গুরুত্বপূর্ণ খবর

দেবিকা ভট্টাচার্য, লেখিকা ও লেকচারার, চন্দননগর, হুগলি:

সৌন্দর্য বস্তুটা যে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে তা রাজবাড়ির মাঠ থেকে নেমে এসেই ছোট্ট, কোমর পর্যন্ত উচ্চতার রিভলভিং গেট দিয়ে অম্বিকা-কালনার রাজবাড়ির মন্দির অঙ্গনে প্রবেশ করলে, মানতেই হয়। রাজবাড়ির মাঠ থেকেই চোখে পড়ে একই আকাশের নীচে সুবিশাল মন্দির প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণে প্রশস্ত মাঠ, কেয়ারি করা ছোটো ছোটো বাহারি গাছের মাঝখান দিয়ে ইটে বাঁধানো রাস্তা, শীতে যেতে পারলে কিছু মরশুমি ফুল। এখানে রয়েছে অসাধারণ স্থাপত্যের নিদর্শন টেরাকোটার ছোট, বড়, মাঝারি মাপের মন্দির, ছাদবিহীন রাসমঞ্চ। কোনও কোনও মন্দির ঘিরে  রয়েছে মন ভোলানো গল্প। বছরের যে কোনও সময় দর্শনার্থীর ভিড় এখানে।

ছোট্ট ঘোরানো গেট পেরিয়ে মন্দির আঙিনায় ঢুকেই  রয়েছে বাঁদিকে উঁচু বারান্দা ঘেরা টেরাকোটার ফলক দিয়ে তৈরি রূপেশ্বর শিবমন্দির। অর্ধগোলাকৃতি কয়েকটি সিঁড়ি পেরিয়ে মন্দিরে উঠলে দেখা যাবে মন্দিরের গর্ভগৃহে বড়ো কালো পাথরের শিবলিঙ্গ। বছরের যেকোনও সময় বিকেলে দেখা যাবে মন্দিরের উঁচু দাওয়া আলো করে বসে থাকা বয়স্ক মানুষদের। স্বয়ং মহাদেবও সব সময় নির্জনতা পছন্দ করেন বলে মনে হবে না। সেজন্য অম্বিকা কালনাকে 'বারাণসী সমতুল' না বলে 'বার্ধক্যের বারাণসী' বলাই ভালো মনে হয়।

এই মন্দিরের পাশে পাঁচটি নাতিউচ্চ শিবমন্দির বা পঞ্চরত্ন মন্দির। মন্দিরগুলিতে ততদিন শিবলিঙ্গ ছিল যতদিন রাজা পাহারাদার রেখেছিলেন। রাজন্য প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় দারোয়ান পদের বিলুপ্তি ঘটে।আর পাহারা না থাকলে বিগ্রহের বুঝি মন্দিরে বসে থাকতে ভালো লাগে না। ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারে বিলীন হয়ে যান। পড়ে থাকে শূন্য বেদী।  এই মন্দিরগুলির ফাঁক (প্রশস্ত পথ নয় বলেই 'ফাঁক ফোঁকর' শব্দটা মাথায় এল) দিয়েই পৌঁছতে হবে মন্দিরগুলির ঠিক পিছনেই কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরে। 

বাইরে সাধারণ কিন্তু উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকতে হবে ছোট্ট এক দরজা দিয়ে। ঢুকে বিশাল এক মন্দির প্রাঙ্গণে এসে মুগ্ধ হতেই হবে। ৬৫ ফুট উচ্চতার এই মন্দিরটি ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে বর্ধমানের মহারাজা তিলক চাঁদ বাহাদুরের মাতা লক্ষ্মী কুমারী দেবী প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ২৫ টি চূড়া বিশিষ্ট। মন্দিরে আড়াই ফুট উচ্চতার শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ এবং ২ ফুট উচ্চতার শ্রীরাধারাণীর বিগ্রহ রয়েছে।মন্দিরের গায়ে রয়েছে টেরাকোটার ফুলকারি কাজের সঙ্গে বকাসুর বধ, নৌকাবিলাস, অশ্বমেধ যজ্ঞের চিত্র।

রাধাকৃষ্ণের মন্দির থেকে নেমে একই উঠানের পূর্বদিকে শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির। মন্দিরে তিন ভাইয়ের সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্র, সীতাদেবী, হনুমান এবং জাম্ববানের মূর্তি রয়েছে। পশ্চিমে বদ্রিনারায়ণের মন্দির। তাহলে তো কালনায় একবার আসতে পারলে ভারত ভ্রমণের আনন্দ পেতেই পারেন! দক্ষিণে বিরাট রন্ধনশালায় রয়েছে বিগ্রহের নিত্য সেবার ভোগের ব্যবস্থা। মন্দিরের মধ্যেই নিত্য সেবার জন্য ফুলের বাগান। একটি ইঁদারা রয়েছে জলের যোগানের জন্য। জনসাধারণের ছোটোখাটো লৌকিক অনুষ্ঠানে, দেবতার উদ্দেশে নিবেদিত প্রসাদ পাওয়ানোর ব্যবস্থাও করা যায় এই মন্দির প্রাঙ্গণে। আবার, কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করার মতো জায়গাও রয়েছে এখানে। ভোরের হাওয়া গায়ে মেখে শরীরচর্চাতেও বাধা দেবে না কেউ। এরপরও কি বলা যাবে 'এ মন্দিরে দেবতা নাই?' না ভালবেসে পারা যাবে কি এই মন্দিরকে?

এখনও শেষ হয়নি!

'বিজয় বৈদ্য’ নামে আলাদা করে ঘেরা একটি বিশাল শিবমন্দির রয়েছে রাধাকৃষ্ণের মন্দিরের বিগ্রহের পিছনদিকে একই মন্দির প্রাঙ্গণে। মন্দিরে ঢুকেই সামনে সোজা একটু গিয়েই মন্দিরটি। আগে অর্থাৎ আমাদের ছোটোবেলায় এই মন্দিরটি গাছ-আগাছায় এমনভাবে অন্ধকার হয়ে থাকত, সাপের আড়ৎ আছে মনে হতো। কৃষ্ণচন্দ্র ভোররাত থেকে হাতছানি দিলেও 'ভোলে বাবা' ভয়ই দেখাতেন। তাই সব শেষে এই মন্দিরটির কথা বললাম। এখন সংস্কার করার ফলে অঙ্গনের অনুপম স্থাপত্য শিল্পকলা এই মন্দিরের আকর্ষণে জোয়ার এনে দিয়েছে। রাজবাড়ির মাঠের দিকে যাওয়ার জন্য একটি দরজাও রয়েছে মন্দিরটিতে। মহারাজা তিলক চাঁদ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন পিতা মিত্রসেন রায় ও মাতা লক্ষ্মীকুমারী দেবীর সৌজন্যে।

করোনা কালে মন্দির চত্বর আগাছায় ঢেকেছে ঠিকই কিন্তু মন্দিরগুলি সংস্কার করা হচ্ছে এই অবসরে। আশা রাখি, সুসময় সত্যিই সুন্দর হয়ে ফিরে আসবে আমাদের কাছে। এবার লালজিবাড়ির উদ্দেশ্যে চলে যাই। (ক্রমশঃ)

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Ambika Kalna)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

তিনি অগ্নিকন্যা, তিনি সততার প্রতীক, তিনি বাংলার নিজের মেয়ে। তার লড়াকু ইমেজ, অনমনীয় তেজ, হারা না মানা যুদ্ধের উদাহরণ গোটা দেশে ফেরে। তার জ্বালাময়ী ভাষণে উৎসাহিত হয় কাকদ্বীপ থেকে কালিম্পং। কিন্তু ভবানীপুরের ভোট প্রচারে এবার যেন সেই চেনা মমতার দেখা মিলল না। “একটা ভোটও নষ্ট করা চলবে না, আমাকে ভোট না দিলে অন্য কেউ মুখ্যমন্ত্রী হবেন”। ভোট চাওয়ার এমন আকুতি আগে তো দেখিনি। মুখ্যমন্ত্রী থাকার জন্য এই আর্তিও অনেকটাই অচেনা। নবীন অবস্থায় সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মত দুঁদে রাজনীতিবিদকে যিনি অনায়াসে হারিয়েছেন, একটা সময় যখন লোকসভায় তৃণমূলের একমাত্র সলতে ছিলেন। সেইখান থেকে আজ শাসক দলের প্রধান।  লম্বা লড়াইয়ে কখনও তাকে এই ভাষায় ভোট চাইতে দেখিনি।

শেষ বিধানসভা নির্বাচনে বাংলা নিজের মেয়ের দলকে চাইলেও মেয়েকে চায়নি। তাই কি কোনও ভয়, আশঙ্কার কুয়াশা ভবানীপুরের আনাচে কানাচে! আসলে শুভেন্দু অধিকারী যত হেভিওয়েটই হোন না কেন তিনি যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে দেবেন, এটা স্বপ্নেও ভাবেননি মমতা নিজে বা তৃণমূলে তার মোসায়েবরা। ব্যবধান কম বেশি নিয়ে আলোচনা হলেও মমতার জয় নিয়ে সংশয় ছিল না কারও। রাজ্য জুড়ে তৃণমূলের ব্যপক জয়েও কিন্তু এই হারই গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে এখনও। তাই তো মমতাও আর নিজের ঘর ছেড়ে বেরতে চাননি। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কেও জেতা আসন ছেড়ে দিতে হল শুধু ঘরের মেয়েকে নিজের আসন দেওয়ার জন্য। মমতা কিন্তু সহজেই খড়দা থেকে দাঁড়াতে পারতেন। কিন্তু সেই ঝুঁকি তিনি নিতে চাননি। খড়দা আসনটিও কিন্তু মাঝে মধ্যেই বদল ঘটায়। কি দরকার ঝুঁকি নিয়ে। 

সে হতেই পারে, তৃণমূলের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার বা থাকার এই যে প্রকাশ্য আকুতি তা আমাদের চেনা তৃণমূল নেত্রীকে অনেকটাই অচেনা করে তুলেছে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী যদি না হন, তাহলেও যে সংখ্যা গরিষ্ঠতা তৃণমূলের আছে তাতে তারা সরকারে সহজেই থাকবে। তৃণমূলের তরফেই কেউ হয়তো মুখ্যমন্ত্রী হবেন। তৃণমূল সুপ্রিমো হিসেবে মমতা তখনও শাসনই করতে পারবেন পরোক্ষ ভাবে। যেমনটা এর আগে অনীল বিশ্বাস, বিমান বসুরা করে গিয়েছেন। কিন্তু বছর দশেকের অভ্যেস, ক্ষমতার শীর্ষে থাকার সুখ, সর্বময় কর্তৃত্বের তৃপ্তি, মুখ্যমন্ত্রী চেয়ারটা ছেড়ে দিতে তাকে বড়ই কষ্ট দিচ্ছে। তাই বোধহয় এমন আকুতি।

তাঁর মতে এনআরসির বিরুদ্ধে লড়াই, বিজেপির নানান জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, দাঙ্গা হাঙ্গামার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর মুখ্যমন্ত্রী থাকা প্রয়োজন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী না থাকলে কি এই সব সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই সম্ভব নয়? বরং তিনি তো জাতীয় স্তরে আরও বেশি করে সময় দিতে পারতেন। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি এখন সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ডরাচ্ছেন মনে হয়। ভবানীপুরে তাঁর জয় নিয়ে খুব একটা সংশয় কিন্তু নেই। আশা করা যায় তিনি সহজেই জিতবেন। বিপক্ষে প্রার্থীও খুব একটা হেভিওয়েট বলা যায় না, শুভেন্দুর মত তো নয়ই। তা স্বত্বেও কিন্তু প্রচারে সামান্যতম ঢিলে দিচ্ছেন না তিনি।

এবার চেষ্টা করি এই আকুতির কারন অনুসন্ধানে। আসলে তিনি না থাকলে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন? সেটা সত্যিই একটা চাপের বিষয়। অভিষেককে বসাতে গেলে আবার তাকে অন্য কোনও জায়গা থেকে জিতিয়ে আনতে হবে, এছাড়াও তিনি এখনই এতটা চাপ নিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অন্য কাউকে ওই পদে বসালে ভিতরে ভিতরে একটা অন্তর্দ্বন্দ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এমনিতেই তৃণমূল দলে অন্তর্কলহ ভাইরাল ফিভারের মত, মাঝে মধ্যেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। নেত্রীর সিদ্ধান্তে মুখে কেউ কিছু না বললেও মন থেকে মেনে না নেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। তাই দল চালাতে গেলে তাকেই মুখ্যমন্ত্রী থাকতে হবে, না হলে সমস্যা আছে। এটা মমতা ভাল মতই জানেন, তাই তিনি মুখ্যমন্ত্রীত্বে থাকার এই সুযোগটিকে এমন আবেগঘন ভাবে ব্যবহার করছেন। এখন ঘরের মেয়ের এমন আকুতি, আবদারের প্রত্যুত্তর ভবানীপুর কিভাবে দেয় সেটাই দেখার। আমরা কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেই চেনা, লড়াকু অগ্নিকন্যা হিসেবেই দেখতে চাই, সে তিনি মুখ্যমন্ত্রী থাকুন বা না থাকুন।

(www.theoffnews.com - Mamata Banerjee Bhabanipur election)

কাজী নূর, কবি, সাহিত্যিক ও ফিচার রাইটার, বাংলাদেশ:

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং পুরনো সিনেমা  হল হিসেবে পরিচিত যশোরের 'মণিহার সিনেমা'। আসন সংখ্যার দিক থেকে সর্ববৃহৎ এই সিনেমা হলটিতে এক সময় রাজধানী ঢাকার সঙ্গে প্রতিযোগীতা করে সিনেমা রিলিজ দেওয়া হতো। নতুন কোন ছবি রিলিজ হলে সে ছবির নায়ক নায়িকা 'মণিহার' এ আসতেন, এমনকি দর্শকদের পাশে বসে সিনেমা দেখতেন, অটোগ্রাফ দিতেন। সে সময় হলে প্রবেশে  দর্শকদের দীর্ঘ লাইন পড়তো যা ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্ল্যাকে টিকিট পাওয়াও ছিল দুষ্কর।  দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে রীতিমতো বেগ পোহাতে হতো আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বহু পর্যটক আসতেন ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল 'মণিহার' দর্শনে। রুপালী জগতের এমন স্বর্ণালী যুগ এখন ধুলো পড়া ইতিহাস। 'মণিহার' এর সেই জৌলুশ এখন আর নেই। নেই দর্শকদের বাঁধ ভাঙা উচ্ছাস আর সেই ঠাঁসা ভিড়।

'মণিহার সিনেমা' প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ঘেটে জানা যায় ১৯৮২ সালে একটি সিনেমা হলের জন্য নান্দনিক এবং শ্রুতিমধুর নাম আহ্বান করে দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোঃ সিরাজুল ইসলাম। পরবর্তীতে জমা পড়া কয়েকশো নামের মধ্যে 'মণিহার' নামটিই চুড়ান্ত করেন 'মণিহার সিনেমা' র প্রতিষ্ঠাতা মোঃ সিরাজুল ইসলাম। এর দেড় বছর পর ১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে 'মণিহার সিনেমা'।

পরদিন ৯ ডিসেম্বর প্রথম শো-তে টিকিটের দাম ৫, ১০ এবং ১৫ টাকা নির্ধারণ করে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় 'মণিহার'। বর্তমানে এসব টিকিটের মূল্য ৬০, ৭০ এবং ৮০ (শীততাপ নিয়ন্ত্রিত) টাকা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। 'মণিহার' এর রুপালী পর্দায় প্রথম প্রদর্শিত হয় দেওয়ান নজরুল পরিচালিত জসিম, সোহেল রানা, সুচরিতা এবং রোজিনা অভিনীত ব্যবসা সফল ছবি 'জনি'। 'মণিহার সিনেমা'র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী ব্যবসা করেছে তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ইলিয়াস কাঞ্চন এবং অঞ্জু ঘোষ অভিনীত 'বেদের মেয়ে জোসনা' ছবিটি দিয়ে। ১৯৮৯ সালে রিলিজ পাওয়া 'বেদের মেয়ে জোসনা' ছবিটি টানা তিন মাস চলে 'মণিহার'র পর্দায়।

দেশসেরা স্থপতি কাজী মোঃ হানিফের করা নকশায় চার বিঘা জমির উপর নির্মিত আধুনিক সুযোগ সু্বিধা সম্বলিত চারতলা বিশিষ্ট ভবনে রাজকীয় স্থাপত্যশৈলী, অভ্যন্তরীণ নানা বৈচিত্র্যময়তা এবং নির্মাণ পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের তত্ত্বাবধানে দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ 'মণিহার সিনেমা'কে দিয়েছে স্বাতন্ত্রতা। শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়কে তৎকালীন যশোর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন 'মণিহার সিনেমা'র আসন সংখ্যা এক হাজার চারশো তিরিশটি। করোনা পরিস্থিতি, মানসম্মত ছবির অভাব এবং সর্বোপরি দর্শকের হল বিমুখতার কারনে বারবার লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে 'মণিহার' কতৃপক্ষকে। 'মণিহার সিনেমা'কে সংস্কার করে শীঘ্রই 'মাল্টিপ্লেক্স'এ রূপান্তরের ঘোষণা করেছেন  প্রতিষ্ঠাতা পুত্র এবং হলটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মিঠু।

(www.theoffnews.com - Bangladesh cinema hall manihar)

দেবিকা ভট্টাচার্য, লেখিকা ও লেকচারার, চন্দননগর, হুগলি:

রাজবাড়ির মাঠ আমাদের কাছে মুক্ত বাতাসের কারখানা। ভাণ্ডার শেষ হতে পারে, কিন্তু এ কারখানা বন্ধ হওয়ার নয়। 

এ মাঠ উন্মুক্ত আকাশের নীচে এক টুকরো দূষণমুক্ত পৃথিবী। প্রাতঃভ্রমণ, খালি হাতে ব্যায়াম থেকে শুরু করে বিকেল বেলা ফুটবল, ক্রিকেটের ব্যাট হাতে সকলেই ছুটছে রাজবাড়ির মাঠে। আমাদের স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কোনও কোনও বছর এখানেই অনুষ্ঠিত হতো। কয়েক বছর ধরে শীতকালে সমারোহের সঙ্গে  কয়েকদিনের জন্য পর্যটন উৎসবও হচ্ছে ওই মাঠে।

রাজার আমলে এই  বিশাল মাঠটির চারদিক টগর ফুলের গাছ দিয়ে বেড়ার মতো ঘেরা ছিল। মাঝে ছিল দেশ-বিদেশের গোলাপের বাগান। মোট চারটি ফুল বাগানের মধ্যে আগে দু'টির কথা বলেছি। এইটি সবচেয়ে বড়ো। ছিল এক বিরাট সূর্য ঘড়ি।বাবার সঙ্গে গিয়ে বুঝেছি সূর্য ঘড়ির ব্যাপারটা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোদ আসবে বলেই অত্ত বড়ো মাঠখানা। সূর্যঘড়িখানা বহুদিন পর্যন্ত ছিল, পরে কারা যেন তুলে নিয়ে যায়। 'রাজা বিনে রাজত্ব আটকায় না'-একথা সত্যি হতে পারে; কিন্তু 'সে রাজাও নেই, আর রাজত্বও নেই'—ধ্রুব সত্যি।

গরমের ছুটি পড়লে ছোটবেলায় (ক্লাস থ্রি-ফোর) ‍ঠাকুমার কথা শুনে ভোর হতেই মাঠে যেতাম। মাঠটি একবার দৌড়ে প্রদক্ষিণ করতে প্রাণটা আমার সত্যি সত্যি ঠোঁটের কাছে চলে আসত। যাকে বলে 'ওষ্ঠাগত প্রাণ'। আর যারা দৌড়তে পারত তাদের আমি একদৃষ্টে দেখতাম, হাঁফাচ্ছে আর দৌড়চ্ছে। দাদুর কাছে রাজবাড়ির গল্প শুনে শুনে এমন হয়েছিল মাঠে দাঁড়ালেই আমি ভাবতে বসতাম, বেশ, এখানে রানিদের বাগান! রানিরা সাজি ভরে ফুল তুলছে! কতটা অন্তর গাছগুলো থাকতে পারে পা দিয়ে মাপতাম। একদিন সকালে হলো কী—একটা ফুটবল এসে হাঁটুর কাছে লাগল। খেলুড়েরা দৌড়ে এল, একজন বলে উঠল- "এই রে! তারাসাধন ভট্টাচার্যের মায়ের পায়ে লেগেছে। বলেই পা ঝাড়তে বসে গেল"। সেই থেকে ভোরবেলা একলা একলা মাঠে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।

এ মাঠ আমার কাছে তেপান্তরের মাঠের সমান। মাঠ পেরোলে দেখা যাবে নতুন সমাজ বাড়ি। এটিও দর্শন যোগ্য। কিন্তু এই বাড়িটিতে ছেলেদের স্কুল করা হয়েছে। তাই যখন তখন প্রবেশের অনুমতি মিলবে না। ছবিতে দেখে নেব। মহিষমর্দিনী গার্লস স্কুল কিন্তু অন্যত্র। নতুন সমাজ বাড়িতে বিচার সভা বসত। হিসাবপত্র দেখা হোত। 

পুরোনো  সমাজ বাড়ি নিচের রাস্তায়। সে বাড়িটির এখন জরাজীর্ণ অবস্থা। আরও কিছু দিন পর 'জ্যোতিষ্ক লোকের পথে কিছু মাত্র চিহ্ন রাখিবে না'। এখানে তেজচাঁদ এবং তাঁর প্রধান মহিষী কমল কুমারীর সমাধি রয়েছে। 

এই পর্বে মহিষমর্দিনী স্কুলের ছবি দেখে নিয়ে মাঠ পেরিয়ে চলে যাব ছোট্ট এক রিভলভিং (revolving) গেটের কাছে। একজন একজন করে সবাই ঢুকে পড়ব। (ক্রমশঃ)

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Ambika Kalna)

দেবিকা ভট্টাচার্য, লেখিকা ও লেকচারার, চন্দননগর, হুগলি:

গাজনের সন্ন্যাসী একটা শূল বিঁধিয়ে চড়কি নাচন দেখায়; নেহাতই এক সংসারী মানুষ হয়ে আমি, পিঠে সাতটি শূল গেঁথে কী চড়কি পাক খাচ্ছি! বসে আছে বন্ধুরা কালনা রাজবাড়ির পিত্যেশে! আর আমি —হা-পিত্যেশ!

এবার সত্যি এসে গেছি। চলো! 

রাজবাড়ি চত্বর! হ্যাঁ, কালনায় শুধু 'রাজবাড়ি' নয়, 'রাজবাড়ি চত্বর'। আগের পর্বে রাজাদের নাম আর ইতিহাস খানিকটা বলে রেখেছিলাম এই কারণে, যে, আমাদের রাজবাড়ির সঙ্গে যে নামগুলি জড়িয়ে থাকবে তাঁদের আর অচেনা লাগবে না। রাজা কীর্তিচাঁদ থেকে প্রতাপচাঁদ পর্যন্ত নাম পাওয়া যাবে কালনার মন্দিরগুলি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। মহাতাবচাঁদ থেকে উদয়চাঁদ পর্যন্ত (রাজন্য প্রথা বিলোপ পর্যন্ত) রাজাদের পাব  তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে। 

এখন যে জায়গাকে ফটক দ্বার বলা হয়, সেখানে ছিল রাজবাড়ির 'ফটক' অর্থাৎ দরজা। এখন শুধু নামটুকু আছে। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া না থাকলেও রাজার গরু থাকত 'গয়লা পাড়া'য়।সেই নামটি এখনও আছে; বলা বাহুল্য, রাজার না হোক; গরু এবং তার সেবক এখনও আছে সে পাড়ায়, তাই আমাদের জন্য গরুর দুধও আছে।

ফটক দ্বার পেরিয়ে চক্ বাজারের মধ্যে দিয়ে গিয়ে রাজবাড়ির প্রধান দরজা। এই দরজা ধরে রেখেছে আস্ত একখানি বাড়ি। এই বাড়ির উপরে নহবতখানায় এককালে ভোরবেলা ভোরের রাগিণী বাজিয়ে কালনাবাসীর ঘুম ভাঙানো হতো। নীচতলায় থাকত রাজ কর্মচারী। শিব চতুর্দশী থেকে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত রাজবাড়িতে চলত রামগান। যাঁরা গান শোনাতে আসতেন তাঁরাও থাকতেন এই বাড়িটিতে। ১৯৭২ খ্রীষ্টাব্দে বাড়িটি আঠারো হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়, সিপিএম পার্টির কার্যালয় হয় সেখানে। আর এখান থেকেই শুরু এখনকার রাজবাড়ি চত্বর। 

অম্বিকা কালনার রাজবাড়ি, তথাকথিত আর কয়েকটি রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ির আদলে নয়। রাজার বাসস্থানকে যদি রাজবাড়ি বলা হয়, তবে এখানেই বলে রাখা ভালো, এখানে রাজার বাসস্থানটি বাইরে থেকেই দর্শন করতে হবে। তাঁদের ব্যবহৃত খাট-পালঙ্ক, বিষয় বৈভব কিছুরই দর্শন মিলবে না। বাড়িটি এই চত্বরের একটি পাশে পড়ে আছে। সুন্দর আলসে দেওয়া বড় তিন তলা রাজবাড়িটি আজ অযত্নে শ্রীহীন। ছোটোবেলায় সেখানে মিলিটারিদের দেখেছি, সঙ্গে দেখেছি বন্দুকও। কখনও পিসিমণি, কখনও বাবার সঙ্গে ভিতরে ঢুকেছি কিন্তু তখন এত ছোটো ছিলাম পরিষ্কার করে কিছু মনে পড়ে না। চোখে ভাসে, ভিতরে বড়ো বাঁধানো উঠোন মতো, একখানা ঘর খোলা। যে ক'টি মানুষ রয়েছে তাঁদের গায়ে মিলিটারিদের পোশাক আর বন্দুক। সে রাস্তা একটু নির্জন থাকাতে বেশি যেতাম না। পরে শুনেছি একটা অংশে ভূমি সংস্কার (সেটেলমেন্ট) আপিস বসানো হয়েছে। কিন্তু সে বাড়ি এখন তালাবন্ধ। জীর্ণ অবস্থা বাড়িটির। আশার কথা এই যে, রাজার এই বাসাবাড়িতে যাত্রীনিবাস তৈরির পরিকল্পনা চলছে। এটা আমাদের কাছে বড় আনন্দের বিষয়।

আমরা রাজার বাসাবাড়ি বাইরে থেকে দেখে, প্রধান দরজার এক্কেবারে সোজা রাস্তাটি ধরব। দু'পাশে দুটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা মাঠের মাঝখান দিয়ে লাল মোরামের পথ। ওই দু'টি মাঠে রাজাদের গোলাপ বাগান ছিল। বিভিন্ন রঙের গোলাপ ফুটত সেই বাগানে। আমাদের ছোটোবেলায় এই মাঠ দু'টিতে স্কাউট এবং গাইডের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আর মাঝের ওই পথের বাঁদিক ঘেঁষে ছিল এক বিশাল বকুল গাছ। তার তলায় উঁচু বেদিতে ছিল এক কামান। কামানটিতে বেলা বারোটা বাজলে তোপ দাগা হতো। কামানের গোলা বেরিয়ে যেত প্রধান দরজার উপরে তৈরি নির্দিষ্ট গোলাকার পথে। বর্তমানে কামানটি তুলে নিয়ে প্রতাপেশ্বর মন্দিরের পাশে দর্শন যোগ্য করে রাখা হয়েছে।

আরও একটু সোজা এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে উঁচু পাঁচিলে ঘেরা এক মন্দির। প্রবেশ পথে পৌঁছতে মন্দিরকে ডান হাতে রেখে পেরোতে হবে আরও অনেকটা পথ। সেই পথ পেরোতে গেলে বাঁহাতে পাব বিশাল এক মাঠ। এই হলো আমাদের রাজবাড়ির মাঠ। আগে রাস্তা থেকে অনেকটা উঁচু ছিল এই মাঠ। এখন রাস্তা উঁচু হয়েছে, না মাঠের মাটি ধ্বসে গেছে জানি না, অনেকটা নীচু লাগে। ওই মাঠে রাজার আমলে কী ছিল? (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Ambika Kalna)

(www.theoffnews.com - Russia parliament election)
 

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

“জিএসটি কাউন্সিল মনে করে, পেট্রোপণ্যকে জিএসটি-র আওতায় আনার এটা আদর্শ সময় নয়।” অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের এই ছোট্ট উক্তি বা বক্তব্য দেশবাসীর আশায় জল ঢেলে দিল। গোটা দেশের মানুষই প্রবল আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন লখনৌতে হওয়া জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠকের দিকে। জোর গুজব ছিল পেট্রোল ও ডিজেলের দামকে জিএসটির আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে আলোচনা হবে। কেরালা হাইকোর্টের নির্দেশে বিষয়টি আলোচনাতে ওঠেও, কিন্তু সেই আলোচনার পরে অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্য হতাশ করেছে আমাদের সকলকেই।

সম্প্রতি একটি সমীক্ষা উল্লেখ করে ইকোনোমিক টাইমস জানিয়েছিল প্রতি ৫ জন ভারতীয়ের মধ্যে ৪ জনই চাইছেন, পেট্রোল-ডিজেলের উপর জিএসটি লাগু করুক কেন্দ্র। এতে জ্বালানির দাম তো বটেই, নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও অনেকটা কমবে বলেই মনে করছেন তাঁরা। ওই সমীক্ষা বলছে, ৭৭ শতাংশ সাধারণ মানুষই জ্বালানিতে জিএসটি লাগুর পক্ষে। এই মুহূর্তে জ্বালানির উপর যদি ২৮ শতাংশ হারে জিএসটি লাগু হয়, তবে পেট্রোলের দাম দাঁড়াবে লিটার প্রতি প্রায় ৭৫ টাকা। ডিজেলের দাম হবে লিটার প্রতি ৬৮ টাকার মত। দাম কমলেই, এর একটা বিপুল প্রভাব পড়বে অর্থনীতির উপর। সাধারণ মানুষের খরচ করার প্রবণতা বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়ার উপরে রাজনৈতিক নেতাদের যে কোনও আবেগ বা দায়িত্ব কাজ করে না তা ফের বুঝিয়ে দিল এই সিদ্ধান্ত। কোভিড পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতি এমনিতেই জরাপ্রাপ্ত। সাধারণ মানুষের হাতে টাকা নেই, কাজ নেই। সেই সময় দেশে জ্বালানীর দাম আকাশ ছোঁয়া। সকলেই চাইছিলেন তার সুরাহা হোক। কিন্তু সে আশায় জল ঢাললেন রাজনৈতিক নেতারা। 

কেরালা, তামিলনাডু, দিল্লী, পঞ্জাব, গোয়া,  মহারাষ্ট্রের মত বেশ কিছু রাজ্যের আপত্তিতে পেট্রোপন্যকে জিএসটির অন্তর্ভুক্ত করা গেল না এমনটাই দাবি কেন্দ্রের। কেন্দ্রের পেট্রোল ডিজেলের দাম কমানোতে সদিচ্ছা কতটা তা এতদিনে আমরা সকলেই বেশ বুঝে গিয়েছি। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার সময় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ১০৯ ডলার। আর ভারতে পেট্রোলের দাম ছিল লিটার পিছু ৭৯ টাকা ৩৬ পয়সা। এখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭১ ডলার, এবং দেশে পেট্রোলের দাম ১০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে মাস খানেক ধরে। ডিজেলের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। কেরালা হাইকোর্টের নির্দেশে জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠকে এই বিষয়টি তুলতে বাধ্য হলেও কেন্দ্রে বিজেপি সরকার কখনই খোলা মনে চায়নি পেট্রোপন্য সস্তা হোক। এবার রাজ্যগুলি আপত্তি তোলাতে কেন্দ্রের আরও সুবিধা হল। এবার তারা সহজেই বলতে পারছে যে রাজ্যের আপত্তিতেই তেলের দাম কমানো গেল না। বিজেপি কিন্তু এটাই চাইছিল। রাজ্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জয়ের মুচকি হাসি তাদের মুখে। 

বিরোধীরা তেলের দাম কমানো নিয়ে নানান লোক দেখানো আন্দোলন করেছেন, কুম্ভীরাশ্রু নিক্ষেপ করেছেন গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায়। রাহুল গান্ধী নিজে সাইকেলে চেপে সংসদে গিয়েছেন। কিন্তু জিএসটিতে জ্বালানী তেলের দাম অন্তর্ভুক্তির প্রসঙ্গ উঠতেই তারা রাজস্ব আদায় কম হওয়ার অজুহাতে রে রে করে উঠলেন। আমাদের বাংলা অবশ্য এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেনি বলেই শুনলাম। কিন্তু অন্য বিজেপি এবং অবিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যই এ ব্যাপারে একবাক্যে না করে দিয়েছে। 

একটা বিষয় এখান থেকে পরিস্কার, পেট্রোপন্যের দাম কমুক সেটা কেউই চায় না। মূল উদ্দেশ্য রাজস্ব আদায়, যেটা এখান থেকে খুব সহজেই কেন্দ্র ও রাজ্যের পকেটে আসে। বাকি পেট্রোপন্যের দাম বাড়লে প্রতিবাদ, আন্দোলন যে শুধুই নাটক তা আজ স্পষ্ট । দেশে যখন পেট্রোলের দাম ১০০ টাকা লিটার ছাড়িয়েছে, ডিজেলের দাম ১০০ টাকার আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। তার ফলস্বরূপ বাজারে প্রত্যেকটি জিনিস অগ্নিমূল্য, তখনও কিন্তু দেশ এবং রাজ্যের অধিকাংশ অর্থমন্ত্রীরা মনে করেন পেট্রোল ডিজেলের দাম জিএসটিতে আনার এটা সঠিক সময় নয়। সেই সঠিক বা উপযুক্ত সময়টা ঠিক কখন আসবে সেই দিকে তাকিয়েই দিন তথা জীবন কেটে যাবে দেশবাসীর।

(www.theoffnews.com - petroleum GST)

দেবিকা ভট্টাচার্য, লেখিকা ও লেকচারার, চন্দননগর, হুগলি:

ধর্মের বল নাকি অনন্ত নির্ঝর থেকে নিঃসৃত। এইজন্য সে, আপাতত অসুবিধা, বারবার পরাজয় এমনকি মৃত্যুকেও ভয় পায় না। বিচার বুদ্ধির সীমা—ফলাফল লাভে বা মৃত্যুতেই আবদ্ধ কিন্তু ধর্মের  কোনও গণ্ডী হয় না। একটিমাত্র কুয়োয় কি সমস্ত দেশের তৃষ্ণা দূর হতে পারে যেখানে আবার তার অনাবৃষ্টিতে শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে? কিন্তু যেখানে চির নিঃসৃত নদী প্রবাহিত, সেখানে যে কেবল তৃষ্ণা নিবারণের কারণ বর্তমান তা নয়, সেখানে সেই নদী থেকে স্বাস্থ্য জনক বায়ু প্রবাহিত হয়, দেশের মলিনতা ধৌত হয়, ক্ষেত্র শস্যপূর্ণাও হয়; এককথায় সমগ্র দেশের শ্রী বৃদ্ধি হয়। ঠিক তেমনই বুদ্ধি-বলে কিছুদিনের জন্য সমাজ রক্ষা হতে পারে, কিন্তু ধর্ম-বলে চিরদিন সমাজের রক্ষা হয়, সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে সমাজের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য বিকশিত হতে থাকে। 

এত কথা বলা এই জন্য, এবার যেখানে নিয়ে যাব, সেই রাজবাড়ি চত্বরে প্রবেশ করার আগে বর্ধমান মহারাজাদের সম্পর্কে নিজেদের মনে একটা ধারণা, একটু শ্রদ্ধার স্থান তৈরি করা। রাজপরিবারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ধর্মের প্রকৃত অর্থ তাঁরা বুঝেছিলেন। এই রাজবংশ সকল সম্প্রদায়ের ধর্মচর্চাতে এবং ধর্মীয় স্থান প্রতিষ্ঠাতে যথেষ্ট বড় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। 

শোনা যায়, ১৬১০ খ্রীষ্টাব্দে পাঞ্জাবের লাহোরের কোটলি মহল্লার অধিবাসী সঙ্গম রায় পুরী ভ্রমণ করে ফিরে যাওয়ার পথে ভুল করে বর্ধমান উপস্থিত হন এবং গাংপুরের কাছে বল্লুকা নদীতীরে তাঁবু ফেলেন। তাঁর আর পাঞ্জাব ফিরে যাওয়া হয়নি। কম্বল, শাল এবং তেজারতি ব্যবসা করে বর্ধমান থেকে পাঁচ মাইল দূরে বৈকুণ্ঠপুরে বসতি স্থাপন করেন। তখন নবাব জাহাঙ্গীরের আমল। বর্ধমানের জায়গীরদার শের আফগান নিহত হয়েছেন, তাঁর পত্নী নূরজাহানকে জাহাঙ্গীর দিয়েছেন সম্রাজ্ঞীর সম্মান। সেই মোগল আমল থেকে শুরু এক ব্যবসায়ীর উত্তর পুরুষদের রাজা হয়ে ওঠার গল্প। ১. সঙ্গম রায়— বঙ্কুবিহারী রায় (দিল্লি সম্রাটের প্রতি আনুগত্য ও বিপদকালে সাহায্যদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছিলেন রায়-ই-রায়ান উপাধি)- ২. আবুরাম রায় (১৬৫৭ সালে কোতোয়ালের পদ লাভ করেন)— ৩. বাবুরাম রায় (বার্ষিক তিন লক্ষ টাকা খাজনার বিনিময়ে বর্ধমান ও তিনটি মহলের অধিকার লাভ করেন) — ৪. ঘনশ্যাম রায়— ৫. কৃষ্ণরাম রায় (জমিদারি প্রসারিত করেন, সম্রাট ঔরঙ্গজেবের ফরমান অনুসারে পরগণার বর্ধমানের জমিদার এবং চৌধুরী পরিচয় সম্মানিত হন)— ৬. কীর্তিচাঁদ রায় (উত্তরাধিকার সূত্রে ৪৯ টি মৌজার জমিদারি লাভ করেন— ৭. চিত্রসেন রায় (মুঘল সনদ অনুযায়ী 'রাজা' উপাধি সহ জমিদারি লাভ করেন)— ৮. রাজা ত্রিলোকচাঁদ—  ৯. রাজা তেজচাঁদ— ১০. রাজা প্রতাপচাঁদ (জীবনটিকে ঘিরে উত্তমকুমার অভিনীত 'সন্ন্যাসী রাজা' সিনেমার প্লট লক্ষ করা যাবে)— ১১. মহাতাব চাঁদ— ১২. আফতাব চাঁদ— ১৩. বিজয়চাঁদ— ১৪. উদয়চাঁদ (১৯৫৩ রাজন্য প্রথার বিলোপ ঘটে) — এই হলো বর্ধমান রাজের ১৪ পুরুষের হিসাব। এঁদের মধ্যে আমরা কালনাবাসী, কীর্তিচাঁদ ও তাঁর মাতা ব্রজকিশোরী দেবী থেকে তেজচাঁদ পর্যন্ত রাজাদের সঙ্গে পরিচিত হবো কালনায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্দিরের মাধ্যমে। প্রতাপচাঁদ, সে জাল বা সত্যি যাইহোক শেষবারের মতো তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল এই কালনা থেকেই। এরপর যেসব রাজার নাম রয়েছে (মহাতাব থেকে বিজয়চাঁদ পর্যন্ত প্রত্যেকেই দত্তক পুত্র), এঁরা কালনার মন্দির বা অন্যান্য বিষয় রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন দায়িত্বের সঙ্গেই। এই রাজবংশের রাজাদের হুকুমনামাগুলি প্রমাণ করে যে, তাঁরা কোনও বিশেষ সম্প্রদায়কে অধিক সমর্থন করে 'দাপুটে শ্রেণী'তে পরিণত হননি।

যেহেতু আমাদের মন্দির পরিদর্শনই প্রধান উদ্দেশ্য তাই রাজাদের গল্প আর না বাড়িয়ে চলে যাব কালনার ফটকদ্বার অর্থাৎ যেখানে এককালে রাজবাড়ির প্রধান দরজা ছিল, তা পেরিয়ে (নামটাই আছে, ফটক নেই) নব কৈলাশ মন্দির বা ১০৮ শিবমন্দিরের দিকে। বিষ্ণুপুরে রাজকীয় ভূসম্পত্তির স্থানান্তর এবং মালিকানা উদযাপন করার জন্য ১৮০৯ সালে মহারাজা তেজ চন্দ্র বাহাদুর দ্বারা এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল। একটি স্থাপত্য বিস্ময়, এই মন্দিরের কাঠামো দুটি সমকেন্দ্রিক বৃত্তের একটি সমন্বয়, যার মধ্যে প্রতিটি ছোট মন্দির ভগবান শিবকে নিবেদিত করা হয়েছে। এটি একটি পুঁতির অক্ষমালাকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং এই মন্দিরের দেয়ালে রামায়ণ ও মহাভারতের কিছু  চিত্র এবং শিকারের বহু দৃশ্য রয়েছে। বাইরের দিকে চুয়াত্তরটি মন্দির আছে এবং ভিতরে চৌত্রিশটি মন্দির আছে যেগুলি মঙ্গলকর চিন্তাভাবনাসহ পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে নির্মিত হয়েছে। এই ১০৮ টি মন্দিরের প্রতিটিতে একটি করে শিব লিঙ্গ রয়েছে। ভেতরের প্রতিটি শিব লিঙ্গ সাদা রঙের; বাইরের বৃত্তে অর্ধেক শিবলিঙ্গ (একটি সাদা, একটি কালো, এভাবে সাজানো) কালো পাথরের।

বছরের যেকোনও সময় তো মন্দির দর্শন করাই যায়, শিবরাত্রি ব্রততে প্রত্যেক শিবের মাথায় 'নমঃ শিবায়' বলে জল দিলে আপনা আপনি এক'শ আট বার জপ হয়ে যায় ভেবে বেশ রোমাঞ্চ হতো একটা সময়। আমাদের জীবনের সেই সময়টায় মন্দিরের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল বলা যাবে না। মন্দিরগুলির বেশ কয়েকটির গা থেকে খসে পড়ছিল ইটের টুকরো, কোনোটার দরজা ভাঙা, কোনোটার ছাদ থেকে চাঙর খসে আসছে। এখন একটু যত্ন নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বহু মন্দিরের গা থেকে হারিয়ে গেছে নকশা, কারুকার্য। মন্দিরগুলির অবস্থা খুব ভালো না হলেও এখন অন্তত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয়, বাগানটিরও বেশ  যত্ন নেওয়া হচ্ছে বলেই মনে হয়।

১০৮ শিব মন্দিরের সঙ্গে  বাইরের দিকে আরও দু'টি শিব মন্দির একই সঙ্গে উদ্বোধন হয়েছিল বলে শুনেছি বাবার কাছে। এও শুনেছি ওই মোট ১১০ টি শিব প্রতিষ্ঠার দিন বাইশজন পণ্ডিতকে বর্ধমান জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা হয়েছিল রাজার ইচ্ছানুসারেই। প্রত্যেক ব্রাহ্মণের উপর দেওয়া হয়েছিল পাঁচটি করে শিবপ্রতিষ্ঠার ভার। আমার পূর্বপুরুষ অম্বিকা কালনায় এসেছিলেন তখনই। আমার দাদু লক্ষ্মী নারায়ণ ভট্টাচার্যের পূর্বপুরুষ রামজয় তর্কভূষণ (বন্দ্যোপাধ্যায়) ছিলেন শঙ্করপুরের (গন্তার থানা) বাসিন্দা। সেখান থেকে, এই মন্দির প্রতিষ্ঠা সূত্রেই কালনায় আসা; গঙ্গার (তখন গতিপথ ছিল অন্য) ধারে বসতি স্থাপন (রাজা কিছুটা নিষ্কর জমি দান করেন), প্রতি মাসে (প্রথমে কত ছিল জানা যায়নি) সাম্মানিক পেয়ে সংসার প্রতিপালন। পুরুষানুক্রমে চলতে থাকে ১০৮ শিব বাড়ির সেবা।

জানি, ইতিহাসের এত কচকচি ভালো লাগছে না, কিন্তু এখানে একটা কথা জানাই, আমিও ছোটোকাকার কাছ থেকে সদ্যই জেনেছি, বেনারসের বাসিন্দা বিদ্যানিধি শর্মা বর্ধমান নবাবহাটের ১০৮ শিব মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় ১৭৯০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ বর্ধমান রাজার অনুগ্রহে বর্ধমানে আসেন। তাঁরই চতুর্থ পুরুষ এলেন কালনার মন্দির প্রতিষ্ঠায়। তর্কভূষণের উত্তর পুরুষ আমি, দেখা যদি হতো একবার, তর্কটা আয়ত্ত করেই ছাড়তাম।

রাজাদের ইতিহাস স্বাভাবিকভাবেই বহু আলোচিত। রাজন্য প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত রাজা এখানে না থাকলেও চার পুরুষ পর্যন্ত সেই সাম্মানিক দেওয়া হতো। বাবার স্মৃতি অনুযায়ী মাসোহারা বারো আনা থেকে হয়েছিল পাঁচ টাকা। পরে বিভিন্ন কাজের চাপে দাদু ১০৮ শিব মন্দিরের দায়িত্ব ভার তাঁরই পরিচিত অপরজনের হাতে তুলে দেন। রাজাদের ইতিহাস স্বাভাবিকভাবেই বহু আলোচিত। কিন্তু কে আর মনে রাখে কারা এই স্থাপত্য নির্মাণ করল আর কাদের হাতে মন্দিরে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হল? রাজার দেওয়া 'ভট্টাচার্য' উপাধিটুকু আজ রয়ে গেছে। কিন্তু দাদুর কাছে বসে রাজবাড়ি আর রাজার গল্প শুনতে শুনতে যে অদ্ভুত টান সেখানকার প্রতি জন্মেছি, তারই বশে তোমাদের কাছে গল্প শোনাতে বসে গেছি। শুধু ১০৮ শিব বাড়ি নয়, আমাদের অনেকেরই খেলা, বড়ো হয়ে ওঠা ঘিরে রাজবাড়ি, রাজবাড়ির মাঠের গল্প। (ক্রমশঃ)

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Ambika Kalna)

দেবর্ষি মজুমদার, লেখক, বীরভূম:

একজনের সাদা ধবধবে গোঁফ। আরেকজনের কলপ কালো। কিন্তু দুজনেরই মোটা গোঁফ। উপাচার্য বা অনুব্রত কেউ কম যান না। তাই বিতর্ক দুজনের পিছু ছাড়ে না। বোলপুরবাসী তা বিভিন্ন সময়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে অস্বস্তিতেও পড়েন।

এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের চোর আখ্যা দিয়ে বিতর্কে জড়ালেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। আগেই অনুব্রতকে বাহুবলী বলেছেন। পাল্টা অনুব্রত 'অপদার্থ উপাচার্য' বলেছেন। তারও আগে 'পাগল' উপাচার্য বলেছেন। 

তবে বিতর্কিত মন্তব্যে এখন সব থেকে বেশি ফর্মে আছেন উপাচার্য স্বয়ং। শুক্রবার রাত থেকে বেশ কয়েক কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। যেখানে উপাচার্যের বেশ কিছু বিতর্কিত মন্তব্য সামনে উঠে এসেছে। যদিও এই সমস্ত ভিডিও-র সত্যতা যাচাই করেনি প্রতিবেদক। 

বিশ্বভারতী সূত্রে খবর, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের নিয়ে বৃহস্পতিবার একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে বসেন উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মসচিব অশোক মাহাতো, উপাচার্যের আপ্ত সহায়ক তন্ময় নাগ সহ অন্যান্য আধিকারিকেরা।

সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের প্রকাশ্যেই চোর আখ্যা দিয়েছেন উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। সঙ্গীত ভবনের থেকে প্রশ্নপত্র চুরি যাওয়ার ঘটনাকে সামনে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাঁদেরকে চোর আখ্যা  দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি উপাচার্য।

অধ্যাপকদের শুধু চোর আখ্যা দেওয়া নয়, এবার থেকে নিজেদের ডিপার্টমেন্ট বা ভবনের চুরি রুখতেও সক্রিয় হতে হবে অধ্যাপকদের বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি এই বিষয়ে তাদের কাছ থেকে মুচলেকা চেয়েছেন উপাচার্য। 

এই ভিডিও ক্লিপে বীরভূম জেলা তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের নাম না করে তাকে "বাহুবলী" বলে কটাক্ষ করেন উপাচার্য। সেই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, "বাহুবলী"র জন্যই বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ থানায় বিভিন্ন চুরির বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পারছেন না। উপাচার্যকে আরও অভিযোগ করতে শোনা যায় যে, "বাহুবলীর" জন্য বিঘ্নিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। 

সেই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন যে বিশ্বভারতীর বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা "বাহুবলীর" ভয়ে ভীত তাই তারা কোনও চুরির ঘটনা ঘটলে বা কোথাও নির্যাতিত হলে তারা থানাতে অভিযোগ জানাতে ভয় পায়। উপাচার্য অভিযোগ করেছেন যে নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে জানিয়েছেন যে তাদের নামে অভিযোগ দায়ের করলে তারা বাহুবলীর জন্য আর বাড়ি ঢুকতে পারবে না।

যদিও উপাচার্যের এই কটাক্ষের তীব্রভাবে জবাব দিয়েছেন বীরভূম জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল। তিনি বলেন, "ওনার সাহস থাকলে আমার নাম উল্লেখ করে বাহুবলী বলুন। আমার সাহস আছে বলেই ওনাকে আমি বদ্ধ পাগল বলি। কলেজ খুলতে দিন ছাত্র-ছাত্রীরাই ওকে উপযুক্ত শিক্ষা দেবে।"

এদিন ভার্চুয়াল বৈঠকের আরও একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। সেখানে উপাচার্যকে স্পষ্ট বলতে শোনা যায়, "সঙ্গীত ভবনে বিখ্যাত কীর্তনিয়া সুমন ভট্টাচার্যের চাকরি হয়েছে আমার জন্য। তাঁকে সঙ্গীত ভবনের অন্যান্য অধ্যাপক, অধ্যাপিকারা পছন্দ করতেন না।’’ এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে কি ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় থাকা দুই সিনিয়ার অধ্যাপকের আপত্তি সত্ত্বেও উপাচার্য জোর করে তাকে অধ্যাপক পদে নিয়োগ করেছিলেন।

স্বাভাবিকভাবেই এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই বিতর্ক আরও জোরালো ভাবে দানা বেঁধেছে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে।

(www.theoffnews.com - Visva Bharati University Bidyut Chak‌raborty Anubrata Mondal)

দেবিকা ভট্টাচার্য, লেখিকা ও লেকচারার, চন্দননগর, হুগলি:

ভেবেছিলাম মানস ভ্রমণে কোনও বাধা-বিপত্তি, ঝুট ঝামেলা নেই। কিন্তু সদলবলে মানস ভ্রমণে বেরিয়ে দেখি, মনটাই বড় বিপত্তির কারণ। সে এত অবুঝ, থেকে থেকে বিস্তর ঝামেলায় ফেলে দেয়। কায়িক বা মানসিক যত কিছু কাজ আছে, তা সমাধা করা যায় 'স্থিতপ্রজ্ঞ' হলে।

মনে হয় বায়ুবশ কঠিন যেমন। 

এই মন বশে রাখা কঠিন তেমন।।

মনের বশবর্তী না হয়ে মনকে বশে রেখে চলো আজ ঘুরে আসি কালনার খ্যাত-অখ্যাত কতগুলি দর্শনীয় স্থান থেকে। এমন নয় যে, এগুলি স্থাপত্য ভাস্কর্যের দিক থেকে দর্শনীয়। কিন্তু ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে কোনও কোনও জায়গার। বিখ্যাত জায়গাগুলির প্রতীক্ষায় রয়েছে সবাই, তা জানি। কিন্তু সেসব জায়গা আগে যদি ঘুরে আসি এইসব স্থান যেমন অন্ধকারে আছে তেমনই থেকে যাবে।

১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে কালনা শহরের বিদ্যাবাগীশ পাড়ায় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে জন্ম কালী সাধক কমলাকান্তের। ভট্টাচার্য ছিল তাঁদের প্রাপ্ত উপাধি। কমলাকান্তের বাবা মহেশ্বর ভট্টাচার্য ছিলেন নদীয়া রাজগুরু বংশের পূর্বপুরুষ পণ্ডিত রামচন্দ্রের শাখা বংশধর। তাঁর অকাল প্রয়াণ ঘটে পুত্রের শৈশবেই। পারিবারিক অস্বাচ্ছন্দ্যের কারণেই দুই পুত্রকে নিয়ে তাঁর মা মহামায়াদেবী চলে আসেন চান্না গ্রামে বাপের বাড়িতে। গ্রামটি বর্ধমান–আসানসোল বা বর্ধমান–বোলপুর রেল পথে খানা জংশনের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত। পরে চান্নারই বিশালাক্ষী মন্দিরে কমলাকান্ত পূজারী নিযুক্ত হন এবং টোল স্থাপন করেন। বিশালাক্ষী মন্দিরেই একটি পঞ্চমুণ্ডির আসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং শ্যামাসাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন। বর্ধমান মহারাজা তেজচন্দ্র ও প্রতাপচন্দ্রের গুরুদেব ছিলেন তিনি। বর্ধমান রাজ পরিবারের সভাপণ্ডিতও ছিলেন। শাক্ত কবি হিসাবে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন।

কালনার জন্মভিটেটি দীর্ঘদিন অবহেলিত হয়ে পড়ে থাকার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে সেটির সংস্কার সাধন সম্ভব হয়েছে। এখানে এক কালীমূর্তি রয়েছে, নিত্য পুজোর ব্যবস্থাও আছে। কালীপুজোর সময় জন্মভিটেতে নিষ্ঠার সঙ্গে কালীপুজোর আয়োজন করা হয়।

এবার যাই, কালনার কাঁসারি পাড়ায় আনন্দ আশ্রমে যেটা এক সন্ন্যাসিনীর দ্বারা স্থাপিত, পরিচালিত। শোনা যায় যে সন্ন্যাসিনীর মূর্তি রয়েছে সেখানে, সেই মূর্তি নেপালের রাজকুমারীর। তিনি সংসার জীবনে প্রবেশ করতেই চাননি আর সেজন্যই পিতার আলয় ছেড়ে বেরিয়ে, বিভিন্ন জায়গা পরিভ্রমণ করে কালনায় এসে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। নেপালের অধিবাসী শৈব ধর্মাবলম্বী হওয়ায় সেই মঠে রয়েছেন জ্ঞানেশ্বর মহাদেব; তাঁর পুজাও হয় বছরভর। এই আশ্রমটি, বন্ধু, তোমাদের জন্য বিস্মৃতির অতল থেকে মানস চক্ষে ভেসে উঠল। কথা দিলাম, সে যদি ভালো থাকে আর যদি আমিও, প্রত্যক্ষ করাবো একদিন। সে আমার বড় প্রিয় জায়গা ছিল। কারণ? অনুমান করে নিও। 

আর এক মন্দির রয়েছে কালনা স্টেশন থেকে শহরের দিকে এগিয়ে এসে বারুইপাড়ার দিকে। যোগানন্দের ঝুপড়ি। সেখানে নাকি মাটির নীচে নরবলি হতো। বাবার সঙ্গে গিয়ে দেখেছি মাটির নীচে নয়, বরং একটু ওপরের দিকে এক কালীমূর্তি। গল্প শুনে ভয় ভয় করতো, তাই চারপাশে কখনও ভালো করে তাকাইনি। তবে বর্তমানে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়েছে।

১৯৩০সালের ১৫ই আগষ্ট মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে হয়েছিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। এ আমরা সবাই জানি, যেটা জানি না, সেটা হলো এই কাজে যাঁরা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন উপেন্দ্র নাথ পাল। পরবর্তীকালে তিনি হয়ে ওঠেন নিত্যগৌরবানন্দ অবধূত মহারাজ। অম্বিকা কালনায় গড়ে তোলেন জ্ঞানানন্দ মঠ। এই মঠ একসময় বিপ্লবীদের আখড়া ছিল। আসতেন মাস্টারদা, বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত সহ অন্যান্য বিপ্লবী। এসেছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি এখানে রাত্রিবাস করেছিলেন বলেও জানা যায়। তাঁর ব্যবহৃত চেয়ার, খাট স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে আজও রক্ষিত আছে। বর্তমানে সেখানকার মহারাজ নিত্য প্রেমানন্দ অবধূত জানান, মঠ রক্ষণাবেক্ষণ কষ্টকর হয়ে উঠেছে, কারণ প্রতিশ্রুতি মিললেও সাহায্য মেলে না। তাই এখানে এলে মঠের অধীনে এত বড় জায়গাটির ইঁটের পাঁচিলের গায়ে দেখতে পাবো অবহেলার চিহ্ন। কালনা মহকুমা হাসপাতালের কাছে দু'পাশে সুপুরি গাছ দিয়ে এককালে সাজানো মঠটি বিপ্লবীদের কার্যালয় হিসেবে কেমন ছিল, কল্পনা করে নিতে হবে।

এবার যাবো অম্বিকা কালনার জাপটে ভবাপাগলার ভবানী মন্দিরে। আজকের ভ্রমণে অন্য মন্দিরগুলির তুলনায় পরিচিত এই মন্দির। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের আমতা গ্রামে ভবাপাগলার জন্ম কিন্তু সাধনস্থল হিসাবে কালনাকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। যোগেন্দ্র চৌধুরী এবং জয়া দেবীর তিন সন্তান—গিরীন্দ্র, ভবেন্দ্র এবং দেবেন্দ্রনাথ। ভবেন্দ্র  মোহন চৌধুরীই হলেন ভবা পাগলা। মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও মাত্র সপ্তম শ্রেণি অবধি পড়াশোনা করেন। অল্প বয়স থেকেই মা কালীর সাধনায় ব্রতী হন। কথা কতটা সরল করে বললে মনের কথাটা সবাই বুঝবে, তা খুব ভালো জানতেন কালী সাধক ভবাপাগলা। একাধারে শাক্ত কবি ও অন্য দিকে শিল্পী এবং মাতৃসাধক হিসাবে পরিচিত ছিলেন ভবাপাগলা। তাঁর রচিত শ্যামাসঙ্গীত আজও কালীভক্তদের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা কয়েক হাজার। বাল্য বয়সে তিনি প্রতিমা নিয়েই খেলা করতেন। ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে কিছু দিন কলকাতায় কাটানোর পরে চৈতন্যদেবের জন্মস্থান নবদ্বীপে যাওয়ার পথে কালনায় এসে তাঁর ভালো লেগে যায়। তৈরি করেন ভবানী মন্দির। এই মন্দিরে বসেই তিনি লিখেছেন প্রচুর গান ও কবিতা। তাঁর রচিত সেই সমস্ত গান জায়গা করে নেয় মানুষের মনে। তৈরি হয় তাঁর বহু গুণমুগ্ধ ভক্ত। শুধু ভিন রাজ্য নয়, ভিন দেশেও ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর ভক্ত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভবাপাগলা তাঁর কবিতা ও গানের মাধ্যমে লোক শিক্ষার কাজও করে গিয়েছেন। বেশ কিছু বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন এই সাধক। আলপনা, বেহালা বাজানো, সেলাই, অঙ্কন, হারমোনিয়াম বাজানো--- সবেতেই পারদর্শী ছিলেন তিনি। তাঁর আঁকা ছবি সাজানো রয়েছে মন্দির জুড়ে। ভবাপাগলার ভক্তের তালিকায় রয়েছেন মহানায়ক উত্তম কুমার, মলিনা দেবী, গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা। হৈমন্তী শুক্লার মতো অনেক নামী শিল্পী তাঁর রচিত সাধন সংগীত গেয়েছেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সমরেশ বসু গুণমুগ্ধ ছিলেন ভবাপাগলার। বেশ কয়েকবার তিনি এসেছিলেন ভবার ভবানী মন্দিরে। তাঁর লেখা ‘মুক্তবেণীর উজানে’ ও ‘চলো মন রূপনগরে’--- এই দু’টি উপন্যাসে ভবাপাগলার চরিত্র চিত্রন করেছেন।

ভবানী মন্দিরে বছরভর পুজো হয়। ভবাপাগলার আরাধ্য কালী মূর্তিটি কষ্টি পাথরের। কালীপুজোর দিন বিশেষ পুজো হলেও মহাপুজো অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখ মাসের শেষ শনিবারে। বহু লোক সমাগম হয় এই সময়। সম্ভবত বছর দুয়েক আগে এই অনুষ্ঠানের সময়েই উপচে ভরা ভক্তের ভিড়ে লঞ্চ ডুবির খবর পাওয়া গিয়েছিল। এখানে কালী পুজোর বৈশিষ্ট্য হলো ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্ধ্যাবেলা পুজো শুরু করা। ভবাপাগলা নিজে  পশুবলির ঘোরতর বিরোধী হওয়ায় রীতি মেনে কলা, শসা, আদা, আম ও কুমড়োর বলি হয়। নিত্য পুজোয় ভবাপাগলা দেবীকে খিচুড়ি, মিষ্টি, ফলের ভোগ দিতেন। রীতি মেনে আজও নিত্য পুজোয় তেমনই ভোগ নিবেদন করা হয় দেবীকে। জনশ্রুতি আছে, রোগাক্রান্ত কাউকে ভবা স্পর্শ করলে তিনি সুস্থ হয়ে উঠতেন। বাস্তববাদী ভবা ভক্তদের বলতেন, জন্মিলে মরিতে হবে। নিজের জীবদ্দশাতেই মন্দিরের সামনে বানিয়ে রেখেছিলেন সমাধি। নির্দেশ দিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে সেখানেই সমাধিস্থ করা হয়। শিশুদের খুব ভালোবাসতেন এই সাধক। শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য মন্দির জুড়ে গড়ে তুলেছিলেন পশুশালা যার অবশিষ্টাংশের কিছু আমরা দেখতে পেলেও আজ আর কিচ্ছুটি নেই।

আগামীদিন হয়তো আমাদের কাঙ্ক্ষিত মন্দির চত্বরে চলে আসব। আজকের  মতো বিদায়, বন্ধু! (ক্রমশঃ)

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Ambika Kalna)

দেবিকা ভট্টাচার্য, লেখিকা ও লেকচারার, চন্দননগর, হুগলি:

আজ চলে এসেছি মা'জীর বাড়ি অর্থাৎ আমাদের শ্যামচাঁদের বাড়ি।

বাড়ির ইতিহাস বলার আগে আমি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা জানাবো, সংগীতাচার্য শ্রী গুরুপ্রসাদ মিশ্র মহাশয়কে।

'মা'জীর বাড়ি' নাম কেন হলো, শ্যামচাঁদ যে রাজমাতার জামাই এসব তথ্য অনেকেই কম বেশি জানেন। কিন্তু এটুকুতে আমার মন ভরছিল না। মা'জীর বাড়ির সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের হলেও এতদিনে মনে প্রশ্ন জাগল কেন ওই বাড়ির মানুষজনের পদবী 'ঠাকুর'? এরা কিভাবে সেবায়েত হলেন? যাঁরা বলতে পারতেন, আমার দাদু বা ঠাকুমা কেউই আজ আর নেই। বাবার বয়স হয়েছে, কয়েকদিন ধরে শরীর খারাপ জানা সত্ত্বেও দেখে আসা সম্ভব হচ্ছে না, এসব নিয়ে প্রশ্ন করতে সংকোচ হচ্ছিল। কাকাকে মাত্র একবার সেকথা জানিয়েছিলাম, উনি যে ব্যাপারটাকে এত গুরুত্ব দেবেন, সত্যি ভাবতে পারিনি। উনি শিল্পী মানুষ। প্রকৃত অর্থে শিল্পী বুঝি এমনই উদার হন, সকলের টুকরো টুকরো ইচ্ছের মূল্য দেন। ওনার সুপারিশে খোদ ঠাকুরবাড়ির মালিকের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে দেবোত্তর সম্পত্তি প্রাপ্তির ইতিহাস জানতে পারলাম। ছিন্ন সূত্রটি যুক্ত করতে পারলাম। রাজমাতা, মাইজী, ঠাকুর পরিবারের যোগসূত্রটির গল্প এবার শুরু করব।

এখানে আগে বলে নেব ইতিহাস। পরে বলব আমার চোখে দেখা মা'জীর বাড়ির গল্প। এখানে ব্রজকিশোরী দেবীকে আমি রাজমাতা বলব ঠিকই কিন্তু তিনি চিত্রসেন রায়ের মাতা। কারণ বর্ধমান রাজ অন্তঃপুরের ইতিহাস থেকে কীর্তিচাঁদের পিতা কৃষ্ণরাম রায়ের কন্যা সত্যবতী ছাড়া অন্য অন্তঃপুরিকার নাম মেলে না। আর ব্রজকিশোরী দেবী খুবই জনপ্রিয় এবং কালনার মন্দির প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব যাঁর নামের সঙ্গে সাল তামামি পর্যালোচনা করলে কীর্তিচাঁদের মহিষী হিসেবে গণ্য করা বেশি যুক্তিযুক্ত হবে। এই ব্রজ কিশোরী দেবী চলেছেন সমারোহের সঙ্গে পুণ্য সঞ্চয়ার্থে গঙ্গাস্নানে। হঠাৎ গঙ্গাতীরে এক স্ত্রীলোককে উদাসীন অবস্থায় বসে থাকতে দেখে নিতান্তই করুণা এবং কৌতূহল বশে রাজমাতা তাঁর সহচরীকে দিয়ে ডেকে পাঠালেন এবং প্রশ্ন করে জানতে পারলেন—স্ত্রীলোকটি মিথিলা থেকে, তাঁর একমাত্র সন্তান বাল্যবিধবা কন্যা রাধারাণী এবং তাঁর পুত্র শ্যামচাঁদকে (একরত্তি কৃষ্ণ মূর্তি) নিয়ে মানসিক শান্তির আশায় তীর্থ দর্শনে বেরিয়েছেন। অবশেষে চৈতন্যদেবের লীলাভূমি অম্বিকা কালনায় এসে পৌঁছেছেন। তিনি সম্ভ্রান্ত ঘরের গৃহবধূ এবং ব্রাহ্মণ কন্যা। তাঁর পদবী ওঝা। তৎকালীন প্রথা মতো একঘর মৈথিলি ব্রাহ্মণকে নিজ রাজত্বে বসতি স্থাপনার্থে রাজমহিষী ওঝানিকে সখীত্বে বরণ করে রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করলেন এবং সখীত্বের বন্ধন দৃঢ় করার জন্য রাজমাতার কন্যা রাধারাণীর (একরত্তি রাধা মূর্তি) সঙ্গে সখীর শ্যামচাঁদের বিবাহ দিলেন। সেই সূত্রে বর্ধমান মহারাজ প্রতিষ্ঠিত লালজী মহারাজ হলেন শ্যামচাঁদের শ্বশুরমশায়। সেই সম্পর্কের জন্য আজও শ্যামচাঁদ রাস পূর্ণিমা এবং দোল পূর্ণিমায়  শ্বশুর বাড়ি, রাজবাড়িতে নিমন্ত্রিত হন এবং নিমন্ত্রণ রক্ষা করেন।

শ্যামচাঁদের মন্দিরের মঙ্গলচণ্ডীর আসনের কাছে,  পিতলের তৈরি এক আঙুল মাপের রাধারাণী এবং দেড় আঙুল মাপের যে শ্যামচাঁদের বিগ্রহ রয়েছে, সেই বিগ্রহ পুরোনো বিগ্রহ, এমন কথা শোনা যায়। 

শ্যামচাঁদ মন্দিরের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত পঞ্চরত্ন অর্থাৎ পাঁচচূড়া মন্দিরে ওই বিগ্রহদ্বয়ের পূজা হতো। একদিন মাইজীর কন্যা বিগ্রহ সাজাতে সাজাতে বলে যে এমন ছোটো বিগ্রহ, কাপড়-জামা, সাজগোজে ঢাকা পড়ে যায়, সাজিয়ে মন ভরে না। সেই কথা শুনে মাইজী তার সখীকে একথা বলেন এবং রাজা একথা শুনে বৃন্দাবন থেকে কষ্টিপাথরের শ্যাম এর মূর্তি এবং মানানসই রাধা মূর্তি আনিয়ে দেন। মাইজী শুধু চেয়েছিলেন শ্যাম-এর রূপ যেন মনোলোভা হয়। সত্যিই মা'জীর বাড়ির শ্যামচাঁদ মনোহরণ।

এবার প্রয়োজন বড় মন্দিরের। তৈরি হলো পঞ্চরত্ন মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বাংলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের আটচালা আকারের বড় মন্দির। পঞ্চরত্ন মন্দির কবে নির্মিত হয়েছিল উল্লেখ না থাকলেও মন্দির চত্বরে বাইরের দিকের অংশটি ১১৬১ সনে তৈরি বলে উল্লেখ আছে। এর সমসাময়িক হলো দোল মঞ্চ, শিবমন্দির। মন্দিরগুলির গায়ে টেরাকোটার কাজ থাকলেও রয়েছে সংস্কারের অভাবের চিহ্ন।

মাইজীর বিগ্রহ স্থাপন, মন্দির নির্মাণ হলো, শ্যামচাঁদের ব্যয় নির্বাহের জন্য কিছু সম্পত্তি দেওয়া হলো। এবার চিন্তা— ধারাবাহিক ভাবে শ্যামচাঁদের সেবার ভার কাকে দেন? অনেক ভেবে তিনি দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং  সুযোগ্য, ব্রাহ্মণের খোঁজ করতে করতে কালনার পাশের গ্রাম একচক্রাতে যুগল কিশোর পাণ্ডে বা পাঁড়ে নামে এক মৈথিলি সৎ ব্রাহ্মণের সন্ধান পেলেন। এই পাঁড়েজীকে দত্তক নিয়ে শ্যামচাঁদের সেবায়েত নিযুক্ত করলেন। সম্পত্তির উপর অধিকার রইল বিগ্রহ শ্যামচাঁদের। পাঁড়েজী নিষ্ঠাভরে দায়িত্ব পালন করতেন, বৃদ্ধ বয়সে ভার দিলেন তাঁর পুত্র বদন পাঁড়ের উপর। কিন্তু বদন পাঁড়ে অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে পুত্র বধূ সর্বানী দেবী শ্বশুরের আবার বিবাহের ব্যবস্থা করেন। এই বিবাহে পাঁড়েজী এক কন্যা সন্তান লাভ করেন। পরবর্তী কালে এই কন্যা পুত্র লাভ করেন যার নাম ঈশ্বর চন্দ্র ঝা (ওঝা)। সর্বানী দেবী ঈশ্বর চন্দ্রের স্ত্রী মতিদেবীকে সেবায়েত নিযুক্ত করেন। কিন্তু মতিদেবী একটি কন্যা সন্তান এবং স্বামীকে রেখে দেহ রক্ষা করেন। স্ত্রীর অবর্তমানে ঈশ্বর চন্দ্র সেবায়েত হন এবং একমাত্র কন্যা গিরিজা সুন্দরীর বিবাহ দেন ডায়মণ্ড হারবারের পদ্মপুকুর গ্রামের বরদাকান্ত ঠাকুরের সঙ্গে। পিতার মৃত্যুর পর সেবায়েত হন গিরিজা সুন্দরী। কিন্তু তিনিও অল্প বয়সে মারা যান। সেবায়েত নিযুক্ত হন বরদাকান্ত। তিনি বংশ রক্ষার্থে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। স্ত্রীর নাম দামিনী দেবী। বর্তমানে তাঁর বংশধরেরা বসবাস করছেন। কিন্তু যেহেতু কীর্তিচাঁদ তাঁর মায়ের সখী ওঝানিকে 'মাইজী' সম্বোধন করতেন ওই বাড়ি 'মা'জীর বাড়ি' নামেই খ্যাত হয়ে রয়েছে।

এবার আসি আমার দেখা মা'জীর বাড়ির গল্পে। এ বাড়িও আমাদের লক্ষ্মণপাড়ার বাড়ির খুবই কাছে।  ভগবান দাস বাবার বাড়ি বাঁহাতে আর মা'জীর বাড়ি ডান হাতে। ছোটোবেলায় মা'জীর বাড়ির রথ ছাড়া অন্য রথ চোখে দেখিনি। আর ছোটো থেকে বিয়ের বছরের সোজা রথ পর্যন্ত একটিবার বাদ দিয়ে প্রতিবার এই রথই টেনেছি। একবার রথে পুরী যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আর বিয়েটা উল্টো রথের দিন হয়েছিল বলে সোজা রথ টানতে পারলেও উল্টো রথের রশি ধরা হয়নি। শ্যামচাঁদের তাতে কী বা যায় আসে! শ্যামচাঁদের রথের পুতুল গুলো ছিল ভারি সুন্দর। মেছুনি মাছ কাটছে, মা ছোট্ট শিশুকে কোলে শুইয়ে বাবু হয়ে বসে আছে, এমন সব বড় বড় পুতুল; সব কাঠের, সব সুন্দর রঙ করা। রথ টানা হয়ে গেলেই শ্যামচাঁদের আরতি, ভোগ; তারপর সব চলে যেত মন্দিরে। আমরা রথে উঠে খেলা করতাম। আর রথতলায়? সময় পেলেই খেলা, লুকোচুরি, ছোঁয়াছুঁয়ি। রথ তলায় ছিল এক আঁশ ফলের গাছ, ছোটো ছোটো ফল পড়ে থাকত, কুড়িয়ে খাওয়াও চাই, বাড়ি এসে ঠাকুমার কানে  সেকথা তোলাও চাই, বকুনি খাব জেনেও। খেলতে খেলতে কখনও কখনও চলে যেতাম মা'জীর বাড়ির ভেতর। রথতলার পাশেই তো বাড়ি! রথতলার দিকটায় সেবায়েতদের কেউ থাকত না।সেবায়েতদের বাস করার জন্য ভিতর দিকে বেশ কয়েকটা আলাদা আলাদা বাড়ি দেখেছি। সম্পূর্ণ মা'জীর বাড়ি বিশাল অংশ জুড়ে। এদিকে লক্ষ্মণ পাড়া থেকে সামনের দিকে আমাদের স্কুল হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে বড় রাস্তা পর্যন্ত, অর্থাৎ ডাঙাপাড়া পর্যন্ত। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে ছিল একটা রাস্তা, গলি বলাই ভালো। মা'জীর বাড়ির পূর্ব দিকের কিছুটা অংশ, আমাদের বাড়ির পিছন দিক অর্থাৎ উত্তরদিক, রবীন্দ্র সদনের পিছন অর্থাৎ পশ্চিমদিকটা মিলে অনেকখানি জায়গা ছিল, ছিল একখানি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমদের বাড়ির সামনের গলিটা সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে বড় রাস্তায় যেখানে মিশত, সেই রাস্তার এপারে মা'জীর বাড়ির সামনের অংশ, অপর পারে আমাদের স্কুল। আমাদের স্কুলের প্রাথমিক বিভাগ দশটায় ছুটি হোতো, আমরা আমাদের স্কুল ছুটির পর ওই ছোট্ট স্কুলের দাওয়ায় এসে খেলতাম, মা'জীর বাড়ির ঝোপ থেকে কখনও কখনও সাপও বেরিয়ে আসতেও দেখেছি। সাপের সামনে নাকি 'আস্তিক আস্তিক গরুড় গরুড়' বললে সাপ পালায়। তাই সাপ দেখলে চুপ করে দাঁড়িয়ে সেগুলোই বলতাম। পরে তো স্কুলটা কোথায় উঠে গেল, স্কুলবাড়িটা ভাঙা হয়ে গেল। রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। সে জায়গায় তৈরি হলো 'পুরশ্রী হল'। মা'জীর বাড়ির এই অংশটা অনেক দূরে চলে গেল যেন। আমরাও বড়ো হয়ে গেলাম। জগৎটা আবর্তিত হতে থাকল অন্য ভাবে।

আমার কাছে মা'জীর বাড়ি মানে রথ, মা'জীর বাড়ি মানে গোটা কার্তিক মাস ভর ভোরবেলা ঠাকুমার সঙ্গে মঙ্গল আরতি দেখা। আমাদের বাড়ির আরতি শেষ হলে ছুটতাম ঠাকুমার সঙ্গে। একখানা চাদর গায়ে-মাথায় জড়িয়ে  দিয়ে, পিছনে ঘাড়ের কাছে গিঁট বেঁধে দিত ঠাকুমা। হাত চাদরের ভিতরে। এতে সোয়েটার মাফলার পরার থেকে কম সময় লাগত। মা'জীর বাড়ি থেকে চলে যেতাম নামব্রহ্ম বাড়ি। ধীরে ধীরে আকাশের অন্ধকার কেটে গিয়ে চারদিক নীল হয়ে উঠত। আমার কাছে মা'জীর বাড়ি মানে ঝুলনও, ভারি সুন্দর ঝুলন হোতো সেখানে। এর আগেও ঝুলন পর্বে সেকথা বলেছি। আর একটা বিশেষত্ব হলো চতুর্দোলায় করে সেজেগুজে সানাই বাদ্যি বাজিয়ে শ্যামচাঁদের শ্বশুর বাড়ি যাওয়া। এখনও হয়তো সব হয়, দর্শনের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি মাত্র, এ তো হবারই। কর্মক্ষেত্রে পড়ে শ্যামচাঁদকে বাল্যের লীলাভূমি ত্যাগ করতে হয়েছিল, আমরা তো তবু একান্তই যদি চাই, রথ-ঝুলন-কোনো বিশেষ দিন না হোক, আমাদের সুযোগ মতো দর্শন করতে পারি!

ঝুলনে নাট মন্দিরে যাত্রা পালা হতো। পালা গানও হতো। কখনও কখনও একটু আধটু শুনতে যেতাম, পিসিমণি বা ঠাকুমার সঙ্গে। আসলে এখানে একটু রাতে এসব শুরু হওয়ায়, দাদুর অনুমতি আদায় করা কষ্ট ছিল। আর একটা জিনিসের জন্য আমরা মা'জীর বাড়ির উপর অনেকটা নির্ভরশীল ছিলাম। তা হলো পুকুর। তখন বাড়িতে বাড়িতে মিউনিসিপ্যালিটির কল আসেনি। আমাদের বাড়িতে ছিল কুয়ো। জল টানতে কষ্ট হতো। যেদিন অনেক কাচাকাচি হতো (সেটা প্রায়ই হতো) সেদিন ঠাকুমা চলে যেত মা'জীর বাড়ির পুকুরে। অনেক বড় পুকুর, অনেকগুলো ঘাট। দূরের ঘাটগুলো অন্যান্য শরিক ব্যবহার করতো। পুকুরে যতদূর চোখ যায় তাকালে দিনের বেলাতেও কেমন  গা ছমছম করত। রথতলার দিকে দরজা দিয়ে ঢুকেই ছিল একটা ঘাট। এটা আমরা, বাইরের লোকেরা ব্যবহার করতাম। ঠাকুমা বা পিসিমণি কাপড় কেচে চান করে নিত। বেশিরভাগ সময়ে অবশ্য গঙ্গায় যেতো। কোনও কোনও দিন ওই পুকুরের জলে আমাকেও চান করিয়ে দিত পিসিমনি, সে দারুণ মজা।  তারপর আমার হাতে কিছু ভিজে কাপড় দিয়ে দিত, বাড়ি নিয়ে চলে আসতাম। তারপর তো সব জায়গায় কল এসে গেল। পুকুর পড়ে রইল। পুকুরটা নষ্ট হয়ে যেতে দেখেছি। অত সুন্দর টলটলে জল, কী সুন্দর বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি! এখন মনে হয় কিছু নেই। ডানদিকে ঘাট ফেলে রেখে আর একটু  এগিয়ে গেলে ঝুলনের ঘর, নাট মন্দির। এখানে ঝুলনের সময় বিগ্রহ আনা হতো। অন্যসময় ভিতর বাড়িতেই শ্যামচাঁদ থাকতেন। ভিতর বাড়িতে বড়ো মাপের, অনেক উঁচু ভিতের উপর মন্দির। সেখানে অন্নকূট হতো, এখনও হয়। সে মন্দির এখন কেমন আছে তাও জানি না। রাজ-বাড়ি, রাজার বিগ্রহই কতদিন অনাদরের পর নতুনভাবে সেজে উঠেছে। বিগ্রহের জামাই-এর খবর কে রাখে! এখন সব কে কেমন আছে দেখে এসে তোমাদের ছবি দেখাবো। এখন চলে যাব এখান থেকে। পরের দিন দেখা যাক, কোথায় যেতে পারি! (ক্রমশঃ)

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Ambika Kalna)