Articles by "বিবিধের মাঝে দেখ"
Showing posts with label বিবিধের মাঝে দেখ. Show all posts

দেবর্ষি মজুমদার, লেখক, বীরভূম:

যেখানে আঙুলের ডগায় গোটা পৃথিবী, সেখানে খবরের কাগজের পাতা ওল্টানোর দিন শেষ! তাই খবরের কাগজের পাতা ওল্টানোয় মানুষের আগ্রহ ক্রমশ কমছে। বিভিন্ন দৈনিকের সার্কুলেশনের হাল দেখলে সেটা সহজেই অনুমেয়। কে আর পাতা ওল্টাতে চান? যেখানে মোবাইলে একটি ক্লিক করে খুলে যায় গোটা জগৎ। তারপর শুধু স্ক্রল করলেই,  কেল্লা ফতে!

বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির যুগে যখন সব কিছুই ডিজিটালাইজেশনের মুখাপেক্ষী। তখন ডিজিটাল মিডিয়া কেন তাদের প্রাপ‍্য মর্যাদা পাবে না? ফেসবুকে ইউটিউব এবং অন‍্যান‍্য ডিজিটাল মিডিয়া বা পোর্টাল গুরুত্বপূর্ণ গণ মাধ‍্যম হলেও, তারা সহজেই আইনের ভ্রুকুটির স্বীকার। গুরুত্বপূর্ণ সভায় ডিজিটাল মিডিয়ার সাংবাদিকরা প্রবেশ অধিকার পান না। সেই স্বীকৃতি ও অধিকার আদায়ে এবার সারা রাজ‍্যের ডিজিটাল মিডিয়া এক ছাতার তলায় এলো। সংগঠনের নাম ওয়েস্ট বেঙ্গল মিডিয়া ফোরাম। ৮ ডিসেম্বর শিলিগুড়ির সিনার্জি টাওয়ারের চতুর্থ তলে একটি আলোচনা সভার আয়োজন হতে চলেছে। বিভিন্ন জেলার সাংবাদিকরা একত্র হয়ে সেখান থেকেই তাদের চলার পথ শুরু করবে। সারা রাজ‍্যকে সংগঠন পাঁচটি জোনে ভাগ করেছে। জোন ভিত্তিক সমস্ত জেলার সাংবাদিকরা পর পর বিভিন্ন জেলায় সভা করবেন বলে সংগঠন সূত্রে জানা গেছে।   

উল্লেখ্য, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল মিডিয়া আমাদের সমাজের জনমত করতে একটা বড় ভূমিকা পালন করছে। অনেক যুবক যুবতীও এটিকে বর্তমানে তাদের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বলতে হয় এখানে যে  কোনও বড় মিডিয়ার থেকে বর্তমান সময়ে ডিজিটাল মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া জনগণের কাছে পৌঁছতে একটা বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিউয়ার্স বাড়লেই গুগল মানিটাইজেশনে সোজা আয়ের খোলা পথের হাতছানি। 

একটি রাজ্যের গঠনমূলক সমালোচনায়ও উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার এই গণমাধ্যম। তাই আজকের দিনে ডিজিটাল মিডিয়াকে অগ্রাহ্য করা নিরুপায়। মানুষের ঝক্কি কমছে অনেক। লিঙ্ক ক্লিক, পড়ো শেয়ার করো, তারপর ভ‍্যানিস।

(www.theoffnews.com social digital media)



 সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ:

শক্তির প্রাণ ভোমরা হলো বিদ্যুৎ। আর এই বিদ্যুৎ উৎপাদন মানেই কার্বণজাত দস্যু দূষণের দাদাগিরি। ফলে বলি পাঁঠার মতো কুঁকড়ে ওঠে স্বচ্ছতার পরিবেশ। তাই শক্তির হাত ধরে পরিবেশ জুড়ে এই কার্বণ গ্রাস কান্ডে বিপন্ন গোটা প্রাণী সমাজ। একইসঙ্গে অস্তিত্বের নিশ্চয়তা হারাচ্ছে মনুষ্যকুল।

তথ্যটা এরকম। সময়টা ২০২৩ সাল। সারা বিশ্বে সামগ্রিক পরিবেশে বৈশ্বিক শিল্পজাত কার্বণ উদগীরণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৭ বিলিয়ন মেট্রিক টন। ঠিক সেইখানে একই ইস্যুতে ভারতের তরফে পৃথিবীর পরিমন্ডলে কার্বণ দূষণের পরিসংখ্যান ছিল ২.৭ বিলিয়ন মেট্রিক টন। এই সংখ্যা তথ্যকে যদি শুধু মাত্র শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রিভুত করা যায় তবে তার নিটফল মানুষের শিরদাঁড়ায় ঘুন ধরতে বাধ্য। কারণ সমগ্র বিশ্ব সহ ভারতের মোট কার্বণ নিঃসরণের ৬৫% থেকে ৭০% সৃষ্টি হয় শুধুমাত্র শক্তিজাত শিল্পের কারণেই। ওই ২০২১ সময়কালেই পৃথিবীতে শক্তি উৎপন্নের জন্য পরিবেশে ৩২ গিগাটন কার্বণ ছড়িয়ে গিয়েছিল। আর শক্তি উৎপাদনের নিরিখে ভারতের পক্ষে বিশ্বব্যাপী কার্বণের মাত্রায় যুক্ত করেছিল ১.৯ গিগাটন কৃষ্ণ দূষণ।

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রক আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের উদ্যোগে দেশীয় শক্তিজনিত কার্বণ নিঃসরণের বর্তমান পরিমাণ ৭০%'কে নামিয়ে ৫০%'এ হ্রাস করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আর এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের কর্মকান্ডে স্বনির্ভর ভারত পাশে পেয়েছে আমাদের দেশের আত্মিক চিরসখা ব্রিটেনকে। সুতরাং ভারতের নিজস্ব উদ্যোগে যেখানে বিশ্বের দূষিত পরিবেশকে আরও স্বচ্ছ করার আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে লন্ডন হাতে হাত মিলিয়ে দিল্লির দোসর হবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সম ভাবনায়, ঠিক সেই বিন্দুতে পারস্পরিক যৌথ প্রতিশ্রুতির মেলবন্ধনের সিন্ধুতে সুনামির অনুঘটকের কাজটা করে ফেলল কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই)।

গত বুধবার। স্থান বলতে তিলোত্তমা নগরের অভিজাত হোটেল তাজ বেঙ্গল। সেখানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল 'এনার্জি ২০২৪ কনক্লেভ।' মঞ্চের মূল ফোকাস একসময়ে কেন্দ্রীভূত হয়ে ওঠে অ্যান্ড্রিউ ফ্লেমিং'কে ঘিরে। তিনি যে কলকাতায় অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাসের দায়িত্ব প্রাপ্ত পূর্বাঞ্চলীয় ও উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ব্রিটেন হাইকমিশনার। এমন এক হেভিওয়েট আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব বলেন, "শক্তি উৎপন্নের ফলে বৈশ্বিক কার্বণ দূষণ আজকের দুনিয়ায় পৃথিবীর কাছে অন্যতম বৃহৎ আশঙ্কার কারণ। ভারত ও ইনল্যান্ড অন্যান্য দেশের সঙ্গে এ'বিষয়ে একইরকমের উদ্বিগ্ন। তাই বিশ্বের কার্বণ জনিত দূষণ রোধে এই দুটি রাষ্ট্র কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে অঙ্গীকার বদ্ধ।" তাঁর আরও বক্তব্য, জীবাশ্ম জ্বালানির ভান্ডারে মজুতের পরিমাণ ক্রমেই কমছে। ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তিত হওয়ার কারণে প্রাকৃতিক গ্যাসেও জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ও একইসঙ্গে ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে। ফলে শক্তি উৎপন্নে পুনরুজ্জীবন ঘটাতে আমাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নির্ভর হতেই হবে। তার সঙ্গে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের দেশ ব্রিটেন এইধরনের অত্যাধুনিক প্রকৌশল ভারতের সঙ্গে আদানপ্রদান করতে প্রস্তুত। কারণ এই দুই দেশের যৌথ লক্ষ্য হলো পরিবেশগত ওজন লেয়ারের ভারসাম্য রক্ষা করা, বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাজ্যের অপ্রচলিত ও পুনর্নবীকরণ শক্তি মন্ত্রী মহম্মদ গুলাম রব্বানি বক্তব্য রাখতে গিয়ে আশাব্যঞ্জক কথা শুনিয়েছেন, "সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি সহ পুনর্নবীকরণ শক্তি ও অপ্রচলিত শক্তি থেকে যে বিদ্যুৎ সারা দেশে উৎপন্ন হয় তা সমগ্র ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪৪%। আর এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, পুনর্নবীকরণ শক্তি ও অপ্রচলিত শক্তি উৎপন্নে সারা দেশের মধ্যে অগ্রণীর ভূমিকা নিয়ে চলছে বরাবর।"

সিআইআইয়ের এনার্জি সাব কমিটির চেয়ারম্যান ইভান সাহা উক্ত আলোচনায় মন্তব্য করেন, জলবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ থেকে বর্তমানে সারা দেশে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় ৪৫০.৭৬ গিগাওয়াট। যা বিশেষতঃ এই ক্ষেত্রে পৃথিবীর মধ্যে তৃতীয় স্থানাধিকার উৎপাদন। এহেন পরিসংখ্যান আগামী ২০৩০ সালে ৫০০ গিগাওয়াটের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলবে ভারত। একইসঙ্গে কার্বণ দূষণের মাত্রা হ্রাসের পরিমাপে ভারত বিশ্বকে নেতৃত্বে দেবে বলেও ইভানবাবু দৃঢ়তা সঙ্গে মত প্রকাশ করেন।

(www.theoffnews.com CII Energy Conclave)

রণজিৎ গুহ লেখক ও সমাজকর্মী দুর্গাপুর 

(লেখক একজন গর্বিত প্রাক্তন ইস্পাত কর্মী)

দুর্গাপুর মিশ্র ইস্পাত কারখানায় একদা কর্মরত অবস্থায় জীবনের চল্লিশটা বছর সত্যি বলতে কি ঘুমানো বা ঘুম থেকে ওঠা, প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারা কিম্বা দুবেলা খাওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের কোনও  বালাইই ছিলনা। মর্নিং শিফট হলে ভোর না হতেই শীত গ্রীষ্ম সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে ৫টা দশে বাস স্ট্যাণ্ড। বাড়ি ফিরে স্নান সেরে দুপুরের খাবার খেতে খেতে সাড়ে তিনটে। পরের সপ্তাহে রাত পালি। সারা রাত কারখানায় কাটিয়ে ঘরে ফিরি সকাল সাতটা। হপ্তা শেষে বেলা দুটো থেকে রাত দশটা কারখানা ডিউটি। ঘুমানো বা ঘুম থেকে ওঠা কিংবা দু'বেলা খাওয়ার নির্দিষ্ট সময় থাকবে কি করে? গত ২০/২২ বছর শিফট ডিউটির বালাই নেই। কারখানায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।  নিজের নিয়ম নিজেই ঠিক করি। তাই বলে ব্রাহ্ম মুহূর্তে ঘুম থেকে ওঠার তালে আমি নেই। হাত-পা ছোড়াছুড়ি বা প্রাতভ্রমণ ইত্যাদি স্বাস্থ্য চর্চার ধারে কাছেও নেই আমি। অভ্যেস করেছি অন্যরকম। প্রকৃতির ডাকে ঘুম ভাঙে সকাল ছ'টায়। আরেকটু গড়াই। সাড়ে ছটা নাগাদ বিছানা ছেড়ে শৌচাগার। তারপর মাজন মুখে ছাদে যাই। এই নিয়মে আছি বলেই একেবারে ক্ষণ স্থায়ী আদুরে হেমন্ত সকালকে উপভোগ করার সুযোগ পাই। সামান্য শীত শীত। গামলার জলপদ্মর পাতায় আহা সেই ছবির মতো দু-এক ফোঁটা  শিশির বিন্দু। বেগুনি, সাদা দোপাটির শেষ ঝলক। সিম গাছ ফুলে ফুলে ভরা। একটা দুটো স্থল পদ্ম। শিউলি কয়েকটা। টগর। সদ্য লাগানো গাদা ফুলের চারা। এখনও পাতা ছাড়েনি।  চন্দ্রমল্লিকা বেড়ে উঠচ্ছে তরতড়িয়ে। ডগা ভেঙে দিই। ডালকাটা গোলাপের কচি পাতা উঁকি মারছে। হঠাৎ করেই কুয়াশার চাদর। আহারে কার্তিকের সকাল! আহারে হেমন্ত!

(www.theoffnews.com late autumn season Hemanta)


সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ:

চোরি চোরি চুপকে চুপকে উৎপাদন অবাধে চলছে, ব্যবহার সমানে চলছে, দূষণও দাপটে চলছে।

সৌজন্যে প্লাস্টিক প্যাকেট।

চিন্তনের পরিধি বলতে আমাদের নিজস্ব সমাজে।

যেখানে সচেতনতার শুরুটা হোক না নিজেকে দিয়ে। আর একটু চেতনাযুক্ত হই না আমরা। আরম্ভটা করি না হয় যে যার ঘর থেকে। তবেই তো অচিরে ঘটবে এক স্বপ্নময় ইকো ব্যালান্স বিশ্ব।

এমনই ক্যাচ লাইনের একটা গভীর পরশ তখন তো কি স্পষ্টই না বর্ণময় রামধনু হয়ে ঝকঝক করছে উপস্থিত সবার চোখে মুখে। কেউ মাথা ঈষৎ ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাচ্ছেন। অনেকেই আবার প্রশ্নোত্তর পর্বে সমর্থন করেছেন। দু'চারজন তো অস্ফুট স্বরে সায় দিয়ে বলছেন, বর্জ্য মুক্তির এটাই সঠিক পন্থা।

আসলে উপরিউক্ত ট্যাগগুলোর এক বাস্তব সম্মত আলোচ্য রসায়ণ ঘটেছিল কলকাতার ভারত চেম্বার অফ কমার্স'এর আপন সভাকক্ষে। গত ৪ অক্টোবর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার অবসরে। এই বণিকসভার লেডিস ফোরামের উদ্যোগে। আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারিত ছিল "সিঙ্গল ইউজ প্লাস্টিক ব্যান এন্ড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট" শীর্ষকে। আলোচনায় অংশ নেন আয়োজক সংস্থার তিন কর্মকর্তা যথাক্রমে রাজকুমার অগ্রবাল, রেনুকা শাহ ও শিবানী বিঞ্জরাজকা।

বক্তাদের সম্মিলিত বক্তব্যে কয়েকটি তথ্য উপস্থিত সকলের কপালে ভাঁজ সৃষ্টি করেছিল অনায়াসেই। তাঁদের মতে, বিশ্বে প্লাস্টিক প্রথম উদ্ভাবন হয়েছিল ১৯০৭ সালে লিও বেকেল্যান্ডের উদ্যোগে। ১৯৫০ সাল থেকে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন ক্রমেই মহীরুহ আকার নেয়। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০, এই কুড়ি বছরে সারা বিশ্বের বর্জ্যের পরিমাপ বৃদ্ধি পেয়েছিল ৪ গুণ। প্লাস্টিকের বদান্যতায়। বর্তমানে গোটা পৃথিবীতে প্রতি বছর মোট প্লাস্টিক আবর্জনা সৃষ্টির পরিমাণ ৪০০ মিলিয়ন টন। এই হার বজায় থাকলে ২০৫০ সালে উক্ত বর্জ্য উৎপাদনের পরিসংখ্যান হবে বছরে ১,১০০ মিলিয়ন টন। অথচ মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের মাত্র ৯% পুনর্ব্যবহারযোগ্য হচ্ছে, আর বাকি ৯১% এই বিশ্বে পরিবেশ দূষণের অন্যতম ভয়াবহ কারণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এমনই সঙ্কটময় তথ্য পরিবেশনের মধ্যেই আসল কথাটাই বলে ফেললেন এদিনের বিশেষ অতিথি বক্তা তথা রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সচিব সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবেশ দফতরের প্রধান সচিব রাজেশ কুমার। তিনি জানান, আমরা মোটামুটি ভাবে উপরিউক্ত তথ্য সম্পর্কে সকলে কমবেশি ওয়াকিবহাল। প্লাস্টিক এই আধুনিক ডিজিটাল যুগে মানুষের অন্যতম সহচর ও বন্ধু। একে এড়ানো এই মুহূর্তে প্রায় অসম্ভব। বাস্তবে প্লাস্টিক কিন্তু আদৌ মানুষের কাছে ক্ষতিকারক বস্তু নয়। আসল ক্ষতির কারণ হলো প্লাস্টিক থেকে উৎসারিত বর্জ্য। আর ঠিক এখানেই আমরা আদতে সচেতন নই কেউই। আমরা এই সংক্রান্ত বিষয়ে স্লোগান তুলি, আলোচনা করি, সভা করি, অপরকে বোঝাই। ব্যাস ওই পর্যন্তই। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমরা কেউই সচেতন হয়েও আদপে সচেতন নই। তিনি জোরের সঙ্গে দাবি করেন, আগে আক্ষরিক অর্থে নিজেকে সচেতন করতে হবে, আপন ঘর থেকে শুরু করতে হবে। আমাদের সকলের যোগদানে সামগ্রিক পর্যায়ে সামাজিক হতে হবে। রাজেশবাবু একইসঙ্গে আবেদন করেন, ভারত চেম্বার অফ কমার্স নেতৃত্ব দিক প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহে, বিভিন্ন সমাজসেবী সংগঠন চালু করুক অভিনব বিপণন কেন্দ্র। যেখানে স্বল্প মূল্যে কিনে নেওয়া হবে প্লাস্টিক সৃষ্ট আবর্জনা। সমাজে বিভিন্ন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের সিএসআর বিভাগের তরফে আরও বেশি সংখ্যক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্রকল্প গড়ে উঠুক। তবেই তো এহেন বিপদের মোকাবেলা করা সম্ভব। অন্যথায় বিশ্বের দূষণমাত্রা রাক্ষুসে আকার ধারণ করলে সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বটাই বিপন্নের মুখে পড়ে যাবে অচিরে। তিনি এও বলেন, 'কেন্দ্র ও রাজ্যের প্লাস্টিকের বিষয়ে নানা বিধি নিষেধ আছে। আইনের সংস্থানও রয়েছে কঠোর ভাবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে হাটে বাজারে প্রায় প্রত্যেকটা মানুষ অবাধে নিম্নমানের প্ল্যাস্টিক ব্যবহার করে চলেছে। আমরা নিজেরাই যদি অবোধ হই সরকার একা কতটা সামাল দেবে?"

তাইতো আক্ষেপের সুরে রবীন্দ্রনাথের উক্তি স্মরণ করেন, 'আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না...'

পরিশেষে আলোচনাচক্রের একটাই মহার্ঘ আবেদন, হে প্লাস্টিক ব্যবহারকারীগণ, তোমাদের চৈতন্য হোক।

(www.theoffnews.com plastic uses polution recycling)

সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

দুর্গাপুর নামকরণটি অর্বাচীন কালের হলেও এই জনপদের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। দুর্গাপুরের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ রূপে বোঝার জন্য মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে - প্রাগৈতিহাস, মধ্যযুগীয় ইতিহাস এবং আধুনিক ইতিহাস। 

রাজ্যে পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের মানসপুত্র দুর্গাপুর ষাটের দশকে ‘ইস্পাতনগরী’ বলে পরিচিতি পেয়েছিল। নব্বই-এর দশক থেকে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় দুর্গাপুর ‘শিক্ষানগরী’ হিসেবেও পরিচিত হয়েছিল। তারপরে ‘(শপিং)মলনগরী’ ও অধুনা বিভিন্ন অত্যাধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্রের দৌলতে ‘স্বাস্থ্যনগরী’ হিসেবে বিখ্যাত।

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পাশের বাঁকুড়া জেলার জগন্নাথপুর গ্রাম থেকে গোপীনাথ চট্টোপাধ্যায় দুর্গাপুরের দামোদরের কাছে নডিহা গ্রামে স্থায়ী বসবাসের জন্য চলে আসেন। গোপীনাথ তাঁর একমাত্র মেয়ে আনন্দময়ীকে নডিহা গ্রামের ভূসম্পত্তি দান করেন এবং তাঁর দৌহিত্র মুখোপাধ্যায় বংশ এখনও নডিহা গ্রামে বসবাস করছেন। গোপীনাথের কনিষ্ঠ পুত্র দুর্গাচরণের নামে দুর্গাপুরের নামকরণ হয়েছে এমনটা অনুমান করা হয়।  

শুধুমাত্র প্রত্নপ্রেমীরাই জানেন যে ১৯৫৪ এবং ১৯৫৭ সালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ-এর সংযুক্ত মহানির্দেশক অধ্যাপক ব্রজ বাসী লাল নডিহা এবং বীরভানপুরে খনন করে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়ের নবপলীয় যুগের নবাশ্মীয় সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কার করেছিলেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার নডিহা এবং বীরভানপুরকে আন্তর্জাতিক প্রত্নস্থলের মানচিত্রে জায়গা করে দিয়েছে। পরিতাপের বিষয় দুর্গাপুরের অধিকাংশ নাগরিক এই গুরুত্ব পূর্ণ ঐতিহ্য সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নন এবং এখানে আবিষ্কৃত প্রস্তর আয়ুধের একটি নিদর্শনও দুর্গাপুরে নেই। নডিহার তদানীন্তন জমিদার অজিতকুমার মুখোপাধ্যায় বীরভানপুরে প্রথম প্রস্তরায়ুধটি সংগ্রহ করেছিলেন এবং যাঁর ঐকান্তিক আগ্রহে বি বি লাল এখানে খনন করেছিলেন এবং মাটির তলা এবং ওপর থেকে প্রায় আড়াই হাজার প্রস্তরায়ুধ, পুঁতি ইত্যাদি সংগ্রহ করেছিলেন, তাঁর কৃতী পুত্র ডঃ শ্যামল মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানা গেছে যে ওই সব সংগ্রহ তিনি কলকাতার কোনও সংগ্রহালয়ে দান করেছিলেন তবে সেখানেও পরে তিনি সেগুলির কোন হদিশ পাননি। নডিহার ‘দক্ষিণায়ন’ নামে যে জায়গায় খনন হয়েছিল পরে সেটি সংরক্ষিত স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধের পর বাংলাদেশী শরণর্থীরা এখানে বসবাস শুরু করেন এবং সেই সংরক্ষিত স্থানেও আধুনিক ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে। ডিপিএল-এর কর্মী আবাসনের মধ্যে অবস্থিত ‘উড ইন্ডাস্ট্রি’-র ভেতর খনন কাজের একটি ট্রেঞ্চ ছিল, সেটিরও কোন সন্ধান পাওয়া যায় না। বি বি লাল দুর্গাপুরে যে প্রাচীন মানব সভ্যতার দাবী করেছেন তা যদি সত্যি হয় তাহলে এই সভ্যতা হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতা থেকে বহু প্রাচীন কারণ এখানে অনেক ধরণের প্রত্ন অবশেষ পাওয়া গেলেও মৃৎপাত্রের কোন নিদর্শন পাওয়া যায়নি। বি বি লাল অনুমান করেছিলেন যে নডিহা এবং বীরভানপুরে পাথরের অস্ত্র বা যন্ত্র তৈরির কারখানা ছিল, প্রাগৈতিহাসিক শিকারীরা এখান থেকে সেগুলি বিনিময় প্রথার মাধ্যমে নিয়ে যেত। দুর্গাপুরের অনতিদূরে পান্ডু রাজার ঢিবি ও গোস্বামীখন্ডের রাজডাঙ্গায় অজয় নদ দিয়ে যে বাণিজ্য চলত তা আজ প্রমাণিত। লৌহ-প্রস্তর যুগে দুর্গাপুরে লোহা গলানো হতো তার প্রমাণ দুর্গাপুরের নির্জন স্থানে কিছুদিন আগেও পাওয়া যেত। ইতিহাসের এমন মজা, বহু হাজার বছর পরে আধুনিক দুর্গাপুরে ইস্পাত এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতির কারখানা হয় এবং এখান থেকে উৎপাদিত দ্রব্যাদি দেশে-বিদেশে চালান যায়।

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলকে সুহ্মদেশ, রাঢ়-দেশ, বর্ধমান ভুক্তি, বজ্জভূমি, কর্ণসুবর্ণ, ক-জঙ্গল, গোপভূম, শেরগড় পরগণা প্রভৃতি বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে দুর্গাপুরের মুচিপাড়া থেকে চার মাইল উত্তরে আঢ়া বা আড়রা গ্রামই রাঢ়াপুরী (দুর্গাপুরের ইতিহাস – প্রমোদকুমার চট্টোপাধ্যায়)। আঢ়া বা আড়া গ্রামে রাঢ়ের অধীশ্বর রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দুর্গাপুরের মুচিপাড়া থেকে মলানদীঘি হয়ে শিবপুর যাওয়ার পথে আড়া গ্রাম। আনুমানিক ১২শো শতাব্দীতে নির্মিত উড়িষ্যা রেখ দেউলের আদলে তৈরি রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য। এটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ কর্তৃক সংরক্ষিত। আড়া গ্রাম অত্যন্ত প্রাচীন গ্রাম। গ্রামের অভ্যন্তরে এখনও কিছু বৌদ্ধ ও জৈন মূর্তির ভগ্নাবশেষ এবং কয়েকটি প্রাচীন মন্দির আর একটি দর্শনীয় জমিদার বাড়ি আছে যার নাম চার আনির জমিদার বাড়ি।

মধ্যযুগে জগন্নাথধাম বা দাক্ষিণাত্য যাওয়ার পথে দুর্গাপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান বলে পরিগণিত হতো। ভৌগোলিক কারণে দুর্গাপুর আশেপাশের অঞ্চল থেকে উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় এটি কৌশলগত কারণেও প্রাগৈতিহাসিক মানুষ থেকে শাসক, বণিক, তীর্থযাত্রী, ব্রিটিশ সার্ভেয়ার সবার কাছে আকর্ষণীয় ছিল। জৈন ধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্কর মহাবীর, যাঁর অপর নাম বর্ধমান, রাঢ় অঞ্চলে ধর্ম প্রচার করেছিলেন ফলে এই অঞ্চলে জৈন ধর্মের প্রাবল্য বেশি। পশ্চিমা ব্যবসায়ীদের আধিক্যও এর প্রচারের একটা কারণ। সপ্তগ্রাম বন্দর বৌদ্ধদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই দুর্গাপুর ও তার আশেপাশের অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব এখনও বিদ্যমান – রাঢ় অঞ্চলে ধর্ম্মরাজ পুজো তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। কাঁকসা তহশীলের বিদবিহার গ্রাম এবং বুদবুদ থানার ভরতপুর বৌদ্ধবিহার এই প্রমাণকে আরও দৃঢ় করেছে। দুর্গাপুর থেকে বাঁকুড়া হয়ে দাক্ষিণাত্য যাওয়ার যে রাস্তা তার ওপর নির্দিষ্ট দূরত্বে জৈন বা বৌদ্ধ মন্দির এবং ভান্ডার স্থাপিত হয়েছিল তীর্থযাত্রী ও বণিকদের সুবিধার্থে যেমন শের শাহের আমলে স্থাপিত গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে নির্দিষ্ট দূরত্বে ‘চটি’ স্থাপিত হয়েছিল।

বৌদ্ধধর্মের ক্ষয়িষ্ণু পর্বে ইলামবাজার ও সন্নিহিত অঞ্চলে তন্ত্র সাধনার জোয়ার আসে। জয়দেব-কেন্দুলী এবং সন্নিহিত অঞ্চলে আউল-বাউল আখড়ায় এর রেশ এখনও পাওয়া যেতে পারে। দুর্গাপুরের বর্তমান মানচিত্রের বাইরে বৃহত্তর দুর্গাপুরের দিকে যদি নজর দেওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে পশ্চিমবঙ্গের অনেক অঞ্চলের মত এখানেও প্রত্ন ও পুরাসম্পদের কোন অভাব তো নেই-ই বরং বহু বিখ্যাত জায়গার থেকে বেশিই আছে। স্বাধীনতা লাভের পর ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ-এর কাজের পরিধি কমেছে কিন্তু কাজের প্রসারতা বা গুণগত মান বৃদ্ধি পায়নি। এই অঞ্চলে প্রাচীন স্থাপত্যের বহু নিদর্শন কিছুদিন আগেও দৃশ্যমান ছিল কিন্তু অনাদরে অবহেলায় বেশির ভাগ নিদর্শনই হারিয়ে গেছে বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে। একেবারে হালে সিটি সেন্টারে ভাগ্যক্রমে আবিষ্কৃত সুড়ঙ্গটির কথাই ধরা যাক। আধুনিক যুগের এই আবিষ্কার সাধারণ মানুষের মনে দারুণ উৎসাহ সৃষ্টি করেছিল। আপামর জনসাধারণকে পুরাতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্ব সম্বন্ধে আগ্রহী করে তোলার এই ছিল সুবর্ণ সুযোগ। একজন ছদ্ম ইতিহাসকার দুর্গাপুরের ইতিহাস লিখে উপকার করতে গিয়ে একটি প্রাকৃতিক গুহাকে উত্তরবঙ্গের ভবানী পাঠকের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে যে অতলান্তিক ভুল করলেন সেটা অন্তত শোধরানো যেত। কিন্তু আদতে কি হল? ভারতবর্ষে যা এখন দস্তুর তার থেকে আলাদা কিছু নয়। দন্ডমুন্ডের কর্তাদের সঙ্গে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কয়েক কোটি টাকার হাতবদলে সুড়ঙ্গটারই হাতবদল হয়ে গেল! হায় রে দেশীয় ঐতিহ্য, হায় রে দেশপ্রেম! রং বদলায়, স্বভাব বদলায় না। এক প্রয়াত ঐতিহাসিক দুর্গাপুরের একটি প্রাচীন পুকুর খনন করিয়ে একটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি পেয়েছিলেন, কালক্রমে সেটি একটি ইস্কুলে ঠাঁই পায়। ভাগ্যের এমন পরিহাস সেই ইস্কুলের তদানীন্তন হেডস্যার অবসর গ্রহণের সময় ওইটিকেও বিদায়কালীন উপহার মনে করে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রেখেছেন। অত্যন্ত বেআইনী কাজ, কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে, ইত্যাদি। অমূল্য জাতীয় সম্পদের প্রতি আমাদের প্রবাদপ্রতীম উদাসীনতাই এর জন্য দায়ী। আমরা আত্মবিস্মৃত জাতি এবং আমাদের ঐতিহ্যের প্রাচুর্য আমাদের চোখে ঠুলি পরিয়েছে।

দুর্গাপুরস্থ এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে অবিশ্বাস্য রকম প্রাচীন ঐতিহ্য ও উৎসব এখনও বিদ্যমান যা ‘হেরিটেজ ট্যুরিজম’ জমিয়ে দিতে পারে, স্থানীয় ভাবে এবং সামগ্রিক ভাবে অর্থনীতির হাল ফেরাতে পারে। বামুনাড়া, গোপালপুর, আড়া, কুলডিহা, মলানদিঘী, ইছাই ঘোষের দেউল, শ্যামারূপার গড়, নডিহা, বীরভানপুর, সগড়ভাঙ্গা প্রভৃতি গ্রামে প্রাচীন স্থাপত্য ও ধর্ম্মরাজ পুজো, চড়ক-গাজন ইত্যাদি অবশ্য দ্রষ্টব্য।

 দুর্গাপুরের দু’টি প্রাচীন মূর্তি-ভাস্কর্যের কথা বলে এই আলোচনায় দাঁড়ি টানতেই হবে। বামুনাড়া (বামুন-আড়া) গ্রামের মাঝখানে ভুবনেশ্বর মন্দির সংলগ্ন একটি পুকুরের পাড়ে কয়েকটি ভগ্নমূর্তি রয়েছে যার মধ্যে আকর্ষণীয় হলো নৃত্যরত অষ্টভূজ নটরাজের মূর্তি। একটি আয়তাকার ল্যাটেরাইট পাথরে খোদিত অপূর্ব এই মূর্তি, যার আয়তন ৭৫ সেমি X ৪২ সেমি। পাদপীঠে বৃষ লাঞ্ছন, নৃত্যরত মূর্তির ওপরের হাতদু’টি যোগমুদ্রায় মুষ্টিবদ্ধ; আর নিচের হাতে রয়েছে ডমরু ও অক্ষমালা। ডানদিকের একটি হাত কনুই থেকে ভাঙ্গা – মনে হয় এই হাতে ছিল ত্রিশূল। বাঁ দিকের সবথেকে নিচের হাতে রয়েছে কমন্ডুল এবং তার ওপরের হাত দুটি ভাঙ্গা। বৃষের দু’পাশে শিবের দুই অনুচর দাঁড়িয়ে। শিবমূর্তির মাথায় জটাজুট ও গায়ে বিচিত্র অলংকার। ফলকের ওপরের দু’পাশে দু’টি উড়ন্ত গান্ধর্ব মূর্তি খোদিত। বিশেষজ্ঞরা শিল্পরীতির বিচারে এটিকে গুপ্তোত্তর যুগের বলে অনুমান করেন। 

বীরভানপুরের শঙ্খেশ্বরীতলায় রয়েছে দুর্গাপুরের অন্যতম আকর্ষণ – ব্যাসাল্ট পাথরে তৈরি একটি প্রাচীন সূর্যমূর্তি – একটি অত্যন্ত পুরনো লতানে তমাল গাছের নিচে ৩`৬`` x ২`২`` x ১`৯`` মাপের মূর্তিটি রাখা আছে। মূর্তিটিকে যত্ন নিয়ে দেখলেই বোঝা যায় যে বিভিন্ন ভগ্নাংশ জুড়ে এটিকে একটি সম্পূর্ণ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে – অনুমিত মূর্তির ওপরের অংশটি একটি বিষ্ণুমূর্তির অংশ এবং বাকি অংশটি সূর্যমূর্তির অংশ।

[ঋণ স্বীকার: সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দুর্গাপুরবাসী, রাজীব গরাই, সন্ধিৎসা সম্পাদক সুভাষ ঘোষাল, ডঃ ত্রিপুরা বসু, রথীন রায়, ডঃ গোপেশ কুমার দত্ত, তারাপদ সাঁতরা, ডেভিড ম্যাকাচ্চন, যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়]

{ছবি সৌজন্যে লেখক স্বয়ং}

(www.theoffnews.com - Durgapur archaeology)


রণজিৎ গুহ, লেখক ও সমাজকর্মী, দুর্গাপুর:

(লেখক প্রাক্তন ইস্পাত কর্মী)

এখন বছরের প্রতিটি দিনই কোনও না কোনও দিবস হিসাবে পালিত হয়। হ্যাংলা দিবস, বুভুক্ষু দিবস, টমেটো দিবস,গালি দিবস, চপলতা দিবস, অট্টহাসি দিবস, শৃগাল দিবস, প্রজাপতি দিবস। আবার কবিতা দিবস,পুস্তক দিবস, সঙ্গীত দিবস, বন্ধুত্ব দিবস, ভালবাসা দিবস এসবও আছে। শিশু দিবস,বাল্য দিবস, যুব দিবস, নারী দিবস, প্রবীণ দিবস, ক্রীড়া দিবস, যোগ দিবস ইত্যাদিও পালিত হয়। এত এত দিবস ৩৬৫ দিনে কুলিয়ে ওঠা যায় না। একই দিনে দুটো বা তিনটে দিবস পালন করতে হয়। যেদিন স্বাক্ষরতা দিবস সেদিনই ফিজিওথেরাপি দিবস। যেদিন শরনার্থী দিবস সেদিনই প্রাচীন অট্টালিকা দিবস। কিছু দিবস আন্তর্জাতিক। ইউএনও বা ইউনেস্কো কিংবা অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ঘোষণা করে। সারা বিশ্বে পালিত হয়। কিছু কিছু দিবস দেশজ। শিক্ষক দিবস বা চিকিৎসক দিবস একেক দেশে আলাদা আলাদা দিনে পালিত হয়। আবার শ্রমিক কর্মচারী দিবস বিশ্বের সব প্রান্তে ১লা মে পালিত হয় অথচ সে হিসাবে এই দিনটির ঘোষণা সরকারি ভাবে কেউ করেনি। কিন্ত এক শ্রমিক আন্দোলনের স্মৃতিতে পালিত হয়ে আসছে। আমিষ ভোজীদের জন্য নির্দিষ্ট দিন আছে কিনা আমি জানি না, তবে বিশ্ব জুড়েই নিরামিষ দিবস পালিত হয়। পর্বত দিবস আছে। দ্বীপ দিবস আছে। নদী দিবস, সাগর দিবস আছে আবার আলাদাভাবে জল দিবসও আছে।  পর্যটন দিবস বা প্রতিবেশী দিবস আছে। বাবা দিবস, মা দিবস, ভাই দিবস, ভগিনী দিবস এমনকি ঠাকুর্দা ঠাকুমা দাদু দিদিমা দিবসও আছে। পুলিশ দিবস, সৈন্য দিবস যেমন পালিত হয় তেমনই নৌযান দিবস এবং বিমান দিবসও পালিত হয়।মাতৃদুগ্ধ দিবস যেমন আছে আলাদাভাবে, মাতৃত্ব দিবস ও অন্তসত্ত্বা দিবসও পালিত হয়। বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস আছে, আবার আলাদা আলাদা স্প্যানিশ, ফরাসি, আরবিক ভাষা দিবস আছে। অনেক অসুখ বিসুখ এর জন্যও নির্দিষ্ট দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্ব মধুমেহ দিবস, কর্কট রোগ দূরীকরণ দিবস, হৃদপিণ্ড দিবস। সে না হয় নানান দিবস পালিত হল। কিছু হৈ-হুল্লোড়। শপথ গ্রহণ, আলাপ আলোচনা। জন সচেতনতা। সেসব মন্দ কি! সামান্য গোলমালে পড়ি যখন দিবস পালনে উৎসাহী কেউ হোয়াটসঅ্যাপে শুভেচ্ছা পাঠায় 'হ্যাপ্পি অটোমোবাইল ডে' বা 'হ্যাপ্পি পরিবহন দিবস'। এই শুভেচ্ছা নিয়ে আমি কি করব বুঝতে পারি না। সম্পর্কে ভাইপো মেসেজ পাঠালো-

"জেঠু প্রবীণ দিবসের প্রণাম নিও।" যাক তবু একটা দিন জেঠুকে মনে পড়েছে। ও হরি পরে জানলাম আশেপাশে পরিচিত কোনও বুড়োর সাথেই ভাব ভালোবাসা নেই তাই দিবস উদযাপনে জেঠু ভরসা।

অনেকেই বলেন এই সব দিবস পালন ইদানিংকার অনাবশ্যক বিলেতি ঢঙ। শুভেচ্ছা পত্র বিক্রি করার কৌশল। অনেকে বেশ বিরক্ত। সম্বৎসর খোঁজ নেই বছরে একদিন বাবা দিবস বা মা দিবস। যত আদিখ্যেতা। ন্যাকামি। আমাদের সমাজে দিবস পালন অবশ্য নতুন কিছু নয়। সে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, শিখ, খৃষ্টান যে ধর্মেরই হোক সকলেই বছরভর নানা দিবস পালন করে আসছে। প্রচলিত ধর্মাচরণে যারা মোটেও আগ্রহী নন তাঁরাও দেশাচার লোকাচার হিসাবে কিছু দিবস পালন করে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। অবশ্য এই দিবসগুলি অধিকাংশ পালিত হয় নির্দিষ্ট তারিখের বদলে তিথিতে।বিশ্বকর্মা পুজো যা কিনা বলা যেতে পারে মিস্ত্রি দিবস কিংবা বড়দিন পালিত হয় নির্দিষ্ট তারিখে। মহরম শোকদিবস হিসাবে পালিত হয় তিথি অনুযায়ী। ইস্টার বা গুডফ্রাইডের সেভাবে নির্দিষ্ট তারিখ নেই। বুঝে না বুঝে কতজনাই যে হ্যাপি মহরম হ্যাপি ইস্টার জানাচ্ছে! বিজয়া দশমীকে শুভেচ্ছা দিবস বা কোলাকুলি দিবস বলা যেতেই পারে। হেপি বিজয়া এখন বেশ চল কথা। তাই বলে এক বঙ্গসন্তান আরেক বাঙালিকে হ্যাপি বেঙ্গলি নিউ ইয়ার্স বলে শুভেচ্ছা জানান তা একেবারেই অসমীচীন। ভাই দিবস জামাই দিবস বেশ সুপরিচিত। মুলো ষষ্ঠী কৌশিকি অমাবস্যা গুরু পূর্ণিমা এসবতো দিবস পালনই। দশহরা তো নদী দিবসের নামান্তর। কিংবা নবান্ন শস্য দিবস। শ্রীপঞ্চমী কি সঙ্গীত দিবস বা বুদ্ধপূর্ণিমা নাস্তিক দিবস বা উপলব্ধি দিবস? নারীবাদীরা মানবেন কিনা জানি না রাখিবন্ধন তো ভগিনী সুরক্ষা দিবস। দীপাবলি বিজয় দিবস বা প্রদীপ দিবস। অরন্ধন দিবসের চল বহুকালের। সেকি গৃহিণী বিশ্রাম দিবস নাকি জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ দিবস। ইদানীং কালে এদেশে দিবস ঘোষণা ও পালন কিছু কম নয়। কুষ্ঠ দিবস, অস্পৃশ্যতা বিরোধিতা দিবস কিংবা সদ্য সদ্য স্বচ্ছতা দিবস, কন্যাশ্রী দিবস এখন সরকারের উদ্যোগে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিলেতি ঢঙে মা দিবস বাবা দিবস পালনকে আমরা ঠাট্টা ইয়ার্কি করতেই পারি। তবে প্রিয়জনের জন্ম অথবা মৃত্যু দিনে স্মরণ করাতো সংস্কার বা পরম্পরা। এই যে পুজোর আগে মহালয়া সেতো প্রকৃতপক্ষে আমাদের পূর্বপুরুষদের জন্য উৎসর্গিত দিবস। স্মরণ বা কৃতজ্ঞতা দিবস বলা যেতেই পারে।যেমন খুশী সমারোহে যে কোনও দিবস পালন করতে চান করুন কিন্তু খুশিতে ডগমগ হয়ে হেপ্পি মহালয়া বলে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠাবেন না। আমার আশংকা কিছু দিন পরে হয়তো ২৫শে বৈশাখ বা ২২শে শ্রাবণ হ্যাপি রবীন্দ্র দিবস শুভেচ্ছা আদান প্রদান শুরু হয়ে যাবে।

(www.theoffnews.com Mahalaya day)