গুরুত্বপূর্ণ খবর

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

ধীরেন দাস এক প্রবাদ প্রতিম ব্যক্তিত্ব যাঁর সাথে জড়িয়ে আছে কলকাতা তথা বাংলার কত প্রানের মানুষ। তাই ধীরেন দাস হলো একটি অনন্য যুগ।

ধীরেন দাস শুধু শিল্প ও সংগীতের যুগ নয়, নাটক, সিনেমা কবিতাও। ধীরেন দাস মানে কাজী নজরুল ইসলাম, জমিরউদ্দিন খাঁ সাহেব, আঙ্গুর বালা ও ইঁদুবালা, কৃষ্ণ চন্দ্র দে, শিশির ভাদুরী, আবার ধীরেন দাস মানে গ্রামোফোন কোম্পানী এইরকম অজস্র গুণমুগ্ধ শিল্পী।

এই গ্রামোফোন কোম্পানীর অফিসে আসতেন পাইকপাড়ার অনেক কবি ও সাহিত্যিকরা। ওই গ্রামোফোন কোম্পানীর অফিস ছিল সেকালে শিল্প, সাহিত্যের এবং সংগীতের আড্ডার কেন্দ্র স্থল। এক দিন কথায় কথায় সজনীকান্তর মেয়ে সোমা দেবী বললেন, এই পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়িতে উনি বহুবার এসে গান গেয়ে গেছেন। কি করে ভুলবো সেই সব দিনের কথা। সেই গান আমি আর আমার  বাবা শুনতাম না শুধু। শুনতো এই পাড়ার সব কৃতি মানুষ ও সাহিত্যিকরা। ওই সব স্মৃতি আজ ও আমার কাছে একমাত্র সম্বল। আর আমরা হলাম ওই ফেলা আসা যুগের স্মৃতি ভ্রষ্ট এক অন্য উত্তর পুরুষ।

এইবার আসি ইতিহাসে: ধীরেন্দ্রনাথ নাথ দাস, ১২সি নর্দার্ন এভিনিউ,পাইকপাড়া। জন্ম: ০৪-০৮-১৯০৩, পাণ্ডুয়া হুগলি। মৃত্যু: ২৫-১১-১৯৬১ কলকাতার পাইকপাড়া। পিতা কালীচরণ দাস। মাতা প্রভাবতী দাস স্ত্রী বিজয়া দাস।

নজরুল তাঁকে বলতেন শ্রুতিধর। একবার, বড়জোর দুইবার দেখালেই গান কণ্ঠস্থ। রবীন্দ্রনাথের যেমন দিনু ঠাকুর গানের ভান্ডারী তেমনি ধীরেন দাস ছিলেন নজরুলের গানের ভান্ডারী। বিভিন্ন রকম গান গাইতেন, সব চেয়ে বেশি গান গেয়েছেন কাজী নজরুল ইসলামের। এক কথায় বলা যায় নজরুলের গানের সার্থক রূপায়ণ করেছেন ধীরেন দাস। তাঁর শিক্ষায় প্রশিক্ষিত হয়েছেন অগণিত শিল্পী এবং তাঁদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য সংগীত ব্যক্তিত্ব হলেন আঙ্গুরবালা ও ইঁদুবালা দেবী। তাঁর নৈপুণ্যের সাক্ষর রয়ে গেছে মঞ্চে, বেতার নাটকে, এমন কি চলচ্চিত্রেও। কিন্তু তিন দশকের এই অবিসংবাদী জনপ্রিয় শিল্পী আজ এক বিস্মৃত প্রায় নাম। এই শিল্পী যুক্ত ছিলেন কৃষ্ণ চন্দ্র দে, জমিরউদ্দিন খাঁ সাহেব ও তুলসী লাহিড়ীর মত শিল্পীর সাথে। ধীরেন দাসের মতো এরা কেউই প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমের আলোয় আলোকিত নন। ১৯০৩ সালে ৪ আগস্ট ধীরেন্দ্রনাথ জন্ম গ্রহন করেন তাঁর মামার বাড়িতে। ধীরেন দাসের পিতার অভিনয় ও সংগীতের প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল। কর্ম সূত্রে তাঁর পিতা কালীচরণ দাস রানীগঞ্জে বেঙ্গল কোল কোম্পানীর নায়েব ছিলেন। তাঁরই উৎসাহে ও উদ্যোগ্যে গড়ে উঠে সৌখিন নাট্য সম্প্রদায়। এই খানেই তাঁর অভিনয় ও গানের শিক্ষা। অল্প কিছু দিনের মধ্যে নানারকম বাদ্য যন্ত্রে পারদর্শী হয়ে উঠলেন। কিন্তু পিতা চাইতেন না ছেলে পেশাদারী ভাবে গান বাজনা করুক। যাই হোক তাঁর বাল্য শিক্ষা শুরু হয় শ্রী কৃষ্ণ পাঠশালায়। এইখান থেকে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তারপর বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। আর এই কলেজেই অধ্যাপনা করতেন শিশির ভাদুরী। তখনও শিশির ভাদুরী অভিনয় জগতে প্রবেশ করেননি। সেই সময়ে একবার আশুতোষ মুখোপাধায়কে  সংবর্ধনা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে  ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে ক্ষীরোদ প্রসাদ বিদ্যাবিনোদের রঘুবীর নাটক মঞ্চস্থ করার ব্যবস্থা করা হয়। এই নাটকে নাম ভূমিকায় ছিলেন শিশির ভাদুরী আর এখানেই শ্যামলী চরিত্রে ধীরেন দাসের প্রথম মঞ্চাবতরণ। ইতিমধ্যে পিতার মৃত্যু হয়েছে। আর পিতার উৎসাহে ও নির্দেশে ধীরেন্দ্রনাথ পরিণয় সূত্রে আবধ্য হয়েছেন বিজয়া দেবীর সঙ্গে। পিতার মৃত্যুর পর তিনি কিছুদিন কাজ করলেন লয়েডস ব্যাংকে। যাই হোক শিশির ভাদুরী অধ্যাপনা ছেড়ে পেশাদার মঞ্চে যোগদান করেছেন।

১৯২৪ সালে যোগেশ চন্দ্র চৌধুরীর সীতা নাটকের লব ও কুশ চরিত্র অভিনেতার  প্রয়োজন হয়ে পড়লো। ধীরেন দাসের সাথে তো আগেই পরিচয় ছিল। শিশির ভাদুরী বললেন ধীরেন দাসকে তুমি করতে চাও এই চরিত্র। ধীরেন দাস তো এককথায় রাজি হলেন মার বারণ সত্বেও। সন্তোষ সিংহ মহাশয় যার সাথে ধীরেন দাসের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ছিলো। সন্তোষ সিংহের অনুরোধে মা রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু শিশির ভাদুরী বললেন। অন্য কিছু করতে পারবেন না বরং এই মঞ্চে কাজ করতে গেলে পেশাদারি শিল্পী হিসেবে যোগদান করতে হবে।

এই মঞ্চে শিশির ভাদুরীর সাথে তিনি অনেক নাটকে অভিনয় করলেন সাথে নাটকের গান ও গাইলেন। ১৯২৬ থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হলো একদম পেশাদারী ভাবে। অভিনয় ও সংগীতে পারদর্শী সমান ভাবে পারদর্শী এইরকম শিল্পী তখন সত্যি খুব কম ছিল। তিনি গান শিখেছেন বিখ্যাত গায়ক রাধিকা প্রসাদ গোঁসায়ের কাছে, তারপর সাতকরি মালাকার ও জ্যোতিষপ্রসাদের কাছে। এরই মধ্যে একটা উল্লেখ যোগ্য ঘটনা ঘটলো ধীরেন দাসের জীবনে। এটাকে মাহেন্দ্রক্ষণ বলা যায়।

তাঁর পিতৃ বন্ধু ভূতনাথ দাস তাঁকে নিয়ে গেলেন গ্রামোফোন কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করাতে। এই গ্রামোফোন কোম্পানিতে ভূতনাথ দাসের সহকারী রূপে কাজ করার সুযোগ পেলেন বছরখানেক এই ভাবে কাজ করার পর তিনি মানে ধীরেন্দ্র নাথ দাস সুরকার ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে থাকেন। যখন তিনি গ্রামোফোন কোম্পানিতে ছিলেন।

১৯২৭ এর সময়ে বা কিছু আগে ধীরেন দাসের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হলো (p 8732) এইচএমভি থেকে। নরনারায়ন নাটকে যে গান দুটি গেয়ে জনাদর পেয়েছিলেন 'মন্দিরে একা বসে' আর কোন বেনিতে ব্রজের কানু স্থান পেলো তাঁর প্রথম রেকর্ডে। সেকালে তখন ইলেক্ট্রিক্যাল রেকর্ডিং চালু হয়নি। শিল্পীকে একটা টিনের  চোঙ্গার সামনে বসে উচ্চ স্বরে গান গাইতে হত। তারপর সেই চোঙ্গার মধ্যে দিয়ে গান ঘূর্ণায়মান মোমের চাকতির ওপর পিনের সাহায্যে স্ক্র্যাপ করে দিত - সেই স্ক্রেপিং ভাইব্রাশনে গান বাধা থাকতো। মোমের চাকতির থেকে সেগুলি তামার চাকতিতে ছাপ তোলা হতো। যাকে বলে ম্যাট্রিকস। পরে সেই তামার চাকতি থেকে গালা ইবোনাইট মিশ্রিত নরম চাকতিতে সেগুলোকে ছেপে তুলতে হতো। চাকতি শক্ত হওয়ার সময়ে লেবেল লাগিয়ে রেকর্ড করে ছাড়া হতো। এইচএমভির রেকর্ডিং স্টুডিও তখন বেলেঘাটায় আর রিহার্সাল হতো চিৎপুরের গরানহাটায় বিষ্ণু ভবনে। এইচএমভি তখন ডাকসাইটে শিল্পী ছিলেন কে মল্লিক, কৃষ্ণ চন্দ্র দে, আঙুরবালা ও ইঁদুবালা। সকলেই নিয়মিত আসতেন

বিষ্ণু ভবনে। এই গ্রামোফোন কোম্পানীর সূত্রে ধীরেন দাসের আলাপ হলো সেকালের সবচেয়ে বড় উস্তাদ জমিরউদ্দিন খাঁ সাহেব, এছাড়া আঙুরবালা ও ইঁদুবালা আছেন। এদের মধ্যে ধীরেন দাস তালিম নিলেন কৃষ্ণ চন্ড দে ও জমিরউদ্দিন খাঁ সাহেবের কাছে।

এরই মধ্যে আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে গেল। তরুণ নজরুল এলেন গ্রামোফোন কোম্পানীতে। জমিরউদ্দিন খাঁ সাহেব বললেন ' নজরুল তুমি এইবার কোম্পানির ভার নাও আমি আর পারছি না'। নজরুল বললেন উচ্চ হারে রোয়েলটি দিতে হবে বাকি যা বলবেন করবো'।

তখন সর্বময় কর্তা ছিলেন সঙ্গীতের ব্যাপারে জমিরউদ্দিন খাঁ সাহেব। তারপর এলেন কাজী নজরুল। নজরুল বললেন আমার সহকারী হবে ধীরেন দাস। আর প্রথম গান উনি গাইবেন। আর কবি খুশি হলে ধীরেন দাস হবেন গানের প্রধান ট্রেনার। তাই হলো কথা মতো। নজরুল মুদ্ধ হলেন ধীরেন দাসের গান ও স্মৃতি শক্তি দেখে। এবং ধীরেন দাস হয়ে গেলেন তখন থেকে গ্রামোফোন কোম্পানীর ট্রেনার। বাকি টা তো ইতিহাস।

নজরুল আসার মাস কয়েক বাদেই কে মল্লিকের বাগিচায় বুলবুলি আর ও আমারে চোখ ইশারায় এই দুইটি আলোড়ন ফেলে দিলো। নজরুলের গান গেয়ে কে মল্লিক বাজার মাত করলেন। এই ভাবে নজরুলের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর গ্রামোফোন কোম্পানি বহু গান রেকর্ড করেছেন। গান তুলিয়েছেন নজরুল এবং ধীরেন দাস। আঙুরবালা ও ইঁদুবালা দুইজনেই তাঁদের স্মৃতি কথায় বলেছেন, নজরুল এবং ধীরেন দাসের ঋণ তাঁরা কোনোদিন ভুলতে পারবে না। তখন রেকর্ড লেভেলে সুরকার ও গীতিকারের নাম থাকতো না ফলে বহু শিল্পী সুরকার ও গীতিকারের নাম হারিয়ে গেছেন জনমানসের স্মৃতি থেকে।

কিন্তু সেকালের গায়ক ও গায়িকা কেউ ধীরেন দাসকে ভোলেন নি। বরং বুকে আগলে রেখেছেন এই মহান প্রতিভাকে। ধীরেন দাস প্রায় ৫০০ ওপর গান রেকর্ড করেছেন। ভাবা যায়? তবু আজকের মানুষ এই সব কিছুই জানে না। তিনি এইচএমভি ছাড়াও মেগাফন কোম্পানির সাথে ও যুক্ত ছিলেন।

রেখা নাট্য প্রবর্তনের সাথেও ধীরেন দাসের নাম জড়িয়ে আছে। অর্থাৎ নাটক রেকর্ড করা, সাথে গান ও থাকতো। তিনি এই রেকর্ডের নাটকে প্রচুর অভিনয় করেছেন। তাঁর জন্য বিশেষ ভাবে কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করলেন বিদ্যাপতি। এই রেকর্ডে কৃষ্ণ চন্দ্র গান গাইলেন আর অভিনয় করলেন ধীরেন দাস। তিনি প্রচুর রেকর্ডে সুর করেছেন, গান গেয়েছেন এবং অভিনয়ও করেছেন পারদর্শিতার সাথে। এই ধীরেন দাস নির্বাক এবং সবাক ছবিতেও কাজ অনেক কাজ করেছেন। তিনি পুরো যুগটা দেখেছেন এই নির্বাক থেকে সবাক যুগের রূপান্তর।

তবে  আরও একটা কথা বলা দরকার। এই কমলা ঝরিয়া ও বীনাপানী দেবীও যুক্ত ছিলেন এই গ্রামোফোন কোম্পানীর সাথে। এরা সবাই ধীরেন দাসকে শ্রদ্ধা করতেন তাঁর বহুমুখী প্রতিভা আর মানবিকতার জন্য। গ্রামোফোন কোম্পানীর লায়লা মজনু রেখা নাট্যটি খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। নাটকটিতে সুর দেন কমল দাশগুপ্ত লায়লা মজনু চরিত্রে ছিলেন যথাক্রমে পাইকপাড়ার সরজুবালা ও ধীরেন দাস।

নাট্যমঞ্চে, রেকর্ড জগতে, রেডিও ও চলচিত্রে প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে ধীরেন দাস যে প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন তা খুব শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়। তবে এর মধ্যে আর একটা কথা বলা দরকার। এই কাজী নজরুলকে  নিয়ে এসেছিলেন এই ধীরেন দাস গ্রামোফোন কোম্পানিতে আর তাঁর দায়িত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন ম্যানেজার ভগবতী ভট্টাচার্য। বহু বাদনুবাদের পর নজরুল বললেন, 'আমি একটি শর্তে এই কোম্পানীতে যোগ দেব'। সেইটা কি? তিনি মানে নজরুল ছাড়া আর কেউ সুর রচনা করতে পারবেন না। এই শর্ত নজরুল সর্ব প্রথম ভঙ্গ করেন ধীরেন দাসের ক্ষেত্রে। ধীরেন দাস  প্রথম যে নজরুল সংগীতটির সুর করেন সেটি হলো কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন। এই গানটি গেয়েছেন সেকালের আর এক বিখ্যাত গায়ক মৃনাল কান্তি ঘোষ। তবে ধীরেন দাসের সব চেয়ে জনপ্রিয় গানটি হলো

আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও

জননী এসেছে দ্বারে।

এই গানটা সুপার ডুপার হিট ছিল। ওই কলকাতায় এবং বাংলাদেশে এই গান সবাই গুনগুন করতো।

তিনি দ্বৈত সংগীত গেয়েছেন যে সব শিল্পীদের সাথে  তাদের হরিমতি, আঙুরবালা, ইঁদুবালা, আশ্চর্যময়ী, কমলা ঝরিয়া, বীনাপানী প্রভৃতির নাম করা যেতে পারে। এই আঙ্গুরবালা প্রথম দিকে থাকতেন কাশীপুরে। আর ওই খান থেকেই আসতেন পাইকপাড়ার সিমলাই পাড়ার বাড়িতে।

১৯৪৪-৪৫ সালে ধীরেন দাস তদানীন্তন পশ্চিম বাংলা সরকারের প্রচার বিভাগের সাথেও জড়িত ছিলেন। তিনি ওই বিভাগে এক বৎসর কাজ করেছিলেন। বর্তমানে পুত্রেরা উপার্জনক্ষম হবার সঙ্গে সঙ্গেই শিল্প জগৎ থেকে বিশ্রাম নিলেন। সংসারের ব্যাপারে তিনি প্রায় কিছুই দেখতেন যা দেখতেন সবই স্ত্রী বিজয়া দেবী। সংগীতজ্ঞ রাজ্যেশ্বর মিত্র বলেছেন 'ধীরেনবাবু প্রচার বিমুখ ছিলেন। কারণ উনাকে স্টেজে খুব কমই দেখা যেত অনুষ্ঠান করতে। আবার সেইটা পূরণ হয়ে যেত গানের রেকর্ডে। তিনি আরও বলেছেন আমরা যখন কলেজে পড়ছি তখন উনি খ্যাতির শীর্ষে।' তাঁর প্রথম সবাক ছবি ছিল প্রহ্লাদ আর শেষ ছবি মহা কবি গিরিশ চন্দ্র। শেষ করার আগে আমার নিজের একটা স্মৃতি মনে পড়ছে।

তখন ১৯৬০ সাল। আমি  জানলা দিয়ে দেখতাম, উনি ইজি চেয়ার এ বসে টিনের বক্সের লম্বা লম্বা সিগারেট খাচ্ছেন। তখন আমার ১১বছর বয়স মাত্র। খুবই গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তিনি।উনার সাথে কোনোদিনই কথা হয়নি আমার। উনার  স্ত্রী মানে মাসিমার সাথে আমার প্রায়ই কথা হত।উনার স্ত্রীর নাম ছিল বিজয়া দেবী। উনার সাত পুত্র ও পাঁচ কন্যা ছিল। তার মধ্যে মধ্যম পুত্র অনুপ কুমার সিনেমা জগতে এক খ্যাতির চূড়ায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এই অনুপকুমার মানে মেজদার সাথে আমার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। এই পরিবারের সবাই সংগীতে  ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। এই অনুপ কুমারের জামাইবাবু ছিলেন পরিচালক মৃনাল সেন। গোটা পরিবার টা বাংলার সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকতো।

যাই হোক তখন ১৯৬১ সাল আমি গেলাম ওই ১২সি বাড়ির কাছে। গিয়ে দেখলাম ব্যাপক ভীড়। কেন ভীড় ধীরেন দাস মারা গেছেন। উত্তম কুমার এসেছেন শেষ দেখা দেখতে। আমিও দেখলাম উত্তম কুমারকে। হটাৎ বেরিয়ে এলেন ঘরের বাইরে মধ্যম পুত্র মানে অনুপকুমার (আমাদের কাছে মেজদা)। আর চিৎকার করে বললেন আমার বাবা মারা গেছেন। আর আপনারা উত্তম কুমার দেখতে এসেছেন?

এই বলার সাথে সাথে ভীড় কমতে থাকলো কিন্তু কেউ চলে গেলেন না খালি সবাই একটু দূরে সরে গেলেন। এই স্মৃতি আজও মনে আছে। বাংলা সংগীতের ইতিহাস যদি ঠিক মতো লিখতে হয় তাহলে ধীরেন দাসকে বাদ দিয়ে লেখা যাবে না।কিন্তু হায় বাঙালি বলতে লজ্জা নেই যে আজ বাঙালি হলো বিস্মরণ প্রিয় জাতি। পরিশেষে বলি এই ধীরেন দাসের জন্য পাইকপাড়া ধন্য।

সূত্র:

জন্ম শতবর্ষে ধীরেন্দ্র নাথ দাস, বইটি প্রকাশ করেছেন ধীরেন দাস স্মৃতি রক্ষা কমিটি।

নজরুলের যে গান গুলিতে ধীরেন দাস সুর দিয়েছেন তাঁর তালিকা

১) আর লুকাবি কোথায় মা কালি

২) উতল হলো শান্ত আকাশ

৩) এস হে সজল শ্যাম

৪) বেদনা বিহুল পাগল

৫) রাত্রি শেষের যাত্রী আমি

৬) এসেছি তব দ্বারে

৭) অকূল তুফানে নাইয়া

৮) একলা ভাষাই গানের কমল

৯) বিজন গোঠে কে রাখাল বজায় বেনু

১০) কথা কও কথা কও হে দেবতা

১১) হরি নাচত নন্দ দুলাল

১২) আমারে চরণে দিও ঠাই

১৩)  বাঁশিতে সুর শুনিয়ে

১৪) জয় বাণী বিদ্যাদায়িনী এবং মধুমালা নাটকের কিছু সংখ্যক গান।

(www.theoffnews.com - Dhirendranath Das)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

(ডাকাত রানি ও স্টিং অপারেশন)

২০০৩ এর কোনও এক সকাল, সিউড়ীর ইটিভি অফিসে বসে আমরা কজন। কথা হচ্ছে এক মহিলা প্রতারককে নিয়ে। সামনে বসা তিন চারজনই চাকরি পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়াতে তাকে টাকা দিয়েছিল, যথারীতি চাকরিও পায়নি, টাকাও না। পুলিশের কাছে গিয়েও সেভাবে পাত্তা না পাওয়ায় এবার তারা আমার স্মরণাপন্ন হয়েছে। টাকা যে দিয়েছে তেমন কোনও প্রমাণ তাদের কাছে নেই, শুধু মুখের কথায় এমন খবর করা মুশকিল। তাই প্ল্যান হচ্ছে কি করা যায়। ডাকা হল জেলায় ছড়িয়ে থাকা আমাদের অন্য প্রতিনিধিদের। রুদ্ধদ্বারে বসে ঠিক হল আমরাও যাব চাকরির খোঁজে ওই মহিলার কাছে। 

কাজটা মোটেই সহজ নয়। যে ছেলেরা টাকা দিয়েছিল তারা স্পষ্ট জানাল জায়গাটা মহম্মদবাজার থানার সোঁতসাল গ্রাম। মহিলার নাম গুলনেহার বেগম। এলাকাটা মোটেই ভাল নয়। স্থানীয় ছেলে বা গুন্ডাদের ওই মহিলা হাতে রেখে দিয়েছেন, ধরা পড়লে কিন্তু ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। গুলনেহারের নামে নানা কথা শোনা যায়, পুলিশ প্রশাসনের উপর তলা মায় মুখ্যমন্ত্রীর পিএ পর্যন্ত তার নাকি অবাধ যাতায়াত। সকলেই তার হাতের মুঠোয়। প্রতারণা, তোলা আদায় এমনকি ডাকাতি করানোর দুর্নামও আছে তার। তার বাড়ি পাহারা দেয় বেশ কয়েকজন সশস্ত্র গার্ড। বোঝাই যাচ্ছিল ব্যাপারটা বেশ বিপদজনক। কি করা যায় তারই আলোচনা চলছে। তখনকার দিনে তো আজকের মত জামার বোতাম, পেন বা চশমার মধ্যে লুকানো ছোট্ট ক্যামেরা ছিল না। তাই কাজটাও কঠিন। ঠিক হল দুটি দলে ভাগ হয়ে আমরা যাব। একটি দল ভিতরে ঢুকবে চাকুরীপ্রার্থী সেজে, অন্য দল বাইরে থেকে কভার করবে, নজর রাখবে। গুলনেহার যেহেতু প্রথম থেকেই পুলিশের সঙ্গে তার যোগাযোগের দাবী করে আসছে, তাই পুলিশকে প্রাথমিক ভাবে কিছু জানানো হবে না ঠিক হল। 

এবারে প্রথম এবং প্রধান সমস্যা ক্যামেরা নেওয়া। বড় ক্যামেরা, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় প্রতি পদে। সকলেই সাইড ব্যাগ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হল। সেই ব্যাগের পাশের দিকটা সামান্য খোলা থাকবে যাতে সেই ফাঁক দিয়ে ক্যামেরায় ছবি তোলা যায়। ছক রেডি। গুলনেহারকে ফোন করা হল চাকরী চাওয়ার কথা বলে। পরের দিন আমাদের সকাল এগারোটা নাগাদ আমাদের যেতে বলা হল। আমার সৈনিকেরা সকাল সকাল হাজির ইটিভি অফিসে। আমাদের রামপুরহাটের প্রতিনিধি আশিস হঠাৎ বলল “পলাশদা আমার মনে হয় তোমার ভিতরে যাওয়াটা ঠিক হবে না। কারন টিভিতে তোমায় প্রায়ই দেখা যায়, গতকালও একটা খবরে তোমার পিটিসি ছিল। তাই তোমায় চিনে ফেলার একটা সম্ভাবনা থাকতেও পারে।” আমিও ভেবে দেখলাম কথাটা যুক্তি যুক্ত। চিনে ফেললে খুব বিপদ। শেষমেশ ঠিক হল আমি বাইরে থাকব একটু দূরে, ভিতরে যাব না। 

সোঁতসাল গ্রামে পৌঁছে আমরা দুটি দলে ভাগ হয়ে গেলাম। কেউ কাউকে চিনি না, এমন ভাবে ওরা দু তিনজন ঢুকে গেল ভিতরে। আমি বাইরে। ওরা ভিতরে ঢুকতেই শুরু হল টেনশন। কি হয়, কি হয়? এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাও মুশকিল, লোকের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি বার বার ঘুরে ফিরে আসছে। একটু এদিক ওদিক করছি, এর মধ্যে দুতিনটি বাইক এসে আমায় জরিপ করে গিয়েছে। কাউকে খুঁজছি কিনা সরল ভাবে জেনে গিয়েছে। আমি তো এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি বলে পাশ কাটিয়েছি। প্রায় ঘন্টা খানেক পর মুর্তিমানেরা বেরোতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। 

ভিতরে ওদের কাজটাও আরও কঠিন ছিল। ওদের কাছ থেকেই জানা। প্রথম দিকে কিছু বলতে চাইছিল না। পরে একটু একটু করে সে সবই বলেছে। পুলিশ প্রশাসন মন্ত্রী সব লেভেলেই তার নাকি বেজায় জানাশোনা, চাকরী নাকি হাতের মুঠোয়। আরও নানান কথা। আমাদের তিনটি ক্যামেরায় মিলিয়ে জুলিয়ে প্রায় সবই ক্যাপচার করা হয়েছে। হ্যা ফ্রেম ভাল আসেনি কিন্তু যা আমরা চাইছিলাম তা এসেছে। গুলনেহার নাকি বার বার কথা বলতে বলতে ব্যাগের দিকে তাকাচ্ছিল। তাই মাঝে মধ্যেই ব্যাগগুলিকে সামলাতে গিয়ে অনেক সময়েই ক্যামেরার ফ্রেম গন্ডগোল হয়ে যায়। তবে খুব অসুবিধে কিছু হয়নি। আসলে এর আগে তো স্টিং অপারেশন তেমন একটা হয়নি, তাই গুলনেহারও অতটা ভেবে উঠতে পারেনি। 

ফিরে আসা হল। সেই দিনই ইটিভিতে বড় করে খবরটি দেখানো হল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার পুলিশ কিন্তু নির্বিকার। আমরা পরের দিন পুলিশ সুপারের বাইট নিলাম, তিনি বিষয়টা দেখা হচ্ছে বলেই এড়িয়ে গেলেন। অথচ জেলা জুড়ে খবরটি রীতিমত শোরগোল ফেলে দিয়েছে। সর্বত্র আলোচনা, শুধু পুলিশের কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। সেটা নিয়েও খবর করলাম আমরা। দুদিন পরে হঠাৎ ফোন করলেন গৌতম মোহন চক্রবর্তী, আইজি পশ্চিমাঞ্চল। গৌতমদার সঙ্গে আমার আগে আলাপ ছিল, তিনি খবরটা দেখে আমায় ফোন করেন।দুর্গাপুরে তার অফিসে যেতে বলেন। দুর্গাপুরে গেলে লোকাল পুলিশের ভুমিকা কি জানতে চান? আমি জানালাম পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশের কথা স্পষ্ট জানিয়েছে গুলনেহার, তার পরেও পুলিশের এই নিঃস্পৃহতা সেই দাবীকেই শক্ত করে। গৌতমদা বললেন একটু দাঁড়াও, রাইটার্স থেকেও খবরটি নিয়ে একটা চাপ তৈরি হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর পিএর নাম নিয়েছেন ওই মহিলা, আমরা দেখছি। অন্য কাউকে দিয়ে তদন্ত করানো হবে। পরের দিনই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন দুর্গাপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমিত চতুর্বেদি। তাঁকে এই তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে। সদ্য আইপিএস সুমিত তরতাজা যুবক, আমাদের অফিসে এলেন পরদিন। কথা বলে সাধুবাদ জানিয়ে শুরু করলেন তদন্তের কাজ। অদ্ভুত ব্যাপার এর পরেই গ্রেফতার করা হল গুলনেহারকে। সেদিন থানায় ডাকা হয়েছিল আমাকেও, সুন্দরী গুলনেহার পুলিশের সামনেই হুমকি দিয়েছিল আমাকে বা আমাদের দেখে নেওয়ার। এখনও সে জেলেই আছে বলে শুনেছি। 

এটাই বাংলা খবরে প্রথম স্টিং অপারেশন সে কথা আমি বলব না, তবে একেবারে প্রথমদিকের স্টিং অপারেশন সে কথা বলাই যায়। খুব কষ্ট করে, বেশ ঝুঁকি নিয়ে এই কাজটা করা হয়েছিল। এতে অবশ্য আমার চাইতে আমার সহকর্মীরা বেশি কৃতিত্ব পাওয়ার অধিকারি। আশিস মণ্ডল, রথীন সেন, পরিতোষ দাস, দীনবন্ধু দে, সঞ্জয় চক্রবর্তী, সুপ্রতিম দাস এরা সকলেই নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিল। এত বছর পরে এরা সকলেই এখন প্রতিষ্ঠিত নিজেদের কাজের সুবাদেই। তবুও আমার তরফে ধন্যবাদ ও ভালবাসা আবার সকলকে। আমার মনে রাখার মত খবরের তালিকায় এটিও একটি উজ্জ্বল তারা। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Sting operation)

তানজিন তিপিয়া, লেখক ও রন্ধন বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ:

মুক্তিযুদ্ধ চোখে দেখিনি। দেখার সেই সাহসও নেই। এই মুহূর্তে যদি যুদ্ধের ডাক আসে হয়তো আমি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ নাও করতে পারি কারণ ইট সিমেন্টের তৈরি সোনার চামচে জন্মে আমি সেই ক্ষেত্রে খুব ভীরু। জীবনের মায়া অভ্যাসে পরিণত এখন। কিন্তু যখন নিজের বাবাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখি তখন খুব বিস্মিত হয়ে শীতল হয়ে যাই ভাবি এই মানুষটি যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের বর্বরতা দেখেছেন। যুদ্ধের মৃত্যুর ভয়কে বাস্তবে অনুভব করেছেন। মানুষ ক্ষুদ্র জীবনে কত কিছুই না করেন।

পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেকে যাহির না করে নীরবে, নিভৃতে সমাজসেবা তথা দুর্বল মানুষের পাশে ছায়া হয়ে থাকেন। তেমনি একজন সাদা মনের মানুষ আমার পিতা আলহাজ আবু মোহাম্মদ খালেদ।

যিনি শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সাবেক জেনারেল ম্যানেজার, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও সংগঠক। 

পরিবারের বড় জন হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালে আবু মোহাম্মদ খালেদ পরিবারের হাল ধরেন। তিনি শহর ও গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন ও মুক্তিযুদ্ধের সকল সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতার কারণে তাকে অনেক প্রতিকূলতার স্বীকার হতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি একটুও ভীরুতার আশ্রয় নেননি। তিনি তৎকালীন গ্রাম রাউজানের সুপরিচিত সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান “জাগরণী” সংস্থার সভাপতি ছিলেন। 

এভাবেই একদিন আব্বাকে বললাম- আব্বা মুক্তিযুদ্ধের কোন বিশেষ স্মৃতি থাকলে আমাকে একটু লিখে দিয়েন সময় হলে। 

লিখেও দিলেন আব্বা উনার মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা-

"১৯৬৬ সালে সিটি কলেজে পড়া অবস্থায় ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হই। প্রাক্তন মন্ত্রী মরহুম এম এ মান্নান সহ ডিগ্রীতে পড়ার সময় বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দাবী দেন। তখন আমি ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী হয়ে ৬ দফা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ শুরু হয়ে যায় সারাদেশে সেই বর্বরতা। ২৬ শে মার্চ সকালে জীবিকার তাগিদে প্রাণ নিয়ে ৮ ঘটিকায় অফিসে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসি এবং দেখি চারদিকে নিঃস্তব্ধ। লোকজন চারদিকে ছুটোছুটি করছে এবং যার যার বাড়ি ঘরের দিকে রওনা হচ্ছে তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমি তখন দি জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিঃ এ অফিসার হিসাবে কর্মরত ছিলাম। অফিসে গিয়ে আমরা কয়েকজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে আলাপ আলোচনা করে যার যার বাড়ি ঘরের দিকে রওনা হলাম। গাড়ি না চলাতে হেঁটে কালুরঘাট গিয়ে নৌকা যোগে কর্ণফুলী নদী পাড় হয়ে দক্ষিণ রাউজান দিয়ে আমাদের মোহাম্মদপুর গ্রামে পৌঁছলাম।

পরদিন ২৭ শে মার্চ আমার পরিচিত নিজাম উদ্দিনের নেতৃতে ১০/১২ জন ছাত্র আমাদের বাড়িতে উপস্থিত। আমি আর ওরা সহ রাত্রে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিই। তাদের সবাইকে রাজাকারদের ত্রিসীমানা থেকে বাঁচিয়ে খাওয়া দাওয়া করিয়ে পরদিন খুব ভোরে ২০০ টাকা দিয়ে ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিই। তারা আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফটিকছড়ি দিয়ে রামগড় হয়ে ভারতের দিকে চলে যায়। ওরা আমাকে এখানের সকল দায়িত্ব সঁপে যায়। কয়েকদিন পর দেখি আমাদের হিন্দু বাড়িতে মুসলিম লীগের লোকেরা বাড়ি ঘরে আগুন দিয়ে লুটপাট শুরু করল। হিন্দুরা প্রায় গ্রাম শূন্য হয়ে ভারতে চলে গেল। ইতিমধ্যে মে মাসে পাকিস্তান রেডিও থেকে যার যার কাজে যোগ দিতে এবং দোকান- পাট, অফিস আদালত খুলতে রেডিওর মাধ্যমে প্রচার শুরু করল। ২৫শে মে থেকে আমি কাজে যোগ দিলাম। চট্টগ্রাম এসে দেখি সব হিন্দু বাড়ি ও দোকান পাট লুট হয়ে গেছে। কিছু কিছু বাড়ি ও দোকান মুসলিম লীগের লোকেরা দখল করে রেখেছে। গ্রামে গিয়ে দেখি আমাদের মোহাম্মদপুর গ্রামের মতিলাল শীল ও নতুন চন্দ্র সহ আরো কয়েক জনের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। ওদেরকে আমি খাওয়ার জন্য তখন ৫০০ টাকা করে দিয়েছিলাম। আমাদের পশ্চিম পাড়ার হিন্দু বাড়ির বিধবা দুলালের মাকে ঘর তৈরি করে দিয়ে খাওয়া দাওয়ার জন্য সকল ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। নিজাম ভাই ভারত থেকে কয়েকবার পাকিস্তানী সেনাদের রাউজান ও শহরের মুভমেন্ট এর খবরা- খবর নিত আমার কাছ থেকে। আমি রাউজান, মুন্সীর ঘাটা, সত্তর ঘাট ও হাটহাজারী স্কুলে পাকিস্তানী সেনা অবস্থানের খবরা খবর চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দিতাম। পাকিস্তানী সেনারা আমাদের বাস থেকে নামিয়ে পুরো শরীর চেক করত। শহরে গাড়ির মধ্যে বন্দুক তাক করে সেনারা এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করত। আমাদের গ্রামের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মুছা ও আমি একসাথে সব সময় থাকতাম। রাজাকাররা যখন জানতে পারলো আমিও মুক্তিযোদ্ধা তখন একদিন ১৯৭১ সালে নভেম্বর মাসে আমাকে আর মুছাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে কাগতিয়া বাজারের পাশে পাকিস্তানী সেনার হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মুছা মারা যান। অল্পের জন্য আমি কোনোভাবে বেঁছে যাই। কিছুদিন পর আমি আমার আর মুসার অস্ত্র লুকিয়ে রাখি আর এদিক সেদিক পালিয়ে বেড়াই। এরপর বাড়ি ফিরে দেখি সব দিকে হাহাকার। আমি ডাবুয়া জাফরের কাছে মিলিত হয়ে পাকিস্তানীদের আক্রমণ করার জন্য নতুন করে বৈঠক করি। কিন্তু দুঃখের বিষয় পাকিস্তানীদের হাতে জাফরও মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ৫/৬ দিন পূর্বে ভারতীয় আর্মি প্রবেশ করেছে এবং আমাদের দেশের সকল মুক্তি বাহিনীও ভিতরে ঢুকেছে। এরপর তাদের সাথে সাথে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। দেশ স্বাধীন হল। সকলে ঘরে ফিরে গেল।" 

(ছবি সৌজন্যে: বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা আমার পিতার সঙ্গে আমি প্রতিবেদক)

(www.theoffnews.com - Bangladesh muktijuddho)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

রাত প্রায় দশটা, শুনশান সিটি সেন্টার। দুর্গাপুর শহরের প্রাণ কেন্দ্র তখনও এমন জমজমাট নয়। শপিং মল  তো দূরের কথা সাতটায় শিলিগুড়ির শেষ বাসটা চলে যেতেই নিথর গোটা চত্বর। মূলত অফিস পাড়া, তাই এমনিতেই সন্ধ্যার পর জনসমাগম কম, তার উপরে অক্টোবরের এই শেষ দিকে ঠান্ডাও পড়ে গিয়েছে। নিঝুম সিটি সেন্টারে সকলে চলে গেলেই বাসস্ট্যান্ডে সঞ্জয়ের চায়ের দোকানে বসত আমাদের আড্ডা। শুধু সাংবাদিক নয় নানান পেশার নানান ধরনের বা বয়সের মানুষেরা ওই আড্ডায় আসতেন। দুই তিন ঘন্টা জমাটি আড্ডা হত। সেই আড্ডা থেকেই ফিরছি, পায়ে হেঁটে। এমন সময় মোবাইলে ফোন, দেখলাম সদ্য আলাপ হওয়া এক পুলিশ আধিকারিক। কিন্তু তখন মোবাইল ধরলেই সাড়ে আট টাকা দিতে হত। বাড়ির কাছেই এসে গেছি। কেটে দিয়ে বাড়িতে ঢুকেই ফোন করলাম, কি ব্যাপার এই মাঝ রাতে কেন? চাপা উত্তেজনা গলায় উত্তর এল শিবপুরে মার্ডার হয়েছে, বেশ উত্তেজনা। চলে আসুন এখনও বডি পড়ে আছে। 

দুর্গাপুরে আমি তখন নতুন এসেছি, ভাল করে সব দিক চিনিও না, তার উপরে এমন ঠাণ্ডার রাত। কি করি? সদ্য চেনা কয়েকজন খবরের কাগজের সাংবাদিকদের ফোন করলাম। টিভির সাংবাদিক আমি ছাড়া আর নেই বললেই চলে। কিন্তু কাগজের সকলেরই প্রায় এক কথা, আমাদের এত রাতে গিয়ে কোনও লাভ নেই, আজ আর পাঠানো যাবে না, যা হবার কাল সকালেই দেখা যাবে। কিন্তু আমি তো তখন নবীন, ফোন করলাম আমার তৎকালীন বস আশিস ঘোষকে। আশিসদা প্রায় সব কিছুতেই যেতে বলেন, এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হল না। বললেন “এখুনি বেরিয়ে যা, এমন ব্যাপার হাতছাড়া করা যায় নাকি”? এসব করতে করতেই প্রায় এগারোটা। ডাকলাম আমার সদ্য নিযুক্ত ক্যামেরাম্যান সঞ্জয়দাকে। সঞ্জয়দাও তখন নতুন কিছু করবার উত্তেজনায় ফুটছে। বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। সঞ্জয়দার একটা স্কুটার ছিল বাজাজের। তাই নিয়ে রওনা দিলাম দুই মুর্তি। সঞ্জয়দার কাছেই শুনলাম শিবপুর জয়দেবের দিকে, অজয়ের ধারে একটা গ্রাম, রাস্তায় নাকি জঙ্গল আছে। কি আর করা। আমি পিছনে বসে আছি ঢাউস ভিএইচএস ক্যামেরার একটা সুটকেস ধরে। স্কুটার চালাচ্ছে সঞ্জয়দা।

মুচিপাড়া থেকে বাঁ দিকে বেঁকে যেতেই মুছে গেল সব আলোর রেখা। শুরু হল অসম্ভব খারাপ একটা রাস্তা। সঞ্জয়দার স্কুটারের হেডলাইটের আলো দেখার জন্য বোধহয় আর একটা আলো আনলে ভাল হত মনে হচ্ছে। কোনও রকমে গোত্তা খেতে খেতে দুই মক্কেল চলেছি। কয়েকদিন আগেই লোকসভা ভোট মিটেছে, এই খুন কি তারই ফল? ভাবতে ভাবতে বড় একটা গর্তে পড়ল গাড়ি, বিষম একটা ঝাঁকুনি খেয়ে আঁক করে একটা আওয়াজ করে প্রায় উল্টে পড়লাম আমি। স্কুটারও গেল থেমে। গতি কম ছিল বলে তেমন ব্যাথা লাগেনি। সঞ্জয়দা আমাকে তুলে স্কুটারটাকে নাড়িয়ে ঝাঁকিয়ে কাত করে আবার কোনও রকমে স্টার্ট দিল। ত্রিসীমানায় কোনও আলো নেই। ঠান্ডাও বেড়ে গিয়েছে কয়েকগুণ। অন্ধকারে চোখ সয়ে যাওয়াতে আবছা আবহ পাচ্ছিলাম জঙ্গলের। নীরব নিথর আবহে স্কুটারের আওয়াজটা যেন বিকট লাগছিল এক এক সময়। প্রাণ হাতে করে এগোচ্ছি ওই খানা খন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে, হঠাৎ সামনে কয়েকটা টর্চের আলো একটু প্রাণ এল বুকে। পুলিশ বুঝি। কাছে যেতেই ভাঙল ভুল, মুখে কাপড় বাঁধা কয়েকজন রাস্তা আটকে। হাতে সকলেরই অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র। স্কুটার থামতেই কাছে এসে শীতল গলায় প্রশ্ন “কে আপনারা? কোথায় যাচ্ছেন”? বললাম “আমরা সাংবাদিক, একটা কাজে যাচ্ছি”। ছুটে এল প্রশ্ন, “এখন কি কাজ? এখানে সব ঠিক আছে”। মনে মনে একটু ভয় পেয়েছিলাম বৈকি, কারন এখানে কিছু হলে সাহায্য পাওয়ার কোনও আশাই নেই। মুখে বললাম “সেটাই দেখে আসি তাহলে”। এবার একটু অধৈর্য হয়েই এগিয়ে এল একজন। “তখন থেকে বলছি চলে যেতে এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে”। সঞ্জয়দা আমার হাতটা একটু শক্ত করে ধরল। আমি বললাম “আমরা সাংবাদিক আমাদেরকে তো কেউই আটকায় না, আমরা কোনও পক্ষেরই নই। তাই একটা খুন হয়েছে সেটা দেখেই চলে যাব”। “যে খুন হয়েছে সে ভাল লোক ছিল না। এবারে না গেলে আপনাদের কিন্তু জঙ্গলে নিয়ে যাব” বলেই একজন এগিয়ে স্কুটারের হাতলটা ধরেছে। সত্যি সত্যিই টান পড়ল স্কুটারে, আর একজনের হাত সঞ্জয়দার ঘাড়ে, আমরা অসহায়। এমন সময় গায়ে পড়ল একটা গাড়ির হেড লাইট।

আলো পড়তেই ম্যাজিক, উধাও সেই মুখ ঢাকার দল, যারা আমাদের জোর করে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। আমাদের মাঝপথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গাড়িটি থেমে গেল। গাড়ি থেকে নেমে এলেন এক যুবক, পুলিশের বড় কর্তা পোষাক দেখেই বোঝা যায়। হালকা আলোয় বেশ অল্প বয়স্কই মনে হল। ভাঙা বাংলায় বললেন কি হয়েছে? সব শুনে বললেন ভালই হল আমিও ওদিকেই যাচ্ছি, আমার ড্রাইভারেরও রাস্তাটা খুব ভাল জানা নেই, চলুন আমার সঙ্গে। বাকি ওদের এখন ছেড়ে দিন কাল সকালে দেখে নেব। ওদের গাড়ির আগেই যেতে লাগলাম আমরা। প্রায় এসকর্ট করে আমাদের একেবারে ঘটনাস্থলে নিয়ে গেল পুলিশের সেই গাড়ি। আমরা বা পুলিশের গাড়ি পৌঁছতেই শশব্যস্ত ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশকর্তা বা কর্মীরা। সেই চেনা পুলিশ কর্তাটি যিনি আমাকে খবর দিয়েছিলেন তিনি আমাকে পাশে ডেকে নিয়ে বললেন করেছেন কি? খোদ বড় সাহেবকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন? বড় সাহেব মানে পুলিশ সুপার? বর্ধমান তখনও ভাগ হয়নি তাই বর্ধমান থেকেই ছুটে এসেছেন। আমার অবশ্য তাতে একটা বড় উপকার হয়েছে, না হলে ওই সময় এসপি সাহেবের গাড়ি না এসে পড়লে এতক্ষণে কি যে হত কে জানে? 

গিয়ে দেখলাম একজন সিপিএমের স্থানীয় নেতা খুন হয়েছেন, এতদিন পরে নামটা আর মনে নেই। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হল জনযুদ্ধ গোষ্ঠীর কাজ হতে পারে। জনযুদ্ধ আজকের মাওবাদীদের পুরনো নাম। তাহলে আমাকে যারা জঙ্গলে ধরেছিল তারা ওদের দলেরই কেউ? নাকি অন্য কেউ বা কারা? দলীয় কোন্দলও তো হতে পারে? নানা প্রশ্ন কুরে কুরে খাচ্ছিল নবীন সাংবাদিকের মনে। আলো তেমন নেই, এসপি-র গাড়ির আলোতেই শুট করা হল। বাইট নেওয়া হল এসপি-র। কাজ শেষ হলে ফিরে যাব ভাবছি, এমন সময় বড় সাহেবের ডাক। বললেন – “ফিরবেন তো? আমার সঙ্গেই চলুন। না হলে আবার সমস্যা হতে পারে। কিছু পুলিশ সঙ্গে নিয়ে নিচ্ছি। এত রাতে এমন ভাবে চলে এসেছেন দুজনে, দেখে তো আমার অবাক লাগছে। আপনি আমার গাড়িতে উঠে আসুন, রাস্তা ভাল না। মুচিপাড়ায় গিয়ে ছেড়ে দেব।” উঠে পড়লাম গাড়িতে সঞ্জয়দা স্কুটার নিয়ে আগে চলেছে। আবার সেই অরণ্য সঙ্কুল রাস্তা। এসপি সাহেবের সঙ্গে গল্প করতে করতে এগোচ্ছি। কোথায় থাকি, বাড়ি কোথায়, ইত্যাদি নানা কথা। এত অল্প বয়সেই এই পেশায় চলে এসেছি, কেমন লাগছে জিজ্ঞাসা করলেন। নিজের নানা কথা বলার পর বললেন “আমার তো বদলী হয়ে গিয়েছে কাল বা পরশু চলে যাব। আগের রাতেই এই কাণ্ড। যাই হোক আপনার সঙ্গে আলাপ হল, ভাল থাকবেন।” আমিও মাথা ঝাঁকিয়ে তাকে ভাল থাকার বার্তা দিলাম। বললাম “আপনিও তো এত রাতে ছুটে এসেছেন, চলে যাওয়ার আগের দিনে। ভাল লাগল দেখে”। মুচিপাড়ায় গাড়ি থেকে নামার সময় আমাকে বললেন “এই পেশায় যখন এসেছেন তখন হয় তো আবার দেখা হবে। অনেক রাতের আলাপ তো, মনে থাকবে বহুদিন”। আমিও সায় দিলাম, “ঠিক বলেছেন, পরে দেখা হলে মনে করিয়ে দেব আপনাকে কিন্তু”। হেসে বললেন তাই হবে। চলে গেল এসপি সাহেবের গাড়ি। আমি সঞ্জয়দার স্কুটারে চেপে বাড়ির দিকে...

সেদিনের সেই এসপি-র সঙ্গে আমার আর সরাসরি দেখা হয়নি। কিন্তু তিনি বিখ্যাত পুলিশ আধিকারিক হয়েছেন। তার বাইট নিয়ে আমার কাছে এসেছে জুনিয়র রিপোর্টাররা। বিভিন্ন মহলে, সংবাদ মাধ্যমে তার নাম, সুনাম অথবা দুর্নাম। সম্প্রতি সিবিআই এর সঙ্গে বিবাদে তিনি আলোচনার শীর্ষে। আমার কিন্তু মানুষটিকে ওই কয়েক ঘন্টার আলাপে ভালই লেগেছিল। বছর কুড়ির আগেকার কথা, তবুও স্পষ্ট মনে আছে ওই গাড়ির ছোট্ট আড্ডা, হঠাৎ এসে আমার জীবন বাঁচানো। মানুষটির নাম – রাজীব কুমার, আইপিএস। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - IPS Rajib Kumar)

(www.theoffnews.com - Russia president Vladimir Putin opposition leader Alexey Navalny fasting)
 

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মধ্যে স্বর্ণকুমারী ও জ্ঞানদানন্দিনীর নাম সকলেই জানে। তবু ইতিহাসেরও ইতিহাস থাকে, তাই তাদের পিতামহী দিগম্বরীকেও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। সূর্যোদয়ের অনেক আগে যেমন উষার আলো ফুটে ওঠে, দিগম্বরীর ধর্মনিষ্ঠা এবং নির্ভীক তেজস্বিতার মধ্যেও তেমনি ঠাকুরবাড়ির নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার ছাপটুকু চোখে পড়ে। যে যুগে মেয়েদের স্বামী বই গতি ছিল না সেই সময়ে দিগম্বরী কুলধর্মত্যাগী স্বামীকে ত্যাগ করা উচিত কি উচিত নয় জানতে চেয়েছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সমাজের কাছে। সেই পুরুষ শাসিত সমাজে তার একক প্রতিবাদ—তবু তিনি নিন্দায় জর্জরিত হননি। বরং হিন্দুসমাজ তাকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছিল।

কিন্তু তিনিই বা হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞদের কাছে এমন একটা বিধান জানতে চেয়েছিলেন কেন? তিনি কি মুক্তি চেয়েছিলেন সাত-পাকে-বাঁধা বিবাহ বন্ধন থেকে, না, স্বামীর অবহেলা তার তীব্র অভিমানকে বড় বেশি আঘাত করেছিল? এই কেনর উত্তর খুঁজতে হলে বাস্তবে-অবাস্তবে মেশা দিগম্বরীর অলৌকিক জীবনের কথা জানতে হয়।

লোকে বলে, অপরূপ লাবণ্যময়ী দিগম্বরী এসেছিলেন ঠাকুরবাড়ির লক্ষ্মী হয়ে। যশোরের নরেন্দ্রপুরে তার জন্ম। মাত্র ছ বছর বয়সে দ্বারকানাথের ধর্মপত্নী হয়ে তিনি জোড়াসাঁকোর বাড়িতে এসে পা দিলে ঠাকুরবাড়ির শ্রীবৃদ্ধি হতে শুরু করে। দিগম্বরীর রূপ এখন প্রবাদে পরিণত হয়েছে। বোধহয় তখন থেকেই ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের রূপের খ্যাতি। শোনা যায়, দিগম্বরীর মুখের আদলেই ঠাকুরবাড়ির জগদ্ধাত্রী প্রতিমা গড়া হত। প্রত্যক্ষদর্শীরা তাকে বলতেন, সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী। বলবে নাই বা কেন? দুধে-আলতা মেশা গায়ের উজ্জ্বল রঙ, পিঠে একটাল কোঁকড়া কালো চুল, চাপাকলির মতো হাতের আঙুল, দেবী প্রতিমার পায়ের মতো দুখানি পা—মৃত্যুর পরে তাকে শ্মশানে নিয়ে যাবার সময় অনেকে তার পা দুটি থেকে এক অপূর্ব জ্যোতি বেরোতে দেখেছিল। অতুলনীয় রূপের সঙ্গে দিগম্বরীর ছিল প্রচণ্ড তেজ। শাশুড়ী অলকাসুন্দরীও এই ব্যক্তিত্বময়ী বৌটিকে সমীহ করে চলতেন।

১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে দ্বারকানাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহের সময় তাঁর বয়স ছিল ৬ বৎসর। তিনি অসামান্য সুন্দরী ছিলেন। ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনী'' গ্রন্থে এ বিষয়ে লিখেছেন

"...দিগম্বরীদেবীকে লোকে লক্ষ্মীর অবতার বলিত। তাঁহার হাতের আঙুল চাঁপার কলির মত ছিল। তাহার কেশদাম কোঁকড়া ছিল। প্রতিমার পদযুগল যে রূপ সচরাচর গঠিত হয়, তাঁহারও পদযুগল সেইরূপ ছিল। তিনি নাতিহ্রস্ব নাতিদীর্ঘ এবং শরীরে দোহারা ছিলেন। আমাদের গোষ্ঠীতে প্রবাদ আছে যে আমাদের বাটীতে যে জগদ্ধাত্রী মুর্তি গঠিত হইত, তাহার মুখটি নাকি দিগম্বরী দেবীর মুখের আদর্শে গঠিত হইত। সেখানের বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা যাঁহাকেই তাঁহার রূপের কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছি, তাঁহাদের সকলেই একবাক্যে বলিয়াছেন যে, তাঁহার রূপের কী বর্ণনা করিব, সাক্ষাত জগদ্ধাত্রী ছিলেন।"

আর দ্বারকানাথ?

স্ত্রীকে তিনি সত্যিই ভালবাসতেন। কিন্তু এ তো গল্প। গল্পই তো। গল্পই তো জীবন। তারই টানাপোড়েনে বোনা হয়েছে অন্দরমহলের বালুচরী আঁচলার নকশা, গৌরবময় নারী জাগরণের ইতিহাস।

তখনকার দিনে এঁরা ছিলেন গোঁড়া বৈষ্ণব। পাথুরেঘাটার ঠাকুররা ব্যঙ্গ করে বলতেন মেছুয়াবাজারের গোঁড়া। পেঁয়াজ ঢুকত না বাড়িতে। মাছ-মাংসের তো কথাই নেই। পাছে কুটনো-কোটা বললে হিংস্র মনোভাব জেগে ওঠে তাই বলা হত তরকারি বানানো। গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দনের নিত্যসেবা নিজের হাতে করতেন দ্বারকানাথ। পুজোর উপকরণ হয়ত যুগিয়ে দিতেন দিগম্বরী। নীলাম্বরী শাড়ির আঁচল-ঘেরা দুধে-আলতা মেশা সুন্দর মুখে ভক্তির আবেশ মাখা —যে দেখত শ্রদ্ধায় আপনিই নুয়ে পড়ত। না, সেদিন কোথাও বিরোধের কালো মেঘ বাষ্প হয়েও দেখা দেয়নি।

হঠাৎ ঝড় উঠল, কেঁপে উঠল যুগলের সংসার। ফাটল ধরল সনাতন হিন্দুয়ানীর ভিতে। মা লক্ষ্মীর পদ্মের অনেকগুলো পাপড়ি উড়ে এসে পড়ল দ্বারকানাথের ঘরে। আর ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে বিলাসিতা ও বাবুয়ানীর ছদ্মবেশ পরে নবযুগের ভাবনা বাসা বাঁধলে দ্বারকানাথের মনে। হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, বিধর্মীর সংস্পর্শে এলে দেহ অপবিত্র হয়। সেই নিয়ম অনুযায়ী দ্বারকানাথ যখন সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করলেন তখন থেকে তাঁকে নিজের হাতে পুজো-করা ছাড়তে হল। নিত্য পূজা ও অন্যান্য ক্রিয়াকর্মের জন্যে তিনি আঠারজন শুদ্ধাচারী ব্রাহ্মণকে মাইনে দিয়ে সেই কাজে নিযুক্ত করলেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজে এর পরে ব্যবসায়িক কাজকর্মের প্রয়োজনে মাংস এবং শেরি খাওয়া অভ্যাস করলেন। দিগম্বরী ও দ্বারকানাথ বয়ে চললেন ভিন্ন খাতে।

প্রথম প্রথম দ্বারকানাথ বেপরোয়া খুশির প্রমোদে গা ঢেলে দেননি। যদিও এটি ছিল সে যুগের বিলাসী বাবুদের মতোই দিলদরিয়া। সেই সঙ্গে ছিল শিল্পরুচি। তাঁর বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে ছিল নানারকম প্রমোদের আয়োজন। এক প্রহরের আমোদে কত যে ঐশ্বর্য নষ্ট হয়েছে তার সীমা নেই। নিজের মনের মতো জীবন-যাপন করবার জন্যে বাগানবাড়িটি তৈরি করেছিলেন দ্বারকানাথ। কী তার কারুকাজ। ফোয়ারা, সেতু, রঙিন টালি-ঘেরা বাগান, ঝাড়লণ্ঠন, বিলিতি আসবাবে নিজের রুচিমতো সাজালেন। তাঁর নতুন গৃহসঞ্চার-এর কথা ঘটাপটা করে ছাপাও হল সেদিনকার কাগজে। প্রকাণ্ড ভোজ, নাচ-গান, বিলিতি ব্যাণ্ডের সঙ্গে ভাঁড়ের সং-এরও আয়োজন হয়েছিল, আর মধ্যে একজন গোবেশ ধারণপূর্বক ঘাস চর্বণাদি করিল। সুতরাং দ্বারকানাথের বিলাসিতায় সেযুগের বাবুয়ানীর ছাপ পুরোমাত্রায় বজায় ছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

এই বাড়িটি তৈরি হয় ১৮২৩ সালে। এসময় দ্বারকানাথ গভর্নমেন্টের দেওয়ান, পরে আরো উন্নতি হয়। প্রথমদিকে দিগম্বরীর চোখে এত পরিবর্তন ধরা পড়েনি। নিজের জপ-তপ ঠাকুরসেবা নিয়ে তিনি সদাব্যস্ত। ভরা সংসার। বড় ছেলে দেবেন্দ্রর সবে বিয়ে হয়েছে। ছেলের বৌ সারদাও এসেছেন যশোর থেকে। এখানে যে পিরালীবংশের অনেকেই থাকেন। ছ বছরের মেয়ে সারদা এসেছেন দক্ষিণডিহি থেকে। অন্য দিকে তাকাবার সময় কই? ভোর চারটে থেকে দিগম্বরীর পূজা শুরু হত। লক্ষ হরিনামের মালা জপ ছাড়াও তিনি নিয়মিতভাবে পড়তেন ভাগবত-রাসপাধ্যায়ের বাংলা পুঁথি। দয়া বৈষ্ণবী পড়ে শোনাতেন নানারকম ধর্মগ্রন্থ। পরাণ ঠাকুর তাঁর পুজোর উপচার ও রান্নার উপকরণ গুছিয়ে রাখত। দিগম্বরী স্বপাকে আহার করতেন। একাদশীতে খেতেন সামান্য ফলমূল।

মাঝে মাঝে শোনেন অনেক কথা। অনেকে অনেক কিছু বলে। কিছু শোনেন, কিছু মনে থাকে না, মালা জপতে জপতে ভুলে যান। মন বলে, এ সবই অহেতুক রটনা। কৃতী পুরুষের গায়ে কালি ছিটোবার সুযোগ কে না। খোঁজে? কিন্তু খুব বেশি দিন নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকা সম্ভব হল না। ওদিকে বাগানবাড়িতে পানভোজন হাসিহল্লা চলে নিয়মিত। ঘরগুলো আলোতে, আরশীতে, মির্জাপুরের কার্পেটে, লাল জাজিমে, সবুজ রেশমে, ফুলের তোড়ায় ঝলমল করে। গুজব ছড়ায়। শেষে সবই শুনলেন দিগম্বরী, শুনলেন দ্বারকানাথের। ভোজসভায় নাকি মদের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। শোনেন ছড়ার গান বাঁধা হয়েছে :

বেলগাছিয়ার বাগানে হয় ছুরিকাঁটার ঝনঝনি,

খানা খাওয়ার কত মজা আমরা তার কি জানি?

জানেন ঠাকুর কোম্পানী।

বাগবাজারের রূপচাঁদ পক্ষী আরো শোনালেন :

কি মজা আছে রে লাল জলে

জানেন ঠাকুর কোম্পানী।

মদের গুণাগুণ আমরা কি জানি।

জানেন ঠাকুর কোম্পানী।

প্রথমে বিশ্বাস হয়নি তবু নিঃসংশয় হবার জন্যে দিগম্বরী স্থির করলেন, তিনি স্বয়ং যাবেন সেই ম্লেচ্ছ ভোজসভায়। স্বচক্ষে দেখে আসবেন কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে। পতিব্রতা দিগম্বরীর এই অতর্কিত অভিযান চিরস্মরণীয়। বিপথগামী স্বামীকে ফেরাবার জন্যে তিনি নিজেই গেলেন, সঙ্গে রইল ভীতত্ৰন্তা তরুণী সারদা ও আরো কয়েকজন আত্মীয়। মনে ক্ষীণ আশা, যা শুনেছেন তা ভুল। এতদিনের চেনা মানুষ কি এভাবে বদলে যেতে পারে? তিনি পালকি চড়ে চুপি চুপি এসেছিলেন তাঁর স্বামীর বাগানবাড়িতে যে তিনি কিরকম জীবনযাপন করেন। তিনি সব স্বচক্ষে দেখে ফিরে গিয়েছিলেন ঠাকুর বাড়িতে।

অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে প্রবেশ করতে গিয়ে কুলবধূ দিগম্বরী কেঁপে উঠেছিলেন কিনা কে জানে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে কেউ কোনভাবে ধরে রাখেনি। কারণ ইতিহাস পুরুষদের তৈরি। সত্যিই কি তিনি সেখানে যেতে পেরেছিলেন, পারিপার্শ্বিক ঘটনা তো তাই বলে চোখের সামনে দেখলেন, অলো-ঝলমলে ঘরে সাহেব-বিবিদের সঙ্গে একাসনে পানাহারে মত্ত তার স্বামী। এ কি দুঃস্বপ্ন! তাহলে যা শুনেছেন সব সত্যি! বুকটা যেন ভেঙে গুড়িয়ে গেল। তবু কর্তব্য ভোলেননি; বিপথগামী স্বামীকে ফিরিয়ে আনার জন্যে অনেক চেষ্টা অনেক কাকুতি-মিনতি করেছিলেন। কর্ণপাত করেননি দ্বারকানাথ।

অন্য মেয়ে হলে এ সময় কী করতেন? হয় কেঁদে-কেঁদে নিঃশেষে হারিয়ে যেতেন, নয়তো থাকতেন আপনমনে। যেমন থাকত সেকালের অধিকাংশ ধনী গৃহিণীরা। দিগম্বরী এর কোনটাই বেছে নিলেন না। তার মতে তেজস্বিনী নারীর কাছে ধর্ম আর কর্তব্য সবার আগে। তাই মনের দুঃখ মনে চেপে তিনি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের মতামত চেয়ে পাঠালেন। কী করবেন তিনি? স্বামীকে ত্যাগ করে কুলধর্ম বজায় রাখবেন, না স্বামীর সহধর্মিণী হয়ে কুলধর্ম ত্যাগ করবেন? দ্বারকানাথ অবশ্য ধর্মত্যাগী নন। কিন্তু ম্লেচ্ছদের সঙ্গে যে। একত্রে খানা খায় তার আর ধর্মত্যাগের বাকী কী আছে? পণ্ডিতেরা ভাল করেই বিচার করলেন। বহু বিতর্কের পর উত্তর এল, স্বামীকে ভক্তি ও তাহার সেবা করা অবশ্য কর্তব্য তবে তাহার সহিত একত্র সহবাস প্রভৃতি কার্য অকর্তব্য।

পণ্ডিতদের রায় শুনে দিগম্বরী নিজের কর্তব্য স্থির করে নিলেন। শুধু সেবা ছাড়া আর সব ব্যাপারে তিনি স্বামীর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। অবশ্য বাইরের কেউ কিছু জানতে পারল না। কারণ তাঁর স্বামীভক্তি ছিল প্রবল। তিনি প্রতিদিন দ্বারকানাথের শয্যার কাছে গিয়ে মাটিতে একটি প্রণাম রেখে আসতেন। দ্বারকানাথ সম্পূর্ণ নির্বিকার। বৈষয়িক ব্যাপারে কিংবা অন্য কারুর প্রয়োজনে দিগম্বরী যখনই স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য হতেন তারপরই সাত ঘড়া গঙ্গাজলে স্নান করে নিজেকে শুদ্ধ করে নিতেন। দিনরাতের বিচার ছিল না। দুঃসহ অত্যাচারের ফলে কয়েকদিনের জ্বরবিকারে নিবে গেল দিগম্বরীর জীবনদীপ। তার জ্যোতির্ময়ী মুর্তিটি শুধু অম্লান হয়ে রইল মহর্ষিপুত্রের আধ্যাত্মিক ধ্যান-স্মৃতিতে। দ্বারকানাথেরও কি মনে পড়েনি তেজস্বিনী দিগম্বরীকে? স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তিনি বারবার অনুভব করেছেন গৃহলক্ষ্মীর অভাব; তাই তো যেদিন কার-টেগোর কোম্পানীর একটি মূল্যবান জাহাজ অকুল সাগরে ডুবে গেল সেদিন দ্বারকানাথের বুকভাঙা নিঃশ্বাসের সঙ্গে শুধু বেরিয়ে এল দুটি কথা, লক্ষ্মী চলিয়া গিয়াছেন, অলক্ষ্মীকে এখন আটকাইবে কে?

সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে দিগম্বরী যে সাহস দেখিয়ে গিয়েছিলেন তার ছেলের বৌয়েদের মধ্যে সেই তেজ, সেই শক্তি দেখা যায়নি। দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী সারদার সমস্ত কাজকর্মই ছিল স্বামীকেন্দ্রিক। বরং গিরীন্দ্রনাথের স্ত্রী যোগমায়ার মধ্যে শাশুড়ির সনাতন ধর্মনিষ্ঠার অনেকটাই লক্ষ্য করা গেছে। দেবেন্দ্রনাথের ছোট ভাই নগেন্দ্রনাথের স্ত্রী ত্রিপুরা সুন্দরী, তিনি এসেছিলেন অনেক পরে।

দ্বারকানাথের সঙ্গে সহবাস না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন এই তেজস্বিনী নারী। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন দ্বারকানাথের মা অলকাসুন্দরী এবং ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল। দিগম্বরীর নেতৃত্বে ঠাকুরবাড়ির মহিলারা দ্বারকানাথকে বসতবাড়ি থেকে বহিষ্কার করার  সিদ্ধান্ত নেন— এমনটাই বলেছিলেন ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা দ্বারকানাথের জীবনীতে। দ্বারকানাথ একরকমভাবে স্বেচ্ছা নির্বাসন গ্রহণ করেন জোড়াসাঁকোর বৈঠকখানা বাড়িতে। কিন্তু দূরত্ব বজায় রেখে স্বামীর প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন দিগম্বরী। প্রতিদিন প্রাতঃকালে একটি প্রণাম এবং সাংসারিক সৌজন্যমূলক কথোপকথন — এই ধার্য ছিল দ্বারকানাথের জন্য। দিগম্বরী থাকতেন জোড়াসাঁকোর বাড়ির উত্তরপূর্বাঞ্চলে। কোনোদিন যদি দ্বারকানাথের সঙ্গে বাক্যবিনিময় হত তাঁর, সেই দিন সাত ঘড়া গঙ্গাজলে স্নান করে শুদ্ধ হতেন তিনি। এমনি ছিল স্বামীর প্রতি তাঁর কঠিন উদাসীনতা। স্বামীর ঘর ত্যাগ না করেই আজীবন মৌন ভর্ৎসনা করে গিয়েছিলেন দিগম্বরী নিজের স্বামীকে। কতটা মানসিক জোর থাকলে এই আচরণ করা যায় বলুন তো?

কিন্তু একটি মেয়ের মনের অভিমানের প্রকাশ ঠিক কেমন হবে, তা কে ঠিক করে দেবে? কি তাঁর মানদন্ড হবে। সবই কি পুরুষরাই ঠিক করে দেবে?

বছরের সব ঋতুতে স্বামীর সঙ্গে কথা বলে কোন অভিমানে একটি মেয়ে ঘড়া ঘড়া জল ঢেলে শুদ্ধ হতে চাইতেন? তাঁর চোখের জল ওই সাতঘড়া জলের সঙ্গে ধুয়ে যেতো কিনা, তার খবর উনিশ শতক কেন, এই একবিংশ শতকও রাখে না।

এই ঝলমলে বেলগাছিয়ার স্মৃতির ইতিহাসে স্ত্রীদের দুঃখের ইতিহাস কেউ মনে রাখেনি হয়তো রাখবেও না। তাই পুরুষ তান্ত্রিক ইতিহাস বোধ আজ কঠিন সমালোচনার মুখে। যাই হোক শরীরের প্রতি এই ইচ্ছাকৃত অত্যাচারে, ব্রত উপবাস পালনের মাত্রাধিক্যে দিগম্বরীর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। এরপর ১৮৩৯ সালের ১৮ জানুয়ারি তেরো বছরের সন্তান ভূপেন্দ্রনাথের মৃত্যুর ঠিক তিনদিন পরেই ২১ জানুয়ারি দিগম্বরী দেবী মারা যান।

(www.theoffnews.com - Digambwari Dwarakanath Tagore)

শেখ ফরিদ, প্রগতিশীল লেখক, বাংলাদেশ:

করোনা ভাইরাস কৃত্রিম নাকি মানুষের তৈরি তা নিয়ে বাহাস তো চলছেই। চলতেই থাকবে মনে হয়। যারা ধর্মান্ধ তারাও দুইভাগে বিভক্ত। তা, যে কোন ধর্মেরই হোক। তাদের একদল মনে করে,করোনা ভাইরাস বলে কিছু নেই। এসব মিথ্যা প্রচারণা। আবার এই ধর্মান্ধরাই মনে করেন, করোনা ভাইরাস তাদের স্ব স্ব বিধাতার সৈনিক! পৃথিবীর সকল ধর্মের ধর্মবেত্তা তাদের নিজ নিজ ধর্মের নিয়ম নীতি ও ব্যাখ্যা নিয়েই ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেননি। আর তো করোনা ভাইরাস। তারা একাধারে বলছেন, করোনা, ভাইরাস বলে কিছু নেই, আবার বলছে, এসব 'গজব" "আজাব" "পরীক্ষা" "অভিশাপ" "কর্মফল" প্রভৃতি। ধর্মবেত্তা ও ধর্মান্ধদের করোনা ভাইরাস ভাবনা নিয়ে, আজকের এ লেখা নয়।

ইস্টিশন ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা নুর নবী দুলাল লিখেছেন, তার আশংকা ছিলো, করোনা ভাইরাস যতদিন থাকবে। ততদিনই পৃথিবীর সকল মানুষকে করোনার টিকা গ্রহন করতে হবে। গত বৃহস্পতিবারে ফাইজারের নির্বাহী পরিচালকও তেমনটাই বলেছেন! নুর নবী দুলাল যে আশংকা করেছেন, তেমনি ভারতের একজন ডাক্তার বিশ্বরূপ রায় চৌধুরীও করোনা ভাইরাস ও টিকা নিয়ে বিশ্বের বড় বড় দেশ ও ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়ীক "ধান্ধাবাজীর" কথা বেশ কবার বলেছেন। যার কারনে ডক্টর বিশ্বরূপ রায় চৌধুরী ফেসবুক, ইউটিউবে কঠিন বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। এমনকি তার দেশে তাকে সেমিনার করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃংখলা বাহিনী ডক্টর চৌধুরীকে এয়ারপোর্ট থেকে শহরে যেতে নিষেধ করে। ডক্টর বিশ্বরূপের ভাষায় তার সেমিনার চিকিৎসা বাণিজ্য বিরোধী। তাই তাকে সেমিনার করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তাকে ফেসবুক ও ইউটিবে নিষিদ্ধ করার পায়তারা চলছে।

আমার আরো কয়েকজন ফেসবুক বন্ধু তারা তাদের ফেসবুক পোষ্টে টিকা নিয়ে ব্যবসার "ধান্ধার" আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। আমি তাদের সাথে একমত ছিলাম না। বরং আমি মনে করেছিলাম, এমন সময়, আসবে, করোনাই ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে পোলিও টিকার মত একটা কিছু খেলেই আজীবনের জন্য করোনা মুক্ত হওয়া যাবে। আমি এখনও তাই মনে করি। কিন্তু ফাইজারের প্রধানের সাক্ষাৎকার শুনে এবার আমিও শঙ্কায় পরে গেলাম বৈকি। স্বাভাবিক ভাবেই পুঁজিপতিরা টিকা নিয়ে  ব্যবসা করার এই "মহাসুযোগ" হাত ছাড়া করতে চাইবে না। কারন, পরাশক্তিগুলো বাজার তৈরি ও দখল করতে প্রক্সি যুদ্ধ করে। তাতে কাজ না হলে, সরসরি নিজেরাই যুদ্ধে নামে। আর এখানে তো ব্যবসা করার ক্ষেত্র প্রস্তুতই আছে। দেখা যাক আগামী দিনে করোন ভাইরাসের টিকা নিয়ে কি ঘটে। দুটো বা তিনটা টিকা নিলেই চলবে, নাকি প্রতিবছরই টিকা নিতে হবে। তা সময়ই বলে দেবে। যদি ফাইজারের নির্বাহীর কথাই সত্য হয়। তবে, করোনা ভাইরাস যে কৃত্রিম সে বিষয়ে মানুষের সন্দেহ বাড়বে। এমনকি প্রাকৃতি হলেও ব্যবসায়ীরা "ধান্ধা" করার অভিযোগও উঠবে যদি প্রতিবছর টিকা নিতে হয়! আর বামপন্থীরা জোড়েশোরেই  বলবে, এ করোনা ভাইরাস এবং করোনা ভাইরাসের টিকা মৃতপ্রায় পুঁজিবাদকে জীবিত রাখার পুরনো কৌশল।

(www.theoffnews.com - corona vaccine business)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

এবারের ভোট কথায় কোনও রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীকে নিয়ে কথা বলব না, কথা বলব রাজনীতির সাইড এফেক্ট নিয়ে। রাজ্য রাজনীতিতে তখন বহু আলোচিত নাম নানুর। বীরভূমের নানুরে চণ্ডীদাসের ভিটে। রামী ধোপানীর সঙ্গে চণ্ডীদাসের প্রেমের সাক্ষ্য দেবে এখনও সেই পুকুর ঘাট, যেখানে কাপড় কাচত রামী। কিন্তু সে কারনে নয়, নানুরের খ্যাতি বা কুখ্যাতি ছড়িয়েছিল অন্য কারনে। ঘরে ঘরে বোম বাঁধার কুটির শিল্প, কারনে অকারনে তার মুড়ি মুড়কির মত ব্যবহার। ধারাবাহিক হিংসা বাম আমলে নানুরকে এক আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। সূচপুরে গণহত্যা সেই পরিচিতির রক্তিমতাকে আরও গাঢ় করে। প্রতিদিন খবরের শিরোনামে তখন নানুর এবং আশপাশের গ্রামের নাম। নানুর এমনিতেই উত্তপ্ত বছরভর, সেখানে ভোট এলে তো কথাই নেই। বোমা শিল্পীদের ব্যস্ততা এবং চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। লোকসভা ভোটের বেশ কয়েক মাস আগে থাকতেই আমরা নজর রাখছিলাম নানুরের উপরে। আমার নানুরে সেই সময়ের সহকর্মী পরিতোষ দাস। গোপনে বলা ছিল পরিতোষকে, বোমা বাঁধার একটা ভাল ছবি করতে হবে। পরিতোষ বলেছিল, দাদা আপনাকে আসতে হবে, স্থানীয় মানুষকে ওরা পুরোপুরি বিশ্বাস করবে না। বললাম ঠিক আছে নজর রাখ। 

পরিতোষ স্থানীয় ছেলে, তখন দাশকলগ্রামে ও থাকত। কাজের ছেলেও বটে। তক্কে তক্কে থেকে ঠিক কয়েকজনের হদিশ বার করল। অতি কষ্টে তাদের একজনের নম্বর মিলল। এবার আমার পালা। প্রায় একমাস ধরে ওই নম্বরে ফোন করে পটানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। তখন তো টিভি ক্যামেরা এতো জলভাত হয়ে যায়নি। তখন সাংবাদিককে কিছুটা ভয় ভক্তি করত লোকে, ফলে তারা তো ভয়ে আর মানতেই চায় না। মাস খানেকের চেষ্টার পর রাজি হল দুজন, শর্ত মুখ দেখানো চলবে না। তাদেরকেই বললাম গোপন ডেরায় গিয়ে ছবি তুলব কিন্তু। ডিটেলে সব নেব। পাঁচ ছজন থাকলেই হবে বেশি লোক চাই না। শেষমেশ কথা হল আমি আর পরিতোষ এই দুজনই যেতে পারব, এবং কোনও রকম বেচাল দেখলে তারা আমাদের জীবনের দায়িত্ব নেবে না। 

এবারে এল সেই দিন। আমি কীর্ণাহার পৌঁছে গাড়ি সেখানেই রেখে দিলাম। বাইক নিয়ে যেতে হবে আমাদের। পরিতোষের বাইকের পিছনে চেপে আমরা চলেছি ওদের বলে দেওয়া একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। সেখানে পৌঁছিয়ে সামান্য দাঁড়াতেই হাজির আর একটি বাইক। সেই বাইককে অনুসরণ করলাম আমরা। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর থামল বাইক। এবার হেঁটে যেতে হবে। আশপাশে ধু ধু মাঠ। কেউ কোত্থাও নেই, সামনেই একটা বাঁশবন। একজন এসে আগাপাশতলা দেখে নিল পরীক্ষা করে। চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করল কেউ সাথে নেই তো? না বললাম বটে, কিন্তু একটা ঠান্ডা স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল যেন। ঠান্ডা গলায় বলল, সামনে বনের পথ ধরে এগিয়ে যান। এগোলাম, বাঁশ গাছের ফাঁক গলে খানিকটা যাওয়ার পর দেখা মিলল ওদের। প্রথম প্রথম দু পক্ষেরই একটু জড়তা, অস্বস্তি, বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলতা। সেটা কেটে যেতেই জমে উঠল কথাবার্তা। অনেক কথা হল, ওদের দুঃখ সুখ, চাওয়া পাওয়া, ব্যথা আনন্দ নানা বিষয়। খুব সুন্দর করে যত্ন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বোমা তৈরি শেখাল ওরা। শেখাল বন্দুক ধরা, তাতে গুলি ভরাও। প্রথম প্রথম একটু ভয় থাকলেও পরে আমিও অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছিলাম ওদের সঙ্গে। 

ওদের কথা শুনতে শুনতে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম সামান্য কটা টাকার জন্য কিভাবে নিজেদের জীবনকে বাজি রেখেছে ওরা। সব রাজনৈতিক দলের হয়েই ওদের কাজ। অথচ কাজ ফুরালে কেউই দেখে না ওদের। এ কাজের পরিণতি মৃত্যু জেনেও নির্বিকারে বোমায় সুতলি জড়ায় ওরা। মনটা ভার হয়ে গিয়েছিল। আমায় কিন্তু কোনও অসম্মান করেনি ওরা, দাদা দাদা করে বরং বেশিই সম্মান দেখিয়েছিল। ফেরার পথ নেই, তাই মুখ ঢেকেই ভালবাসা জানিয়েছে, ভোটের আগে ব্যস্ততা থাকা সত্বেও প্রায় সকলেই ঘন্টাখানেক ধরে আমার সঙ্গে কথা বলেছে, আমাদের চাহিদা মত ছবি তুলতে দিয়েছে। ফিরে আসার সময় যুদ্ধ জেতার আনন্দ থাকলেও একটা রক্তক্ষরণ ছিল ভিতরে। ভোটের সময় ক্ষমতা পাওয়ার লড়াই, ভোটের পরে ক্ষমতা রাখা বা ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই। তাই এই শিল্পের সাইড এফেক্ট হিসেবে ভোটের উপস্থিতি এবং বিস্তার উপেক্ষা করা যায় না।

এই খবরের একটা ভিডিও ছিল, যেটা খবরাকারে ইটিভিতে দেখানো হয়। যেহেতু আগে সেই খবরটি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল তাই অনেকেই দেখে থাকতে পারেন। প্রাসঙ্গিক বলে আমি এখানে আরও একবার দিয়ে দিচ্ছি। পরে এই ধরনের খবর অন্য চ্যানেলে আমিও বহুবার দেখেছি। কিন্তু ২০০৪ সালের আগে এধরনের খবর এত বিশদে বাংলা সংবাদ মাধ্যমে সেভাবে প্রকাশিত বা প্রচারিত হয়নি। তাই বীরভূম জেলা তথা রাজ্য রাজনীতিতে এই খবরটি বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। আমার কাছে ফোন এসেছিল ভবানী ভবন থেকেও। কোথায় এই খবর শ্যুট করেছি তা বলতে হবে। সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা এবং সৌজন্য মেনে সেটা পুলিশ কর্তাদের বলতে পারিনি। তবে বললেও কিছুই হত বলে মনে হয় না, প্রথমত পুলিশের জায়গা অজানা হলেও বিষয়টা মোটেই অজানা নয়। দ্বিতীয়ত, ওরা এক জায়গাতে দিনের পর দিন থাকে না। পুলিশও বুঝেছিল, তাই পরে আর জোর করেনি। ভোটের সন্ত্রাসে এখনও বীরভূমের নাম দেখলেই মনে পড়ে যায় সেই মুখবাঁধা মুখগুলির কথা। মনে পড়ে সেই হাহাকার, “নিশ্চিৎ মৃত্যু জেনেও এ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছি দাদা। ফেরার পথ নেই।” (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Nanur bomb)

(www.theoffnews.com Japan prime minister Yoshihide Suga American president Joe Biden White House)
 

ইরানী বিশ্বাস, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও পরিচালক, বাংলাদেশ:

মানুষ নিজেকে আধুনিক জীবনে অভ্যস্থ করতে ব্যস্ত। ফ্রিজ, এসি ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারছে না। এছাড়াও আছে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও আবিস্কার। আধুনিক জীবন গড়তে গিয়ে মানুষ নিজেদের জীবনকে সংকটময় করে তুলছে। পৃথিবী তার স্বাভাবিক নিয়ম হারাচ্ছে। প্রকৃতি নিজস্ব রূপ হারাচ্ছে। উন্নত অনেক দেশের কথা বাদ দিলাম। বাংলাদেশ ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ। অথচ কয়েক বছর ধরে ঋতু পালাবদল হচ্ছে না। শীতের দিনে শীত নেই, ‍বৃষ্টির সময় নেই বৃষ্টি। বসন্তে এখন আর শীতল পরশ নেই। এই সবকিছুই আমাদের বার বার সতর্ক করেছিল। আমরা বুঝতে পারিনি। আমরা মানুষ প্রকৃতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছি বারবার।

অপরাজেয় হিসেবে প্রমান করতে চেষ্টা করেছি সবসময়। কিন্তু প্রকৃতি শ্বাশ্বত। সে কাউকে ক্ষমা করে না। আজকে বিশ্বজুড়ে মহামারি তান্ডব চলছে। কিসে তার বিনাশ এখনো ঠিক করতে পারেনি সভ্য মানুষ। করোনার একমাত্র ওষুধ অক্সিজেন। একটি নিঃশ্বাস টেনে নিতে অক্সিজেনের জন্য হাহাকার ঘরে ঘরে। অথচ প্রকৃতির দান অক্সিজেন আমরা প্রতিনিয়ত নষ্ট করছি। আমরা নিজেদের নিঃশ্বাসে নিজেরাই কার্বন দিচ্ছি প্রতিনিয়ত। চারপাশে এত মানুষের মরণ যন্ত্রণা আমাকে কেবলই বিবেক যন্ত্রনা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে আমরা সভ্যতার নামে প্রকৃতির সাথে রূঢ় আচরণ করেছি। প্রকৃতি তারই প্রতিশোধ নিচ্ছে। আসুন প্রিয়জনের নিঃশ্বাসের প্রতিদানে প্রকৃতিকে সবুজে ভরিয়ে দিই।

(www.theoffnews.com - Bangladesh breath)

দীপ্তি জামান, লেখিকা, বাংলাদেশ:

কোথাও কোনো পাপ নেই পঙ্খিলতা নেই৷ পাপ-পুণ্য মাপার নিদির্ষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই। নিয়তি নীরব রহস্যময় দেবতার মতো যার কোনো সম্ভাবনা যাচাই করা যায় না৷ তাই ন্যায় ও ন্যায্যতা, যুক্তি ও তর্ক দিয়ে যতদূর যাওয়া যায়৷ পৃথিবীর অস্তিত্ব একটি মুদ্রার ন্যায় যার একপিঠে পাপ অন্যপিঠে পুণ্য৷ জীবন নামের মানবিক অধ্যায়টি পাপ ও পুণ্যের মুখোমুখি হয়ে নিরন্তর বয়ে চলে এবং ঈশ্বর আশির্বাদ ও দূর্ভাগ্যের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে না পেয়ে জড়িয়ে পড়ে বিভ্রান্তিতে৷ কখনো কখনো জীবনের প্রতি খেই হারিয়ে জীবন পড়ে সংশয় ঝুঁকিতে৷ মানুষ খোঁজে নিরর্থক জীবনের তাৎপর্য। মেনে নিতে হয় নিরার্থকতার পর নিরার্থকতাকে৷ তাৎপর্য থেকে যায় তাৎপর্যহীনতার মধ্যে৷ পথের শেষ মৃত্যুতে৷ সব কামনা-বাসনাতর অবসান ঘটে নির্বিকার ক্ষুধার্ত মাটি আর আগুনের মধ্যে৷ মৃত্যুর মধ্যে চূড়ান্ত বিনাশ৷ তাই জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে জ্ঞানের চেয়ে উত্তম কোনো অর্জন নেই৷

ঈশ্বরের পুত্রগণ --

ঈশ্বরের প্রথম সারির পুত্রগণ ঈশ্বরের প্রতি পূর্ণ বিশ্বস্ত। যেমনটি ধারণা করা হয়, ঈশ্বরের এই বিশ্বস্ত পুত্রগণ পুনরুত্থান পর্বে ঈশ্বরের সাথে অনন্তকাল স্বর্গীয় জীবন-যাপন করবেন৷ স্বর্গীয় জীবন-যে জনম অবিনশ্বর ধারণার ওপর নির্ভরশীল ৷ যার ভীত তৈরি হবে বিশ্বস্ত পুত্রগণের দেহ দিয়ে আর দেয়াল তৈরি হবে তাদের উৎসর্গকৃত অশ্রু আর স্বেদ দিয়ে৷ কারা ঈশ্বরের একান্ত পুত্রগণ? এরা হলেন নশ্বর জগতের দুর্ভাগ্যকবলিত ঈশ্বর আশীর্বাদপুষ্ট অনাথ বালকগণ৷ যারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় নিবিড় প্রাচীরের মধ্যে বেড়ে ওঠে৷ যেখানে পৌঁছায় না আলোকিত পৃথিবীর আলো৷ লাগে না পরিবর্তন-বিবর্তনের ছোঁয়া৷ পৌরাণিক কাহিনী রপ্ত করে বিশ্বস্ত থাকে ঈশ্বরের বিমূর্তলোকে৷ ঈশ্বরের পুত্রগণ জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইহলৌকিক সময় পার করে মধ্যযুগীয় অন্ধকার গহ্বরে৷ বিশ্বাসের সাথে বাস্তবতার সমন্বয় ও বিশ্লেষণের সকল পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়৷ তাই তাদের জীবদ্দশায় থাকে না মানসিক মধ্যস্থতা, থাকে না নিজস্ব মতামত৷ জীবনের উপসংহার টানতে হয় যুক্তি-তর্কহীন বাস্তবতার সাথে সম্পর্কশূন্য এক কল্পরাজ্যে৷ স্বর্গ আর মর্তের মধ্যে তৈরি করে চলে রহস্যকরণ, জন্ম দিতে থাকে  রূপকথার মিথ৷ রূপকথার তালিম নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দোলাচলে বিশ্বাসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় ঈশ্বরের দ্বিতীয় সারির পুত্রগণ৷ যারা ঈশ্বরের একান্ত পুত্রদের পৃষ্ঠপোষকতা বা করুণা করে স্বর্গের সিঁড়ি হিসেবে৷ তারা তাদের উপার্জনের উচ্ছিষ্টাংশ ব্যয় করেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এতিমখানা মসজিদ মাদ্রাসায় অবস্থানরত ঈশ্বরের অনুগত পুত্রগণের ভরণপোষণে একই সাথে জপেরমালা, ধর্মীয় আচার -অনুষ্ঠানিকতা পালন করে থাকেন জাগতিক আরাম- আয়েস, সুখ-সমৃদ্ধি মৃত্যু পরবর্তী জীবনে ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখার নিমিত্তে৷

(www.theoffnews.com - Bangladesh)

মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও লেকচারার, আহমেদাবাদ:

গুজরাটের চারণ সম্প্রদায়ের মানুষদের আরাধ্য দেবতা এই খোদিয়ার মাতা। কর্তার অফিসের একটি ছেলে একবার আনন্দ থেকে এসেছিল আমাদের বাড়ীতে, তারই হোয়াটসঅ্যাপে প্রথম দেখি এই কুমির বাহিনী মাতৃমুর্তি। এরপর ওর মুখেই জানতে পারি গুজরাট রাজস্থান বর্ডারে থাকা চারণ সম্প্রদায়ের সব মনষ্কামনা পূরণ করেন এই খোদিয়ার মাতা। নিজেও হাঁটতে গিয়ে সবসময়  খোঁড়াই তাই খোঁড়া দেবীকে দেখে তাঁর ইতিহাস নিয়েও একটু খোঁড়াখুঁড়ি করতে সাধ হল---উঠে এল সপ্তম শতাব্দীর এক উপকথা। তবে আমি উপকথা বা রূপকথা যাই বলি না কেন ভাবনগর, জামনগর, মটেল সব জায়গায় এনার বিশাল মন্দির, গোটা সৌরাষ্ট্র আর কাথিয়াবাড়ে ওনার ভক্তরা ছড়িয়ে আছেন। তাদের মনের বড় কাছের এই মা, ডাকলেই যে তিনি সাড়া দেন। ভক্তদের বিশ্বাস তাড়াতাড়ি আসতে গিয়ে চোট পেয়েই তো মা খুঁড়িয়ে চলেন, তাই ভক্তের ডাক উপেক্ষা করেন না। আর কুমিরের যেহেতু জলে স্থলে দুটোতেই অবাধ বিচরণ তাই মা নিজের বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছেন কুমিরকে।এবার আসি খোদিয়ার মাতার জন্ম গাথায়। সপ্তম শতাব্দীতে ভাবনগরের ভল্লবীপুর প্রদেশের মহারাজা ছিলেন রাজা শীলভদ্র। সেই রাজ্যের রোহিশালা গ্রামে থাকতেন মামানিয়া গাধবী নামে এক ভারী সৎ, বুদ্ধিমান, শিবভক্ত চারণ সম্প্রদায়ের  মানুষ। মহারাজের সাথে তার ছিল ভারি সুসম্পর্ক, প্রায় সমবয়সী হওয়ায় সে মহারাজের বড় কাছের মানুষ হয়ে যায়। মহারাজ শীলভদ্র অনেক  সময়ই রাজ্যের বড়সড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মামানিয়াকে ডেকে পাঠাতেন। বুঝতেই পারছেন বাকি মন্ত্রীরা হিংসের চোটে জ্বলে পুড়ে মড়ছিল----তাই তারা দল বেঁধে মহারানীর কান ভাঙ্গাতে শুরু করলেন। মামানিয়ার মত ভাল মানুষের বিরুদ্ধে বলার মত আর কিছু না পেয়ে মন্ত্রীরা মিলে রানীকে বোঝালেন মামানিয়া নিঃসন্তান, তার স্ত্রী বাঁজা ---তাই তাদের অশুভ ছায়া পড়ে মহারাজ শীলভদ্রও আজও সন্তান সুখ পাননি। অতএব বিনাদোষে মামানিয়ার রাজপ্রাসাদে প্রবেশ নিষিদ্ধ হল। 

সৎ নিঃস্বার্থ ভাল মানুষ মামানিয়া বড় মনঃকষ্ট পেলেন, ভারি অপমানিত বোধ করলেন এভাবে বন্ধু বিচ্ছেদ হওয়ায়। শুকনো মুখে বাড়ী ফিরতেই স্ত্রী মিনাল্ডির জেরার মুখে সব কথা খুলে বলতে বাধ্য হলেন----এরপর স্ত্রীর পরামর্শে শুরু করলেন কঠোর তপস্যা। আত্মবলি দিতে উদ্যত মামানিয়াকে আটকালেন মহাদেব। তুষ্ট হয়ে শিব ঠাকুর বর দিতে চাইলে সন্তান কামনাই করেন এই চারণ দম্পতি।কিন্তু দেবাদিদেব জানান মামানিয়ার ভাগ্যে সন্তান যোগ নেই, তবে পারলে নাগলোকে গিয়ে একবার প্রার্থণা করা যেতে পারে। এরপর নাগরাজের কন্যা নাগ পুত্রী দয়াপরবশ হয়ে বর দিলেন মামানিয়াকে--- সাতটি কন্যা আর এক পুত্রের জনক হবেন তিনি। বাড়ী ফিরে ছোট ছোট আটটি দোলনা বানিয়ে রাখলেন মামানিয়া আর তাঁর স্ত্রী মিনাল্ডি। 

ওমা! কোথা থেকে আটটা সাপের বাচ্ছা এসে গুটিশুটি মেরে দোলনায় শুয়ে পড়ল আর খানিক পরে তারা শিশুতে রূপান্তরিত হল। গাঁয়ের লোক দেখেছে মিনাল্ডি গর্ভবতী হয়নি, তাই রটে গেল কালা যাদু করেছে মামানিয়ারা। কোথায় যেন হালকা মিল আমাদের চাঁদ সদাগরের সাথে---দুজনেই শৈব আর মনসা বা নাগকন্যার আশীর্বাদে পুত্রলাভ।

এদিকে খবর পৌঁছল রাজা শীলভদ্রের কানে, আর তো তাঁর বন্ধু নিঃসন্তান নয়---আকুল হয়ে ছুটলেন বন্ধুকে দেখতে। এদিকে এতদিন পরে বাবা হয়ে মামানিয়া সারা গাঁয়ে মিষ্টি বিতরণ করছেন। মন্ত্রীরা ভাবল এই সুযোগ। লোক লাগিয়ে বিষাক্ত মিষ্টি খাইয়ে রাজাকেই মেরে ফেলার প্ল্যান করল। লোকে জানবে মামানিয়া কালা জাদু করেই রাজাকে মেরেছে---এক ঢিলে দুই পাখী মারা যাবে। কিন্তু ততক্ষণে জানবাই জন্ম নিয়ে নিয়েছেন (ইনিই পরে খোদিয়ার মাতা), তাকে মহারাজ কোলে নিতেই হাতের এক ঝটকায় ফেলে দিলেন রাজার জন্য আনা সেই বিষাক্ত মিষ্টান্নের থালা টি,আর যেন গায়েব হয়ে গেল মিষ্টান্ন গুলি। এবার মহারাজের সন্দেহ হয় নিশ্চয় কোনো কালা যাদু আছে! সঙ্গে সঙ্গে রাজার আদেশে আটটা বাচ্ছাকে আটটা লোহার বাক্সে, শিকল ঝুলিয়ে জলে ছুঁড়ে ফেলা হল। অবাক হয়ে সবাই দেখল লোহার বাক্স ভাসছে, আর বাচ্ছাদের কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।এরপর সকলে বুঝে নেয় দৈবশক্তির অধিকারী মামানিয়ার সন্তানরা। 

সাত ভাই চম্পা আর পারুল বোনের ঠিক উল্টো এখানে—মামানিয়ার সাত কন্যা হলেন আভাল, জোগাল, টোগাল, জানবাই, হোলবাই, সোসাই আর এক পুত্র মেহেরক। বড় আদরের ভাই মেহেরকিয়াকে খেলার মাঠে একবার বিষাক্ত সাপে কাটল।  সবাই জানে নাগলোকে আছে “আমি” (গুজরাটি শব্দ মানে অমৃত)। সবার আগে ছুটল জানবাই, জলের তলা থেকে অমৃত নিয়ে আসার পথে পাথরে ঠোক্কর খেল জানবাই, তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাল একটি কুমির। সেই কুমিরের পিঠে চেপেই জলের ওপর অমৃত হাতে ভেসে উঠলেন জানবাই একটু খুড়িয়ে হাটছিলেন পায়ে চোট পেয়ে তাই দেখে কে যেন বলে ওঠে- “খোদাতি  আবেচে” মানে খুঁড়ী আসছে। সেই থেকে জানবাই এর অপর নাম খোদিয়ার মাতা আর বাহন হল কুমির। এরপর রাজা শীলভদ্রও সন্তান সুখ পান।ভাবনগর থেকে সিন্ধ অবধি ছড়িয়ে পরে খোদিয়ার মাতার কাহিনী।

দশম শতাব্দীতে জুনাগরের নিঃসন্তান মহারানীকে তার পারিষদরা নানান  কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করেন, তাদের কথায় কিছু অশুভ কালা জাদুর সাহায্যে তিনি গর্ভবতী তো হন কিন্তু নমাস পরেও বাচ্ছা হয় না। দেখতে দেখতে আরও ন মাস কেটে যায়, শুরু হয় অসহ্য প্রসববেদনা কিন্তু বাচ্ছা বের হয় না।বুঝতে পারেন অশুভ শক্তির সাহায্য নেওয়ার ফলভোগ করছেন। উপায়ান্তর না পেয়ে খোদিয়ার মাতাকে মন থেকে ডাকলে তবেই মুক্তি পান সেই মর্মান্তিক যন্ত্রণা থেকে। জন্ম দেন এক সুন্দর পুত্রসন্তানের—নাম নবগাহন। এই শক্তিশালী অপরাজেয় রাজা নবগাহনের রথের ওপর নাকি ছোট্ট চড়ুইপাখি রূপে দেবী সদাসর্বদা যুদ্ধের সময় উপস্থিত থাকতেন। গিরের কাছে এক জলাশয়ের কাছে ঘোড়াকে চান করানোর সময় খোদিয়ার মাতার দর্শন পান মহারাজ নবগাহন। প্রতিষ্ঠা হয় সবচেয়ে প্রাচীন খোদিয়ার মাতার মন্দির—গালধারাতে। সিন্ধের শক্তিশালী রাজা সুমরাকে মাতাজীর কৃপাতেই হারান নবগাহন আর তারপর সুদূর সিন্ধ থেকে ইঁট এনে পালিতানার কাছে মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই ইঁট আনতে নিমরাজি হওয়ায় সেনাপতির মুন্ডু কেটে মন্দিরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন রাজা নবগাহন।

এমন অনেক উপকথা ছড়িয়ে আছে খোদিয়ার মাতাকে নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন শতাব্দীতে, মায়ের মন্দিরও ছড়িয়েছে গুজরাটের নানান জায়গায়। কোথাও মিল পাই সাক্ষী গোপালের মত পথ চলতে চলতে পিছু ফিরে তাকাতেই মা সেখানে দাঁড়িয়ে গেছেন।কোথাও দেখছি গরু চরাতে গিয়ে জলের নীচে স্বর্ণ মন্দির দেখেছে রাখাল বালক। ছুটে গিয়ে সে রাজাকে জানিয়েছে মন্দিরের সন্ধান--- ওদিকে মায়ের দেওয়া আশীর্বাদী পাতা ফেলে দিয়েছে সেই  অবোধ বালক, মাথায় লাগা দু একটা পাতা বাড়ী এসে দেখেছে সোনার পাতা হয়ে গেছে। মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের কৃপণ কবিতার সেই লাইনটি— “তোমায় কেন দিইনি আমার সকল শূণ্য করে।“  হয়ত গরিব যাযাবর এই চারণ সম্প্রদায় নিজেদের উজার করেই ভালবাসে তাদের এই খোদিয়ার মাতাকে---অসীম বিশ্বাস তাদের যে সব ধরণের  বিপদে পাশে তাদের খোদিয়ার মা আছেন।

(www.theoffnews.com - Khodiyar Mata)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

দুপুরে খাওয়ার পাতে শাক সুক্তোর পরে আমডাল বা টক ডালটা পড়তেই মনে পড়ে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। কি, চোখ কপালে উঠল তো? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আবার আম ডালের কি সম্পর্ক! আছে, আমার ক্ষেত্রে একটা সম্পর্ক আছে বৈকি। সেই গল্পই করব এবারের ভোট কথায়।

২০০১ সাল। আমি তখন দুর্গাপুরে। লাল সমুদ্রের মাঝে কোথাও যেন একটা সবুজ চোরা স্রোত বইছে। আসলে অবিভক্ত বর্ধমান জেলা জুড়ে সেই সময় বামেদের একছত্র আধিপত্য। সেই সঙ্গে বাম নেতাদের অহংকার এবং ঔদ্ধত্যের চরম সময়। বিরুদ্ধে সামান্য টু শব্দটি করবার উপায় নেই, নেতা ক্যাডারদের শাসানি, সামান্য ব্যাপারেই দলের ক্ষমতা দেখানোর স্পৃহা, মানুষকে কিছুটা বিরক্ত তো করেছেই। যেটা এখন তৃণমূলের আমলেও দেখা যাচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে সেই সময়েই পরিবর্তনের আভাষ পাচ্ছি আমরা। তৃণমূল দল তখন শিশু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী নেত্রী হিসেবে অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন রক্তিম আবহে থেকে ঘুণাক্ষরেও কেউ কল্পনা করতে পারছেন না যে আর দশ বছরের মধ্যে বাংলা থেকে বামেদের অস্তিত্বই মুছে যেতে পারে। যাই হোক বিধানসভা ভোটে তৃণমূল প্রার্থীদের হয়ে প্রচারে এলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুর্গাপুর এবং আসানসোলে সভা করবেন তিনি। তখন কিন্তু মমতা বাদ দিয়ে তৃণমূলের অন্যতম প্রধান মুখ পঙ্কজদা, পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়। আমি ঠিক করলাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলাদা করে একটা সাক্ষাৎকার নেব। কথা হল স্থানীয় প্রার্থী অপূর্ব মুখোপাধ্যায় ওরফে অপুদার সঙ্গে। অপুদা বললেন আমি বলে রাখব।

মমতা সেই সময় দেরি করে ঘুম থেকে উঠতেন। অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে ঘুমোতে যেতেন, তাই তার উঠতে উঠতে বেলা হয়ে যেত। সেই অভ্যাস অবশ্য পরে বদলে যায়। যাই হোক দুর্গাপুর হাউজে মমতা উঠেছেন রাতে। আমি এবং আমার চিত্রগ্রাহক সহকর্মী দুজনে সকাল দশটা নাগাদ গিয়ে অপেক্ষা করছি। প্রায় পৌনে বারোটা বাজে, কিন্তু মমতার দেখা নেই। জিজ্ঞাসা করলেই বলছে ঘুমোচ্ছে। স্থানীয় তৃণমূল নেতারাও দেখলাম উসখুস করছেন। গল্প করছি দুর্গাপুর এবং হিরাপুর কেন্দ্রের প্রার্থী অপূর্ব মুখোপাধ্যায় এবং মলয় ঘটকের সঙ্গে। এমন সময় হাজির আসানসোল কেন্দ্রের প্রার্থী কল্যান বন্দ্যোপাধ্যায়। পেশায় আইনজীবী হলেও কল্যানদার কথাবার্তা কোনওদিনই সুবিধার না। ঢুকেই আমাকে দেখে তার কথা – “কি ব্যাপার?” বললাম দিদির সঙ্গে কথা বলব। হঠাৎ কল্যানদা বলে বসল “এখন হবে না, তাছাড়া মমতাকে ইটিভি অনেক পেয়েছে। আর কি হবে?” বোঝো কথা, সিপিএমের ওই আমলে ভোটের আগে এক প্রার্থী সেই সময়ের সব চেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় টিভি মিডিয়াকে বলছে বিরোধী নেত্রীকে নাকি প্রচুর পেয়েছি আমরা তাই আর দরকার নেই! শুনেই তো মেজাজ চড়ে গেল, আমার থমথমে মুখ দেখেই অপুদা এবং মলয়দা বুঝল কল্যান সব্বোনাশ করে দিয়েছে। ক্যামেরাম্যানকে বললাম চল, বাড়ি যাই। অফিসে বলে দেব মমতাকে অনেক পেয়েছি আমরা আর দরকার নেই এটা তৃণমূল বলে দিয়েছে।

কিন্তু অপুদা এবং মলয়দা দুজনেই আমাকে প্রায় জড়িয়ে ধরে বললেন “আমাদের কথা ভেবে যেও না। দিদি এখুনি আসবে আমরা কথা বলাবই তোমার সঙ্গে।” আমার সঙ্গে দুজনের সম্পর্কই খুব ভাল ছিল, দুজনের অনুরোধ তাই ফেলতে পারলাম না। এর মধ্যেই দিদি তৈরি হয়ে বেরিয়ে এসেছেন। কেউ বোধ হয় দিদিকে আগেই কল্যান কীর্তির কথা লাগিয়ে দিয়েছে। দেখলাম খুব প্রসন্ন মুখ, ডেকে আগে জলখাবার খাওয়ার জন্য জোরাজুরি করলেন। বললাম খেয়ে এসেছি দশ মিনিট কথা বলব দিদি। তা বললে হয় একটু কিছু খাও। খেতে খেতেই প্রায় এক ঘন্টা কথা হল। মমতা সরাসরি জানালেন আমাদের নতুন দল, দারুণ কিছু হবে এ কথা বলছি না, কিন্তু একটা লড়াই আমরা দেব। আমার কাছ থেকে শুনলেন শিল্পাঞ্চলের কি অবস্থা? বললাম বিরোধীতার চোরা স্রোত আছে, সুযোগ নিতে পারলে হয়ে যেতেও পারে। বেশ উৎসাহ পেলেন মনে হল। আরও অনেক গল্প করলেন, কেন রাতে দেরী হয়েছিল, তার গাড়িকে কোথায় আটকে দেওয়া হয়েছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনকি বসিয়ে রাখার জন্য দুঃখ প্রকাশও করলেন। অপুদা পাশ থেকে বলল দিদি পলাশ কিন্তু কলকাতার ছেলে, তবে আমাদের সঙ্গে খুব ভাল সম্পর্ক। বললাম কলকাতা নয় আমার বাড়ি গোবরডাঙ্গায়। শুনে আবার দিদির মত জিজ্ঞাসাও করলেন বাড়িতে কে কে আছে? এখানে আমার সঙ্গে কে থাকে? একা থাকি রান্না করি শুনে জিজ্ঞাসা করলেন কি খাওয়া দাওয়া করি। ডাল আলুভাতে আর ডিমের ঝোল দিয়ে চলে যায় শুনে মমতা সুলভ ভঙ্গীতে মমতা আমায় আম ডাল রান্নার রেসিপি বলে দিলেন। গরমে নাকি আমডাল খাওয়া খুব ভাল। পান্তার নাম শুনলেও জল ঢালা ভাতের কথা মমতার কাছ থেকেই প্রথম শুনি। তখনই জানলাম ওনার মামাবাড়ি বীরভূমে। নিজের ফোন নম্বরও দিয়ে বলে দিলেন প্রয়োজনে যেন ফোন করি। সেই নম্বরটি আজও আমার কাছে আছে। বিকেলে প্রচার সভাতেও যেন থাকি অনুরোধ করলেন। বললাম সে তো থাকবই। আসার আগে আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন আম ডালে একটু মিষ্টি দিতে ভুলো না কিন্তু। 

পরেও অনেক বার দেখা হয়েছে, জনসভায় দেখা হলে দূর থেকেই হাত নেড়ে ইশারা করতেন। বীরভূমে নানুরে শহিদ দিবসে এসেছিলেন, আমায় দেখতে পেয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বদলি হয়ে বীরভূমে আছি শুনে আশিসদা মানে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের (তখনও কেষ্টা অনুব্রত মণ্ডল হয়ে ওঠেননি) সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। উনি যখন মুখ্যমন্ত্রী হন তখন আমি অবশ্য কলকাতায় চলে এসেছি। কিন্তু অফিসেই বিভিন্ন দায়িত্ব নিয়ে থাকতে হত বলে আর মাঠে ময়দানে দেখা হত না। তবে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হলে তার স্বাভাবিক স্বভাব, অভ্যাস এবং পরিচিতির পরিমণ্ডল তো বদলে যায়ই। প্রবল চাপে বদলে যায় আরও অনেক কিছুই।

ও হ্যা একটা কথা তো বলাই হয়নি। দুর্গাপুর হাউজে আমাকে ওই কথা বলবার পর কিন্তু আমি আর কল্যান বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখতেই পাইনি। কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন কে জানে? পরে নির্বাচনী ফলাফলে অবশ্য ২০০১-এ বর্ধমান শিল্পাঞ্চলে তৃণমূল চারটি আসন পেয়েছিল। তার মধ্যে আসানসোল থেকে কল্যান বন্দ্যোপাধ্যায়ও জিতেছিলেন। জিতেছিলেন অপুদা এবং মলয়দাও। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - West Bengal politics Mamata Banerjee)

সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ:

সেই সকাল থেকেই ভাবছি নববর্ষ নিয়ে কিইবা লিখি। কিন্তু থিম কি বাছবো সেটাই তো ঠিক মনে ধরছে না। অথচ মন তখন থেকেই একটু লিখি লিখি উষ্কানি দিচ্ছে। ওই এসো হে বৈশাখ মার্কা বহুল চর্চিত অআকখ চর্চা আর ভালো লাগছে না। চিন্তার জট আর কলমের অতি উৎসাহের দ্বন্দ্বে আমি যেন ক্রমেই স্যান্ডউইচ বনে গেছি। এমনই সময় ইউরেকা বলে মনমন্থনে যেন আচমকা সুনামি বয়ে গেল। পেয়েছি পেয়েছি নববর্ষের মিল গ্যায়া থিম। 

গত সপ্তাহে আমার এক বাংলাদেশের বন্ধু তার ফেসবুক ওয়ালে একটা পোস্ট দিয়েছিল। আমিও তাতে যথারীতি কমেন্ট করি। আসলে তার পোস্ট আর আমার কমেন্ট--দুটি ক্ষেত্রেই ছুঁয়ে গেছে নববর্ষের প্রসঙ্গ। তাই মনে হল আচ্ছা তার পোস্ট আর আমার কমেন্টটাই তো আমার আজকের লেখার উপপাদ্য যদি হয় তবে আপত্তি কোথায়?

যেই ভাবা সেই কাজ। নীতিগত প্রশ্নে সকালেই তার পোস্ট আমার লেখার জন্য ব্যবহার করবো কিনা বন্ধুর কাছে অনুমতি চাইলাম। উদারচেতা বন্ধুটি আমার, শত ব্যস্ততার মধ্যেই আমাকে সদর্থক উৎসাহ দিলেন ক্ষাণিক পরেই। একইসঙ্গে উনি বললেন, পোস্টটা আসলে হুমায়ূন আজাদ স্যারের একটা উক্তি। আমি বললাম নো প্রবলেম।

আমার প্রিয় বন্ধুটির পোস্টটা ছিল এরকম, 

"একজন বাঙালি একই সাথে ধর্ম চায়, মদ চায়, নারী চায়, জুয়া খেলতে চায়, শিক্ষা চায়, আধুনিকতা চায়, যৌতুক চায়, পয়লা বৈশাখ চায়, ইসলামি রাষ্ট্র চায়, এরকম ভন্ডামি আর কোথাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।"

এই পোস্ট পড়ে আমিও কমেন্টটি দিই তাকে গভীর রাতে। পোস্টের প্রতিটি পয়েন্ট ধরে ধরে। আমার মতো করে।

"আমি কিন্তু মনে প্রাণে একেবারে খাঁটি বাঙালি। এক্কেবারে হোক কথা কইলাম। বাঙালি আমার পরিচয়। আমার এটা দাম্ভিকতাও। 

ধর্মভীরু আমি মোটেও না। তবে সকল ধর্মের মূল মানবিক ভিত্তিগুলি আমি বিশ্বাস করি। ধর্মীয় গোঁড়ামি দুচোখের বিষ। আবার সব ধর্মের আধ্যাত্মিক আচারে আমার উপস্থিতি বেশ উৎসাহের। 

মদ বা কোনও নেশা নৈব নৈব চঃ। এই বিষয়ে আমার ব্যর্থতা চিরদিনের। এইসব আসক্তি আমাকে কোনও কালেই একবারের জন্যও প্রভাবিত করতে পারেনি আর পারবেও না। সেই মানসিক জোড় আমার আছে। 

নারী? হ্যাঁ, একটু তো আকর্ষণ বোধ করি মনে মনে। মিথ্যে বলে ভন্ড হতে নারাজ। তবে বহুগামিতার রাস্তায় হেঁটে নয়। মর্যাদা ভরসা ভালোবাসা বিশ্বাসের সুষমায় একটিমাত্র নারীসঙ্গ কে না চায়? আমিও যে প্রকৃতির সন্তান। কপালে না জুটলেও আকাঙ্খার সহজাত প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত হতে পারলাম না আজও।

জুয়ার ঠেকে সাংবাদিক হয়ে নিশ্চয়ই গিয়েছি। কিন্তু খেলতে নয়। খবর সংগ্রহের তাগিদে। প্রাণ হাতে নিয়ে ফিরেছিলাম এটাই অনেক। অবশ্য ক্যাসিনো ও ঘোড়দৌড়ের জুয়ায় একবার করে দুটি ক্ষেত্রেই মিনিমাম টাকা লাগানোর ইচ্ছা বহুদিনের। হারি বা জিতি ওই একবারের জন্য। কিন্তু সমায়াভাবে এই শখ আর পূর্ণ হল না এখনও।

শিক্ষা? শিক্ষিত আমি মোটেও না। প্রত্যেক সময় নিজেকে মনে হয় আমি অশিক্ষিত। কত কি জানার আছে। সবাই কত কি জানে। আর আমি কিছুই তো রপ্ত করতে পারলাম না। তাই খাই না খাই, কিছু করি বা না করি, কিছু না কিছু বিষয়ে পড়ার চেষ্টটা রোজ নিয়মিত করি। সেই ছাত্রাবস্থা থেকে এখনও। একটি দিনও বাদ দিই না। তবু জানাটা আর সেরকম হল না। জানি না এজন্মে শিক্ষিত আর কবে হবো। এই আফসোসটা রয়েই গেল।

আধুনিকতার আমি আবার দারুণ ফ্যান। যদিও আমি অত আধুনিক পোষাক পরি না। সাধ থাকলেও সেই যোগ্যতার সামর্থ্য আমার নেই। তবুও যে কোনও আধুনিকতার সুন্দর নির্যাসের আমি চরম সমর্থক। সময় পাল্টে যাচ্ছে। প্রজন্ম পরিবর্তন হচ্ছে। জীবনধারা পরিবর্তনশীল। রুচি পাল্টে যাচ্ছে। এই সরল সত্যকে আমি নিজের মতো করে মেনে নিতে ও মানিয়ে নিতে চেষ্টা করি। আসলে যুগের সঙ্গে চলতেই হবে। আমি তাই বরাবরই আধুনিকতার পক্ষে। যদিও আধুনিকতার নামে অমনুষ্যত্ব আমার ধাতে সয় না।

যৌতুক আমি চাই না। নিজের জীবনে ঐশ্বর্য কম দেখিনি। ক্ষমতার ভড় কাকে বলে তাও জীবন দিয়ে দেখেছি। আবার আর্থিক কষ্টটাও খুব কাছের থেকে দেখে চলেছি। তথাপি আমি মানসিক ভাবে ভিখারী নয়। আমি খিদে সহ্য করে থাকতে শিখে গেছি। কিন্তু যৌতুক নেওয়া বা ঠকিয়ে অর্থ উপার্জনে আমি বিশ্বাসী নয়। এই জীবনপাঠ্যটা আমাকে বাবা মা অল্প বয়স থেকেই শিখিয়ে ছিল। যা আজও আমি পালন করে চলেছি অক্ষরে অক্ষরে।

পাগল নাকি? ইসলামিক রাষ্ট্র, হিন্দু রাষ্ট্র এসব কুক্ষণে শব্দের মুখে সপাটে থাপ্পর মারি। অসভ্য পশু সমর্থকদের সঙ্গে আমি পা মেলাতে রাজি নই। রাষ্ট্র হোক মানুষের। সমস্ত ধর্মের সম্মানজনক সহবস্থানের ভূমি হোক পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্র।

এটা কিন্তু ঠিক। পয়লা বৈশাখ মানে এসো হে বৈশাখ এসো এসো। আমার প্রাণের সুরের বাঙালিয়ানার এই বঙ্গ বর্ষপূরণ হোক শান্তির আনন্দের। বাঁচার পূন্য সহবস্থানের। এমন সার্থক পয়লা বৈশাখ যে আমার স্বপ্ন আমার নিশ্বাস।"

আসলে পোস্টে ও কমেন্টে অনিবার্য ভাবেই চলে এসেছে নববর্ষের প্রসঙ্গ। এই শুভ নববর্ষের সন্ধিক্ষণে আমি এটুকুই শুধু ভাবি আমার এই বন্ধুটি কত উদার, কত নম্র, কত নমনীয় অথচ উগ্রপন্থা বিরোধী, অনৈতিকতা বিরোধী, অমনুষ্যত্বের বিরোধী। আচ্ছা আমরা যদি আমার এই বন্ধুটির মতো সবাই এমন মানবিক হতে পারতাম, তবে? তাহলে নিশ্চিত দুই বাংলার আমরা এক বাঙালি জাতি আবশ্যই হতে পারতাম। জানি না এই স্বপ্নপূরণের জন্য আমাদের আর কটা নববর্ষ অপেক্ষা করতে হবে।

(www.theoffnews.com - Bengali nababarsha)

সুস্মিতা পাল, লেখিকা ও শিক্ষিকা, কলকাতা:

জীর্ণ পাতা ঝরার দিনশেষে নিঃশব্দে বিদায় নিল ১৪২৭ সাল। বছরে বছরে এ যেন -'মিলি মিলি যাওব সাগরলহরী -সমানা।' গত একটা বছর আক্ষরিক অর্থেই  দিনযাপনের আর প্রাণধারণের গ্লানি বয়ে কাটিয়েছি। সময়ের স্রোত বয়ে গেছে একঘেয়েমিতে, মাঝে মাঝে ক্ষণিকের অঞ্জলি ভরে নিয়েছি দুমুঠোতে। 

কিন্তু এ তো চিরন্তনী সত্য-শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা। গত বছরেও কি শুধু সবই এসেছে ও গিয়েছে? ধ্রুব কিছুই কি নেই? যাকে অন্তরে অনুভব করতে পারি? জীবন যদি সত্যি নাও হয়, তবে ব্যর্থ জীবনের বেদনা সত্যি হোক। জীবনের পথ তো সবসময়ই বিঘ্নশোকে আকীর্ণ। নতুন বছরের প্রথম দিনটি থেকে আবার সেই তেতেপুড়ে থাকা পথেই চলবো। সময় ফুরোলে কোন অসীমে হারিয়ে যাব! অনন্তের মাঝখানে পরস্পর কখনো আর মুখোমুখি হবো না জানি। প্রিয়মুখগুলো জলের কাঁপন লেগে ঝাপসা হয়ে আসে। তাদের আর একবার দুহাতে জড়াই, ভালোবাসি।

ফেলে আসা বছরের সেই ভালোবাসার মধু নতুন বছরের মৌচাকে জমা হতে থাক। অশেষের ধনে পূর্ণ হোক আমার হাত। চিরপুরাতন থেকে নতুনকে খুঁজে নিই। যে বেদনা আমার মনকে অধিকার করে রেখেছে, সে যেন নতুন আনন্দকে জন্ম দেবার বেদনা হয়ে ওঠে। সব শূণ্যতা যেন চলে যাওয়ার আগে পূর্ণতার জন্য স্থান রেখে যায়। সত্য, আলো ও অমৃত প্রয়োজন আজ আমাদের মানসিক নিরাময়ের জন্য- করজোড়ে প্রার্থনা করি: আবিরাবীর্ম এধি।

দুঃখের আগুনে আমাকে পূত পবিত্র করো। নতুন দিনের মঙ্গলকলস ভরে উঠুক কানায় কানায়। পুরনো বছরশেষে নতুন বছর, প্রতিটি দিনের শেষে নতুন দিন, যে দান আনে, তাকে যেন আমি মনের চোখে দেখতে পাই, চিনতে পারি।

(www.theoffnews.com - Bengali nababarsha)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

যে নববর্ষের 'বাঙ্গালিয়ানা' নিয়ে আমরা এত গর্বিত , সেই নববর্ষই প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশদের New year celebration'এর অনুকরন ছাড়া আর কিছু নয়। ইতিহাস এর বিচারে বাঙ্গালির নববর্ষ পালন একটা নিতান্ত নব্য অর্বাচীন যুগের রেওাজ! 

বরং সমাজ তাত্ত্বিকদের মতে সুপ্রাচীন যুগে নববর্ষ পালনের সময় ছিল আশ্বিন মাস! যে নববর্ষের স্মৃতি আমরা আজও বহন করে চলেছি নতুন জামাকাপড় পরে, নতুন জুতো কিনে, ঘর রঙ করে আর পরস্পরের সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে! নববর্ষের সব আচারই আমরা মানছি... শুধু হেতু টাই বিস্মৃত হয়েছি। বৈদিক বর্ষবরণ উৎসব মহাকালের অঙ্গুলিহেলনে মিশে গেছে আজকের দুর্গোৎসবে!তাও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সবাইকে জানাই শুভ নববর্ষ। মঙ্গল হক সকলের ...

যোগেশচন্দ্র রায়ের জন্ম বৃটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় তাঁর পিতার কর্মস্থলে ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ শে অক্টোবর। তাঁদের পৈতৃক বাড়ি ছিল হুগলি জেলার দিগড়া গ্রামে। তাঁর স্কুলের পড়াশোনা বাঁকুড়া জেলা স্কুলে। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রান্স পাশের পর ভর্তি হন বর্ধমান রাজ কলেজে ও পরে হুগলি মহসিন কলেজে। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে এখান থেকে স্নাতক হওয়ার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে বটানির একমাত্র ছাত্র হিসাবে দ্বিতীয় বিভাগে এম.এ পাশ করেন।

যোগেশচন্দ্র এম.এ পাশের পরই কটকের রাভেনশ' কলেজের লেকচারার হন। একটানা ৩৬ বৎসর অধ্যাপনার পর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। এর মাঝে অবশ্য কিছুদিন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ও চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাঁকুড়ায় ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু বাঁকুড়াতেই বাস করেন। ৩৬ বৎসরের অধ্যাপনা জীবনে তিনি বারো বৎসর বাংলা ভাষাচর্চায়, বারো বৎসর জ্যোতিবির্দ্যা চর্চায় এবং বারো বৎসর দেশীয় কলাচর্চায় ব্যাপৃত ছিলেন। তিনি প্রবাসী, সাহিত্য, বঙ্গদর্শন, মডার্ন রিভিউ, ভারতবর্ষ-সহ সেকালের বিখ্যাত পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধাদি লিখতেন। তিনি গভীর নিষ্ঠায় বাংলাভাষা, সাহিত্য ও পুরাতত্ত্ব চর্চায় আত্মনিয়োগ করতেন। সেকারণে, তাঁর রচিত গ্রন্থগুলি যেমন তথ্যে সমৃদ্ধ, তেমনই মনীষায় উজ্জ্বল। "বাশুলী চণ্ডীদাস" নামের এক পুঁথি আবিষ্কার, "সিদ্ধান্তদর্শন" গ্রন্থ সম্পাদনা এবং "পূজাপার্বণ" গ্রন্থ রচনা তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি। 

ওড়িশার জঙ্গলরাজ্য খণ্ডপাড়ার জ্যোতির্বিদ চন্দ্রশেখর তথা পাঠানি সামন্ত'র জীবনচর্যা ইংরাজীতে রচনা করে ভারতীয় ধ্রুপদী জ্যোতিবিজ্ঞানীকে দেশে-বিদেশে পরিচিত করান। বাংলা বানানে দ্বিত্ব বর্জন রীতির প্রচলন এবং চারখণ্ডে "বাঙ্গলা শব্দকোষ" প্রণয়নও তাঁর বিশেষ কীর্তি। এছাড়া তিনি বিজ্ঞান ও সাহিত্য বিষয়ক পাঠ্যপুস্তকও রচনা করেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল-

'সিদ্ধান্তদর্শন' (১৮৯৯)

'আমাদের জ্যোতিষী ও জ্যোতিষ' (১৯০৩)

'বাঙ্গলাভাষা' (৪ খণ্ড) (১৯০৭ - ১৯১৫)

'বাঙ্গলা শব্দকোষ' (৪ খণ্ড) (১৯১৩)

'পূজাপার্বণ' (১৯৫১)

'বেদের দেবতা ও কৃষ্টিকাল' (১৯৫৪)

'পত্রালি' (২ খণ্ড)

'রত্নপরীক্ষা'

'শঙ্কুনির্মাণ'

'চণ্ডীদাসচরিত'

'Ancient Indian Life'

সম্প্রতি ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৭৬ বঙ্গাব্দের মধ্যে তাঁর লেখা দুর্গাপূজা বিষয়ক চোদ্দটি প্রবন্ধের সংকলন 'শ্রীশ্রীদুর্গা' প্রকাশিত হয়েছে। এক প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছেন-

আমরা ভাবের পূজা করি, মুর্তির পূজা করি না... আমরা দুর্গার মুর্তি বলি না, বলি দুর্গার প্রতিমা, গুণ ও কর্মের প্রতিমা।"

যোগেশচন্দ্র বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বিশিষ্ট সভ্য, কয়েক বছর সহ-সভাপতি ও এক বছর সভাপতিও ছিলেন। বিজ্ঞান পরিষদ, উদ্ভিদবিদ্যা পরিষদ ও উৎকল সাহিত্য সমাজের সভ্য ছিলেন। তিনি বাঁকুড়ার ছাতনায় চণ্ডীদাসের নামে এক স্মৃতিমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

যোগেশচন্দ্র তাঁর পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন সময়ে নানা উপাধি ও পুরস্কারের ভূষিত হয়েছেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পণ্ডিত সমাজে জ্যোতির্বিদ চন্দ্রশেখরকে পরিচিত করার জন্য পুরীর পণ্ডিতসভা ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে "বিদ্যানিধি" উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে 'Ancient Indian Life' গ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার, "পূজাপার্বণ" গ্রন্থের জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের 'রামপ্রাণ গুপ্ত পুরস্কার' লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় জগত্তারিণী স্বর্ণ পদক ও সরোজিনী পদক প্রদান করে। উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডিলিট প্রদান করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই এপ্রিল বাঁকুড়ায় বিশেষ সমাবর্তন উৎসবে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেন।

এই যোগেশ রায় তথ্য দিয়ে প্রমান করেছেন বাংলার কবি চণ্ডীদাস বাঁকুড়ার ছাঁতনায় জন্মেছেন।যোগেশচন্দ্র ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ শে জুলাই বাঁকুড়ায় ৯৬ বৎসর বয়সে প্রয়াত হন।

(www.theoffnews.com - Bengali nababarsha)

ইরানী বিশ্বাস, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও পরিচালক, বাংলাদেশ:

বাংলা সন বাঙালির একটি নিজস্ব সন বা সাল। যতই দিন আসছে বাংলা সনের গৌরব ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলা সন বা তারিখ বঙ্গাব্দ হিসেবে গণনা করা হয় কিংবা পরবর্তী কোন সময়ে গণনা আরম্ভ করার প্রারম্ভিক সময় ৫৯৩-৯৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে, অর্থাৎ ঐ বছরকে বাংলা সনের আরম্ভ বর্ষ বা ভিত্তি বর্ষ বলা চলে। তবে বাংলা সনের প্রবর্তক বা প্রচলন সম্পর্কে নানা মনীষীর নানা রকম ব্যাখ্যা রয়েছে। কারও কারও মতানুযায়ী রাজা, ভুস্বামী কিংবা ধনাঢ্য মহাজন গোষ্ঠী বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন। বেশ কয়েকজন পন্ডিতের মতে গৌড়রাজা শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল গৌড় বঙ্গে স্বাধীন ভাবে রাজত্ব আরম্ভ করেন। অর্থাৎ তার রাজত্বকালেই এই অব্দের গণনা শুরু হয়। আবার অনেক পন্ডিত মনে করেন বাংলা সনের প্রচলন ও উদ্ভাবন হয় ১৫৫৬ -১৬০৫ শতকে মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তারই নির্দেশে। তাই আকবরকে বাংলা সনের প্রবর্তক বলা হয়। 

বলা হয়ে থাকে, মুঘল আমলে ফসল দিয়ে কৃষকের খাজনা পরিশোধ করতে হতো। যে চন্দ্র মাসে রাজস্ব নির্ধারণ করা হতো, ঋতু পরিবর্তনের কারণে সেই চন্দ্র মাসে সবসময় রাজস্ব আদায় সম্ভব হতো না। কেন না ঋতুটি সরে যাওয়ার কারণে দেখা যেত ঐ সময় কৃষকের কোন ফসল ঘরে ওঠেনি। তখন কৃষকের খাজনা আদায় করা কঠিন হয়ে উঠত। ফসল দিয়ে খাজনা পরিশোধ করার রেওয়াজ ছিল বলে এটা ছিল বড় রকমের একটা সমস্যা। 

কৃষকরা যখন শস্য কেটে ঘরে তোলার আয়োজন করতেন, সে সময় রাজকর্মচারীরা খাজনা আদায় করে নিতেন। কিন্তু মাঝে মধ্যে এই খাজনা আদায় করতে রাজ কর্মচারীদের বেশ কিছুটা সমস্যায়ও পড়তে হত। যেহেতু হিজরি সাল সৌর বছর থেকে এগারো দিন এগিয়ে যায়, তাই অনেক সময় দেখা যেত কৃষকরা সে সময় শস্য কেটে ঘরে তুলতে পারেনি। আকবরের এই নতুন সন অনুসারে তখন এ অঞ্চলে ফসল তোলা ও খাজনা আদায়ের নিয়ম শুরু হয়। ধারণা করা হয় জমিতে ফসল বোনা এবং ফসল তোলার সাথে বাংলা সনের উদ্ভব হয়েছে কৃষকের ফসল তোলাকে কেন্দ্র করে। আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগে ইংরেজি সন চালু হওয়া ফসলী সন ‘বাংলা সন’ নামে পরিচিতি লাভ করে। উনিশ শতকে এর নাম হয় ‘বঙ্গাব্দ’।

বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম মাস। বলা হয়ে থাকে, বৈশাখ নাম হয়েছে বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারে, বাংলা বর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ পুরো একটি বছরের অতীত ফেলে যেদিনটি আসে সেটি নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ নামে পরিচিত। এই নববর্ষ বা বৈশাখী উৎসব এখন সাধারণ বাঙালির বাঙালিত্বের অনুষ্ঠান বলা চলে। প্রতিবছর ঋতু বদলের পালায় আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে বৈশাখ। পুরো একটি বছরের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা পিছনে ফেলে, দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে-মুছে আসে বছরের নতুন দিন। বৈশাখের প্রথম দিনটিতে তাই সকলের মন খুশিতে ভরে উঠে। আমরা সকলেই নানা রকম আনন্দ অনুষ্ঠানে মেতে উঠি। বিশ্বের প্রত্যেক জাতি কিংবা ভাষাভাষী মানুষদেরও নিজ নিজ বছরের পয়লা দিনটিকে বরণ করে নেওয়ার রেওয়াজ আছে। যেমন ইংরেজদের নিউ ইয়ার, প্রাচীন আরবীয়দের ওকাজের মেলা, ইরানিদের নওরোজ উৎসব, প্রাচীন ভারতীয়দের দোল উৎসব। এই দিনগুলিতে তারা বর্ষবরণ করে বা নতুন বছরের আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে।

বৈশাখের প্রথম দিনটি বাঙালির জীবন ও চেতনায় নানা আনুষ্ঠানিকতার ডালি নিয়ে উপস্থিত হয়। বাঙালি তার ঐতিহ্যমন্ডিত বর্ষবরণ করে স্বকীয় আনন্দ উৎসবে। এই দিনটি বাঙালির জীবনে বড় এক পার্বণ, একটি সার্বজনীন জাতীয় উৎসব। বসন্তের অবসানে বৈশাখের আগমন ঘটে, পুরানোকে ধুয়ে মুছে নতুনকে বরণ করে নেয়। বাঙালির দিবস আরো অনেক রয়েছে কিন্তু তার কোনটাই পহেলা বৈশাখের মতো সার্বজনীন নয়। 

নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব, আদিতম উৎসব বা মেলা। শত শত বছর ধরে চলে আসা একটি বর্ষ অনুষ্ঠান। মাটির গন্ধ এবং মানুষে মানুষে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগভাগি করার সবচেয়ে বড় উৎসব এই বৈশাখী মেলা। অতীতে গ্রামবাংলায় এই দিনে ঘোড় দৌড়, মোরগের লড়াই, ষাড়ের লড়াই, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ আয়োজন করা হতো। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হালখাতার ধুম পড়ে যেত, ধর্মীয় উৎসবে হিন্দুদের দোকানে গনেশ মুর্তিতে সিঁদুর পরানো, মুসলমানদের দোকানে আগর বাতির গন্ধে মাতোয়ারা হতো চারিদিক। এ ছাড়া হিন্দু বাড়িতে মঙ্গল ঘট প্রতিস্থাপন করা হতো, মসজিদে আয়োজন করা হতো মিলাদ মাহফিল।

আমার জন্ম গ্রামে। তাই গ্রামীন পটভুমিতে বৈশাখ বরণ দেখেছি। তখন নববর্ষ মানে পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ বৈশাখী মেলাকেই বুঝতাম। এটা ছিল বোরো মৌসুম। তখনো গ্রামে ইরি প্রকল্প শুরু হয়নি। ধান কাটার জন্য অন্য জেলা থেকে কৃষক আসতো আমাদের গ্রামে। তারা মাঠে তাবু টানিয়ে নিজেরা রান্না করে খেতো। সারাদিন ধান কাটা হতো, শেষ রাতে মলন দিয়ে ধান ছাড়ানোর কাজ করতো। এ সময় তাদের গলায় থাকতো বিভিন্ন লোকজ গান। এসব গানে ঘুম ভাঙতো কৃষানী বা গৃহকর্ত্রীর। তারাও ঘুম থেকে উঠে গৃহস্থালীর বিভিন্ন কাজ করতো। গ্রামের প্রত্যেকটা বাড়িতে তখন থাকতো ধানের ছড়াছড়ি। গ্রামীন নর-নারীর ফুরসত নেই, ধান গোলায় তুলতে তারা ভীষন ব্যস্ত দিন কাটাতো। তবু দিন তারিখ মনে করে চৈত্র সংক্রান্তি পালিত হতো। চৈত্রের শেষ দিনটিকে বিদায় জানানো হতো পুজার মাধ্যমে। এই পূজা ছিল মূলত শিবের পূজা। শিব ঠাকুরের অপর নাম নীলকন্ঠ। তারই প্রতিকী হিসাবে বলা হতো নীল পূজা। গ্রামবাংলায় চড়ক পূজা বা চড়ক ঘোরানোর প্রচলন রয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়ক পূজারও শুভ সূচনা হয়ে থাকে। বৈশাখের প্রথম দিন থেকে বৈশাখী মেলার আয়োজন চলে। 

চৈত্রের বিদায় এবং বৈশাখের প্রথম সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রস্তুতি ছিল পাড়ার দোকানে হালখাতায় যাওয়া। পাড়ার দোকান থেকে বাড়িতে বাড়িতে নিমন্ত্রন করতে আসতো। যাদের কাছে টাকা বাকী থাকতো, তাদেও বাকী টাকার হিসাব দিয়ে একটি চিঠি দিয়ে যেতো। আর কিছু আছে গ্রামের গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, তাদের এমনিই নিমন্ত্রন করা হতো। আমার খুব মনে পড়ে, আমার ক্লাশমেটের মুখে শুনছি তাদের দোকানে ৩টি দোকানে বাকী আছে। তাই তারা ৩টি দোকানে হালখাতার নিমন্ত্রন পেয়েছে। আমিও যথারীতি বাড়িতে এসে জ্যাঠা মশায়কে জিজ্ঞেস করলাম আমাদের কয়টা দোকানে বাকী। তিনি জানালেন কোন দোকানে বাকী নাই। আমার সে কি চিন্তা। লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না শুরু করে দিলাম। আমার কান্নার রহস্য উদ্ঘাটন করতেই জানতে পারলেন দোকানে বাকী নাই বলে এই কান্না। কারন আমি এ বছর হালখাতা খেতে পারবো না। তখন আমাকে বলা হলো, আমরা এমনিই নিমন্ত্রন পেয়েছি। পরিবারের ছোটদের সঙ্গে নিয়ে বিকালে জ্যাঠামশায় যাবেন হালখাতা খেতে। সারা বছর যতই মিষ্টি-মন্ডা খাওয়া হোক না কেন, হালখাতার গরম মিষ্টি ছিল লোভনীয়। দোকানীরা ময়রা ডেকে মিষ্টি বানানোর আয়োজন করতো। গ্রামের যত ক্রেতা ছিল তাদের এই দিনে নিমন্ত্রণ করে পেট ভরে মিষ্টি মন্ডা খাওয়াতো। যে সব ক্রেতারা সারা বছর বাকি খেতো, বছরের এই দিনে তারা সকল পাওনা পরিশোধ করতো। আবার তাদের নাম লেখা হতো নতুন হাতায়। সম্ভবত এই জন্যই এ দিনটিকে হালখাতাও বলা হতো। তারপর দিনব্যাপী চলতো নানান রকমের সুস্বাদু খাবারের আয়োজন। নতুন চালের পায়েস, শুক্ত, পাটশাকের ডালনা, মাছের রসা, কঁচি পাঠার মাংস। গ্রামের হিন্দু বাড়িতে মুরগি রান্নার প্রচলন হয়েছে মাত্র কয়েকদিন। এখনো হয়তো অনেক বাড়িতে মুরগীর মাংস খায় না।

বিকাল হতেই নতুন জামা কাপড় পরে স্কুল মাঠে বৈশাখী মেলায় চড়ক দেখতে যাওয়া ছিল পহেলা বৈশাখের প্রধানতম আকর্ষণ। আমি কখনো চড়ক ঘোরানো দেখতে পারতাম না। কারন একটি মানুষের পিঠে বড় বড় লোহার বড়সি ফুটিয়ে শুন্যে ঘোরানো হতো। আমি এই দৃশ্য দেখতে ভয় পেতাম।  তবুও যেতাম চড়কের মেলায়। এই উৎসব চলতো ৫ দিন ব্যাপী। বৈশাখী উৎসবে ঘোড়দৌড় হবে না তাতো হতে পারে না। প্রতিযোগীতার সময় কিছু ঘোড়া দিক ভুলে মানুষের ঘর-বাড়িতে চলে যেত, এ জন্য আমি ভীষন ভয়ে থাকতাম। আমি বরাবরই ঘোড়া, গরু বা যে কোন জন্তু-জানোয়ারকে ভয় পাই। তবুও চড়ক, ঘোড় দৌড় মেলায় যেতাম। নৌকা বাইচ, লাঠিখেলা, হাডুডু খেলা এমনকি ফুটবল খেলারও আয়োজন করা হতো বৈশাখী মেলায়। সময় গড়িয়ে বিকাল হতেই বাড়িতে ফিরে আসতাম। বাড়ির অন্যান্য বয়সে বড় ব্যক্তিদের প্রনাম করতে ভুল হতো না। কারণ এ সময় গুরুজনরা ছোটদের আশীর্বাদ করতেন মিষ্টিমুখের মাধ্যমে।

বড় হতে হতে ঢাকা কেন্দ্রিক বর্ষবরণের সঙ্গে পরিচিত হলাম। আমার দেখা বৈশাখী উৎসব এখানে এসে নববর্ষ উদ্যাপন হয়ে গেছে। নতুন চালের পায়েস হয়ে উঠেছে পানতা-ইলিশে। আমি আর কোন দোকানে মঙ্গল ঘটে সিঁন্দুর বা আগর বাতির গন্ধ পাই না। কোন শিশুর চোখে স্বপ্ন দোলে না হালখাতার গরম মিষ্টি খেতে যাওয়া। গাছের কাঁচা আম পেড়ে নুন-মরিচের ভর্তা খেতে কিংবা নতুন চালের পায়েসের মৌ মৌ গন্ধ তাকে আর আকৃষ্ট করে না। এখানে শুধু নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে শপিং মলগুলিতে কেনাকাটার ভিড়, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে পোশাকের নতুন ডিজাইন মেলে ধরা।  ইলিশ নিয়ে বানিজ্য চলে আকাশচুম্বী। বৈশাখের প্রথম প্রহরে ঢাকার রাস্তায় মানুষ লাল-সাদা পোশাকে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। কে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে তার হদিস নেই। এছাড়া কিছু সংস্কৃতি সর্বস্ব মানুষ নানা রঙয়ের নানা ঢঙের মুখোশ নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় শরীক হয়। এমন শুভক্ষণে এসব অদ্ভুত মুখোশ পরার তাৎপর্য আমি খুঁজে পাইনি কখনো। পরিশেষে এক দিনের জন্য বাঙালী পোশাকে নিজেকে উপস্থাপন করে, মাটির সানকিতে পানতা-ইলিশ খেয়ে নিজেকে বাঙালি করার চেষ্টা চলতে থাকে। সারাদিন বিভিন্ন অনুষ্ঠান শেষে বিকালে কোন অভিজাত রেস্তোরায় ঢুকে পেট ভরে খাবার খেয়ে বাড়ি ফেরা। এ সবই শহুরে নব্য নববর্ষ উদ্যাপনের অংশ।

আমি মিলাতে পারি না, কোনটা বাঙালী উৎসব, আমার দেখা ছোটবেলার বৈশাখের প্রথম দিন, নাকি শহুরে নববর্ষ! তবু মনে মনে শান্তি পাই, আমি বাঙালি, বছরের একটা দিন হলেও সমগ্র বাংলাদেশ সেদিন বাঙালি হয়ে ওঠে। না হোক মনণে অন্তত পোশাকে বাহ্যিক অবয়বে নিজেকে বাঙালি করে গড়ে তোলার এই যে চেষ্টা এটাকে আমি সাধুবাদ জানাই। মনে মনে নিজেকে শান্তনা দেই, আমার মতো সেদিনের কোন শিশু নাইবা শিখলো প্রথম প্রভাতে মিষ্টি খেয়ে দিন শুরুর শিক্ষা, আর দিন শেষে গুরুজনের আশীর্বাদে তুষ্ট হয়ে ঘরে ফেরা। তবুও সমস্ত বাঙালী একটি দিনে, একটি সংস্কৃতিতে মতানৈক্য ভুলে এক কাতারে দাঁড়ায়। বছরের এই একটি দিন-ই বিশ্বের কাছে প্রমান করে বাঙালী উৎসব প্রিয় জাতি। 

প্রত্যেকটা উৎসব ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্ম দেয়। আমার ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখ শুরু হতো মিষ্টি মুখ করে আর শেষ হতো বড়দের আশির্বাদ নিয়ে। এখন আর এসব দেখা যায় না। হয়তো এ জন্যই এখন আর আগের মতো বড়দের সামনে ছোটদের চোখ নীচু করে কথা বলতে দেখি না। বাদশা আলমগীরের মতো কোন বাবা এখন আর সন্তানকে শিক্ষা দেয় না, শিক্ষকের মর্যদা কি করে দিতে হয়। রাস্তায় বেরিয়ে সন্তানের বয়সি ছেলের কাছে মায়ের বয়সি মহিলাদের ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হয়। নিজ ঘরে বাবার কাছে কন্যারা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। সংসার নামক অভয়ারন্যে কন্যা-জায়া-ভগিনী এখন শুধুই ভোগের সামগ্রী। আমি খুঁজেফিরি বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি, মমত্ব-ভ্রাতৃত্ব আর পারস্পরিক  শ্রদ্ধাবোধ!

(www.theoffnews.com - Bangladesh Bengali nababarsha)