গুরুত্বপূর্ণ খবর

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

সুরের গান, না-সুরের গান, কাকে ছেড়ে কাকে বাছবো? আমি দুইকেই সমান স্বীকার করে নিয়েছি। এক জাগয়ায় কেবল আমার বাধে। খেলনা নিয়ে নিজেকে ভোলাতে আমি কিছুতেই পারি নে। এটা পারে নিতান্তই শিশু বধূ। সাথী আছেন কাছে বসে তাঁর দিকে পিছন ফিরে খেলনার বাক্স খুলে বা একেবারেই সময় নষ্ট করা। এতে করে সত্য অনুভূতির রস যায় ফিকে হয়ে। ফুল দিতে চাও দাও না, এমন কাউকে দাও যে-মানুষ ফুল হাতে নিয়ে বলবে বাঃ। তার সেই সত্য খুসি আনন্দে গিয়ে পৌঁছায়। শিলাইদহের বোষ্টমী আমার হাতে আম দিয়ে বললে, তাঁকে দিলুম। এই তো সত্যকার দেওয়া- আমারই ভোগের মধ্যে তিনি আমটিকে পান। পূজারী ব্রাহ্মণ সকাল বেলায় গোলকচাঁপার গাছে বাড়ি মেরে ফুল সংগ্রহ করে ঠাকুরঘরে যেত- তার নামে পুলিশে নালিষ করতে ইচ্ছা করত- ঠাকুরকে ফাঁকি দিচ্ছে বলে। সেই ফুল আমার মধ্যে দিয়ে ঠাকুর গ্রহণ করবেন বলেই গাছে ফুল ফুটিয়েছেন আর আমার মধ্যে ফুলে আনন্দ আছে। ঠাকুরঘরে যে মুর্তি প্রতিদিন এই চোরাই মাল গ্রহণ করে সে তো সমস্ত বিশ্বকে ফাঁকি দিলে- মূঢ়তার ঝুলির মধ্যে ঢেকে তার চুরি। কত মানুষকেই বঞ্চিত করে তবে আমরা এই দেবতার খেলা খেলি। ঠাকুর ঘরের নৈবেদ্যের মধ্যে আমরা ঠাকুরের সত্যকার প্রাপ্যকে প্রত্যহ নষ্ট করি।

এর থেকে একটা কথা বুঝতে পারবে, আমার দেবতা মানুষের বাইরে নেই। নির্ব্বিকার নিরঞ্জনের অবমাননা হচ্ছে বলে আমি ঠাকুর ঘর থেকে দূরে থাকি এ কথা সত্য নয়- মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে বলেই আমার নালিষ। যে সেবা যে প্রীতি মানুষের মধ্যে সত্য করে তোলবার সাধনাই হচ্ছে ধর্ম সাধনা তাকে আমরা খেলার মধ্যে ফাঁকি দিয়ে মেটাবার চেষ্টায় প্রভূত অপব্যয় ঘটাচ্ছি। এই জন্যেই আমাদের দেশে ধার্মিকতার দ্বারা মানুষ এত অত্যন্ত অবজ্ঞাত। মানুষের রোগ তাপ উপবাস মিটতে চায় না, কেন না চিরশিশুর দেশে খেলার রাস্তা দিয়ে সেটা মেটাবার ভার নিয়েছি। মাদুরার মন্দিরে যখন লক্ষ লক্ষ টাকার গহনা আমাকে সগৌরবে দেখানো হলো তখন লজ্জায় দুঃখে আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল। কত লক্ষ লক্ষ লোকের দৈন্য অজ্ঞান অস্বাস্থ্য ওই সব গহনার মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। খেলার দেবতা এই সব সোনা জহরৎকে ব্যর্থ করে বসে থাকুন- এদিকে সত্যকার দেবতা সত্যকার মানুষের কঙ্কালশীর্ণ হাতের মুষ্টি প্রসারিত করে ওই মন্দিরের বাহিরে পথে পথে ফিরছেন। তবু আমাকে বলবে আমি নিরঞ্জনের পূজারী? ওই ঠাকুর ঘরের মধ্যে যে পূজা পড়ছে সমস্ত ক্ষুধিতের ক্ষুধাকে অবজ্ঞা করে সে আজ কোন শূন্যে গিয়ে জমা হচ্ছে?

হয়তো বলবে এই খেলার পূজাটা সহজ। কিন্তু সাধনাকে সহজ করো না। আমরা মানুষ, আমাদের এতে গৌরব নষ্ট হয়। দেবতার পূজা কঠিন দুঃখেরই সাধনা- মানুষের দুঃখভার পর্বত-প্রমাণ হয়ে উঠেছে সেইখানেই দেবতার আহ্বান শোনো- সেই দুঃসাধ্য তপস্যাকে ফাঁকি দেবার জন্যে মোহের গহ্বরের মধ্যে লুকিয়ে থেকো না। আমি মানুষকে ভালোবাসি বলেই এই খেলনা দেবতার সঙ্গে আমার ঝগড়া। দরকার নেই এই খেলার, কেননা প্রেম দাবী করছে সত্যকার ত্যাগের, সত্যকার পাত্রে। তোমাকে বোধ হয় কিছু কষ্ট দিলুম। কিন্তু সেও ভালো। যদি তোমাকে অবজ্ঞা করতুম তাহলে এ কষ্টটুকু দিতুম না।

এমনি স্বগতঃ ভাবনা বা ব্যক্তিগত প্রবন্ধে অতুলনীয় সৎসাহিত্য রচিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য পত্রের বেশির ভাগ জুড়ে। তবে এ সাহিত্য পত্র-মাধ্যম ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে এ প্রসাদগুণ নিয়ে সৃষ্ট হতে পারতো না কেন, তাও তাঁর কাছেই শোনা ভালো। ছিন্নপত্র, ভানুসিংহের পত্রাবলী, পথে ও পথের প্রান্তে- এই তিনখানি গ্রন্থ ১৩৪৫ সালে পত্রধারা শিরোনামে চিহ্নিত হলে, তার ভূমিকাতে ছিন্নপত্র প্রসঙ্গে কবি যা লিখেছেন তা তাঁর সমগ্র পত্রসাহিত্য সম্পর্কেই প্রযোজ্য :

পত্রধারায় ছিন্নপত্র পর্যায়ে যে-চিঠির টুকরোগুলি ছড়ানো হয়েছে তার অধিকাংশই আমার ভাইঝি ইন্দিরাকে লেখা চিঠির থেকে নেওয়া। তখন আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম বাংলার পল্লীতে পল্লীতে, আমার পথ-চলা মনে সেই-সকল গ্রামদৃশ্যের নানা নতুন পরিচয় ক্ষণে ক্ষণে চমক লাগাচ্ছিল; তখনি তখনি তাই প্রতিফলিত হচ্ছিল চিঠিতে। কথা কওয়ার অভ্যাস যাদের মজ্জাগত, কোথাও কৌতুক-কৌতূহলের একটু ধাক্কা পেলেই তাদের মুখ খুলে যায়। যে বকুনি জেগে উঠতে চায় তাকে টেকসই পণ্যের প্যাকেটে সাহিত্যের বড়ো হাটে চালান করবার উদ্যোগ করলে তার স্বাদের বদল হয়। 

রবীন্দ্রশতবর্ষে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ‘বাক্‌পতি বিশ্বমনা’। স্মরণযোগ্য এই বিশেষণ। বি‌শ্বের কোনও কবি বা সাহিত্যিক বোধ হয় এত কথা লেখেননি। তাঁর রচনাবলির কথা বাদ দিচ্ছি। শুধু চিঠিই লিখেছেন পাঁচ হাজারের বেশি। ইংরেজি চিঠির সংখ্যা ধরলে ন’-দশ হাজার তো হবেই। প্রমথ চৌধুরীকে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘রীতিমতো ভালো চিঠি লেখা খুব একটা দুরূহ কাজ। প্রবন্ধ লেখা সহজ— খুব একটা মোটা বিষয় নিয়ে অনর্গল কলম ছুটিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু চিঠিতে এমন সকল আভাস ইঙ্গিত নিয়ে ফলাতে হয় কেবল ভাবের চিকিমিকিগুলি মাত্র— যে, সে প্রায় কবিতা লেখার সামিল বললেই হয়। কিন্তু সে রকম চিঠি লেখার দিন কি আর আছে? এক সময় ছিল যখন চিঠি লেখাতেই একটা আনন্দ পেতুম এবং বোধ হয় চিঠি লিখে আনন্দ দিতেও পারতুম।’

চিঠি লিখে যে আনন্দ পেতেন, তার অজস্র প্রমাণের মধ্যে ‘ছিন্নপত্রাবলী’, ‘পথে ও পথের প্রান্তে’, ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’ কিংবা হেমন্তবালাদেবীর কাছে লেখা চিঠির কথা অবশ্যই মনে পড়বে। ‘ছিন্নপত্র’-এ চিঠির প্রাপক ছিলেন ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাদেবী। ‘পথে ও পথের প্রান্তে’র চিঠিগুলি লিখেছেন নির্মলকুমারী মহলানবিশকে এবং স্নেহাস্পদ রাণুকে লেখা চিঠির সংগ্রহ ‘ভানুসিংহের পত্রালী’। যৌবনে ‘য়ুরোপ যাত্রীর ডায়ারি’ কিংবা পরিণত বয়সে লেখা ‘পশ্চিম যাত্রীর ডায়ারি’ও তো অজস্র চিঠির সমষ্টি। ১৯৩০-এ লেখা ‘রাশিয়ার চিঠি’ও তাই। এ সব ছা়ড়া আছে বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র। তার বাইরেও রয়েছে ভূরি পরিমাণ চিঠি— সংকলিত ও অসংকলিত। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Rabindranath Tagore)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে, তাঁর ১৩ থেকে ২১ বছর বয়স কালে, লেখা চিঠিগুলির একক তাৎপর্য স্বয়ং পত্রকারই সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন ৭ অক্টোবর ১৮৯৪ সালে লেখা চিঠিখানিতে। ইন্দিরা দেবীকে লেখার বিষয়-বৈশিষ্ট্য কি, সেটা স্বয়ং লেখকের জবানি শোনা যাক:

আমার অনেক সময় ইচ্ছা করে, তোকে যে সমস্ত চিঠি লিখেছি সেই গুলো নিয়ে পড়তে পড়েত আমার অনেক দিনকার সঞ্চিত অনেক সকাল দুপুর সন্ধ্যার ভিতর দিয়ে আমার চিঠির সরু রাস্তা বেয়ে আমার পুরাতন পরিচিত দৃশ্যগুলির মাঝখান দিয়ে চলে যাই। কত দিন কত মূহুর্তকে আমি ধরে রাখবার চেষ্টা করেছি- সে গুলো বোধ হয় তোর চিঠির বাক্যের মধ্যে ধরা আছে…আমাকে একবার তোর চিঠিগুলি দিস- আমি কেবল ওর থেকে আমার সৌন্দর্য সম্ভোগগুলো একটা খাতায় টুকে নেব…আমার গদ্যে-পদ্যে কোথাও আমার সুখ দুঃখের দিনরাত্রিগুলি এ রকম করে গাঁথা নেই (শিলাইদহ। ১১ মার্চ ১৮৯৫, সংযোজন, ছিন্নপত্র)।

ছিন্নপত্রের যে-কোনও একটি চিঠি পড়লেই দেখা যাবে কবির অনুপ্রাণিত মনে বহির্জগতের ক্রিয়াগুলি যে-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে তাকেই সত্যরূপে পত্রগুলি বিশ্বস্তভাবে ধারণ করে আছে। যেমন প্রকৃতির বক্ষলগ্ন কবির প্রাণিত অনুভব:

ওই-যে মস্ত পৃথিবীটা চুপ করে পরে রয়েছে ওটাকে এমন ভালোবাসি- ওর এই গাছপালা নদী মাঠ কোলাহল নিস্তব্ধতা প্রভাত সন্ধ্যা সমস্তটা-সুদ্ধ দুহাতে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে। মনে হয় পৃথিবীর কাছ থেকে আমরা যে-সব পৃথিবীর ধন পেয়েছি এমন কি কোনও স্বর্গ থেকে পেতুম? স্বর্গ আর কী দিত জানি নে, কিন্তু এমন কোমলতা দুর্বলতাময়, এমন সকরুণ আশঙ্কা-ভরা, অপরিণত এই মানুষগুলির মতো এমন আপনার ধন কোথা থেকে দিত!…আমি এই পৃথিবীকে ভারী ভালোবাসি। এর মুখে ভারী একটি সুদূরব্যাপী বিষাদ লেগে আছে- যেন এর মনে আছে, আমি দেবতার মেয়ে, কিন্তু দেবতার ক্ষমতা আমার নেই। আমি ভালোবাসি, কিন্তু রক্ষা করতে পারি নে। আরম্ভ করি, সম্পূর্ণ করতে পরি নে। জন্ম দিই, মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারি নে। এই জন্যে স্বর্গের উপর আড়ি করে আমি আমার দরিদ্র মায়ের ঘর আরও বেশি ভালোবাসি- অসহায়, অসমর্থ, অসম্পূর্ণ, ভালোবাসার সহস্র আশঙ্কায় সবর্দা চিন্তাকাতর বলেই (পত্র ১৮, ছিন্নপত্র)।

কাদম্বিনী দত্ত (১২৮৫(?)-১৩৫০) উচ্চশিক্ষিতা বা সুপরিচিতা কোনও ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। কিন্তু তাঁর ঈশ্বর-জিজ্ঞাসা এবং অসামান্য ধীশক্তি রবীন্দ্রনাথকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল। প্রায় ত্রিশ বছর কাল উভয়ের মধ্যে পত্রযোগে নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলেছিল। কবি কি-প্রাঞ্জল ভাষায় এই শোকাতুরা বাল্য বিধবাকে শান্তির আমোঘ বাণী শুনিয়েছেন, এখানে তার কিছু নমুনা দেওয়া আলোচনার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হবে।

ঈশ্বর তাঁর পরম দানগুলিকে দুঃখের ভিতর দিয়াই সম্পূর্ণ করেন- তিনি বেদনার মধ্য দিয়া জননীকে সন্তান দেন- সেই বেদনার মূল্যেই সন্তান জননীর এত অত্যন্তই আপন। সেই কথা মনে রাখিয়া, যখন ঈশ্বরের কাছে সত্য চাই, আলোক চাই, অমৃত চাই তখন অনেক বেদনা অনেক ত্যাগের জন্য নিজেকে সবলে প্রস্তুত করিতে হইবে। মা, ঈশ্বর যদি তোমাকে বেদনা দেন তবে নিজের দোষে সেই বেদনাকে ব্যর্থ করিও না- তাহাকে সফল করিবার জন্য সমস্ত হৃদয় মনকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করিয়া জাগ্রত হও (পত্র ৪, ঐ)।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কাদম্বিনী দত্তের পত্র ব্যবহারের মূল বিষয় ছিল- এ সংসারে মানুষের সুখ দুঃখের স্বরূপ। হেমন্তবালার সঙ্গে পত্রালাপের মুখ্য বিষয় মানুষের ধর্মমত, এবং ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে কবির আত্মপরিচয়।

তিনি নানা প্রশ্ন করে এমনভাবে চিঠি লিখতেন যে, রবীন্দ্রনাথ সারবান উত্তর লিখতে উদ্বুদ্ধ হতেন। বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণকারিণী এই গরীয়সী রমণীর মুখ্য প্রশ্নটি ছিল আপনি এমন কবি ও ভাবুক হয়েও বৈষ্ণবধর্মকে কেন সমর্থন করেননি, এবং সাকার-উপাসনার বিরুদ্ধে বলেন কেন?

এ সম্পর্কে কবি বহু পত্রে বহু কথা লিখেছেন। এখানে আমি কেবল দ্বিতীয় পত্রখানি থেকে দীর্ঘ একটি উদ্ধৃতি দিয়ে প্রসঙ্গটি শেষ করবো।

আমি র্নিগুণ নিরঞ্জন নির্বিশেষের সাধক এমন একটা আভাস তোমার চিঠিতে পাওয়া গেল। কোনও একদিক থেকে সেটা হয়তো সত্য হতেও পারে- যেখানে সমস্তই শূন্য সেখানেও সমস্তই পূর্ণ-যিনি তিনি আছেন এটাও উপলব্ধি না করব কেন? আবার এর উল্টো কথাটাও আমারই মনের কথা। যেখানে সব-কিছু আছে সেখানেই সবার অতীত সব হয়ে বিরাজ করেন এটাও যদি না জানি তাহলে সেও বিষম ফাঁকি। আজ এই প্রৌঢ় বসন্তের হাওয়ায় বেলফুলের গন্ধ সিঞ্চিত প্রভাতের আকাশে একটা রামকেলী রাগিণীর গান থাকে ব্যপ্ত হয়ে- স্তব্ধ হয়ে একা একা বেড়াই যখন, তখন সেই অনাহত বীণার আলাপে মন ওঠে ভরে। এই হলো গানের অন্তর্লীন গভীরতা। তার পরে হয়তো ঘরে এসে দেখি গান শোনবার লোক বসে আছে- তখন গান ধরি “প্যালা ভর ভর লায়ীরি”। সেই ধ্বনিলোকে দেহমন সুরে সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে, যা কিছুকে সেই সুর স্পর্শ করে তাই হয় অপূর্ব। এও তো ছাড়বার জো নেই। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Rabindranath Tagore)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

রবীন্দ্রনাথ খুবই কম কথা বলতেন, উনি উপলব্ধি

করেছিলেন উনি বলতে আসেননি, লিখতে এসেছিলেন। উনি যা দেখতেন, যা শুনতেন তাঁকে নিজের উপলব্ধিতে সাজিয়ে এক আন্তরিক দার্শনিক স্তরে পেশ করতেন।

উনি ছিলেন এক অদ্ভুত ব্লটিং পেপার, যা দেখতেন উনার বিশ্বজনীন ও ব্যক্তিগত দৃষ্টি দিয়ে তা শুষে নিতেন যা আজকের ডিজিটাল টেকনোলজিকেও হার মানায়। উনার চিঠি পত্র তাঁরই প্রমান। আজকে চিঠির যুগ নেই, অপেক্ষা নেই, তাই হয়তো ভালোবাসার গভীরতা নেই।

উনার চিঠি শুধু চিঠি নয়, এ এক আন্তর্জাতিক সাহিত্যি। উনি সংগীত নিয়ে যে চিঠি লিখেছেন সংগীতজ্ঞ ধূর্জটি মুখোপাধ্যায়কে, তা শুধু অনবদ্য নয়, এক বিরাট শিক্ষা ভান্ডারের পরিচয় দেয়। আজ সেই সব আলোচনা করবো না, আজ তাঁর যে পত্র সাহিত্য রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের অন্যতম প্রধান অঙ্গ- কৃতি হিসেবে তাঁর গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, কবিতা, গীতির চেয়ে কোনও অংশেই কম নয়।

পত্রের একটা অতি বিশিষ্ট ভূমিকা কবি ব্যাখ্যা করেছেন ছিন্নপত্রের ১৪১-সংখ্যক পত্রে, যেটি পুরোপুরিই উদ্ধৃতিযোগ্য:

পৃথিবীতে অনেক মহামূল্য উপহার আছে, তার মধ্যে সামান্য চিঠিখানি কম জিনিস নয়। চিঠির দ্বারা পৃথিবীতে একটা নূতন আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মানুষকে দেখে যতটা লাভ করি, তার সঙ্গে কথাবার্তা কয়ে যতটা লাভ করি, চিঠিপত্র দ্বারা তার চেয়ে আরও একটা বেশি কিছু পেয়ে থাকি। চিঠিপত্রে যে আমরা কেবল প্রত্যক্ষ আলাপের অভাব দূর করি তা নয়, ওর মধ্যে আরও একটু রস আছে যা প্রত্যক্ষ দেখা-শোনায় নেই। মানুষ মুখের কথায় আপনাকে যতখানি ও যে রকম করে প্রকাশ করে লেখার কথায় ঠিক ততখানি করে না। আবার লেখায় যতখানি করে মুখের কথায় ততখানি করতে পারে না। এই কারণে, চিঠিতে মানুষকে দেখবার এবং পাবার জন্য আরও একটা যেন নতুন ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনে হয়, যারা চিরকাল অবিচ্ছেদে চব্বিশ ঘণ্টা কাছাকাছি আছে, যাদের মধ্যে চিঠি লেখালেখির অবসর ঘটেনি, তারা পরস্পরকে অসম্পূর্ণ করেই জানে। যেমন বাছুর কাছে গেলে গরুর বাঁটে আপনি দুধ জুগিয়ে আসে তেমনি মনের বিশেষ বিশেষ রস কেবল বিশেষ বিশেষ উত্তেজনায় আপনি সঞ্চারিত হয়, অন্য উপায়ে হবার জো নেই। এই চার পৃষ্ঠা চিঠি মনের যে রস দোহন করতে পারে, কথা কিম্বা প্রবন্ধ কখনওই তা পারে না। আমার বোধ হয় ওই লেফাফার মধ্যে একটি সুন্দর মোহ আছে- লেফাফাটি চিঠি প্রধান অঙ্গ, ওটা একটা মস্ত আবিষ্কার।

কিন্তু মনের বিশেষ রস নিঃসরণের জন্যে বিশেষ পাত্র-পাত্রী চাই, যাকে উপলক্ষ করে রসটি স্বতঃনিসৃত হয়। ১৬ অক্টোবর ১৯৩৩ সালে শ্রীমতী হেমন্তবালা দেবীকে লিখিত পত্রে (পত্র সংখ্যা ১৪২, চিঠিপত্র, নবম খ-) রবীন্দ্রনাথ লিখছেন :

তোমাকে উপলক্ষ্য করে আমি অনেক কথা বলি কিন্তু তোমাকে বলি নে। দেশের অসীম দুর্গতির কথায় মন যখন উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে তখন চুপ করে থাকতে পারি নে।…দেশের জন্যে আমি তোমাকেও ভাবাতে চাই।

বিশ্ব মুসলিম সমাজের সৌভ্রাতৃত্বের তুলনায় হিন্দুজাতের ধর্মে ও নিরর্থক আচারে শতধা বিভক্তির দুর্বলতা এই পত্রের উপজীব্য। এমনি হাজারও বিষয়ে বক্তব্য, মন্তব্য, ভাষা, ব্যাখ্যা উপযোগী কোনও সম্বোধিতকে উপলক্ষ করে কবি হাজারও পত্রে লিখে গিয়েছেন। অবিশ্বাস্য প্রাচুর্যের আধার অজস্র ধারার পত্রাবলীতে রবীন্দ্রনাথ কখনও দেশকে-জাতিকে, কখনও চলমান ক্ষণকে, কখনও সদা সক্রিয় মনকে, কখনও মনের খেয়াল-খুশিকেই বিশ্বস্তরূপে রেকর্ড করে গিয়েছেন।

এবারে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও জনপ্রিয় ছিন্নপত্র প্রসঙ্গ। শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা আটখানি চিঠিসহ, ১৮৮৭-১৮৯৫ সালে শ্রীমতী ইন্দিরা দেবীকে রবীন্দ্রনাথ যে সমস্ত পত্র লিখেছেন, ১৫৩ টি পত্র-সংকলিত গ্রন্থখানি তা থেকে সংকলন। এ সময়ে লিখিত চিঠিপত্র (সব চিঠি নয়) ইন্দিরা দেবী দুটি খাতায় স্বহস্তে নকল করে কবিকে উপহার দিয়েছিলেন। এই খাতা দুটি অবলম্বনে, অনুলেখিকা অথবা পত্রকার স্বয়ং যতটা সঙ্কলন যোগ্য মনে করেছিলেন তাই নিয়ে ১৩১৯ সালে ছিন্নপত্র প্রকাশিত হয়। বহু চিঠিই রবীন্দ্রনাথ তখন গ্রন্থভুক্ত করেননি; অনেক পত্রের কোনও কোনও অংশ সাধারণের সমাদর যোগ্য নয় মনে করেও বর্জন করেন। মূল খাতা-দুখানি অবলম্বনে ১৯৬০ সালে ছিন্নপত্রাবলী নামে যে গ্রন্থখানি প্রকাশিত হয়, তাতে পাওয়া যাবে বর্জিত অনেকগুলি পত্র এবং পত্রাংশ। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Rabindranath Tagore)

সাজিয়া আক্তার, রেসিডেন্সিয়াল এডিটর (বাংলাদেশ), দ্য অফনিউজ:

বলা হয় স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। তাই স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার বিকল্প নেই। না হলে অকালে কঠিন সব রোগে ভুগতে পারেন। তবে ওজন কমাতে গিয়ে বর্তমানে সবাই নানা ধরনের ডায়েট অনুসরণ করেন।

বিশেষ করে ইন্টারনেটে ছড়ানো বিভিন্ন ওজন কমানোর টিপস অনুসরণ করে নিজের অজান্তেই শারীরিক সমস্যা ডেকে আনছেন অনেকেই।

চিকিৎসকদের মতে, ওজন কমানো স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে এটি শরীরের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। সাধারণত শরীরচর্চার সময় শরীরে অনেক চাপ পড়ে।

এক্ষেত্রে অনেকের মধ্যেই দুর্বলতা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই অতিরিক্ত শরীরচর্চার পরামর্শ দেন না কোনও বিশেষজ্ঞরাই।

তাদের মতে, আপনার শরীর যতটা সক্ষম ততটা করুন। তার বেশি নয়। জেনে নিন ওজন কমাতে গিয়ে যেসব বিপদ ডেকে আনছেন-

১. দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা

দ্রুত ওজন কমাতে অনেকে অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতি বেছে নেন। যার মধ্যে আছে এক বেলা না খেয়ে থাকা, অনেকক্ষণ পরপর খাওয়া বা একদমই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেওয়া।

এভাবে অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে খাওয়া দাওয়া করে মেদ কমাতে গিয়ে নিজেরই ক্ষতি করছেন অনেকেই। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে প্রাথমিক পর্যায়ে ওজন কমতে পারে। তবে এতে শারীরিক সমস্যাও বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে শরীরের চর্বির বদলে পেশিও কমতে পারে। পুষ্টিবিদরাও এমনই মনে করেন।

২. অত্যাধিক প্রোটিন কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমাতে গিয়ে সবাই কমবেশি প্রোটিনের উপর ভরসা রাখেন। প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার শরীরের জন্য ভালো ও পুষ্টিকরও। তবে অতিরিক্ত প্রোটিন খেলে অন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। যেহেতু এই খাবারে ফাইবারের অভাব থাকে। তাই প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার প্রায়ই ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে।

৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়

চিকিৎসকের মতে, শরীরে সব ধরনের খনিজ ও ভিটামিন থাকা প্রয়োজন। ওজন কমাতে গিয়ে সবাই খুব কম পরিমাণে খান। এ কারণে শরীর প্রয়োজন মতো পুষ্টি ও ভিটামিন পায় না। ফলে ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হতে শুরু করে। এটি শরীরে বিভিন্ন সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ায়।

৪. পিত্তথলিতে পাথর

যখন খুব কম পরিমাণে খাবার খাওয়া হয় ও পেট দীর্ঘক্ষণ খালি থাকে তখন অবশিষ্ট খাবার ও রস দীর্ঘ সময় ধরে পরিপাকতন্ত্রের মধ্যে থাকে। এই ক্ষুদ্র কণাগুলো একত্রিত হয়ে একটি পাথর তৈরি করে।

এই পাথরের গঠন অনেক জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে, যা পিত্তথলিতে চরম ব্যথা ও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জানা যায়, পিত্তথলির গঠনে অনেক ব্যথা হয়।

৫. চুল উঠতে পারে

ওজন কমাতে গিয়ে সবাই কম ক্যালোরিযুক্ত খাবার খান। আবার অনেকেই কার্বোহাইড্রেট একেবারেই বাদ দেন। তাই ডায়েট চলাকালীন কিছু পুষ্টি, খনিজ ও ভিটামিনের অভাবে চুল পড়তে পারে। এ কারণে নিজের মতো ডায়েট চার্ট বানিয়ে তা অনুসরণ না করে বরং পুষ্টিবিদের পরামর্শ মেনে চলুন।

৬. নিস্তেজ ত্বক

ওজন কমাতে গিয়ে ত্বকের ক্ষতি করে ফেলেন অনেকেই। শরীর সব পুষ্টি সমানভাবে না পেলে ত্বক প্রভাবিত হতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিন ও খনিজের অভাব ব্রণ, নিস্তেজ ত্বক, ব্রেকআউটের কারণ হতে পারে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার ত্বককে সুস্থ রাখে। তাই আপনি ওজন কমাতে চান, তাহলে খাদ্যতালিকায় সব ধরনের পুষ্টি উপাদান অন্তর্ভুক্ত করুন।

(www.theoffnews.com - Bangladesh weight loss)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

আধ্যাত্মিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমি কে? নিজেকে চেনা।

দুই, এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড বা সৃষ্টির কর্তা কে? কি রহস্য।

আধ্যাত্মিকতা মানে বিশেষ কোন অনুশীলন নয়। এটা জীবন যাপনের এক ধরন। সেখানে পৌঁছতে গেলে, অনেক কিছু করার আছে। এটা আপনার বাড়ির বাগানের মতন। যদি মাটি, সূর্যের আলো বা গাছ যেমন তেমন ভাবে থাকে তাহলে ফুল ফুটবে না, আপনাকে সেগুলো নির্দিষ্ট ভাবে রাখতে হবে। যত্ন নিতে হবে। সেরকম ভাবেই আপনি যদি আপনার শরীর, মন, আবেগ, শক্তি এগুলোকে বিশেষভাবে পরিচর্যা করেন তাহলে আপনার মধ্যে আলাদা কিছু একটা প্রস্ফুটিত হবে – সেটাই আধ্যাত্মিকতা। যতক্ষণ আপনার বিচারবুদ্ধি অপক্ক রয়েছে সেটা সবকিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখে। কিন্তু যখনি সেটি পরিণত হয়, তখন সেটি সবকিছুকে এক আলাদা মাত্রায় অনুভব করতে শুরু করে।

যখনই কোনও মানুষ তার নিজের অভিজ্ঞতার  বাইরে বৃহত্তর কিছু অনুভব করেন, সেটাকেই আমরা চিরাচরিত ভাবে ভগবান বলে এসেছি। ভগবানের গোটা ধারণাটাই হল – আপনার চেয়ে বৃহত্তর কিছু। সেটা কোনও মানুষ হতে পারে, অনুভূতি হতে পারে, প্রকৃতির কোনও দিক হতে পারে। কিন্তু এটাকে কি আধ্যাত্মিক বলা যায়? না, এটা স্রেফ জীবন। যখন আমি বলছি ‘স্রেফ জীবন’ আমি কিন্তু ব্যাপারটাকে একেবারেই ছোট করছি না। জীবনই শ্রেষ্ঠতম। কিন্তু একমাত্র যখন আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা বিহ্বলকারী, প্রগাঢ় ও আনন্দময় হয়ে ওঠে, তখনই আপনি এই প্রশ্ন করেন যে এটার সৃষ্টিকর্তা কে।

আপনি যদি জীবনের উৎস বা প্রক্রিয়াকে জানতে চান, তাহলে এটা মানবেন তো যে আপনার নিকটতম সৃষ্টির নজির আপনার নিজের শরীর? এই শরীরে স্রষ্টা বন্দী হয়ে রয়েছে। এটা যেন আপনার নজর এড়িয়ে না যায়। যদি আপনি নিজের মধ্যে সৃষ্টির উৎসর সন্ধান খুঁজে পান, তার মানেই আপনি আধ্যাত্মিক।

ভগবানে বিশ্বাস করা মানেই কি আধ্যাত্মিক হওয়া?

একজন অনীশ্বরবাদী আধ্যাত্মিক হতে পারেন না। একজন ঈশ্বরবাদীও আধ্যাত্মিক হতে পারেন না। এর কারণ হল এই দুজনের মধ্যে তফাৎ নেই। একজন বিশ্বাস করেন ভগবান আছেন, অন্যজন বিশ্বাস করেন ভগবান নেই। সত্য আপনার জানা নেই, এটা স্বীকার করার মতন সততা যদি আপনার না থাকে তাহলে সেটা আপনার সমস্যা। তাই, আদতে এই দুই ধরণের মানুষই এক, কেবল বিশ্বাসের বস্তুগুলো আলাদা। একজন আধ্যাত্মিক মানুষ হল সেই ব্যক্তি যিনি বুঝেছেন যে তিনি সত্য কি তা জানেন না, এবং তাই তিনি অনুসন্ধান করছেন।

কোনও কিছু বিশ্বাস করে নেওয়া মানে আপনি বাকি সবকিছুর থেকে চোখ বন্ধ করে নিলেন। এই গোটা বিশ্বের সমস্যা ভালো-মন্দ নিয়ে নয়, যেটা নাকি প্রচার করা হচ্ছে। সমস্যাটা বিভিন্ন মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে সংঘর্ষ। কোন একটা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকার প্রবণতাটা যত না আধ্যাত্মিক তার চেয়ে অনেক বেশী মনস্তাত্বিক। কোন কিছুকে আঁকড়ে ধরে থাকলে নিরাপদ মনে হয়, মনে হয় আপনি অনেক কিছু জানেন। এটা অত্যন্ত অপরিণত মনের ফল। আপনি যদি সৃষ্টির সম্বন্ধে কিছুই না জানেন তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আদতে আপনি কোনও কিছুই জানেন না। এবং সেটা একটা সুন্দর ব্যাপার! আপনি এটা দেখুন নিজের অন্তরে নিজেকে কিভাবে আনন্দময় করে তুলবেন, যেটা কিনা আপনার হাতে রয়েছে।

আপনি যদি ভাবেন ,জানতে পারেন এই বিশ্ব প্রকৃতির রহস্য সমন্ধে আপনি কিছুই জানেন না, এইটুকু উপলব্ধি মানেই আপনার জ্ঞানের যাত্রা পথ শুরু হয়েছে। দার্শনিক সক্রেটিস অনেক আগে বলে গিয়েছিলেন আমি যে কিছুই জানি না এটাই আমি জানতে পেরেছি, এই অর্থে আমি জ্ঞানী আর যে মনে করে যে অনেক কিছু বুঝে গেছে অর্থাৎ সে বুঝতে পারেনি সে কিছু জানে না অর্থাৎ মূর্খ। এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড এর সাথে আমরা সবাই যুক্ত।

কিন্তু এই যোগকে বুঝতে পারে বা উপলব্ধি করতে পারে সেই হলো আত্ম জ্ঞানী পুরুষ। Unknown god (অচেনা ঈশ্বর)।

একজন প্রশ্ন করেছে, এতো করোনায় মরছে ভগবান কি আদৌ আছে।? What is unknown god? যেটা আমি প্রায় বলি। God is not known to us. Its a belief only। আর যখনই এটা বিশ্বাস করি তার মানেই সন্দেহ আছে। if you have mastery over your mind, means you can fully control your mind। তুমি দুঃখেও ভেঙে পড়ছো না আবার সুখেও উত্তেজিত নও, কিন্তু কুল আছো।

Then you are god। no 2) if cant feel that you are connected with great cosmos then god is unknown to you।

তোমার বা সবার ভিতরেই আছে চৈতন্য। কিন্তু মানুষ ছুঁতে পারে না। যে ছুঁতে পারে সেই ঈশ্বর। আর উপরওয়ালা বলে কিছু নেই, নিচওয়ালা কথাটা অনেক জীবন্ত এবং বাস্তবিক। আমাদের দেশে ভগবান বলতে কোনও অলৌকিক শক্তিকে বোঝায় না।

মানুষই ভগবান কিন্তু খুব কম মানুষ এটা অনুভব করতে পারে বা বুঝতে পারে। গৌতম বুদ্ধের একটা গল্প আছে। এইটা বলা এইখানে প্রাসঙ্গিক। একদিন সকালে এক চার্বাক পন্থী জিজ্ঞেস করলো বুদ্ধকে ঈশ্বর কি আছেন? বুদ্ধ খুব কম কথা বলতেন, উনি বুঝেছিলেন যে এই ব্যক্তি ঈশ্বর বিরোধী।

বুদ্ধ উত্তরে বললেন ঈশ্বর আছে। এইবার ওই দিন  বিকেলে আর একজন ঈশ্বর বিশ্বাসী মানুষ এলেন। উনি বুঝলেন বুদ্ধ হলো আত্ম জ্ঞানী মানুষ উনাকে জিজ্ঞেস করা যাক। জিজ্ঞেস করলেন ঈশ্বর কি আছে। বুদ্ধ হেসে বললেন ঈশ্বর নেই। সবাই অবাক হয়ে গেল কেন বুদ্ধ একই দিনে দুই রকম কথা বললেন। আসলে বুদ্ধ বোঝাতে চেয়েছিলেন  তোমরা অনুসন্ধান করো কেবল বিশ্বাসে থেমে  থেকো না। অর্থাৎ যে মানুষটি বিশ্বাস করে ভগবান নেই আর যে বিশ্বাস করে ভগবান আছে এরা সবাই একই জায়গায় আছে। প্রত্যেকেরই সন্দেহ আছে তাই বিশ্বাস ও অবিশ্বাস এর মধ্যে আছে। ঈশ্বর আছে কিন্তু তোমরা যে ভাবে ঈশ্বরকে দেখতে চাইছো ওই ভাবে কোনও ঈশ্বর নেই। its better to doubt than to belief।

ভিন্ন ভিন্ন পথে খুঁজে নাও। কোনও একটি পথ সত্য নয়। যত মত তত পথ। ওই কারণেই god is unknown। জয়গুরু।আপনি নিজেই একটা ব্রহ্মান্ড আবার অসীম ব্রহ্মান্ড এর অংশ। এই প্রসঙ্গে বিবেকানন্দ খুব সুন্দর বলেছেন, "বার বার আমি মৃত্যুর কবলে পড়িয়াছি। কতবার দিনের পর দিন অনাহারে কাটিয়াছে, কতবার পায়ে নিদারুণ ক্ষত দেখা দিয়াছে, হাঁটিতে অক্ষম হইয়া ক্লান্তদেহে বৃক্ষতলে পড়িয়া রহিয়াছি, মনে হইয়াছে এইখানেই জীবনলীলা শেষ হইবে। কথা বলিতে পারি নাই, চিন্তাশক্তি তখন লুপ্তপ্রায়। কিন্তু অবশেষে ওই মন্ত্র মনে জাগিয়া উঠিয়াছে: আমার ভয় নাই, মৃত্যু নাই; আমার ক্ষুধা নাই, তৃষ্ণা নাই। আমি ব্রহ্ম, আমি ব্রহ্ম। বিশ্ব প্রকৃতির সাধ্য নাই যে, আমাকে ধ্বংস করে। প্রকৃতি আমার দাস। হে পরমাত্মন্, হে পরমেশ্বর, তোমার শক্তি বিস্তার কর। তোমার হৃত রাজ্য পুনরধিকার কর। উঠ, চলো, থামিও না। এই মন্ত্র ভাবিতে ভাবিতে আমি নবজীবন লাভ করিয়া জাগিয়া উঠিয়াছি এবং আজ এখানে সশরীরে বর্তমান আছি। সুতরাং যখনই অন্ধকার আসিবে, তখনই নিজের স্বরূপ প্রকাশ করিও, দেখিবে—সকল বিরুদ্ধ শক্তি বিলীন হইয়া যাইবে। বিরুদ্ধ শক্তিগুলি তো স্বপ্ন মাত্র। জীবন-পথের বাধাবিঘ্নগুলি পর্বতপ্রমাণ, দুর্লঙ্ঘ্য ও বিষাদময় বলিয়া মনে হইলেও এগুলি মায়া ছাড়া আর কিছুই নয়। ভয় করিও না, দেখিবে উহারা দূরে চলিয়া গিয়াছে। নিষ্পেষণ কর, দেখিবে অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে; পদদলিত কর, দেখিবে মরিয়া গিয়াছে। ভীত হইও না। বার বার বিফল হইয়াছ বলিয়া নিরাশ হইও না। কাল নিরবধি, অগ্রসর হইতে থাকো, বার বার তোমার শক্তি প্রকাশ করিতে থাকো, আলোক আসিবেই। জগতে প্রত্যেকের কাছে সাহায্যপ্রার্থী হইতে পারি, কিন্তু তাহাতে কি ফল হইবে? কে তোমাকে সাহায্য করিবে? মৃত্যুর হাত কে এড়াইতে পারিয়াছে? কে তোমাকে মৃত্যু হইতে উদ্ধার করিবে? তোমার উদ্ধার সাধন তোমাকেই করিতে হইবে। তোমাকে সাহায্য করার সাধ্য অপর কাহারও নাই। তুমি নিজেই তোমার পরম শত্রু, আবার তুমিই তোমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। আত্মাকে জানো; উঠো, জাগো; ভীত হইও না। দুঃখ ও দুর্বলতার মধ্যে আত্মাকে প্রকাশ কর,—প্রথমে ইহা যতই ক্ষীণ ও অনুভবের অতীত বলিয়া মনে হউক না কেন। তোমার এমন সাহস হইবে যে, তুমি সিংহগর্জনে বলিয়া উঠিবে: আমিই আত্মা, আমিই ব্রহ্ম। আমি পুরুষ নই, স্ত্রীও নই; দেবতা নই, দৈত্যও নই, কোন প্রাণী বা বৃক্ষাদিও নই। আমি ধনী নই, দরিদ্রও নই, পণ্ডিত নই, মূর্খও নই। আমার স্বরূপের তুললায় এই-সকল উপাধি অতি তুচ্ছ। আমি পরমাত্মা, আমি ব্রহ্ম। ওই যে দেদীপ্যমান চন্দ্র-সূর্য গ্রহনক্ষত্র-নিশ্চয় দেখিতেছে, উহারা আমার প্রভায় উদ্ভাসিত হইয়াই আলোক বিস্তার করিতেছে। অগ্নির যে রূপ, তাহা আমিই; বিশ্বের যে শক্তি, তাহাও আমি, কারণ আমিই পরমাত্মা, আমিই ব্রহ্ম।"

‘আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করিবে, মনন করিবে, নিদিধ্যাসন করিবে।’ হাত যখন কাজ করিবে, মন যেন তখন জপ করিতে থাকে, ‘আমি ব্রহ্ম, আমি ব্রহ্ম।’ যতদিন না এই সত্য তোমার অস্থি-মাংসের সহিত মিশিয়া যায়, যতদিন না তোমার অন্তর হইতে নিজের ক্ষুদ্রতা দুর্বলতা দুঃখ এবং অমঙ্গলের ভয়াবহ স্বপ্ন চিরতরে তিরোহিত হয়, ততদিন জাগরণে ও স্বপ্নে ইহা চিন্তা কর এবং তখনই পরম সত্য তোমার নিকট আর ক্ষণকালও আত্মগোপন করিয়া থাকিবে না।

তথ্য ঋণ-- স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, 'সুবিদিত রহস্য', ২য় খণ্ড, জ্ঞানযোগ-প্রসঙ্গে, জ্ঞানযোগ (বঙ্গানুবাদক: স্বামী শুদ্ধানন্দ)

(www.theoffnews.com - Universal Vivekananda Buddha)

সুকন্যা পাল, ম্যানেজিং এডিটর, দ্য অফনিউজ, কলকাতা:

রোগ দূরীকরণে বাঙালির দাক্ষিণাত্য অভিমান।

এই স্লোগানের পটভূমি যেন ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে। আসলে দিন পাল্টাচ্ছে। পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হচ্ছে ডিজিটাল আবর্তে। বঙ্গবাসীর মানসে আরোগ্য মিথও পরিবর্তন হয়েছে প্র্যাকটিকাল ধারনায়। সুক্ষ্ম লয়ে তাই দক্ষিণ ভারত বা কলকাতা মহানগর যখন দুয়োরানীর ভ্রমে উপেক্ষিত, ঠিক তখনই শিল্পনগর দুর্গাপুর বর্তমানে পাখির পালক ছন্দে হয়ে উঠেছে চিকিৎসার মক্কা মদিনা।

চিকিৎসা জগৎ বলতে আজ দুর্গাপুরের জয়গান বাঙালির মুখে মুখে অন্তরে অন্তরে। এই স্তুতির প্রজ্জ্বলিত শিখাকে আরও উজ্জ্বলিত করে তুলেছেন প্রখ্যাত নেফ্রোলজিস্ট রাহুল কাঞ্জিলাল। একক মুন্সিয়ানায়। এমনকি স্বীয় দক্ষতায়।

বছর পঁয়তাল্লিশের ধারেপাশের এই ফর্সা সুপুরুষ চিকিৎসক রাহুল কাঞ্জিলাল আজ যেন রোগীর কাছে পরম ত্রাতাসম। শুধুই বাংলা নয়, পার্শবর্তী বিহার ও ঝাড়খণ্ডের রোগগ্রস্থ মানুষের ঢল যেন আজ এই নেফ্রোলজিস্টের চেম্বার অভিমুখে। সম্প্রতি তিনি দুর্গাপুরের হেলথ ওয়ার্ল্ড হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত।

নেফ্রোলজিস্ট রাহুল কাঞ্জিলালের তত্ত্বাবধানে চলা উক্ত হাসপাতালের অভ্যন্তরে একটি বিশেষ ইউনিটও ইদানিং বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে জনমানসে। এগারো শয্যা বিশিষ্ট এই ইউনিটে পঁচিশ সদস্যের একটি পরিষেবা দল কাজ করে চলেছে ননস্টপ দিবারাত্র।

রাজ্যের বিভিন্ন স্থানের ও কাছাকাছি বিভিন্ন হাসপাতালও বেগতিক বুঝলে তাঁদের রোগীকে পরামর্শ দেন রাহুলবাবুর সকাশে যেতে। তবে যাঁকে ঘিরে এই জন-উন্মাদনা সেই রাহুলবাবু বলেন, "আমি চিকিৎসা করি রোগীর অন্তরের আত্মীয় হয়ে। চেষ্টা করি আমার সবটুকু উজাড় করে দিতে প্রতিটি রোগীর কাছে। তাঁদের আরোগ্য হওয়া যে আমার ঈশ্বর প্রাপ্তি।"

এইতো সম্প্রতি রাহুলবাবুর কাছে চিকিৎসা করাতে ধানবাদ থেকে এসেছিলেন মনীশ ঝাঁ। তাঁর মতে, "আমি তো জীবনে বেঁচে থাকার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। এক পড়শির মুখে শুনে রাহুল স্যারের কাছে যাই। উনার চিকিৎসায় আজ আমি সুস্থ। চিকিৎসক জীবনে অনেক দেখেছি। কিন্তু নেফ্রোলজিস্ট রাহুল কাঞ্জিলাল যেন প্রকৃতই কর্মে ও ব্যবহারে ভগবান তুল্য।" 

(www.theoffnews.com - nephrologist)

কাজী নূর, কবি, সাহিত্যিক ও ফিচার রাইটার, বাংলাদেশ:

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া সরু লম্বাটে আকৃতির ছাতিম গাছকে অঞ্চল ভেদে ছাইতান, ছয়তাইন্যা, ছাতিয়ান, ছাইত্তান, ছাইত্তান্না বা ছাতিম নামে ডাকা হয়। একটা সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে কমবেশী ছাতিম গাছের দেখা মিলতো। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে ছাতিম গাছ এখন বিলুপ্ত প্রায়। দুর্লভ ছাতিম গাছের রয়েছে নানা ঔষধি গুণ। এ গাছের ছাল এবং আঠা জ্বর, হাঁপানি, কুষ্ঠ, চর্ম ও আমাশয় রোগ নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকরী। ছাতিম গাছের ছালের নির্যাস উচ্চ রক্তচাপ এবং ক্যান্সারের ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ছাতিম ফুলের গুড়ো ও পিপুলের গুড়ো দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট দূর হয়। ছাতিমের ছাল সেদ্ধ করা পানি মুখের অরুচি ও জ্বর দূর করে। ছাল সেদ্ধ করা পানি কুসুম গরম দুধে মিশিয়ে খেলে মুত্ররোগ দূর হয়। ছাতিম থেকে হারবাল, হোমিওপ্যাথি ঔষধ তৈরী করা হয় যা আমাশয়, উদরাময় এবং রক্তশূন্যতা রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। ছাতিমের ছাল ভালো করে সেদ্ধ করে পানি ও দুধ একসাথে মিশিয়ে খেলে মায়েদের বুকের দুধ বাড়ে।

চিরসবুজ ছাতিম গাছের কাণ্ডগুলো ছাতার মতো বেষ্টিত হয়ে থাকে এজন্য এ গাছটির নাম ছাতিম হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। একসঙ্গে সাতটি দৃষ্টিনন্দন পাতা যুক্ত থাকায় ছাতিমকে সংস্কৃত ভাষায় 'সপ্তপর্ণ' বা ‘সপ্তপর্ণী’ উদ্ভিদ বলে। ছাতিম ফুল ফোটে হেমন্তের শুরুতে এবং তা থাকে শীতের মধ্যভাগ পর্যন্ত। এমন সময়ে ফোটার কারনে ছাতিম ফুলকে অনেকে 'হেমন্তের উপহার' বলে থাকেন। এ মৌসুমে গোটা গাছে সাদা এবং বড় বড় গুচ্ছ ফুলে ছেয়ে যায়। হেমন্তের সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি ছাতিম ফুল তীব্র মিষ্টি গন্ধ ছড়ায়। ছাতিম ফুলের মাদকতাময় মিষ্টি সুবাসে মোহাবিষ্ট হয়নি এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। শীতের শেষে ছাতিম গাছে লম্বাটে আকৃতির ফল বা বীজ ধরে। 

বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনাম ছাতিম গাছের আদি নিবাস। ছাতিম গাছের ছালের ভেতর অংশ সাদা এবং উপরটা ধূসর খসখসে। এ গাছের অভ্যন্তরে দুধের মতো সাদা এবং অত্যন্ত তেতো কষ বা আঠা থাকে। ছাতিম কাঠ নরম এবং সাদা রঙের। এর কাঠ থেকে জ্বালানী, চায়ের পেটি, হালকা মানের আসবাব, দেশলাইয়ের কাঠি, চামচ, ব্লাকবোর্ড, পেন্সিল এবং কফিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ছাতিম গাছকে ইংরেজিতে ডেভিল’স ট্রি (Devil’s tree) বলা হয়। যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ভূতের গাছ।

ছাতিম ফুল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ফুলগুলোর মধ্যে একটি। হয়তো এজন্যই রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, 'ঊষার ছোঁওয়া জাগায় ওরে/ছাতিমশাখে পাতার কোলে'। শান্তি নিকেতনে সমাবর্তনের সময় কবিগুরু প্রথমে উপহার দিতেন ছাতিম পাতা। বাংলাদেশের প্রয়াত বিজ্ঞান লেখক, বৃক্ষাচার্য, অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা তার 'শ্যামলী নিসর্গ' নামক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ছাতিমই বোধহয় একমাত্র বৃক্ষ যে হেমন্তের অঙ্গনে দাঁড়িয়ে প্রস্ফুটন আর সুগন্ধের পল্গাবনে এই দুরন্ত শীতকে অভ্যর্থনা জানায়।

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং। ছাতিম গাছের ছবিটি চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত যশোর প্রাঙ্গণ থেকে তোলা।)

(www.theoffnews.com - Bangladesh Devil's tree)

(www.theoffnews.com - Auckland lockdown New Zealand Jacinda Ardren)
 

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

এদিকে এই পৃথিবীও বিপন্ন হয়ে উঠল। শতবর্ষব্যাপী অনাবৃষ্টিতে পৃথিবীর নদ-নদী, জলাশয় এমনকী কুয়ো পর্যন্ত শুকিয়ে গেল। অবস্থা দেখে শান্তচিত্ত ব্রাহ্মণরাও তপস্যা আরম্ভ করলেন শিবা-ভবানীর। দেবতা-ব্রাহ্মণদের স্তব এবং করুণ তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেবী শক্তি এক অদ্ভুতরূপে তাঁদের সামনে আবির্ভূত হলেন। দেখা গেল— তাঁর অনত্ত চক্ষু, নীল পদ্মের পাপড়ির মতো টানা টানা শত শত আঁখিপাতে জল নিয়ে তিনি দেখা দিলেন—

অনন্তাক্ষিময়ং রূপং দর্শয়ামাস পার্বতী।

নীলাঞ্জনসমপ্রখ্যং নীলপদ্মায়তেক্ষণম্।।

তিনি চতুর্ভুজা মুর্তিতে ডান দিকের অধোহস্তে অনেকগুলি বাণ মুষ্টি পাকিয়ে ধরে আছেন, আর ডাইনে ওপরের হাতে পদ্ম। বাম দিকে ওপরের হাতে পুষ্প-পল্লব, ফল-মূল-শাক, আর বাম দিকের নীচের হাতটিতে ধনুক। এই অদ্ভুতরূপে সবার সামনে আসার পর তাঁর অনন্ত সংখ্যক চক্ষু দিয়ে বৃষ্টির ধারার মতো জল গড়াতে শুরু করল। তাতে পৃথিবীর সর্বস্থানে নয় দিন ধরে নিরন্তর বহুল বৃষ্টিপাত হল। নদ-নদী-কূপ-তড়াগ ভরে উঠল জলে। দেবতারা, মানুষেরা যে যেখানে আত্মগোপন করেছিল সবাই বেরিয়ে এসে দেবীর স্তব করতে করতে বললেন— আপনি যখন আমাদের এই অনাবৃষ্টির ভয় নিবারণ করার জন্য নিজ শরীরে শত শত অক্ষি (চক্ষু) ধারণ করেছেন, তাই আপনি শতাক্ষী নামে বিখ্যাত হবেন—

অস্মচ্ছান্ত্যর্থমতুলং লোচনানাং সহস্রকম্।

ত্বয়া যতো ধৃতং দেবি শতাক্ষী ত্বং ততো ভব।।

দেবতারা-ব্রাহ্মণেরা এবার মহাদেবীর স্তব করতে করতেই তাঁকে বললেন— আমরা খাবারদাবার পাইনি এতকাল, তাই ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর, আমাদের ভালো করে স্তব করার শক্তিটুকু পর্যন্ত নেই। হে অম্বিকে, হে মহেশানী! আপনি নিজগুণে কৃপা করে বেদের উদ্ধার সাধন করুন। দেবতা-ব্রাহ্মণদের মুখে এত করুণ আর্তি শুনে মহেশানী অম্বিকা তাঁর নিজের হাতে ধরে থাকা ফলমূল এবং শাক অর্থাৎ শক্তিদায়ী নানাপ্রকারের উদ্ভিদ দেবতা এবং মানুষদের দান করলেন। যতদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে নতুন শস্য-শাকের উৎপত্তি না হলো, ততদিন সেই দেবী সমস্ত মানুষকে আহারের উপযোগী নানা রস-সমৃদ্ধ খাদ্য এবং পৃথিবীর সমস্ত পশুদের ঘাস পাতার জোগান দিলেন তিনি। এই শাকান্ন দানের ফলেই মহেশানীর নতুন আর একটি নাম হল শাকম্ভরী—

নানাবিধানি চান্নানি পশুভোজ্যানি যানি চ।

কাম্যানন্তরসৈর্যুক্তান্যানবীনোদ্ভবং দদৌ।

শাকম্ভরীতি নামাপি তদ্দিনাং সমভূন্নৃপ।।

এইভাবে বৃষ্টি এবং পুষ্টিদায়ক খাদ্যলাভের পর দেবতা-মানুষ সকলের মধ্যে যখন আনন্দ-কোলাহল তৈরি হলো, তখন দূতের মুখে সব খবর পেলেন দুর্গমাসুর। দেবতাদের ওপর এবং ব্রাহ্মণদের ওপর শরবর্ষণ করতে আরম্ভ করলো। দেবী শতাক্ষী এই অবস্থায় চতুর্দিকে একটি তেজোময় বলয় তৈরি করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের প্রাথমিক সুরক্ষা প্রদান করলেন। তাঁর শরীর থেকে বেরিয়ে এলেন বহুতর শক্তি মুর্তি— কালী, তারা, মাতঙ্গী, মোহিনী, ছিন্নমস্তা এবং দশমহাবিদ্যা-সহ আরও অনেক শক্তি মুর্তি। দুর্গমাসুর এবং তাঁর সৈন্যবাহিনী দশ দিন ধরে যুদ্ধ করলেন মহাশক্তির বিভিন্ন রূপের সঙ্গে। দুর্গমাসুরের সৈন্যক্ষয় হয়ে গেল দশ দিনের মধ্যেই। এবার দুর্গমাসুর এলেন যুদ্ধ করতে, অন্যদিকে উপস্থিত হলেন মহাদেবী স্বয়ং। ভীষণ যুদ্ধ হলো দেবী এবং দৈত্যের। অবশেষে মারা গেলেন দুর্গম দৈত্য। ব্রহ্মাদি সমস্ত দেবতারা দেবী অম্বিকার স্তব করলেন। পরমতুষ্টা দেবী দেবতাদের কল্যাণ কামনা করে বললেন— দুর্গমাসুরকে আমি হত্যা করেছি বলে আজ থেকে আমার নাম হলো দুর্গা। এই দুর্গা নাম এবং শতাক্ষীর নাম যে গ্রহণ করবে, সে সমস্ত সাংসারিক মায়া জয় করতে পারবে—

দুর্গমাসুরহন্ত্রীত্বাদ্ দুর্গেতি মম নাম যঃ।

গৃহ্নাতি য শতাক্ষীতি মায়াং ভিত্ত্বা ব্রজত্যসৌ।।

শতাক্ষী, শাকম্ভরী, দুর্গা— এই তিনটি স্বরূপই ভগবতী মহাশক্তির কার্যভেদে তিনটি নাম; স্বরূপত তাঁদের মধ্যে কোনও ভেদ নেই বলেই দেবীভাগবতের টীকাদার শৈব নীলকণ্ঠ লিখেছেন— এখানে শতাক্ষী, শাকম্ভরী এবং দুর্গা— দেবতাদের যেহেতু এই তিন রূপে তিনি জলদান, অন্নদান এবং দৈত্যবধের উপকার সাধন করেছিলেন, তাই তিনটি হলো মহাদেবীর কর্মভেদ মাত্র এবং কর্মভেদের জন্যই তাঁর নামেও ভেদ হয়েছে, কিন্তু এগুলি তাঁর অবতার-ভেদ নয়।

দেবী ভাগবতের টীকাদার শৈব নীলকণ্ঠের কণ্ঠলগ্ন হয়েই আমরা দুর্গা নামের বহুল ব্যবহার এবং জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে একটা সিদ্ধান্ত শোনাতে চাই। খেয়াল করে দেখুন, নীলকণ্ঠ দুর্গার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন শতাক্ষী-শাকম্ভরীর পরিণতি হিসেবে, আরও লৌকিক এবং জড়দৃষ্টিতে জলদান, অন্নদানের পর সেই অন্নপানে বাধা সৃষ্টিকারী অসুরনাশের পরিণতিতে। এর অর্থ মানুষের যত দুর্গতি হয় জলাভাবে খাদ্যশস্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায়, যে দুর্গতি হয় অনাহারে, অর্ধাহারে অথবা যে দুর্গতি তৈরি করে জাত বৈরী শত্রুরা, সেই দুর্গতি শতাক্ষীর করুণাঘন নয়নাশ্রু বৃষ্টিধারায় সিঞ্চিত করে, নতুন শস্য না ওঠা পর্যন্ত ফল-মূল-শাকম্ভরীর ক্ষুধার অন্ন দান করে— আনবীনোদ্ভবং দদৌ— অবশেষে অন্নপানের বাধাসৃষ্টিকারী দুর্গতির মূর্ত স্বরূপ দুর্গাসুরকে বধ করে দেবী হলেন দুর্গা— দুর্গা দুর্গতিনাশিনী।

আমরা এখানেই যেন বুঝতে পারছি যে, দুর্গ বা দুর্গম কোনও অসুর বা দৈত্য নন, আমাদের জীবন ধারণের যত দুর্গতি— যে দুর্গতি আমরা রোধ করতে পারি না, আমাদের কাছে যেটা দুর্গম, অসাধ্য, সেই দুর্গতিই আসলে দুর্গাসুর অথবা দুর্গম দৈত্য এবং সেই দুর্গতি নিঃশেষে যিনি দূর করে দেন, তিনিই দুর্গা। লক্ষণীয়, এই দুর্গাসুরের মধ্যেই মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর শুম্ভ-নিশুম্ভ-কাহিনীর রসাভাস আছে, আবার এই দুর্গার মধ্যেই মহিষাসুর-নিধন কালে হস্তী থেকে মহিষ, মহিষ থেকে পুনরায় অসুরের যোদ্ধা বেশের আরোপন ঘটেছে। এই দুর্গার মধ্যেই মহিষাসুরমর্দিনী চণ্ডীকার মতোই অন্যান্য শক্তি দেবতার উৎসারণ ভূমি। ফলত দুর্গতিনাশিনী দুর্গাই পরবর্তীকালে অন্যান্য শক্তি দেবতার, বিশেষত শরৎকালীন মহিষাসুরমর্দিনী চণ্ডীরও নামান্তর হয়ে উঠেছেন।

দুর্গা কি মাত্রিকা শক্তি  কালীর বিবর্তনের

পথ ধরে এসেছে। কারণ শক্তির আদি রূপ হলো

অব্যক্ত অদ্যাশক্তি কালী। দেবী কালী রূপে পূজিত

হলেও তাঁর রূপ দুর্গা কালী রূপী।

চিৎপুরের দুর্গা মন্দির এই কথারই সাক্ষ্য দেয়। (সমাপ্ত)

(www.theoffnews.com - name Durga)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

শব্দকল্পদ্রুমে দুর্গা শব্দটার প্রধান অর্থ প্রকাশ করা হয়েছে বর্ণ ভেঙে প্রত্যয় যুক্ত করে। সমস্ত প্রকার দুর্গতি নাশের এই অর্থ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লিখিত হয়েছে। আরও লক্ষণীয়, মহাভারতে অজ্ঞাতবাসের জন্য বিরাট নগরে প্রবেশ করার আগে সমস্ত বিপদ থেকে মুক্তি পাবার জন্য পাণ্ডবরা যে শক্তি-দেবতার স্তুতি করলেন— তিনি কিন্তু দুর্গা— অগমন্মনসা দেবীং দুর্গাং ত্রিভুবনেশ্বরীম্। যুধিষ্ঠির-কৃত এই দুর্গাস্তুতির মধ্যে দেবীর সমস্ত রূপেরই বর্ণনা আছে প্রায়। এই বর্ণনার ক্রমে যখন দুর্গার নামটি এসেছে, তখন যুধিষ্ঠির বলেছেন— তুমি সমস্ত বিপদ-আপদ-ভয় থেকে ত্রাণ করো বলেই তোমাকে লোকে দুর্গা বলে। যারা অরণ্য-কান্তারের মধ্যে পথ হারিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, যারা মহাসমুদ্রে মগ্ন হয় (সংসার-সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে), দস্যুরা যাঁদের বন্দি করেছে— তাদের সকলের গতি তুমি। এমন সংকটাপন্ন অবস্থাতেও যদি তোমাকে কেউ স্মরণ করে, তারা কিন্তু আর বিপন্ন হয় না—

দুর্গাত্তারয়সে দুর্গে তস্মাদ্ দুর্গা স্মৃতা জনৈঃ।

দুর্গ বা বিপদ থেকে ত্রাণ করেন বলেই তাঁর নাম দুর্গা— মহাভারতের এই কথাটার প্রতিধ্বনি আছে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে এবং মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে। ব্রহ্মবৈবর্তে তিনি ‘দুর্গে দুর্গতিনাশিনী’। দুর্গানাম স্মরণ করলেই তিনি দুর্গতি থেকে ত্রাণ করেন—

নারায়ণি মহাভাগে দুর্গে দুর্গতিনাশিনি।

আর দুর্গাসপ্তশতী চণ্ডীতে স্তুতি করে বলা হচ্ছে— হে দেবী! তুমি আমাদের সকল ভয় থেকে পরিত্রাণ করো, তাই দেবী দুর্গা হে! তোমাকেই প্রণাম করছি—

ভয়েভ্যস্ত্রাহি নো দেবি দুর্গে নমো’স্তুতে।

দুর্গার এই রক্ষাদায়িনী, ত্রাণকারিণী ভূমিকা থেকেই সেকালে রাজারা শত্রুর পক্ষে অভেদ্য যে দুর্গগুলি তৈরি করতেন, সেই দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হিসেবে দুর্গার মুর্তি প্রতিষ্ঠা করতেন। দুর্গা হলো বিপদ তারিণী মাতা। ফলত একটি অভেদ্য, দুরধিগম্য দুর্গ যেভাবে রাজাকে সুরক্ষা দেয়, সেই দুর্গের ভাবনা থেকেই দুর্গার সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকেই ধারণা করেন। দেবী পুরাণে দেবী দুর্গাকেই দুর্গের রক্ষাকর্ত্রী দুর্গেশ্বরী বলে সম্বোধন করা হয়েছে এবং রাজা-রাজরাদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, দুর্গগুলিতে তাঁরা যেন মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার মূর্তি স্থাপন করেন— কেননা দুর্গের মধ্যে অবস্থিত হয়েই তিনি পরাক্রম দেখান—

দুর্গা এইখানে পাহারাদার। যে দুর্গকে রক্ষা করে সেই দুর্গা।

ত্বং হি দুর্গে মহাবীর্যে দুর্গে দুর্গপরাক্রমে।

দেবীভাগবত পুরাণে দুর্গ শব্দটি ব্যবহার না করে বহুদুর্গসমন্বিত কাশী নগরীর উল্লেখ করে বলা হয়েছে— দেবী দুর্গা যেন নগরে স্থিত হয়ে নগরকে রক্ষা করেন। কাশীর রাজা সুবাহু দুর্গার কাছে প্রার্থনা জানিয়ে বলছেন— আপনি সেই পরমা শক্তি। আপনি দুর্গা দেবী নামে বিখ্যাত হয়ে সব সময় এ বারাণসী নগরীতে অবস্থান করবেন এবং চিরকাল রক্ষা করবেন এই বারাণসী নগরীকে—

নগরে’ত্রত্বয়া মাতঃ স্থাতব্যং মম সর্বদা।

দুর্গাদেবীতি নাম্না বৈ ত্বং শক্তিরিহ সংস্থিতা।।

দেবীভাগবত পুরাণের এই শ্লোকটিতে যে নগরী শব্দটি বলা হলো, এই নগরী, নগর, পুরী আসলে দুর্গেরই নামান্তর। এটা বোঝা যাবে সপ্তাঙ্গ রাষ্ট্রের সাতটি অঙ্গের মধ্যে অন্যতম অঙ্গ দুর্গকে অনেকেই ‘পুর’ বলে অভিহিত করেছেন। স্বয়ং মনুই বলেছেন পুর। কিন্তু দুর্গ তৈরি করার সঙ্গে নগর-নির্মাণের একটা বড় সম্বন্ধ আছে বলেই কৌটিল্য দুর্গ নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গেই নগর নির্মাণের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। ফলে দেবীভাগবতে দেবী দুর্গাকে বারাণসী নগরীর রক্ষাকর্ত্রী বা পালিকা হিসেবে দেখতে চাইছেন রাজা, সেটা আসলে বারাণসীর দুর্গপালিকার কথা।

যে বারাণসী নগরীতে নগরপালিকা হিসেবে দুর্গার কথা বলা হলো, বারাণসী বা কাশীর সুরক্ষা নিয়ে স্কন্দপুরাণের কাশীখণ্ডে স্বয়ং মহাদেব তাঁর পরিচর নন্দীকে আদেশ দিয়ে বলছেন— কাশী নগরী রক্ষার জন্য প্রতিটি দুর্গে দুর্গামূর্তি স্থাপন করো—

প্রতিদুর্গং দুর্গারূপাঃ পরিতঃ পরিবাময়।

প্রভু মহাদেবের আদেশ পেয়ে নন্দীও প্রতিটি দুর্গে দুর্গামূর্তি স্থাপন করেছেন—

আহূয় সর্বতো দুর্গাঃ প্রতিদুর্গং ন্যবেশয়ৎ।

রাজা-রাজরাদের দুর্গের মধ্যে দুর্গামূর্তি প্রতিষ্ঠা করার এই পৌরাণিক নির্দেশ কিন্তু এমন একটা ইঙ্গিত দেয় যে, দুর্গরক্ষিণী দেবী হিসেবেই দুর্গার প্রথম রূপকল্পনা হয়েছিল।

দুর্গা নামের আর একটি অন্যতম প্রসিদ্ধ উৎস হল—মহাশক্তিরূপিণী দেবী দুর্গম বা দুর্গ নামে এক অসুরকে বধ করেছিলেন বলেই তাঁর নাম হয়েছে দুর্গা। দেবীভাগবত পুরাণ এবং স্কন্দ পুরাণের কাশী খণ্ডে এই দুর্গ বা দুর্গমাসুর বধের কাহিনি বিবৃত হয়েছে— যদিও স্কন্দপুরাণের কাহিনিতে দুর্গাসুরের সঙ্গে মার্কণ্ডেয় পুরাণের শুম্ভ-নিশুম্ভ দৈত্যের ব্যবহারিক মিল পাওয়া যায় কিছু; আর দেবীভাগবতের কাহিনিতে দুর্গার সঙ্গে শতাক্ষী এবং শাকম্ভরী দেবীর একটা পর্যায়ক্রমিক একাত্মতা তৈরি হয়।

দেবীভাগবত পুরাণে দুর্গম বা দুর্গ দৈত্যের বধ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং তা দুর্গতিনাশের একটি ক্রমিক পর্যায় হিসেবে এসেছে বলে অসুর বধের চাইতেও এখানে দুর্গার দুর্গতিনাশিনী ভূমিকা বড়ো হয়ে ওঠে। এখানে রুরুদৈত্যের ছেলে দুর্গম দৈত্য মনে মনে এটা আগে বুঝে নিলেন যে, দেবতারা আসলে বেদের ওপর বেঁচে আছেন। ব্রাহ্মণরা বেদবিহিত যজ্ঞকর্মাদি করে দেবতাদের বল-শক্তি বাড়িয়ে দেন। ব্রাহ্মণরা যজ্ঞে ঘি ঢালেন, সেই ঘি খেয়ে দেবতারা পুষ্ট হন এবং তাঁরা অসুরদের বিনাশ করেন। কিন্তু এই সমস্ত প্রক্রিয়ার উপাদান এবং উৎস যেহেতু বেদ, অতএব বেদকেই যদি অবলুপ্ত করে দেওয়া যায় তাহলেই দেবতাদের বিনাশ ঘটবে— এই ভাবনা নিয়ে দুর্গম দৈত্য ব্রহ্মার তপস্যা আরম্ভ করলেন। তপস্তুষ্ট ব্রহ্মা বর দিতে চাইলে দুর্গম সকাতরে বললেন— এই তিন ভুবনে দেবতা এবং ব্রাহ্মণদের কাছে যে বেদমন্ত্র আছে, সেগুলি আওমস্ত আমার কাছে থাকবে আর আপনি আমাকে এমন শক্তি দিন, যাতে আমি দেবতাদের পরাজিত করতে পারি—

ত্রিষু লোকেষু যে মন্ত্রা ব্রাহ্মণেষু সুরেষ্বপি।।

বিদ্যন্তে তে তু সন্নিধ্যং মম সন্তু মহেশ্বর।

বলঞ্চ দেহি যেন স্যাদ্দেবানাঞ্চ পরাজয়ঃ।।

ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে ‘তথাস্তু’ বলে চলে গেলেন বটে, কিন্তু সেই থেকে ব্রাহ্মণেরা বেদমন্ত্রে বিস্মৃত হলেন। স্নানাচিহ্ন, যজ্ঞ-জপ, শ্রাদ্ধ-হোম— সব বন্ধ হয়ে গেল। দেবতারা আর যজ্ঞে আহূত হন না, তাঁদের অন্ন-পান বন্ধ হয়ে গেল, শরীর হয়ে উঠল নিস্তেজ। এই অবস্থায় দুর্গম দৈত্য স্বর্গ অধিকার করে নিলেন। দুর্গমাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করার কোনও শারীরিক ক্ষমতাই তাঁদের রইল না। দেবতারা স্বর্গ থেকে পালালেন। নিরুপায় হয়ে তাঁরা আশ্রয় নিলেন হিমালয় পর্বতের গিরিগুহায় এবং অবশেষে পর্বতসানুতে বসে জগদম্বিকা শিবার ধ্যানে মগ্ন হলেন। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - name Durga)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

পৌরাণিক ইতিহাস গবেষক নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুরী বলছেন, "দুর্গা নামটি বঙ্গদেশীয় শরৎকালীন দুর্গাপূজার সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িয়ে আছে বলেই প্রাথমিকভাবে আমাদের বলতে হচ্ছে যে, দুর্গাপূজার সময় আমরা যে মহিষাসুরমর্দিনীদেবীর পূজা করি, তিনি যতখানি দুর্গা, তার থেকে অনেক বেশি চণ্ডী বা চণ্ডিকা"।

এমন কি কালীর ও চন্ডী রূপ আছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ পাঠের শুরুতে তাই ‘নম চণ্ডী’র গান অথবা ‘নমশ্চণ্ডিকায়ৈ’ মন্ত্র।

দুর্গ, মতান্তরে দুর্গম নামক একটি অসুরকে শক্তিরূপিণী দেবী বধ করেছিলেন, তিনিই দুর্গা নামে কথিত হন। অন্যমতে যিনি দুর্গা উনি কালী। মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা এবং দুর্গাসুর বা দুর্গমাসুরনাশিনী দুর্গা মূল শক্তিস্বরূপে এক এবং অভিন্না হলেও তাঁরা লীলাভেদে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। এঁদের দুজনের আবির্ভাবের কাল, অসুরবধের লীলাস্থল এবং তাঁদের কাজও আলাদা আলাদা।

মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার আবির্ভাবের সময় হলো স্বায়ম্ভুব বা প্রথম মন্বন্তর, লীলাস্থল হিমালয় পর্বত এবং তার সানুদেশ, আর তাঁর কাজ মহিষাসুর বধ। আর দুর্গমাসুরনাশিনী দুর্গার আবির্ভাব-কাল বৈবস্বত মনুর কাল অর্থাৎ সপ্তম মন্বন্তর, তাঁর লীলাস্থল বিন্ধ্য পর্বত, এবং তাঁর কাজ দুর্গমাসুর নিধন করা বা দুর্গাসুর বধ। শেষোক্ত দুর্গাসুরনাশিনী দুর্গার সঙ্গে শক্তিদেবীর অন্য রূপ শাকম্ভরী, শতাক্ষীর গভীর যোগ আছে। আর আমরা বঙ্গদেশে শরৎকালীন যে দুর্গাপূজা করি, সেটি আসলে মহিষাসুরমর্দিনী চণ্ডীর পূজা— যা খুব সরলভাবে দুর্গাপূজা বলেই বিখ্যাত হয়েছে। তবে এই বিখ্যাত হবার কাজটাও আজকে হয়নি। কেন না বঙ্গদেশে দুর্গাপূজার সময় মার্কণ্ডেয় পুরাণের সাতশো শ্লোকের যে অংশটা আমরা মার্কণ্ডেয় চণ্ডী বা ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’ নামে পাঠ করি, সেই চণ্ডী কিন্তু অনেক আগে থেকেই দুর্গা-সপ্তশতী নামে পরিচিত, যার অন্য নাম দেবীমাহাত্ম্য কিংবা সপ্তশতী চণ্ডী। ইনি চন্ডী বা দুর্গার চন্ডী রূপ।

তবে দুর্গানামটি শক্তিরূপিণী দেবীর একটি সাধারণ নাম হিসেবে প্রচলিত হওয়ার রহস্যটা ওই দুর্গা নামের মধ্যেই নিহিত আছে। বস্তুত মানুষের মনের মধ্যে অহরহ বিপদ-মুক্তির যে প্রার্থনা থাকে, সেখানেই দুর্গা নামের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়ে যায়। ‘দুর্গ’ শব্দের সাধারণ অর্থই হল সংকট, বিপদ। যে কোনওরকম বিপদ বা দুর্গ থেকে যিনি ত্রাণ করেন, তিনিই দুর্গা। এই ভয়, সংকট বিপন্নতা— যা দুর্গ শব্দের অর্থ— সেগুলি, তৎকালীন সামাজিক পরিস্থিতিতে কেমন ছিল, তার একটা বিবরণ দিয়ে ‘শব্দকল্পদ্রুম’ বলেছে— দুর্গ শব্দের অর্থ যেমন দৈত্য অর্থাৎ সেই দুর্গাসুর যেমন হতে পারে, তেমনই দুর্গ-শব্দের অর্থ মহাবিঘ্ন, দুর্গ মানে এই সংসারের মায়ার বাঁধন বা ভববন্ধন এবং দুর্গ মানে কুকর্ম—

দুর্গো দৈত্যে মহাবিঘ্নে ভববন্ধে কুকর্মণি।

মহাবিঘ্ন এবং ভববন্ধন থেকে মুক্তি পাবার জন্য দুর্গাকেই তো চিহ্নিত করা হয়েছে মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর মধ্যেই। এখানে দেবস্তবে বলা হয়েছে— তুমি দুর্গা, এই দুস্তর (দুর্গ) ভবসাগর পার হবার নৌকা হলে তুমি—

দুর্গাসি দুর্গভবসাগর-নৌরসঙ্গা

এই শ্লোকের পরে পরেই দেবতারা আবার বলছেন— হে দুর্গা, তোমাকে স্মরণ করা মাত্রই তুমি সমস্ত প্রাণীর ভয়ভীতি হরণ করে থাকো—

দুর্গে স্মৃতা হরসি ভীতিমশেষজন্তোঃ

এই শ্লোকের ‘দুর্গে’ শব্দটিকে সম্বোধন পদ হিসেবে না ধরে দুর্গ শব্দের সাধারণ অর্থ করলে মানে দাঁড়াবে— বিপদে-আপদে তোমার নাম স্মরণ করলেই তুমি সমস্ত প্রাণীর বিপদের ভয় দূর করে দাও।

দুর্গ শব্দের অর্থ মহাবিঘ্ন ধরে নিয়েই শব্দকল্পদ্রুম দুটি-তিনটি শ্লোক উদ্ধার করে বলেছে— দুর্গ শব্দের অর্থ মহাবিঘ্ন, সংসার-বন্ধন, কুকর্ম, শোক, দুঃখ, নরক, পরলোকে যমদণ্ডের ভয়, পুনর্জন্মের ভীতি, মহাভয়, অতিরোগ ইত্যাদি। আর এই মহাভয়াত্মক দুর্গ শব্দটির সঙ্গে ‘আ’ বর্ণটি ব্যবহৃত হয় হন্তা বা ‘নাশ করা’ অর্থে অর্থাৎ দুর্গ বা মহাভয়-বিঘ্নকে যিনি নাশ করেন, হত্যা করেন, তিনিই দুর্গা—

দুর্গে দৈত্যে মহাবিঘ্নে ভববন্ধে কুকর্মণি।

অন্য আর একটি পরম্পরাপ্রাপ্ত শ্লোকে দুর্গা শব্দের বর্ণবিভাগ করে শব্দকল্পদ্রুম জানিয়েছে— দুর্গা শব্দে ‘দ’ বর্ণটি ব্যবহার করা হয়েছে, যেহেতু তিনি দৈত্য নাশ করেন, উ-কার ব্যবহৃত হয়েছে বিঘ্ন নাশ করেন বলে, আর এখানে রেফ বা র-বর্ণের অর্থ তিনি রোগ নাশ করেন, আর ‘গ’ বর্ণের অর্থ তিনি পাপ নাশ করেন— এই সম্পূর্ণ দুর্গ-পদটির সঙ্গে আ-কার ব্যবহার করার অর্থ হলো— তিনি ভয়, শত্রু, সব কিছু নাশ করেন, কেননা আকার বর্ণটাই নাশবাচক—

দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।

উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মতঃ।।

রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।

ভয়-শত্রুঘ্নবচন আকারঃ পরিকীর্তিতঃ।।

অবশেষে দুর্গা শব্দের সবচেয়ে সাধারণ অর্থ এটাই যে, দুর্গা সব প্রকারের দুর্গতি নাশ করেন—

দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - name Durga)