Articles by "চলতি পথের আঁকিবুঁকি"
Showing posts with label চলতি পথের আঁকিবুঁকি. Show all posts

শ্বেতা সরকার, লেখিকা, ইন্দা, খড়গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর:

ম্যানগ্রোভ অরণ্যের আদিম হাতছানি থেকে কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ে ট্রেকিং! প্রকৃতির অকৃপণ দানে পরিপূর্ণ ঈশ্বরের দেশ কেরালা। সুন্দরী কেরালার এমনই একটি মনোমুগ্ধকর পর্যটন কেন্দ্র হলো পুভার আইল্যান্ড। আরব সাগর এবং নেইয়ার নদীর মোহনায় অবস্থিত একটি ম্যানগ্রোভ অঞ্চল হলো এই পুভার দ্বীপ। কেরালার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই দ্বীপ আসলে একটি মাছ ধরার গ্রাম এবং বিশ্বের বিরল স্থানগুলির মধ্যে একটি যেখানে সমুদ্র, নদী, হ্রদ এবং সৈকতের সঙ্গম দেখতে পাওয়া যায়।

প্রাচীন কালে এই অঞ্চলের একটি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পাওয়া যায়। এই অঞ্চল একসময় মশলা, চন্দন, হাতির দাঁত এবং কাঠের জন্য একটি প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল।

যারা পুভার আইল্যান্ডেই থাকতে চান তারা পেয়ে যাবেন এই মায়াবী প্রকৃতির কোলে বিভিন্ন বিলাস বহুল রিসর্ট অথবা কেরালার রাজধানী শহর ত্রিভান্দ্রম থেকে সড়কপথে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যাবে পুভার আইল্যান্ডে।

এই দ্বীপ গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ুর অন্তর্ভুক্ত ফলে সারা বছরই এখানে মনোরম আবহাওয়া থাকে। তবে এই দ্বীপ দেখার সর্বোত্তম সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ কারণ এই সময় আবহাওয়া শীতল এবং শুষ্ক থাকে। অন্য দিকে এই সময়টি কেরালায় পর্যটনের সর্বোচ্চ মরসুম হওয়ায় এই সময়ে প্রচুর ভিড় এবং উচ্চ মূল্য হয়। তাই ভিড় এড়িয়ে নিরালায় শান্তিপূর্ণ ছুটি উপভোগ করতে চাইলে, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হলো পুভার দ্বীপে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। কেরালায় পর্যটনের জন্য এই সময় অফ-সিজন হওয়ায় পর্যটকেরা কিছুটা স্বল্প মূল্যের সুবিধা পান। কিন্তু বর্ষার মরসুম অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধ্বসের কারণে পুভার দ্বীপ পরিদর্শন যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। 

পুভারের প্রবেশ পথে পৌঁছে স্পিড বোটের টিকিট কেটে প্রায় আধঘন্টা স্পিডবোটে ভেসে চলার পথ  আসলে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার যাত্রা পথ। ম্যানগ্রোভের শ্যামল শোভায় চোখের বিশ্রাম নিতে নিতে পথে পড়বে পরিযায়ী পাখি ও নারিকেল গাছের সৌন্দর্য। নদীর খাড়িপথ পেরিয়ে এসে সমুদ্র সৈকত বা গোল্ডেন বিচের দেখা মেলে। তবে বালির সোনালী রঙ দেখতে হলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। নির্জন সমুদ্র সৈকতে ঢেউ গুনতে গুনতে পর্যটকেরা নারকেলের জলে গলা ভেজাতে পারেন ও সামুদ্রিক মাছ ভাজার স্বাদ নিতে পারেন। সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের শ্যামলিমা মনের মণিকোঠায় সঞ্চয় করে আবার ফেরার পথে বোট যাত্রা। দশটা পাঁচটার পাকদণ্ডী জীবনে একমুঠো ক্ষুদকুঁড়ো সঞ্চয় হয়ে থাকে এই সোনালী বেলাভূমির যাত্রাপথ। 

(www.theoffnews.com Poovar Island Kerala travel)


শ্বেতা সরকার, লেখিকা, ইন্দা, খড়গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর:

ঈশ্বরের দেশ কেরলে প্রকৃতির মোহিনী রূপের ডালি মুন্নার। চা বাগান সমৃদ্ধ মুন্নারে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ গালিচায় মোড়া ঢেউ খেলানো পাহাড়, মেঘ বৃষ্টির হাতছানি আর ঝর্ণার ঝংকারে মানসিক পর্যায়ে আনন্দঘন আয়ু বেড়ে যায় দশ বছর। এই মুন্নারের সর্বশ্রেষ্ঠ আকর্ষণ হলো এরাভিকুলাম ন্যাশনাল পার্ক।

৯৭ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে এই আরণ্যক উপন্যাস। যদিও শুরু ২২৭ বর্গ কিলোমিটার থেকে। ত্রিবাঙ্কুরের স্থানীয় রাজা পুঞ্জাতের কাছ থেকে সস্তায় জমি নিয়ে ইউরোপীয় পর্যটক কর্নেল ডগলাস হ্যামিল্টন ও জে ডি মুনরো ১৮৭৯ সালে এখানে স্থাপন করেছিলেন নর্থ ট্রাভাঙ্কুর প্লান্টেশন অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল সোসাইটি। ১৮৯০ সাল নাগাদ এখানের উঁচু অংশে লাগানো হয়েছিল চা গাছ। পাশাপাশি কফি, সিংকোনা ও ইউক্যালিপটাস—অবশ্যই স্বাভাবিক উদ্ভিদকে কিছুটা ধ্বংস করেই। স্বাধীনতার অনেকগুলো বছর পরে কেরল সরকারের হাতে এই জমি ফিরে এলে ‘কানন দেবন হিলস আইন’, ১৯৭১-এর সাহায্যে স্থানীয়দের মধ্যে তা বন্টনের ব্যবস্থা হয়। এর সাথে যুক্ত হন পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা। সেই পথেই আবার স্বাভাবিক উদ্ভিদ ও চাষবাস ফিরে আসে এবং অরণ্য অংশটি ১৯৭৫ সালে এরাভিকুলাম-রাজামালাই অভয়ারণ্য (Eravikulam National Park) নামে পরিচিত হয়। ১৯৭৮ সালে উন্নীত হয় জাতীয় উদ্যানে।

সম্পূর্ণ পার্কটি বন দফতরের অধীনে। এখানে প্রবেশের সময়: সকাল আটটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত। টিকিট কাউন্টার থেকে বন দফতরের বাসে চড়ে পনেরো মিনিটের পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হবে রাজামালা, এর পর প্রায় দুই কিমি পাকদণ্ডী হেঁটে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর পালা। একদিকে সবুজ গালিচায় ঢাকা পশ্চিমঘাট ধাপে ধাপে নেমে যাচ্ছে সমভূমির দিকে, আর অন্যদিকে পাহাড়ী পথ ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে আনাইমুড়ি চূড়ার দিকে। আনাইমুড়ি অর্থ হাতির মাথা। ২,৬৯৫ মিটার উঁচু দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ বিন্দু হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে এই হাতির মাথার মতো দেখতে চূড়া, প্রকৃতির শ্যামল শোভায় ডুব দিয়ে চার পাঁচ ঘন্টা ট্রেকিং করে চূড়ায় পৌঁছনো যায়। অবশ্যই বন বিভাগ থেকে পূর্বানুমতি নিতে হবে। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মন্টেন-শোলা তৃণভূমির সবচেয়ে বড় অংশটি এই এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত। উচ্চতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্তরে স্তরে জল-জঙ্গল ঘিরে জলজ, স্থলজ উদ্ভিদ আর প্রাণী জড়ো হয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে গড়ে তুলেছে এক বিরাট বাস্তুতন্ত্র এবং প্রকৃতির এক মনমোহনী রূপ। চলার পথে পর্যটকদের স্বাগত জানাবে ছানা পোনা সমেত নীলগিরি তাহর বা থর। নীলগিরি তাহর বা থর হলো পশ্চিমঘাট পর্বতের একটি বিরল এবং বিপন্ন পার্বত্য ছাগল। ছোট, কালো, মোটা চুল এবং মানিযুক্ত এই বিপন্ন ছাগলের সংখ্যা প্রায় ৭৫০ টি । এই উদ্যানটি এদের আবাসস্থল। নীলগিরি তাহরের প্রজননের মরসুম ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত পার্কটি বন্ধ থাকে, এই বিপন্ন প্রজাতির সংরক্ষণের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এরা মানুষের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত এবং শান্ত প্রকৃতির তাই ডোন্ট কেয়ার মনোভাব নিয়ে ছানা পোনা সমেত নিশ্চিন্তে পর্যটকদের ফটোগ্রাফির মডেল হয়ে যায়। নীলগিরি তাহর এবং নীলগিরি মার্টেন সহ পার্কে মোট ৪৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে ১৭ টি পশ্চিমঘাটের স্থানীয়। মোট একশত তেত্রিশ প্রজাতির পাখি রয়েছে যার মধ্যে প্রায় এগারোটি প্রজাতি পশ্চিমঘাটে স্থানীয়। ইরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান প্রজাপতির জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলে প্রায় একশো প্রজাতির প্রজাপতি শিক্ষাবিদরা চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে মাত্র ১১ টি পশ্চিমঘাটের স্থানীয়। এছাড়াও রয়েছে একুশটি প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে যার মধ্যে ১৭ টি ইরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যানের প্রাণীজগতে স্থানীয় এবং বিরল প্রজাতির।

 চড়াই পথে হাঁটতে হাঁটতে আর ক্যামেরায় একের পর এক ছবি তুলতে তুলতে একটু এগোলেই দেখা মিলবে স্ফটিক স্বচ্ছ জলরাশির লাক্কাম জলপ্রপাতের সাথে। লাখাম বা লাক্কাম জলপ্রপাত একটি প্রাকৃতিক পশ্চাদপসরণ। এছাড়াও অনেক ছোট ছোট জলধারা এই পাহাড়ের গা বেয়ে পাম্বার নদী হয়ে পেরিয়ার ও কাবেরী নদীকে পুষ্ট করেছে। লাক্কাম জলপ্রপাতের হিম শীতল জলে হাত মুখ ধুয়ে ক্লান্তি জুড়িয়ে আবার চড়াইয়ের পথে হাঁটা শুরু। এরপর বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই নীলা কুরিঞ্জির বাগান।

প্রকৃতির বিস্ময় এই নীলা কুরিঞ্জি ফুল যা বারো বছরে একবার ফোটে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩০০ থেকে ২৪০০ মিটার উঁচু পাহাড়ের ঢালে ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার উচ্চতায় এই বন্য ফুল জন্মায়। ফুলটি গন্ধহীন এবং এর কোনও ওষধি মূল্য নেই। বেগুনি-নীল নীলাকুরিঞ্জি ফুলের নাম অনুসারে নীলগিরি বা "নীল পর্বত" নামকরণ হয়েছে। বহুবর্ষজীবী গুল্ম জাতীয় এই গাছটি সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়, কখনও কখনও ১৮০ সেন্টিমিটারেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। কিছু বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদের একবারই ফুল ফোটে, বীজ হয় এবং মারা যায়। এই বীজ থেকে উদ্ভিদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্ম হয়। এই জাতীয় গাছগুলি মনোকারপিক নামে পরিচিত। মনোকারপিক উদ্ভিদে পরিপক্কতা অর্জনের পরেই ফুল ফোটে। বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে এই সময় ভিন্ন ভিন্ন হয়। আমাদের পরিচিত উদ্ভিদের মধ্যে বাঁশ হল মনোকারপিক উদ্ভিদ যা পরিপক্ক হতে এবং ফুল হতে ৪০ বছরেরও বেশি সময় নেয়। কুরিঞ্জিও এই জাতীয় উদ্ভিদ। ভারতে অন্তত ছেচল্লিশটি প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়। নীলাকুরিঞ্জি ১২ বছরের মধ্যে পরিপক্ক হয় এবং প্রতি ১২ বছর পর পর ফুল ফোটে। তবে কিছু প্রজাতিতে পাঁচ বছর বা ষোল বছর পর পর ফুল ফোটে। তাই ফুলে ফোটার দশ মাস পরে বীজ পরিপক্ক না হওয়া পর্যন্ত গাছ বা এর শুকনো ডালগুলির কোনও ক্ষতি যাতে না হয় তা কঠোরভাবে দেখা হয়।

মুন্নারের মুথুভা এবং নীলগিরির টোডাস উপজাতি কুরিঞ্জির ফুলকে শুভ বলে মনে করেন। স্থানীয় উপজাতি মুথুভাস এবং টোডাসের পৌরাণিক কাহিনী এবং সংস্কৃতিতে এই ফুলের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান রয়েছে। বিশ্বাস করা হয় প্রভু মুরুগার একটি আদিবাসী মেয়েকে কুরিঞ্জি ফুলের মালা উপহার দিয়ে বিয়ে করেছিলেন। এই পৌরাণিক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে এই ফুলগুলি প্রেম এবং আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

নীলা কুরিঞ্জিকে পিছনে ফেলে পাহাড়ী পথ বেয়ে পর্যটকেরা এসে পৌঁছবেন তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া অঞ্চলের শেষ প্রান্তে। যেখানে গোটা গোটা অক্ষরে বোর্ডে লেখা "HERE IS THE LIMIT", যা বাংলা তর্জমায়, 'এখানেই শেষ প্রান্তর'l টেবিলের মতো সমতল একটি জায়গা। যার প্রান্তে দাঁড়িয়ে মনে হয়, 

"স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর--

এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে।"

(www.theoffnews.com Kerala Eravikulam National Park Neelakurinji)


মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও লেকচারার, আহমেদাবাদ:

ঝাঁসির খুব কাছেই মানে ১৮ কিলোমিটার দূরের শহর ওরচা। গাড়িতে আধ ঘণ্টায় দিব্যি পৌঁছে যাওয়া যায় মধ্যপ্রদেশের এই ছোট্ট জায়গাটিতে। বুন্দেলরাজ রাজা রুদ্রপ্রতাপের তৈরি ওরছা ফোর্ট দেখতে দেশী বিদেশী ট্যুরিস্টদের ভিড় লেগেই আছে। গোয়ালিয়র এয়ারপোর্ট থেকে নেমে ঝাঁসি হয়ে অনায়াসে চলে আসা যায় ওরছায়।

বেতোয়া নদীর ধারের ছোট্ট জায়গাটির নাম কেন ওরছা সেটা ব্যাখ্যা করলেন গাইড ভদ্রলোক, একদম গোড়ায় জায়গাটির না সামনে না পিছনে কোনও নির্দিষ্ট পথ ছিল, তার থেকেই নাম নাকি ওরছা। রুদ্রপ্রতাপ যখন মহারাজ, ভারতবর্ষ তখনও ইব্রাহিম লোধীর অধীনে, এরপর আসেন বাবর মানে মোঘলদের রাজত্বকাল, সেসময় কথিত কোনও সিদ্ধ পুরুষ মহারাজ রুদ্রপ্রতাপকে বলেন, এ জায়গার ভার নাও। জায়গার তখনও কোনও নির্দিষ্ট নাম নেই। মহারাজ জানতে চান কি নাম রাখবেন এমন জায়গার? সিদ্ধ পুরুষ বলেন "ভোরে উঠে তোমার মুখ নিঃসৃত প্রথম শব্দ হবে এ জায়গার নাম।" যথারীতি বেমালুম ভুলে যান মহারাজ, সকালে উঠে বুন্দেলি ভাষায় পোষা কুকুরকে বলেন "ওর ছা " মানে "উঠে পড়", সেই থেকেই নাকি জায়গার নাম "ওরচা।" এখানে নিজের রাজধানী স্থানান্তরিত করেন রাজা রুদ্রপ্রতাপ, শুরু হয় দুর্গ নির্মাণ।

এবার আসি আমার কথায়। ঝাঁসির থেকে বেশ দেরিতেই বের হলাম কারন আমার ধারণায় ওরচা সবুজে ঘেরা গ্রাম, একটাই পুরোনো ফোর্ট দেখে, চারপাশ ঘুরে, রেস্ট নেব বাকিবেলা। ওমা! রাস্তাতে দেখি পুলিশ গাড়ি ঘুরিয়ে দিচ্ছি, আজ নাকি গোবর্ধন উৎসব, কাতারে কাতারে ট্রাক, বাসে চেপে গাঁয়ের লোক আসছে এখানকার বিখ্যাত রাম রাজার মন্দিরে। সরু রাস্তা, গাড়ি ঢুকতে দিচ্ছে না।

এক জায়গার পর থেকে, সব গাড়ি পার্ক করে লোকে হেঁটে বা অটোতে যাচ্ছে।

অতএব একটা অটোর সাথে কথা হল, সে সাতশো টাকা নেবে ওরচা ঘুরে দেখাবে। প্রথমে রাম মন্দিরে ছেড়ে দিল। তারপর সে, সেই যে গেল আর আসে না!

অতএব মন্দিরে আমি একাই যুদ্ধ করে দর্শন করলাম। কর্তা যথারীতি জুতো সামলে গেলেন।আমার মোজাটা ফুল, পাতা মিষ্টিতে চ্যাটচ্যাটে হয়ে গেল। কোনও রকমে মানুষ, বিশাল বিশাল গরু সরিয়ে অটোয়ালাকে ফোন করে বুঝলাম, সে এমন জায়গায় আছে আসতে পারবে না। তাই হেঁটেই ঢুকলাম ওরচা ফোর্ট দেখতে। নিলাম একজন গাইডকেও।

দুর্গের তিনটি মহল। রাজমহল, শিসমহল আর জাহাঙ্গীরমহল। কালে কালে তৈরি হয়েছে এই দুর্গ, প্রথমে শুরু হয় রাজমহল।

রুদ্রাপ্রতাপের পুত্র ভারতী চাঁদ রাজমহল নির্মাণ শেষ করেন। এই মহলের দুটি ভাগ, তিন দিকে পাঁচ তলা বিল্ডিং আর এক দিকে চার তলা। রাজার বসার জায়গা, পাশেই রয়েছে মন্ত্রীর বসার জায়গা, একটু দুরে এক পাশে আছে শৌচালয়। 

ভারতী চাঁদ বেশিদিন না বাঁচায় তার ভাই মধুকর শাহ সিংহাসনে বসেন। পরবর্তী কালে তিনি এই ফোর্টকে আরও  বিস্তার করেন। বানান রাজমহলের মধ্যেই রানীর মহলও। রানীর জন্য তৈরি হয় স্নানাগার যেখানে গরম আর ঠান্ডা জলের আলাদা জায়গা আবার মেশাবারও ব্যবস্থা আছে। 

মধুকর শাহ ছিলেন কৃষ্ণ ভক্ত তাই তার মহলে সারা দেওয়াল ছাদ জুড়ে অপূর্ব চিত্রকলা, কোথাও গিরি গোবর্ধন রূপ, কোথাও গোপীদের সাথে লীলা, এছাড়াও বিষ্ণুর দশাবতার, সমুদ্র মন্থনের চিত্র নানান জৈবিক রঙে আঁকা, প্রচুর নষ্ট হলেও এখনও যা আছে দেখবার মতো। ছাদ জুড়ে কার্পেটের ডিজাইন। এছাড়া একপাশে ছবি আছে তন্ত্র সাধনার, বোঝা যায় এসবের বেশ ভালই চর্চা ছিল সেযুগে এই অঞ্চল জুড়ে। একটি চিত্রে আছে অদ্ভুত দর্শন এক প্রাণী, গাইড বুন্দেলি ভাষায় যে নামটি বললেন সেটি মনে রাখতে পারিনি। হাতির মত সিং, সিংহের মত চেহারা আবার কানের পাশে দুটি ডানা, যদিও আমার মনে হয়েছে মহারাজের শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীকী ব্যবহার ওই জন্তুর চিত্র, এছাড়া জাতক কাহিনীও আছে একটি কক্ষে। 

মহারাজ মধুকর শাহের বড় রানী গণেশকুমারি ছিলেন অযোধ্যার মেয়ে, রামচন্দ্রের ভক্ত।

কথিত আছে রাজা  মধুকর শাহ বলেন, "পারলে এখানে এনে দেখাও তোমার শ্রীরামচন্দ্রকে।" রানী সরজু নদীর ধারে জঙ্গলে দীর্ঘ তপস্যা করে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করার সময় শ্রীরামচন্দ্র দেখা দেন এবং আসতে রাজী হন ওরচায়। তবে কিছু শর্তও রাখেন। প্রথম শর্ত ওরছার রাজা থাকবেন একজনই, আর তিনি হলেন শ্রীরামচন্দ্র। তাই আজও ওরচাবাসীরা সবাই নিজেদের রামচন্দ্রের প্রজাই ভাবে।

দ্বিতীয় যেখানে রামচন্দ্র একবার থামবেন বা রাণী তাঁকে নামাতে বাধ্য হবেন সেখান থেকে আর নাড়ানো যাবে না। সেই মত রামচন্দ্র যখন আসেন মহারানীর সাথে তখনও মন্দির বানানো বাকি, ভুল করে রান্নাঘরে শ্রীরামচন্দ্রের  মূর্তিটি সেখানে বসাতেই উনি আটকে যান। তাই দুর্গের বাইরে তৈরি হয় রাজ রাম বা রাম রাজার মন্দির। 

মন্দিরটি ছোট কিন্তু একই মন্দিরে রয়েছে এক দিকে শ্রীরামচন্দ্র আর এক পাশে কৃষ্ণ রাধার যুগল মূর্তিও।

দীপবলির পরের দিন হয় এই গোবর্ধন উৎসব। কার্তিক মাসে বুন্দেলখণ্ডের লোকেরা এক বেলা খান, আর গোবর্ধন উৎসবের দিন সবাই এক গোছা ময়ূরের পালক হাতে আসেন।

গাইডকে জিজ্ঞেস করায় তিনি জানালেন "গিরি গোবর্ধন যখন তুলেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ তখন ছোট বাচ্ছা ছেলে, তাই তাকে সাহায্য করতে দূর দূর গ্রাম থেকে লোক আসে ওই ময়ূরের পালক হাতে নিয়ে।আমাদের সামনেই তারা ঢাক ঢোল বাজিয়ে নাচতে থাকল, কেউ গড় হয়ে প্রণাম করল। বিশাল ভিড়ে মন্দির চত্বরে পা রাখাই ছিল মুশকিল, একই মন্দিরে রাজা রামচন্দ্র দর্শন চলছে সাথে চলছে আর এক পাশে শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার দর্শন ও পুজো। যদিও রামচন্দ্রের নামেই মন্দিরটি, সেই থেকেই বুঝতে পারলাম মহারানী তার আরাধ্য দেবতাকে এনেই ছেড়েছেন শশুর বাড়ীতে।

মহারানী যে কত খানি রামচন্দ্রের ভক্ত ছিলেন সেটি তার মহলে গেলেই টের পাওয়া যায়--- দেওয়ালে রাম সীতার নানান চিত্র, অর্ধেক কালের নিয়মে নষ্ট হলেও এখনও কিছু আছে।

গাইড নিয়ে রাজমহল ঘুরে দেখে দূর থেকেই দেখলাম শিসমহল, বর্তমানে এমপি ট্যুরিজম এর হোটেল, আকাশ ছোঁয়া ভাড়া এক রাতের।

তার পাশেই আছে জাহাঙ্গীর মহল, এই মহল তৈরি করেন মধুকর শাহের পুত্র বীর সিং দেও। তিনি প্রচুর দুর্গ, প্রাসাদ নির্মাণ করেন, ঝাঁসির দূর্গটিও ওনার বানানো। খুবই প্রতাপশালী রাজা ছিলেন, তার দলবল মিলেই জঙ্গলের মাঝে সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার আবুল ফজলকে খুন করেন। আসলে জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে বসাতেই তিনি এই গুম খুন করেন। এরপর বন্ধু জাহাঙ্গীর এসে উঠবেন ভেবে তার নামে তৈরি করেন এই জাহাঙ্গীর মহল। যদিও মাত্র একটি দিনই এ প্রসাদ জাহাঙ্গীর ব্যবহার করেন তার পর থেকে খালি ধোয়া মোছাই হয় কিন্তু কেউ ব্যবহার করেনি আর কখনও।

জাহাঙ্গির মহলের মাটির তলা ওপর মিলিয়ে ২০৬ খানি ঘর আর অপূর্ব কারুকার্য করা তোরণ, স্তম্ভ আজও মুগ্ধ করে। পিছনের দরজার ওপারে আছে ছোট্ট গণেশ মূর্তি, ঢুকেই বিশাল চাতালের মাঝে জলের জায়গা, জাহাঙ্গীরের কোরান পাঠের আগে উজু করার জন্য এমন ব্যবস্থা রাখা হয়। এরপর দোতালায় রয়েছে সুন্দর শয়ন কক্ষে বাতানুকূল ব্যবস্থা, কুলুঙ্গিতে দ্বীপ জ্বালানোর জায়গা, সুগন্ধী আতর জল রাখার জায়গা।

সবচেয়ে চমকপ্রদ হলো, মহলের প্রবেশ দ্বার খানি, দরজার ওপারে পাখির নকশা, নিচে স্বস্তি চিহ্ন, তার নিচে পদ্মফুল। এর মাঝে রিদ্ধি সিদ্ধিকে নিয়ে আছেন গণেশ ঠাকুরও। এছাড়াও নিজের শক্তির আস্ফালনের উদ্দেশ্যে রাজ মহল, জাহাঙ্গীর মহল --সব জায়গায় দরজার ওপরে আছে এক আশ্চর্য মোটিফ, দেখা যাচ্ছে ময়ূর মুখে চেপে ধরেছে সাপকে। 

আসল বক্তব্য হল "রাজা এমনিতে ময়ূরের মতো সুন্দর কিন্তু শত্রু যদি সাপের মত হয় তবে তাকে দু টুকরো করে চিড়ে রেখে দেবেন মহারাজা বীর সিং দেও। এছাড়া প্রধান সদর দরজার বাইরে তিনটে প্লাটফর্ম করা সবচেয়ে উঁচু যদি হাতির পিঠে, মাঝেরটি উটের পিঠে আর সর্বশেষে ঘোড়ার পিঠ থেকে  সম্রাট জাহাঙ্গীরের ওঠা নামা করার জন্য।

দূরে দেখা যাচ্ছে একটি ছোট খাটো সুন্দর প্রাসাদ, গাইড জানালেন ওটি রাই পারভীন মহল। আকবরের আমলে তিনি ছিলেন বুন্দেলখণ্ডের যুবরাজ ইন্দ্রজিতের প্রেমিকা, পরে হোন রাজার খাস উপপত্নী। তিনি ছিলেন রূপে, গানে কাব্য চর্চায় অনন্যা, তাই আকবর স্বভাবতই এমন গুণীকে নিজের কাছে রাখতেই দিল্লী ডেকে পাঠান। সেখানে ভারী সুমিষ্ট ভাষায় রাই পারভীন একটি কবিতা উপহার দেন সম্রাটকে, তাতে লেখা ছিল,

দিল্লিশ্বরকে কি মানায় কারোর উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করা? 

মন প্রাণ দেহ সব কিছুই তিনি যুবরাজ ইন্দ্রজিৎকেই দান করে বসে আছেন যখন তখন তাকে টেনে এনে লাভ কি হবে!

এবার নিজের ভুল বুঝে সসম্মানে সম্রাট আকবর তাকে পাঠিয়ে দেন ওরচায় ,বানিয়ে দেন তার নামে একখানি মহল। 

এরপর গাইড ভদ্রলোক দেখালেন দূরের রাজা রাম মন্দিরের পাশে থাকা চতুর্ভূজ মন্দির। সে মন্দির বহু প্রাচীন, বিষ্ণু মূর্তি রাখা আছে সেখানে। এই মন্দির ছিল সোনার রঙে রাঙানো, বিষ্ণুর চতুর্বাহু তাই মন্দিরের নামও তাই, এর চুড়ো সব হিন্দু মন্দিরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এখানেই কথা ছিল রামচন্দ্রের মূর্তিও রাখা হবে, কিন্তু ওঠানো না যাওয়ায় ঠিক এর কোলে বানানো হয়েছে রাম রাজার মন্দির। এই মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণই পূজিত হন।

গাইড ভদ্রলোক এক হাজার টাকা চাইলেও একটু দরাদরি করে ছশো টাকাতেই রাজী হোন। কিন্তু এতো যত্ন করে দেখালেন যে মনে হল পয়সা উশুল।

একদিনেই ওরচা বেরিয়ে নেওয়া যায়, সন্ধ্যেটি মনোরম, প্রকৃতির কোলে দিনটি কাটিয়ে রাতে থেকে যেতে পারেন এখানকার কোনু হোটেলে।আমরা ছিলাম হোটেল ওরচা প্যালেস, ভীষণ ভালো ব্যবস্থা, বাঙালি এজিএম অল্পবয়সী মেয়েটি (প্রিয়াঙ্কা মুখার্জি) ভীষণ মিষ্টি ব্যবহার করলেন, সাথে সব রকম সাহায্য। ভোর বেলায় বেরিয়ে পড়ব বলে সাতটার আগেই ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে ডেকে নিয়েছিল ডাইনিং হলে। এই হোটেলেই ভুলভুলাইয়া ৩'এর লোকজন উঠেছিলেন, এছাড়া বিয়ের পার্টি, লোকজন নিয়ে থাকার জন্য ঝাঁসী থেকে অনেকেই বেছে নেন ওরচখর এই হোটেলেটি।

পরের দিন খুব ভোর ভোর উঠে সাতটা নাগাদ যাত্রা করেছিলাম দিল্লীর উদ্দেশ্যে। চার ঘণ্টার ড্রাইভ তবে ঠিক সময়ে পৌঁছে যায় এয়ারপোর্ট, ফিরে এলাম আহমেদাবাদ।

এযাত্রায় আমার গল্পটি ফুরোলো, নাতে গাছটি মুড়ালো।

সবাই ভালো থেকো, কেমন!

(www.theoffnews.com Orcha)


মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও লেকচারার, আহমেদাবাদ:

আগেরদিন আগ্রা ঘুরে পা প্রায় পাথরের মতো অবস্থা তবু নতুন জায়গা দেখার আগ্রহে সাত তাড়াতাড়ি উঠে সব সেরে বেরোতে বেরোতে ৯টা বাজল। ব্রেকফাস্টে গরম পুরি (ভুলেও পুরিকে লুচি বলে লুচিকে অপমান করব না) আলুর রসা মানে ঝোলই বেশি আলু খুঁজতে হবে খেয়ে রওনা দিলাম। প্রায় তিন ঘন্টা লাগবে, ইচ্ছে আগে গোয়ালিয়র ফোর্ট দেখে রাস্তায় লাঞ্চ করে ঝাঁসি চলে যাব। কর্তার অফিসের ছুটি কম তাই এমন হ্যারিকেন সফর। আমার অবশ্য যা পাই যতটুকু পাই তাই চেটেপুটে খাই---তাই ঝটিকা সফরেও রাজি। তবে গোয়ালিয়র আরও একবার যেতে হবে পরে।

আগ্রা পেরিয়ে ধোলপুর হয়ে গাড়ী চলেছে, কেমন আস্তে আস্তে প্রকৃতিও পাল্টে যাচ্ছে। পবন হঠাৎ বলে উঠল “ম্যাডাম, আমরা কিন্তু রাজস্থান দিয়ে যাচ্ছি। “চমকে বলি “সেকি ইউপি আর এমপির মাঝে রাজস্থান কি করে এল?”

হাসতে হাসতে পবন বলে “সেটাই তো, একটু খানি রাজস্থান ঢুকে গেছে।“ 

খানিক পরেই একটা নদী আর তার পাশের সবুজ পাহাড় দেখিয়ে বলে উঠল পবন “দেখুন, এবার চম্বল দিয়ে পাস করছি, এখন আর ডাকাত থাকে না, ওদের ছেলে মেয়েরা পরীক্ষা দিয়ে পুলিশের নোকরি করছে। গোয়ালিয়র মধ্যপ্রদেশে কিন্তু ঝাঁসি আবার উত্তর প্রদেশ। আজ আমরা তিনটে রাজ্যই ছুঁয়ে গেলাম।“

প্রায় বারোটা নাগাধ পৌঁছলাম গোয়ালিয়র, বেশ পাহাড়ি রাস্তা পথের পাশে পাহাড় কেটে বানানো বিশাল জৈন ধর্মগুরুদের মূর্তি। সর্বোচ্চ মূর্তিটি ৫৮ ফুট লম্বা, চলন্ত গাড়ী থেকে ভাল ছবি তুলতে পারলাম না। এরপর একটা গোল চক্কর থেকে দু'দিকে দুটি রাস্তা গেছে এক দিকে বর্তমানের রাজা রাজরাদের পুত্র কন্যাদের পড়বার জন্য সিন্ধিয়া স্কুল, মাধব রাও সিন্ধিয়ার প্রতিষ্ঠিত। আর একদিকে গেছে ফোর্টের রাস্তা।

ফোর্টের সামনে, বাইরের রঙ্গীন কারুকার্য স্তব্ধ করে দেয় দর্শকদের, সুবিশাল ফোর্ট, ষষ্ঠ শতাব্দীরও আগে তৈরী হয়েছে। কত হাত বদল হয়েছে সময়ের সাথে সাথে, কখনও এসেছে হুণ রাজ মিহিরকূল, কখনও ঘোরী, গুর্জর, প্রতিহাররা, কখনও রাজপুত তোমার বংশ, কখনও ইব্রাহিম লোদী তো কখনও মুঘল সম্রাট বাবর। এসেছে শের শাহ, হিমু, আকবর থেকে জাহাঙ্গীর, শাহজাহান পরের দিকে ব্রিটিশরা, শেষে  মারাঠারা। 

ফোর্টের ভিতর ঢোকার দুটো গেট –একটা উত্তর পূর্ব দিকে যেখানে হাতির পিঠ থেকে নামার জায়গা মানে হাতি পোল আছে। এখানেই মান সিং তোমারের মহল, সবচেয় ভাল ভাবে সংরক্ষিত। অন্য গেটটি দক্ষিণ পশ্চিমে, বিশাল পাকদন্ডীর পথ, পায়ে হেঁটে আসার। 

ফোর্টে ঢুকেই গাইড প্রথমেই কর্ণ মহল নিয়ে গেলেন ---- 'তোমার' বংশের রাজা কীর্তি সিং তৈরী করেন মহলটি। অনেক ঘটনার সাক্ষী মহলটি, সুন্দর খোলামেলা মহল, বড় বড় লোহার আংটা ঝুলছে ঘরের মাঝেই ছাদ থেকে, ঝুলা লাগানো থাকত প্রথমে কিন্তু কালের নিয়মে কখন যেন সেই আংটা গুলো দিয়ে ফাঁসীর দড়ি ঝুলতে ব্যবহার হতে শুরু হল। 

মুঘলরা জেল আর ফাঁসি ঘর হিসেবে ব্যবহার করেছে এই কর্ণ মহলকে  --- আকবর তার সৎ ভাইকে মেরেছেন, জাহাঙ্গীর বন্দি করে রেখেছিলেন বারো বছরের গুরু গোবিন্দকে, ঔরঙ্গজেবের ভাই মুরাদকে অত্যাচার করে মেরেছেন এই মহলেরই ঘরে। 

ঘরগুলি এমন ভাবে তৈরী যে একটি ঘর থেকেই পর পর সব ঘরের দরজা দেখা যায়, কে আসছে কে যাচ্ছে অনায়াসে লক্ষ্য রাখা সম্ভব।

কর্ণ মহলের বাইরে এক জায়গা রয়েছে যেখানে বাইরে থেকে তোপ ছুঁড়েছিল ব্রিটিশ সেনারা ক্যাপটেন হিউ রোসের নির্দেশে। উদ্দেশ্য ছিল রাণী লক্ষীবাইকে উড়িয়ে দেওয়া।

রানী লক্ষীবাই এসেছিলেন ঝাঁসি থেকে গোয়ালিয়রে সিন্ধিয়াদের কাছে সাহায্য চাইতে, খবরটা বিশ্বাসঘাতক সিন্ধিয়ারাজ ব্রিটিশদের পাচার করেন।

কিন্তু বিধাতার পরিহাসে অল্পের জন্য বেঁচে যান রাণী কারণ ততক্ষণে দুই  কিলোমিটার এগিয়ে গিয়েছিলেন প্রিয় ঘোড়া বাদলের পিঠে চেপে।

দূরে একটা মহল দেখিয়ে গাইড বললেন ওটা গোলা বারুদ রাখার মহল। দূরে টলটল করছে জহর কুন্ড, যুগে যুগে সম্মান বাঁচাতে হিন্দু নারীরা এই পথই বেছে নিয়েছেন। 

এরপর দেখলাম ভিক্রান্ত মহল, কীর্তি সিং এর নাতি, মান সিং তোমারের পুত্র ছিলেন শিব ভক্ত, মুঘলের আক্রমনে তার মহলের ভিতরের প্রতিষ্ঠিত মন্দির ভাঙ্গলেও মূর্তি মাটির নীচে চাপা পড়ে যায়। বর্তমানে মাটি খুঁড়ে খুঁজে পেয়ে এখন মহলের বাইরে রেখে পূজা হয়। 

দূরে ছিল জাহাঙ্গীর মহল আর শাহজাহান মহল, খুবই শোচনীয় অবস্থা, শুনলাম টাকা মঞ্জুর হয়েছে, চারিদিকে ঘাস বসানো হবে। এই চারটি মহলের মাঝের খোলা জায়গা জুড়ে বিশাল সিঁড়ি কাটা জলাধার, যেখান থেকে শ্রমিকদের বউরা সারাদিন খালি ভিস্তা ভিস্তা জল তুলত, প্রাসাদে ব্যবহারের জন্য, শ্রমিকদের মহল বানানোর জন্য। বেরিয়ে আসার আগে ঘোড়াশাল দেখলাম, বাইরে রাখা ব্রিটিশ আমলের তোপখানিও দেখলাম।

এবার ৫০ টাকার টিকিট কেটে ঢুকলাম মান সিং মহলে, এককালের সবচেয়ে প্রতাপশালী রাজা মান সিং তোমার! রাজার আট রাণীর জন্য নাচ, গান শেখার জায়গা বানিয়েছেন অপরূপ কারুকার্যে সাজানো পিলার দিয়ে। নবম রানী মৃগনয়নী গুর্জরী কন্যা, অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ---পাঁচ ভুতের ব্যবহার্য জল তিনি ব্যবহার করতে পারেন না।

তাই একটু দূরে তাঁর নিজস্ব মহল নাম গুর্জরী মহল। বর্তমানে তা মিউজিয়াম, শুক্রবার থাকায় সেটি যথারীতি বন্ধ। মানসিং মহলের কারুকার্য দেখার মতো, মা হাতি কোলে শিশু হাতি নিয়ে দাঁড়িয়ে, এক জায়গায় ড্রাগনের মুখও দেখলাম। গাইড বললেন জনৈক চৈনিক পরিব্রাজককে বিশ্রামের অনুমতি দেন রাজা মান সিং, সে সময় মহল তৈরী হচ্ছে, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন ড্রাগনের প্রতিকৃতি বানিয়ে দেন সেই চৈনিক পরিব্রাজক।

এরপর মাটির নীচে তিনটে তলা পাথুরে সিঁড়ি ভেঙ্গে দেখতে গেলাম ---ঈশ্বরই জানেন কোথা থেকে  মনের জোড় পাই! সে সময় বিধর্মীদের আক্রমনের ভয়ে রাণীদের মহল বেশির ভাগই মাটির নীচে।  ওপরে প্রাঙ্গণ জুড়ে নৃত্যগীত বাদ্য চর্চা, প্রমোদ বিনোদনের ব্যবস্থা কিন্তু বিশ্রাম কক্ষ, ঝুলায় দোলা, স্নানাগার সব কিছুই মাটির নীচে। 

মান্ডুতেও ঠিক এক রকম স্থাপত্য। সুন্দর ইন্টার কমে কথা বলার ব্যবস্থা। পাথরের গায়ে সুগৌল ছিদ্র। এছাড়া আলো হাওয়া আসার সুন্দর ব্যবস্থা, ছোট গর্ত যার চারপাশের ছাপ বলছে সেখানে বৃত্তাকার চাকা ছিল। ঠিক যেন আধুনিক টেবিল ফ্যান। দরজাগুলো এমন ভাবে বানানো যে মাথা নীচু করে ঢুকতে হবে, দুই পাশে তরোয়ালধারী রক্ষী থাকতেন, শত্রু বুঝলে কুচ করে গর্দানটি নামিয়ে দিতেন।

এছাড়া  মাটির নীচের প্রথম তলার পাথরের গায়ের ফুটোয় চোখ রাখলে দূর্গের ঝান্ডা দেখা যায়, ঝান্ডার রং সাদা দেখলে বুঝতেন সময় হয়েছে জহর করবার। একদম নীচে তলায় রাখা জলে ঝাঁপ দিতেন গায়ে আগুন দিয়ে। 

মানসিং মহল থেকে বেরোবার সময়। জানলাম প্রাচীন মন্দিরে রাখা আছে আর্যভট্টের শুন্য আবিষ্কারের শিলালিপি খানি। আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে অনুমতি পেলে দেখা সম্ভব।

নামার সময় থেকে মনে হয় মঘা আর অশ্লেষা এক সাথে হল, বিশাল জ্যাম, পাহাড়ি রাস্তা, স্কুলের দিক থেকে গাড়ী বেরিয়েছে, ঘড়িতে বাজছে দুটো। ঝাঁসি খুব দূর না হলেও ঘন্টা আড়াই লাগবে তাই মাঝপথেই কোন ধাবায় খাব ঠিক করলাম।

যথারীতি ছুটির মরশুম অনেক ধাবাই বন্ধ তায় দেরীও কম হয়নি। তবু একটা খালি পেয়ে ঢুকলাম। পবন ডাল রুটি আর আমরা পনির রুটি অর্ডার দিয়ে বসে আছি, আধ ঘন্টা কেটে গেল—কর্তা আর পবনের অসীম ধৈর্য আমার শরীরে আবার ওটা দিতে ভুলে গেছেন ঈশ্বর! 

উঠে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি তারা সবাই মায় মালিক পর্যন্ত খেতে বসে গেছে। আমায় দেখেই যে যেদিকে পারল উঠে গেছে, মালিক একটা লোক দেখানো হাঁকডাক শুরু করতেই আমি অ্যবাউট টার্ন। বুঝেছি এদের হয় ভাঁড়ে মা ভবানী নয়তো অন্য কোনও সমস্যা আছে। আমার পিছু পিছু পবন আর কর্তাও বেরিয়ে এসেছে ---তখন দেখি গ্যাস সিলিন্ডারের গাড়ী এসে দাঁড়াল। বুঝলাম এতক্ষণে কেন খেতে দিচ্ছিল না ,গাড়ীতে উঠেই গত দিনের মায়াঙ্কের দেওয়া খাবার গুলোর সদগতি করলাম তিনজনে। 

ঝাঁসি পৌঁছলাম প্রায় চারটে, এখানেও দেখি কর্তার অফিসের দুই জুনিয়র ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে। মনে হল ফুল পেয়ে আমার গত দিনের উচ্ছ্বাসের খবর এখানেও পৌঁছে গেছে! হোটেলটা দেখে বেশ ভাল লাগল, ড্রেস ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে চললাম ঝাঁসির ফোর্ট দেখতে।

ওরচার রাজা ভীর সিং বানান ফোর্টটি ষোলশ শতাব্দীতে। ঝাঁসি তখন গ্রাম, মারাঠা সুবেদার রঘুনাথ রাও দেখাশুনো করেন। এরপর গঙ্গাধর রাওয়ের সময় প্রজারা খুশি, ঝাঁসি যেন ফুলে ফেঁপে উঠল। বিঠুরের ব্রাহ্মণ মোরপন্থের মেয়ে মণিকর্ণিকা তাম্বে এলেন এই দূর্গের লক্ষীবাই হয়ে, গঙ্গাধর রাওয়ের স্ত্রী। 

শিবভক্ত গঙ্গাধরের মন্দিরে পুজো করতে যাওয়ার জায়গাটি ঠিক ফাঁসী ঘরের পাশ দিয়ে। সে সময় চুরির শাস্তিও ছিল মৃত্যুদন্ড, রোজ পুজোর সময় ওই আর্ত চীৎকার সহ্য করতে না পেরে স্বামীকে অনুরোধ করে চুরির শাস্তি মৃত্যুদন্ড রদ করালেন। ফলে চুড়ান্ত জনপ্রিয় হোন নতুন রাণী!

তারপর প্রথমে পুত্র দামোদর রাও, পরে স্বামীর মৃত্যুর পরে রানী দত্তক সন্তান অনন্ত রাওকে (পরে নাম হয় দামোদর) নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস অবধি লড়ে যান।

রানীর ছিল দূর্গা বাহিনী, ছিল সেনাপতি জান মহম্মদ, বাবা মোরপন্থ দাঁড়িয়েছিলেন ঢাল হয়ে তাই বারবার ওরচার আক্রমন, গোয়ালিয়রের আক্রমণ রুখেছেন। প্রথমে বাধ্য হন দুর্গ ছেড়ে রানী মহলে যেতে। তবে আবার দুর্গ পুনরুদ্ধার করেন। 

তাঁতিয়া টোপী যে সময় ভেবেছিলেন একসাথে লক্ষীবাই এর দলের সাথে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বেন তার আগেই ব্যারাকপুরে জ্বলে উঠল আগুন, মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে। ফলে সময়ের আগেই লড়াই শুরু হয়, তবু হারতেন না রাণী যদি না নিজের লোকেরাই বিশ্বাসঘাতকতা করত। 

দুই হাতে তরোয়াল নিয়ে লড়েছিল ২৯ বছরের মেয়েটি, চোখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে, ঘোড়ার ওপর চেতনা হারানোর আগে অবধি লড়ে গেছে মারাঠী মুলগী। প্রতিপক্ষ ব্রিটিশ জেনারেল হিউ রোস বাধ্য হয়ে বলেছেন, এত লড়াকু, এত ভয়ঙ্কর যোদ্ধা তিনি অন্তত দেখেননি তার জীবদ্দশায়।

ছ'টা থেকে শুরু হল লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো, অনেক জায়গার থেকেই বেশ ভাল লাগল, ১২৫ টাকা করে টিকিট ৪৫ মিনিট পরে বেশ ঘোরের মধ্যে থেকে শেষে হোটেলে ফিরলাম ।

পরদিন যাব কাছের গ্রাম ওরচায়, বেলা করে উঠলেও চলবে। ভাবলে অবাক লাগে একসময় ওরচা ছিল রাজধানী আর ঝাঁসি অনামী গ্রাম, আর আজ ঝাঁসী স্মার্ট সিটি, সেনাবাহিনীর বেস, আর্মি ইউনিটের নাম হোয়াইট টাইগার --- আর  সেখানে ওরচা এক অনামী গ্রাম! পরবর্তীতে হবে ওরচার গল্প। এখন বাই বাই। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews Gwalior Jhansi Fort)


মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও লেকচারার, আহমেদাবাদ:

ঘড়িতে বাজছে বারোটা, তাজমহলের থেকে ৪০ কিমি দূর ফতেহপুর সিক্রী, যেতে লাগবে ঘন্টা খানেক, ফিরতেও তাই, মাঝে দেখতেও ঘন্টাখানেক। বুঝতেই পারছি লাঞ্চ করতে করতে তিনটে হবেই কিন্তু বছর দশেক আগে এসে সেই যে সিক্রীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম, আজও তা অমলিন। এবার কর্তাকে দেখাব ভেবেই বেশ উত্তেজিত কারণ ইতিহাস তার বেশ প্রিয় বিষয়। গাড়ী থেকে নামতেই দেখি গাইড হাজির, বুঝলাম তাজমহলের গাইড ভদ্রলোক ফোনে খবর দিয়ে দিয়েছেন। এখানেও ই-রিক্সা চড়ে আগে সিক্রী দেখাতে নিয়ে গেল শেষে দেখাবে ফতেহপুর। 

আসলে সিকরি হল বিন্ধ্যপর্বতের ওপরের ভাগের একটা গ্রাম, যার চারপাশে ছিল সুন্দর জলাশয়, চারিদিকে সবুজে ঘেরা। প্রগৈতিহাসিক যুগ থেকে নানান বণ্য প্রাণীর সাথে আদিম গুহা মানবরাও থেকেছে।

প্রস্থর যুগের যন্ত্রপাতিও পাওয়া গেছে এখান থেকে, সাথে নানান গুহাচিত্রও। মহাভারতেও পান্ডবদের রাজসূয় যজ্ঞের সময় সহদেব জয় করেছেন সৈক নামের এই জায়গাটিকে। সৈক মানে জলে ঘেরা জায়গা। পরবর্তী কালে নাম বদলে দাঁড়িয়েছে সৈকরি তা থেকে সিক্রী। যুগে যুগে মানুষ এখানে বসতি স্থাপন করেছে, মাটি খুঁড়ে যেমন দুই লক্ষ বছরের পুরোনো পাত্র পাওয়া গেছে তেমনি দেখা গেছে দশম, একাদশ শতাব্দীর জৈন মূর্তি। এ'পথে চলতো উত্তরের সাথে দক্ষিণের জলপথে ব্যবসা বাণিজ্য। 

বাবর খানওয়া যুদ্ধের সময় সিক্রী দেখে মুগ্ধ হন, সময়টা ১৫২৭ খ্রীষ্টাব্দ, যুদ্ধে জিতে তৈরী করেন জলমহল আর একটি ধাপ কাটা কুয়ো মানে বাউলি। পরে বাবরের নাতি আকবর নিজের রাজধানী নিয়ে আসেন সিক্রীতে।

সিক্রী হল মুঘল আমলের প্রথম প্ল্যানড সিটি।এখানে ক্যরাভানে থাকতেন সুফী সেলিম চিস্তি, যিনি প্রতিবার সুস্থ জীবিত সন্তানের আশায় আসা সম্রাট আকবরকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন। পরে চিস্তির সন্তান নাকি সম্রাটের যাতে বংশধর থাকে সেই উদ্দেশ্যে নিজের ছয় মাসের সন্তানকে বলি দেন আর যোধাবাই ওরফে মারিয়ামের কোল আলো করে আসে সেলিম মানে জাহাঙ্গীর। 

আনন্দে সিক্রীকে ঢেলে সাজান সম্রাট আকবর, গড়ে ওঠে বাজার দোকান, হাসপাতাল, স্কুল। সেলিমচিস্তের মৃত্যুর পর দরগা বানিয়ে তাঁকে যথাযথ সম্মান দেন জালালুদ্দিন মহম্মদ আকবর। 

এখানকার টোপোগ্রাফি অনুসারে সবচেয়ে উঁচু জায়গাটি ধর্মস্থান যার নাম ফতেহবাদ থেকে বর্তমানে ফতেহপুর। যেখানে রয়েছে জাম্মা মসজিদ, সেলিম চিস্তের দরগা। এখানেই নিজের ফতেহ মানে জয় করার স্মারক বুলন্দ দরওয়াজা, দাক্ষিণাত্য জয়ের নিশান বানান সম্রাট আকবর। সবটাই রেড স্টোনে বানানো। 

এরপর মাঝের সমতল জায়গায় সিক্রীতে রাণীদের মহল, মীনাবাজার, শাহী বাজার, বৈঠক, বাগান আর একদম নীচে পাঁচমহল, খোয়াববাগ, অনুপ তালাও ইত্যাদি। সাধারণ লোকেদের জীবিকা ছিল পাথরের কাজ, চামড়ার কাজ, কাঠের কাজ।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় এত জমজমাট পরিকল্পিত রাজধানী যেখানে সম্রাট আকবর দীন ইলাহী চালু করলেন, ঢেলে সব সাজালেন, মাত্র পনেরো বছর পরেই পাঞ্জাবের বিরোধিতা সামলাতে লাহোরে  রাজধানীকে সরিয়ে নিয়ে চলে গেলেন আকবর। আর জল কষ্টে সিক্রী হয়ে গেল পরিত্যক্ত নগরী। জলে ঘেরা বলে যে জায়গার নাম ছিল সৈক তার কি করুণ পরিণতি ভাবলে অবাক লাগে। 

গাইডের সাথে প্রথমে সিক্রী ঢুকেই সামনে দেওয়ানই খাস, যেখানে প্রজাদের কথা শোনা, বিচার সব কিছুই চলত। এরপর যোধাবাই মহল, যেখানে কারুকার্যে রাজপুত ঘরানার ছাপ সুস্পষ্ঠ। প্রিয় এবং প্রধাণ মহিষীর সাজগোজের, রান্নার সব আলাদা আলাদা মহল, কি অনবদ্য কারুকার্য!মেয়েদের কানের ঝুমকোর ডিজাইন থেকে শুরু করে শীতল পাটি, নানান জ্যামিতিক নকশা দিয়ে প্রতিটি পিলার, কার্নিশ, পরদা বানানো। 

চোখ বুঁজলেই মনে হয় ওই তো যোধাবাই স্নান সেরে তুলসী মঞ্চে জল দিচ্ছেন, এরপর রান্নাঘরে তৈরী হবে সুস্বাদু সব নিরামিষ রান্না যাতে থাকবে তার বাপের বাড়ীর রাজস্থানের ছোঁয়া। 

খানিক দূরে অনুপ তালাও, সবুজ জল টলটল করছে, এক কালে এই জলের কাছে সম্রাটের হারেমের মেয়েরা তাদের মনের কত কথা বলেছে। 

একদম মাঝ খানে বিনোদন ক্ষেত্র যেখানে বৈজু বাওরা রাগ মল্লাহার বাজিয়ে বৃষ্টি নামাচ্ছেন তো তানসেনের বাজানো দীপক রাগে আগুন জ্বলে উঠছে।

সাদা মার্বেলের ওপর কালো কাটা চিহ্ন, দাস দাসীদের ঘুঁটি করে চলত লুডো সহ নানান ধরণের খেলা। অদূরেই পাঁচ মহলা হারেম সম্রাটের! এছাড়া খোয়াববাগ আসলে লাইব্রেরি, পেন্টিংস, মুরাল দিয়ে সাজানো থাকত। সেখানে আছে দোতলা সমান সম্রাটের উঁচু পাথরের পালঙ্ক যাতে সিঁড়ি দিয়ে চড়তে হয়, সুন্দর ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা ঘরখানিতে সম্রাটের দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রামাগার।

প্রতিটি বিল্ডিং হয় উত্তর নয় পূর্ব মুখে বেরোনোর দরজা, এমন ভাবে বিল্ডিং বানানো যে উঁচু দেওয়াল পেরিয়ে এক মহল থেকে অন্য মহল দেখা যায় না। তবে খোয়াববাগ আর হারেম সরু রাস্তা দিয়ে যুক্ত কিন্তু সে আসা যাওয়ার পথ লোকচক্ষুর আড়ালে। 

এরপর সিক্রী দেখা শেষ হলে ই-রিক্সা চেপে এলাম ফতেহপুর, এখানে জুতো খুলে ঢুকতে হয়। সেলিম চিস্তের দরগায় ফুল, চাদর চড়ানোর ব্যবস্থা আছে। একদিকে পরপর সুফী সেলিম চিস্তের আত্মীয়দের কবর, বাইরে পুরুষদের, ভিতরে মেয়েদের।

এখানেই ছিল আনারকলিকে যেখানে অন্ধকুঠুরিতে রাখা হয়। ওটি আসলে গুপ্ত রাস্তা, ওই পথ ধরেই আনারকলি লাহোর দূর্গে পালায়। এরপর বুলন্দ দরওয়াজার সামনে ছবি তুলে যখন বেরোলাম, ঘড়িতে বাজে দুপুর আড়াইটে। 

কাছেই দোকান থাকলেও কর্তার অফিসের আগ্রা ব্রাঞ্চের জুনিয়র ছেলেটির ঘনঘন ফোন আসছে সে অপেক্ষা করছে একসাথে লাঞ্চ করবে বলে। বারণ করলেও শুনছে না। অবশেষে তাকে পাওভাজি আর কোল্ড কফির অর্ডার দিতে বলে ঝড়ের গতিতে আগ্রার হলদিরামে গেলাম।

মায়ঙ্ক নামের ছেলেটি ”হ্যাপি দিওয়ালী ম্যাম!” বলে এক তোড়া লাল গোলাপের বুকে আমার দিকে এগিয়ে দিতেই আমার খুশিতে থার্টি সিক্স অল আউট।

খাবার পরে দেখি গাড়ীতে কোল্ড ড্রিংকস, বিস্কিট, কেক, কফির ক্যান, চিপ্স, আগ্রার পেঠা সব ভরেছে। তার স্যার আর্তস্বরে চীৎকার করছে, ”করেছিস কি? করেছিস কি? নিয়ে যা নিয়ে যা এসব!”

সেও নাছোড়বান্দা, ”আমাদের রাজ্যে এসেছেন, রাস্তায় ঘুরবেন, সব লাগবে দেখবেন।”

ভাগ্যিস দিয়েছিল, সে গল্প পরবর্তীতে হবে। 

এদের তর্কাতর্কি মিটলে একসাথে ছবি তুলে রওনা হলাম আগ্রা ফোর্টের দিকে, কারণ পাঁচটার পরে ঢুকতে দেয় না সেখানে। ৯৫ বছর ধরে একটু একটু করে গড়ে উঠেছে বিশাল ফোর্ট, এখন বেশির ভাগ জায়গাই সেনাবাহিনী থাকে। র‌্যাম্প দিয়ে উঠে গিয়ে সামনেই রাখা জাহাঙ্গীরের বাথটাব, মামার বাড়ী থেকে আনা টাবটি ছিল সোনায় মোড়া। তাতে দূর্মুল্য রত্ন খচিত। ইংরেজরা ন্যাড়া মুড়ো করে ছেড়ে দিয়েছে। ফোর্টটি ইঁটের ওপর লাল স্যান্ড স্টোনের তৈরী তাই আর এক নাম লাল কিলাও বটে, অপূর্ব সব কারুকার্য। 

শাহজাহান মহল, সবচেয়ে সুন্দর, প্রতিটি সাদা মার্বেলের ওপর দামী রত্ন বসানো আলো পড়লেই জ্বলজ্বল করছে। বড় শখ করে বানান শৌখিন সম্রাট শাহজাহান। শীশমহলও বলে তাকে, দাদুর ওই ইঁটের ওপর মার্বেল বসানো মোটেই পছন্দ ছিল না বলেই শুধু মার্বেল দিয়ে বানান তাজমহল। এরপর নিজের জন্য কালো মার্বেলের তাজ  বানানোর খবর পেয়ে আর খরচের অঙ্ক শুনে ছেলে ঔরঙ্গজেব বাবাকে তাঁর পছন্দের শাহজাহান মহলেই গৃহবন্দি করেন। 

দুই পাশে দুই মেয়ের মহল। তবে জাহানারার  মহলটি বেশি সুন্দর, খোলামেলা। তবে দুটি মহলেই ওপরে পাল্কির মত করে বারান্দা কারণ দুজনেই যে চিরকুমারী। শাহজাহানের মহলের কারুকার্য একদিকে যেমন মুগ্ধ করে তেমন দূর থেকে তাজমহল দেখতে দেখতে মনে হয় অত শৌখিন মানুষ কি ভেবেছিলেন তাঁর শেষ বয়সটা এভাবে নিঃসঙ্গতা আর হতাশায় কাটবে! কর্ম ফল হয়ত!

আগ্রা ফোর্টের খোলা ছাদের ওপর  কালো পিওর গ্রানাইটের মন্ত্রীর বসার জায়গা আর উল্টো দিকে ধবধবে সাদা মার্বেলের উপর সম্রাটের বসার জায়গা। সম্রাট তার কাছের পারিষদ নিয়ে খাস  পরামর্শ চালাতেন। ইংরেজদের কামানের তোপ উড়ে আসায় চিড় ধরে গেছে সেই কালো  পাথরে, গোল গর্ত হয়ে গেছে পাশের দেওয়ালে। গাইড বলল প্রচুর জিনিস চুরি করেছে সারানোর কর্মীরা, দোষ হয়েছে টুরিস্টদের। খুঁটে তুলে নিয়েছে মার্বেলের ওপরের স্টোন গুলো। 

পড়ন্ত সূর্যালোকে লাল আগ্রা ফোর্টকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল কত ইতিহাসের সাক্ষী এই পাথুরে দেওয়ালগুলো! লোধী থেকে সুরী মোঘল থেকে জাঠ, মারাঠা কত ধরণের সুলতান, সম্রাটরা এসেছেন, গেছেন। চলেছে ভাঙ্গাগড়ার খেলা, তারপর একসময় কালের গর্ভে সবই বিলীন হয়ে গেছে প্রকৃতির আপন খেয়ালে। 

কত নতুন চিন্তাধারার সাক্ষী এই ফোর্ট। জাহাঙ্গীর বানিয়েছিলেন বিশাল ঘন্টা, যাতে সরাসরি গরীব প্রজা তার সমস্যা জানাতে পারে নির্দ্বিধায়, শের শাহ শুড়ি বানালেন সুবিশাল গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড, পথের পাশে জলসত্র, সরাইখানা, আনলেন ঘোড়ার ডাকের ব্যবস্থা। শাহজাহান স্থপতি, কারিগর এনে বানালেন কত ধরণের আর্টর মিশেলে স্তম্ভ, ঝরোখা! 

পাশ থেকে পবনের বন্ধু গাইড ছেলেটি বলে উঠল “ভাবী, আপ বহুত থাক্ গয়ে! গরম পানি মে নাহাকে শো যাইয়ে হোটেল যা কে।“ 

সত্যিই আর শরীর চলছে না যেন! কিন্তু একেবারে  কিছু কেনাকাটা করব না তাও কি হয়!

এদিকে দীপাবলী তাই অর্ধেক জায়গায় পুজো চলছে। পবন তার চেনা বিরিয়ানীর দোকানে ফোন করে জানল আজ বন্ধ! অতএব হোটেলের ঠিক পাশের ইউপি হ্যান্ডলুমে ঢুকে টুকটাক কেনাকাটি সেরে হোটেলের ঘরে খাবার আনিয়ে লম্বা ঘুম দিলাম। পরেরদিন ভোরে গোয়ালিয়র আর ঝাঁসি ফোর্ট দেখতে যাওয়া। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com Fatehpur Sikri Agra Fort tour)


মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও লেকচারার, আহমেদাবাদ:

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শখ ঘুরে বেড়ানো, তার জন্য ভাঙ্গা কোমর নিয়ে যদি রাস্তার পর রাস্তা হাঁটতে হয়, সিঁড়ির পর সিঁড়ি ভাঙতে হয়, তবু সব সয়ে নিতে পারি। আমার পায়ের ব্যথা এবার একটু বেশীই ছিল, কারণ হট প্যাড চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সকালে দেখলাম দুটো বড় বড় টসটসে ফোসকা, তবে পুরো জায়গাটাই নিঃসাড় থাকায় গরমও টের পাইনি, ব্যথাও নয়। মনে মনে ভাবছি সামনেই বেড়াতে যাব, এসময় ফোসকা পড়ল ভাঙ্গা পায়ে। তবু জানি মনের জেদের কাছে শরীর হারবেই, বেড়াবো তো ঠিকই ।

এবার দীপাবলীতে প্রোগ্রাম ছিল আগ্রার তাজমহল দেখা, তার সাথেই গোয়ালিয়র ফোর্ট, ঝাঁসির ফোর্ট দেখে একরাত কাছেই অর্চায় কাটিয়ে বাড়ি ফেরা। একটি গাড়ি নিয়েই ঘোরার পরিকল্পনা বলে ঠিক করেছিলাম দিল্লি থেকে আগ্রা যাবার পথে মথুরা, বৃন্দাবনে একটু ঢুঁ মেরে নেব। 

ধনতেরাসের পরের দিন নরক চৌদশ মানে ভূত চতুর্দশী, সেদিন ভোরেই যাত্রা শুরু, খবরটা জেনে আমার প্রতিবেশীরা বেশ রেগে গিয়ে বলে উঠেছিল, "কি অলক্ষ্মী বউ গো তুমি, বিশেষ পুজো আর্চা তো করতে দেখি না, তাই বলে দীপাবলির দিনও ঘরে আলো না জ্বেলে ডাং ড্যাং করে ঘুরতে চললে?"

কাঁচু মাচু মুখে বলি "কি করি, বাজির আওয়াজ কর্তার সহ্য হয়ে না, তাই প্রতিবার পালায়, তবে আগে কালী পুজোর পরে যেত, এবার আগেই পালাচ্ছে। তোমাদের মত প্রতিবেশী তো কপাল করে পেয়েছি, প্রদীপ দেশলাই সব গুছিয়ে যাচ্ছি, তোমারাই একটু জ্বেলে দিও, গাছেও একটু বুঝে বুঝে জল দিয়ে দিও। ঘুরে এসেই তোমাদের সবার বাড়ি যাব।"

আহমেদাবাদে দীপাবলীতে নতুন বছর শুরু হয়, তাই একে অপরকে গিফট দেওয়া, এর ওর বাড়ী গিয়ে চা নাস্তা খাওয়া চলতেই থাকে প্রায় পাঁচ দিন ধরে। এসময় কাজের মেয়ে, ড্রাইভার সবাই ছুটিতে, দোকান পাট কম খোলা, পুরো ছুটির মুড! 

সে যাক ভোর পাঁচটায় দিল্লীর উদ্দেশ্যে কর্তা গিন্নি রওনা দেব ভেবে সবে দরজা খুলে বেড়িয়েছি কি দেখি আমার ঘরের আলো দেখে একটা বোকা পায়রা ভাবল সূর্য্য উঠে গেছে, মানি প্ল্যান্টের ঝোঁপটা বাগান ভেবে ঢুকে এলো। ( কর্তা বহুবার বলেছেন, "এটা বাড়ি, দিন দিন আমাজনের জঙ্গল বানাচ্ছ এরপর বাঘ বেরোলে ও অবাক হবো না!"

একদিকে বেরোবার মুখে পায়রা তাড়ানো চলছে কর্তার আর আমার হিস্টিরিয়া রুগীর মত চিৎকার, কারণ উড়ন্ত কিছু দেখলেই আমার ফোবিয়া চালু হয়ে যায় আনকনট্রোলেড ভাবে। যাক আমার চিৎকারে ঘাবড়ে পায়রা পালাতেই দুগ্গা বলে যাত্রা শুরু করলাম।

প্লেনে উঠেই জানলার পাশের সিটটা বাগিয়ে নিলাম, কর্তা জানালেন "ওটা তোমার নয়, ধারের সিট নিলাম, পাছে তোমার বাথরুম যেতে হয় বলে।" মনে মনে ভাবলাম ২৬ বছরেও বউকে চিনল না, গম্ভীর ভাবে বললাম, "এখন তো বসি কেউ এলে সরে যাবো।"

কি কপাল যে অল্প বয়সী ছেলেটার সিট ছিল, সে আমায় দেখেই হেসে বলল, "বসুন, বসুন আমি এদিকে বউ বাচ্ছা নিয়ে বসছি!"

কর্তার দিকে তাকিয়ে বললাম, "আগে স্বপ্ন দেখতে হয়, তবেই না সেটা সত্যি হয়!"

শুনে নাক দিয়ে "ফত" করে আওয়াজ করে বললেন, "আহা, স্বপ্নের কি ছিড়ি, পরের সিট  বাগাবো!" তারপরেই মোবাইল ঘাঁটতে শুরু করলেন। ব্রেকফাস্ট বেশ ভালো ছিল, এখনও এয়ার লাইন্সটি টাটা ভিস্টেরার ----এয়ার ইন্ডিয়ার সাথে মিশে গেলে হয়ত সঙ্গ দোষে শত গুণ নাশ হবে!

দিল্লী এয়ারপোর্ট বিশাল বড় সবাই জানে, গাড়ি বলা থাকায় সে ঠিক সময়ে চলে এলো। অল্প বয়সী ছেলে নাম পবন কুমার। বেশ নয়ডা হয়ে যমুনা এক্সপ্রেস ধরে এগিয়ে চললাম মথুরার দিকে। পথেই একটা জমজমাট ধাবায় পবন

খাবার জন্য গাড়ি থামাতে দেখি ভিড় কাকে বলে, সবাই বেরিয়ে পড়েছে বোধহয়!

কিন্তু দেখার মত সার্ভিস, ঠিক মুভির মতো আমার সামনে বলে গেল, "গোবি পারাঠা, আলু পরোটা, মুলি পারাঠা, পনির পরাঠা, আলু পিয়াঁজ পারাঠা ছোলে বাটুরে...।"

তাকে থামিয়ে এক প্লেট ছোলে বাটুরে আর একটা আলু পিয়াঁজ পারাঠা নিলাম। কয়েকজন প্লেট দিচ্ছে, আর কয়েকজন টেবিল থেকে এঁটো প্লেট সরাচ্ছে মেশিনের মত। প্লেট দিতেই কর্তার ওষুধ ব্যাগ থেকে বের করে প্লেটের একপাশে রাখতেই নিমেষে একজন প্লেটটা নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল, হাঁ হাঁ করতে করতেই বুঝলাম ছেলেটি বোবা কালা, তার পাশের বন্ধু ক্ষমা চেয়ে অন্য প্লেট দিয়ে গেল, বুঝলাম এরা কাজ করতে করতে আর বিশাল ভিড় সামলাতে সামলাতে পুরো রোবট হয়ে গেছে। যাক ভোজন পর্ব সেরে পবন আমাদের মথুরা নিয়ে এলো, বেশ পরিষ্কার ছিমছাম শহর কিন্তু ঢোকার মুখেই একজন বলল, "আজ তো জন্মভুমি বন্ধ, গাড়িও যেতে দিচ্ছে না।" পবন আগ্রার ছেলে, পাত্তাও দিল না গাড়ি ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, "জীবনে কৃষ্ণের জন্ম স্থান বন্ধ থাকে না।" প্রচুর গেট উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম সব দিকে, কিন্তু উঁচু নিচু জায়গা, আর রাস্তা সরু হওয়ায় কোনও রাস্তায় গাড়ি যায় কোনওটায় অটো।

যাক আমরা উত্তরের গেট দিয়ে ঢুকে শুনলাম বেলা চারটের সময় মন্দির খুলবে, ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটে, একটু এদিক ওদিক ঘুরে দেখলাম, আসল কংসের কারাগারের ওপর মসজিদ বানানো হয়ে গেছে, তাই নিয়ে টানাপোড়েন চলছে, অযোধ্যার বাবরি মসজিদের মতই, খানিক পাশেই জন্মস্থান কারাগারের মত করে বানিয়ে রাখা হয়েছে। খানিক পরে মন্দির খুলতেই অপেক্ষামান প্রচুর মানুষ ঢুকে বসলেন মন্দিরের ভিতরের সুন্দর পাথরের মেঝেতে, আস্তে আস্তে খোলা হল রাধা কৃষ্ণের সোনার রঙের যুগল মূর্তি খানি, ভারী সুন্দর দেখতে। এরপর খানিক প্যাঁড়া কিনে চললাম বৃন্দনের দিকে। 

আগেই কর্তা গিন্নির কথা হয়েছে পুণ্য করবেন গিন্নী আর জুতো সামলাবেন কর্তা, ভিড়, বাজি এসব থেকে পালাতে তিনি এসেছেন তাই এসব জায়গায় তিনি কিছুতেই ঢুকবেন না, তাই বৃন্দাবন বিহারীর আসল মন্দির যাব না ঠিক ছিল, আমিও মেনে নিয়েছিলাম কারণ ২০১৪ সালে বাবা মা, ভাই ভাইয়ের বউ ভাইজিদের সাথে পুত্র সহ আগ্রা বৃন্দাবন ঘোরা ছিল, না হলে বেড়াতে এসে কিছুই ছাড়ার পাত্রী নই আমি। 

সে যাক ঠিক হল নিধিবন যাব, সেখানে রাতে নাকি কাউকে থাকতে দেওয়া হয় না, শ্রীকৃষ্ণ আসেন, গোপীদের সাথে চলে লীলা খেলা, সব সাজানো ভোগ আধ খাওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়, রাধারাণীর জন্য রাখা শাড়ি এলোমেলো। 

নিধিবন যেতে হলে সরু রাস্তায় টোটো চাপতে হল, অতি বাজে রাস্তা, আমি তো ভাবলাম এবার ফোস্কা ফেটে যাবে, সারা শরীরের কল কব্জা খুলে গেল বলে। যাক কুড়ি মিনিট পরে নামলাম নিধিবনের সামনে, প্রায় পুকুরের মত যমুনা, কষ্ট করে ভাবতে হবে এখানেই কালিয়াদহ, সামনে সেই গাছ যেখানে কাপড় চোপড় রাখতেন গোপিনীর দল। এরপর গাইড নিয়ে চললাম নিধিবন দেখতে, অদ্ভুত ধরনের তুলসী গাছে ভরা তবে এতই লালমুখো বানরের উৎপাত যে মানুষ চলেছে তার দিয়ে ঘেরা খাঁচার মধ্যে দিয়ে, ওপরের আসবেস্টাসের চালে ধুপ ধাপ বাঁদরের লাফালাফি। 

ওখানেই আছে একটি ছোট মন্দির যেখানে শ্রীরাধার কৃষ্ণসাজে সজ্জিত রূপ হাতে বাঁশি, মাথায় মুকুট। এক জায়গায় বলরামের মন্দির, হলধর এদের বড় আদরের দেবতা, কথার ভাবে বুঝলাম।একটা খোলা উঠোনে যদিও তারও মাথা চারপাশ তারে, আসবেস্টেস দিয়ে ঢাকা সব ভক্তরা মিলে নাচছে। অনেকেই দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করে দিলেন, ফোস্কা পরা পা নিয়ে আমি এগোলাম না। এরপর বেরিয়ে দেখি গাইড নিয়ে চলেছে কোনও গুরুর আশ্রমে, বাঙালিরা নাকি বাবা মায়ের নামে টাকা দেয়, প্রথমে বুঝিনি, জুতো খুলে ঢুকে গেছিলাম, পরে যখন বলছে "বসুন, আশ্রমের পান্ডাদের বক্তব্য শুনতে হবে তখন উঠে পড়েছি।"

মনে হয় ওরা সবাই মিলে আমাকে এমন অভিশাপ দিয়েছে যে বেরিয়ে জুতো পড়তে একটা খালি চেয়ার দেখে জিজ্ঞেস করলাম "জুতো বাঁধব, বসতে পারি?" কিন্তু অতগুলো লোক কেউ কেন বসছে না মাথায় আসেনি, বসে নিচু হতেই, সুন্দর ভাবে চেয়ার ভেঙে জমিতে পড়লাম, লাগলো এই ভাঙ্গা ফোসকা পরা পায়েই, যদিও স্লো মোশানে পড়ছি বলে তেমন কিছুই বুঝলাম না। এবার এরা দান না পাওয়ায় বলে চেয়ারের দাম দিন! কর্তা রেগে আগুন, এতক্ষণ সব দেখছে দুর থেকে, গিন্নির ভক্তির ঠেলায় চুপচাপ এদের কাণ্ড দেখছিল, কিন্তু এবার গাইডকে এক ধমক লাগাতেই সব চুপ। আসতে আসতে টোটোতে উঠে মানে মানে বৃন্দাবন ছাড়লাম, আস্তে করে বলে উঠলাম এবার বুঝেছি কেন কথায় আছে, "পেঁদিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেবো!"

যাক এরপর পবনের গাড়িতে চেপে চললাম আগ্রার হোটেলে, পরদিন ভোরে তাজমহল দেখতে যাওয়া। হোটেলের ঘরেই খাবার খেয়ে টেনে ঘুম দিলাম। 

পরের দিন সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে স্নান সেরে বেরিয়ে তাজমহলের সামনে ইরিক্সার পিছনের সিটে চড়তে গিয়ে কিভাবে যেন পায়ের ব্যালেন্স হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম, আর ঠিক সেই ভাঙ্গা পায়ে বেশ খানিকটা জায়গা গেল লোহায় কেটে, রক্ত খুব না বেরোলেও কালশিটে পড়েছে, ছাল উঠে দগ দগ করছে। 

কোনও রকমে লেগিংস তুলে জায়গাটা একটু খুলে হওয়া লাগিয়ে সামনের সিটে উঠে বসলাম। গাইড ভদ্রলোক খুবই ভালো মানুষ ছিলেন, ভাবির করুণ দশা দেখে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে দিলেন ঢোকার আগেই ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে। মেয়েদের মানসিকতা বোঝেন দেখে ভারী ভালো লাগল, ব্যথাটাও যেন একটু কমে গেল। ভদ্রলোক কর্তাকে বললেন "একটু ম্যাডামের দিকে যদি তাকান মানে দুজনে দুজনের দিকে তাহলে বেশ রোমান্টিক ফটো ওঠে।" 

শোনা মাত্রই কর্তা এমন গম্ভীর মুখে ওনার দিকে তাকালো যে ভদ্রলোক ভাবলেন থাক, ঘাঁটিয়ে লাভ নেই, পয়সা কম দেবে বেশি বললে।

এরপর তাজমহলের খুঁটিনাটি শোনাতে শুরু করলেন, কর্তা হিসেবে ব্যস্ত থাকলেন ঠিক কত খানি সোনা নিয়ে চলে গেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী।

তাজমহলের পিছনের মসজিদে লোকাল লোকেরা আসেন শুক্রবার তাই ওইদিন তাজ মহল বন্ধ আগে ছিল সোমবার বন্ধ।

এক এক খানি  মার্বেলের ওপর এত সুন্দর কারুকার্য যারাই গেছেন তারাই জানেন কি অপূর্ব। 

দশ বছর আগে জুতো খুলে ঢুকেছিলাম, তেতে থাকা মার্বেলে পা পুড়ে গেছিল, এখন বেশ সুবিধে পাতলা কাপড়ের থলিতে জুতো ঢেকে ঢোকা। আসল কবর নিচের তলায় থাকলেও ওপরের রেপ্লিকা থেকেই বোঝা যায় কারিগরদের ফিজিক্স আর ম্যাথমেটিক্স এর ওপর কি অসম্ভব দক্ষতা।প্রতিটি কারুকার্য একে অপরের মিরর ইমেজ, পুরো ঘরের ঠিক মাঝের পয়েন্টে মুমতাজ মহলের কবর খানি রাখা। ছাদের মার্বেল ঠিক হিরের মতো করে কাটা যাতে আলোর টোটাল রিফ্লেকশন হয়। ভদ্রলোক দুর থেকে কি সুন্দর তাজমহলের এক খানি ছবি তুলে দিলেন।

তাজের নাকি দিনের এক এক সময় এক এক রঙ, ভোরবেলা পিঙ্ক, একটু বেলায় কমলা, দুপুরে লাল, সন্ধ্যে বেলায় হলদেটে আর পূর্ণিমা রাতে দুধ সাদা।পূর্ণিমায় দূর থেকে আধ ঘণ্টার জন্য রাতে দেখতে দেয় টিকিট ভারতীয়দের জন্য পাঁচশো টাকার বিনিময়ে।

এরপর চললাম ফতেহপুর সিক্রি, তারপর আগ্রা ফোর্ট, এক দিনের পক্ষে একটু বেশি তায় আমার মতো এক পায়ে নানান চোট নিয়ে। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com tour Tajmahal Brindavan)


মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও লেকচারার, আহমেদাবাদ: 

চারিদিকে বড় অন্ধকার ---আলো চাই! জ্ঞানের আলো, মেধার আলো, পরিশুদ্ধ মননের চিন্তনের আলো! এককালে মানে প্রায় সপ্তম শতাব্দীর কিছু আগে প্রচুর মানুষ ছিলেন সূর্যের উপাসক। ভারতবর্ষে ছিল বেশ কিছু সূর্যমন্দির, সাত ঘোড়ায় টানা রথে উপবিষ্ট সূর্যদেব, ঈষৎ রক্তিম গাত্রবর্ণ আর মাথার সোনার মুকুটের ঠিক মাঝখানে ঝকঝকে একখানি হীরক খন্ড। 

উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ভারতে সূর্যমন্দির থাকলেও পশ্চিম বা উত্তর পশ্চিম ভারতে বিশেষতঃ কাথিয়াবাড় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়, তার একটি কারণ হয়ত, অঞ্চলটির অবস্থান –সরাসরি সূর্যের প্রখর তাপ এসে পড়ে অঞ্চলটিতে। এই কাথিয়াবাড়ের মেহসানা জেলায় রয়েছে এমনই  এক সূর্য মন্দির –মোধেরা সূর্য মন্দির, পুষ্পবতী নদীর পাশে। 

স্কন্দ পুরাণ ও ব্রহ্ম পুরাণ মতে মোধেরা ছিল এক সুপ্রাচীন জনবসতি। রামচন্দ্র রাবণকে হত্যা করায় ব্রহ্মহত্যার পাপ স্খলনের উদ্দেশ্যে এক যজ্ঞ করেন, সাথে তৈরি করেন মোধেরাক –সেই থেকে নাম মোধেরা। আবার অন্য মতে মোধ গোষ্ঠীর ব্রাক্ষণেরা সাহায্য করেছিলেন যজ্ঞে তাই জায়গার নাম মোধেরা তবে পরবর্তী কালে বহু সূর্যমন্দির ছিল ---  বল্লভীর মৈত্রকাদের সময় (শাসনকাল ৪৭৫ থেকে ৭৭৬) এবং তারপর সোলাঙ্কিদের সময় ৯৪০ থেকে ১২৪৪)। ভারতবর্ষ তথা কাথিওয়াবাড় থেকে বারোশ শতাব্দী থেকে আস্তে আস্তে সূর্য উপাসনা বন্ধ হয়, সৌর উপাসকরা মিশে যান স্মার্তদের সঙ্গে।

স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে ভারতীয়রা চিরকালই বড় উদাসীন অথচ মৈত্রকদের শাসনকাল থেকে গুজরাটের নানা জায়গায় গড়ে ওঠে প্রচুর মন্দির পরবর্তী কালে সোলাঙ্কিদের রাজত্ব কালে মন্দিরের স্থাপত্য শৈলীতে আসে নানান বৈচিত্র্য। 

এই মন্দিরে পাওয়া লিপিতে দেবনাগরী হরফে লেখা আছে "বিক্রম সংবত ১০৮৩” যা সাধারণ অব্দের হিসাবে হয় ১০২৬-২৭। ঐতিহাসিকরা এই লিপির ওপর নির্ভর করে মনে করেন সোলাঙ্কি রাজ ভীমদেবের সময় মানে ১০২৪-৬৪ এর মাঝে মন্দির নির্মাণ করেন। গজনী সুলতান মামুদ গুজরাট আক্রমন করেন ১০২৪-২৫ সাধারণ অব্দে।

সোলাঙ্কি রাজ ভীমদেব ২০,০০০ সৈন্য নিয়ে মোধেরায় মামুদকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। লড়াইতে হারলেও স্মৃতি হিসেবে মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন। তবে সঠিক তথ্য অজানা।

মোধেরার সূর্য্য মন্দির তিনটি অংশে বিভক্ত ---শুরুতেই সূর্যকুন্ড, এরপর সভাগৃহ তারপর গর্ভগৃহ।

সূর্যকুন্ড বা রামকুন্ড একটি ছোট পুষ্করিণী যার চারিধার ঘিরে অসংখ্য অসম ধাপের সিঁড়ি নেমে যাওয়ায় মনে হয় ঠিক যেন ওল্টানো পিরামিড।  ধাপে ধাপে ছোট বড় মন্দির, কথিত আছে ১০৮ টি মন্দির ছিল তবে এর চার কোণে চারটি বড় মন্দির। একটি গণেশের, একটি শেষ শয্যায় শায়িত বিষ্ণুর মূর্তি আর অন্য দুটির একটিতে নটরাজ রূপী শিব এবং গাধায় উপবিষ্টা ঝাঁটা আর নিমপাতা হাতে গুটি বসন্তের দেবী শীতলা। 

ধারণা করা হয় এই পুষ্করিণীতে নেমে হাত, পা ধুয়ে  ভক্তবৃন্দ সভাগৃহে প্রবেশ করত। সভাগৃহের সামনে পূর্বদিকেই এই সূর্যকুন্ড –দৈর্ঘ্য ১৭৬ ফুট ,পূর্ব পশ্চিম প্রস্থ ১২০ ফুট। 

সভাগৃহটির চারদিক খোলা, ৫২ টি খিলান আছে, অপূর্ব কারুকার্যময়, রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সৌর বছরের ৫২টি সপ্তাহ বোঝাতেই ৫২ টি খিলান, দেয়ালে ১২টি কুলুঙ্গি রয়েছে যাতে সূর্যের ১২টি রূপ তুলে ধরা হয়েছে---১২ মাসে এক সৌর বছর। সভাগৃহ আর গর্ভগৃহের মাঝের ফাঁকা অংশটির ছাদ ঢাকা, সভাগৃহ থেকে অল্প কটি সিঁড়ি ভেঙ্গে নেমে গর্ভগৃহে কয়েকটি সিঁড়ি ভেঙ্গে ঢুকতে হয়, এর প্রবেশদ্বারটিও পূর্বমুখী।  

গর্ভগৃহ 

এটি একটি উল্টানো পদ্মফুলের স্তম্ভ মূলের ওপর অবস্থিত, পদ্মফুল সূর্যোদয়ের সাথে ফোটে আর সূর্যাস্তের সাথে বন্ধ হয়, তাই পদ্মফুল প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এক অভূতপূর্ব জ্যোতির্বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে গর্ভগৃহটি বানানো। ২১ শে জুন সূর্য যখন নিরক্ষরেখা থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে সেদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত মন্দিরের রথের ওপর রাখা সূর্যদেবের মূর্তির ওপর ফলিত হবে।

মন্দিরের গর্ভগৃহে ছিল খাঁটি সোনার তৈরি সাত ঘোড়ায় টানা রথ (সাত দিনে এক সপ্তাহ)। সারথি অরুণ চতুর্থ ঘোড়ায় উপবিষ্ট, রথটি ১৫ ফুট গভীর একটি কূপ বা গহ্বরের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কূপটি ছিল কানায় কানায় স্বর্ণ মুদ্রায় পূর্ণ ---যা সোলাঙ্কি রাজরা তাঁদের পূজ্য দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছেন। মাহমুদ গজনী স্বর্ণ মুদ্রাসহ সোনার সম্পূর্ণ ভাস্কর্যটি লুঠ করেন। বর্তমানে কূপটি লোহার পাত দিয়ে আটকানো।

মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে আছে সূর্যের বারোটি  ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গি, আট জন দ্বারপাল, বিশ্বকর্মার মূর্তি (যিনি শ্রীকৃষ্ণের স্বর্ণ দ্বারকা বানিয়ে ছিলেন), সিদ্ধিদাতা গণেশ, জ্ঞানের দেবী সরস্বতী মূর্তি ---আছে সমুদ্রমন্থনের দৃশ্য। মন্দিরের ভিতরের স্তম্ভের গায়ে নানান যৌন আবেদন মূলক দৃশ্যের মোটিফ দেখা যায়। সেযুগে যৌনতা নিন্দনীয় ছিল না, বরং ছিল সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম এবং স্বাভাবিক প্রাকৃতিক শারীর বৃত্তীয় ঘটনা । 

বর্তমানে মোধেরা সূর্যমন্দিরটি সংস্কার করে অন্যতম টুরিস্ট স্পট হিসেবে রাখা হয়েছে, এখানে প্রতিবছর জানুয়ারী মাসের তৃতীয় সপ্তাহে চলে মোধেরা নৃত্যৎসব, সে যুগে মোধেরার শিল্প, সাহিত্য কলা, জ্ঞান, বিজ্ঞানের উৎকর্ষতাকে স্মরণে রেখে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। মন্দিরের পিছনের তিন দিন ব্যাপী উত্তরায়ণ উৎসবের পরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের নামকরা শিল্পীরা এখানে কলা প্রদর্শন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। 

মোধেরার সূর্যমন্দিরটির ঢোকার মুখেই আছে আর্কিওলজিকাল মিউজিয়াম , সেখানে বেশ কিছু দশম, একাদশ শতাব্দীর মূর্তি রাখা আছে। মন্দিরটি সোমবার বন্ধ থাকে।

(www.theoffnews.com Modhera Sun temple)