Articles by "রূপসী বাংলা"
Showing posts with label রূপসী বাংলা. Show all posts


পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা: 

বইমেলায় উপছে পড়া ভিড়, এদিকে শুনশান রাজ্যের গ্রন্থাগারগুলি। বাঙালি কি বই পড়তে চায় না আর?

সে একটা সময় ছিল, যখন দুপুর হলেই গমগম করতো পাড়ার গ্রন্থাগারগুলি। নানান বয়সের নানান মানুষের ভিড় তখন গ্রন্থাগারে। কেউ কমিক্স পড়ছে, কেউ পড়ছেন খবরের কাগজ, কেউ আবার সাময়িক পত্রিকা, কারও হাতে দেখা যেত গল্প বা উপন্যাসের বই। কিন্তু ধীরে ধীরে ছবিটা বদলেছে। পাড়ার গ্রন্থাগারগুলির এখন করুণ দশা। ক্রমশ কমে এসেছে পাঠক। তরুণ সমাজের হাতে বই এর বদলে উঠে এসেছে মোবাইল। তাই তো লাইব্রেরি এখন ব্রাত্য। বই পড়ার অভ্যাস কিন্তু কমে যাচ্ছে। বইমেলায় যখন উপচে পড়ে ভিড়, তখন মেলা বই মেলে যেখানে সেই গ্রন্থাগার কিন্তু শুনশান থাকে বছরভর। এখন অবশ্য বই পড়া যায় মোবাইলে অনেকে সেখান থেকেও পড়েন। কিন্তু গ্রন্থাগারে যেমন হাতের কাছেই বিভিন্ন বই চটজলদি মেলে, বিস্তৃত পরিসরে বই পড়ার মজা কি ওই ছোট্ট গ্যাজেটে মেলে? একটা সময় পাড়ার মহিলারা প্রচুর বই পড়তেন অবসর সময়ে, এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে টিভির সিরিয়াল। এখন ২৪ ঘন্টা ধরেই নানান অনুষ্ঠান চলে টিভিতে। চালিয়ে রেখেই কাজ সারেন অনেকে। বই পড়তে গেলে সেখানেই মনোনিবেশ করতে হয়। তাই বইয়ের প্রতি ভালবাসা সেখান থেকেই কমেছে। এমন নানান কারণ, ক্রমশ বই পড়ুয়া বাঙালিকে বই বিমুখ করে তুলছে বলে অনেকের ধারণা। 

কিন্তু ঠিক কেন এমন হাল, মানুষ কি সত্যিই বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন? বাঙালি এখন পড়তে ভালবাসে না? কথাটা কিছুটা ঠিক হলেও পুরোপুরি কিন্তু নয়। বাঙালির গ্রন্থাগার বিমুখতার পিছনে সরকারের অবদানও কম নয়। চলুন তাহলে একটু তলিয়ে দেখা যাক ব্যাপারটা। 

সমাজ গড়ার কারিগর হিসাবে যেমন স্কুল ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবদান থাকে ঠিক তেমনই একজন পড়ুয়ার ছাত্রাবস্থায় গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা ঠিক ততটাই ৷ কিন্তু সেই সব সরকারি গ্রন্থাগারের অধিকাংশতেই ঝাঁপ খোলার কর্মী নেই এখন। রাজ্যের পালা বদলের পর দীর্ঘ এগারো বছর যাবৎ সেই অর্থে কোনও সরকারি গ্রন্থাগারে স্থায়ী পদের লোক নিয়োগ হয়নি। জেলা থেকে শুরু করে স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও গ্রন্থাগারের শূন্য পদ পূরণ হয়নি। এসএসসি-র মাধ্যমে মাত্র দু'বার নামমাত্র নিয়োগ হয়েছে। মাদ্রাসা লাইব্রেরির ছবিও একই। দ্রুত কর্মী নিয়োগ করে গ্রন্থাগারগুলোর হাল ফেরাতে দাবি জানিয়েছে গ্রন্থাগারিকদের সংগঠন। পশ্চিমবঙ্গ সাধারণ গ্রন্থাগার কর্মী সমিতির রাজ্য সম্পাদক সৌগত সাহার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল রাজ্যের গ্রন্থাগারগুলির বর্তমান হালহকিকত। এক সময় পশ্চিমবঙ্গের গ্রন্থাগার ব্যবস্থা ছিল ভারতের মধ্যে সেরা। গ্রন্থাগার নির্ভর লেখাপড়ায় যথেষ্ট জোর দেওয়া হতো। কিন্তু বছর কুড়ি ধরে ক্রমেই নিম্নমুখী হয়েছে সাধারণের গ্রন্থাগার ব্যবস্থা। নতুন করে নিয়োগ হয়নি বললেই চলে। ৫৫২০ মোট পদ রাজ্যে তার মধ্যে ২০২২ পর্যন্ত ৪১৭৭ পদ শূন্য। তারপর আরও খালি হয়েছে। আর নিয়োগ হয়েছে ৭৩২ জন। তার মধ্যে চার জেলাতে পরীক্ষা হলেও নিয়োগ হয়নি। সম্প্রতি সামান্য কিছু কর্মী নিয়োগ হয়েছে বটে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগন্য। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মুখে প্রায়শই অজুহাত শোনা যায়, লাইব্রেরিতে পাঠকরা আসে না তাই লাইব্রেরিতে নিয়োগ করা হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে লাইব্রেরি খুললে পাঠকরা আসেন। লাইব্রেরি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বা অনিয়মিত খোলা হলে পাঠকরা আসবেন না এটাই স্বাভাবিক।

পশ্চিমবঙ্গে ২৩টি জেলা মিলিয়ে সরকারি গ্রন্থাগার রয়েছে ১৩টি, ২৪৬৭টি সরকার পোষিত ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত সাধারণ গ্রন্থাগার রয়েছে। ১৩টি সরকারি গ্রন্থাগারের অনুমোদিত ১৬৪টি পদের মধ্যে ৮০টি শূন্যপদ। ২৪৬৭টি সরকার পোষিত ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত সাধারণ গ্রন্থাগারের অনুমোদিত ৫৫২০টি পদের মধ্যে ৪২০০টি শূন্যপদ। সরকারি সূত্রে বিভিন্ন জেলাগুলিতে কর্মীর অভাবে ৩৯২টি বন্ধ গ্রন্থাগারের কথা বলা হলেও যেভাবে প্রতিদিন কর্মীদের অবসরের সঙ্গে সঙ্গে শূন্যপদ তৈরি হচ্ছে তাতে প্রায় ৮৫ শতাংশ শূন্যপদ। বাস্তবে ১৩০০ গ্রন্থাগার বন্ধ। 

সরকারি স্কুল, কলেজগুলোর লাইব্রেরিতেও নিয়োগ করছে না সরকার। ফলে কর্মীর অভাবে লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়তে পারেন না বহু পড়ুয়া। কর্মী না থাকা এবং লাইব্রেরি বন্ধ রাখার অজুহাতে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বই কেনার টাকাও অনেক ক্ষেত্রেই দিচ্ছে না সরকার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের নিয়মিত দরকার হয় লাইব্রেরি। সুতরাং লাইব্রেরিতে পাঠক আসে না সরকারের এই যুক্তি খাটে না। 

রাজ্যের এমনই এক গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক কুতুবউদ্দীন মণ্ডল। উত্তর ২৪ পরগনার দুটি গ্রন্থাগারের দায়িত্ব আছেন তিনি। তার কাছ থেকে যা জানা গেল তা আরও দুশ্চিন্তার। গ্রন্থাগারগুলিতে গ্রন্থাগারিক ও সহকারী গ্রন্থাগারিক মিলিয়ে ওই সংখ্যার দ্বিগুণ থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা পঞ্চাশ শতাংশেরও অনেক কম। স্বাভাবিক ভাবেই কর্মীর অভাবে অধিকাংশ গ্রন্থাগারে তালা ঝুলছে। অধিকাংশ গ্রন্থাগারে ‌পঠনপাঠন ও বই নেওয়া-দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ। কিছু গ্রন্থাগারে অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ও কমিটির লোক মিলে সপ্তাহে কয়েক দিন কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্রন্থাগার খুলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে অবশ্য। কিন্তু সপ্তাহে প্রতি দিন পূর্ণ সময়ের জন্য খুলে না রাখার‌ ফলে গ্রন্থাগারে পাঠক আসা ও বই নেওয়া-দেওয়া কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। অথচ, সরকারের এই নিয়ে কোনও হেলদোল নেই। অধিকাংশ জায়গাতে আবার একেকজন গ্রন্থাগার কর্মীর ওপর একাধিক গ্রন্থাগারের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই গ্রন্থাগারিক পালা করে সেই গ্রন্থাগারগুলি খোলেন। ফলে সপ্তাহে একদিন বা দু’দিন করে খোলা থাকে সেই সব গ্রন্থাগার। পাঠকরা চাইলেও লাইব্রেরিতে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর ফলে চালু গ্রন্থাগারগুলিকেও বাস্তবে অচল করে দেওয়া হচ্ছে। একই অভিযোগ পাঠকদেরও, উত্তর ২৪ পরগনার দোগাছিয়ায় এক গ্রন্থাগারে নিয়মিত আসেন পাঠক শ্রীনাথ ঘোষ, মৌমিতা চক্রবর্তী, অঙ্কিতা চক্রবর্তী প্রমুখরা। আজকের এই মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও বই পড়তে ভালবাসেন তারা। কিন্তু গ্রন্থাগার রোজ খোলা না থাকায় বা অনিয়মিত খোলার ফলে তাদেরও ইচ্ছে হলেই আসার উপায় নেই। গ্রন্থাগারিক কুতুবউউদীনের দায়িত্ব দুটি গ্রন্থাগার, তাই তাঁকে একটি বন্ধ রেখেই অন্যটি খুলতে যেতে হয়।

বই কেনা সহ গ্রন্থাগার পরিচালনার বিভিন্ন কাজের জন্য গ্রন্থাগার-পিছু‌ সরকার থেকে সাড়ে উনত্রিশ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। শহর বা গ্রামের গ্রন্থাগারের নিরিখে এই অঙ্কটা কম বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু খুব বেশি তারতম্য নেই। বইয়ের মূল্য বর্তমানে আকাশছোঁয়া হলেও সরকার থেকে বই কেনার অনুদান এক‌ টাকাও বাড়ানো হয়নি। বাড়ানো হয়নি গ্রন্থাগারের রক্ষণাবেক্ষণের খরচও। গ্রন্থাগারে বিভিন্ন মনীষীদের জন্মদিন পালন ও অনুষ্ঠান করার জন্য ১২০০ টাকা করে অনুষ্ঠান পিছু ‌দেওয়া হত। তাতে যেমন এলাকার বাসিন্দাদের নিয়ে সংস্কৃতি চর্চা করা যেত, তেমনই গ্রন্থাগারে বইপ্রেমী‌রা আসার‌ একটা সুযোগ পেতেন। করোনাকালীন অবস্থার পরে তা-ও বন্ধ করে দেওয়া ‌হয়েছে। রাজ্য সরকারের খেলা, মেলা, পুজোয় অনুদান দেওয়ার সময় অর্থের অভাব পড়ে না, মন্দির গড়তে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে পিছপা হয় না। কিন্তু গ্রন্থাগারগুলিতে কর্মী নিয়োগের‌‌ বেলায় এত টালবাহানা কেন? কেন গ্রন্থাগারগুলি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে না রাজ্য সরকার? সরকার কি চায় না বইপ্রেমীরা গ্রন্থাগারে নিয়মিত আসুন, তাঁদের মধ্যে পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠুক? পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও আরও উদ্যোগী হতে হবে, ভিড় করতে হবে গ্রন্থাগারগুলিতে। সরকারকে জানাতে হবে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তার কথা, মানুষের ইচ্ছা, উৎসাহ, ভালবাসাই সরকারকেও এদিকে মুখ ফেরাতে বাধ্য করবে। না হলে কিন্তু এভাবেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় গ্রন্থাগারগুলি।

(www.theoffnews.com library book)


মোনালিসা মুখোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার, হিন্দমোটর, হুগলি:

বাংলাদেশে কোনও কালে বা এখন কোনও বিহারী হিন্দুদের তাড়ায়নি,কাশ্মীরে কোনও হিন্দিভাষী লোক হিন্দু-শুন্য কাশ্মীর করার ডাক দেয়নি। মসজিদ থেকে ভেসে এসেছিল হিংস্র  আওয়াজ - 

"রা.লিভ, গা.লিভ ইয়া চা.লিভ।"

হয় ধর্মান্তরিত হও নইলে মরো। তার পরের ইতিহাস অনেকের জানা। যারা জানেন না তারা পড়ে নেবেন। যদি কিছু তার থেকে শিক্ষা নেন। 

বিহারী, গুজরাটী, পঞ্জাবী, মারাঠি এসব করে আর আহম্মকপনা করবেন। এখনও যদি হুঁশ না ফেরে তাহলে নিজের জুতো নিজের গালে মেরে বাস্তবে ফিরুন।

দু'দিন কাশ্মীর গিয়ে গলে পড়েন। আহা কি মৈত্রী তাই না? ছিলাম শ্রীনগর ৬ মাস ওদের আসল রূপ দেখেছি দুই একজন ছাড়া। সে গল্প আরেকদিন হবে।

আপনারা ঠেকুয়া নিয়ে খিল্লি করে জাকারিয়া চলে যান ইফতারি খেতে। রক্তে জল আছে কিনা চেক করুন। আপনার এই ঈদের সিমুই প্রীতি ছটের ঠেকুয়াতে দেখা যায় না কেন? কে হয় একাংশের চাচারা? 

আজকাল তো বাঙালীও কম গুটখা খায় না।  এমনকি মেয়েরাও। হিন্দি গান ছাড়া আপনার চলে না। অথচ ছটে আপনার অচ্ছুৎ মার্গ স্পষ্ট হয়। আপনি সম্মান না করলে পাবেন না। না পেলেই বলবেন এ খারাপ, ও খারাপ।

গর্গ নামক মহান ব্যক্তিকে অনুরোধ করব রাজা বাজার বা মিটিয়া বুরুজ গিয়ে বলুন বাংলা বলরে। সবাই বিহারী, ইউপি ভাষী বিশেষ সম্প্রদায়ের।  আপনার বাতেলার ভুনা বানিয়ে চুনা লাগিয়ে দেবে।আপনার যত নেত্ত হিন্দু বিহারী নিয়ে। আমি নিজে ওখানে কোনও এক সম্প্রদায়ের দোকানে বাংলা বলে দেখেছিলাম দোকানী বুক ফুলিয়ে বলছে -

"হিন্দী মে বলিয়ে, বাংলা মুঝে মালুম নেহি।" সেখানে কাংলাপক্ষ কোনও ছেড়খানি করে দেখুক। বুঝব মায়ের দুধ খেয়েছে। আসলে মশাই আপনি নিজেই একজন তৃতীয় শ্রেণির নির্লজ্জ জাতি বিদ্বেষী।

কোনও বিহারীকে দেখিনি আমাদের কোনও পুজো বা আচার অনুষ্ঠান নিয়ে খিল্লি করতে। আমি তাদের সাথে মিশি ভক্তি ভরে তারা, প্রসাদ নেয়। অন্য একটি সম্প্রদায়ের মত বলে না, মূর্তি পুজো হারাম বা অন্য ধর্মের উপাসনা সঠিক নয়। সেই হারাম বলা মানুষের পা চাটবেন অথচ আপনার প্রতিবেশী তার মতো রীতি রেওয়াজ মানলে আপনার বুক ফাটে। 

জন্মদিনে পায়েসের বদলে কেক কাটতে বিবেকে লাগে না? জিন্স টপ পরে মনে হয় না এটা বাঙালি কালচার নয়? 

"আত্মঘাতী বাঙালী" নামটা এমনি হয়নি। বাংলাদেশ দেখেও আপনারা শোধরাননি এতটুকু। এখনও অত্যাচার চলছে সেখানে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দৌলতে আপনি আজও পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করতে পারছেন। নাহলে ওই হাল হতো আপনার আমার।

শুধরে যান। আপনার পিরীতের জন্য আমরা এপারে বলি হবো। আপনি আবার হয়ত রাজু থেকে রাজ্জাক হয়ে যাবেন। মেকি-সম্প্রীতি-খোর হিসেবে ।কিন্তু সবাই তা নয়। তারা নয় মরবে না হয় আত্মপক্ষের সদর্থক সমর্থনে তীব্র প্রতিরোধ করবে। নিজেদের ঘরে সিঁদ নিজেরা কাটছেন এক শ্রেণির বাঙালী। আপনার ছেলে মেয়ে ভারতের সব জায়গায় চাকরি করে। সেখান থেকে বাঙালী বলে লাথ মারলে দারুণ হবে কি? আপনি বলতে আমি এখানে সেই নাটুকে বাঙালীকে বলছি যাদের ঈদের সিমুইতে খিচুড়ি ভোগ মিশে বেহাগের সুর তোলে। এক বৃন্তে ফোটে তারা। অথচ শুধু ঠেকুয়ায় অ্যালার্জি হয় তাদের।

আপনার আচার আপনি পালন করুন, সবাই তার মতো করুক। কারোর নিয়ে এতো মস্করা করার কিছু নেই।

শেষে বলি ধার করা হিন্দি কথা। বোঝার হলে বুঝুন না হলে সিরিয়াল দেখুন। 

"অগর বাঁটোগে তো কাটোগে"

সবার সুমতি হোক। বাস্তবে ফিরুক বাঙালী। আর হ্যাঁ আর একটা কথা, মেকি-বিপ্লবী-সম্প্রীতি-খোর হয়ে সমাজে বসবাস করে নগ্ন খিল্লি করা বন্ধ করুন, প্লিজ।

(www.theoffnews.com fake secularism com munalism)


রণজিৎ গুহ, লেখক ও সমাজকর্মী, দুর্গাপুর:

(লেখক একজন গর্বিত প্রাক্তন ইস্পাত কর্মী)

সত্যি বলতে কি বাঙালিয়ানায় সৌজন্য সম্ভাষণ হিসাবে সকাল সন্ধ্যায় কোনও দিনই এইসব সুপ্রভাত শুভসন্ধ্যা ইত্যাদির চল নেই। ইংরেজদের সম্ভাষণের অযথা অনুসরণ এবং অনুবাদ। দেখতে দেখতে গুড মর্নিং শব্দটা অবশ্য বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ফেলেছে প্রায়। সেরকম তো হয়ই।

অন্য দিকে 'নমস্কার' শব্দটা সময়কাল নিরপেক্ষ এবং চমৎকার ভাবে বহুমাত্রিক। আবাহন আপ্যায়ন প্রত্যাখ্যান কিংবা বিদায় সম্ভাষণ সবেতেই চলে। সৌজন্যে ভরপুর। আর অবশ্যই বাঙালিয়ানায় পুরোপুরি সিদ্ধ।

তবে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে একান্ত বাঙালি ঢঙে 'কেমন আছো?' 'কি খবর?' ইত্যাদির ডাক খোঁজ সখ্যতা জোরদার করে পরিচিতজনের নৈকট্য বাড়ায়। বিদায় কালে 'আসি' বা 'চলি'  'শুভ রাত্রি' র চেয়ে কিছু কম আন্তরিক নয়।

তাই আমার মনে হয় বাঙালিয়ানা দেখাতে ইংরেজ অনুকরণে শুভ দুপুর শুভ বিকেল জানানোর দরকারই নেই। ধ্রুপদী বাংলা ভাষা বাঙালিয়ানার একটা জরুরি অঙ্গ। বাঙালিয়ানার অন্যান্য লক্ষ্মণ ও শর্তগুলো অবহেলা উপেক্ষা করলে ভাষার ওপর দরদ ও আগ্রহ কিন্তু কমে যেতে পারে। সংস্কৃত ভাষার মতই সাহিত্যের জোরে বাংলাও বিনোদন ও গবেষণার জন্য হয়তো টিকে থাকবে। বাঙালিয়ানা না থাকলে বাংলা ভাষা সজীব নাও থাকতে পারে।

সাধু সাবধান।

(www.theoffnews.com welcome)


পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

জাতীয় সড়ক হোক বা পাড়ার সরু গলি সব ক্ষেত্রেই তাদের অবাধ বিচরণ। এর ফলে দেখা দিচ্ছে যানজট, সমস্যা বাড়ছে টোটোর দৌরাত্ম্যের কারণে। বছর পনেরো আগে যখন টোটো আসে এ রাজ্যে, তখন ভাবা হয়েছিল দূষণহীন এবং শব্দহীন যান, হাওয়া বাতাস খেলে, ভ্যান রিকশার চেয়ে তাড়াতাড়ি যায়, এ বেশ ভালই হয়েছে। কিন্তু পনেরো বছর পরে এখন সাধারণ মানুষের ত্রাহি ত্রাহি রব। কোনও জিনিস চাহিদার চেয়ে অতিমাত্রায় হয়ে গেলে যেমন উপকারের চেয়ে অপকারেই বেশি আসে, টোটোর অবস্থাও তাই হয়েছে। এক মাত্র কলকাতার বেশ কিছুটা অংশ ছাড়া এই মুহূর্তে রাজ্যের সর্বত্র দৌড়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার টোটো। রাস্তার উপরে, যেখানে সেখানে গজিয়ে উঠেছে বেআইনি টোটো স্ট্যান্ড। 

এ বার থেকে জাতীয় বা রাজ্য সড়কে চালানো যাবে না অটো রিক্সা বা টোটো। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে পরিবহণ দফতরের সচিব সৌমিত্র মোহন এই মর্মে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিলেন। ওই নিষেধাজ্ঞার আওতায় অটো টোটো ছাড়াও ছিল পরিবহণ দফতরের অনুমোদনহীন তিন চাকার যান। অবৈধ অটো রিক্সা বা টোটো চালানোর ফলে জাতীয় বা রাজ্য সড়কে যানজট তৈরি হচ্ছে। তার প্রেক্ষিতেই এই বিজ্ঞপ্তি। এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের এক বছর পরেও কি ছবি পাল্টেছে বলে মনে হয়? উল্টে আরও শোচনীয় হয়েছে পরিস্থিতি। সেই বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল, এই ধরনের অবৈধ যান জাতীয় তথা রাজ্য সড়কে চলাচলের ফলে প্রতিদিন যানজট বাড়ছে। আর সেই যানজটের ফলেই বাড়ছে দুর্ঘটনা। সেই দুর্ঘটনা এড়াতেই এই নির্দেশনামা জারি করা হয়। রাজ্যের প্রায় প্রত্যেকটি বড় শহরে টোটোর দৌরাত্ম্যে যানজট তীব্র আকার নিয়েছে। বিশেষত, হাওড়া, শিলিগুড়ির মত বড় শহরে টোটোর বাড়বাড়ন্তের ফলে যানবাহনের গতি কমেছে। হাওড়ায় টোটোর দৌরাত্ম্য নিয়ে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব এবং নগরপালকে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত। গোটা বিষয়টি নিয়ে তিনি কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলাও করেছেন। অভিযোগ, শুধু হাওড়া শহরেই ২০ হাজারেরও বেশি লাইসেন্সহীন টোটো চলে। হাওড়া থেকে হাবড়া, এই সমস্যা এখন সর্বত্র। বিভিন্ন শহরের সব কটি বড় রাস্তায় টোটো চলায় পথচারীদেরও সমস্যা হচ্ছে। 

সম্প্রতি প্রবল গরমের সময় ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারকে। কিন্তু মাঠে নেমে কারণ খুঁজতে গিয়ে অবাক বিদ্যুৎ দফতরের কর্তারা। বিদ্যুৎ পর্ষদ সূত্রে খবর, অধিকাংশ সাবস্টেশনে রাত বাড়লেই বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হচ্ছে। নির্দিষ্ট এলাকায় ট্রান্সফর্মারগুলির যে ‘ক্যাপাসিটি’ বা ক্ষমতা রয়েছে, চাহিদা পেরিয়ে যাচ্ছে সেই সীমা। ফলে বিদ্যুৎ থাকছে না। আবার কোথাও বিকল হয়ে পড়ছে ট্রান্সফর্মারই। শুধু তা-ই নয়, পরিষেবা চালু থাকলেও ভোল্টেজ কম জেলার প্রায় সর্বত্র। ঘটনার কারণ সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে জেলার বিদ্যুৎকর্তারা একাধিক এলাকা পরিদর্শন করে। সেই পরিদর্শক দলটি দেখে এসি নয়, রাত বাড়লে ব্যাটারিচালিত টোটো চার্জে বসানো হচ্ছে। এ জন্য প্রচুর চাপ পড়ছে। লোডশেডিং এর আসল কারণ এটাই। 

রক্তবীজের মত টোটোর এই বাড়ন্তে চিন্তিত প্রশাসনও। টোটোর রমরমা আটকাতে সম্প্রতি রাজ্য সরকার আবার একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবার কথা ভাবছে। ভাবা হচ্ছে টোটো চালানোর ক্ষেত্রে জোড় বিজোড় নীতি নেওয়া যায় কিনা। এছাড়াও এক ব্যক্তির নামে একাধিক টোটো কেনার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞার কথা ভাবা হয়েছে। গ্রামে গঞ্জে টোটো সাধারণ মানুষের যাতায়াতের একটা বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যাবৃদ্ধিকে না রোখা গেলে সেটা উপকারের চেয়ে অপকারই করবে বেশি। মানুষজনও বুঝছেন এখন হাড়ে হাড়ে। সরু গলি পথে চলা এখন বিপদজনক রীতিমত। জাতীয় সড়কে ভারি ভারি যানবাহনের সঙ্গে হালকা টোটোর চলাও দুর্ঘটনার আহ্বায়ক। অধিকাংশ বেআইনি কাজের মত এখানেও শাসক দলের প্রত্যক্ষ সমর্থন মিলছে। তাই টোটো চালকেরাও বেপরোয়া। সব মিলিয়ে এখনই রোধ করা না গেলে কিন্তু আগামী দিনে একটা ভয়াবহ সমস্যা হতে চলেছে এই টোটো।

(www.theoffnews.com Toto jam road problem)


পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

সদ্য অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া লোকসভা ভোটের পরেই ফের বাড়তে চলেছে পন্যের দাম। সৌজন্যে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকার। জাতীয় সড়কে বহুদিন ধরেই টোল আদায় করে কেন্দ্র। সেই টোল বেশ ভাল রকম মূল্যের। পন্যবাহী গাড়িগুলিকে বিপুল টাকা শুধু টোলই দিতে হয় গন্তব্যে পৌঁছতে। সেই মূল্যই পরোক্ষে চুকাতে হয় খুচরো ক্রেতাদের। কারণ পন্যের মূল্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় টোলের বাড়তি টাকাও। কেন্দ্রীয় সরকার তাই জাতীয় সড়ক ঠিকাঠাক রেখে আরও টোল প্লাজা নির্মানে বিপুল আগ্রহী। কলকাতা থেকে বম্বে রোড ধরে গেলে দেখা যাবে ওড়িশা এবং ছত্তিশগড়ে অন্তত কুড়িটা নতুন টোল প্লাজা নির্মাণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ বিনা পয়সায় রাস্তা ব্যবহার করতে দিতে নারাজ কেন্দ্র। এখন তো শুনছি কেন্দ্র ভাবছে নতুন পদ্ধতি বা প্রযুক্তি আনার, যাতে এক কিলোমিটার পথ গেলেও টোল দিতে হবে আপনাকে। একটা উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারা যায় যে শুধু ছোট গাড়িতে যাতায়াত করলেই কত টাকা টোল দিতে হয়। কলকাতা থেকে দুর্গাপুর ১৭৫ কিলোমিটার পথ, এই পথে শুধু গেলে ছোট গাড়িকে টোল দিতে হয় প্রায় তিনশো টাকা। পন্যবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে সেই টোলের পরিমান বেড়ে যায় দুই থেকে তিন গুন। বুঝতেই পারছেন কেন্দ্রীয় সরকার কেন টোল প্লাজা বাড়ানোতে উৎসাহী। 

এবার রাজ্য সরকারও সেই রাস্তায় হাঁটতে চলেছে। পূর্ত দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এবার থেকে জাতীয় সড়কের মতো রাজ্য সড়কগুলিতেও টোল ট্যাক্স আদায় করা হবে। রাজ্যের মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টোল ট্যাক্স আদায়ের পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। কিছু দিনের মধ্যেই রাজ্য সড়কগুলিতে শুরু হবে টোল আদায়। কোন সড়কে কত টাকা ট্যাক্স ধার্য হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে পূর্ত দফতর। তাদের দাবি এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নের ফলে রাজ্যের কোষাগারে যেমন উপার্জন বাড়বে, তেমনই সংস্কারের জন্য নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে না। রাজ্যের অভিযোগ কেন্দ্রীয় সরকার গ্রাম সড়ক যোজনায় বন্ধ রেখেছে বরাদ্দ। এর ফলে মেরামতের জন্য খরচা করতে হচ্ছে রাজ্য সরকারকে। কিন্তু নবান্ন যদি গ্রাম সড়কের জন্য খরচা করে তাহলে রাজ্য সড়ক বা স্টেট হাইওয়ের রক্ষণাবেক্ষণ কোন টাকায় হবে? এই নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্কের পর অবশেষে নবান্ন ২৮টি টোল প্লাজা শুরু করতে চলেছে। এই ব্যাপারে আহ্বান করা হয়েছে দরপত্রের।

পূর্ত দপ্তর রাজ্যের যে ২৮টি জায়গার জন্য টোল প্লাজা খুলতে চেয়ে দরপত্র হেঁকেছে সেগুলি হল:

চণ্ডিতলা- শিয়াখালা-চাঁপাডাঙা রোড, সপ্তগ্রাম-ত্রিবেণী-কালনা-কাটোয়া রোড, ডানকুনি-চন্দননগর মগরা রোড, বর্ধমান-আরামবাগ রোড, বিষ্ণুপুর-কোতলপুর-আরামবাগ রোড, বনগাঁ-চাকদা রোড, বড়জোরা-মালিয়ারা-দুর্লভপুর রোড, বাঁকুড়া-দুর্গাপুর রোড, বাঁকুড়া-শালতোড়া রোড, পুরুলিয়া-রাঁচি রোড, বাঁকুড়া-পুরুলিয়া রোড, মেদিনীপুর-কেশপুর-চন্দ্রকোণা টাউন রোড, কলকাতা-বাসন্তী রোড, বারাসত-বসিরহাট রোড, দমদম-লাউহাটি-হাড়োয়া রোড, ঘোজাডাঙা-সংগ্রামপুর রোড, 

সাঁইথিয়া-সুলতানপুর-কান্দি রোড, আহমেদপুর-কীর্ণাহার-রামজীবনপুর রোড, কৃষ্ণনগর-নবদ্বীপধাম রোড, কাটোয়া-কালনা রোড, চ্যাংড়াবান্ধা-মাথাভাঙা রোড, রায়গঞ্জ-কালিয়াগঞ্জ-বুনিয়াদপুর রোড, পতিরাম-ত্রিমোহিনী- হিলি রোড, মন্তেশ্বর-দাঁইহাট রোড, রামজীবনপুর-কেতুগ্রাম-কাটোয়া রোড, পানাগড়-ইলামবাজার রোড। 

তবে জানা গেছে আপাতত কোনও রকম টোল নেওয়া হবে না প্রাইভেট বা ব্যক্তিগত গাড়ির উপর। টোল নেওয়া হবে না ব্যক্তিগত দুই চাকার গাড়ির উপরেও। তিন চাকার ভাড়ার গাড়ি, লাইট কমার্শিয়াল ভেহিকেল, ট্রাক, মাল্টি অ্যাক্সেল ভেহিকেল, আর্থ মুভার এবং ওভারসাইজ তথা ৭ বা বেশি অ্যাক্সেলের পণ্যবাহী গাড়ি থেকে আদায় করা হবে এই টোল ট্যাক্স। তবে আশঙ্কা থেকেই যায়, কেন্দ্রের দেখানো পথেই হেঁটেই টোল আদায় করতে চলেছে রাজ্য। তাই এখন ব্যক্তিগত গাড়িতে টোল না নিলেও রাজস্ব বাড়াতে পরবর্তীতে তা নেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তবে রাজ্য সরকারের এই সড়কগুলি দিয়েও কিন্তু প্রচুর পন্যবাহি গাড়ি চলাচল করে। যেমন হুগলীর আরামবাগ এবং পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চাষ হয় আলুর। সেখানে অহল্যাবাই হোলকার রোডে দুটি টোল প্লাজা বসানো হচ্ছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আলুর সেই দামেও টোলের বাড়তি টাকা জুড়বেই। অর্থাৎ এই টোল প্লাজাগুলি আশু চালু হলে বাড়তি পন্যমূল্য গুনতে হবে জনগনকে। এমনিতেই কেন্দ্রের অধীনে থাকা জাতীয় সড়কে টোলের পরিমান মাঝেমধ্যেই বেড়ে যায়। ২০২৩ এর এপ্রিলে টোল ট্যাক্স দশ শতাংশ বৃদ্ধি করেছিল কেন্দ্র। শোনা যাচ্ছে সামনে আবার টোল বাড়াতে চলেছে কেন্দ্র। এর সঙ্গে যদি রাজ্যের টোলও যোগ হয় তাহলে আপনার আমার কি হাল হবে বুঝতেই পারছেন নিশ্চয়।

(www.theoffnews.com toll tax India government West Bengal government)


তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

১৯১৯ সাল। সারা বাংলা জুড়ে স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার। কলকাতা, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম সবত্রই স্বদেশী ভাবধারায় জেগে উঠছে এক নতুন প্রজন্ম। এখানে সেখানে প্রতিদিন গড়ে উঠছে ছোটখাটো বিপ্লবীদের দল। এমন কয়েকটি বিপ্লবীদের আড্ডায় ঠিক হলো, সবাইকে এক ছাদের তলায় আনতে হবে। তবেই স্বদেশী আন্দোলনে সফলতা আসবে। তার জন্য সেরা উপায় হল দুর্গা পুজো। ঠিক করা হলো, দুর্গা পুজোকে উপলক্ষ করে স্বদেশী চেতনায় উদ্বুদ্ধ যুবকদের একত্র করা হবে। উৎসবও হবে আর দেবী বন্দনার সঙ্গে সঙ্গে দেশ মাতৃকার বন্দনায় তরুণ প্রজন্মকে জাগরিত করার আয়োজন চলবে।

এর মধ্যেই ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস বারোয়ারি দুর্গোৎসবকে বেছে নিলেন। ১৯২৭ সালে বার্মার জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কলকাতায় ফিরে এসে নেতাজী বিভিন্ন সামাজিক এবং সেবামূলক কাজে জড়িয়ে পড়েন। সে সুবাদে পরবর্তীকালে তিনি বেশ কিছু বারোয়ারি দুর্গা পুজোর সঙ্গে যুক্ত হন। দক্ষিণ কলকাতার আদি লেক পল্লীর পুজো, মধ্য কোলকাতার ৪৭ পল্লীর পুজো, উত্তর কলকাতার বাগবাজার, কুমারটুলি, সিমলা ব্যায়াম সমিতি- এই বারোয়ারি পুজোগুলোর সঙ্গে নেতাজী বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৬ সালে উত্তর কলকাতার মানিকতলায় কংগ্রেস নেতাদের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত হয় সার্বজনীন দুর্গোৎসব।

তিনি পুজোগুলোয় উপস্থিত হয়ে সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে একতা আর জাতীয় চেতনা গড়ে তুলতে চেষ্টা করতেন। দুর্গা পুজোকে উপলক্ষ করে এই অঞ্চলের মানুষের মনে স্বদেশী ভাবধারা জাগিয়ে তোলাই ছিল এই পুজোর উদ্যোক্তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। এসব পুজো প্রাঙ্গণে পুজোর ক'দিন স্বদেশী গান-বাজনার ব্যবস্থা হতো। স্বাধীনতা সংগ্রামী চারুচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও এসব সার্বজনীন দুর্গা পুজোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ফলে পূজা মণ্ডপগুলো হয়ে উঠলো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মিলনস্থল। নেতাজী পুজো প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলে তাকে দেখার জন্য মানুষের ঢল নামতো।

সিমলা ব্যায়াম সমিতির উদ্যোগে পরিচালিত বারোয়ারি পুজোয় সুভাষ চন্দ্র বোস ও শরৎচন্দ্র বোস প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ঋষি অরবিন্দ ও বাঘা যতীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুগান্তর দলের নেতা বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসু সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রতিষ্ঠা করেন। এই সমিতি ছিল লাঠি খেলা, তলোয়ার চালনা, কুস্তি খেলা প্রভৃতি শেখার প্রধান আখড়া। দেশমাতৃকার আরাধনার উদ্দেশ্য নিয়ে অতীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে সিমলা ব্যায়াম সমিতির উদ্যোগে দুর্গোৎসব শুরু করেন। সারা বছরের শরীর চর্চা আর সাহসিকতার পরীক্ষার দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হতো মহাষ্টমীর দিনটিকে। এই দিনটি তারা বীরাষ্টমী দিবস হিসেবে পালন করতেন। 

এই বীরাষ্টমী অনুষ্ঠানে দেবী দুর্গার সামনে লাঠি খেলা, ছুরি খেলা, কুস্তি, মুষ্টিযুদ্ধ আর তরবারি খেলার মাধ্যমে সাহস আর শক্তি দেখানোর পরীক্ষা হতো। সুভাষ চন্দ্র বোসের সঙ্গে এই বারোয়ারি পুজো কমিটির গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি বেশ কয়েক বছর এই বীরাষ্টমী উৎসবের উদ্বোধন করেছিলেন। ১৯২৮ সালের সিমলা ব্যায়াম সমিতির তৃতীয় বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, সে বছর খুব জাঁকজমকভাবে বীরাষ্টমী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। উৎসবে উপস্থিত ছিলেন শরৎচন্দ্র বোস, সুভাষচন্দ্র বোস, ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, উপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, কিরণ মুখোপাধ্যায়, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিরা।

১৯৩০ সালে নেতাজী কলকাতা পুরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। ওই বছরেই সিমলা ব্যায়াম সমিতি সভাষচন্দ্র বসুকে প্রথম কোনো সার্বজনীন পুজো কমিটির সভাপতি নিযুক্ত করে। নেতাজীর উদ্যোগে ও স্বদেশী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোতে প্রতিমাকে তখন দেশীয় খাদি বস্ত্র পরানোর চল শুরু হয়। দেবীর পরনের অলঙ্কার সবই মাটির। অস্ত্র দেশীয় লোহা, তামার। বীরাষ্টমী উৎসব ছাড়াও মণ্ডপে পুতুল খেলা, যাত্রা পালা ও কবিয়াল গানের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হতো।

এছাড়াও পুজো প্রাঙ্গনগুলোতে বিভিন্ন বাণী লেখা পোস্টার শোভা পেত। সে সময়ের ইংরেজি পত্রিকা ‘অ্যাডভান্স’ এ সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোকে ‘স্বদেশী ঠাকুর’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার সাহস করতো না। কিন্তু সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোয় বিপ্লবীদের অংশগ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় ১৯৩২ সালে ইংরেজ সরকার এই পুজোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরপর তিন বছর এ পুজো নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৩৯ সালে আবার নতুন করে এই পুজো শুরু হয়। এবার এ পুজোয় অগ্রণী ভূমিকা নেন স্বামী বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্র দত্ত। 

১৯২৯ সালে বাগবাজারের এই পুজোয় এক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ১৯৩০ সালে কলকাতা পুরসভার ওল্ডারম্যান দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির সভাপতি হন। তারই উদ্যোগে এই পুজো এক নতুন রূপ পায়। দেশাত্মবোধচ্ছতিনি এই পুজোর নামকরণ করেন, ‘বাগবাজার সার্বজনীণ দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী’। প্রকৃতপক্ষে ওই বছর থেকেই এই পুজোর গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের শুরু। 

এই দুর্গাপুজোর যে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হতো, তা স্বদেশী শিল্প মেলায় রূপান্তরিত হয়। দুর্গাচরণের উদ্য‌োগেই পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয় দেশীয় শিল্প সম্পর্কিত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী। গ্রামীণ শিল্পের সঙ্গে কলকাতার মানুষদের পরিচয় করিয়ে দিতেই মূলত তাঁর এই পদক্ষেপ। সে বছরই সুভাষচন্দ্র এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত হন। সুভাষ চন্দ্র ১৯৩৮-১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এই দুর্গোৎসব কমিটির সভাপতি ছিলেন। এছাড়া ১৯৩০ এবং ১৯৩৯ সালে তিনি বাগবাজারের সার্বজনীন দুর্গোৎসবের সমাপ্তি অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন।

সুভাষ চন্দ্র বোসের নেতৃত্বে বাংলার বিভিন্ন পূজা মণ্ডপগুলোতে স্বদেশী আন্দোলনের ভাবনা তীব্র হতে থাকে। সেই সময় অনুশীলন সমিতির লাঠি খেলা, শরীর চর্চা ইত্যাদি প্রদর্শন করার জায়গা ছিল বাগবাজার সার্বজনীন পূজা প্রাঙ্গণ। এই অনুষ্ঠানটি হতো বীরাষ্টমী উৎসবের দিনে। ১৯৩৬ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি সরলা দেবীর পরিচালনায় বাগবাজারে সর্বপ্রথম বীরাষ্টমী উৎসব শুরু হয়। এই পুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “কাপুরুষতা, ভীরুতা সব মায়ের চরণে অর্পণ করে দেশমাতৃকার পুজোর জন্য তৈরি হতে হবে। সে পূজার জন্য প্রয়োজন শুধু ত্যাগ।”

উল্লেখ্য, আজও মহাষ্টমীর দিনে এখানে বীরাষ্টমী উৎসব পালিত হয়। জাতীয়বাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই পুজোর সূচনা বলে এই দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল স্বদেশ ভাবনার এক নব জাগরণ। সুভাষ চন্দ্র ছাড়াও আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, নলিনীরঞ্জন সরকার এবং আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

পরাধীন ভারতবর্ষ তখন স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তাল। বিরাট জনসমাগম দেখলেই ইংরেজরা ভয় পেতে শুরু করে। এভাবেই বারোয়ারি পুজোর মাধ্যমেও বহু মানুষকে একত্র করার পরিকল্পনা তখন পরাধীন দেশের বিভিন্ন অংশে শুরু হয়ে যায়। খানিকটা এভাবেই উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৩২ সালে হরিমোহন পালের সভাপতিত্বে এবং সম্পাদক দ্বারিকানাথ দাসের নেতৃত্বে কুমোরটুলি অঞ্চলের কিছু যুবক কুমারটুলি সার্বজনীন দুর্গোৎসবের শুভ সূচনা করেন।

দুর্গা পুজোর মহাষ্টমীর দিনে অনুশীলন সমিতির উদ্যোগে লাঠি খেলা, শরীর চর্চাসহ বিভিন্ন অস্ত্র খেলার আয়োজন করা হয়।  

১৯৩৮ সালে সুভাষ চন্দ্র বোস এই সার্বজনীন পুজো কমিটিরও সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে সে বছরই দুর্গা পুজোর পঞ্চমীর দিন পূজামণ্ডপটি ভস্মীভূত হয়। ফলে সে বছর পুজোটি নিরানন্দভাবে সম্পন্ন হয়। তখন নেতাজীর অনুরোধে ভাস্করশিল্পী গোপেশ্বর পাল এই পুজোতে নতুনত্ব নিয়ে আসেন।

এভাবে দুর্গােপুজোর মাধ্যমে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে স্বদেশী চেতনার এক নব জাগরণ। বিভিন্ন জায়গায় সার্বজনীন পুজোর মাধ্যমে ঘটতে থাকে ব্রিটিশ বিরোধী চেতনার এক নব উন্মেষ। সে উদ্যোগের মধ্যমণি হিসেবে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের নাম জড়িয়ে থাকলেও তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও অনেক সাহসী বিপ্লবী যোদ্ধার নামও। বাঙালির ঐতিহ্য, সাহসিকতা, আত্মসম্মানবোধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের এক পর্ব এর মধ্যে দিয়ে সূচিত হয়।

This article is in Bengali language. This is a brief history about Durga Puja, the journey from a Zamindari status symbol to a nationalism project. The ostentatious celebration of Durga Puja helped the zamindars in asserting their influence in an era of drastic political and social change in Bengal.

রাজ্যের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র মুকুটমণিপুর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অম্বিকানগর। ভগ্ন রাজবাড়িতে লুকিয়ে রয়েছে অগ্নিযুগের ইতিহাসও। পুরোনো স্মৃতি সম্বল করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভাঙাচোরা দালান, রাসমঞ্চ। কান পাতলে শোনা যায় বাংলার বিপ্লবীদের পদধ্বনি। সেই গল্পও শোনালেন গৌরীশঙ্কর ও বিশ্বজিৎ। অম্বিকানগর রাজ পরিবারেই জন্মে ছিলেন বীরযোদ্ধা রাজা রাইচরণ ধবলদেব। তিনি ছিলেন ষষ্ঠতম রাজা। পরবর্তী যে রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বিপ্লবের দুর্গম পথ। ব্রিটিশ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করার শপথ নিয়ে বিপ্লবীদের দলে নাম লিখিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই জঙ্গলমহলে গড়ে উঠেছিল বিপ্লবী বাহিনী। নিয়মিত যাতায়াত ছিল প্রফুল্ল চাকী, বারীন ঘোষ, ভূপেশ দত্ত, নরেন গোঁসাইদের। এই রাজবাড়িই ছিল তাঁদের মন্ত্রণাকক্ষ। গৌরীশঙ্কর বলেন, 'অম্বিকানগর থেকেই গভীর রাতে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বিপ্লবীরা যেতেন দুর্গম ছেন্দাপাথরে গোপন ডেরায়। সেখানে গুহার মধ্যে ছিল বোমা, বন্দুক-সহ নানান অস্ত্র তৈরির গুপ্ত কারখানা।

হ্যাঁ কারখানা। তবে বিপ্লবীদের এই সব কর্মকাণ্ডের নিয়মিত খোঁজ রাখত ব্রিটিশ গুপ্তচররা। একবার পুরীর পান্ডার ছদ্মবেশে এক গুপ্তচর আশ্রয় নিয়েছিল অম্বিকানগর রাজবাড়ির সিংহদ্বারের কুঠুরিতে। পরে চার্লস টেগার্ট বিশাল বাহিনী নিয়ে রাজবাড়িতে হানা দেয়। আলিপুর বোমা মামলায় গ্রেপ্তার হন রাজা রাইচরণ ধবলদেব ও তাঁর তিন সঙ্গী। যদিও পরবর্তীতে রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাই খুন হওয়ায় প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেয়ে যান রাজা রাইচরণ সহ বহু বিপ্লবী। মুক্তি পেয়ে সেবার দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন সঙ্গীদের নিয়ে অম্বিকানগরে ফেরেন রাইচরণ। তার কয়েক বছর পরেই ১৯২৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। রাইচরণের সময়কালে পুজোর ক'দিন অম্বিকানগরে আত্মগোপন করে থাকতেন বহু বিপ্লবী।'

আর এখন দুর্গাপুজো হল ভোটের রাজনীতির অঙ্গ এবং কর্পোরেটদের মুনাফার উৎস যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। তখন দুর্গাপুজো ছিল দেশপ্রেমিকদের সাধনার মন্ত্র, এখন কি চলছে তা তো মানুষ স্বচক্ষেই দেখছে।

(www.theoffnews.com - Puja Bengali freedom fighters)

মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায়, লেখিকা, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর:

চৈত্র শেষের হাওয়া গায়ে মেখে বাবা ভোলানাথ জাত পাতের বিভেদ ভুলিয়ে গাজনের নৃত‍্য গীতে মেতে ওঠেন। চড়কের আগুন ভাঙা, বাণফোঁড়া ইত‍্যাদি নানান লোকাচারের দ্বারা ভোলেনাথকে তুষ্ট ক‍রার অসীম প্রচেষ্টা চলে অথচ তিনি কেবল ভক্তিতেই তুষ্ট। আসলে আত্মপীড়নের মাধ‍্যমে  গাজন সন্ন‍্যাসীরা নিজেদের বৈরাগ‍্যের পরীক্ষা নেন। এদিকে তার আগে বাংলার মায়েরা নীল ষষ্ঠীর বাতি জ্বেলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঊণকোটি চৌষট্টি কাজের মধ্যে দিয়ে সংসারের মঙ্গল কামনায়। এভাবেই দুই বাংলায় মন্দিরের ঘন্টার সাথেই মিশে যায় পবিত্র রমজান মাসের প্রার্থনার ধ্বনি। একটি বছর শেষ হয়ে এইভাবে। নতুন দিনের শুরু হয় নতুন বছরের শুভ সূচনার মধ্যে দিয়ে। চৈত্র সংক্রান্তি আর পহেলা বৈশাখ বা পয়লা বৈশাখ আপামর বাঙালির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সংক্রান্তির পুজো শেষে বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিতে বাঙালি নতুন পোশাকে সাজে। গ্ৰামবাংলার মানুষজন এই দিন  পান্তাভাত, নানাকরম মিষ্টি, নোনতা খাবার ও মরশুমী ফলে রসনা তৃপ্তি করে। এছাড়াও পয়লা বৈশাখের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল 'হালখাতা' যা আমাদের কাছে বেশ উদ্দীপনার বিষয় ছিল ছোটবেলায়। দোকানে দোকানে ওই দিন ব্যবসায়ীরা তাদের সারাবছরের দেনা পাওনার হিসেব করে নতুন খাতা খোলেন। যারা ঋণ নিয়েছিলেন তারা তাদের পরিবারের ছোটদের নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে দেনা শোধ করে মিষ্টি মুখ করে বাড়ি ফেরেন। সাথে থাকে নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার। আজকাল যদিও ইংরেজি ক্যালেন্ডারের দাপটে বাংলা ক্যালেন্ডারের একটু কোণঠাসা অবস্থা তবুও পয়লা বৈশাখের দিন বাঙালির বাংলা ক্যালেন্ডার চাই-ই চাই। আর চাই নতুন পাঁজি বা পঞ্জিকা।

তাই পয়লা বৈশাখ নববর্ষের শুরুর এক আনন্দ উৎসবের দিন। কিন্তু সেই আনন্দ বর্তমানে রাজনৈতিক গুন্ডারাজের দৌলতে আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। সোনার বাংলায় যেখানে চাষীর ঘরের লক্ষী মেয়ে বৌরা সরল হাসি নিয়ে সমাজের শ্রীবৃদ্ধিতে রত ছিল আজ সেখানে শুধুই ভয়। যে কোন মুহুর্তে ধর্ষিত হয়ে যাওয়ার ভয়। আজ বাংলা রক্তাক্ত। আট থেকে আশি সব মেয়েরাই এখন ভোগ‍্যপন‍্য। দলের দন্ডমুন্ডের কর্তা কর্তৃদের অঙ্গুলিহেলনে ধর্ষক ছাড়া পেয়ে আঁচলের আশ্রয় নেয় আর ধর্ষিতার পরিবার হয় একঘরে।

প্রতিবাদ করলে তাকে দমন করার চেষ্টা চলে। এ কোন  বাংলা? এ কোন নববর্ষ? নারীদের দমনপীড়ন লাঞ্ছনার মধ্যে দিয়ে কি করে আসবে 'শুভ নববর্ষ'? 

প্রশ্নগুলো বড় ভাবায়। বাংলা নববর্ষের সূচনায় আজ দেশের তথা বাংলার মেয়েরা অসুরক্ষিত ঘরে ও বাইরে। বড় অন্ধকার চারিদিকে। একটা প্রদীপে সে অন্ধকার ঘুচবে না। চাই দেশের সব মহিলাদের ঐক‍্যবদ্ধ ভাবে এক হাতে অস্ত্র অপর হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে প্রতিবাদ। অত‍্যাচারীর রক্তে ধুয়ে যাক পুরনো গ্লাণি।  

ঘুচে যাক সব কালো। আলোয় ভরুক আমাদের দেশ, আমাদের বাংলা। সেই সুদিনের আশায় সবইকে জানাই শুভ নববর্ষ। শুভমস্তু।

(www.theoffnews.com - Suva nababarsha)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

গেল গেল রব। প্রতিবাদে উত্তাল গোটা অন্তর্জাল মাধ্যম। ফেসবুক টুইটারে বাংলা মাধ্যমে পড়বার সগৌরব ঘোষণার ছড়াছড়ি। গর্জে উঠেছে বাংলার একাংশ, বাংলা মাধ্যমে পড়া নিয়ে এমন অপবাদ, অপমান? না, মেনে নেওয়া যায় না। কি নিয়ে বলছি তা এতক্ষণে প্রায় সকলেই বুঝে গিয়েছেন। যারা বোঝেননি তারা কিন্তু এখন থেকে সঠিক বাঙালি নন। তাও সেই সব মানুষগুলির জন্য জানিয়েই দিই, সম্প্রতি এক বেতার সঞ্চালিকা একটি বেসরকারি সংবাদ মাধ্যমে সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন বাংলা মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীরা নাকি বহুজাতিক সংস্থাগুলিতে চাকরিলাভে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেন না। এই কথাটাকেই বাংলার অপমান, বাঙালির অপমান আখ্যা দিয়ে রীতিমত প্রতিবাদ এবং কটাক্ষের ঝড় উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে। হ্যাঁ, এ রাজ্যের বাঙালিদের প্রতিবাদের প্রধান বা একমাত্র জায়গা এখন এই সামাজিক মাধ্যমই। 

পরে সেই সঞ্চালিকা কেন তিনি এই উক্তি করেছেন তার স্বপক্ষে একটি যুক্তিও উপস্থাপন করেছেন। ক্লিশে এবং চেনা সেই যুক্তি, বাংলা মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ভাল বলতে না পারায় হীনমন্যতায় ভোগেন, যার নাকি সরাসরি প্রভাব পড়ে চাকরির ইন্টারভিউতে। এ কথা আংশিক সত্যি তা স্বীকার করে নেওয়া ভাল। কারন সব মাধ্যমেই ভাল খারাপ দুই রকমের ছাত্রছাত্রী থাকে তাই ভাল ছেলেমেয়েরা যে কোনও মাধ্যম থেকেই ভাল ফল করে, ভাল জায়গায় প্রতিষ্ঠা পায়। বাংলা মাধ্যমে পড়া অসংখ্য ছেলেমেয়েই এখন বহুজাতিক তথা দেশ বিদেশের বিভিন্ন নামীদামী সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। তাই এই আলোচনা এখানেই থামিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু সেটা হওয়ার নয়। কারণ, বাংলা মাধ্যমে পড়া নিয়ে যতটা আত্মশ্লাঘা আমরা এখন অনুভব করছি, বাংলা ভাষা নিয়ে পড়ে যতটা গৌরব আমাদের মধ্যে রয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে। তা কি সত্যিই আন্তরিক? নাকি প্রতিবাদের স্রোতে গা ভাসানো? 

বাংলাকে ভালবাসি, কিন্তু বাংলা বলতে খুব আপত্তি। কথায় কথায় ইংরেজি, হিন্দি বা অন্যান্য ভাষার শব্দ ঢুকিয়ে বাংলাকে অপদস্থ করতে আমাদের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের জুড়ি নেই। বাংলা মাধ্যমে পড়া আশু গর্বিত বাবা মায়ের ছেলেমেয়েরা কি এখন বাংলা মাধ্যমেই পড়েন? উত্তরটা সকলেরই জানা। কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিমি দূরে একটি মফঃস্বলে থাকা আমার এক বন্ধুর মেয়ে ভর্তি হল স্থানীয় একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। তার স্ত্রী আমায় জানাল বাংলা মাধ্যমে নাকি পড়াশোনাই হয় না। বলাই বাহুল্য সেই মেয়েটি নিজে বাংলা মাধ্যমেই পড়েছে, আরও অবাক কাণ্ড আমার সেই বন্ধুটি কিন্তু একটি বাংলা মাধ্যম স্কুলের শিক্ষক। এখানেই শেষ নয়, সেই বন্ধুটির মেয়ের স্কুলে প্রথম ভাষা ইংরেজি, দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি, কারন হিন্দিতে নাকি নম্বর ওঠে বেশি। এটা একটা উদাহরণ, শহর, মফঃস্বল, একটু আধুনিক গ্রাম সর্বত্রই এখন একই ছবি। আমার বাড়ি গোবরডাঙা বলে একটি মফঃস্বল শহরে। পৌর এলাকায় ২৬টি বাংলা মাধ্যম প্রাথমিক স্কুল ছিল এখানে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীর অভাবে গত দশ বছরে বন্ধ হয়ে গিয়েছে আটটি স্কুল। ভাবুন একবার, শিক্ষার্থীর অভাবে বন্ধ হয়ে গেল বাংলা মাধ্যম স্কুল। বদলে গজিয়ে উঠল দ্বিগুণ পরিমাণে ইংরেজি বা আধা ইংরেজি মাধ্যমের বেসরকারি স্কুল। অর্থাৎ আমরা বাংলা মাধ্যমে পড়বার জন্য খুব গর্বিত হলেও আমাদের ছেলেমেয়েদের সেই গর্বের ভাগিদার হতে দিতে নারাজ। 

আচ্ছা আমরা তো বাংলা মাধ্যমে পড়বার জন্য এত গর্বিত। দৈনন্দিন লেখালেখির যে সামান্য কিছু কাজ আমাদের করতে হয় তা কি আমরা বাংলায় করি? একটু বুকে হাত রেখে বলুন তো ব্যাঙ্কের বিভিন্ন ফর্মে, এমনকি চেক বইতে বাংলায় কতজন লেখেন। রেলের আসন সংরক্ষণের ফর্মও কি কেউ ইদানিং কালে বাংলায় পূরণ করেছেন? কতজন বাংলা মাধ্যমে পড়া গর্বিত মানুষ নিজের সাক্ষরটি সব জায়গাতেই বাংলাতে করেন? এই সব গা জ্বালানে প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছেই আছে। উত্তরটাও আমাদের সকলেরই জানা। 

রেলের টিকিটে অনেক সময়ই বাংলা ভাষা থাকে না। কেউ এ নিয়ে কখনও প্রতিবাদ করেছেন? বাহুবলি, আরআরআর নিয়ে পাগল গোটা দেশ। আপনি আমিও ব্যতিক্রম নই। বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে রমরমিয়ে চলছে এই সব দক্ষিনী ছবি। বাকিটা হিন্দি ছবি। বাংলা কই? প্রশ্ন করেছেন আপনি? অথচ আপনার জন্যই জানিয়ে রাখি এখানে আরআরআর হিন্দি ভাষায় দেখানো হলেও দক্ষিনের সব রাজ্যে তাদের ভাষায় ডাব করে দেখানো হচ্ছে এই ছবি। শুধু তাই নয় সব হিন্দি বা ইংরেজি ছবিই সেখানে তাদের নিজেদের ভাষায় ডাব করে দেখানো হয়, না হলে সেখানকার মানুষজন ছবি দেখতে আসেন না। আমাদের এই নিজের ভাষার প্রতি ভালবাসা আছে? আমরা কখনও বলেছি, সব ছবিই আমি নিজের ভাষায় দেখতে বা শুনতে চাই? না, আমরা উদার। তাই তো আমি অন্য প্রদেশে যাই বা অন্য রাজ্য থেকে কেউ এখানে আসুক, তাদের সঙ্গে হিন্দি বা অন্য ভাষায় কথা বলতে পারলে বর্তে যাই। কোনও মতেই বাংলা বলার ভুলটুকুও করি না। কারণ? উনি তো বাংলা বুঝবেন না। আমরা তাই বোঝাতেও যাই না। অন্য রাজ্যের মানুষ কিন্তু এই বোকামো করেন না। 

বাংলা ভাষার পাশাপাশি বাংলা সনাতনী সংস্কৃতিও আপনার আমার মত বাংলা মাধ্যমে পড়া গর্বিত বাঙালির হাতে পড়ে এখন আইসিইউতে। আচ্ছা একটু মনে করে দেখুন তো গত দশ বছরে কোনও পাত্রকে তার বৌভাতে ধুতি পাঞ্জাবী পরতে দেখেছেন? আমি কিন্তু বৌভাতের কথা বলছি বিয়ের দিন নয়। আমি নিশ্চিত আপনি দেখেননি। কারন বৌভাতে এখন স্যুট কোট পরে সাহেব সাজাটাই রীতি। আগে তেমনটা ছিল না। মেয়েদের ক্ষেত্রেও যেমন শাড়ি বিদায় নিয়ে চলে এসেছে লেহেঙ্গা চোলি। না না আমি গোটা বছর বা গোটা জীবন শাড়ি পড়তে বা ধুতি পরতে বলছি না। কিন্তু আমাদের বাঙালিদের যে পরিচিত পোশাক, রীতি তা কি এই দুটো দিনের জন্যও মানা অসম্ভব? না কি বড্ড আনস্মার্ট লাগে? বৌভাতে কোট টাই পরে সাহেব সাজা বরগুলির সিংহ ভাগই কিন্তু বাংলা মাধ্যমে পড়া। বাঙালির বিয়েতে এখন মেহেন্দি, সঙ্গীত হয়, মেয়েরা নাচ গান করেন। একটু মনে করুন তো গত দশ বছরে কোনও বিয়ে বাড়িতে বাসর রাতে জমজমাট গান গল্প আড্ডার কথা শুনেছেন? অথচ সেটা আমাদের সংস্কৃতি ছিল।

বাংলা মাধ্যমে পড়েও, একটা কর্পোরেট চাকরি বাগিয়ে ফেসবুকে সগর্ব ঘোষণাই যদি আপনার একমাত্র উদ্দেশ্য হয় তাহলে বলব আপনি ওই সঞ্চালিকার মুখে ছাই দিয়ে বেশ সফল। কিন্তু বাঙালি হিসেবে আপনি কতটা সফল, কতটা আন্তরিক তা নিজেই একবার বিচার করুন না, বুকে হাত রেখে। সম্ভব হলে বেরিয়ে আসুন “আমরা বাঙালি” নাটকের চরিত্রের খোলস ছেড়ে। মন থেকে ভালবাসুন বাংলা ভাষাকে, বাংলা সংস্কৃতিকে। তাহলে দেখবেন কেউ আর আপনার ভাষাকে অপমান করবার সাহস দেখাবে না, আপনাকেও ফেসবুকে টুইটারে সগর্বে ঘোষণা করে জানাতে হবে না আপনি কতটা গর্বিত বাঙালি। 

পরিশেষে ধন্যবাদ অয়ন্তিকাকে, ঘুমিয়ে থাকা বাঙালি এবং তাদের বাংলা প্রেমকে জাগিয়ে তোলার জন্য। হোক না বিতর্ক, তবুও জেগেছে বাংলা, এটাই বা কম কি?

(www.theoffnews.com - Bengali language study service RJ Ayantika Chakraborty)

অরিন্দম সাহা, ফিচার রাইটার ও শিল্পোদ্যোগী, মুম্বাই:

রাষ্ট্রসম্মান মাথা পেতে নিতে জানতে হয়। অহেতুক বাগ-বিতন্ডা, সস্তা রাজনীতির দূর্বিপাক একটা জাতিকে কিভাবে হাস্যকর পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে, তা আজকের বাঙালিদের না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

একটা পুরষ্কার যেটা করে (অনেক কিছুর মধ্যে) তা হলো কিছু অতিরিক্ত পরিচিতি বয়ে আনে। গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কি পরিচিতির সংকট হয়েছে? বলবো, আরো হলে মন্দ কি? আজকের প্রজন্ম তো বাংলা ধ্রূপদী গান শোনেই না। ওনার নামও অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা শুনেছে বলে বিশ্বাস করি না, এক ছত্র গানের কলি তো দূরাশা। বা, বুদ্ধবাবুর ক্ষেত্রে, ….ওনার শিল্পায়ন নিয়ে সদর্থক ভূমিকাই বা কজন জানে? পুরষ্কারটা পেলে আরো কিছু লোক না হয় জানতো। ওনারা যখন সাফল্যের মধ্যগগনে, তখন সোশাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত ছিল না। 

আরো একটা জিনিস হতো। গত ৭৫ বছরে দেশ হাজারো শিল্পী - শতাধিক উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পেয়েছে। তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন রাষ্ট্রীয় পুরষ্কারে সম্মানিত হয়। বিষয়টা ১৩০ কোটি লোকের মধ্যে থেকে কতিপয় গুনী মানুষকে বেঁচে নেওয়ার মতো একটা জটিল কাজ। ভবিষ্যত প্রজন্মের কিছু ইতিহাস সচেতন মানুষ নিশ্চয় সে তালিকা খুঁটিয়ে দেখত। জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত হতাম। আপনারা সে সুযোগটা দিলেন না কেন?

কোথাও যেন কেউ বলে দিয়েছে বাঙালী মানেই বিদ্রোহী হতে হবে, তর্ক করতে হবে। আখেরে লাভ না হলেও, ‘মানছি না, মানব না’, আমাদের মজ্জাগত। প্রধানত, দুটো বক্তব্য, ‘এতদিন মনে পরেনি কেন?’, এ প্রশ্নের উত্তর তো আগের কেন্দ্র/ রাজ্য সরকারকে দিতে হবে। তবে ৮০ বছরে বঙ্গবিভূষণ নেবার সময় কিভাবে যেন বয়স গৌন হয়ে যায়। অন্য বক্তব্যটা হলো, ‘ওপরের স্তরের পুরষ্কার নয় কেন?’। বিনয়ের সঙ্গেই বলছি, লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে আপনার তফাৎটা থাকা সঙ্গত - যদিও দুজনেই লিজেন্ড। আর বুদ্ধবাবুর ক্ষেত্রে ভামপন্থা মার্কা কিছু কেঁজো যুক্তি শুনছি বটে। যা ভাবার অযোগ্য। 

আর, শুনছি পুরস্কারের খবর ‘বলার’ ধরণে গলদ ছিল। হয়তো সরকারি আমলার গাফিলতি। আপনিও কি সব জায়গায় সমানভাবে নিজেকে উজার করে দিয়েছিলেন? না কি করা সম্ভব? শুধু এটা বলবো, স্টেজে আপনাদের কোনো একটা পুরষ্কার ধরিয়ে, ভুলভাল ইতিহাস, ঝড়ঝড়ে মিথ্যা ভাষণ বা অনুপ্রেরণার বানী যখন ধেয়ে আসে, তখন আমাদের ভীষণ খারাপ লাগে। পদ্ম সম্মানের ক্ষেত্রে এসব হয় বলে আমার জানা নেই। তবে এটা বুঝি (অনেকের ক্ষেত্রে), হাসপাতালের বিলের বোঝা বড্ড ভারী, আর সংগীত মেলাগুলোয় পাওয়া সম্মাননা মাসকাবারীর মুসকিল আসান। তাই কিছু নিতে হয়, আর কিছু রিফিউজ করতে হয়। 

পুরষ্কার আসলে প্রাপকের সিদ্ধান্তে হয় না। যা আগে বহুল হতো বলে আমার বিশ্বাস। এক গুনী শিল্পীকে দেখেছি, ২০০৯ কি ২০১০ সাল নাগাদ তৎকালীন কং সরকারে নিজের জন্য সুপারিশ করতে। ইনি পরে আবার বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন! বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার চেষ্টা করছে যথার্থ লোককে সম্মান দেওয়ার। এনারা একটু অন্যভাবে ভাবলে, সেই প্রচেষ্টার পালে আর একটু হাওয়া লাগতো। কিন্তু ওই যে, শিল্পের জমি দেওয়া থেকে, পুরষ্কার পাওয়া সবেতেই ভ্রকুটি। আফশোষ, বাঙালি সদর্থক ভাবতে ভুলে গেছে বোধহয়। আসলে আপনারা হাওয়া মোরগের সাথে গা ভাসালেন। সুখবরটা হলো, আপনার থাকছেন, গান স্যালুট বরাদ্দ রইল। 

(www.theoffnews.com Sandhya Mukhopadhyay Buddhadeb Bhattacharjee Padma Bhushan Padma Shri rejected)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

“ইতিবাচক খবর করুন, অবশ্যই বিজ্ঞাপন পাবেন”। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহশীল এই বাক্যের মধ্যে কিন্তু স্নেহ ছাড়াও লুকিয়ে আছে খানিক দম্ভ, খানিক হুমকি এবং সমালোচনা সহ্য করতে না পারার এক চিরাচরিত সংমিশ্রণ। শাসকের অহং, দিনের আলোর মতই স্পষ্ট এই বাক্যে। সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য এমন সরাসরি বিধি নির্দেশ এর আগে কোনও শাসকের গলায় আমি অন্তত শুনিনি। সমালোচনা কেউই পছন্দ করেন না। সাংবাদিকতার প্রথম দিকে বাম তথা সিপিএমের আমলেও তারা সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না। কোনও খবর বিপক্ষে গেলেই বাম নেতারা দেখা হলেই তা নিয়ে নানা কটুক্তি বা কটাক্ষ করতেন। প্রচ্ছন্ন হুমকিও যে পাইনি তা নয়, কিন্তু সরাসরি আমাদের পক্ষেই খবর করতে হবে, তার বিনিময়েই আমরা বিজ্ঞাপন দেব এটা অন্তত বামেরাও বলেনি। ঠারেঠোরে বোঝালেও প্রকাশ্য সভায় এমন কথা বলার মত দুর্মতি তাদের হয়নি। 

কিন্তু আমাদের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সোজা সরল। তিনি তাই সোজা কথা সোজা ভাবেই বলে থাকেন। তাই বলে নিজেদের পক্ষে খবর করলেই সরকারি বিজ্ঞাপন মিলবে, এটা বোধহয় সাম্প্রতিক কালে সব চেয়ে উদ্ধত উক্তির মধ্যে একটি। সংবাদ পত্রের অনেকটাই অর্থ আসে সরকারি বিজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তি থেকে। ছোট পত্রিকা তো বটেই সরকারি বিজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে থাকে বড় বড় সংবাদপত্রও। বহু সংবাদ মাধ্যমই তাই সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করতে কার্যত ভয়ই পায়, পাছে সরকারি বিজ্ঞাপন হাতছাড়া হয়ে যায়। তাই অনেক ক্ষেত্রেই পাঠকরা সরকারের বিপক্ষে তেমন খবর অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যম থেকেই পান না। এরই মাঝে কেউ কেউ একটু আধটু সাহস দেখাতো, মুখ্যমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর তারাও আর সেই সৎসাহস দেখাবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ। 

উত্তর ২৪ পরগনার প্রশাসনিক সভায় স্থানীয় এক সংবাদ পত্রের প্রতিনিধি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সরকারি বিজ্ঞাপন না পাওয়ার অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তারই উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন সরকারের পক্ষে খবর করলেই মিলবে বিজ্ঞাপন। “যে গ্রামীণ পত্রিকাগুলো সরকারের ডেভলপমেন্ট কাজ পজিটিভলি, পজিটিভ ভাবে করবেন, আমি ডিএমকে বলব, তাদের যেন আমরা বিজ্ঞাপনটা দিই।“ শুধু তাই নয়, পাশাপাশি তার মন্তব্য “ইতিবাচক কাজ নিয়ে খবর করে প্রতিদিন একটা করে কপি ডিএম অফিসে পাঠাবেন। ডিআইসিওকে পাঠাবেন। পুলিশের এসপি এবং পুলিশ কমিশনারেটকে পাঠাবেন। কারণ, তারাও দেখে নেবে যে ইতিবাচক খবর হচ্ছে। একটা নেতিবাচক জিনিসকে ইতিবাচক করা যায়। যত ইতিবাতক খবর, তত বিজ্ঞাপন। কারণ আমি চাই, তারা ভালো জিনিসগুলি তুলে ধরুক। বাংলায় সারা দিন নেতিবাচকই লক্ষ্য করি। ইতিবাচক খবরটা কেউ আর করে না। ইতিবাচক খবর করুন, বিজ্ঞাপন নিশ্চয় পাবেন।' অর্থাৎ এখন খবর করে সেই খবরটি সরকারের পক্ষে হয়েছে কিনা, তা সরকারি আধিকারিকদের দিয়ে তা পাশ করিয়ে নিতে হবে। তবেই বুঝুন সরকারের বিপক্ষে আর কোনও খবর আপনি পড়তে পারবেন কিনা তা এখন থেকে যথেষ্ট প্রশ্নের মুখে। 

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এই সমস্যা নেই। কারন তিনি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন না। সাংবাদিক সম্মেলনও করেন না। মাঝে মধ্যে তার মন কি বাত তিনি প্রকাশ করেন, সাংবাদিকেরা সেটাই কুড়িয়ে নিয়ে প্রচার করে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর সেই সমস্যা নেই। তিনি এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর উল্টো মেরুতে, যথেষ্ট সময় দেন সাংবাদিকদের। প্রচুর সাংবাদিক সম্মেলন করেন। কিন্তু সমালোচনা একেবারেই নিতে পারেন না। পছন্দ করেন না বিরুদ্ধাচারণও। তাই তো তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু লিখলেই সেই সাংবাদিককে প্রকাশ্যেই অপমান করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে কথাই বলতে দেন না তার মনে হওয়া বিরোধী সাংবাদিকদের। 

এ পর্যন্তও চলছিল এক রকম। কিন্তু সংবাদপত্র কি খবর করবে? অথবা কি খবর করলে পরেই সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে এই নির্দেশ এমন প্রকাশ্যে সরাসরি তিনি না দিলেই বোধহয় ভাল হত। জেলার ছোট কাগজগুলির সরকারি বিজ্ঞাপন প্রয়োজন, অনেক কাগজই পয়সার অভাবে ধুঁকছে, কিছু বন্ধও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার জন্য এমনিতেই তিনি জেলা প্রশাসনকে কোনও সুস্থ নির্দেশ দিতেই পারতেন। তার স্নেহশীল দিদিময়ী ভাব যথেষ্টই প্রকাশিত হত সে ক্ষেত্রে। কিন্তু শুধুমাত্র সরকারের জন্য ইতিবাচক খবর করলেই বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে, এটা বলাটা মুখ্যমন্ত্রীর মুখে মানায় কিনা তা নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। সংবাদপত্রই সরকারের বিভিন্ন ভুল ধরিয়ে দিত, সমালোচনা করত সাধারণ মানুষের হয়ে। কিন্তু এখন সে কাজও বন্ধ করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি। আগে সরকারি কর্মী বা আধিকারিকরা সাংবাদিকদের একটা আলাদা মর্যাদা দিতেন। এখন তাদের কাছ থেকেই খবর ইতিবাচক কিনা তা পাশ করাতে হবে। তারা কি আর সংবাদকর্মীদের সেই মর্যাদা দেবেন? এমনিতেই সাংবাদিকদের সম্মান এখন যথেষ্ট কমে গিয়েছে নানা কারনে। তার উপরে এখন মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশের পর সাধারণ মানুষও কি সাংবাদিক তথা সংবাদ মাধ্যমের আর ভরসা রাখতে পারবে?

(www.theoffnews.com - government advertisement news Mamata Banerjee)

সুখময় ঘোষ, লেখক, শ্রীরামপুর, হুগলি:

মিশনারিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশন উনবিংশ শতাব্দীতে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে জর্জরিত  বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবর্তনে এক  নবজাগরণের সূত্রপাত করেছিল। এই ব্যাপারে পথ প্রর্দশক ছিলেন শ্রীরামপুর ত্রয়ী নামে খ্যাত  উইলিয়াম কেরী, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড। কেরী ইংল্যান্ডে থাকাকালীন ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে লেইস্টারসে ‘ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটি’ গঠন  করেন। কেরী ও ডঃ টমাস এই সোসাইটির  প্রতিনিধি হিসাবে ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আগমন করেন। কেরী প্রথমে মালদহের কাছে মদনাবতী নীলকুঠীতে চাকরী করতেন। মদনাবতীতে থাকাকালীন উইলিয়াম কেরী বাইবেলের অনুবাদ, বিদ্যালয় স্থাপন ও ধর্ম প্রচার প্রভৃতির মাধ্যমে  মিশনের কাজ শুরু করেন। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ডঃ মার্শম্যান ও ওয়ার্ড এবং তাঁদের দুজন সঙ্গী খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে পদার্পণ করেন। সেইসময় ফ্রান্সের সাথে ইংল্যান্ডের যুদ্ধ চলছিল। তদানীন্তন  ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড ওয়েলেসলি তাঁদেরকে ফরাসী গুপ্তচর  মনে করে ভারত ছাড়তে হুকুম দেন। কিন্তু রেভারেন্ড ডেভিড ব্রাউন ওয়েলেসলির ভ্রান্ত ধারণা দূর করার পর এই বাংলায় থাকার অনুমতি পায়। ইংরেজদের বাধাদানে মার্শম্যান ও ওয়ার্ড কলকাতায় থাকতে না পেরে ডেনিসদের অধীনে শ্রীরামপুরে বাস করার অনুমতি পান স্বয়ং ডেনিস গভর্ণরের কাছ থেকে। পরে কেরী শ্রীরামপুরে এসে  মার্শম্যানদের সাথে যোগ দেন।

ভারতে শিক্ষাবিস্তার ও খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য ডেনিস গভর্ণর মিশনারিদের শ্রীরামপুরে স্থান দেওয়ায় উইলিয়াম কেরী, উইলিয়াম ওয়ার্ড, জন ফাউন্টেন এবং জশুয়া মার্শম্যান ২৫ এপ্রিল ১৮০০  খ্রিস্টাব্দে ডেনিস গভর্ণর কর্ণেল বাই-কে এক ধন্যবাদ জ্ঞাপন পত্র পাঠিয়ে লেখেন – ‘শ্রীরামপুরে স্থান না পাইলে তাহাদিগকে এই দেশ ছাড়িয়া  চলিয়া যাইতে হইত'। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ১০  জানুয়ারি কেরী, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড এই তিনজন মিলে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই মিশন  ছিল ভারতের প্রথম নিজস্ব প্রচারক সংঘ। এই মিশন হুগলি জেলার দুটি স্থান থেকে খ্রিস্টের বাণী প্রচারের সূচনা করে। শ্রীরামপুর মিশনের অধীনে স্থাপিত ‘মিশনস্কুল’-এ কলকাতা থেকে সমস্ত ইউরোপীয় ছাত্ররা পড়তে আসত। 'কলিকাতা গেজেটে’ প্রায়ই ‘The Mission School At Serampur under Mr. Carey' বলে বিজ্ঞাপন বের হত। কেরী ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে একখানি  বাড়ী কিনে ডঃ মার্শম্যান ও ওয়ার্ডকে সঙ্গে নিয়ে  শ্রীরামপুর ‘ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস' নামক মুদ্রাযন্ত্র স্থাপন করেন।

পঞ্চানন কর্মকার দ্বারা প্রস্তুত প্রথম কাঠের তৈরী বাংলা হরফ দিয়ে বাইবেলের বঙ্গানুবাদ এই প্রেস থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। দুই হাজার খন্ড বাইবেল বাংলা ভাষায় প্রকাশ করতে তৎকালীন সময়ে মোট খরচ পড়েছিল ৬১২ পাউন্ড। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে  রামরাম বসুর রচিত ‘প্রতাপাদিত্য চরিত’ শীর্ষক পুস্তকটি মিশন প্রেস মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হয়। বলা হয় এটাই বঙ্গদেশের প্রথম মুদ্রিত গদ্য পুস্তক। বাংলার গদ্য ও সাহিত্যকর্মের প্রসারে মিশন  গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছিল। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মে এই প্রেস হতে বাংলা ভাষার  প্রথম সংবাদপত্র ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয়।  ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে বিধ্বংসী অগ্নিকান্ড ঘটে যায়। অগ্নিকান্ডে প্রেসের প্রচুর ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছিল। এই বিপুল বিপর্যয় সামলে  পরবর্তী কালে প্রেসটিকে পুর্নগঠিত করা হয়।

কেরী শ্রীরামপুর মিশনের  অর্থ তহবিলের ভার নেন। মার্শম্যান বিদ্যালয় এবং ওয়ার্ড মুদ্রণ পরিচালনার  দায়িত্ব নেন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ এপ্রিল  শ্রীরামপুর মিশন চার্চের উদ্বোধন হয়। কেরী হলেন  চার্চের পুরোহিত এবং মার্শম্যান ও ওয়ার্ড সহকারী পুরোহিতের ভার নেন। কেরীদের এই মিশন  নিজেদের স্বপোর্জিত অর্থেই চলত। মার্শম্যান  বিদ্যালয়, ওয়ার্ড প্রেস এবং কেরী ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপনা করে নিজেদের ভরণপোষণ ও  মিশনের কাজ চালাতেন।  

ইংরেজ সরকারের বাধাদানের দরুণ এই মিশনারিদের ধর্ম প্রচারের কাজ আশানুরূপ হয়নি।  কিন্তু বাইবেল অনুবাদ,পুস্তক মুদ্রণ, বিদ্যালয় স্থাপন  ইত্যাদি জনহিতকর কাজে শ্রীরামপুর মিশন যথেষ্ট সাফল্য লাভ করে। বাংলার গদ্য ও সাহিত্যকর্মের প্রসারে মিশন গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছিল। সমাজ সংস্কারে শ্রীরামপুর মিশন তৎকালীন সময়ে  অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। জনহিতকর কর্মপরিধি  প্রসার লাভ করায় মিশনের শাখা পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের বহু জায়গায় স্থাপিত হয়েছিল।  

শ্রীরামপুর মিশনের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল দেশীয়দের শিক্ষাদানের জন্য শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠা। ধর্মনিরপেক্ষ উচ্চশিক্ষাদান এই কলেজের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। ডেনিস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীরামপুর কলেজ একসময় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নিত হয়। কিন্তু ১৮২২ থেকে ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে উলিয়াম ওয়ার্ড ও কেরীর বড় ছেলে ফেলিক্সের হঠাৎ মৃত্যু হলে শ্রীরামপুর মিশনের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে।  হুগলা নদীর বন্যায় মিশনের ঘড়-বাড়ীর ক্ষতিসাধন  হলে মিশন কর্তৃপক্ষ আরও সমস্যায় পড়ে যায়।  সমস্যার টানাপোড়নে বাধ্য হয় ইংল্যান্ডের ‘ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটি’-র সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। ফলে শ্রীরামপুর মিশন স্বাধীন মিশনারি সোসাইটি হিসাবে কাজকর্ম শুরু করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁদের পিছু  ছাড়েনি। কলকাতার যে কোম্পানীতে  তাঁরা মিশনের টাকা গচ্ছিত রাখতেন সেটি হঠাৎ একদিন নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে বসে। মিশনের এই  অসহায় অবস্থায় ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে  কেরী এবং ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে মার্শম্যান  পরলোকগমন করেন। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে কয়েকবছর চলার পর ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর মিশনের কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়।

(www.theoffnews.com - Shreerampore Mission)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

সকাল সকাল বেজায় উল্লাস আমাদের পাড়ার চায়ের ঠেকে। এমনিতে ঠেকে উল্লাস, আমোদ, উত্তেজনা লেগেই থাকে, কিন্তু আজ যেন একটু বেশিই মনে হচ্ছে। গুটি গুটি পায়ে সেই দিকে এগোতেই মালুম হল ব্যাপারটা। রাজ্য সরকারের একটা সিদ্ধান্তে এমন খুশির হিল্লোল। গত এক বছরে নাকি মদের দাম অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। তাতে বেশ একটু সমস্যাতেই পড়ে গিয়েছিলেন রাজ্যের সুরাপায়ীরা। একই সমস্যার শরিক ছিলেন আমাদের ঠেকের অনেকেই। সম্প্রতি সুরাপায়ীদের ব্যথা অনুভব করেছে আমাদের রাজ্য সরকার। তাই আবগারি শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে তারা। এতে মদের দাম মোটামুটি ২৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত কমে যাবে। এই খবর জানতে পেরেই ঠেকে এমন খুশির হাওয়া। কেউ কেউ একটু বক্রচাহনীতে জিজ্ঞাসা করতেই পারেন, মদের দাম কমেছে তো চায়ের দোকানে উল্লাস কেন? আরে বাবা, সকালের ‘চাতাল’ তো সন্ধেয় মাতাল হতেই পারেন, তাই না?

চায়ের দোকানের মালিক বিশুদাকে অবশ্য এই খুশিতে সামিল মনে হল না। একবার বেজার মুখে বলেও ফেললেন মদের দাম না কমিয়ে তেলের দামটা আরও একটু কমালে ভাল হত। কিন্তু এমন একটা ভাল খবরের উচ্ছ্বাসে বিশুদার চাওয়াটা বুদবুদের মতই মিলিয়ে গেল। কিন্তু এই চাওয়াটা কি বিশুদার একার? আমাদের রাজ্যে মা মাটি মানুষের সরকার অবশ্য মদ্যপায়ীদের জন্য সব সময়েই উদার। সরকারে আসার কদিন পরেই চোলাই খেয়ে মৃতদের দুই লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিয়েই তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এর পরে ক্রমশ বেড়েছে মদের দোকান, বেড়েছে সুরাপানের বহর। মানছি এ থেকে রাজ্য সরকারের আয় প্রচুর। তাই মদের দোকানের লাইসেন্স পেতে এখন আর আমাদের রাজ্যে খুব একটা অসুবিধে হয় না। দীঘাকে গোয়া বানাতে না পারলেও, মদের দোকানের সংখ্যায় আমরা হয় তো গোয়ার কাছাকাছি চলেই যাব কিছুদিনের মধ্যে। 

আমরা খুব গালি দিই, হ্যাটা করি, কিন্তু পাশের রাজ্য বিহার যা করেছে তা আমরা করতে পারিনি। বিহার কিন্তু তাদের রাজ্যে মদ্যপান নিষিদ্ধ করেছে অনেকদিন আগেই। সেখানকার মানুষ লুকিয়ে চুরিয়ে মদ খান নিশ্চয়, তবে প্রকাশ্যে নয়। আমাদের ক্ষেত্রে উল্টো। লকডাউনে অন্য পরিষেবা যখন বন্ধ ছিল তখন কদিনের মধ্যেই খুলে দেওয়া হয়েছিল মদের দোকান। লকডাউন, করোনা, শারীরিক দূরত্ববিধি শিকেয় তুলে সেই দোকানের সামনে সুরারসিকদের ভিড়ের ছবিটা নিশ্চয় মনে আছে আপনাদের। না, রাজ্য সরকার সেই ভিড় নিয়ন্ত্রণে কোনও চেষ্টাই করেনি। বরং তারা উৎসাহ দিয়ে গিয়েছে প্রকারান্তরে। 

এবার আসি বিশুদার চাওয়াতে। জ্বালানি এবং ভোজ্য তেলের দাম নিয়ে নতুন করে কিছু বলবার নেই। কেন্দ্র প্রায় চল্লিশ টাকা দাম বাড়িয়ে লোক দেখাতে পাঁচ এবং দশ টাকা পেট্রোল ডিজেলে কমিয়েছে। সেই দেখে কিছু বিজেপি শাসিত রাজ্যও আরও কিছু কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে। আমাদের রাজ্য এ ব্যাপারে অনড়। এমনিতেই পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডে আমাদের থেকে পাঁচ টাকা কম মূল্যে পেট্রোল মেলে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবী তিনি আগেই এক টাকা কমিয়েছিলেন। তখনও কিন্তু আমাদের সঙ্গেই অন্যান্য বেশ কয়েকটি রাজ্য তেলের দাম কমিয়েছিল। এখন তারা কমালেও আমাদের রাজ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা তেলের দাম কমাবে না। রাজ্য সরকারের আশা মদের দাম কমালে মদ বিক্রি আরও বাড়বে, সেই সঙ্গে বাড়বে রাজ্যের আয়ও। কিন্তু মানুষকে নেশাতুর করে আয় বাড়ানোর এই পন্থা কি আদৌ সুখকর? 

মদের শুল্ক কমালে তেলের শুল্ক কেন কমানো হবে না, এই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা। সঙ্গত হলেও তাদের বক্তব্যকে আমি ধরছি না, কারন তারা শুধু বিরোধীতার জন্যই এটা বলেন, মন থেকে নয়। কিন্তু চায়ের দোকান মালিক বিশুদা বা ছাপোষা আমার মত নাগরিকেরা যথেষ্ট আরাম পেতাম যদি জ্বালানি তেলের শুল্ক আমাদের রাজ্য আরও একটু কমাতো। না, এতে গাড়ি চালাতে সুবিধা হত তা শুধু নয়। সুবিধা হত বাজার যেতে। এই শীতে যে সবজির দাম যা থাকার কথা তার চাইতে তিন গুন বেশি দামে কিনতে হচ্ছে ডিজেলের আকাশ ছোঁয়া দামের কারনে। সুবিধা হত বাসে, অটোয় চাপতে। দিনের পর দিন যাত্রী ভাড়া ইচ্ছেমত বেড়ে চলেছে। এ ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকার নীরব। সরকারি মতে ভাড়া বাড়েনি, কিন্তু এক এক বাসের রুটে এক এক রকম ভাড়া। অটো নিজেদের মর্জি মত ভাড়া চায়। সব দেখেও নীরব রাজ্য। তারা শুধু সমব্যথী সুরাপায়ীদের জন্য। তাই তো সকলেই যখন তেলের দাম কমার আশায় তাকিয়ে তখন মদের দাম কমিয়ে চমক দেন তারা। বাবুমশায়… সাধারণ মানুষের কাছে মদ্যপান ছাড়াও আরও অনেক কিছু খাওয়ার থাকে, অনেক কিছু করার থাকে, সেটা যদি বুঝত কেউ…

(www.theoffnews.com - wine petrol tax West Bengal)

সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ:

এবার না সত্যি বিরক্ত লাগছে। একটু আগে একটা জরুরি ছবির ফটো ফিনিশের কাজ করছিলাম। হঠাৎ মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে নোটিফিকেশন ভেসে উঠল, "হাসপাতাল থেকে ছুটি পেলেন নুসরত জাহান।" খবরের সৌজন্যে কলকাতার একটি প্রথম শ্রেণির সংবাদ মাধ্যম। যারা আবার কোনও সীমানা মানে না, অন্তত তাদের এমনই দাবি। তবে তীব্র চাটুকতায় যে তারা অধুনা অভ্যস্থ তা জনগণের সমালোচনায় স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় অহরহ। ব্রেকিং নিউজের বেলায় তো অষ্টরম্ভা। সেই কত যুগ আগে বাংলার সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিল বঙ্গের শেষতম প্রকৃত ব্রেকিং নিউজ 'ট্রাম কেলেঙ্কারি' ও 'বেঙ্গল ল্যাম্প কেলেঙ্কারি'। তার পরবর্তী 'আমলাশোল' কাহিনী। ব্যাস বাঙালি সাংবাদিকতার লম্ফঝম্ফ করার দিন আপাতত শেষ। তাই আপোষের মসনদে বসে তারা আজ আমাদের ব্রেকিং নিউজ পরিবেশন করে, হাসপাতাল থেকে ছুটি পেলেন নুসরত জাহান। সত্যি ডিসগাস্টিং।

ভেবেছিলাম, এসব নিয়ে কিছু লিখবো না। কিন্তু একাধিক তথাকথিত সংবাদ মাধ্যমের অতি প্রয়োজনহীন বাচালতা আমাকে সেই কলম ধরতে বাধ্য করালো। কাউকে ব্যক্তি আক্রমন করা যেমন আমার উদ্দেশ্য নয়, তেমনি আমার লেখায় কেউ আঘাত পেলে আমি আগাম দুঃখ প্রকাশ করছি তারজন্য। আবার নব্য জেন্ডার বিভাজনকারী সমর্থকদের বলবো, অনুরোধ করে আমার লেখাটির বাকি অংশটি আর না পড়লে আমি খুশি হবো। আরও একটি বিশেষতম আবেদন, লেখার মধ্যে ধর্মের ও রাজনীতির কোনও রসায়ন অনুগ্রহ করে খুঁজতে যাবেন না।

গত ২৬ অগস্ট। কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন বাংলার অভিনেত্রী তথা সাংসদ নুসরত জাহান। এযাবৎ সবটাই ঠিক। একজন সাংবাদিক হিসেবে এই নতুন মাকে সেলাম জানাই। অবশ্যই সাধুবাদ জানাই এই কারণেও যে, তিনি নানা বিতর্কের মধ্যে ভ্রুণহত্যার রাস্তায় পা বাড়াননি বলে। তাঁর নব মাতৃত্বের কারণে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেছেন। এই পর্যন্ত সবই তো সুন্দর।

কিন্তু তাই বলে, এই জন্মপর্ব ইস্যুটাকে নিয়ে বাংলার বহুল সংবাদমাধ্যমের এমন নির্লজ্জ হ্যাংলামি প্রচার দিনরাত এক করে চলবে তা ভাবিনি। অন্যদিকে, সোস্যাল মাধ্যমের কিছু লেখালেখি পড়ে এটাই মনে হলো, নুসরত বোধ হয় এই প্রসবান্তে চলতি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম মহান মায়ের তকমা পেয়েছেন। আমি ফের বলি, নুসরতের নতুন মাতৃত্ব নিয়ে আমি একটিও নেতিবাচক মন্তব্যে রাজি নন। বরং কামনা করি নুসরত ও তাঁর নবজাতক সুন্দর ও সুস্থ থাকুক। পাশাপাশি একাংশ হুজুগে বাঙালির আদেখলাপনা শ্রেষ্ঠ মাতৃত্বকরণ দাবিরও আমি ঘোর বিরোধী। 

একটা বিতর্ক সম্প্রতি বাজার মাত করেছে। নুসরতের নব্য সন্তানের পিতা কে তা নিয়ে। এই বিতর্কের সৃষ্টি অবশ্যই করেছেন নুসরত নিজেই। কারণ তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, নিখিল জৈনকে বিয়ে করেননি। উভয়ে সহবাস করেছিলেন মাত্র। আবার সাম্প্রতিক কালে বিশেষ বন্ধু যশ দাসগুপ্তের সঙ্গে অভিনেত্রীর অন্তরঙ্গতা তো ফিসফিস গসিপের শিরোনামে। অতএব নুসরাতের নিঃসন্দেহে জানার কথা তাঁর পুত্র সন্তানের জৈবিক পিতা কে? এছাড়া প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষা তো নির্ণায়ক উত্তর সহজেই দিতে পারে । তবে এই পিতৃত্বের নাম পরিচয় প্রকাশ করা বা না করাটা সম্পূর্ণ অভিনেত্রীর নিজস্ব ব্যক্তিগত বিষয়। এখানে কারও খবরদারি বর্তমান সুসভ্য সমাজ মান্যতা দেয় না।

আবার প্রকৃতিগতভাবে গর্ভধারণ করলে স্বাভাবিক নিয়মে পশু পাখি জলজ প্রাণি থেকে মানবী সবাই প্রসব করবেই, এটাই তো জাগতিক নিয়ম। ঠিক এই পরিস্থিতিতে বিশেষতঃ এই ইস্যুতে এমনতর মহান পর্বের সিংহাসনে আসীন কেন তিনি আচমকা হয়ে গেলেন, এটা আমার মাথায় ঢুকলো না। ভাগ্যিস আগ বাড়িয়ে কোন মিডিয়া স্কুপ খবর করার জন্য তখনকার দিনের নেহরু বংশীয় যুগের নার্গিসের মায়ের সাহসিকতার সঙ্গে হালফিল এই মাতৃতের তুলনা করে বসেনি, এটাই আমাদের রক্ষে।

মনে রাখতে হবে, নুসরত কিন্তু কোনও ভাবেই কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির চাপে তাঁর সন্তানের পিতৃত্বের পরিচয় গোপন রাখতে সত্যি বাধ্য হয়েছেন কিনা তা কিন্তু কেউ জানি না। এমনকি এমনতর অভিযোগ নুসরত নিজেও এখনও পর্যন্ত করেননি। বরং তিনি যেচে বিষয়টি গোপন রেখেছেন বলে তাঁরই একদল নেটিজেন সমাজে জোরদার লোকের কান ভাঙাতে শুরু করেছেন। এটাও সত্য, এযাবৎ নুসরাতকে কেন্দ্র করে যাঁদের নাম দিবারাত্রির ঘুরপাক খেয়েছে তাঁদের মধ্যে কেউই যেচে নবজাতকের পিতৃত্বের দায় অস্বীকার করে প্রকাশ্যে বিবৃতিও দেননি। সেক্ষেত্রে, কেউ যদি নিজের ব্যক্তি অধিকার বলে পিতৃ পরিচয়ের বিষয়টি গোপন রেখে সন্তানের জন্ম দেন, তাহলে তা নিয়ে এতো মাতোয়ারা প্রচার হইচই কিসের তাগিদে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কারণ বাংলার নানা শহরে নানা গ্রামে এহেন পিতৃ পরিচয়হীন সন্তানের জন্মগ্রহণ সাম্প্রতিক যুগে তো আকছার লেগেই রয়েছে। কই তখন তো এই মিডিয়া কুলের নব্য মাতৃত্বের ট্যাগ লাইনের হুল্লোড়বাজি বা সোস্যাল মিডিয়ায় মহৎ মায়ের দৃষ্টান্তের কাহিনী নজরে পড়ে না।

বহু কাল আগের কথা। সময়টা আশির দশক। ভারতে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে এসেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেই দলে ছিলেন ব্যাটের দানব ভিভিয়ান রিচার্ডস। সেই সফরকালে অভিনেত্রী নীনা গুপ্তের সঙ্গে ভিভিয়ান রিচার্ডসকে দেখা গেছে যত্রতত্র। এর কিছুদিনের মধ্যেই নীনা গুপ্ত গর্ভবতী হোন। তিনি কিন্তু কোনও ভনিতার আশ্রয় না নিয়ে বা কোনও ন্যাকামি না করে সরাসরি সেদিন জানিয়ে দেন, তাঁর গর্ভে থাকা সন্তানের পিতার নাম স্বয়ং ভিভিয়ান রিচার্ডস। কিন্তু দুঃখের এটাই, সেই সময় ভিভিয়ান রিচার্ডস নীনা গুপ্তর পাশে তো দাঁড়ানইনি, উল্টে স্বদেশে ফিরে গিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। বরং নীনা গুপ্ত সেদিন সমস্ত সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে পুরুষের ভোগের লালসার বিরুদ্ধে চপেটাঘাত করে জন্ম দিয়েছিলেন এক কন্যা সন্তানের। নুসরতের সঙ্গে কিন্তু কোনও কেটে পড়া পুরুষের যৌন লালসার মতো তো তেমন কোনও নালিশ বা প্রতারণা ঘটেনি যার ফলে তিনি গর্ভবতী হয়েছিলেন। তাই নীনা গুপ্তর সেদিনের দৃষ্টান্তের সঙ্গে এদিনের নুসরত কখনই একাসনে বসে মহান মাতৃত্বের সীতাভোগ খাবার অধিকারী হতে পারেন না।

কিন্তু অধুনা বাংলার মিডিয়ার একাংশের প্রচার সর্বস্বতা দেখে মনে হয়, পিতৃ পরিচয় হীন প্রসব অলিম্পিকে এই পরিবেশন ইস্যুটা যেন স্বর্ণপদক লাভ করেছে। যেন বাংলায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নয়া-মাতৃত্বের ইভেন্ট ঘটে গেল গত কয়েকদিনে। আমি কারও মাতৃত্বকে ছোট করে দেখতে নারাজ। প্রতিটি নতুন মাকে আমি নতমস্তকে প্রণাম করি। কিন্তু তাই বলে মিডিয়ার এহেন 'কাগুজে বাগ' মার্কা পদলেহন স্কুপ খবর পরিবেশন বড্ড অস্বস্তিরও। মনে রাখা আবশ্যক মিডিয়ারও একটা সীমানা আছে, নিজেদের সামাজিক দায়িত্ব মেনে সেটা লঙ্ঘন না করাই শ্রেয়।

(www.theoffnews.com - Nusrat Jahan Bengal media social media new baby)

দেবর্ষি মজুমদার, লেখক, বীরভূম:

যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির বিশ্ববিখ‍্যাত পেরোটিস আর্ট গ‍্যালারিতে প্রদর্শিত একটি ছবিতে পাকা কদলী চিপকে দিয়েছেন ইটালির শিল্পী মরিজিও কেটলান। তার মূল্য এক লক্ষ কুড়ি হাজার ডলার। তিন জন ক্রেতা মিলে ওই শিল্পকর্মটি ক্রয় করেন। কিন্তু ভাবতে পারেননি, কেউ কলাটি কেউ খেয়ে ফেলতে পারে! মিস ডাটুনা খপাৎ করে কলাটি টেনে খুলে খেয়ে সেলফি তুলে ইন্সট্রাগ্রামে পোস্ট করেন। আর্ট গ‍্যালারীর পরিচালক এর জন্য কোনো আইনী ব‍্যবস্থা নেননি। শুধু বলেন, কলাটি তো শিল্পীর ধারণা মাত্র। শিল্প কর্ম ঠিকই আছে। 

এই ধারণা আসলে শিল্পীর খেয়াল। আর সেই খেয়ালেই তো শিল্পী অবন, রবি ঠাকুর ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায় আসর জমাতেন। আর তার নির্মিতি ছিল জিলিপি অমৃতি। সেই খেয়ালেই অবন বলেন, “ধীরে ধীরে পথ ধরো মুসাফির, সীড়ী হৈ অধবনী!”—দুর্গম সোপান, হে যাত্রী, ধীরে পা রাখ।এ পা রাখতে গেলে পার্থিব জ্বালানি নয়, মনের জ্বালানির দরকার পড়ে।

জ্বালানির অগ্নিমূল‍্যে যখন গণপরিবহন বেসামাল, ঠিক তখনই গরীবের ঘোড়া রোগ পাঁড়ুইয়ের এক শিল্পীর। শিল্পী উদয় দাস তাঁর মা লক্ষ্মীর নামে নিজেই বানিয়ে ফেললেন "লক্ষ্মী ট্র‍্যাভেলস" বাস। শুরুতে এমন মন্তব্য গ্রামের অনেকেই করেছিলেন। অবশ‍্য যতক্ষণ না কোন রূপকথার কাহিনীর মত তার বাস সজীব হয়ে জ্বালানির তেল দাবী করছে! ততক্ষণ নো চিন্তা বাস মালিকের! এটাই যা আশার কথা!

বাসের রুট বোলপুর শান্তিনিকেতন বাইপাশ রোড। রাজ‍্য সরকারের নিয়মে করোনা বিধি মেনে পঞ্চাশ শতাংশ যাত্রী নিয়ে দূরত্ববিধি মেনে চলতে হবে বাস। বোলপুর শান্তিনিকেতন ছেড়ে কসবা পাঁড়ুই হয়ে সিউড়ী যাবে বাস। রিজার্ভ করা যাবে। কন্টাক্ট নাম্বার দেওয়া আছে বাসের গায়ে।

বাস তো হলো, কিন্তু তেলের যা দাম! তবুও এই  খেয়াল! শিল্পী মাত্রেই খেয়ালী, আর শিল্প মানেই খামখেয়ালের ফসল। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে পাঁড়ুই পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ধানাইগ্রামে যেতে হবে। পাঁড়ুই থেকে মাত্র এক কিমি হাঁটা পথ।

ব‍্যাঙ্ক থেকে আশি হাজার টাকা লোন নিয়ে একা হাতে নিখুঁত বাসের আদলে তৈরী করে ফেলেন এক আস্ত বাসা। দূর থেকে সাধারণ মানুষের মনে হবে বাস দাঁড়িয়ে আছে প‍্যাসেঞ্জার নেওয়ার জন‍্য।  পাক্কা এক বছর লাগে। তাঁকে সাহায্য করেছেন স্ত্রী আর বড় ছেলে। দুএকজন শ্রমিক ছাড়া পুরো কাজটা নিজে একা হাতে করেছেন। এমনিতে মৃৎ শিল্পী। পুরন্দরপুরে পঁয়তাল্লিশ ফুট কালি মুর্তি তিনি তৈরী করেন। পড়াশোনা করা হয়নি। তাই বিশ্বভারতীর কলাভবনে পড়ার সাধ তাঁর মেটেনি। কৃষিমেলায় তাঁর শিল্প সকলের নজর কাড়ে। পুরস্কারও পান। তবে অভাব তাঁর নিত‍্যসঙ্গী। শিল্পী ভাতা পাননি। পাননি অন‍্যান‍্য সাহায্য। 

প্রথম যখন বাসা বানাতে গিয়ে বাস বানাচ্ছিলেন, অনেকেই ভাবছিলেন একি ছেলেখেলা! আজ সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে বাস খুঁজতে সবাই চলে আসছেন, রসিকতা করে বলছেন, বাসে চড়তে এলাম। দাদা, বাস কখন ছাড়বে? সবার  তারিফ শুনে উদয় দাস বলেন, সবাইকে আনন্দ দিতে পারছি এতেই  আনন্দ। এখনো গৃহপ্রবেশ হয়নি। তবে বাইরে ওয়েদার কোট পেন্টিং, জানালার কাঁচ লাগানো সম্পূর্ণ। দূরদূরান্তের লোকের কাছে এখন পরিচিত শিল্পীর গ্রাম ধানাইগ্রাম। বাসের আদলে বাসা দেখতে ভিড় জমছে মানুষের। এখন পোড়ো ভগ্নপ্রায় বাড়িতে বড় ছেলের পরিবার, ছোট ছেলে, স্ত্রী ও অসুস্থ মা বাবাকে নিয়ে মাত্র দুটি রুমে  থাকেন উদয় দাস। দুই ছেলে ও এক মেয়ে। এক ছেলে ও মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। 

বাস বাড়ি। অথচ বাস বলে ভুল হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে। বাসের রঙ, বাসের জানালা, বাসের ঘেরা ছাদ, বাসের মুখ, হেড লাইট, বাসের চাকা এত নিখুঁত যা একমাএ কোন শিল্পীর পক্ষে এমনভাবে প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব। চাকায় নাটবোল্ট পর্যন্ত আসল মনে হবে। শিল্পীর কথায়, ঢালাই দিয়ে চাকা তৈরী হয়। তারপর ছোট কুর্ণি দিয়ে সিমেন্টের মশলা ধরিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় বাসের চাকা।  শুধু তাই নয় বাসের গায়ে যেসব লেখা থাকে তাও হুবহু লেখা রয়েছে। বাসের ভেতরে ঢুকলে একটি রান্নাঘর ও একটি বেডরুম আছে। কিন্তু  রান্না ঘর পুরো বাসের কেবিন। কেবিনের দেওয়ালে শিবের মুর্তি। বাসা মনে হবে না। মনে হবে যেন বাসেই আছি। গন্তব্যস্থল চলে এলো না তো?

খালাসী যেন হাঁক মারছে-- পাঁড়ুই, কসবা, সিড়ড়ী...

কিন্তু শিল্পীর খেয়াল জমাটিয়া আসর। সেখানে অভাব নয়, নিয়ম নয়, খেয়ালটাই আসল! বাসা আর বাসের প্রভেদ থেকে একটু দূরে!

(www theoffnews.com - bus house Birbhum)

দেবিকা ভট্টাচার্য, লেখিকা ও শিক্ষিকা, চন্দননগর, হুগলি:

পূর্ব বর্ধমান জেলার অম্বিকা কালনার প্রতাপেশ্বরের মন্দিরকে জলেশ্বর মহাদেবের মন্দির বা 'প্যারীকুমারী মঠ' যে নামই দেওয়া হোক সে মন্দির অসাধারণ টেরাকোটার কাজের এক অপূর্ব নিদর্শন। 

বাঁকুড়ার সোনামুখী থেকে তৎকালীন প্রখ্যাত টেরাকোটা শিল্পী রামহরি মিস্ত্রীকে নিয়ে এসে বানানো এই মন্দির ১৮৪৯ এ প্রতিষ্ঠিত, উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত, পূর্বমুখী, উড়িষ্যারীতির শিখর দেউলের প্রাচীন রীতির পরিবর্তিত ও সরলীকৃত রূপ। গর্ভগৃহে একটি মাত্র দরজা, পূর্ব দিকে। বাকি তিনদিকে আছে ভরাট করা দরজা। আয়তন ১৫ ফুট x ১৫ ফুট  উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট (১৩.৭ মি.)। এর চারদিকেই রয়েছে খুব ছোট পরিসরের বারান্দা। গর্ভগৃহে কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ নিত্যপূজিত। উচ্চতা প্রায় ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি ( ১৩৭ সেমি)।

মন্দিরে প্রবেশ পথের মাথায় রয়েছে রামসীতার অভিষেকের মুর্তি। নিচে বাদ্যবন্দনা। উত্তর দিকের কৃত্রিম দ্বারের মাথায় আছে লঙ্কাযুদ্ধ। যুদ্ধে সিংহবাহিনী দুর্গার আবির্ভাব। অন্য দিকে বানর সৈন্য। নিচে রণবাদ্য। পশ্চিম দিকে কৃত্রিম দ্বারের মাথায় রয়েছে কীর্তনদলসহ 'গৌড়-নিতাই' মূর্তি। আর দক্ষিণ দিকে রয়েছে রাধাকৃষ্ণ ও ললিতা-বিশাখা। অন্যান্য টেরাকোটা কাজের মধ্যে আছে দলবদ্ধ বিদেশিনী, বেহালা বাদিকা, কালী, রাধাকৃষ্ণলীলাদৃশ্য, অশ্বারোহী যোদ্ধা, সখীদ্বয়ের মাঝে শ্রীকৃষ্ণ, জগন্নাথ, শিব, মহিষমর্দিনী (ভগ্নপ্রায়), তীরন্দাজ, বীণাবাদক, গড়গড়ার নল হাতে এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, ঘোড়-সওয়ার, মালা-জপ-রত বৈষ্ণব সাধু ও ফুলকারি নকশা ইত্যাদি। অনেকে বলেন, প্রতাপচাঁদের দুই মহিষী প্যারী কুমারী এবং আনন্দ কুমারীর অনুরোধে রাজপরিবারের তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এমন সুন্দর মনোমুগ্ধকর আকাশ চুম্বী মন্দির যাঁর নামে চিহ্নিত তাঁকে ঘিরে জালিয়াতির গল্প! প্রতাপেশ্বর শিব একমেবদ্বিতীয়ম্। বর্ধমান-রাজ প্রতাপচাঁদকে ঘিরে 'জাল প্রতাপচাঁদ' এর কাহিনি!

প্রতাপচাঁদের পিতা বর্ধমান-মহারাজ তেজচাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে নানা বদ অভ্যাস থাকলেও, প্রজাপালক হিসাবে তিনি বিখ্যাত ছিলেন। 

তেজচাঁদের আট রাণী। কিন্তু পুত্র সন্তান? বহু প্রতীক্ষার পর ষষ্ঠ রাণী নানকিদেবীর গর্ভে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নিলেন প্রতাপচাঁদ। জমিদারির একমাত্র উত্তরসূরি। পরিবার ও প্রজাদের চোখের মণি তিনি। ঠাকুমার আদরে প্রশ্রয়ে মানুষ। নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান। নানারকম মানুষের সঙ্গে মেশেন। সাধুসন্তদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়াবাড়ি রকমের বেশি।

১৮১৩ সালে পিতার বর্তমানে অতি অল্প বয়সে জমিদারির ভার নিলেন প্রতাপ।

১৮২১ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি প্রতাপচাঁদ নাকি এক অজানা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েন। তার ইচ্ছানুসারে কালনার গঙ্গার তীরে অন্তর্জলি যাত্রার আয়োজন করা হয়। এক তুমুল ঝড় বৃষ্টির রাত্রে শোনা যায়, প্রতাপচাঁদের মৃত্যু হয়েছে। অনেকের মতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে তিনি গঙ্গা সাঁতরে নৌকায় পালিয়ে যান। পরবর্তীকালে এমন কথাও শোনা যায়, এই ঘোষণার পিছনে তেজচাঁদের পঞ্চম পত্নী কমলকুমারী ও তাঁর দাদা পরাণচাঁদ কাপুরের পরামর্শ ছিল। এমনকি এই সাজানো অন্তর্জলি যাত্রার মাধ্যমে প্রতাপচাঁদের গৃহত্যাগের পিছনে রানি কমলকুমারীর ষড়যন্ত্র ছিল। মহারাজ তেজচাঁদের প্রিয় পঞ্চম মহিষী কমলকুমারী ছিলেন প্রখর বুদ্ধিমতী। রাজপরিবারের অনেক ঘটনার পিছনেই ছিল তাঁর মস্তিষ্ক। অনেকে মনে করতেন, রানি কমলকুমারী এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পরানচাঁদ কাপুরের অর্থলিপ্সা ও উচ্চাভিলাষের জন্য ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেন প্রতাপচাঁদ। পরে তিনি অনুশোচনায় ভোগেন। প্রায়শ্চিত্তের উদ্দেশ্যে অন্তর্জলি যাত্রার কৌশল করে গোপনে চোদ্দ বছরের জন্য বর্ধমান ত্যাগ করেন। প্রতাপচাঁদের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু অথবা মৃত্যুর গল্প কমলকুমারী ও তার দাদা পরাণচাঁদ কাপুরের কাছে এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিল। বর্ধমান রাজপরিবার হয়ে গেল বংশধরহীন। তেজচাঁদ বারংবার পুত্রের মৃত্যুকে অস্বীকার করলেও তারা বৃদ্ধ তেজচাঁদকে  দিয়ে পরাণচাঁদের পুত্র চুনিলাল কাপুরকে দত্তক গ্রহণ করিয়ে ফেললেন। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে তেজচাঁদ মারা যাবার পরে এই চুনিলাল কাপুরকে 'মহাতাবচাঁদ বাহাদুর' নাম দিয়ে রাজসিংহাসনে বসালেন কমলকুমারী ও পরাণচাঁদ। 

প্রতাপচাঁদের মৃত্যুর খবর তেজচাঁদের মতো অনেকেই বিশ্বাস করেননি। এর ঠিক ১৪ বছর পর ১৮৩৫ সালে গোলাপবাগের গাছতলায় ফকির সন্ন্যাসী আলেক শাহকে দেখে 'গোপীনাথ ময়রা'র  মনে হয় "ছোটো মহারাজ"এর কথা। কিন্তু ততদিনে তেজচাঁদ মারা গেছেন। জমিদারির ক্ষমতা দখল করেছেন  মহাতাবচাঁদের নামে প্রতাপের বিমাতা কমলকুমারীর ভাই পরাণচাঁদ। সন্ন্যাসী রাজ পরিবারের সকল কথা বলতে পারেন। কিন্তু সে খবরে প্রমাদ গুনলেন পরাণ। এক দেওয়ানের নেতৃত্বে বিজয় ও রাম নামের দুজন লেঠেল পাঠিয়ে সন্ন্যাসীকে শহরের সীমানার বাইরে বের করে দিলেন। শহরের বাইরে সেই জায়গার নাম হল 'বাজেপ্রতাপপুর'। অর্থাৎ নকল প্রতাপের জায়গা। আর তার নিকটেই দুটি জায়গার নাম দেওয়ানদীঘি ও বিজয়রাম।

প্রতাপচাঁদ ওরফে আলেক শাহ গেলেন বিষ্ণুপুরের মহারাজার কাছে। তাঁর পরামর্শে বাঁকুড়ায় ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে আলাপ করলেন। আর সেখানে প্রজাবিদ্রোহ শুরু হলে গ্রেফতার করা হয় আলেক শাহকে। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের তখন শেষ অবস্থা। কোথাও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লেই কোম্পানীর দৃষ্টি যায় স্থানীয় ফকির সন্ন্যাসীদের দিকে। যাই হোক, মুক্তি লাভের পর তিনি গেলেন কলকাতা। সেখান থেকে সবান্ধব আবার বর্ধমান প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু কালনায় পৌঁছোতেই গ্রেপ্তার করা হল তাঁকে।

শুরু হয় জাল প্রতাপচাঁদের মামলা।

১৮৩৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ম্যাজিস্ট্রেট স্যামুয়েল সাহেবের অধীনে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হল। 

সাক্ষ্য দিতে এলেন গণ্যমান্য নানান ব্যক্তি। বিষ্ণুপুরের মহারাজ, জোড়াসাঁকোর দ্বারকানাথ, পাঞ্জাব থেকে রণজিৎ সিংয়ের সেনাপতি ফরাসি জেনারেল অ্যালার্ড। 

সেকালে এই মামলা ঘিরে বর্ধমান এবং সারা বাংলা যথেষ্ট আলোড়িত হয়। রবীন্দ্র পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এই মামলার একজন সাক্ষী হিসাবে আদালতে উপস্থিত হয়ে প্রতাপের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। অনেকের মতে, দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ‘কার এন্ড ট্যাগোর’ কোম্পানীর একজন কর্মকর্তা, বর্ধমান রাজপরিবারের আইনী পরামর্শদাতা ছিলেন ‘কার এন্ড ট্যাগোর’ কোম্পানী। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বর্ধমান রাজপরিবারের মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

এই মামলায় ডেভিড হেয়ারও সাক্ষ্য দেন। তিনি সন্ন্যাসীকে প্রতাপচাঁদরূপে সনাক্ত করেন। 

স্যামুয়েল সাহেব শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রতাপ বলে স্বীকার করলেন না।

অনেক সাক্ষ্য-প্রমানের পর ইংরেজ আদালতে সন্ন্যাসী দোষী প্রমাণিত হন। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে ২০শে সেপ্টেম্বর রায় বের হল যে, জাল প্রতাপচাঁদের আসল নাম অলক শাহ অথবা কৃষ্ণলাল ব্রহ্মচারী। আদালত জাল প্রতাপচাঁদকে এক হাজার টাকার জরিমানা করে এবং অনাদায়ে ছ'মাসের জেলের আদেশ দেয়। কর্পদকহীন জাল-প্রতাপচাঁদ ছ'মাস জেল খেটে কলকাতা চলে যান। এরপর আইন মোতাবেক জাল-প্রতাপচাঁদ কলকাতা হয়ে শ্রীরামপুর চলে যান। সেখানে তিনি সন্ন্যাস জীবন পালন করেন। শ্রীরামপুর থেকে তিনি ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৮৫৩) কলকাতার বরানগরের ময়রাডাঙা পল্লীতে আশ্রয় নেন। সেই বছরেই চরম দারিদ্র্য, হতাশা, ভগ্ন স্বাস্থ্যের জন্য তাঁর মৃত্যু হয়। 

মামলা শেষ হবার, হয়েও গেল। প্রজাদের মনে প্রতাপ রয়ে গেলেন। আইনত ক্ষমতালাভ না হলেও, প্রজারা অধিকাংশই প্রতাপের ফিরে আসার কথা বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন, তিনি জাল নয়। 

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! কখনও সখনও ঘটে বুঝি! এই ঘটনার প্রায় সত্তর বছর পরে পূর্ববঙ্গে ঘটেছিল ভাওয়াল সন্ন্যাসীর ফিরে আসার ঘটনা। কাহিনির গতিপ্রকৃতিও প্রায় একই।

এই কাহিনিকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা চলচ্চিত্র 'সন্ন্যাসী রাজা' তো কালজয়ী। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং সুমিত্রা মুখার্জি অভিনীত "রত্নদ্বীপ" যাত্রাপালাটিতে একই ঘটনা বা ক্ষমতা দখলে জালিয়াতির গল্প। কালনা শহরই সৌমিত্র এবং সুমিত্রার অসাধারণ অভিনয়ের সাক্ষী হয়ে আছে।ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অবিকল এক না হলেও খানিকটা একভাবে ঘটে, এর প্রমাণ ইতিহাস নিজে। 

ভাওয়াল সন্ন্যাসী আদালতে ‘আসল’ রাজকুমার বলেই প্রমাণিত হয়েছিলেন। আমাদের প্রতাপচাঁদ প্রজাদের মনে যত রেখাপাতই করুন, ইতিহাসের পাতায় থেকে গেছেন ‘জাল প্রতাপচাঁদ’ নামেই…আসল প্রতাপচাঁদকে অকালে বিদায় দিতে হয়েছে।

আমরা সেই সময়ের সাক্ষী নই। যদি বা মনের কোণে কোনো পক্ষপাতিত্বের টুকরো জমা হয় গান দিয়ে ভুলি—

"কেউ বা রাজা রাজপ্রাসাদে, কেউ ফকির হয়ে কাঁদে।

কেই বা এর করবে বিচার, নালিশ জানাব কাকে!"

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Pratapeshwar mandir Kalna Pratap Chand)