটি মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা আর বিপর্যয় নেমে আসবে| অনেকের নতুন পরিচয় হবে উদ্বাস্তু| ছেড়ে যেতে হবে সাত পুরুষের বসতি, স্মৃতি ও সংগ্রামের ভূমি, নদী -মাঠ- ঘাট, আশৈশব, হেঁটে যাওয়া চেনা পথ, প্রান্তর। পেছনে পড়ে থাকবে ধূ-ধূ স্মৃতির ভূমি, স্বজনের কবর আর শশ্মান| অসহায় অজস্র মানুষের স্থান হবে রিফিউজি ক্যাম্প| কেউ যাবে দূর পৌরাণিক কাহিনীর অনুর্বর দেশ -দণ্ডকারণ্যে। তাদের সংগ্রাম ও গভীর বেদনা ফুরাবে না একজীবনে। আজ যেন সব স্মৃতির পাতা।

(www.theoffnews.com fractured freedom India)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

দক্ষিণ গারো পাহাড়ের টলেগ্রে গ্রামে আবিষ্কৃত ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও প্রচারিত মেঘালয়ের গর্বের জীবাশ্মটি চুরি হয়ে গেছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা এই কুকর্মকাণ্ডের জন্য হতবাক এবং ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ।

গত বছরের মে মাসে, কোর জিও অভিযান দলের নেতৃত্বে একটি অভিযান এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এলাকাটি ঘোরাঘুরি করার পরে গ্রামে জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছিল। প্রারম্ভিক অনুমান অনুসারে জীবাশ্মটি প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ কোটি বছর আগের এবং রোডোসেটাস বা অ্যামুলোসেটাস (এখন বিলুপ্ত) গণের অন্তর্গত। এই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীটিকে তিমিদের স্থল পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়।

কোর জিও টিমকে অনুসরণ করে, একটি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (জিএসআই) দলও গত বছর সাইটে পৌঁছেছিল যেখানে তারা দৃশ্যত ফলাফলগুলি যাচাই করার প্রয়াসে সাইট থেকে নমুনা নিয়েছিল। তবে জীবাশ্মের বড় অংশটি গ্রামবাসীদের দ্বারা অক্ষত এবং সুরক্ষিত ছিল। এমনকি তাঁরা এলাকায় বহিরাগতদের অযথা অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, এমনকি জেলা প্রশাসনকে সাইটটি এবং এর বিষয়বস্তু সংরক্ষণের জন্য সাইটটি পরিদর্শন না করতে বলা হয়েছিল।

তবে একটি সূত্র জানিয়েছে যে জীবাশ্মটি চুরি হয়েছিল, অভিযোগ করা হয়েছে দুই রাত আগে, কেউ জায়গাটি ভেঙে পুরো অংশটি খনন করার পরে। চুরির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দক্ষিণ গারো হিলসের পুলিশ সুপার শৈলেন্দ্র বামানিয়া।

“ফসিল চুরির গুজব আসার পর একটি দল গতকাল (চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারী) সেখানে গিয়েছিল। তবে তারা নোকমা বা গ্রামের সচিবের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি কারণ তারা তাদের মাঠে কাজ করছে। অবশ্য অন্য গ্রামবাসীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গ্রামবাসীরা বর্তমানে চুরির বিষয়ে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করার কথা ভাবছে,” এসপি জানিয়েছেন।

সূত্রের মতে, চুরিটি অনেক দিন আগে ঘটে থাকতে পারে তবে ঘটনাটি পরিদর্শন করতে গ্রামে পরিদর্শন করা একজন সিনিয়র অফিসারের সাম্প্রতিক পরিদর্শনের পরেই এটি আবিষ্কার করা হয়েছিল। সাইটটি টলেগ্রের বাসিন্দাদের দ্বারা সুরক্ষিত ছিল এবং পরিদর্শন নিষিদ্ধ ছিল।

“এটি সত্যিই দুঃখজনক এবং মেঘালয় একটি মূল্যবান নিদর্শন হারিয়েছে। আমরা সাইটটিকে সংরক্ষণ করার জন্য চাপ দিয়েছিলাম কারণ এটি অঞ্চলের জন্য একটি সম্পদ ছিল। এত চেষ্টার পরও যে শেষ পরিণতি এই হবে তা কে জানত। আমি এই ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম,” নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বাসিন্দা এমনটা জানিয়েছেন।

গারো পাহাড় জুড়ে তার অনুভূতি প্রতিধ্বনিত হয়।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিজু থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ অপরাধীদের খুঁজছে।

মেঘালয়ের শিক্ষামন্ত্রী রাক্কাম সাংমার মতে, রাজ্য সরকার ওই জায়গায় একটি জাদুঘর তৈরির পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেছেন, "গ্রামবাসীরা আমাকে জানিয়েছে...তারা একটি এফআইআর দায়ের করেছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এটা হওয়া উচিত হয়নি...ফসিলের একটি অংশ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই জীবাশ্মটি রাজ্য ও দেশের একটি সম্পদ। আমরা অপরাধীকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করব। এই সাইটটি মেঘালয়ের দক্ষিণ গারো হিলসের সিজু থানার অধীনে আমার নির্বাচনী এলাকা টোলেগ্রেতে অবস্থিত। বিদেশ থেকে ভূতাত্ত্বিকরা এটি আবিষ্কার করেছিলেন। রাজ্য সরকার এই জায়গায় একটি জাদুঘর নির্মাণের কথা ভাবছিল, এবং স্থানীয় বিধায়ক হিসাবে আমি পরিকল্পনা করছিলাম।" এটির জন্য চাপ দেওয়ার জন্য, পুলিশ কীভাবে তদন্ত করবে তা দেখতে হবে।”

(www.theoffnews.com Rodhocetus fossil stolen Meghalaya)


দেবর্ষি মজুমদার, সিনিয়র জার্নালিস্ট, বীরভূম:

আমাদের দেশে বিশ্বের বলিষ্ঠতম গণতন্ত্র বিরাজমান। রাজতন্ত্র কবে বিদায় নিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। তাহলে প্রজা কোথা থেকে এলো? অথচ আজকের এই বিশেষ দিনে আখছার ভাষণে কিম্বা শুভেচ্ছা বার্তায় জেনে না বুঝে প্রজাতন্ত্র দিবস বলা হয়। ভাববার বিষয়। যারা জেনে ইচ্ছে করে ভুল বলেন অর্থাৎ প্রজাতন্ত্র দিবস বলেন, তাদের জন্য এই লেখা নয়। তারা অসংশোধনীয়। এটা অবশ্যই ঠিক যে আমার উপর নেই ভুবনের ভার। তাই তাদের কথা বাদ থাক। যারা জানেন না, তারা বুঝলেও বুঝতে পারেন। 

আজকের এই বিশেষ দিন আমাদের কাছে গর্বের। কারণ আজকের দিনে আমরা আমাদেরকে অর্থাৎ নিজেদেরকে দেশের সংবিধান প্রদান করি। শপথ নিই সংবিধানের মর্যাদা সর্বদা রক্ষা করবো। 

এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাধারণতন্ত্র দিবসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত গানের লাইন খুবই প্রাসঙ্গিক হবে। "-- আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে--" আমাদের আলাদা করে কোনও রাজা নেই। অনেকেই ভুল করে "রিপাবলিক ডেই" এর বাংলা তর্জমা করে বলে থাকেন প্রজাতন্ত্র দিবস।" কিন্তু আমরা কেউ প্রজা নই। গণতন্ত্রে জনসাধারণ সর্বেসর্বা। তাই আমরা সাধারণতন্ত্রের জয়গান গাই। 

আমাদের প্রথম সাধারণতন্ত্র দিবস পালিত হয় ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫১ সালে। এই বছর ২০২৫ সালে সংবিধান গৃহীত হওয়ার ৭৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে, যা ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলা যায়। এই বছর ভারত ৭৬তম সাধারণ তন্ত্র দিবস উদযাপন করছে। 

প্রতি বছর কেন্দ্র সরকার এই উপলক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট থিম নির্বাচন করে থাকে। এবছরের থিম 'স্বর্ণিম ভারত'। যা দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং উন্নয়নের যাত্রাকে তুলে ধরেছে বা ধরবে।

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ এ ভারত স্বাধীন হলেও দেশের প্রশাসক প্রধান হিসেবে তখনও বহাল ছিলেন ষষ্ঠ জর্জ। লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ছিলেন গভর্ণর জেনারেল। তখন আমাদের হাতে কোনও স্থায়ী সংবিধান ছিল না। ঔপনিবেশিক ভারত শাসন আইনে কিছু রদবদল ঘটিয়েই দেশ শাসনের কাজ চলছিল। বলে রাখা ভালো, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ আগস্ট একটি স্থায়ী সংবিধান রচনার জন্য খসড়া কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। শান্তিনিকেতনের কলাভবনের অধ্যক্ষ শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুকে ভারতের সংবিধানের সচিত্র অলংকরণ বা নকশা চিত্রিত করার দায়িত্ব দেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। সেই কাজে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ভারতের স্বকীয় সত্ত্বা তুলে ধরতে সংবিধানের পাতায় তিনি যেমন এঁকেছেন বুদ্ধ মূর্তি, তেমনি এঁকেছেন গান্ধীজীর ডাণ্ডি অভিযান, নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজ, জাতীয় প্রতীক সারনাথের অশোক স্তম্ভের সিংহ। সারা ভারতের প্রতীক হুবহু সাদৃশ্য রেখে একত্রিত করে তিনি চিত্রিত করেছেন। জাতীয় সংহতি হিসেবে ৪ নভেম্বর ১৯৪৭ তারিখে কমিটি একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করে গণপরিষদে জমা দেয়। চুড়ান্তভাবে সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে ২ বছর, ১১ মাস, ১৮ দিন ব্যাপী সময়ে গণপরিষদ এই খসড়া সংবিধান আলোচনার জন্য ১৬৬ বার অধিবেশন ডাকে। এই সমস্ত অধিবেশনে জনসাধারণের প্রবেশের অধিকার ছিল। শেষে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর স্বাধীন ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়। যেহেতু ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারিতে, প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালন হয়, সেহেতু ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ভারতের সংবিধান কার্যকর করা হয়। সেদিন থেকে আমরা ভারতবাসীরা এই দিনটিকে যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করে আসছি।

(www.theoffnews.com Republic day Indian Constitution)


রণজিৎ গুহ, লেখক ও সমাজকর্মী, দুর্গাপুর:

(লেখক একজন গর্বিত প্রাক্তন ইস্পাত কর্মী)

৩৯৫টি ধারা এবং ৮টি তপশিল সম্বলিত ভারতীয় সংবিধান সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ সংবিধান। ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর, এই তিন বছরের মধ্যে তা রচিত হয়। যা কার্য্যকরী হয় ১৯৫০ সালে ২৬শে জানুয়ারি। রচনা পর্বে এর বিভিন্ন মুসাবিদাগুলির প্রত্যেকটি ধারা ভারতের গণপরিষদে আলোচিত হয়। সব মিলিয়ে গণ পরিষদের ১১টি অধিবেশন বসেছিলো। মোট সময় লেগেছিলো ১৬৫ দিন। এইসব অধিবেশনের মাঝেই বিভিন্ন কমিটি ও উপকমিটির মুসাবিদাগুলির সংশোধন আর পরিমার্জনের কাজ চলতো। গণপরিষদে তিনশোর বেশী সদস্য ছিলেন। 

উইনষ্টন চার্চিল বিষ-ঢালা ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলেন -"এই গণপরিষদ কেবলমাত্র একটি প্রধান সম্প্রদায়ের (হিন্দু সম্প্রদায়ের) ক্ষমতা দখলের কমিটি ...।" কিন্তু গণপরিষদ সংবিধান রচনার এই প্রক্রিয়াটিকে আরও বেশী করে অংশগ্রহণমূলক করে তোলার জন্য সাধারন মানুষের কাছ থেকেও মতামত চাওয়া হয়েছিল, সেই আবেদনে সারাও মিলেছিল ভালোই ¦ 

কেউ কেউ "গান্ধীবাদী আদর্শে" সংবিধান রচনার পরামর্শ দিয়েছিলেন... আবার কলকাতা থেকে "নিখিল ভারত বর্ণাশ্রম স্বরাজ্য সমিতি"- প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রীয় মত ভিত্তিক সংবিধান রচনার পরামর্শ দেয়... নিন্মবর্ণের গোষ্ঠীগুলোর দাবি ছিল, "উচ্চবর্ণের অত্যাচার বন্ধ করতে তাদের জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হোক,... ভাষা সংখ্যালঘু , ধর্মীয় সংখ্যালঘু, মহিলা সমাজ, শিক্ষক সঙ্ঘ, আদিবাসী সঙ্ঘ থেকে "কেন্দ্রীয় ইহুদি পরিষদ" শত শত সংগঠন এবং ব্যক্তি বিশেষের প্রস্তাব দেখলেই বোঝা যায় সংবিধান রচয়িতাদের কতো রকম স্বার্থের কথা মাথায় রাখতে হয়েছিল।

গণপরিষদের প্রতিবেদনগুলি ১১টি মোটা মোটা খন্ডে ছাপা হয়। এইসব খন্ডগুলি পড়লে - যার কতকগুলোর পৃষ্ঠা সংখ্যা ১০০০ বেশী ও ভারতীয়দের বচন পটুত্বের নমুনা ছাড়াও তাঁদের অন্তদৃষ্টি, বুদ্ধি, আবেগ আর রসবোধেরও নমুনা পাওয়া যায়। এই খন্ডগুলো একেকটি সোনার খনি, কিন্তু অল্প লোকই তার খবর রাখে। ইতিহাসবিদের কাছে এর মূল্য অসীম এবং আগ্রহী নাগরিকদের কাছে জ্ঞানলাভের সাম্ভাব্য এক উৎস। 

১৯৪৬ সালের ৩১শে ডিসেম্বর জহরলাল নেহেরু গণপরিষদের লক্ষ্য সংক্রান্ত বিষয়ে প্রথম ভাষণে -ভারতকে "স্বাধীন, সার্বভৌম, প্রজাতন্ত্র" বোলে ঘোষনা করেন, নাগরিকদের সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সমমর্যাদা, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ, সংখ্যালঘু এবং পিছিয়ে পরা উপজাতিদের রক্ষাকবচের ব্যবস্থা সংবিধানে রাখার কথা ঘোষনা করেন ...।" 

১৯৪৯ সালের ২৫শে নভেম্বর অর্থাৎ গণপরিষদের কাজের শেষ দিন ডা. আম্বেদকর এক মর্মস্পর্শী ভাষণে - প্রথমে ধন্যবাদ জানান গণপরিষদের মুসাবিদা কমিটির সব সদস্যদের। ধন্যবাদ জানালেন সাহায্যকারী কর্মীদের এবং ধন্যবাদ জানালেন সেই পার্টিকে, তিনি সারা জীবন ধরে যার বিরোধিতা করেছেন। পরিষদ কক্ষের ভিতরে ও বাইরে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব সহযোগিতা না করলে তাঁর পক্ষে এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে সুশৃঙ্খলভাবে সংবিধান রচনা সম্ভব ছিল না, কংগ্রেস পার্টির এই শৃংখলার সুবাদেই মুসাবিদা কমিটির পক্ষে প্রতিটি ধারা ও প্রত্যেকটি সংশোধনীর পরিণতি সম্বন্ধে সুনিশ্চিত হয়ে সংবিধানকে পরিষদে ঠিকমত চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে...।"

১৯৪৬ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে যখন গণপরিষদের অধিবেশনগুলো বসে, চারদিকে তখন ছেয়ে রয়েছে খাদ্যের অভাব, ধর্মীয় দাঙ্গা, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, শ্রেনী যুদ্ধ, সীমান্তে যুদ্ধ এবং সামন্ততান্ত্রিক বিরুদ্ধতার এক পরিবেশ। এক ইতিহাসবিদের ভাষায়, "মৌলিক অধিকারগুলি রচনা করতে হলো মৌলিক অনধিকারের ভয়াবহ এক বাতাবরণে!"

(www.theoffnews.com Baba Ambedkar Indian Constitution)


রণজিৎ গুহ, লেখক ও সমাজকর্মী, দুর্গাপুর: 

(লেখক একজন গর্বিত প্রাক্তন ইস্পাত কর্মী)

স্বাধীনতার পর সামান্য কয়েকটা বছর কেটেছে তখন। ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে বেরিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টায় নতুন ভারত। কিন্তু এরপর? আইনকানুন দৃঢ় করার জন্য, স্বাধীন দেশে দরকার নতুন সংবিধান। দেশের নেতারা এবার মন দিলেন সেই কাজেই। কিন্তু এমন ঐতিহ্যশালী দেশের সংবিধান ও তার গড়ন, গঠন, নকশা তো যেমন-তেমন করে হওয়ার নয়! হাতে লিখতে হবে। শুধু তাই নয়, সেই হাতে লেখা পৃষ্ঠার পাতায় পাতায় চাই ছবি ও নকশার বৈভব। ঠিক যেমনটি থাকত মুঘল পুঁথিচিত্রে কিম্বা পাল ও জৈন পুঁথি চিত্রকলায়।

কিন্তু এই কঠিন কাজের দায়িত্ব কে নেবে? নকশাদার হাতের লেখার জন্য তলব পড়ল প্রেমবিহারী নারায়ণ রায়জাদা'র (সাক্সেনা)। তিনি ব্রিজবিহারী নারায়ণ রায়জাদা'র পুত্র। রায়জাদা'রা দিল্লির বাসিন্দা। কিন্তু ব্যবসা রামপুরে। ইংরেজি রোমান ঢং-এর হাতের লেখার সুদক্ষ ক্যালিগ্রাফার প্রেমবিহারী। গোটা সংবিধানটি হাতে লেখার দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হল তাঁর ওপর। আর হাতের লেখার পাশাপাশি ছবি ও নকশা দিয়ে সংবিধানের পাতাগুলিকে সাজানোর বিষয়টি নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবতে সময় নেননি ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। তাঁর কন্যা ইন্দিরার শান্তিনিকেতনের কলা ভবনের মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু ছাড়া আর কেই বা সামলাতে পারেন এই গুরুভার!

খবর গেল শান্তিনিকেতনে। এমন দায়িত্ব পেয়ে নন্দলাল বসু তৎপর হলেন সঙ্গে সঙ্গে। তাঁর নেতৃত্বে শান্তিনিকেতনের কলাভবনের শিল্পীরা শুরু করলেন ভারতের সংবিধানের অলঙ্করণের কাজ। পুরো সংবিধানটি ছাপা হয় ফোটো লিথোগ্রাফ পদ্ধতিতে, দেরাদুনের সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে। এমন নকশামণ্ডিত সংবিধানের পৃষ্ঠা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যে যে বিষয় নিয়ে ছবি আঁকা হয়েছে সেগুলি হল - মহেঞ্জোদারের সিল, গুরুকুল বা বৈদিক আশ্রমের দৃশ্য, রামায়ণের দৃশ্য, মহাভারতের দৃশ্য, বুদ্ধের জীবনী, মহাবীরের জীবনী, বৌদ্ধধর্মের প্রসার ও সম্রাট অশোকের ভূমিকা, গুপ্ত যুগের শিল্পধারার বিবিধ পর্যায়, বিক্রমাদিত্যে রাজসভা, ওড়িশার ভাস্কর্য শিল্প, নালন্দা, নটরাজের নৃত্য, মহাবলীপুরম ভাস্কর্য দৃশ্য, আকবর ও মুঘল স্থাপত্য, শিবাজি ও গুরু গোবিন্দ সিং, টিপু সুলতান ও ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, জাতির পিতা গান্ধী ও তাঁর ডান্ডি মার্চ, গান্ধিজির নোয়াখালি ভ্রমণ, দাঙ্গার সময়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, ভারতের বাইরে থেকে ভারত, হিমালয়ের দৃশ্য, মরুভূমির দৃশ্য, সমুদ্রের দৃশ্য। সব মিলিয়ে মোট বাইশটি ছবি।

ভারতের ঐতিহ্যের ছবি সংবিধানের পাতায় পাতায়। ধর্ম, ঐক্য, বোধ, সমাজ, ত্যাগ, জাতীয়তাবাদ, দেশের গঠন, জাতির স্বপ্ন সবকিছুর সম্পর্ক রয়েছে এই ছবিগুলির সঙ্গে।

আরও আকর্ষণীয় বিষয় হল, সংবিধানের বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আঁকা হয়েছে সে-পাতার ছবি। যেমন, যে-পাতায় রয়েছে ইমার্জেন্সি প্রভিশনের কথা, সেই ১৫৪ নম্বর পৃষ্ঠার ছবির বিষয় হলো গান্ধিজীর নোয়াখালির দাঙ্গা কবলিত এলাকা ভ্রমণ। যেখানে রয়েছে কর্মোদ্যম দিয়ে দেশ গঠনের প্রসঙ্গ। সেখানে এসেছে সম্রাট আকবরের ছবি। বাণিজ্যের প্রসঙ্গে এসেছে মহাবলীপুরমের ছবি, যেখানে রয়েছে গঙ্গা অবতারণের দৃশ্য। এরকমই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে, তার সঙ্গে ইতিহাস ও পুরাণের প্রসঙ্গ মিলিয়ে ভারতের সংবিধান চিত্রিত। যার মূল অবদান নন্দলাল বসু’র।

(www.theoffnews.com Indian Constitution Nandalal Basu Prembihari Narayan Royjada)


মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও লেকচারার, আহমেদাবাদ:

ছোট বেলায় মায়ের মুখে গল্প শুনে পরিচয়, গোল গোল চশমার নীচে চোখ দুটো ছোট হলেও কি শান্ত আর তেজী মনে হয়েছিল। মাকে নাকি আড়ালে কলেজের ছেলেরা সুভাষ চন্দ্র বলতো, কারণটা মেয়ের স্পর্ধা, সবাই মিলে কোনও প্রফেসরের ক্লাস বয়কট করলে, একা মা ক্লাস করতে যায়, আর তিনিও একাই একজন ছাত্রী নিয়ে পড়াতে শুরু করেন, আস্তে আস্তে একটি দুটি মেয়ে এসে যোগ দেয়, তারপর অর্ধেক ক্লাস। 

সুভাষচন্দ্র মানে একটাই লাইন আমার কাছে, "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।" এক কালে বাঙালিকে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে চলতে ইনিই শিখিয়ে ছিলেন। 

শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড়ে এসে প্রথম কলকাতা চিনতাম। ঘোড়ার মুখের দিকে, লেজের দিকে কোন রাস্তা। ১৬ বছর বয়সে মফঃস্বল থেকে আসা একলা মেয়েটি প্রাক্টিক্যাল ক্লাস করতে যেত কলেজ স্ট্রীটে আপনার মূর্তির ভরসায়। 

পড়াতে পড়াতে একবার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শংকরবাবু বলেছিলেন, "সুভাষ চন্দ্র এমন মানুষ যাঁর জন্মদিন আছে, মৃত্যু দিন নেই। একটা আশার আলোর নাম সুভাষ!"

ছোট বেলায় মাঝে মাঝে দেখতাম হাওড়া স্টেশনে, বাস স্ট্যান্ডের গায়ে লেখা, "নেতাজী ফিরে আসবেন!"

বুঝতাম ইনি একজন এমন মানুষ যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী! যাঁর অপেক্ষায় থাকে মানুষ দিনের পর দিন। মায়ের মুখে শুনেছি শোলমরীর সাধুর কথা, মায়েদের পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে নাকি ওনাকে দেখতে গিয়েছিল। বুঝতে পারতাম আজও তরুণ প্রজন্ম যুগে যুগে হন্যে হয়ে যাকে খোঁজে সেই ব্যক্তিত্ব হলেন সুভাষচন্দ্র!

এরপর বিয়ের পরে দেখি আমার স্বামীর অবসর যাপন সুভাষ চন্দ্রের ওপর পড়াশুনো, জানতে পারি শশুর মশায়ের সাথে সুভাষ চন্দ্রের দাদা সুরেশ বোস এর আলাপ পরিচয়। সুরেশ বোস বলেছিলেন "সুভাষ আমায় রাখী পাঠায়।"

এসব শোনার পরে ছাই আর তার ডিএনএ টেস্টিং বড় হাস্যকর লাগে। অনুজ ধরের back from dead, conundrum আসার পর থেকে অনেক ধোঁয়াশা কাটতে থাকে। চন্দ্রচূড় ঘোষ আর অনুজ ধরের রিসার্চ জানায় তাইওয়ানের সেই বিমান দূর্ঘটনাতে মৃত্যু হয়নি ওনার, রাশিয়ার জেলে এক মহিলা সাংবাদিক দেখেছিলেন তাঁকে। এরপর তিব্বতের দুর্গম পথ ধরে অতি কষ্টে এসে পা রাখেন নিজের দেশে, ভারতবর্ষে।

মনে মনে ভাবি এক কালে যার কণ্ঠস্বর শুনে  দেশবাসীর রক্ত চলকে উঠেছিল, মেয়েরা তার ডাকে অনায়াসে গায়ের গয়না খুলে দিয়েছিল সেই স্বাধীন ভারত বর্ষে এসে মানুষটি যখন জানলেন তিনি  নাকি জাতীয় শত্রু, তখন কতখানি কষ্ট পেয়েছিলেন!

ভাবলে ভীষণ কষ্ট অনুভব করি। নামটি ও পেলেন ভারী অদ্ভুত গুমনামি বাবা, নামটাই যার গুম হয়ে গেছে!

সত্যিই কি তথাকথিত তদানীন্তন দেশীয় পিতা, চাচা শ্রেণির চক্রান্তকারীরা পেরেছেন ওই মানুষটিকে আপামর ভারতবাসীর মন থেকে গুম করে দিতে? এতই কি সহজ ! নেতা তো হাজার হাজার কিন্তু নেতাজী তো একজনই হন!

ভরসা, বিশ্বাসের আর এক নাম সুভাষ চন্দ্র! যিনি আজ ১২৮ বছর বয়সেও শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের স্বপ্ন দেখার সাহস দেন! আজও নিশ্চয়  দেশের কোনও না কোনও মা সন্তানদের তাঁর গল্প বলে শেখাবেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে। ২৩শে জানুয়ারি  আসলে শিরদাঁড়া সোজা রেখে  অন্যায়ের সাথে আপোষ না করার বার্তাবহ একটি দিন। জয় হিন্দ।

(www.theoffnews.com Netaji Subhash Chandra Bose)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলা থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বেণীসাগর গ্রাম থেকে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (এএসআই) উৎখননে প্রাপ্ত শতাধিক প্রত্নবস্তু থেকে বোঝা গেছে যে এখানে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী থেকে ১৬-১৭ শতাব্দী পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে মানুষের বসবাস ছিল। 

প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানে পাওয়া ভাস্কর্য এবং পাথরের মূর্তিগুলি নিয়ে ক্রমাগত গবেষণা করছেন।  কৌতূহলোদ্দীপক এমন অনেক প্রত্নবস্তুও এখানে পাওয়া গেছে যেগুলির রহস্য আগামী দিনে উন্মোচিত হতে পারে।

এএসআই ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ১০০টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের তালিকায় বেণীসাগরকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ৩০০ x ৩৫০ মিটার আয়তনের একটি বিশাল পুকুরের কারণে এর নামকরণ করা হয়েছিল বেণীসাগর, যা নিয়ে স্থানীয় এলাকায় জনশ্রুতি প্রচলিত আছে যে এটি বেণী বা বেণু নামে একজন রাজা নির্মাণ করেছিলেন।

১৮৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কর্নেল টিকেল এই স্থানটি প্রথম আবিষ্কার করেন এবং ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক জে.ডি. বেগলার বেণীসাগর পরিদর্শন করেন এবং এখানে কিছু ভাস্কর্য দেখতে পান। এই মূর্তির উপর ভিত্তি করে তিনি এই প্রত্নস্থলটিকে খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীর বলে নিরূপণ করেন। ইতিহাসবিদ কে সি পানিগ্রাহী এখানের প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে ১৯৫৬ সালে একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছিলেন।

এএসআই ২০০৩ সালে  প্রথমবারের মতো এখানে খনন করে। এই দীঘির দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্বের বাঁধের দিকে খননের ফলে দুটি পঞ্চায়তন মন্দির চত্বর এবং সূর্য, ভৈরব, লকুলিশ, অগ্নি, কুবের প্রভৃতি দেবতার অনেক ভাস্কর্যের ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে। 

এগুলি ছাড়াও ওখানে একটি পাথরের শিলালিপিও পাওয়া গেছে, যেটিতে "প্রিয়াঙ্গু ধেয়াম চাতুবিদ্যা (চাতুরবিদ্যা)" খোদাই করা রয়েছে, যার অর্থ ‘প্রিয়ঙ্গু নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি চারটি বেদে সুপণ্ডিত ছিলেন।' শিলালিপির লিপি ব্রাহ্মী এবং ভাষা সংস্কৃত। কিছু গবেষকের ধারণা, যে বেণীসাগর থেকে উদ্ধারকৃত শিলালিপি থেকে বোঝা যায় যে এটি একটি শিক্ষাকেন্দ্র ছিল, যেখানে চারটি বেদ পড়ানো হত। তার ওপর কাম এবং সঙ্গমের শিলামূর্তিগুলি দেখে বোঝা যায় যে সেই সময়ে যৌন শিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল না। 

ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে বেণীসাগর অবশ্যই তান্ত্রিক ও শৈবধর্মের প্রভাবাধীন এলাকা ছিল।

আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইট অনুসারে, এটিকে এপিগ্রাফিক বা শিলালিপির অধ্যয়ন থেকে ৫ম শতাব্দীর বলে মনে করা যেতে পারে। এযাবৎ কালের আবিষ্কারের ভিত্তিতে বলা যায় যে এখানে ৫ম থেকে ১৬-১৭ শতাব্দী পর্যন্ত জনবসতি ছিল।

বেণীসাগর ওডিশার ময়ূরভঞ্জ জেলার সীমান্তের কাছে অবস্থিত। ময়ূরভঞ্জের এপি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অজয় রাওয়াত বলেছেন যে ওড়িশা সংলগ্ন অঞ্চলে বহু রাজা বহু শতাব্দী ধরে রাজত্ব করেছেন। বেণীসাগরে খননকার্য ও ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করে যে এটি অবশ্যই ওডিশার রাজার অধীনে ছিল। এখানকার মন্দির স্থাপত্যকে ওডিশায় প্রচলিত রেখ দেউল ধরনের স্থাপত্যের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

২০০৯ এবং ২০১৯-২০২০ সালে এখানে পরিচালিত বৈজ্ঞানিক খননের সময় অগ্নি, গণেশ, মহিষাসুরমর্দিনী, সূর্য, ব্রহ্মা, শিরোচেদক, ভৈরব, লকুলিশ, যমুনা, শিবলিঙ্গের মূর্তি খোদাই করা পাথরের প্যানেলগুলি পাওয়া গেছে। এছাড়াও, মন্দিরের স্থাপত্যের অনেকগুলি অংশ যেমন দরজার চৌকাঠের বাজু, শাখা এবং খাড়া পিলার আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব নিদর্শন বেণীসাগরে নির্মিত একটি জাদুঘরে রাখা হয়েছে। এই জাদুঘর থেকে কিছু দূরত্বে প্রাচীন সভ্যতার কিছু ঘরের ধ্বংসাবশেষও রয়েছে। তাদের বাঁকা গঠন দেখে মনে হয় সেখানে প্রাচীন যুগে স্নানের জায়গা ছিল।

এছাড়াও ৫০ একর জায়গা জুড়ে মন্দির চত্বরের ধ্বংসাবশেষও এখানে পাওয়া গেছে। মন্দিরের কাছে একটি বিশাল পাথর, যা অন্য একটি পাথর দিয়ে আঘাত করলে ঘণ্টার শব্দ নির্গত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রক্ষীরা বলেন যে রাতে এক কিলোমিটার দূরেও এই শব্দ শোনা যায়।

৩০০ x ৩৫০ মিটারের বিশাল পুকুরটি এই জায়গার অন্যতম আকর্ষণ, যেটি গ্রামবাসীদের মতে কখনও পুরোপুরি শুকিয়ে যায় না। যদিও এই এলাকার অন্যান্য পুকুরগুলির প্রায়শই সেই দশা হয়। পর্যটকদের সুবিধার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুকুরের চারপাশে একটি ভিউপয়েন্ট তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে তারা বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

(www.theoffnews.com archeology Jharkhand Benisagar)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

হরিয়ানা বিধানসভার অধ্যক্ষ গিয়ান চাঁদ গুপ্ত এবং নগরোন্নয়ন মন্ত্রী কমল গুপ্ত সম্প্রতি হরিয়ানার হিসার জেলার অগ্রোহা প্রত্নস্থানে একটি ‘গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার’ বা জিপিআর সমীক্ষার উদ্বোধন করেছেন। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অভ ইন্ডিয়া (এএসআই) এবং হরিয়ানা আর্কিওলজি ও ম্যুজিয়াম ডিপার্টমেন্টের যৌথ উদ্যোগে এই প্রত্নস্থলটির উন্নতিকল্পে যে বৃহত্তর পরিকল্পনা করা হয়েছে এই সমীক্ষা তারই একটি অংশ। অগ্রোহায় সর্বশেষ খননকালে (১৯৭৮-৮১) একটি প্রাচীন সভ্যতার সন্ধান পাওয়া যায় এবং বর্তমানে এই জিপিআর সমীক্ষার লক্ষ্য ভূগর্ভস্থ স্থাপত্য শনাক্ত করা। এএসআই এবং হরিয়ানা সরকারের চুক্তির লক্ষ্য হলো অগ্রোহা প্রত্নস্থলের গুরুত্ব বৃদ্ধি করা। 

জিপিআর সার্ভে হল একটি ভূ-পদার্থগত পদ্ধতি যা ভূগর্ভস্থ স্তরগুলির গঠন এবং প্রোথিত স্থাপত্য সনাক্ত করতে সাহায্য করে। জরিপ শেষ হলে, অগ্রোহা প্রত্নস্থলে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলি সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।  

হরিয়ানার হিসার জেলায় আদমপুর তহসিলে হিসার থেকে ফতেহাবাদের দিকে ২২ কিমি দূরে ১০ নং জাতীয় সড়কের ধারে আগরোহা গ্রামে অগ্রোহাদের প্রাচীন প্রত্নস্থল ‘অগ্রোহার প্রাচীন ঢিবি’ অবস্থিত। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী থেকে ১৪শ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে মানুষের বসবাস ছিল।

পরম্পরাগত ভাবে অগ্রোহা প্রত্নস্থলটি অগ্রবাল সম্প্রদায়ের কিংবদন্তী রাজা মহারাজা অগ্রসেনের রাজধানী বলে অনুমান করা হয়। তক্ষশীলা ও মথুরার মধ্যবর্তী প্রাচীন বাণিজ্য পথে অগ্রোহা শহরটি অবস্থিত ছিল। ফিরোজ শাহ তুঘলগের হিসার-ই-ফিরোজা (হিসার) নামে একটি নতুন জনপদ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত অগ্রোহা বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

অগ্রোহা প্রত্নস্থল থেকে ৪টি ইন্দো-গ্রীক, একটি পাঞ্চ-মার্কড এবং আরও ৫১টি এগ্রোডাকার মুদ্রার একটি ভান্ডার পাওয়া গেছে। খননের সময় আগ্রেয় জনপদের (প্রজাতন্ত্র) মুদ্রার আবিষ্কার এবং সাহিত্যে এর প্রাচীন নাম অগ্রোডাক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। এই স্থানটি ১৮৮৮-৮৯ সালে সি জে রজার্স দ্বারা খনিত হয় এবং ১৯৩৮-৩৯ সালে এচ এল শ্রীবাস্তবের তত্ত্বাবধানে এএসআই ৩.৬৫ মিটার পর্যন্ত পুনঃখনন করে। ১৯৭৮-৮৪ সালে হরিয়াণা সরকারের প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগের পি কে শরণ এবং জে এস ক্ষত্রী স্থানটিতে পুনরায় খনন করেন।

এইসব খননের ফলে অগ্রোহাতে একটি দুর্গ-জনপদ এবং খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী থেকে ১৪শ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মানুষের অবিচ্ছিন্ন বসতির ইতিহাস প্রমাণিত হয়েছে। রোদে শুকোনো ইট দিয়ে তৈরি ব্যক্তিগত আবাসস্থল এবং জনগণের বাড়িগুলি ছাড়াও এখানে একটি বৌদ্ধ স্তুপ ও হিন্দু মন্দিরের অবশেষের পাশাপাশি অবস্থান বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থান এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দিক নির্দেশ করে। 

সমীক্ষার উদ্বোধনের সময় অধ্যক্ষ অগ্রোহাকে একটি বিশ্বমানের পর্যটনস্থলে পরিণত করতে সরকারের প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন। তিনি প্রত্নখননের মাধ্যমে আগ্রোহার ঐতিহ্যময় অতীত উন্মোচনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। নগরোন্নয়ন মন্ত্রীও একই ভাবে অগ্রোহাকে ২৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে একটি বিশ্বমানের শহর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার রূপরেখা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন যে হরিয়ানার পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রচারের জন্য অগ্রোহার উন্নয়ন একান্তভাবে জরুরী।  

অগ্রোহা প্রত্নস্থলে জিপি আর জরিপটি এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ চিহ্নিত করে। অগ্রোহাকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের এই প্রচেষ্টা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে আরও বৃদ্ধি করে, দর্শনার্থী এবং ঐতিহাসিকদের একইভাবে আকর্ষণ করবে বলে আশা করা যায়।

(www.theoffnews.com Agroha archeological)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন যে এই প্রথম হায়দ্রাবাদ শহরে নিওলিথিক হাতিয়ারের সন্ধান পাওয়া গেছে

হায়দ্রাবাদের কচ্ছপের আকারে গঠিত একটি বিশেষ শিলার নীচে নিওলিথিক হাতিয়ারগুলির আকস্মিক আবিষ্কারের ফলে ওই প্রত্নস্থানটিকে সুরক্ষার দাবি উঠেছে।

কোথা তেলেঙ্গানা চরিত্র ব্রুন্ডমের সদস্যরা কচ্ছপ শিলার (যা এখন বিএনআর পাহাড়ের কাছে একটি ট্র্যাফিক আইল্যান্ড) নীচে দুটি নিওলিথিক সেল্ট (প্রাগৈতিহাসিক যুগের পাথর বা ব্রোঞ্জের লম্বা, পাতলা হাতিয়ার যা একটি কুড়াল বা কুড়ালের মতো) আবিষ্কার করেছেন। প্রত্নবিদ ই. শিভানাগী রেড্ডি বলেছেন - “আমরা পেইন্টিং বা স্কেচের আকারে প্রাগৈতিহাসিক রক আর্টের অনুসন্ধান করছিলাম কিন্তু প্রাকৃতিক আস্তানার মেঝেতে দুটি পাথরের কুড়াল খুঁজে পেয়েছি। সেল্টগুলি যথাক্রমে ১২x৭.২x২.১ সেমি এবং ৯.২x৩.৯x২.২ সেমি দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং বেধ মাপ যুক্ত।

এই অনুসন্ধানটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর ফলে হায়দ্রাবাদ শহরের ইতিহাস ৬,০০০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস বিশেষজ্ঞ কে.পি. রাও বলেছেন - “এই প্রথম হায়দ্রাবাদের অভ্যন্তরে নিওলিথিক হাতিয়ার পাওয়া গেল। আগের অনুসন্ধানগুলি জানগাঁও এবং হায়দ্রাবাদের অন্যান্য দূরবর্তী এলাকায় ছিল। পালিশ করা নিওলিথিক সেল্টস প্রাগৈতিহাসিক মানুষের হাতিয়ার তৈরির জ্ঞান ও দক্ষতার অগ্রগতির প্রমাণ দেয়”। 

এই সরঞ্জামগুলি ৪০০০ থেকে ২০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের সময়কালের মধ্যে নিওলিথিক বা নব্যপ্রস্তর যুগের মানুষদের চাষবাস, পশুপালন এবং অস্থায়ী বসতি স্থাপনে সাহায্য করেছিল। অনুসন্ধানকারী দলটির মতে ‘কচ্ছপ শিলা’ একটি মরশুমী বাসস্থান হিসেবে হয়ত ব্যবহৃত হয়েছিল কারণ সেটির আশেপাশে প্রচুর জলের উৎস অবস্থিত ছিল যেগুলি বর্তমানে ‘দুর্গাম চেরুভু’ এবং ‘মালকাম চেরুভু’ নামে পরিচিত।

(www.theoffnews.com Hyderabad)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

(সৌজন্যে বিহার পর্যটন)

[ASI starts excavation to further unearth remnants of Vikramasila Mahavihara.]

{বিক্রমশীলা মহাবিহারের ধ্বংসস্তূপে অবশেষ খোঁজার জন্য এএসআই ৪২ বছর পরে পুনরায় খনন শুরু করেছে।} 

বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাল যুগে ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কেন্দ্রের একটি। অন্য দুটি ছিল নালন্দা ও ওদন্তপুরী বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ও ওদন্তপুরীতে শিক্ষার মান কমে গেছে এমন ভাবনা থেকে রাজা ধর্মপাল ৮ম শতাব্দীর শেষের দিকে অথবা ৯ম শতাব্দীর প্রথম দিকে বিহারের ভাগলপুর জেলার এন্টিচক গ্রামে বিক্রমশীলা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে একটি যেখানে শতাধিক শিক্ষক এবং সহস্রাধিক ছাত্র ছিল। এখান থেকে শিক্ষালাভ করে অনেক ছাত্র বিশিষ্ট পন্ডিত হয়েছিলেন। যাঁদেরকে প্রায়ই বৌদ্ধ শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ধর্ম প্রচারের জন্য বিদেশী দেশগুলি থেকে আমন্ত্রণ জানানো হত। ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজির আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যাবার আগে এটি প্রায় চার শতাব্দী ধরে সমৃদ্ধ হয়েছিল। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা এএসআই বিক্রমশীলা মহাবিহারের অবশিষ্টাংশ খুঁজে পাওয়ার জন্য ৪২ বছরের ব্যবধানে সাম্প্রতিক কালে পুনরায় খনন শুরু করেছে।

এএসআই পাটনা সার্কেলের সুপারিন্টেন্ডিং আর্কিওলজিস্ট গৌতমী ভট্টাচার্য জানিয়েছেন - “এর আগে ওই প্রত্নস্থলে ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এএসআই অত্যন্ত সতর্কতা ও সাবধানতার সঙ্গে নিখুঁতভাবে খনন করে একটি বিশাল বর্গাকার মঠ উদ্ঘাটিত করেছিল যার কেন্দ্রে একটি ক্রুশাকৃতি স্তূপ, একটি গ্রন্থাগার ভবন এবং মানসসিদ্ধিমূলক বা সমর্পিত (ভোটিভ) স্তূপের গুচ্ছ ছিল। বিক্রমশীলা এক্সক্যাভেশন প্রজেক্টের অধীনে ডা. বি এস ভার্মা ১৯৮২ সালের আগে এখানে খনন করেছিলেন। এখন আমরা ৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে আমাদের খননকার্য শুরু করেছি। এই মুহূর্তে আমরা আগের খননের ট্রেঞ্চগুলো পরিষ্কার করার কাজে লেগে রয়েছি। আমরা ডাঁই করা মাটি সরাচ্ছি আর সেই আনকোরা অংশে পৌঁছাতে চাইছি যেখান থেকে আমরা পদ্ধতি মাফিক খনন শুরু করতে পারি।”

এএসআই পাটনা সার্কেলের সহকারী সুপারিন্টেন্ডিং আর্কিওলজিস্ট জলজ কুমার তিওয়ারির তত্ত্বাবধানে ভাগলপুর থেকে ৩৮ কিমি দূরে কহ্লগাঁও সাব-ডিভিশনে ওই প্রত্নস্থলে খনন শুরু হয়েছে। শ্রীমতী ভট্টাচার্য জানিয়েছেন - “আগের খননের সময় উদ্ঘাটিত মঠটি একটি বিশাল বর্গাকার নির্মাণ। কয়েকটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠের নীচে কয়েকটি ইটের খিলান যুক্ত ভূগর্ভস্থ কক্ষও দেখা যাচ্ছে যেগুলি সম্ভবত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আবদ্ধ ধ্যানকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হত। উপাসনার উদ্দেশ্যে নির্মিত প্রধান স্তূপটি চুন-সুরকি দিয়ে গাঁথা ইটের একটি কাঠামো যেটি বর্গাকার মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। এই দুই-দাঁড়া স্তূপটি একটি ক্রুশের আকারে নির্মিত এবং মাটি থেকে প্রায় ৪৫ ফুট উঁচুতে অবস্থিত যেটিতে উত্তর দিকের একটি সিঁড়ি দিয়েই ওঠা সম্ভব।” তিনি আরও বলেন - “কোনও সন্দেহ নেই যে খননের ফলেই ওই প্রত্নস্থলটিকে একদা বিখ্যাত বিক্রমশীলা মহাবিহারের প্রকৃত অবশেষ হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এখন, নতুন খনন এই মহাবিহারের দীর্ঘ বৈচিত্র্যময় ইতিহাস সম্পর্কে অনেক গুরুত্ব পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করবে। এই স্থানটির খননের ফলে পাথরের ফলকগুলিতে উৎকীর্ণ আরও কিছু গুরুত্ব পূর্ণ শিলালিপি পাওয়া যেতে পারে, যা হয়তো ওই মহাবিহারের ইতিহাস আরও খানিকটা উন্মোচিত করবে।”

(www.theoffnews.com Vikramasila Mahavihara unearth)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

সম্প্রতি জম্মুর উপকণ্ঠে ভৌর ক্যাম্পে খনন করার সময় দেবী ইন্দ্রাণী ও শিবের প্রাচীন ভাস্কর্যগুলি পাওয়া যায় এবং পরে সেগুলিকে আর্কাইভস, প্রত্নতত্ত্ব এবং যাদুঘর বিভাগে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানের উদ্ধৃতি দিয়ে কর্মকর্তারা বলেছেন যে বিশেষজ্ঞদের মতে দ্বাদশ শতকের ভাস্কর্যগুলি খুব বিরল। তাঁরা জানিয়েছেন যে এই ভাস্কর্যগুলি দেবী ইন্দ্রাণী ও শিবের মানবীয় রূপগুলিকে পরিস্ফুটিত করেছে। দেবী ইন্দ্রাণীর মূর্তির পরিমাপ ২৮ x ১৩.৫ ইঞ্চি এবং ওজন ৫৫ কেজি এবং শিবের মূর্তির পরিমাপ ২১ x ১৪ ইঞ্চি এবং ওজন ৪০ কেজি। তাঁরা জানান, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী পরিচালক সঙ্গীতা শর্মার নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল ভৌর ক্যাম্প পরিদর্শন করে ভাস্কর্যগুলো সংরক্ষণের জন্য দখলে নিয়েছে।

সম্প্রতি, শেরি গ্রামের স্থানীয়রা বারামুল্লার পুলিশ কম্পোনেন্টকে জানায় যে তারা জমিতে চাষ করার সময় একটি মূর্তি পেয়েছে। তত্ক্ষণাৎ পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভাস্কর্যটি দখলে নেয়। উদ্ধারকৃত ভাস্কর্যটি পরীক্ষা করার জন্য কাশ্মীরের আর্কাইভস, প্রত্নতত্ত্ব এবং জাদুঘরের বিশেষজ্ঞ দলকে ডাকা হয়েছিল যাঁরা জেলা পুলিশ সদর দফতর বারামুল্লায় এসে ভাস্কর্যটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করার পরে পুরোপুরি নিশ্চিত হলেন যে উদ্ধারকৃত ভাস্কর্যটি দেবী লক্ষ্মীর। এরপর আইনকানুন মোতাবেক বারামুল্লা হেড কোয়ার্টারের এসপি শ্রীমতী দিব্যা, ডেপুটি সুপার আইয়াজ আহমেদের উপস্থিতিতে কাশ্মীরের অ্যান্টিক্যুইটিজ, ডিপার্টমেন্ট অফ আর্কাইভস, আর্কিয়োলজি অ্যান্ড ম্যুজিয়ামস্‌-এর রেজিস্টারিং অফিসারকে হস্তান্তরিত করেন।

(www.theoffnews.com Bhour camp Jammu archaeologyal statue sculpture Shiva Laxmi)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

আপামর বাঙালী তথা বেশ কিছু ভারতবাসীর কাছে জয়সালমের সমার্থক শব্দ “সোনার কেল্লা”। কিন্তু অতি সম্প্রতি রাজস্থানের বিখ্যাত মরুশহর জয়সালমের আর এক গুরুত্বপূর্ণ কারণে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে জয়সালমেরের জেঠোয়াই-গজরূপ সাগরের পাহাড়ি অঞ্চলে ভীম কুঞ্জ নামের জায়গায় পরিদর্শনের সময় সিনিয়র ভৌমজল বিজ্ঞানী নারায়ণ দাস ইনখিয়া ডাইনোসরের ডিমের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি করেছেন। জীবাশ্মটি ১৮ কোটি বছর আগের মেসোজোয়িক যুগের (যেটিকে “ডাইনোসরের যুগ” বলা হয়) বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ২০১৮ সালে এই একই জায়গায় ১৬ কোটি ৭০ লক্ষ বছর আগেকার তৃণভোজী লম্বা গলার ডাইনোসরের জীবাশ্মের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল।

মোটামুটি এক থেকে দেড় ইঞ্চি লম্বা এবং একশো গ্রাম ওজনের ডিমের জীবাশ্মটিকে সম্ভাব্য সব রকমের পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের জন্য ডা. ইনখিয়া জিওলজিকাল সার্ভে অভ ইন্ডিয়ার (জিএসআই) জয়পুর শাখার মাধ্যমে লক্ষ্ণৌর জিএসআই-এর প্যালিওন্টোলজি বা জীবাশ্মবিজ্ঞান বিভাগের ল্যাবে পাঠিয়ে দিয়েছেন যেখানে এটির বয়স, কার্বন ডেটিং ইত্যাদি নির্ধারিত হবে। তিনি বলেছেন যে এটি ডাইনোসর বা ওই যুগের যে কোন প্রাণীর হতে পারে তবে সেটা তদন্তসাপেক্ষ। মুরগীর ডিমের মত জীবাশ্মটি মেসোজোয়িক যুগের জুরাসিক সময়ের ডাইনোসরের বলে তাঁর বিশ্বাস। 

জিওলজিকাল সার্ভে অভ ইন্ডিয়ার (জিএসআই) বিজ্ঞানী দেবাশীষ ভট্টাচার্য, কৃষ্ণা কুমার, প্রজ্ঞা পান্ডে এবং ত্রিপর্ণা ঘোষ ২০১৮ সালে জেঠোয়াই-গজরূপ সাগরের পাহাড়ি অঞ্চলে গবেষণা শুরু করেন। গবেষণা চলাকালীন জেঠোয়াই জেলার জেঠোয়াই গ্রামে প্রাচীনতম তৃণভোজী ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছিল। এটাই ছিল ভারতে উদ্ভিদভোজী ডাইক্রিয়োসৌরিড ডাইনোসরের প্রথম আবিষ্কার। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে এযাবৎকাল পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ডাইনোসরের এটি একটি নতুন প্রজাতি এবং ভারতের থর মরুভূমিতে পাওয়া গিয়েছিল বলে সেই সন্মানে এটির নামকরণ করা হয় থরোসরাস ইন্ডিকাস। এখানে যে জীবাশ্মগুলি পাওয়া গিয়েছিল তার মধ্যে প্রধানত ছিল শিরদাঁড়া, ঘাড়, ধড় এবং পাঁজরা। 

বাঙালীর সেরা বাঙালী সত্যজিৎ রায়ের “সোনার কেল্লা”-র জন্য জয়সামেরের নাম ১৯৭৪ থেকে বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার ২০২৩ সালে মূলত বাঙালী বিজ্ঞানীদের হাত ধরে পশ্চিম রাজস্থানের বিখ্যাত থর মরুভূমি ও মরুশহর জয়সালমের ডাইনোসর আবিষ্কারের জন্য একটি বিশিষ্ট স্থান হয়ে উঠেছে।

(www.theoffnews Joisalmer dinosaur Bengali)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

অতি সম্প্রতি তেলেঙ্গানার রঙ্গারেড্ডি জেলার বুরকাগাড্ডাকোথায় দাদাপুর জেলা পরিষদ হাই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র আকস্মিক ভাবে প্রত্নপ্রস্তর যুগের গোড়ার দিকের একটি অ্যাসুলিয়্যান পাথরের হাতিয়ার আবিষ্কার করে ফেলেছে যা ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে অস্ত্রটির বয়েস অন্তত এক লক্ষ বছর।

বাচ্চা ছেলেটি সৌভাগ্যক্রমে মাটি থেকে খানিকটা বেরিয়ে থাকা হাতিয়ারটিতে হোঁচট খায় এবং কৌতূহলী হয়ে মাটি খুঁড়ে পাথরটিকে বের করে ফেলে। পাথরটি হাতে নিয়ে তার একটা অদ্ভুত অনুভব হয় যে সে একটি খুব প্রাচীন জিনিস হাতে ধরে আছে। সে তৎক্ষণাৎ হাতিয়ারটিকে তার শিক্ষক এ সন্তকুমার এবং এম কৃষ্ণার পাশাপাশি ‘কোথা তেলেঙ্গানা চরিত্র ব্রুন্ডম’-এর সদস্যদের নজরে  আনে। ১২.৫ সেমি লম্বা, ৮.৫ সেমি চওড়া এবং ৩.৫ সেমি পুরু এই প্রস্তরায়ুধটি বুরকাগাড্ডাকোথার উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে ছোট ছোট টিলার মধ্যে পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য যে দক্ষিণ টিলা ‘পালুগু’ (কোয়ার্টজ) পাথরে সমৃদ্ধ যেখানে একটি গ্রানাইট পাথর উত্তরের ভূখন্ডে রাজ করছে এবং পশ্চিমের নীচু জমিতে একটি জলাশয় রয়েছে। কর্ণাটকের ভূমিপুত্র এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক রবি করিসেট্টার এবং ‘কোথা তেলেঙ্গানা চরিত্র ব্রুন্ডম’-এর আহ্বায়ক শ্রীরামোজু হরগোপাল এই পাথরের হাতিয়ারের ছবি পরীক্ষা করে দেখে এটিকে প্রত্নপ্রস্তর যুগের গোড়ার দিকের একটি অ্যাসুলিয়্যান পাথরের হাতিয়ার হিসেবে শ্রেণি বিভাগ নিশ্চিত করেছেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে হরগোপাল অনুমান করেছেন যে প্রস্তরায়ুধটি অন্তত এক লক্ষ বছরের পুরনো। 

“অ্যাসুলিয়্যান” (Achuelian) শব্দটি ‘অ্যাসুলিন’ ‘Achulein’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যার উৎস ফ্রান্সের পিকার্ডির সোম্মা ডিপার্টমেন্টের রাজধানী আমিয়াঁর শহরতলীর ‘সেইন্ট অ্যাসুলিয়েল’-এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রত্নস্থল (‘টাইপ সাইট’) যেখানে জন ফ্রেয়ারা দ্বারা ১৮৫৯ সালে প্রস্তরায়ুধগুলি আবিষ্কৃত হয় এবং তিনিই প্রথম এগুলোর বিশাল প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে ধারণা দেন। “অ্যাসুলিয়্যান” হাতিয়ার হোমো ইরেক্টাস এবং হোমো হাইডেলবারজেন্সিস প্রজাতির প্রস্তরায়ুধ শিল্পের সঙ্গে জড়িত।

(www.theoffnews.com Telengana Achuelian stone tool school boy)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

ওড়িশা ইনস্টিটিউট ফর মেরিটাইম অ্যান্ড সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজ (OIMSEAS), রাজ্য সরকারের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক শাখা, এই অঞ্চলে কাজ করে চলেছে। OIMSEAS বালাসোর শহরের কাছে সুরক্ষিত প্রারম্ভিক মধ্যযুগের দুর্গের কাঠামোর অবশেষ আবিষ্কার করার পরে রেমুনা তহসিলের দুর্গাদেবী গ্রামে প্রত্নস্থলটি নথিভুক্ত করার জন্য আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) এর কাছে অনুমতির প্রার্থনা করেছিল। দুর্গাদেবী এবং রানাসাহি আবিষ্কারের আগে বালাসোরে কোনও বড় ঐতিহাসিক স্থান নথিভুক্ত হয়নি। ময়ূরভঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী বালাসোর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দুর্গাদেবী সাইটের দক্ষিণে সোনা নদী এবং এর উত্তর-পূর্ব দিকে বুরাহাবালংয়ের মধ্যে প্রায় ৪.৯ কিলোমিটার পরিধির একটি বৃত্তাকার মাটির দুর্গ রয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা খনন স্থলে তিনটি সাংস্কৃতিক সময়ের স্বতন্ত্র চিহ্ন আবিষ্কার করেছেন: ক্যালকোলিথিক (২০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ১০০০ খ্রিষ্টপূর্ব), লৌহ যুগ(১০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৪০০ খ্রিষ্টপূর্ব), এবং প্রারম্ভিক ঐতিহাসিক সময়কাল (৪০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ১০০ খ্রিষ্টপূর্ব)। একই সাথে এই অঞ্চলে সামুদ্রিক কর্মকান্ডের সাথে সাথে বৌদ্ধধর্মের বিকাশ ঘটে। অযোধ্যা, জয়রামপুর, কুপারি, সুজানাগড়, সোরো, বর্ধনপুর এলাকা থেকেও বৌদ্ধ দেহাবশেষ পাওয়া গেছে।

ইনস্টিটিউট জানিয়েছে যে খনন শুরুর উদ্দেশ্য হল ভারতের পূর্ব উপকূলের নগরায়নের সাথে সামুদ্রিক কর্মকান্ডের যুগপত বৃদ্ধি এবং বিকাশকে সংযুক্ত করা, উত্তরের গঙ্গা উপত্যকাকে মধ্য ওড়িশার মহানদী উপত্যকার সাথে সংযুক্ত করা এবং উত্তর ওড়িশার প্রাথমিক সাংস্কৃতিক বিকাশের দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া। 

"দুটি ছোট নালা, গঙ্গাহারা এবং প্রসানা, প্রত্নস্থলটির উত্তর এবং দক্ষিণে মিশেছে, যাতে ওই দুর্গটির জন্য একটি প্রাকৃতিক পরিখা তৈরি করেছে, যা আজ থেকে প্রায় ৪,০০০ বছর আগে তৈরি একটি প্রাচীন জল ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়," ইনস্টিটিউট জানিয়েছে।

OIMSEAS জানিয়েছে যে দুই একর উঁচু জায়গাতে অনুভূমিক খনন করা হয়েছিল, যেখানে ৪ থেকে ৫ মিটারের গভীরতায় মানব সংস্কৃতির প্রমাণ আবিষ্কৃত হয়েছে। কাজের প্রথম পর্যায়ে, নির্বাচিত পরিখাগুলিতে বৈজ্ঞানিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন করা হয়েছিল, যা ২.৬ মিটার পর্যন্ত গভীর ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি মানব বসতির পাশাপাশি চ্যালকোলিথিক যুগের নিদর্শনগুলি আবিষ্কার করেছেন।

সুনীল কুমার পট্টনায়েক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং সচিব, OIMSEAS বলেছেন - "দুর্গাদেবীর ক্যালকোলিথিক যুগের প্রধান আবিষ্কার হল একটি গোল কুঁড়েঘরের ভিত, লাল রঙের মৃৎপাত্রের উপর কালো রঙের চিত্রণ, কালো স্লিপড ও লাল স্লিপড মৃৎপাত্রে এবং তামার জিনিসপত্র। গোল কুঁড়েঘরের মেঝে লাল মাটি দিয়ে পেটান হয়েছে। ওই গোল ভিত এবং ওখানে উপলব্ধ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত জিনিস থেকে মানুষের জীবনযাত্রার ধারণা করা হয়েছে। বেশিরভাগ লোকেরাই স্থায়ী জীবনযাপন করছিল এবং কৃষিকাজ, পশুপালন এবং মাছ ধরা শুরু করেছিল”।

একইভাবে, লৌহ যুগ থেকে আবিষ্কৃত সাংস্কৃতিক উপাদানের প্রমাণ এবং অবশিষ্টাংশের মধ্যে রয়েছে মৃৎপাত্র, কালো পালিশ করা পোড়া জিনিসপত্র, কালো এবং লাল মৃৎপাত্র, লোহার জিনিস যেমন পেরেক, তীরের মাথা এবং লৌহ যুগের বিভিন্ন ধরণের ধাতু গলাবার মাটির পাত্র বা মুচি এবং লৌহমল।

পট্টনায়েক বলেছেন - “ওড়িশায়, বিশেষ করে উত্তর ওড়িশায় সভ্যতার বিকাশে লোহার ব্যবহার একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। উচ্চ এবং মধ্য মহানদী উপত্যকায় বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিকদের আবিষ্কৃত বেশ কয়েকটি লৌহ যুগের স্থান রয়েছে, কিন্তু উত্তর ওড়িশায় এটিই প্রথম স্থান।”

তিনি বলেছেন - "সাংস্কৃতিক উপকরণ থেকে বোঝা যায় যে ওখানে মানুষের জীবনধারা - কৃষির ভিত্তি থেকে বাণিজ্য এবং পরিখা দিয়ে জায়গাটির চারপাশে দুর্গ নির্মাণ - সব দিক থেকেই খুব উন্নত ছিল, যা খ্রিঃপূঃ ৪০০ সাল থেকে খ্রিঃপূঃ ২০০ সালের মধ্যে দুর্গাদেবীতে নগরায়নের উত্থানের ইঙ্গিত দেয়।” 

তিনি বলেছেন - “এই সাইটটি প্রারম্ভিক ঐতিহাসিক সময়েরও সাংস্কৃতিক উপকরণ খুঁজে পেয়েছে, যেমন লাল মৃৎপাত্রের নমুনা, পোড়ামাটির চাকা, কানের দুল, ব্রেসলেট, পুঁতি এবং কিছু শঙ্কু আকৃতির বস্তু।"

OIMSEAS-এর একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে - "তবে, আমরা AUC, ইন্টার-ইউনিভার্সিটি এক্সিলারেটর সেন্টার, নয়া দিল্লির মাধ্যমে সাইটের জন্য একটি নিখুঁত তারিখ পাওয়ার চেষ্টা করছি৷ আরও খনন শুধুমাত্র বালাসোর জেলার সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নয়নে নয় বরং ভারতের পূর্ব উপকূলেও নতুন দিশা আনবে"।

বিষ্ণুপদ শেঠি, আইএএস, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি এবং রঞ্জন কুমার দাস, আইএএস-এর নির্দেশনায় এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ডক্টর সুনীল কুমার পট্টনায়ক, ওআইএমএসইএএস-এর সচিবের তত্ত্বাবধানে খনন কাজ শুরু হয়েছিল।

(www.theoffnews.com archeology Orissa)


প্রাণকৃষ্ণ মিশ্র, লেখক, কালনা, পূর্ব বর্ধমান:

বাংলার কোন মিডিয়ায় কৃষক ও শ্রমিকদের নিয়ে কোন ধারাবাহিক টেলিকাস্টিং নেই। 

একদম করে না তা নয়, যে খবরে মিডিয়ার লাভ কেবলমাত্র সেই খবরটুকু করে। 

আমার মনে হয়, কৃষক ও শ্রমিকদের উচিত এই ধরণের মিডিয়াকে বয়কট করা। 

উদাহরণ দিই। 

সারাবছর কৃষকদের সমস্যা। জিনিসপত্রের দাম। কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন কিনা! কৃষকের জন্য সরকারি প্রকল্পের সুযোগ কৃষক কতটা পাচ্ছেন, সত্যিই পাচ্ছেন কিনা কোন খবর নেই। 

মনে পরে, সরকারি চ্যানেল ডিডি১ -এ কৃষকদের জন্য খবর থাকতো। কৃষি বিশেষজ্ঞদের এনে পরামর্শ দান করা হতো। 

আজ ওই চ্যানেল কেউ দেখেন না। দেখেন না কারণ এই সংস্থাগুলির দৌরাত্মের কারণেই। তাছাড়া আমাদের দেশের সরকার, ওই চ্যানেলগুলোকে উন্নতির ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে। হয়ত এও এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। যে ষড়যন্ত্রের কারনেই বিএসএনএল ধুঁকছে। ব্যাঙ্ক, বীমাকে দুর্বল করা হচ্ছে। 

এবার প্রারম্ভিক আলোচ্য প্রসঙ্গেই না হয় ফোকাস করা যাক। 

রাজ্যের এবং দেশের কৃষকদের দুরবস্থা নিয়ে কোনও মিডিয়ায় কোনও খবর সম্প্রচার নেই। হঠাৎ ঝড়, অতিবৃষ্টিজনিত কারনে টুকটাক খবর ছাড়া কিছুই করা হয় না। 

শিল্প শ্রমিক বা অসংগঠিত শ্রমিকদের নিয়ে কোনও খবর তো থাকেই না। এরকম চললে আমাদের অন্নদাতারা অদূর  ভবিষ্যতে একদিন হারিয়ে যাবেন। কৃষকদের কৃষিকাজে উৎসাহ হারিয়ে যাবে। এখনই হারিয়ে যাচ্ছে। 

তাঁদের উৎসাহ দান কে করবে? আর কেনই বা করতে হবে? তা কিন্তু ভাবার সময় এসে গেছে। অন্যথায় কোনও এক নতুন অদূর ভোরে কপিবুক নিয়মকে তোয়াক্কা না করে নব্য ধারার টাটকা আন্দোলনের উন্মেষ ঘটবেই। নয়া ভারতের স্বপ্নে প্রস্তুত থেকো। প্রস্তুত হও।

(www.theoffnews.com agriculture labour tv India)


পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা: 

মাস ছয়েক আগের ঘটনা আমি হাওড়ার বাগনান যাব একটি সেমিনারে। উদ্যোক্তারা আমায় বললেন, ‘আপনি কিন্তু ভুল করেও ট্রেনে আসবেন না। বাসে আসার চেষ্টা করবেন। এখানে ট্রেনের কোনও ঠিক ঠিকানা নেই। ইচ্ছে মত চলে।‘ কথাটা ঠিক বিশ্বাস হল না, আমি আগে এদিকে বহুবার লোকাল ট্রেনে গিয়েছি সুন্দর ফাঁকায় ফাঁকায় যাওয়া যায়। তাই ওদের কিছু না বলে হাওড়া দিয়ে ট্রেনেই যাব বলে বেরোলাম। হাওড়ায় পৌঁছলাম সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ। ঢুকে দেখলাম বোর্ডে দেওয়া নটা পয়তাল্লিশের মেদিনীপুর লোকাল। একটু অবাক হলাম নটা পয়তাল্লিশের ট্রেন সাড়ে দশটাতেও ছাড়েনি? প্ল্যাটফর্মে গিয়ে আরও অবাক। থিকথিক করছে ভিড়, সেই ট্রেন এখনও প্ল্যাটফর্মে ঢোকেইনি। এর পরে সপ্তাহ খানেক আগেও সেই একই গল্প হাওড়া বর্ধমান শাখাতেও। লোকাল ট্রেনই দেড় দুই ঘন্টা লেটে চলছে। শুধু কি লোকাল ট্রেন? দূর পাল্লার ট্রেনের অবস্থাও তথৈবচ। প্রায় একই অবস্থা শিয়ালদহ শাখাতেও। শীতকালে কুয়াশার জন্য অনেক সময় ট্রেন লেট হতো। কিন্তু এখন শীত গ্রীষ্ম বর্ষা সব সময়েই ট্রেনের বিলম্বে চলাটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

আমাদের রেলমন্ত্রী উচ্চশিক্ষিত। বালেশ্বরে ট্রেন দুর্ঘটনার সময়ে তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে উদ্ধার কার্যে তদারকি করেছেন স্যোশাল মিডিয়ায় তার প্রশংসার বন্যা বয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন যে ট্রেনের সময় সারণীর মা মাসি এক হয়ে গিয়েছে সে বেলা তার কোনও পদক্ষেপ লক্ষ্য করিনি। বছর খানেক আগে বন্দে ভারত উদ্বোধন করে এমন একটা প্রচার করা হল যেন মনে হল, ভারতে এর আগে ট্রেনই চলত না। সেই ট্রেনকে নিয়ে একটা দেশ প্রেম গোছের আবেগ উন্মাদনা সুকৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হল জনমানসে। মানুষও ভেসে গেল সেই আবেগের সুনামিতে। বন্দে ভারত চাপার ধুম পড়ে গেল, স্টেশনে স্টেশনে ওই ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলাটা নিয়মে পরিনত হল। চারিয়ে দেওয়া হল একটাই কথা মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। অন্য ট্রেনের গতি কমিয়ে দিয়ে, স্টপেজ বাড়িয়ে দিয়ে বন্দে ভারতকেই সেরা ট্রেন হিসেবে প্রমাণ করবার চেষ্টা করা হল। আনা হল অমৃত ভারত। রেল তৎপর এই ট্রেনগুলিকে সময়ে চালাতে। বাকি অন্য ট্রেন ছাগলের তৃতীয় সন্তান এখন। তারা কখন যাবে, কখন আসবে এই নিয়ে রেলের কোনও মাথা ব্যাথা আছে বলেও মনে হয় না। 

এখন আর রেল বাজেট আলাদা করে হয় না। সাধারণ বাজেটে তাই নতুন ট্রেন বা অন্য ঘোষণা কমই থাকে। এবারের বাজেটে পশ্চিমবঙ্গের জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে বলে রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিযোগ লোকাল ট্রেন বাড়ানো হয়নি। সময়ে ট্রেন চালানো শিকেয় উঠেছে। শুধু ট্রেন এক গাদা বন্দে ভারত বা অমৃত ভারত বাড়িয়ে চমক দেওয়া হচ্ছে।  গত কয়েক বছরের মতো এবারও রাজ্যের একাধিক রেলপ্রকল্পে মাত্র এক হাজার টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। তারকেশ্বর-‌মগরা, তারকেশ্বর‌-‌ফুরফুরা শরিফ, বারুইপুর-‌মানাপুর ভায়া খড়গপুর, লছিমপুর-‌বারহাট, হাসনাবাদ-‌হিঙ্গলগঞ্জে নতুন রেলপথ বা লাইন ডাবলিংয়ের জন্য মাত্র এক হাজার টাকা করে বরাদ্দ হয়েছে। হাবড়া-‌বনগাঁ-‌ফেস ১ এবং মছলন্দপুর-‌স্বরূপনগর, সোনারপুর-‌ক্যানিং এবং কালিকাপুর-‌মিনাখাঁ ভায়া ঘটকপুর রেল পথের মডিফিকেশনের জন্যও বরাদ্দ হয়েছে এক হাজার টাকা করে। লালগোলা-‌মণিগ্রাম, লালগোলা-‌জিয়াগঞ্জ ও সাইঁথিয়া-‌তারাপীঠ তৃতীয় লাইনের জন্যেও বরাদ্দের পরিমাণ মাত্র এক হাজার টাকা। 

অসংখ্য প্যাসেঞ্জার ট্রেনকে এক্সপ্রেস তকমা দিয়ে তাদের ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ সময় একই আছে। করোনার আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া বেশ কিছু ট্রেন এখনও চালুই করা হয়নি। তুলে দেওয়া হয়েছে বয়স্কদের ছাড়ের সুবিধা। ডিসেম্বর থেকে নিঃশব্দে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ট্রেন টিকিট

বাতিলের খরচ। বড় স্টেশনে এখন নিখরচায় ওয়েটিং রুম তুলে দিয়ে সেখানে অর্থের বিনিময়ে বসার ব্যবস্থা করে হয়েছে। ট্রেনের খাবারের মান দিন দিন খারাপ থেকে অতি খারাপ হয়ে যাচ্ছে।  এসবই কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিযোগ। মোদি জমানায় আচ্ছে দিনে রেলের এমনই বেহাল দশা দেখে হতাশ সাধারণ মানুষ। লোকাল ট্রেন চুলোয় যাক, এখন সবাই আসুন আচ্ছে ভারতের থুড়ি, বন্দেভারতের স্বপ্ন দেখি।

(www.theoffnews.com Indian railways achchhe din)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

সম্প্রতি তামিলনাড়ুর ভেলোরের থান্ডালাই কৃষ্ণপুরমে (টি কে পুরম) প্রথম বারের জন্য আয়ানার দেবের একটি পাথরের মূর্তি পাওয়া গেছে। কয়েকদিন আগে টি কে পুরমের বাসিন্দারা তাদের এলাকায় একটি রাস্তা তৈরির জন্য একটি ফাঁকা মাঠের আশেপাশে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার সময় ওই বিরল দর্শন মূর্তিটি দৈবাৎ খুঁজে পান। তাঁরা তৎক্ষণাৎ স্থানীয় হেরিটেজ প্রেমী সি তামিলভানানকে জানান যদিও তাঁদের সন্দেহ ছিল যে মূর্তিটি তাঁদের গ্রামের নিজস্ব না, এখানে কেউ ফেলে গিয়েছিল। ইতিহাস প্রেমী সি তামিলভানানের মতে “ভেলোরে এই ধরণের মূর্তি এই প্রথম পাওয়া গেল। রাস্তা তৈরির জন্য একটা মাঠ পরিষ্কার করার সময় জেসিবি অপারেটর এটাতে ঠোক্কর খেয়েছিল আর সে যেহেতু আমাকে ফেসবুকে ফলো করে তাই সঙ্গে সঙ্গে আমাকে খবরটা জানায়। আমি সেখানে একটা হিরো স্টোন দেখতে পাবার আশায় গিয়েছিলাম কিন্তু দেখলাম সেটি আয়ানারের একটি মূর্তি, দেহাতি অঞ্চলে গ্রামের ঢোকার মুখে এই মূর্তি গ্রামের রক্ষাকর্তা হিসেবে রাখা থাকে”। তামিলভানানের মূর্তিটি পরীক্ষা করে মনে হয়েছে যে “মূর্তিটি খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর পল্লব যুগের শেষের দিকের। আইয়ানার মূর্তি এবং মন্দিরগুলি গ্রামীণ তামিলনাড়ুর গ্রামের বাইরে পাওয়া যায়। আইয়ানার হয়তো একজন প্রাক্তন যোদ্ধা বা সেনাপতি থেকে উদ্ভূত হয়েছিলেন এবং সময়ের সাথে সাথে একজন অভিভাবক দেবতায় বিকশিত হয়েছিলেন এবং কেউ কেউ তাকে তাদের পারিবারিক দেবতা হিসাবেও পূজা করেছিলেন। কিন্তু তামিলনাড়ুর রাজস্ব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে এটার বয়েস আর উৎপত্তি জানার জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক এবং স্থানীয় জাদুঘর বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করানো হবে। মূর্তিটিতে আয়ানারকে ‘আগমে’ বর্ণিত 'মহারাজা লীলাসন' নামে একটি বিশেষ ভঙ্গিতে একটি পাথরের সিংহাসনে বসানো রয়েছে এবং তাঁর হাতে ‘সেন্দু’ (বাঁকা লাঠি) রয়েছে। মূর্তিটির নিচের অংশে একটি কুকুর এবং একটি শুয়োর দেখা যাচ্ছে। মূর্তিটি পরিষ্কার করতে গ্রামবাসীদের দেড় ঘন্টা সময় লেগেছিল। তারপরে এটির আসল রূপ দেখে তারা এর পুজো করতে শুরু করে দেয় এবং সকলে মিলে ঠিক করে যে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে মূর্তিটিকে সেখানে স্থাপন করবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন যে ১৮৭৮ সালের ‘ইন্ডিয়ান ট্রেজার ট্রোভ অ্যাক্ট’ অনুযায়ী মাটির ১ ফুট নিচের গভীরতায় যা কিছু পাওয়া যায় তা সরকারি সম্পত্তি এবং এই মূর্তিটি জেলা কোষাগারে কালেক্টরের কাছে জমা হওয়া উচিৎ। সেই কারণে ভেলোরের সরকারি জাদুঘর এই মূর্তিটির বিষয়ে ভেলোরের ‘ট্রেজারি’ এবং চেন্নাইয়ের ‘ডাইরেক্টর অফ ম্যুজিয়ামস’কে একটি রিপোর্ট পাঠাবে।

আমাদের কাছে ‘আয়ানার’ তামিল দেবতার নামটি অপরিচিত, কিন্তু গ্রাম বাংলায় এবং খোদ কলকাতা শহরে ‘পঞ্চানন ঠাকুর’ বা ‘পাঁচু ঠাকুর’ একটি অত্যন্ত পরিচিত লোকদেবতা যাদের চেহারায় এবং কাজকর্মে দারুণ মিল। পঞ্চানন বা পঞ্চানন্দ বা পাঁচু ঠাকুর লোকবিশ্বাসে মহাদেব শিবের এক অর্বাচীন রূপ; অন্যমতে, ইনি শিবের পুত্র। মূলত গ্রামরক্ষক, শিশুরক্ষক রূপে পঞ্চানন পূজিত হন। তবে সন্তানদাতা, শস্যদেবতা হিসাবেও বাঙালি হিন্দু সমাজে তার পূজার প্রচলন আছে। রক্তবর্ণ পঞ্চাননের মুণ্ড-মূর্তি ও ঘট প্রতীক পূজিত হয়। [সূত্র: বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ , দুলাল চৌধুরী, আকাদেমি অব ফোকলোর, কলকাতা: ৭০০০৯৪, প্রথম প্রকাশ:২০০৪, পৃষ্ঠা: ৪৮৬] পঞ্চাননের গাত্রবর্ণ লাল এবং চোখমুখের ভঙ্গি রুদ্ররূপী, বেশ বড় গোলাকার ও রক্তাভ তিনটি চোখ ক্রোধোদ্দীপ্ত। প্রশস্ত ও কালো টিকালো নাক, দাড়ি নেই, গোঁফ কান অবধি বিস্তৃত। মাথায় পিঙ্গল বর্ণের জটা চূড়া করে বাঁধা এবং তার মধ্যে জটা কিছু বুকে পিঠে ছড়ানো। কানে ধুতুরা ফুল। গায়ের ওপর দিকে কোনও পোশাক থাকে না, নিচের দিকে বাঘ ছাল পরা। তবে গলায় ও হাতে বেশ বড় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষ মালা থাকে। হাতে ত্রিশূল ও ডমরু, পায়ে খড়ম এবং মাথায় বা দেহের উপর সাপ বিদ্যমান। পাশে থাকে পঞ্চরংয়ের বা পাঁচমুখো গাঁজার কলকে। এঁর অনুচর হলেন লৌকিক দেবতা জরাসুর ও ধনুষ্টংকার নামক দুজন অপদেবতা। এঁর সঙ্গে থাকে মামদো ভূত, ঘোড়া, বাঘ প্রভৃতি।

তামিল দেবতা ‘আইয়ানার’ বা ‘আয়ানার’ দক্ষিণ ভারত আর শ্রীলঙ্কার দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর পরম পুজনীয় লৌকিক দেবতা। কোনও কোনও গবেষক মনে করেন যে অতীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতেও আয়ানারের পুজো হত। তামিলনাড়ুতে তাঁর পুজো মূলত হয় গ্রামের অভিভাবক হিসেবে। আয়ানারের মন্দিরগুলোতে তাঁর এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের খুব রংচঙে মূর্তি দেখা যায় যাদের বাহন হাতি বা ঘোড়া।

(www.theoffnews.com Vellore Ayyanar statue)


প্রাণকৃষ্ণ মিশ্র, লেখক, কালনা, পূর্ব বর্ধমান:

কাশ্মীরে বিগত কয়েক বছরে যা উন্নয়ন হয়েছিল তা লক্ষ্যনীয়। পর্যটকরা নির্ভয়ে কাশ্মীর উপত্যকায় যাওয়া শুরু করেছিলেন। ব্যবসা বাণিজ্য বেড়েছিল (শ্রীনগর হোটেল ব্যবসায়ীর বক্তব্য)।  

নতুন রেলপথের সম্প্রসারণ, শ্রীনগর-কন্যাকুমারী চওড়া রাস্তা, জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতি, রাতেও নির্বিঘ্নে শ্রীনগরে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। 

নাশকতা, পাকিস্তানি উগ্রপন্থী হানা অনেকটাই কমেছিল। যদিও এবছর অমরনাথ যাত্রার পূর্বে রেইসি জেলায় শিবখরী যাত্রী বোঝাই বাসে এবং কাঠুয়াতে দুটি পৃথক নাশকতা হয়েছিল, অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল। তবুও বলা যায় বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা দশ বছর আগের তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। 

একান্ত আমার ব্যক্তিগত মত, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় এদেশের সংখ্যালঘু মানুষ উন্নয়ন নয়, ধর্ম ভিত্তিক ভোট প্রয়োগ করেন। 

কোন দলকে ভোট দিলে, ধর্মীয় ভাবধারায় সুবিধা প্রাপ্তি হয় সেই ভিত্তিতে তারা ভোট দেন। কাশ্মীরের মত এরাজ্যেও সেই প্রমান পেয়েছি। 

এ'বছর জুলাই মাসে কাশ্মীর যাওয়ার সময় বন্ধু ড্রাইভার সাজেদ আহমেদ গাড়ি চালাতে চালাতে বলছিলেন, "মমতা ব্যানার্জি বহুত আচ্ছা আদমি। উহ হাম লোগো কে লিয়ে আচ্ছা কাম করতে হ্যায়।"

 আমি বলেছিলাম, তাই যদি হয়, মমতা ব্যানার্জি কা পার্টি কা আদমি ইধার খাড়া কর দো। উনকো কাশ্মীর কা মুখ্যমন্ত্রী বানা দো। হাম লোগো কো রেহাই মিলে গা।"

সাজেদ বলেছিল, এ হামারা মুলুক। এ নেহি হো সকতা।

উপত্যকায় কোনও দিন বিজেপি জিততে পারবে না, আমি কেন বিজেপিও জানতো। উপত্যকায় ৯০% অধিক ভোটার মুসলিম। 

বিজেপির প্রতি আমার আলাদা কোনও মোহ নেই। কারন আমি জানি বিজেপিও ধর্মের ভিত্তিতে ভোট মেরুকরণের রাজনীতিতে আস্থা রাখে। 

তবে আশঙ্কা এই, কাশ্মীর আবার মৌলবাদীদের স্বর্গরাজ্য হবে। ভূস্বর্গ থেকে আবার সাধারণ পর্যটক মুখ ফিরিয়ে নেবেন। আশঙ্কা ভারতের নিরাপত্তা আবার বিঘ্নিত হবে। 

ফারুক আবদুল্লা, ওমর আবদুল্লা, মুফতি মহম্মদ সহিদ এরা প্রত্যেকেই উগ্রপন্থী দলের সহায়ক শক্তি ও ছায়া শক্তি। ইতিমধ্যে ওরা ঘোষণা করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী জেল বন্দি নেতাদের মুক্ত করবে। 

(www.theoffnews.com Kashmir election)


পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

লোকসভা নির্বাচনের পরে কেটে গিয়েছে বেশ কিছুটা সময়। এখনও বিভিন্ন দলের ফলাফল নিয়ে চলছে আলাপ আলোচনা, তর্ক বিতর্ক। মানুষ এখনও প্রবল উৎসাহী ভোটের ফলাফল নিয়ে কাটাছেঁড়ায়। এই উত্তেজনা এবং উদ্দীপনার মাঝেই একটা ছোট্ট খবর আপনার চোখ এড়িয়ে গেছে নিশ্চয়। কিন্তু এই খবরে আপনি ভারতবাসী হিসেবে গর্বিত হতেই পারেন। আমরাই সেরা গোটা বিশ্বে। কিসে? ভোটের খরচে। ঠিকই শুনেছেন, সারা বিশ্বে নির্বাচনে খরচের বহরে ভারত এক নম্বরে। কি গর্ব হচ্ছে না? ‘সেন্টার ফর মিডিয়া স্টাডিজ’ এর দেওয়া তথ্য বলছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল হল ২০২৪-এ ভারতের লোকসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে খরচ হয়েছে ১.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতিটি ভোট সংগ্রহে খরচ ১৪০০ টাকা। খরচের বহরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে ভারতের অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচন। সেখানে খরচ হয়েছিল ১.২০ লক্ষ কোটি টাকা।

যে দেশে এখনও অপুষ্টিতে মারা যায় অসংখ্য শিশু, চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় বেকার যুবক, দারিদ্রের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিজের সন্তানকে হত্যা করে আত্মঘাতী হন মা, যেখানে ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন হাজার হাজার কৃষক, যে দেশে বন্ধ কারখানার শ্রমিক দুবেলা দুমুঠো খাবার যোগাড় করতে না পেরে সপরিবারে আত্মঘাতী হন সে দেশ শাসক বাছতে খরচ করে সব চেয়ে বেশি। 

‘সেন্টার ফর মিডিয়া স্টাডিজ’ দেশে ভোটে খরচের হিসাব দিয়ে জানিয়েছে, ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে খরচ হয়েছিল ৫৫-৬০ হাজার কোটি টাকা। এ বার দ্বিগুণেরও বেশি খরচ হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ১৯৫১-৫২ সালের সঙ্গে তুলনা করলে খরচসীমার বৃদ্ধি হয়েছে ৩০০ গুণ। তখন একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা খরচ করতে পারতেন। আর এ বার একজন প্রার্থী ৯৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে পারেন। কত গুণ বেড়েছে হিসাব করুন! তাও খরচ-সীমা প্রযোজ্য হচ্ছে মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরে হওয়া জনসভা, রোড শো, বিজ্ঞাপন ও পরিবহণ সংক্রান্ত খরচের ক্ষেত্রে। তা ছাড়াও প্রতিটি নির্বাচনে নানা জাতীয় ও আঞ্চলিক দলের হিসাব-বহির্ভূত উপহার, টাকা, সোনা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা তো রয়েইছে। এগুলি নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া হিসাবের বাইরে। আরও একটা বিষয় গর্ব করার মত, যারা ভোটে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের একটা বড় অংশই হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। গত লোকসভায় এক একজন সাংসদদের গড় সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২১ কোটি টাকা। তার উপর নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের খরচের ক্ষেত্রে কোনও উর্ধ্বসীমা নেই। ফলে ভোটে যে কোনও প্রকারে জেতার তাড়নায় বেড়েই চলেছে খরচের বহর। নির্বাচন কমিশনে শাসক রাজনৈতিক দলগুলির জমা দেওয়া তথ্য দেখে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এডিআর) আশঙ্কা করেছে, অর্থ সংগ্রহ ও খরচ এবং তার হিসাবে স্বচ্ছতার চূড়ান্ত অভাব রয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, ২০০৪-০৫ থেকে ২০২২-২৩ এই সময়কালে দেশের ৬টি বৃহৎ রাজনৈতিক দল ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ১৯ হাজার ৮৩ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে গোপন উৎস থেকে। এর মধ্যে নির্বাচনী বন্ডও রয়েছে। এই টাকা ঘুরে ফিরে আপনার আমার কাছ থেকেই তো যায়। 

এ তো গেল খরচের কথা। কি ভাবছেন এই সব দেখে রাজনৈতিক দলগুলি একটু রাশ টানবে? আজ্ঞে না, তাদের নির্বুদ্ধিতা, খামখেয়ালিপনা এবং স্বেচ্ছাচারিতার মাশুল দিতে হবে আপনাকে আমাকেই। কারণ প্রার্থী বাছাই। রায়গঞ্জ ও রানাঘাট ২ টি লোকসভা আসনেই এবার জয়ী হয়েছে বিজেপি। আর রায়গঞ্জ ও রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভা ওয়ারি ফলাফলে চোখ রাখলে দেখা যাচ্ছে, রায়গঞ্জ বিধানসভা থেকে বিজেপি পেয়েছে ৯৩,৪০২ টি ভোট। যেখানে তৃণমূল পেয়েছে মাত্র ৪৬,৬৬৩ ভোট। অন্যদিকে, রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভা থেকে বিজেপি পেয়েছে ১,২৩,৫৬৮ ভোট, এখানে তৃণমূল পেয়েছে ৮৬,৬৩২ ভোট। আর এই ২ লোকসভা কেন্দ্রে যে ২ জন তৃণমূল প্রার্থীর কার্যত ভরাডুবি হয়েছে, ১ মাসের মধ্যে তাঁদেরকেই ফের টিকিট দিল তৃণমূল কংগ্রেস। যদিও বনগাঁর পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাসকে বাগদা বিধানসভা থেকে টিকিট দেয়নি দল। বদলে টিকিট দেওয়া হয়েছে ঠাকুরবাড়ির তরুণ প্রজন্মের সদস্য মমতা ঠাকুরের কন্যা মধুপর্ণা ঠাকুরকে। বিধায়কদের লোকসভায় প্রার্থী না করে অন্য কাউকে প্রার্থী করলেই তো লোকসভার পরেই আবার বিধানসভা উপনির্বাচনের দরকার পড়ত না। মানিকতলা কেন্দ্র বাদ দিলে বাকি তিনটি বিধানসভায় উপনির্বাচন হচ্ছে শুধুমাত্র তৃণমূল কংগ্রেস নের্তৃত্বের খামখেয়ালিপনা বা তুঘলকি ইচ্ছার কারণে। এই দোষ থেকে বিজেপিও মুক্ত নয়। তাদের বিধায়ক প্রার্থীরা জিততে পারলে সেখানেও উপনির্বাচন করতে হত আবার। এই উপনির্বাচনেও খরচ হবে কোটি কোটি টাকা, সে টাকাও যাবে আপনার আমার পকেট থেকেই। অতএব, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি এসব ক্ষেত্র চুলোয় যাক, ভোটের খরচে আমরা সবার আগে। এতেই আপনি ভারতবাসী হিসেবে গর্বিত হোন।

(www.theoffnews.com Indian election expenses)


সুবীর পাল, সম্পাদক, দ্য অফনিউজ

স্বাধীনতা তুমি,রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।

স্বাধীনতা আমার, রবিকবির অজেয় জনগণমন, ভারতের অন্তরাত্মার অন্তত সুর।

স্বাধীনতা তুমি, পতাকা শোভিত স্লোগান মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।

স্বাধীনতা আমার, গণতান্ত্রিক মধুময় তামরসে মোদী মমতার এগিয়ে চলার প্রত্যয়ে তুমুল রাজনৈতিক বিতন্ডা। 

স্বাধীনতা তুমি, ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।

স্বাধীনতা আমার, বোকারো ইস্পাত কারখানার অবিরাম চিমনি ধোঁয়ায় শ্রমিকের হাতে গ্রিস কালি লাগা।

স্বাধীনতা তুমি, রোদেলা দুপুরে মধ্য পুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।

স্বাধীনতা আমার, ২৯ রাজ্য, ৭টি কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চল, ১৬১৮ টা ভাষা, ৬৪০০ জাতি, ৬ টি ধর্ম, ৬ ধরণের মানব গোষ্ঠী, ২৯ টি সার্বজনীন উৎসব, অথচ একটি মাত্র দেশ, মেরা ভারত মহান।

স্বাধীনতা তুমি, মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশী।

স্বাধীনতা আমার, ডিজিটাল ভারতে এক স্বপ্ন দেখা মেক ইন ইন্ডিয়ার চলমান বিশ্ব-বাস্তবতা।

স্বাধীনতা তুমি, বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর শানিত কথার ঝলসানি লাগা সতেজ ভাষণ।

স্বাধীনতা আমার, ব্যক্তি আক্রমন পাশ কাটিয়ে এখনও আপোষহীন সংবাদ পরিবেশনে খিদের পেটে জনা কয়েক সাংবাদিকের লেখা অর্জুণের পাখির চোখ।

স্বাধীনতা তুমি, চা খানায় আর মাঠে ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।

স্বাধীনতা আমার, শ্রীহরিকোটা থেকে উৎক্ষেপিত চন্দ্রযান৩ পৃথিবীর কক্ষরেখা ছেড়ে চাঁদের মায়াপথে স্বপ্নের জাহিরি অহংকার।

স্বাধীনতা তুমি, কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা। 

স্বাধীনতা আমার, দেশীয় শিল্প প্রেমে মকবুল ফিদার সরস্বতী আর রামকিঙ্কর বেজের রবীন্দ্রনাথ সাধনায় একাত্মতার সিম্ফনি।

স্বাধীনতা তুমি, উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।

স্বাধীনতা আমার, পিছিয়ে পড়া উপজাতির পুত্রহারা এক দ্রৌপদীর রাষ্ট্রনায়ক উত্থানের প্রেরণার উপাখ্যান।

স্বাধীনতা তুমি, বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদী রঙ।

স্বাধীনতা আমার, অদিতি স্বামীর মুঠোয় তীরধনুক ছিলার নিশানায় বিশ্বজয়ের সোনার মেডেলে চুমু খাওয়া।

স্বাধীনতা তুমি, বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।

স্বাধীনতা আমার, শাসক বিরোধীর তুমুল বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে ঝলসে যাওয়া মনিপুরের জাতি দাঙ্গায় সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের হস্তক্ষেপ।

স্বাধীনতা তুমি, গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল, হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।

স্বাধীনতা আমার, সীতা বেহুলার স্বামী পরায়ন দেশে কল্পনা চাওলার একরাশ হাসি মুখে মহাকাশে চিরতরে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া।

স্বাধীনতা তুমি, খোকার গায়ে রঙিন কোর্তা খুকির অমন তুলতুলে গালে রৌদ্রের খেলা।

স্বাধীনতা আমার, রনবীর সিংয়ের নগ্ন ফটোশুটে যুবকের ঠেকে তুফানি স্ক্যান্ডেলের তীব্র ছয়লাপ আর উরফি জাভেদের উন্মুক্ত পোষাকে যুবতীর দলে লেটেস্ট ট্রেন্ডির হুল্লোরে চর্চা।

তামাম দুনিয়ার শান্তির দূত মেরা ভারত মহান এখন যে চাঁদের মাটি স্পর্শ প্রজ্ঞানের তিরতির অপেক্ষারত। অপেক্ষায় মনিপুরের ভিটেতে নিশ্চয়ই মহান ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উপাসনায়। হতেই পারে উর্দ্ধ গগণে বাজে মাদল নিম্নে উতলা ধরণীতল। তবু তবুও হে ভারতের স্বাধীনতা, স্বাধীনতা তুমি, স্বাধীনতা আমার। স্বাধীনতা যে তুমিই গো, স্বাধীনতা যে আমারই গো। আমাদের মুক্তির আজ যে একটাই মন্ত্র- একই আজাদি কা হামারা হাজার মহবৎ, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান। যার একটাই তন্ত্র- প্রজাতান্ত্রিক ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র। জয় হিন্দ। বন্দে মাতরম।

(www.theoffnews.com - Indian independence)