গুরুত্বপূর্ণ খবর

সাজিয়া আক্তার, রেসিডেন্সিয়াল এডিটর (বাংলাদেশ), দ্য অফনিউজ:

মানুষ ডায়েট করে আর ব্যায়াম করে শরীরের অন্যান্য অংশের মেদ কমলেও পেটের মেদ কমে না। আবার পেটের মেদ কমানোর জন্য অনেক অনেক রকম ব্যায়াম করেন।  তবে কয়েকটি খাবার তালিকা থেকে বাদ দিতে পারলে পেটের মেদ কমাতে পারবেন সহজে। জেনে নেওয়া যাক সে খাবারগুলো কি কি.....।

১. হোয়াইট ব্রেড:

আপনি যদি পেটের মেদ কমাতে চান তবে অবশ্যই আপনাকে পাউরুটি খাওয়া বাদ দিতে হবে। হোয়াইট ব্রেড খাওয়ার ফলে পেটে মেদ জমা হয় যা সহজে কমানো সম্ভব হয় না।

২. ডায়েট সোডা:

গবেষণা বলছে যারা ডায়েট সোডা খায় তাদের তুলনায় যারা খায় না তাদের পেটে মেদের পরিমাণ বেশি। পেটের মেদ কমাতে চাইলে ডায়েট সোডাকে আপনার খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে।

৩. ফলের শরবত:

বাজারে যেসব ফলের শরব্ত পাওয়া যায় তাতের প্রচুর পরিমাণে চিনি মেশানো থাকে। আর শরবতের এই চিনি পেটের ভিসারেল মেদ বাড়ায়। প্রয়োজনে বাসায় তাজা ফলের শরবত চিনি ছাড়া খাওয়া যেতে পারে।

৪. চকলেট:

সব চকলেট খারাপ বিষয়টি এমন না। ডার্ক চকলেট শরীরের জন্য অনেক উপকারী। কিন্তু যেগুলো মিল্ক চকলেট সেগুলো চিনিতে ভরপুর যা পেটের মেদ বাড়ায় দ্রুত।

৫. আলুর চিপস:

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী আলুর চিপস পেটের মেদ বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। আলুর চিপস স্যাচুরেটেড ফ্যাটে ভরপুর যা পেটসহ শরীরের মেদ বাড়ায়।

৬. পিজ্জা:

পিজ্জা এমন একটা খাবার যা সবারই কম বেশি পচ্ছন্দ। পিজ্জাতে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে পেটের মেদ বাড়ায়।

৭. লো ফ্যাট পেস্ট্রি:

লো ফ্যাট বিষয়টি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো মনে হলেও সেইরকম না। পেস্ট্রি মাত্রই প্রসেসসড ময়দা,চিনি ও সোডিয়াম রয়েছে যা পেটের মেদ বাড়ায় খুব দ্রুত।

৮. ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস:

হার্ভাডের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যারা প্রতিদিন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খায় তাদের ওজন যারা খায় না তাদের তুলনায় চার বছরে দেড় কেজি বাড়ে।

৯. আইস ক্রিম:

আইস ক্রিম ক্যালোরিতে ভরপুর একটি খাবার। প্রতিদিন আইস ক্রিম খেলে শরীরে বিশেষ করে পেটে মেদ জমবে দ্রুত।

(www.theoffnews.com - Bangladesh belly fat diet control)


দেবর্ষি মজুমদার, লেখক, বীরভূম:

খেলা হবে শ্লোগানের পেটেন্ট কার? তার হকদার খুঁজতে গাঁ উজার। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের নেতা ওসমান সাহেব নাকি এই "খেলা হবে" শ্লোগানের প্রথম প্রবক্তা।  

সে যিনিই হোন, আমজনতার মাথা ব‍্যাথা তাতে বিন্দুমাত্র নেই। একুশের নির্বাচনে ফলাফল এখন সত‍্যি খেলা হবের উপর নির্ভর করে কিনা সেটা দেখার। দিলীপ ঘোষেরা বা বিমান বসুদের জোট কেমন তালমিলে কটা গোল দেবেন সেটাই দেখার। দিদি তো গোল রক্ষক হিসেবে সেই গোল আঁটকাবেন বলেছেন। সর্বপরি নির্বাচন কমিশন রাজ‍্য নির্বাচনে আটদফা নির্বাচন করবেন। রেফারি, সাইড ম‍্যান নিয়ে নেমে পড়েছেন। খেলা হবে। কে ফ্রিকিক পাবেন, পেনাল্টি দেবেন সেটাই দেখার। তবে জেন্টল ম‍্যানের খেলা হবে না সেটা স্বয়ং অনুব্রত বলেছেন অনেকবার। তিনি বলেছেন, ফাউল প্লের কথা। বলেছেন হাঁটুর উপরে কিকে মালাইচাকি ভাঙার কথাও। ইঙ্গিত ভয়ংকর। তাই তিনি বলেই রেখেছেন ভয়ংকর খেলা হবে। তাতে  পেনাল্টি হলে হোক।

অনুব্রত মণ্ডলের এহেন হুংকার মোটেই আমল দিতে নারাজ বিজেপি। দলের এক নেতার বক্তব্য, "তোলাবাজ তৃণমূল নেতাদের নাম মুখে আনলে জিবটা নোংরা হবে নিজের। হারের সিঁদুরে মেঘ দেখে মানসিক অবসাদের এখন এরা বিকারগ্রস্থ। যারা মালাইচাকি ভাঙার ধমকি দেয় তারা আসলে রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া আর পলিটিকাল লুম্পেন ছাড়া আর কিছু নয়। নর্দমার কীটেরও এদের থেকে সৌজন্যতা বোধ অনেক বেশি। আমরা নিশ্চিত, খেলা হবে। জনগণের যথাযত রায় নিয়ে উইনিং গোলটা ঠিক দিয়ে দেব তৃণমূলকে কোনো ফাউল ছাড়াই।"

সেই জন্য তর্কযুদ্ধের দাফটে "খেলা হবে" শব্দ বন্ধ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ ট্রেণ্ডিং। তার প্রভাব দেওয়াল লিখনেও। এখন সব রাজনৈতিক দল পড়তে শুরু করেছেন জয় পরাজয়ের অঙ্ক এর মধ্যেই। 

এ যেন গুপি বাঘার ভূতের রাজা দিল বর। জবর জবর তিন বর। এক- নকুল দানা। গুড় বাতাসা। দুই --ঢাক চড়াম। পাঁচনে সোজা। উন্নয়ন রাস্তায়। তিন নম্বর "খেলা হবে"।

এই স্লোগানের পেটেন্ট নিয়ে যতই দড়ি টানাটানি হোক, বীরভূম জেলা তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের নাম আসবেই। তাঁকেই বিভিন্ন দলীয় সভায় বার বার "খেলা হবে" বলতে সবাই শুনেছেন। তাঁর কথায় সুর দিয়েছেন বোলপুরের রথীন কিসকু। বিভিন্ন সভায় এখন আলাদা সংস্কৃতি মঞ্চ  হয়। সেখানে সভা শেষে গান হয় "খেলা হবে"। অনুব্রতর কথায় এসব একটু বিনোদন। বিয়ে বাড়িতেও সেই খেলা হবে গান। নির্বাচনী দেওয়াল লিখনেও তার প্রভাব থাকবে, তাতে আশ্চর্য কিছুই নেই। নলহাটি দুই ও এক ব্লকে বেশ কিছু জায়গায় দেওয়াল লিখনে সেই খেলা হবে শ্লোগান। যেমন নলহাটির ভদ্রপুরে একটি দেওয়ালে দেখা গেল -- "হাতরাসেতে বোন জ্বালাও, মোদি বলেন থালা বাজাও। এই মাটিতে বাজনা হবে। একুশে আবার  খেলা হবে।" কিম্বা " বুড়ি মায়ের স্বাস্থ্য সাথী ফুলিয়ে বলে বুকের ছাতি। অপারেশন ফ্রীতে হবে। বন্ধু এবার খেলা হবে।" বিভিন্ন মঞ্চে হোক কলরবের মতো এধরনের স্লোগান বাজার মাত করেছে। হুগলির সাহাগঞ্জের সভায় এই "খেলা হবে" স্লোগান নিজের গলায় তুলে নিয়েছেন খোদ মুখ‍্যমন্ত্রী তাঁর নিজের গলায়। জনপ্রিয়তার নিরিখে বিজেপিও বলতে শুরু করেছে খেলা হবে। বীরভূমের বিজেপি নেতা কালোসোনা মণ্ডল থেকে দলের রাজ‍্যর সহকারী পর্যবেক্ষক অরবিন্দ মেননের গলায় শোনা গেছে খেলা শুরু হয়েছে। বামদলও পাল্লা দিতে  হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গণ সঙ্গীত ছেড়ে এখন টুম্পা সোনাতে মজেছে ব্রিগেড ভরাতে। তবে এখনও পর্যন্ত খেলা হবে সুপার ডুপার হিট। তাই বেশির ভাগ সভায় অনুব্রত সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখে বলছেন-- রথীনের গলায় খেলা হবে শুনবেন তো? দর্শকের আগ্রহেই চলে মার্কেটিং। দেওয়াল লিখন সেই কথায় বলে। শ্লোগানের উৎস এপার না ওপার বাংলার, না অনুব্রতর সেটা বিষয় না। মোদ্দা কথা লোক খাচ্ছে। নির্বাচনী দেওয়ালও পড়ে নিচ্ছে সেই শ্লোগান। আর এখানেই পেশাদার ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোরের অস্বস্তি হতে বাধ‍্য। কারন দিদির কেষ্টর স্লোগান এখন তাঁর মস্তিষ্ক প্রসূত স্লোগানকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। এব‍্যাপারে একটা ঘটনা মনে করিয়ে দেয় অনুব্রতর দূরদর্শিতা। রামপুরহাটের এক সভায় অনেক ভালো বক্তব্য রাখা হলো। শেষে অনুব্রত শুধু একটি কথা বললেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর এক সহচরকে বললেন, দেখবি আমি যেটা বললাম, কালকে সেটাই নিউজ হেড লাইন হবে।

(www.theoffnews.com - West Bengal politics khela hobe)

(www.theoffnews.com - Costa Rica electricity 99% 2015 renewable energy)

 

(www.theoffnews.com - United Nations Myanmar ambassador Kyaw Moe Tun)
 

সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ:

এ যেন জ্যোতির মাতৃদুগ্ধে মমতার নম্বরফেরি!

সেই জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রীত্বের সময়কালে পশ্চিম বাংলার শিক্ষা প্রসারণের ভাগ্যাকাশে শনি গ্রহরাজের মহাদশা শুরু হয়। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালেও বঙ্গের শিক্ষা বিস্তারে নেতির ধারাবাহিকতার রাহুমুক্তি তো ঘটলই না। বরং শনির সাড়ে সাতি এক্ষেত্রে পুরোপুরি জাঁকিয়ে বসেছে অন্তর্জলি যাত্রার শেষ পেরেক পোঁতার দৃষ্টান্তে।

লাল লাল লাল সেলামের মতো দিগন্ত বিকীর্ণ করে কি প্রচারই না সেদিন করেছিলেন রক্তিম সেবকেরা। তখন বাংলার বুকে একটাই গণস্লোগান। "মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ সম।" এই স্লোগান তো সত্যি অপরূপ ও চিরন্তন সত্য। কিন্তু এই নান্দনিক সত্যনিষ্ঠার স্লোগান কায়ায় রক্তিম পতাকার ছায়া প্রতিষ্ঠা করে বাংলার প্রাথমিক স্কুলগুলি থেকে ইংরাজি উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল জ্যোতিবাবুর নেতৃত্বে। রাতারাতি। ফলাফল তো সবাই জানেন। বঙ্গমাতার প্রজন্মের পর পড়ুয়া প্রজন্ম পঙ্গু হয়ে পড়ে ইংরেজির নূন্যতম জ্ঞানচর্চায়।

আর বর্তমানে মমতাদেবীর সৌজন্যে শিক্ষাব্যবস্থায় নয়া পাইয়ে দেবার কালচার আমদানি হয়েছে। বাংলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অবাধে চলছে "বিনা পরীক্ষায় নম্বর দান" ও "যোগ্যতাহীন পরীক্ষার্থীকে অতিরিক্ত নম্বর দান।" হে বঙ্গ বিধাতা!  এমন শিক্ষা নৈরাজ্যের করুণ নিয়তির অভিশাপে শুধু প্রজন্ম নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির ললাটে লিখে দেওয়া হল বং-খুনের জীবন্ত পরোয়ানা। এই উদ্যোগের সৌজন্যে এককেশ্বরী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং।

এরাজ্যের শিক্ষার এহেন চিতা শয্যার মর্মান্তিক উদাহরণের জন্যে তাহলে কি দুজনেই সমান রূপে দায়ী? প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর, না একটি কয়েনের দুটি পিঠের দোষারোপ এক্ষেত্রে সমগোত্রীয় নয়।

সরকার চালাতে গেলে নানা পরিকল্পিত সরকারি নীতি রূপায়নের দায়িত্ব বর্তায় মুখ্যমন্ত্রীর উপর। জ্যোতিবাবু সেই কাজটাই করেছিলেন পরীক্ষামূলকভাবে স্পষ্ট একটা নীতি রূপায়নের ভিত্তিতে। সেই গৃহীত নীতি বেঠিক না সঠিক তাতো বহুল চর্চিত হয়েছিল। কিন্তু এই পরিসরে কোনও পাইয়ে দেবার পরিকল্পনা ছিল না। যেমন ছিল না ভোট বৈতরণী পাড় করার নিজের দলগত লিপ্সা। উনার চরম রাজনৈতিক বিরোধীরাও এই এহেন লিপ্সার তকমা তাঁর সাদা পোশাকে এক মূহুর্তের জন্য সাঁটাতে পারেননি কোনদিন। তবে নীতি গ্রহণের বিরোধিতায় জ্যোতিবাবু রাজনৈতিক ভাবে সমালোচিত হয়েছেন ঘনঘন। এটাও ঠিক।

আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেলায় এই ইস্যুতে বিরোধীরা তাঁকে বারংবার কাটগড়ায় তুলেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে পাইয়ে দেবার রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির অভিযোগকে কেন্দ্র করে সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পৃথক ভাবে চরম সোচ্চার। তাঁদের বক্তব্য, এখানে নাকি আক্ষরিক অর্থে প্রশাসনিক নীতির কোনও প্রকৃত অবকাশ নেই। রয়েছে নীতির মোরকে নতুন প্রজন্মের পড়ুয়া ভোটারদের মনজয়ের দলীয় লক্ষ্য! যথেচ্ছ নম্বর রেজাল্টে বিলিয়ে পড়ুয়াদের ভবিষ্যতকে কালো ঘোড়ায় বাজি ধরা হয়েছে আসন্ন ভোট বৈতরণীর পালে হাওয়া লাগাতে।

মুখ্যমন্ত্রী দুজন ঠিকই। কিন্তু একটাই রাজ্য। কিন্তু একটাই ইস্যু, শিক্ষার অধঃপতন। তবু ফারাক রয়ে গেছে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক আলোকবর্ষ দূরত্বের। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজ নামের প্রচারক যে নিজেই। বরাবরই। অথচ জ্যোতি বসুর নাম ঘুরেছে মানুষের মুখে মুখে। দশকের পর দশক ধরে। আজও।

আসলে নিজ স্বার্থহীন একটা ব্যক্তিত্ব চেতনে বিস্তর ফারাকের চিন্তনের একটা বুনিয়াদ তো গড়েই দেয়। যা রাজ্যবাসীর একান্ত নিজস্ব অন্তর্কথা। তাই না?

(www.theoffnews.com - West Bengal education policy Jyoti Basu Mamata Banerjee)

কাকলি সেনগুপ্ত, চিত্রশিল্পী ও সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

(www.theoffnews.com - painting)

(www.theoffnews.com - Biden America Syria Kobani airstrikes)
 

(www.theoffnews.com - sence of smell human dog blood hound bear)
 

সাজিয়া আক্তার, রেসিডেন্সিয়াল এডিটর (বাংলাদেশ), দ্য অফনিউজ:

একজন মানুষের আদর্শ ওজন নির্ণয় করতে গেলে ওই ব্যক্তির ওজন কিলোগ্রামে মাপা হয় এবং উচ্চতা মিটারে মাপা হয়। তারপর ওই ওজনকে উচ্চতার বর্গফল দিয়ে ভাগ করা হয়। আর এই ভাগফলকে বলা হয় বিএমআই।

একজন মানুষের ক্ষেত্রে বিএমআই ১৮ থেকে ২৪'র মধ্যে হলে স্বাভাবিক। ২৫ থেকে ৩০'র মধ্যে হলে স্বাস্থ্যবান বা অল্প মোটা, ৩০ থেকে ৩৫'র মধ্যে হলে বেশি মোটা। আর ৩৫'র ওপরে হলে অত্যন্ত ও অসুস্থ পর্যায়ের মোটা বলা যেতে পারে।

তবে কোন কোন ক্ষেত্রে এই পরিমাপের তারতম্য হতে পারে।

নীচে উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজনের একটি তালিকা তুলে ধরা হলো-

উচ্চতা অনুযায়ী, আদর্শ ওজন-

উচ্চতা          পুরুষ(কেজি)              নারী(কেজি)

৪’৭”               ৩৯-৪৯                      ৩৬-৪৬

৪’৮”               ৪১-৫০                       ৩৮-৪৮

৪’৯”                ৪২-৫২                      ৩৯–৫০

৪’১০”              ৪৪-৫৪                       ৪১–৫২

৪’১১”              ৪৫-৫৬                      ৪২-৫৩

৫ফিট              ৪৭-৫৮                      ৪৩-৫৫

৫’১”                ৪৮-৬০                      ৪৫-৫৭

৫’২”                ৫০-৬২                     ৪৬-৫৯

৫’৩”                ৫১-৬৪                      ৪৮-৬১

৫’৪”                ৫৩-৬৬                     ৪৯-৬৩

৫’৫”                ৫৫-৬৮                    ৫১-৬৫

৫’৬”                ৫৬-৭০                     ৫৩-৬৭

৫’৭”                ৫৮-৭২                     ৫৪-৬৯

৫’৮”                ৬০-৭৪                     ৫৬-৭১

৫’৯”                ৬২-৭৬                     ৫৭-৭১

৫’১০”               ৬৪-৭৯                     ৫৯-৭৫

৫’১১”               ৬৫-৮১                     ৬১-৭৭

৬ ফিট             ৬৭-৮৩                     ৬৩-৮০

৬’১”                 ৬৯-৮৬                    ৬৫-৮২

৬’২”                 ৭১-৮৮                     ৬৭-৮৪

(www.theoffnews.com - Bangladesh hight weight man woman)

সাজিয়া আক্তার, রেসিডেন্সিয়াল এডিটর (বাংলাদেশ), দ্য অফনিউজ:

ঘরোয়া কাজের জন্য স্ত্রীকে টাকা পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন চীনের একটি আদালত। সোমবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানী বেইজিংয়ের একটি ডিভোর্স আদালত স্বামীকে টাকা পরিশোধের বিষয়ে নজিরবিহীন এই রায় দেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ বছর বিনা বেতনে ঘরের কাজ করার ক্ষতিপূরণ হিসেবে চীনা মুদ্রায় ওই নারীকে ৫০ হাজার ইউয়ান (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা) পরিশোধ করার আদেশ দেন আদালত। 

আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বিয়ে করেন চেন এবং ওয়াং। পাঁচ বছর সংসার করার পর ২০২০ সালে স্ত্রী ওয়াংকে তালাক দেন স্বামী চেন। তবে তালাকের বিষয়টি মানতে পারছিলেন না স্ত্রী। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি।

স্ত্রীর দাবি, পাঁচ বছরের সংসার জীবনে ঘরের কোনো কাজে তাকে সাহায্য করেননি স্বামী চেন। এমনকি বাচ্চার দেখাশোনার কাজেও স্ত্রীর হাতে হাত মেলাননি তিনি। সন্তান লালন-পালনসহ সংসারের সব কাজ তিনি একাই করেছেন। আর তাই ক্ষতিপূরণ পাওয়া তার অধিকার।

স্ত্রী ওয়াংয়ের এই যুক্তি মেনে নেয় বেইজিংয়ের ফাংশান জেলার আদালত। সাংসারিক জীবনের প্রতি মাসে দুই হাজার ইউয়ান করে দেওয়ার পাশাপাশি এককালীন আরও ৫০ হাজার ইউয়ান দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারক।

(www.theoffnews.com - Beijing court ordered man to pay compensation to his ex wife)

দেবর্ষি মজুমদার, লেখক, বীরভূম:

রিল ও রিয়েল লাইফ কদাচিৎ মেলে। আর যখন মেলে, তখন বিস্ময়ের অবকাশ থাকে না। মঙ্গলবার  নলহাটির নতুন গ্রামে মাহাফুজা খাতুন ও এন্তাজুল মোল্লার সাদি মনে করিয়ে দেয় গুলজারের কৌসিস ছায়াছবির কথা। চলচ্চিত্রমোদীরা আজও অনেকেই ভুলতে পারেন না সেই সিনেমায় জয়া ভাদুরী ও সঞ্জীব কুমার জুটির দুজনের বোবা কালার অনবদ‍্য অভিনয়। বাস্তব জীবনে এই মূক ও বধির জুটি  আমাদের সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, মুখের ভাষা না থাকলেও মনের ভাষা পড়ে নিতে কোন অসুবিধা হয় না। খেলা সূত্রে মাহাফুজা ও এন্তাজুলের পরিচয়। তাই পরস্পরকে বুঝতে তাঁদের কোন অসুবিধা হয়নি! 

নলহাটির নতুন গ্রামের মাহফুজা খাতুন একজন ভালো সাঁতারু ও অ্যাথলিট। সাত আট বছর আগে  রাজ‍্যস্তর সাঁতার প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। দৌড় প্রতিযোগিতায়ও একবার দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। অন্যদিকে, এন্তাজুল মোল্লা একজন ভালো  খেলোয়ার ছিলেন। বাড়ি হাওড়া জেলার  ডোমজুড়ে। মঙ্গলবার একটি সুন্দর অনুষ্ঠানের মধ্যে বিয়ে সম্পূর্ণ হলো। জানা গেছে, মাহাফুজা ও এন্তাজুলের মনের কথা জানতে পারেন তাঁদের কোচ মহঃ বদরুদ্দোজা সাহেব। তিনিই দুটি পরিবারের সাথে কথা বলেন। মাহফুজার বাবা আব্দুল লতিফ চেয়েছিলেন তার এই মেয়ের বিয়ে একজন কথা বলতে পারে এমন সুস্থ স্বাভাবিক  কোন ছেলের সাথে বিয়ে হোক। কিন্তু  মাহাফুজা সেটা চাননি। কারণ তার মূক ও বধির বড় বোন রুবিনা খাতুনের ষোলো বছর আগে ডেঠারামপুরে  বিয়ে হয়েছিল একজন সুস্থ স্বাভাবিক ছেলের সাথে। তাঁদের দুই পুত্র সন্তানও হয়। কিন্তু সে বিয়ে  টেকেনি। সেই তিক্ততার অনুভূতি থেকেই  তথাকথিত সুস্থ স্বাভাবিক ছেলের সাথে ঘর বাঁধতে চাননি সুন্দরী মাহাফুজা। মিয়া বিবি রাজী তো কেয়া করে গা কাজী। শেষ পর্যন্ত মধুরেণ সমাপয়েৎ।

(www.theoffnews.com - married a couple physical handicapped)


সাজিয়া আক্তার, রেসিডেন্সিয়াল এডিটর (বাংলাদেশ), দ্য অফনিউজ:

স্মার্টনেস মানেই দেখতে ভালো লাগা বা ট্রেন্ডি পোশাক পরা নয়। স্মার্টনেস হলো অভ্যন্তরীণ মানসিক ব্যাপার। নিজেকে সবার কাছে স্মার্টনেস উপস্থাপন করতে নিজের মধ্যে ছোট ছোট পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

কিছু ক্ষেত্রে কৌশলী হয়া প্রয়োজন। খুব সাধারণ কিছু কৌশল অবলম্বন করে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন স্মার্টনেসের অধিকারী। 

১. কথা বলুন বুঝেশুনে: অনেক কথা বলার অভ্যাস থাকলে বাড়তি কথা বলা কমিয়ে দিন। যতটুকু প্রয়োজন কথা ঠিক ততটুকু বলার অভ্যাস করুন। কখন, কোথায়, কী বলতে হবে তা বোঝার চেষ্টা করুন। কথা বলুন বুঝেশুনে এবং গুছিয়ে। কী বলতে চাইছেন তা যেন আপনার বক্তব্যে পরিষ্কার বোঝা যায়। 

২. খাবার খান নিঃশব্দে আস্তে আস্তে: যারা শব্দ করে খাবার খান তাদের কেউ পছন্দ করে না। সকলেই তাদের দিকে বিরক্তির চোখে তাকায়। নিঃশব্দে খাবার অভ্যাস করুন। খাবার ধীরে ধীরে চিবিয়ে খান, এতে শব্দ কম হবে। খাবার সময় যতটা সম্ভব কম কথা বলুন।

৩. পোশাক পরুন রুচিশীল: হালফ্যাশনের বা ট্রেন্ডি পোশাক পরা মানেই স্মার্ট (smart) হওয়া নয়। পোশাকটা আদতে মানাচ্ছে কি না, সেটাই হলো আসল কথা। পোশাক-আশাক যদি ঠিকমতো নির্বাচন না করতে পারেন তাহলে আপনার স্মার্টনেস অনেকাংশেই মার খেয়ে যাবে। তাই পোশাক পরুন নিজের ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী।

৪. হালফ্যাশনের পোশাক নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলে বেছে নিন ট্র্যাডিশনাল বা সব সময়েই যেসব পোশাকের চল থাকে, সেই পোশাকগুলো। যেমন শাড়ি, সাধারণ ছাঁটের সালোয়ার-কামিজ, স্কার্ট, ফর্মাল শার্ট, প্যান্ট, স্ট্রেইট কাটের জিন্স, পোলো টিশার্ট ইত্যাদি। কী রঙের পোশাক বেছে নেবেন তা বুঝতে না পারলে পরুন হালকা যেকোনো রঙের পোশাক। হালকা রং সবাইকেই মানিয়ে যায়।

৫. খাবার খাওয়ার রীতিনীতি: খাবার খাওয়ারও কিছু নিয়ম-কানুন আছে সেগুলো শিখে নিন। যেমন চামচ, কাঁটা চামচ, ছুরি ব্যবহারের নিয়ম, ন্যাপকিন ব্যবহারের নিয়ম, কোনটার পরে কী খেতে হয় ইত্যাদি। আপনার খাবার ধরণ আপনার স্মার্টনেস বাড়িয়ে তুলবে বহু গুণ।

৬. নূন্যতম সৌজন্যতাবোধ: সব জায়গাতেই কিছু ন্যূনতম সৌজন্যতা মেনে চলা উচিত। এতে যেমন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায় তেমনি স্মার্টনেসেরও পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন খুব জোরে জোরে কথা বলবেন না। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে। ধুপধাপ পা ফেলে না হেঁটে নিঃশব্দে হাঁটার চেষ্টা করুন। কারো সাহায্য নেবার পর ধন্যবাদ জানানোও কিন্তু সৌজন্যতাবোধের মধ্যে পড়ে। কাউকে বিরক্ত করলে ‘দুঃখিত’ বলুন। এগুলো খুবই ফর্মাল আচরণ মনে হলেও সৌজন্যতাবোধের বহিঃপ্র’কাশও বটে!

৭. হেসে হেসে সুন্দর করে কথা বলুন: হেসে, সুন্দর করে কথা বলাও স্মার্টনেসের পরিচায়ক। তাই বলে কথায় কথায় হো হো করে হাসবেন না যেন! এটাও শোভন নয়। স্মিতহাস্যে কথা বলুন সবার সাথে। মানুষটি যদি বিরক্তিকরও হয়, আপনার কথা শুনে সে যেন আপনার বিরক্তিটুকু ধরতে না পারে। মোট কথা, আপনার সাথে কথা বলে যেন কারো মনে না হয় আপনি রূঢ় আচরণ করছেন।

৮. ভালো ব্যবহার করুন: যেকোনো পরিবেশে মানিয়ে চলাটাই স্মার্টনেসের (smartness) অন্যতম পরিচায়ক। আপনার মনের অবস্থা যদি খারাপও হয়, ভালো ব্যবহার করুন সবার সাথে। অল্পতেই বিরক্ত হবেন না বা রেগে যাবেন না। ধৈর্য ধরে ধীরস্থির ভাবে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করে যান। প্রতিটা সময় ভালো আচরণ আপনাকে গড়ে তুলবে একজন স্মার্ট মানুষ হিসেবে।

(www.offnews.com - smartness)

প্রানকৃষ্ণ মিশ্র, লেখক, কালনা, পূর্ব বর্ধমান:

অনেকে ভাবেন শিবলিঙ্গ মানে দৃশ্যতঃ শিব ঠাকুরের লিঙ্গ। হিন্দুরা শিবঠাকুরের সেই লিঙ্গ পূজা করেন। বাংলায় হিন্দুদের মধ্যেও অনেকের বদ্ধমূল এই ধারনা আছে। আমি অনেককেই বলতে শুনাছি শিবরাত্রির দিন মহিলারা উপোষ করে শিবঠাকুরের লিঙ্গতে জল দেন। আদৌ কি তাই?

আসুন অল্প কথায় জেনে নিই শিবলিঙ্গ কি? হিন্দু রীতিতে কেন লিঙ্গ পূজা করা হয়।

শিবলিঙ্গ (সংস্কৃত: लिङ्गं, লিঙ্গ; অর্থাৎ, "প্রতীক" বা "চিহ্ন" হল পরমেশ্বর শিবের নির্গুণ ব্রহ্ম সত্ত্বার একটি প্রতীকচিহ্ন। ধ্যানমগ্ন শিবকে এই প্রতীকের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়, হিন্দু মন্দিরগুলিতে সাধারণত শিবলিঙ্গে শিবের পূজা হয়। শিব আত্মধ্যানে স্ব-স্বরূপে লীন থাকেন। আর সব মানুষকেও আত্মনিমগ্ন তথা ধ্যানমগ্ন হতে উপদেশ দেন। "লয়ং যাতি ইতি লিঙ্গম্"- অর্থাৎ যাঁর মধ্যে সমস্ত কিছু লয় প্রাপ্ত হয়, তাই লিঙ্গ।

লিঙ্গ শব্দটির উৎপত্তি সৎস্কৃত লিঙ্গম্ শব্দ থেকে যার অর্থ প্রতীক বা চিহ্ন। বাংলায় এই শব্দটি ব্যাকরণ শাস্ত্রে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু পুরুষ নাকি স্ত্রী নাকি ক্লীব প্রভৃতি চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়। শিবলিঙ্গ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো শিবের মাথা। তবে অজ্ঞতাবশত লিঙ্গ শব্দটি তার অর্থ পরিবর্তন করে বাংলায় পুরুষ জননেন্দ্রিয় অর্থ লাভ করেছে যা বিকৃত এবং অশালীন; এক্ষেত্রে এটি বাংলায় শিশ্ন শব্দকে প্রতিস্থাপিত করেছে। শিব লিঙ্গের উপরে ৩টি সাদা দাগ থাকে যা শিবের কপালে থাকে, যাকে ত্রিপুণ্ড্র বলা হয়। শিবলিঙ্গ যদি কোন জনেন্দ্রিয় বোঝাত তাহলে শিবলিঙ্গের উপরে ঐ ৩টি সাদা তিলক রেখা থাকত না। শিবলিঙ্গ ৩টি অংশ নিয়ে গঠিত, সবার নিচের অংশকে বলা হয় ব্রহ্ম পিঠ, মাঝখানের অংশ বিষ্ণুপিঠ এবং সবার উপরের অংশ শিব পিঠ। একটি সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী, শিবলিঙ্গ শিবের আদি-অন্তহীন সত্ত্বার প্রতীক এক আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের রূপবিশেষ।

(www.theoffnews.com - shiva lingam)

(www.theoffnews.com - Congo Goma terrorist car murdered Italian ambassador)
 

ইসহাক খান, মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ:

দলের সিদ্ধান্ত সবাইকে জানানো হয় না। কাছের কয়েকজন জানতে পারেন দল এখন কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু আমরা জেনে যেতাম। কারণ কমান্ডারের কাছের মানুষ ছিলেন আমাদের প্রাণ ভ্রমরা রফিকুল আলম, আমার সুকুর মামু। মামুর মুখে জানতে পারলাম দল এই এলাকা ছেড়ে সিরাজগঞ্জের পূর্ব অংশে যাবে। সেখান থেকে শহর আক্রমণ অনেক সহজ হবে। একজনকে যাওয়ার রাস্তায় রেকি করতে পাঠানো হয়েছে। সে ফিরে এসে জানাবে কোন পথ আমাদের জন্য নিরাপদ। সে ফিরলে তার রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দল এডভান্স করবে। 

রেকির কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বটে। একজন ব্যক্তি বিপদ মাথায় করে গিয়ে ওই স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসবে। ভুল রেকির কারণে পুরো দল বিপদে পড়তে পারে। বেঘোরে প্রাণ হারাতে পারে অনেক মুল্যবান দেশপ্রেমিক যোদ্ধা। আবার রেকি করতে গিয়ে ওই লোকটি শত্রুর হাতে ধরা পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে উভয়ের বিপদ। 

সন্ধ্যার পর নির্দেশ এলো দল মার্চ করবে। আমি মলয়কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আজকের পাসওয়ার্ড কিরে?’  

মলয় বললো, ‘উত্তম কুমার।’ 

পাসওয়ার্ড হলো দলের গোপন সংকেত। এই সংকেতের মাধ্যমে দলের নিজস্ব কর্মীদের চিহ্নিত করা হয়। প্রতিদিন নতুন নতুন সংকেত দেওয়া হয়। সেটা কিন্তু সবাইকে ডেকে ঘোষণা দিয়ে দেওয়া হয় না। সংকেতটি কানে কানে সবার কাছে পৌঁছে যায়। আমি আবার এই পাসওয়ার্ড মনে রাখতে পারি না। 

আমরা প্রস্তুত হয়ে যার যার অস্ত্র কাধে নিয়ে পথে নামলাম। আসগর এলএমজির সহকা্রি হয়ে গেল। দলে একটি মাত্র এলএমজি। সেটি চালাতো সিরাজগঞ্জ শহরের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন। এলএমজি একা চালানো যায় না। একজন সহকারি লাগে। তৌহিদ ভাইয়ের দলে যোগ দিয়ে আসগর এলএমজি চালানোর সুযোগ পেয়ে গেল। দুজন মিলে এলএমজি চালাবে। কখনও আসগর কখনও আলতাফ। এলএমজি [লাইট মেশিন গান], এমএমজি [মিডিয়াম মেশিন গান] এই ভারী অস্ত্র চালানো খুবই রিস্ক। শত্রু পক্ষের মূল টার্গেট হয় তারা। এই জন্যে তাদের একই পজিশনে থেকে যুদ্ধ করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে এমএমজি-বার বার পজিশন চেঞ্জ করতে হয়। সমস্যা বাঁধে এই এমএমজি নিয়ে। পজিশন চেঞ্জের সময় এর আলাদা আলাদা অংশ দ্রুত খুলে ফেলতে হয়। গেরিলা যোদ্ধাদের তাই এমএমজির মতো ভারী অস্ত্রের ট্রেনিং দেওয়া হয়নি। 

আমাদের রুটিং ওয়ার্ক ছিল যার যার অস্ত্র নিয়মিত পরিস্কার করা। যেদিন যুদ্ধ করতাম শেল্টারে ফিরেই অস্ত্র খুলে ফুলতুরুর সঙ্গে গান ওয়েল মিশিয়ে ব্যারেল এবং চেম্বার পরিস্কার করার কাজে লেগে পড়তাম। গেরিলা যোদ্ধাদের সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। যে কোন মুহূর্তে তাকে শত্রুর মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। তখন একজন যোদ্ধার একমাত্র ভরসা তার অস্ত্র। সেই অস্ত্র যদি তখন কাজ না করে সেই মুহূর্তে একজন সৈনিকের কি যে অসহায়ত্ব তা কেবল সেই সৈনিকই অনুধাবন করতে পারে। 

ফুলতুরু দিয়ে আমরা অস্ত্র পরিস্কার করতাম। এই ফুলতুরু বিষয়টি আসলে কি, এটার অফিসিয়াল নাম কি, সেটা আমাদের ধারণা দেওয়া হয়নি। আমাদের বলা হয়েছে এটা ফুলতুরু। অস্ত্র পরিস্কারের কাজে ব্যবহৃত হয়। সরু লম্বা নাইলনের সূতার মাথায় ফুলের মতো গোলাকার একটি বস্তু। সেটাও নাইলনের সূতায় তৈরি। সূতার ওই গোলাকার ফুলটি গান ওয়েলে ভিজিয়ে ব্যারেলে ঢুকিয়ে, একজন অস্ত্র ধরে থাকে আরেকজন সূতা ধরে টেনে ব্যারেল দিয়ে বের করে। এইভাবে ব্যারেলে জমে থাকা গ্যাস পরিস্কার করা হয়। গ্যাস বেশি জমলে ব্যারেল জ্যাম হয়ে যায়। তখন ট্রিগার চাপলেও গুলি বের হয় না। যুদ্ধক্ষেত্রে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে দেখেছি আমরা। হাতিবান্ধা যুদ্ধে আমাদের একমাত্র এলএমজিটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের সেই ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে এলএমজি-ম্যান বাবলু-যাকে সবাই পাঞ্জাবী বাবলু বলে ডাকতো। দেখতে পাঞ্জাবীদের মতো লম্বা, লালচে গায়ের রঙ। সেই কারণে তার নাম হয়ে যায় পাঞ্জাবী বাবলু। বাবলু এমনই দুঃসাহসিক যোদ্ধা যে, যুদ্ধের সেই ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে এলএমজি খুলে গামছা দিয়ে পরিস্কার করে তখন তখনই সেটা আবার জোড়া লাগিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে।   

ব্যারেল জ্যাম হয়ে অস্ত্র বন্ধ হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সেই থেকে আমরা সাবধান। অবশ্য প্রশিক্ষণের সময় ওস্তাদ আমাদের অস্ত্র খোলা এবং জোড়া লাগানোর বিষয়ে বিশেষ জোর দিতেন। আমাদের প্রশিক্ষণের সময় যেদিন যে অস্ত্রের ফায়ার প্রাকটিস করতাম পরক্ষণে সেই অস্ত্র খোলা এবং জোড়া লাগানোর প্রশিক্ষণ চলতো। সেটা একাধিক দিন করতে হতো। কারণ একদিন বা দুদিনের ট্রেনিংয়ে অস্ত্র খোলা এবং জোড়া লাগানোর বিষয়টি সবাই মনে রাখতে পারতো না।  

যুদ্ধের সময় আমাদের গান ওয়েল দেওয়া হয়নি। বিকল্প হিসেবে আমরা কেরোসিন এবং নারকেলের তেল মিশিয়ে গান ওয়েল তৈরি করতাম। তাতে দিব্বি কাজ চলে যেত। বাঙালির প্রখর মেধার অভিনব আবিস্কার।

স্বাধীনতার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি যুদ্ধের গল্প বলতে বলতে আবেগে তাদের গল্পের নৌকা পাহাড় দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। বলতে বলতে এতটাই আবগ তাড়িত হয়ে পড়েছে যে, একদম বাস্তবতা ভুলে গেছে। অবচেতনে বলে গেছে, ‘আমি অমুক ভারী অস্ত্র চালিয়েছি, তমুক ভারী অস্ত্র চালিয়েছি।’ যাদের কাছে এই গালগল্প তারা করতো তাদের অস্ত্র সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। তাই তারা এই গালগল্প মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো আর বোকার মতো হাততালি দিত। সেখানে যদি কোন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ সৈনিক এসে জিজ্ঞেস করতো, ‘আপনি কি রেজিমেন্টের কোন সৈনিক? ওই ভারী অস্ত্রের প্রশিক্ষণ শুধু রেজিমেন্টের নিয়মিত বাহিনীকে দেওয়া হয়। তাহলে প্রশিক্ষণ ছাড়া ওই ভারী অস্ত্র আপনি চালালেন কিভাবে? ওই ভারী অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঘন-ঘন পজিশন চেঞ্জ করতে হয়। তখন ওই ভারী অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্র খুলে নতুন পজিশন গিয়ে আবার তা জোড়া লাগাতে হয়। আপনার ওই ভারী অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নাই, আপনি যুদ্ধের সময় সেই অস্ত্র খুললেন এবং জোড়া লাগালেন কিভাবে?’ এই প্রশ্নগুলো করলে তখন কিন্তু ওই গালগল্পের সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যেত। সেটা কে করবে? ভাবখানা যে, বলতেছে বলুক, বলে যদি একটু আনন্দ পায় তাতে অসুবিধে কি? এইভাবে সবাই ব্যাপারটা হাল্কাভাবে এড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই গল্প যদি কেউ অন্তরে বাস্তবতার নিরিখে লালন করে তাহলে পরিস্থিতি জটিল হতে বাধ্য। যেমন হয়েছে এবারের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাইয়ের দিনে। আমার সহযোদ্ধা বন্ধু জহুরুল কথায় কথায় একটি মজার ঘটনা বলেছে। চলতি বছরের [২০২১] জানুয়ারিতে মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাছাই কার্যক্রমে ইন্টার্ভিউ দিতে এসে একজন ব্যক্তি নিজেকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করতে গিয়ে এমন সব অস্ত্রের নাম বলেছে, যা শুনে মুক্তিযোদ্ধা জহুরুলের বুক ভেঙে হাসি পেয়েছিল যে হাসতে হাসতে সে ওই স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। ওই ব্যক্তি বলছিল, সে নাকি যুদ্ধে ভারী ভারী মেশিন গান চালিয়েছে। এইসব অস্ত্র চালিয়ে শত শত পাকআর্মি মেরেছে। যাচাই বাছাইয়ের টেবিলে তার ডাক পড়ার আগে উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আগত লোকজনের সামনে গলাবাজি করছিল সেই লোকটি। জহুরুল বললো, ‘তার কথা শুনে আমার ভীষণ লজ্জা লাগছিল আবার হাসিও পাচ্ছিল ভীষণ।’ 

আমি জহুরুলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুই কিছু বলতে পারলি না? জিজ্ঞেস করলি না, আচ্ছা ভাই, ভারী ভারী অস্ত্রগুলো দেখতে কেমন? আপনি দেখেছেন কখনও? ভাইজান, আপনি ওই ভারী অস্ত্রের কোথায় ট্রেনিং নিয়েছেন? আসমানে না পাতালে?’ 

জহুরুল বললো, ‘কি বলবো, যেভাবে সে সিংহের মতো গর্জন করছিল, কিছু বলতে গেলে অযথা ঝগড়া বেঁধে যেত। তাই কিছু বলিনি।’           

জাতির কি দুর্ভাগ্য, স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই হচ্ছে। সাক্ষী দিয়ে নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী চলছে অথচ এখন পর্যন্ত কোন সরকারই মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা তৈরি করতে পারলো না। 

সুকুর মামুর কাছে জানতে পারলাম রেকির দায়িত্ব যার উপর ছিল সে ফিরে এসেছে। আমরা সিরাজগঞ্জ শহরের দক্ষিণে রায়পুর রেলস্টেশনের উত্তর পাশ দিয়ে রেললাইন ক্রস করে ওপার ওয়াপদা বাঁধে গিয়ে উঠবো। তারপর চলে যাব যমুনার চরের দিকে। রায়পুর স্টেশনে নাকি রাজাকারদের ক্যাম্প আছে। অতএব আমাদের ওই সময় খুব সাবধানে রেললাইন ক্রস করতে হবে। 

লম্বা লাইন ধরে আমরা নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছি। যাত্রার এই সময় কথা বলা এবং ধূমপান করা বারণ। বিড়ি সিগারেটের আগুন বহুদূর থেকে দেখা যায়। 

এই সময় একটি আখ ক্ষেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আমরা। আখের দিকে ইশারা করে নিচু গলায় মলয় বললো, ‘হবে নাকি একচোট?’ 

বললাম, ‘হলে মন্দ হতো না। কিন্তু কমান্ডারের কানে গেলে অবস্থা বেগতিক হবে।’ 

মলয়ের এই সাংকেতিক কথা হয়তো অনেকেই বুঝতে পারেননি। তাহলে একটু খোলাসা করা যাক। আমরা তখন কাজিপুর থানার একটি গ্রামে অবস্থান করছি। আমাদের অবস্থানের কাছাকাছি, গ্রামের পশিমে একটি আঁখের ক্ষেত। এই আঁখ খাওয়ার ব্যাপারে আমার এবং মলয়ের বিশেষ দুর্বলতা আছে। আমরা দুজন অন্যদের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে একটি আঁখ ক্ষেতে এসে আঁখ ভেঙ্গে খেতে শুরু করি। আমরা আঞ্চলিক ভাষায় আঁখকে বলি ‘কুশল’ বা ‘কুইশাল’। আমরা দুজন জমির আলে বসে দাঁত দিয়ে আঁখ ছিলিয়ে মজা করে খাচ্ছি। মজা খুব বেশি হচ্ছিল না। কারণ আঁখগুলো ছিল ভীষণ শক্ত। দাঁত দিয়ে ছিলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। ঠোঁটের দু’এক পাশ কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ সেখানে গাট্টা-গোত্তা এক লোক এসে হাজির। হাতে দা। এসে ভারী গলায় আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা কারা?’ 

বললাম, ‘ভাই, আমরা মোসাফির। আমাদের কোন ঘর বাড়ির ঠিকানা নাই।’ 

লোকটি হেসে বললেন, ‘বুঝছি। আপনারা মুক্তিফৌজ। আপনাদের কয়েকজন আমার বাড়িতেও আশ্রয় নিছে।’ 

আমরা এবার আশ্বস্ত হলাম। তাহলে ধরা পড়ার ভয় নেই। লোকটি এবার আমাদের অবাক করে দিয়ে বললো, ‘এই কুশল কেমনে খাইতাছেন। এ কুশলতো লোহার মতো শক্ত। এ কুশল আমরা মেশিনে ভাঙ্গাইয়া গুড় বানাই। আপনারা আমার সাথে আসেন। আমি আপনাদের ভাল জাতের কুশল কাইটা দিতাছি।’

লোকটি আমাদের দু’তিন ক্ষেত পর অন্য একটি আঁখ ক্ষেতে নিয়ে গেল। দু’টো মোটা লম্বা কুশল কেটে দা দিয়ে গোঁড়া ছাপ করে টুকরো টুকরো করে দিলেন। খেতে গিয়ে দেখলাম সত্যি-সত্যি কুশলগুলো নরম, মিষ্টি এবং প্রচুর রস। আমরা দাঁত দিয়ে আঁখের ছোগলা ছাড়িয়ে মড়-মড় করে খাচ্ছি আর লোকটি অপলক দৃষ্টিতে হাসিমুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তে আমাদের কুশল খাওয়া শেষ। লোকটি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলো, ‘আরও খাইবেন?’ 

বললাম, ‘না, থাক। বেশি খেলে আবার ভাত খেতে সমস্যা হবে।’ 

সে কি বুঝলো, সেই জানে। বললো, ‘অসুবিধা নাই। এ জমি আমার। আপনারা যত ইচ্ছা খাইতে পারেন। কেউ কিচ্ছু কবে না।’ এই বলে সে আরও দু’টো মোটা সরল দেখে আঁখ কেটে টুকরো-টুকরো করে আমাদের দিল। আমরা খাচ্ছি আর মজা করছি তাই দেখে আনন্দে হাসছে লোকটি। যেন আমাদের আঁখ খাওয়াতে পেরে তার আনন্দের সীমা নেই। 

এই আমাদের দেশের সাধারণ জনগণ। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের ত্যাগেই যুদ্ধ দ্রুত তরান্বিত হয়েছে লক্ষের দিকে। তারা শুধু ত্যাগই করেছে বিনিময়ে পায়নি কিছুই। [চলবে]

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Bangladesh muktijuddho)

(www.theoffnews.com - T38 airforce jet crashed down Alabama America 2 pilots dead)
 

দেবিকা ভট্টাচার্য, লেখিকা ও লেকচারার, চন্দননগর, হুগলি:

একুশে ফেব্রুয়ারি—ভাষা শহীদ দিবস— আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

এ নিয়ে রচনা লিখতে আর চাই না। তবে পড়ি, যা কিছু লেখা সব পড়ি। পড়তে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। মাফ করবেন। এটা আমার ছোটবেলায় স্বভাব। পড়তে বসলে ঘুম পায়। একটা কথা বহুল প্রচলিত-লিখতে গেলে পড়তে হয়। আর যেহেতু পড়তে গেলে ঘুমিয়ে পড়ি তাই কোনো কিছু লেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে কিনা ঘুমের ঘোরে মগজে অনেক কথা গিজগিজ করে। কথাগুলো এরকম—

ইংরেজি ভাষা আয়ত্তে করার দিকে আমরা যতটা মনোনিবেশ করেছি বাংলা ভাষার ব্যাকরণ পদ্ধতি বা বানান পদ্ধতি নিয়ে ততটা মনোযোগ দেওয়া হয়ে ওঠেনি। তাই ইংরেজির Nesfield বা Guide to spelling and pronunciation এর মত বইকে যত গুরুত্ব দিই, বাংলাভাষায় ঐ ধরণের বইকে তত গুরুত্ব দিইনা। এর প্রতিকার প্রয়োজন।

"২০০০ সাল থেকে বিশ্বের প্রায় ১৯৩টি দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। বিশ্বে এথনোলগ-এর বিংশ সংস্করণের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ছয় হাজার থেকে আট হাজার ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা স্বমর্যাদায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে আছে।"

"বাংলা ভাষা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সর্বত্র এমনকি পৌঁছে গিয়েছে মহাকাশেও।" 

"আফ্রিকানরা গাইছে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো..."

বাংলা ভাষাকে ভালবাসা আর মর্যাদা দিতে একটিদিনই যেন যথেষ্ট। না, সকলের ব্যাপারে এক বাক্যে একই কথা অবশ্যই বলা যাবে না। তবে প্রয়োজন। একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে গুরুত্ব দেওয়া, বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষার উচ্চারণ কোষের বিশেষ প্রয়োজন।

প্রয়োজন মৌখিক ভাষাকে পরিশীলিত করার, যেহেতু লিখিত ভাষা মুখের ভাষার কাছাকাছি আসুক এটাই কাম্য। নাটকে চরিত্র বিশেষের রূপ দানের জন্য সেটি না হলেও তবু চলে।

ভাষা সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে বানান সংস্কারের অবশ্যই প্রয়োজন। শিখে আয়ত্ত করাই বাঞ্ছনীয়।

আর, বাংলাভাষা পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মাতৃভাষা। ভাষা সমস্যা সমাধানের উপায় উভয়কে একযোগে স্থির করতে হবে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সেই দেশের মানুষকে মুক্তি দেওয়া ভালো যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, রাষ্ট্রভাষাও নয়। 

শুনেছিলাম পৃথিবীর বুকে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ ব্যতীত আরও একটা দেশ আছে যাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারত থেকে আকাশ পথে ন'হাজার সাতশ আটচল্লিশ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম আফ্রিকায় আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত অসংখ্য খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ যাকে 'হীরার খনির গরিব দেশ' বলা হয়ে থাকে সেই সিয়েরা লিওনের (আয়তন ৭১ হাজার ৭৪০ বর্গকিলোমিটার) ৬০ লাখ দরিদ্র ও অসুখী মানুষের দ্বিতীয় অফিসিয়াল ভাষা হল বাংলা। দীর্ঘদিন এখানে ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। এ উপনিবেশটি গড়ে তোলা হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মুক্ত ক্রীতদাসদের নিয়ে। এরা সবাই ছিলো কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস। ১৯৬১ সালে সিয়েরা লিওন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। বর্তমানে সিয়েরা লিওনের সাংবিধানিক নাম সিয়েরা লিওন প্রজাতন্ত্র।

১৯৯১- ২০০২ সাল পর্যন্ত সিয়েরা লিওন সাক্ষী ছিল গৃহযুদ্ধের। ২০০২ সালের ১৮ই জানুয়ারি লড়াই এর অবসান ঘটাতে বাংলাদেশ থেকে আগত জাতি সংঘের (UN) ৫৩০০ শান্তিরক্ষী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। যুদ্ধ সমাপ্তির পর সিয়েরা লিওনের অত্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থা স্থিতিশীল করতে গণপূর্ত প্রকল্পে  সহায়তা করেছিল বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরা। ফল স্বরূপ কৃতজ্ঞতা বশত ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে সিয়েরা লিওনের তৎকালীন  রাষ্ট্রপতি আহমেদ তেজান কাব্বাহ্ বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দান করেন। তখন কিছু স্থানীয় মানুষ ধন্যবাদ জ্ঞাপনের প্রতীক হিসেবে বাংলা ভাষা শিখেছিলেন। কিন্তু সেখানকার  বহুল প্রচলিত স্থানীয় ভাষা 'ক্রিও' বা 'কিরিও' (broken English)। এছাড়া সেখানে মেন্দে, তেমনে  ভাষা প্রচলিত রয়েছে। তাছাড়া কোনো, কুরাঙ্ক, কিসসি, ফুলা, লিম্বা ভাষাভাষীর মানুষ রয়েছে। আরও কয়েকটি বিলুপ্ত প্রায় ভাষা রয়েছে যেমন ক্রিম, বোম, সেরব্রো।

পরিশেষে বলি, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী সবাই বাংলাভাষী নন। উত্তরে নেপালি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে সাঁওতালি ভাষাভাষীদের মাতৃভাষার চর্চা কিভাবে হবে, যে সব অবাঙালি মানুষ জীবিকা বা অন্যান্য প্রয়োজনে এখানে এসেছেন বা পুরুষাক্রমে বাস করছেন তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ কোন ভাষায় হবে - এগুলি বিবেচ্য। 

তবে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা বা পৃথিবীর অন্তত একটি রাষ্ট্রে বাংলা ভাষা যে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা পেয়েছে এটা আমাদের খুবই আনন্দের ও গৌরবের বিষয়।

(www.theoffnews.com - World wise Bengali)

ইসহাক খান, মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ: 

একটি ভয়াবহ দুসংবাদ শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। আমরা চলে আসার পর দুপুরের দিকে পাকিস্তানি মিলিটারি বড়ইতলী মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে অতর্কিত আক্রমণ করে। তুমুল সংঘর্ষ চলেছে দুই পক্ষের মধ্যে। কমান্ডার মোজাম্মেল ভাইয়ের বাহিনীর যোদ্ধারা যতটা ভাব দেখায় যুদ্ধে তারা ততটা পারদর্শী নয়। তাদের সাহসেরও যথেষ্ট ঘাটতি আছে। তারা সবাই সবুজ রঙের ইউনিফর্ম পরে। মাথায় স্বাধীন বাংলার পতাকা। তাদের ভাব-সাবই আলাদা। আর আমাদের দলে কোন ইউনিফর্ম নেই। বেশিরভাগেরই পরনে লুঙ্গি। কারও হাফপ্যান্ট। কদাচিৎ কারও কারও ফুলপ্যান্ট। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে আমাদের ছেলেরা মাটি কামড়ে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। বড়ইতলী যুদ্ধেও তাই ঘটেছে। পাকিস্তানি বিশাল বাহিনী এবং তাদের ভারী অস্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাঝপথে মোজাম্মেল বাহিনীর যোদ্ধারা পিছু হটে নিরাপদ স্থানে চলে যায়। আশরাফ ভাইয়ের বাহিনীর আমার সতীর্থ যোদ্ধারা শেষপর্যন্ত লড়াই করেছে। কিন্তু পাকিস্তানি বিশাল বাহিনীর কাছে টিকতে পারেনি। পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধে আমাদের একজন যোদ্ধা গুরুতর আহত হয়েছে। পরে পাকিস্তানি মিলিটারি গ্রামে ধ্বংসলীলা চালিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে গ্রামবাসীর বাড়িঘর। খবরটা শুনে মুষড়ে পড়লাম আমরা। আসগর বললো, ‘আমাদের ওখানে শেল্টার নেওয়াটাই ঠিক হয়নি। আমি তখনই না করেছিলাম। কিন্তু আমার কথা কেউ শুনলো না।’    

বিষণ্ণ মুখে আমরা নতুন কমান্ডার তৌহিদভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আসগর এবং আমাকে দেখে তৌহিদভাই খুশি হলেন। আগে থেকেই আমাদের দুজনকে তিনি পছন্দ করতেন। তার সঙ্গে মলয়ের পরিচয় হলো। ওর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে যা যা ঘটেছে সবই বলা হলো। শুধু বলা হলো না ও এখন মলয় নয় শফিক। 

খেয়াল করলাম কমান্ডার হওয়ার পর তার আচরণে বেশ খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। আগে থেকেই তিনি কম কথা বলতেন। এখন যেন সেই বলায় আরও মাপ-যোগ তৈরি হয়েছে। তাকে আমরা বড়ইতলী মিলিটারির আক্রমণ এবং রতনকান্দি হাটে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ‘পূর্ববাংলা কম্যুনিস্ট পার্টির’ লোকদের জোরপূর্বক চাঁদা তোলার কাহিনী বললাম। শুনে তার ফর্সা চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করলো। আমরা জানতাম পূর্ববাংলা কম্যুনিস্ট পার্টি এবং নক্সালদের তিনি সহ্য করতে পারেন না। সেটা স্বাধীনতার পর আরও তীব্র আকার ধারণ করেছিল। স্বাধীনতার পর সিরাজগঞ্জে তৌহিদ ছিলেন মূর্তিমান আতংক। এক কথায় ভয়ঙ্কর ত্রাস। আমরা কিছুতেই আগের তৌহিদকে স্বাধীনতার পরের তৌহিদের সঙ্গে মেলাতে পারতাম না। তার সঙ্গে স্বাভাবিক সৌজন্যমূলক কথাও হতো না আমাদের। ভয়ে আমরা তার থেকে দূরে-দূরে থাকতাম। সিরাজগঞ্জ আওয়ামী লীগ পরিচালিত হতো তার নির্দেশে। 

১৯৭৪ সালে সিরাজগঞ্জের পূর্ববাংলা কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা ‘মনিরুজ্জামান তারা’ ঢাকায় গ্রেফতার হয়। জেলখানা থেকে তাকে সিরাজগঞ্জ আনা হয় এবং তাকে হত্যা করা হয়। কথিত আছে সেই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সমস্ত কলকাঠি নেড়েছে তৌহিদ। সেই হত্যার প্রতিশোধ নিতে মনিরুজ্জামান তারার সহকর্মীরা নানাভাবে চেষ্টা করতে থাকে। তিন তিনবার তাকে আক্রমণ করা হয়। তিনবারই সে অলৌকিক ভাবে বেঁচে যায়। পরে একদিন প্রকাশ্য দিবালোকে কলেজ রোডে তৌহিদকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মনিরুজ্জামান তারা হত্যার প্রতিশোধ নেয় তারার সহকর্মীরা। 

ইসমাইলের চাঁদাবাজি এবং ডাকাতি বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দলের কয়েকজনকে তৌহিদভাই তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিলেন।  

শেলটারে ফিরে আসার পর মলয় আমাকে বললো, ‘তোর কি মনে আছে আমরা কিন্তু শীতের শুরুতে ওই রতনকান্দি হাটে চাদরের চারকোণা ধরে দোকানিদের কাছে সাহায্য চেয়েছি। সেদিন কিন্তু তারা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আমাদের সাহায্য করেছিল। টাকা পয়সা ছাড়াও কয়েকটি লুঙ্গি এবং গায়ের চাদরও দিয়েছিল।’ নিজের গায়ের চাদর দেখিয়ে মলয় বললো, ‘এটা কিন্তু রতনকান্দি হাটে জনগণের দেওয়া ভালবাসার সেই উপহার।’ 

বললাম, ‘আমরা যে একটা হাটে চাদর ধরে সাহায্য তুলেছিলাম সে কথা মনে আছে। কিন্তু সেই হাটটা যে রতনকান্দি সেটা আমি ভুলে গেছি।’ 

মলয় বললো, ‘দুটো ঘটনার চারিত্রিক পার্থক্য খেয়াল করেছিস। যখন আমরা তাদের কাছে সাহায্য চেয়েছি তারা আগ বাড়িয়ে আমাদের সাহায্য করেছে। আর ওরা যখন জোর করে চাঁদা নিচ্ছে তখন তাদের প্রতিক্রিয়া দেখেছিস, খুবই হতাশাজনক। আমরাও যদি তাদের সঙ্গে পাকিস্তানি মিলিটারিদের মতো আচরণ করি তাহলে ওদের আর আমাদের পার্থক্য রইলো কোথায়?’ 

‘দেখ মলয়, গ্রামের সাধারণ কৃষকরা যদি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের আশ্রয় না দিত, আমাদের খেতে না দিত, আমরা কোনভাবেই মুক্তিযুদ্ধ করতে পারতাম না। তাদের সঙ্গে যারা অমানবিক আচরণ করে তাদেরও আমার রাজাকারদের মতো হত্যা করতে ইচ্ছে করে।’  

‘শতভাগ ঠিক বলেছিস।’ বললো মলয়। 

আমি মলয়কে ভারত থেকে সিরাজগঞ্জে আসার পর একরাতের গল্প বললাম। গল্পটি বলতে গিয়ে আমি শিহরিত হয়ে পড়ি। চোখে পানি চলে আসে। 

‘বুঝলি মলয়, গভীর রাতে আমরা একটি গ্রামে আশ্রয়ের জন্য যাচ্ছি। 

গ্রামে ঢুকতে একটি ভাঙাচোরা বাড়ি। বাড়িটির পাশে মাটির বদনা হাতে একজন কৃষক যাচ্ছিলেন পাটক্ষেতে প্রাকৃতিক কর্ম সাড়তে। আমাদের দেখে মাঝারি বয়সের লোকটি ভয়ে কাঁপতে থাকে। কমান্ডার আশরাফভাই তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কে আপনি?’ 

লোকটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে, ‘আমি স্যার জমির কামলা। ক্ষেতে কাম করি।’ 

লোকটির কাঁপুনি দেখে মনে হচ্ছিল তার পায়খানার বেগ আর নেই। সম্ভবত পেটের উপরের দিকে উঠে গেছে। আশরাফভাই অভয় দিয়ে বললেন, ‘ভয় নেই। আমরা রাজাকার কিংবা মিলিটারি কোনটাই না। আমরা মুক্তিযোদ্ধা।’ তখন কৃষকটির চেহারায় খুশির যে আভা ফুটে উঠলো তা সারাজীবন আমার মনে থাকবে। আশরাফভাই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই গাঁয়ে কোন রাজাকার আছে?’ 

কৃষকটি প্রবল বেগে মাথা নেড়ে বললো, ‘জি না স্যার।’ 

‘যাক। তাহলেতো খুব ভাল হলো। শোনেন, আমরা আজ রাতে এই গাঁয়ে থাকবো। কোন কোন বাড়িতে থাকলে আমাদের সুবিধে হবে সেই ধরনের বাড়িতে আমাদের নিয়ে যাবেন। আপনি শুধু বাড়িটা দেখিয়ে দেবেন। যা বলার আমরা বলবো। আপনাকে কিছু বলতে হবে না। আপনি ফাঁকে থাকবেন। এখন চলেন আমাদের সঙ্গে।’ 

মোটামুটি সবারই নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা হলো। বাকি থাকলো কমান্ডারসহ আমরা কয়েকজন। 

এবার কৃষক লোকটি বললো, ‘চলেন। আমার এক চাচাতো ভাই আছে। বেশ অবস্থাপন্ন। সেও নৌকা মার্কার লোক।’ 

আমাদের একজন মজা করে বললো, ‘ভাইজান, আপনি কোন মার্কার লোক?’ লোকটি গর্বের সঙ্গে বললো, ‘এ গাঁয়ে সবাই নৌকা মার্কার লোক।’

‘অবাক কাণ্ড! সবাই নৌকা মার্কার লোক? কিন্তু আপনাকে দেখেতো রাজাকারের লোক বলে মনে হচ্ছে।’ 

আমাদের একজনের মজা করে বলা কথায় তিনি জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘ও কথা কইয়েন না ভাইজান। রাজাকার হওয়ার আগে আল্লায় য্যান মরণ দেয়।’ 

লোকটির জোরালো প্রতিবাদে আর কোন কথা হলো না। মোটামুটি রাজনৈতিক সচেতন বলে মনে হলো লোকটিকে। 

কমান্ডার বললেন, ‘চলেন, আপনার বাড়ি যাব।’ লোকটি ভীষণ অবাক,  ‘বলেন কি! আমার বাড়ি যাবেন! আচ্ছা চলেন।’  

আর কোন কথা না বলে লোকটি আগে আগে চললো আমরা তার পিছে পিছে তার বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম। বাড়িতে ছোনের ছাউনির একটি মাত্র ঘর। পাটসোলার বেড়া। তাও আবার মাঝে মাঝে ভেঙে পড়েছে। বাইরের উঠোনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। কমান্ডার বললেন, ‘আপনার ঘরে যারা ঘুমিয়ে আছে তাদের ডেকে তোলেন। তাদের বলেন, আজকের রাতটা তারা অন্য কোথাও কষ্ট করে কাটিয়ে দিক। এই ঘরে আজ রাতে আমরা থাকবো।’

‘কি বলছেন স্যার!’ লোকটি যেন আকাশ থেকে পড়লো। আশরাফভাই কড়া ভাষায় বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। যা বলছি তাই করুন।’ লোকটি তবু বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এবার ধমকে উঠলেন আশরাফভাই। ‘যান, দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’ 

লোকটির বিন্ময়ের ঘোর কাটছে না। সে চলে যাবার পর আমাদের একজন সেই ঘরে গিয়ে ফিরে এসে বললো, ‘এখানে থাকা সম্ভব না আশরাফভাই। থাকার কোন ব্যবস্থা নেই।’  

‘তারপরও এখানেই থাকতে হবে।’ আশরাফভাই তারপর জোর দিয়ে বললেন, ‘তোমরা কি সবাই যুদ্ধের কলা কৌশল সব গুলিয়ে খেয়ে ফেলেছ? একমাত্র ওই লোকটা জানে আমাদের ছেলেরা কে কোন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। ও যদি মিলিটারিদের খবর দিয়ে নিয়ে আসে, তখন? ওই লোকটা আমাদের সঙ্গে গাদ্দারি করবে না তার গ্যারান্টি কি? শোন, ওকে চোখে চোখে রাখতে হবে। একজন রাত জেগে তাকে পাহারা দেবে। বাকিরা ঘুমাবে।’

ঘরে ঢুকে আমরা হতবাক। আসবাব বলতে একটি চৌকি। সেখানে ময়লাযুক্ত একটি কাঁথা। তেল চিটচিটে কয়েকটি বালিশ। এখানে কে কিভাবে ঘুমাবে সেটাই যখন সবাই ভাবছিল তখন আশরাফভাই ব্যাগ থেকে একটি লুঙ্গি বের করে মেঝেতে বিছিয়ে মাথার নিচে ব্যাগ দিয়ে শুয়ে পড়লেন। তার আগে তিনি লোকটিকে ডেকে বললেন, ‘আমাদের অর্ডার ছাড়া আপনি কোথাও যাবেন না। সকালে আমাদের কাছে থেকে টাকা নিয়ে বাজার করে আনবেন। সঙ্গে আমাদের একজন লোক আপনার সঙ্গে যাবে। মনে থাকবে?'

কমান্ডার মেঝেতে শুয়ে পড়েছে বাকিরা কি আর অন্য কিছু ভাবতে পারে? তারাও যার যার ব্যাগ মাথার নিচে দিয়ে  মেঝেতে লুঙ্গি বিছিয়ে শুয়ে পড়ে। আমাদের একজন পাশের বাড়ি থেকে খড়ের পালা থেকে এক পাঁজা খড় [আঞ্চলিক ভাষায় আমরা বলি ‘খ্যাড়’] নিয়ে এলে আমরা খুশিতে সেই খ্যাড় ছড়িয়ে তারউপর লুঙ্গি বিছিয়ে শুয়ে পড়ি। আশরাফভাইকেও একই ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো। খ্যাড়ের উপর শুয়ে আশরাফভাই সন্তোষ প্রকাশ করলেন। ‘বাহ। এখনতো বেশ ওম লাগছে।’ কে একজন বললো, ‘খ্যাড় না হলে মেঝের ঠাণ্ডায় জইমা যাইতেন।’

ঘুম ভাঙ্গলো দুপুরের দিকে। ক্ষুধায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। রাতেও খাওয়া হয়নি। কখন বাজার করবে কখন রান্না হবে তারপর খাওয়া। ক্ষুধার কথা কাউকে বলতেও পারছি না আবার সহ্য করতেও পারছি না। 

এইসময় কৃষক লোকটি এসে বললো, ‘আপনারা হাতমুখ ধুইয়া লন। আমি খাওয়া আনতাছি।’ বলেই লোকটি চলে গেল। আমরা ঘরের এক কোণে বদনার পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিলাম। গোল হয়ে বসে পড়লাম আমরা। আশরাফভাই গুম মেরে বসে আছেন। আমরা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। 

লোকটি প্রথমে পানির জগ এনে রাখলো। দরজার কাছাকাছি এসে লোকটির স্ত্রী [সম্ভবত] এটা সেটা এগিয়ে দিতে থাকে। আয়োজন দেখে আমাদের চোখ কপালে উঠে গেছে। পানির জগ দেখেই আমাদের চোখ চড়ক গাছ। দামী ঝকঝকে কাঁচের জগ। প্লেটের অবস্থাও জমকালো।  চিকন চালের ভাত। নানান পদের বাহারি তরকারি। মাছ আছে। মুরগির মাংস আছে। ডাল। ভাঁজি। দেখে জিভায় পানি এসে গেল। কিন্তু আশরাফভাইয়ের গোমড়া মুখ আমাদের মনে নানান প্রশ্নের জন্ম দিতে থাকে। হঠাৎ তিনি রাগমুখে বলে উঠলেন, ‘এসব আপনি কোথায় পেলেন?’ 

লোকটি থতমত খেয়ে বললো, ‘আমার ভাইয়ের বাড়ি থেকে ধার কইরা আনছি।’

‘আপনাকে না বলেছিলাম, আমাদের পারমিশন ছাড়া আপনি কোথাও যাবেন না। কেন গেছেন আমাদের হুকুম ছাড়া?’ 

লোকটি ভয়ার্ত মুখে বললো, ‘আমি যাই নাই। আমার পরিবার গিয়া চায়া আনছে।’

‘ধার শোধ দিবেন কিভাবে?’ 

‘কামলা খাইটা শোধ দিমু।’

‘আপনাকে যে বলেছিলাম আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাজার করবেন। সে কথা আপনার মনে ছিল না?’ লোকটি জবাব না দিয়ে মাথা নামিয়ে থাকে। আশরাফভাই ধমকে ওঠেন, ‘নিয়ে যান আপনার ধারের জিনিস। ধার করা জিনিস আমরা খাব না।’ 

আমাদের অবাক করে দিয়ে লোকটি হঠাৎ কান্না গলায় বলে উঠলো, ‘আপনারা যারা জীবন বাজি রাইখা দেশের জন্য যুদ্ধ করতাছেন তাদের যদি একবেলা খাইবার দিবার না পারি তাইলে এ জীবন থাইকা লাভ কি? দেশটাতো আমারও। আপনাদের একবেলা খাওয়ানোর সুযোগ পামু না। এই পোড়া কপাল দিয়া আল্লাহ্‌ ক্যান আমারে দুনিয়ায় পাঠাইল?’ 

বলেই লোকটি শব্দ করে কাঁদতে লাগলো। তার কান্না এবং আবেগঘন কথায় আমাদের চোখেও পানি চলে এলো। দেখলাম আশরাফভাইয়ের চোখও ভেজা। কান্না গলায় তিনি সবাইকে খাওয়া শুরু করতে বললেন। আমরা কাঁদছি আর খাচ্ছি। কোত্থেকে কান্না উঠে আসছে বুঝতে পারছি না। চোখে বর্ষার ধারা বয়ে যাচ্ছে। লোকটির মুখে তখন অনাবিল হাসি। যেন এতো সুখ তার জীবনে কখনও আসেনি। [চলবে] 

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Bangladesh muktijuddho)

কাকলি সেনগুপ্ত, চিত্রশিল্পী ও সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

(www.theoffnews.com - painting)