গুরুত্বপূর্ণ খবর

চন্দ্রিমা দত্ত (সাঁজবাতি), লেখিকা ও শিক্ষিকা, শ্রীরামপুর, হুগলি:

জীবনের প্রধান রং তিনটে। এক সাদা, যা শুদ্ধতা, দুই কালো -পবিত্রতা। পবিত্রতা বলার কারণ মৃত্যুর রং কালো। তৃতীয় রং লাল যা সাফল্য। রামধনুতে যে সাত রং আছে বৈজ্ঞানিকরা বলবেন সবগুলো মেলালে হবে সাদা। কিন্তু একজন দার্শনিক? তিনি বলবেন আরেকটি রং আছে তা সোনা রং। সেই রং অনেক সময় লালের অভাবে উপস্থিত থাকতে পারে না। আসলে এই সোনা রং একজন দার্শনিকের স্বর্ণ বোধ। নচিকেতা চক্রবর্তী এই বোধের আরেক নাম।

কিন্তু সাফল্যের লাল রং আর স্বার্থকতার সোনা বর্ণ সবসময় একসাথে পাওয়া যায় না। একজন শিল্পী  শুধু দৃষ্টি আছে, কান আছে, সুর সাধনা আছে, হৃদয় তন্ত্রীতে বীণা আছে, কবিত্ব শক্তি আছে ইত্যাদি ইত্যাদি আছের নিরিখে রঙিন হবেন এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। এরকম অনেকেই আছেন। কিন্তু তিনি যদি সর্বদা উচ্চ মিনারে বসে থাকেন তবে তাঁর সর্বত্র গমন নেই, তিনি বিচ্ছিন্ন সবার থেকে এমনকি নিজের থেকেও। তাঁর জন্য লাল রং শুধু।

আজ, কাল এবং আগামীতে নচিকেতা চক্রবর্তী থাকবেন, কেননা তিনি তাঁর মেধার রং, সরলতার রং, কথার রং রোদের মতন ছড়িয়েছেন। একজন অধ্যাপকের যেমন নচিকেতা আছেন, একজন রিক্সাওয়ালা বা জনমজুরেরও তিনি আছেন । আছেন এদের কৈশোর, যৌবন, বৃদ্ধ সমস্ত বয়েসের মধ্যেই।

রোদের রং কি?

(www.theoffnews.com - Nachiketa)

শামা আরজু, লেখক, বাংলাদেশ:

দুই যুগেরও বেশি সময় অমাবশ্যা- পূর্ণিমা, শীত- বর্ষা, টিনের চালে বৃষ্টি কিংবা উথাল পাতাল ঝড়ের কোনো অনুভূতিই আমার ছিল না। সেই আর্মির বাচ্চা, সেই ম্যারিনার কিংবা ফারুক কারো সাথেই এসব নিয়ে কোনো কথাই হতো না। প্রেম ভালোবাসর অনুভূতি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। কেবল এক বর্ষার রাতে আনিস থাকতে চেয়েছিল কোটি কোটি আদর করবে বলে, রাজি হইনি বলে গজগজ করে কী কী যেন বলতে বলতে বেরিয়ে গেলো। ওর গায়ে সেদিন ভালোই জ্বর ছিলো। পিছন থেকে ডেকে ছাতাটা এগিয়ে দিলাম। ওর মুখের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করলেও ভয়ে তাকাইনি। আনিস ছাতাটা হাত বাড়িয়ে নিল। আর মটমট করে ভেঙ্গে ফেলে দিলো ছুঁড়ে। তখন মনে হয়েছিলো কেবল ছাতাই ভাঙ্গলো বুঝি। পরে বুঝলাম না কেবল ছাতাই ভাঙ্গেনি।

আনিস চলে গেলে সে রাতে খালি ফ্লোরে গড়াগড়ি দিয়ে কতো যে কাঁদলাম! ইচ্ছে করেছিল দৌড়ে গিয়ে ডেকে আনি ওকে। জীবনভর আমার ইচ্ছে দমন! খুব কাছেই থাকে আনিস।ও আমার নয়, অন্য কারো। অসুস্থ। মাইকে মৃত্যু সংবাদ শুনলে কান পাতি। বুঝি আনিসই মরে গেলো! বুঝি আনিস ছাড়া আর কারও মরতে নেই। না, আমি তার মৃত্যু কামনা করি না। ওকে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে খুব। তাও সবসময় না। সময় কই, ভুলেই তো থাকি। মাঝে মাঝেই ইচ্ছেটা খুব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বিশেষ করে মাইকে মৃত্যু সংবাদ শুনলে।

আমি তোমাকে, না আপনাকে দেখতে আসবো আনিস। আপনার স্ত্রীকে বলবো, "দেখুন আমি ওকে ভালোবাসতাম। কথাটা ও বুঝতো। কিন্তু আমি কখনও সেটা স্বীকার করিনি বলে ও খুব রেগেছিল আমার ওপর। আজ আমি ওকে সত্যটা বলবো।" আপনার বউ লাশের সামনে অত নিষ্ঠুর হবে না। আমি সেদিন আপনাকে তুমি করেই বলবো। বলবো, "আনিস, আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসতাম। বলিনি, হারানোর ভয়ে।" ভালোবাসার প্রকাশ পুরুষের ধাতে সয় না।

পেয়ে হারানোর চাইতে না পাওয়ার কষ্ট অনেক কম। এটা বুঝিয়েছে আর একজন। সে আনিস নয়। অন্য কেউ। যাকে আমি পেয়ে হারিয়েছি।

আমার কেন একটু পাওয়ার গল্প হয় না! জগতের সকল হারানোর গল্প কেবল আমারই কেন হতে হয়।এই মহামারী কতো জনকেই না নিয়ে গেলো। আমার গল্পগুলি কি থমকে যাবে!

(www.theoffnews.com - Bangladesh lost love)

দেবস্মিতা ধর, চিত্রগ্রাহক ও ফিচার রাইটার, কলকাতা:

(www.theoffnews.com - photography)

ইসহাক খান, মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট বাংলাদেশ:

বাহাদুরাবাদ ঘাট পেছনে ফেলে আমাদের নৌকা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। আমরা টের পাইনি। মাঝিদের গলা ছেড়ে গান গাওয়ার শব্দে আমরা সচকিত হলাম। গত দুইদিন মাঝিদের সাড়া শব্দ ছিল না। নিজেরা কথা বলেছে ফিস-ফিসিয়ে। হঠাৎ তাদের গলা ছেড়ে গান গাওয়ার মাজেজা কি? ব্যাপারটা বোঝার জন্য নৌকার পেছনের দিকের যে ছই, সেই ছইয়ের দরোজা খুলে হালের মাঝিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘চাচা, খবর কি? মনে এত ফুর্তি ভাব ক্যা’? চাচা একগাল হেসে বললেন, ‘আপনারা বাইরে আসতে পারেন। ফাড়া কাইটা গেছে’। এ কথার পর আর আমাদের পায় কে? লাফিয়ে ঝাপিয়ে আমরা বাইরে এলাম। 

ফাড়া কাটা মানে আমরা বাহাদুরাবাদ ঘাট পার হয়ে এসেছি। বাহাদুরাবাদ ঘাটে পাক আর্মির বড় ঘাঁটি। গান বোট নিয়ে ব্যাটারা নদী পাহারা দেয়। এর আগে কয়েকটি নৌকা থেকে যুবকদের ধরে নিয়ে হত্যা করে যমুনায় ভাসিয়ে দিয়েছে। তারাও আমাদের মতো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতে যাচ্ছিল। এই জন্যে আমাদের আগেই মাঝিরা সতর্ক করেছিল। বলেছিল, বাহাদুরাবাদ ঘাট পার হওয়ার আগে আমরা যেন কোনভাবেই ছইয়ের বাইরে না বেরোই। 

ফাড়া কেটে গেছে মানে আমরা বাহাদুরাবাদ ঘাট পার হয়েছি।

ছইয়ের বাইরে এসে দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ দেখে আমার মন প্রাণ চঞ্চল হয়ে উঠলো। আনন্দে ভরে উঠলো মন। মনে হচ্ছিল কতদিন দিনের বাংলাদেশ দেখি না। এমন হৃদয় খোলা পরিবেশে যে কারো কণ্ঠে গান নেচে উঠবে। আমারও কণ্ঠে গান নেচে উঠলো। গলা ছেড়ে প্রিয় গানটি অবচেতন ভাবে কণ্ঠে সুর তুললো। আমি গাইলাম পরম মমতায়। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’।

আমার মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। হঠাৎ দেশমাতৃকা এসে ভর করলো আমার বুকে। বললাম, ‘হে জননী জন্মভুমি, তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি। তুমি কি আবার আমাদের তোমার কোলে আশ্রয় দেবে? 

হঠাৎ পাশ থেকে একটি আওয়াজ ভেসে এলো। 

‘দেবে। অবশ্যই আশ্রয় দেবে। আমরা দেশকে শত্রুমুক্ত করে ফিরলে দেশ অবশ্যই আমাদের কোলে তুলে নেবে’। তাকিয়ে দেখি বন্ধু আসগর। আমার পাশে বসতে বসতে কথাগুলো বললো। আমার কাছের বন্ধু সে। সব সময় সে আমাকে সাহস যোগাতো। আমি কখনও হতাশা প্রকাশ করলে তুড়ি মেরে আমার হতাশা উড়িয়ে দিত। ৭০ সালে আমরা একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। পাকিস্তানের লাস্ট ব্যাচ আমরা। আবার দেশের টানে একসঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়েছি। 

সুঠাম দেহি হালের মাঝি এক হাতে হালের বৈঠা ধরে অন্যহাতে হুঁকো টানছে। কষে দম দিয়ে তারপর কয়লার ইঞ্জিনের মতো ধুয়ো ছাড়ছেন মুখ দিয়ে। এই হুঁকোর চল আমাদের বাড়িতেও আছে। আমাদের বাড়ির কামলারা হুঁকো টানে। তাদের জন্য অনেকদিন আমি বাজার থেকে তামাক এনে দিয়েছি। কৃষকগঞ্জ বাজ্যারের মাঝামাঝি স্থানে বিখ্যাত ‘কুদ্দুসের তামাকের দোকান’। তাঁর তামাক ডলা দেখার মতো। নিপুন হাতে তিনি তামাক এবং খামুরে দিয়ে ডলে তামাক তৈরি করতেন। দোকানে সারাক্ষণ একটি কল্কিতে তামাক জ্বালানো থাকতো। অনেকেই বিনে পয়সায় সেই তামাকে টান দিয়ে নেশা মিটিয়ে নিতো। সেখানকার একটি মজার দৃশ্য আজও আমার চোখে লেগে আছে। একজন কল্কি টানছে সঙ্গে কয়েকটি হাত কল্কি ধরে আছে। তার টানা শেষ হলে আরেকজন টানবে। কিন্তু কল্কি ধরা হাত কমছে না। বিস্ময়ভরা চোখে আমি এই দৃশ্য উপভোগ করতাম।

আমাদের নৌকার হালের মাঝি আয়েশে হুঁকো টেনে যাচ্ছেন। তার কাশফুলের মতো সাদা ধবধবে দাড়ি এবং চুল বাতাসে উড়ছে। তার পেটা শরীর। যৌবনে আরও তাকত ছিল বোঝা যায়। আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘চাচা, আমি কি আপনার হুঁকোয় একটু দম দিতে পারি’?       

বললেন, ‘অভ্যেস আছে? পারবেন’?

বললাম, ‘পারবো’। 

প্রাইমারি থেকে বিড়ি খাই। হুঁকোও খেয়েছি ঠেকায় পড়ে। না পাড়ার কিছু নেই। হুঁকো নিয়ে কষে দম দিলাম। হালের মাঝি আমার দিকে অবাক চোখে তাকালেন। হেসে বললেন, ‘আগে কখনও খাইছেন অক্কা’? বললাম, 'অনেক খেয়েছি। আমাদের বাড়িতে দুজন কামলা আছে। তারা হুঁকা খায়। তাদের সঙ্গে খেয়েছি’। মাঝি চাচা হে হে করে হাসলেন। তার পান খাওয়া লালচে দাঁত পড়ন্ত বিকেলের সোনালি আলোতে ঝলমল করে উঠলো। জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচা, আপনার বয়স কত’? চাচা একগাল হেসে বললেন, ‘বয়সের হিসাব কে রাখে? হবে তিন চার কুড়ি’। 

আমার ধারণা চার কুড়ি হবে না। তবে তিন কুড়ির বেশি। আমি মজা করে বললাম, আপনাকে দেখেতো মনে হয় আপনার বয়স দুই কুড়ি’। আমার এই কথায় চাচার সে কি হাসি। সেই প্রাণখোলা হাসি যমুনার ঘোলা জলে ভেসে ভেসে বার বার কানে এসে বাজতে লাগলো। 

নৌকা বেশ জোরে চলছে। কিভাবে এত জোরে চলছে? মুহূর্তে আমার ভাবনা কেটে গেল। এতক্ষণ একবারও খেয়াল হয়নি। নৌকা চলছে পালে। যমুনা নদীর বুক জুড়ে রঙ-বেরঙের পাল তোলা নৌকা। সে এক অপরূপ দৃশ্য। যমুনার বিশাল বুক জুড়ে নানা বর্ণের শুধু পালের নৌকা। যেন সরোবরে নানা জাতের অসংখ্য রঙিন ফুল। আমাদের নৌকায় উড়ছে তিন পাল। একটার উপর আরেকটা। এইভাবে তিন পাল। মাঝের পালটি লাল বর্ণের। মনে হচ্ছে জাতির রক্তাক্ত পতাকা। এমন মনোলোভা দৃশ্য এখনও মনে গেঁথে আছে। জনম জনম মনে থাকবে। 

আমাদের আরও একটি নৌকা, যে নৌকায় সুকুর মামু - জহুরুল মোস্তফা এবং রাজ্জাক আছে। সে নৌকাও তিন পালে চলছে। সেটা আমাদের পেছনে পেছনে আসছে। দেখলাম নৌকার আগা গলুইতে চাদর গায়ে মোস্তফা শুয়ে শুয়ে গলা ছেড়ে লালনগীতি গাচ্ছে। পানির উপর বাতাসে ভেসে আসা মোস্তফার বেসুরো লালনগীতি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।                   

একটু পেছনের নৌকায় হৈচৈ। মাঝিরা পাল গুটিয়ে ফেলছে। আমরা আতংকিত মুখে চেঁচিয়ে ‘কি হয়েছে’ জানতে চাচ্ছি। জহুরুল চেঁচিয়ে বললো, ‘মোস্তফা নৌকা থেকে যমুনায় পড়ে গেছে’। 

শুনে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগলো। যমুনার এত স্রোতে ভেসে না জানি কোথায় চলে গেছে। সত্যি মোস্তফাকে উদ্ধার করা যাবে কি? আকংকে আমাদের কথা আসছে না মুখে। দ্রুত আমাদের নৌকার পালও গুটিয়ে ফেলা হলো।[চলবে]

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Bangladesh muktijuddho)

সুস্মিতা সেনগুপ্ত, লেখিকা ও শিক্ষিকা, বারাসাত, কলকাতা:

আমরা জানি প্রানীজ খাদ্য মানেই আমিষ। কিন্তু হিন্দু ধর্মের মানুষ ও অন্যান্য কিছু ধর্মের মানুষ পেঁয়াজ, রসুন, মুসুরির ডালকে নিরামিষের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন, প্রাচীন যুগ থেকে। আসলে এই জিনিস গুলোর মধ্যে তাঁরা কিছু কাল্পনিক জিনিস দেখেন।

যেমন পেঁয়াজ: পেঁয়াজ লম্বালম্বি করে যদি কাটা যায়, তাহলে তার ভেতরে সাদা অংশটি একদম শঙ্খের মতো, আর যদি আড়াআড়ি ভাবে কাটা যায় তাহলে ভেতরে দেখা যায়, দুটো চক্রের মতো। পেঁয়াজের একটা একটা করে খোঁসা ছাড়ালে শেষে আর কিছু থাকেনা। থাকে শুধু যে কাটে, তার চোখে জল। যেন চোখের জলে বিদায়। এটাই জীবন। 

রসুন: রসুনের একটা কোয়া যেন একটা গদা। এরকমই দেখতে।

মুসুরির ডাল: মুসুরির ডালের রং গোলাপি পদ্মের মতো।

তাই ভাগবতে এগুলোকে শঙ্খ, চক্র, গদা,পদ্মের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যা আমরা ভগবান বিষ্ণুর হাতে দেখি। ভাগবতের এই তুলনায় এগুলোকে আমিষ হিসেবে ভক্ষন করা হয় না। আবার রং হিসেবে যদি বিচার করা হয়, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। লাল বলতে ব্রহ্মা, যা ডাল। গোলাপি, সাদা আভায় পেঁয়াজ, বিষ্ণু সাদৃশ্য। সাদা রসুনের রং মহেশ্বর।

(www.theoffnews.com - onion dal religion)

ইসহাক খান, মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ:

আমরা যে নৌকায় উঠলাম সেগুলো মূলত মাল বহনের জন্য ব্যবহৃত নৌকা। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় এ নৌকাকে বলে বজরা নৌকা। বিশাল আকৃতির সেই নৌকা। ছোটখাটো লঞ্চ বলা যায়। ছইয়ের ভেতর অনেক জায়গা। পার্টিশন করে রুম ভাগ করা। আমরা যে নৌকায় উঠলাম সেখানে আমরা ছাড়া আরও দু’টো পরিবার যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে। তারা হিন্দু সম্প্রদাইয়ের মানুষ। পাকিস্তানি মিলিটারির ভয়ে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যাচ্ছে। পাকিস্তানি মিলিটারি হিন্দু এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী পেলে কিছুতেই ছাড় দিচ্ছে না। এই

দুই ধরণের মানুষকে বেছে-বেছে তারা মেরে ফেলছে। এদের জন্য দেশ ভীষণ অনিরাপদ হয়ে হয়ে উঠেছে। দুই পরিবারের বাবা-মা ছাড়াও যুবক বয়সী তিনজন ছেলে মেয়ে ছিল। আর ছিল বালক এবং শিশু  বয়সী দু’তিনজন। আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে নৌকার ভেতরে থাকতাম, খেতাম এবং ঘুমাতাম। 

আমরা পাশাপাশি দু’নৌকায় ভাগ হয়ে গেলাম। একই মালিকের দু’নৌকা। থাকা খাওয়ার সুবিধের জন্য আমরা নয়জন দুভাগ হয়ে দু’নৌকায় চড়লাম। একভাগে আমি, আসাদুজ্জামান খোকন, সাইফুল ইসলাম মিন্টু, শাজাহান, সরকার আলী আসগর। অন্যটিতে রফিকুল আলম সুকুর, মোস্তফা, জহুরুল ইসলাম খান এবং আব্দুর রাজ্জাক খান [মোটা রাজ্জাক]। 

পাকিস্তানি মিলিটারিদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য নৌকার সামনে কয়েকটি ভুসি মালের বস্তা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে দূর থেকে পাকিস্তানিরা দেখলে বুঝতে পারে নৌকায় মালামাল বহন করা হচ্ছে। অথচ নৌকার ভেতরে আমরা আরও দু’টো পরিবার এবং দুই পরিবারের যুবক যুবতী বালক বালিকারা ঘাপটি মেরে আছি। আমাদের সতর্ক করা হয়েছে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত বিপজ্জনক এরিয়া। এই সময় কিছুতেই ছইয়ের বাইরে যাওয়া চলবে না। 

দালালের কাছে আমরা আগেই জেনেছি আমাদের ভারতে পৌছতে তিনদিন লাগবে। পথে খাওয়া-দাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস যেন আমরা সংগ্রহ করে তবেই যাত্রা করি। সেই মতো আমরা আগেরদিন বিকেলে স্থানীয় ‘পাকিস্তান হাট’ থেকে চাল-ডাল আলু পেঁয়াজ তরি-তরকারি কিনে নিয়েছি। নৌকার ভেতরে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা আছে। মাটির তৈরি বহনযোগ্য চুলা আর লাকড়ি এগুলো নৌকার মাঝিদের সংগৃহীত। আমরা সবাই সেটা ব্যবহার করছি। কাকিমারা রান্না করার পর আমাদের রান্নার আয়োজন শুরু হতো। আমাদের পর মাঝিরা। তারা সংখ্যায় ৮ জন। 

আমাদের রান্নার কাজে সাহায্য করতো বুড়ি। বুড়ি কলেজ পড়ুয়া আমার বয়সী একটি মেয়ে। আমিও কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। বুড়ি আমার ইয়ারমেট। 

দুই পরিবারের মধ্যে শুধু বুড়ির নামটা এখনও মনে আছে। নিশ্চয়ই তার পোশাকি কোন নাম ছিল। কিন্তু সেটা জানা হয়নি। বুড়ি সিরাজগঞ্জ ডিগ্রী কলেজে পড়তো। মাঝারি গড়নের শ্যামলা মেয়েটি মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে আমাদের সবার মন জয় করে নিয়েছিল। যেন আমরা আপন ভাইবোন। এতো গুলো বছর পরও বুড়ির কথা হৃদয়ে গেঁথে আছে। সেই যে দেশ ছেড়ে গেলাম তারপর আর কখনও বুড়িদের সঙ্গে আমার বা আমাদের কখনও দেখা হয়নি। আমার অন্য বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হউয়ার কথাও জানতে পারিনি। জানি না বুড়িরা কোথায় কেমন আছে?             

বুড়ির নামটা মনে থাকার আরও একটি বড় কারণ হলো আমাদের রান্নার দায়িত্বে ছিল শাজাহান। যিনি পেশায় তাঁতশ্রমিক। যার ভারত যাওয়ার নৌকা ভাড়া আমাদের দিতে হয়েছে। আমাদের মধ্যে একমাত্র সেই বিবাহিত। আমরা তাকে বলতাম ম্যারিড ব্যাচেলর। বিয়ে করেছে কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে একঘরে থাকার সুযোগ হয় না। বাড়িতে বাড়তি ঘরের অভাব। শশুর বাড়িতেও একই সনস্যা। এই নিয়ে তার ভয়ংকর খেদ। রাগে দুঃখে তার নাকি মরে যেতে ইচ্ছে করে। সেই শাজাহান কথা বলতো ভীষণ দ্রুতলয়ে। কথা অনেক সময় জড়িয়ে যেত। সে রান্নার সময় বুড়িকে দ্রুতলয়ে কয়েকবার নাম ধরে ডাকতো। আর এই ব্যাপারটা নিয়ে রসালো ভাবে মজা করতো আসাদুজ্জামান খোকন। অবিকল শাজাহানের কণ্ঠে বুড়ি-বুড়ি-বুড়ি বলে ডেকে শাজাহানের সঙ্গে রঙ্গ তামাশা জুড়ে দিত। বলতো বুড়ির সঙ্গে শাজাহানের গভীর প্রেমপর্ব

চলছে-আমরা সেই তামাশা ভীষণ উপভোগ করতাম। শাজাহানকে এই নিয়ে কখনও মন খারাপ করতে দেখিনি। ভেতরে ভেতরে সেও এনজয় করতো। 

বুড়ি এবং তার দাদাদের অধিকাংশ সময় আলাপের বিষয় থাকতো ভারতে পৌঁছে তারা কিভাবে কলকাতা যাবে। কলকাতায় তাদের আত্মীয় আছে। তারা সেই আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে উঠবে। কলকাতা যাওয়া নিয়ে তারা ভীষণ চিন্তিত। 

আমরা জেনেছি আমাদের নৌকা ভারতের আসাম রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা ছোট শহর মাইকেরচর গিয়ে আমাদের নামিয়ে দেবে। সেখান থেকে আমরা তিন/চার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ভারতের পেটের ভেতর বাংলাদেশের রউমারি থানা, আমরা সেখানে যাব। সেটা মুক্তাঞ্চল। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাইমারি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

আমরা উভয়ই যার যার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য উতলা। রাত এলে সময়টা ভীষণ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। রাতে নৌকা চলে না। নদীর ধারে কাশবনের ভেতর কোন নিরাপদ জায়গায় নৌকা ঢুকিয়ে দিনের জন্য অনন্ত অপেক্ষায় থাকি আমরা। কখন ভোর হবে। কখন আবার যাত্রা হবে। কবে পৌঁছবো কাঙ্খিত স্থানে। [চলবে]

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Bangladesh muktijuddho)

সাজিয়া আক্তার, রেসিডেন্সিয়াল এডিটর (বাংলাদেশ), দ্য অফনিউজ:

নাটক বা সিনেমার দৃশ্যে দেখা যায় বিয়ের দিন কন্যার সব গহনা চুরি হয়ে গেছে। এমনি একটা ঘটনা ঘটেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব কলকাতার বেলেঘাটা এলাকায়। যেখানে শ্যালকের বিয়ের গহনা চুরি করলেন দুলাভাই।

সোমবার (২৫ জানুয়ারি) ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম সংবাদ প্রতিদিনের একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। 

বিয়ের দিন আলমারির ভিতর থেকে নবদম্পতির বিয়ের যাবতীয় গয়না চুরি হয়ে গেছে। আর তাতেই পরিবারের সবার মাথায় হাত। তবে এই চুরির তদন্ত করতে গিয়ে অনেকটা অবাক হয়েছে পুলিশ। যে চুরি করেছে সে ওই বাড়িরই জামাই। তার নাম পার্থসারথী ঘোষ। পূর্ব কলকাতার বেলেঘাটা পুলিশ তাকে এ ঘটনায় গ্রেফতার করেছে।

কলকাতার বেহালার রায়বাহাদুর রায় রোডে অভিযোগকারীর মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ পুরো আট লাখ টাকার গয়না উদ্ধার করে। পেশায় উদ্যানতত্ত্ববিদ পার্থসারথী একটি নার্সারির মালিক। কিন্তু লকডাউনের পর থেকে তার ব্যবসা ভাল যাচ্ছিল না। আর এক সাথে শ্যালকের এতো গয়না দেখে লোভ সামলাতে পারেননি জামাই। 

পুলিশ ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, গত ১৭ জানুয়ারি ওই দম্পতির বিয়ে হয়। বিয়ের যাবতীয় গয়না বেলেঘাটার সুরেন সরকার রোডে দম্পতির ফ্ল্যাটের শোওয়ার ঘরে আলমারিতে রাখা হয়। কিন্তু ১৯ জানুয়ারি নবদম্পতি দেখেন, আলমারি থেকে উধাও পুরো গয়না। আর এতেই বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। এই ব্যাপারে ছেলের বাবা বেলেঘাটা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।

পুলিশের সন্দেহ হয়, বাড়ির কেউ চুরি করেছেন। সেই অনুযায়ী সবাইকে জেরা করাও শুরু হয়। কারা ওই ঘরে গিয়েছিলেন, সেই সূত্র ধরেই পুলিশ তদন্ত করতে শুরু করে। সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে বাড়ির বড় জামাই পার্থসারথীর উপর। একটানা জেরার মুখে ভেঙে পড়েন তিনি।

জেরা করার পর পুলিশ জানতে পারে যে, বাড়ির জামাই সুযোগ বুঝে শ্যালকের ঘরে ঢুকে আলমারির চাবি চুরি করেন। এরপর পুরো গয়না হাতিয়ে নিয়ে বেহালায় নিজের বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে রাখেন। ধৃত ব্যক্তিকে জেরা করা হচ্ছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছে পুলিশ।

(www.theoffnews.com - Bangladesh Kolkata ornaments theft)

সুখময় ঘোষ, লেখক, শ্রীরামপুর, হুগলি: 

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের হাওয়ায় হিন্দিভাষী চতুর রাজনীতিকরা বাংলার সংস্কৃতির পোষাক পরে মাঠে নেমে পড়েছে। বিজেপি-র বাংলার মনীষিদের সাথে একাত্ম হতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান হয়ে গিয়েছে শান্তিনিকেতন। বীরশা মুন্ডার মুর্তির গলার মালা উঠেছে এক আদিবাসী শিকারী মূর্তির গলায়। পাশপাশি বিবেকানন্দের বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। চৈতন্য  মহাপ্রভুর দীক্ষাস্থান গুলিয়ে দিয়েছে স্বয়ং বিজেপির সভাপতি জে পি নাড্ডা। গোবলয়ের নেতাদের  ভুল বাংলা উচ্চারণের প্রতিযোগিতা চলছে কেবলমাত্র বাংলার আত্মাকে কব্জা করার জন্য। রবীন্দ্রনাথের কবিতার অর্ধ বিকৃত উচ্চারণে অর্থ যাচ্ছে পাল্টে। ভাইপো যেখানে ‘ভাতিজা’। আরও ভয়ংকর কথা ছবিতে কবিগুরুকে গুজরাট দাঙ্গায় মদতকারী অমিত শাহ-এর পায়ের নিচে স্থান দেওয়া হয়েছে।

অমিত শাহ-এর ভাষায় ‘বংগাল’ দখল করতে এসে বিজেপি-র ভৈরব বাহিনী ক্রমশ তাদের দাঁত নখ বার করে ফেলছে। সাথে সাথে আস্ফালন বেড়েছে তৃণমূল থকে দলত্যাগী সারদা কেলেংকারীতে জড়িত দুর্নীতিপরায়ন নেতাদের সাথে নিয়ে। সেই কারনে বংগালকে ভবিষ্যত ‘সোনার বাংলা’ বানানোর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমেই মনে আসে প্রধানমন্ত্রীর সাধের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যটির ভয়ংকর অধোগতির কথা। সংখ্যালঘু নিগ্রহের ঘটনায় যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য সারা দেশে অগ্রগণ্য। মহিলাদের উপর নির্যাতনের ঘটনায় উত্তরপ্রদেশ দেশের সর্বোচ্চ স্থানে। তফসিলী জাতিভুক্ত মানুষের উপর অত্যাচারেও উত্তরপ্রদেশ এক নম্বরে। সেখানে প্রতিবাদী সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, ডাক্তার, সাধারন মানুষ প্রত্যেকেই সরকারের বিরূদ্ধে মুখ খুললেই মিথ্যা মামলায় হাজতবাস। মোদীর রাজত্বে যারাই প্রতিবাদী কন্ঠস্বরে মুখর হয়েছেন তাঁদেরই তকমা দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রদোহিতার। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ, দিল্লীতে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে কৃষকদের একমাসেরও অধিক অবস্থান। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধদের সাথে সকল কৃষকদের বানিয়ে দেওয়া হল মাওবাদী ও খালীস্থানী জঙ্গি হিসাবে। এই রাজ্যে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনকে স্বর্ণকার মাননীয় দিলীপ ঘোষ ‘জমি চোর’ বলে বিবৃতি দিয়ে বসলেন। সম্প্রতি অভিনেত্রী সায়নী ঘোষকে প্রতিবাদের জন্য বঙ্গ বিজেপির সুসন্তানেরা  ধর্ষনের  হুমকি  দিয়েছে। কোন প্রতিবাদ বিজেপির নেতাদের তরফে করা হয়নি বরং এতে ইন্ধন যোগান হয়েছে। এই ক্ষেত্রে  আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কেন না বিজেপির ধর্মগুরু হিন্দু মহাসভার নেতা ভি ডি সাভারকর তাঁর রচিত ‘সিক্স গ্লোরিয়াস ইপকস অব ইন্ডিয়ান  হিস্ট্রি’ বইটিতে ছত্রপতি শিবাজী ও চিমাজী আপ্পাকে ধিক্কার জানিয়েছেন। তার কারণ, তাঁরা যথাক্রমে কল্যানের মুসলিম রাজ্যপাল এবং বাসেইনের পর্তুগিজ রাজ্য প্রধানের স্ত্রীদের বন্দী করেও ধর্ষণ না করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই সূত্রধরে এই সময়ে এসে বর্তমান চেলারা আর ভুল করতে রাজী নয়। সেইকারনে অভিনেত্রীর প্রতি এই নিদান।

অন্যদিকে দেশের বয়স্ক মানুষদের প্রতিবাদী  বক্তব্যও এই মনুবাদী দলটি মেনে নিতে রাজী নয়।২০১৮ সালে মহারাষ্ট্রের ভীমা-কোরেগাঁওয়ে জাতিহিংসার যে ঘটনা ঘটেছিল তাতে ৮০ বছরের অসুস্থ কবি ভারাভারা রাও, আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ প্রমুখ বিশিষ্ট সমাজ আন্দোলনকারীরা মিথ্যা অভিযোগে এক বৎসরের উপর কারারুদ্ধ রয়েছেন। বহু বছর ধরে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় ও কল্যাণের সাথে জড়িত ৮৩ বছরের পাদ্রি স্ট্যান স্বামীকে সরকারের বিরোধীতার কারনে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। আশ্চর্য জনকভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে কোন নির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমান দাখিল হয়নি আদালতে। এ এক অলিখিত জরুরী অবস্থা। ব্যক্তির কন্ঠরোধের চেষ্টা।

আসলে ইংরেজদের পদলেহনকারী আরএসএস দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনদিনই অংশগ্রহণ করেনি। দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা সাভারকরের হাত ধরে আরএসএস হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ নির্বিশেষে  ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসাবে ভারতবর্ষকে কোন কালেই দেখতে চায়নি। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, “সাম্প্রদায়িক পথে ভারত বিভাগের ধারণাটির উদ্ভাবনের জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী হল হিন্দু  মহাসভা”। আন্দামান জেলে বন্দিদশার সময় রাজসাক্ষী হিসাবে নিজেকে দাঁড় করিয়ে ক্ষমাপ্রার্থী  সাভারকর বিপ্লবীদের গুপ্তকথা ফাঁস করে দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে পিছন থেকে কার্যত ছুরি মেরে ছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়েরও রাজনৈতিক শঠতার ক্ষেত্রে জুড়িমেলা ভার। বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইরন উইনার বলেছিলেন- “শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন আপাদমস্তক একজন চতুর ও সুযোগসন্ধানী এক রাজনীতিক। তাঁর কাছে কোন আদর্শবাদ নয়, বরং ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতার ভর কেন্দ্রে থাকাই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। যখন যেখানে ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন, তিনি সেখানেই ছুটে গেছেন”। তাঁর রাজনৈতিক গুরু সাভারকরের মতই শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন ইংরেজদের পদলেহনকারী। ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে শ্যামাপ্রসাদ উচ্ছৃঙ্খলতা আখ্যা দিয়ে বৃটিশদের বলেছিলেন- ‘আমি মনে করি না, গত তিন মাসের মধ্যে যেসব অর্থহীন উচ্ছৃঙ্খলতা ও নাশকতামূলক কাজ করা হয়েছে, তার দ্বারা আমাদের দেশের স্বাধীনতা লাভের সহায়তা হবে’। ১৯২১-২২ –এর অসহযোগ আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনা ও অফিসারদের বিচারের বিরূদ্ধে আন্দোলন, ১৯৪৬-এর নৌ বিদ্রোহ এবং ওই বছরের ২৯ জুলাই  দেশব্যাপী ধর্মঘট – এসবে শ্যামাপ্রসাদের নিষ্ক্রিয় ভুমিকা বৃটিশদের খুশী  করেছিল। বাংলা ভাগের স্রষ্টা শ্যামাপ্রসাদের বিখ্যাত উক্তি ‘ভারত ভাগ হোক বা না হোক  বাংলাকে ভাগ করতেই হবে’। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ইংরেজদের পক্ষে পূর্নসমর্থনকারী এই খলনায়ক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবসে কুচকাওয়াজের সময় শ্যামাপ্রসাদ ছাত্রদের হুকুম করেন বৃটিশদের পতাকাকে অভিবাদন করতে হবে। ছাত্ররা প্রতিবাদ জানালে শ্যামাপ্রসাদ তাদেরকে চাবুক মারার হুকুম দেন। বিক্ষোভ দেখালে শ্যামাপ্রসাদ দুজন ছাত্র নেতা ধরিত্রী গাঙ্গুলী ও উমাপদ মজুমদারকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করেন। পরবর্তী সময়ে ছাত্র আন্দোলনের চাপে সিণ্ডিকেট তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন (আন্দবাজার পত্রিকা -১৪মে, ১৯৪০)। বাংলাভাগের ক্ষমতালিপ্সু নেতা সেই শ্যামাপ্রসাদের হাতে গড়া বর্তমান উচ্ছৃঙ্খল বাহিনী মানুষের ঘরে ঢুকে দেখছে তারা কি খেয়েছে, কি উৎসব পালন করছে? আজকে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতায় অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ তাদের রাজনৈতিক ইস্তাহারের অঙ্গ। বর্তমানে বিজেপি-র ‘লাভ জেহাদের’ রাজনীতি, ক্ষমতা উন্মাদের গৈরিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকৃত আস্ফালন। ব্যক্তি পরিসরকে ধর্মীয় রাজনীতির আখড়া বানানোর কৌশল তাদের জন্মলগ্ন থেকেই।

নাগরিকত্ব আইন, রাম মন্দির আর আদানিদের হাতে রেল, বিমান বন্দর, কৃষিজাত উৎপাদন তুলে দেওয়া ছাড়া বিগত বছরগুলিতে মোদী সরকারের আর কোন কৃতিত্ব নেই। পুলয়ামা কাণ্ডে ৪০ জন সেনার মৃতদেহের বিনিময়ে শ্রী নরেন্দ্র দামোদাস মোদী গট আপ খেলায় নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছিলেন। রিপাবলিক টিভি-র অর্ণব গোস্বামীর সাথে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোপনীয়তাকে মোদীজি সকলের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন। তাই ভাবতে হবে কুসংস্কারছন্ন ,অবৈজ্ঞানিক ও মধ্যযুগীয় মনোভাবাপন্ন বিজেপি-র নেতাদের হাতে এই রাজ্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে? আজকে বিজেপি-র নেতারা সুভাষচন্দ্রের সাথে শ্যামাপ্রসাদকে একই আসনে বসানোর অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই শ্যামাপ্রসাদ ’৪৩-এর ভয়ংকর দুর্ভিক্ষের সময় নিজের প্রভাব খাটিয়ে হুগলীর জিরাটে যে প্রাসাদোপম অট্টালিকা তৈরী করেছিলেন তা নিয়ে ঐ সময় সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। শ্যামাপ্রসাদ -এর সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ব রাজনীতির তীব্র বিরোধী  ছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র। ১২ মে ১৯৪০-এ নেতাজী ঝাড়গ্রামের জনসভায় বলেছিলেন- ‘হিন্দুমহাসভা ত্রিশূলধারী সন্ন্যাসীদের কাজে লাগাচ্ছে রাজনীতিতে জায়গা তৈরীর জন্য। হিন্দু ধর্মকে কাজে লাগিয়ে গৈরিক বসনের ভেকধারীদের দিয়ে, এরা ভোট চাইছে। কিন্তু তা করে এরা শুধু হিন্দু ধর্মের অপমানই করছে না, তাকে অপবিত্রও করছে। সুতরাং, এইরূপ দেশদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক তথা ধর্মদ্রোহী হিন্দুমহাসভা এবং হিন্দুত্ববাদীদের সমাজের থেকে বর্জন করা সকল হিন্দুর কর্তব্য’।  পরবর্তীকালে শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ডায়েরীতে লিখেছেন- ‘সুভাষচন্দ্র আমার সাথে দেখা করেন এবং বলেন, হিন্দু মহাসভা যদি বাংলায় রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে মাথাচাড়া দিতে চায় তবে সেটা জন্মের আগেই গুঁড়িয়ে দিতে বাধ্য হব, যদি বল প্রয়োগ করতে হয় তাহলে সেটাই করব’। আজকে সুভাষচন্দ্রের এই চিন্তাধারাকেই মর্যাদা দিতে হবে।  বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে হিন্দিভাষীদের কবল  থেকে মুক্ত করাই আজকে প্রথম ও একমাত্র চ্যালেঞ্জ। বাংলাকে সাম্প্রদায়িক রক্তে রাঙা মুখোশধারীদের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে হবে।  সুতরাং সাধু সাবধান!

(www.theoffnees.com - Bengal politics BJP RSS Netaji Shyamaprasad)

রমা চক্রবর্তী, শিক্ষিকা, আবৃত্তিকার ও ফিচার রাইটার, দুর্গাপুর:

আজ ২৬শে জানুয়ারী ২০২১, প্রজাতন্ত্র দিবস মহাসমারোহে সমগ্র ভারতবর্ষে পালিত হচ্ছে,  এবছর ৭২ তম প্রজাতন্ত্র দিবস।

প্রতি বছর এই প্রজাতন্ত্র দিবস এলেই ছোটোবেলার বেশ কিছু স্মৃতি জীবন্ত/তাজা হয়ে ওঠে। বাবার চাকরি সূত্রে আমর দুর্গাপুরের M.A.M.C (Mining & Mecheinary Corporatin Ltd)তে জন্ম ও বড়ো হয়ে ওঠা। এইদিনটাতে আমাদের টাউনশিপ তথা দুর্গাপুর শিল্পনগরী যেন অপরূপ সৌন্দর্যে সেজে উঠতো। সবজায়গায় প্যারেড, মার্চপাস্ট, ক্রীড়া প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হতো। আমাদের M.A.M.C কারখানার গেটে পতাকা উত্তোলন, মার্চপাস্ট, প্যারেড এসবের ব্যবস্থাপনা চলতো। আমরা স্কুলে যেতাম সকাল ৮--৮.৩০ মি:, স্কুলে পতাকা উত্তোলনের পর আমরা আমাদের M.A.M.C স্টেডিয়ামে চলে আসতাম।সেখানেও  পতাকা উত্তোলন, প্যারেড হওয়ার পর ক্রীড়া প্রতিযোগীতা চলতো সারাদিন ধরে।

খেলাধূলার প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল না, আমি আবৃত্তি প্রতিযোগীতা, নাটক এইসবে আগ্রহ ছিল ফলে এই সময় বেশ কয়েকদিন ধরে এই সব সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতা চলতো। আমার দিদি আবার খেলাধূলায় বেশ কয়েকটি পুরস্কার প্রাপ্তি ঘটাতো। আমি আবার ছোটোতে Go As You Like  এ অংশগ্রহণ করতাম এবং পুরস্কার ও পেতাম। সারাদিন ধরেই একটা সুন্দর পরিবেশের মধ্যে কাটাতাম।

কিন্তু এখন সবই অতীত, এখন দুর্গাপুর শহর অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। অনেক Shopping Mall, English Medium School, Flat Culture, Private Hospital গড়ে উঠেছে এবং শহরের চেহারার অনেক পরিবর্তন ঘটলেও আমাদের ছোটোবেলায় দেখা ২৬শে জানুয়ারী দুর্গাপুর শহরের জৌলুস অনেকটাই কমে গেছে। একদা যে দুর্গাপুর শহর ছিল সমগ্র ভারতের রূঢ় শিল্প শহর, যে শহরতলী একসময় ছিল রাজ্যের শিল্প মানচিত্রের পীঠস্থান আজ সেই অঞ্চল যেন মৃতনগরীতে পরিনত হয়েছে। তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে গেল দুর্গাপুরের ঐতিহ্যের শিল্প বুনিয়াদ।

তবে ছোটো থেকেই আমার দাদামশাই এর আদর্শকে দেখে বড়ো হয়েছি তাই এই দিনগুলোর একটা গুরুত্ব আছে আমার কাছে। আমার দাদামশাই (প্রয়াত সুধীর কুমার চক্রবর্তী) তিনি নেতাজীর আদর্শকে নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ চলা শুরু করেছিলেন। ওনার সংগ্রহে নেতাজীর কাছ থেকে পাওয়া 'উত্তরীয়', কানাইলাল ভট্টাচার্যের কাছ থেকে পাওয়া তৎকালীন 'ভারতের ইতিহাস' বইটি এখনও স্বযত্নে রাখা আছে, এছাড়াও সেই সময়কার বেশ কিছু পত্রিকা, সংবাদপত্র আজও স্বযত্নে রাখা আছে।

দাদামশাই বাড়ীতে নিজেই পতাকা উত্তোলন করতেন, ঐ অঞ্চলের মানুষেরা ওনাকে "ভূমিপুত্র" বলেই চেনেন ও জানেন। তবে দাদামশাই আমৃত্যু একটাই দুঃখ করে গেলেন (নেতাজীর মতাদর্শের মানুষ) "এই তিনটুকরো স্বাধীনতা আমরা চাইনি"।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যখন কমিউনিস্টরা বলত "এ আজাদী ঝুটা হ্যায়", আমার দাদামশাই এই স্লোগানটাকে পছন্দ করলেও তাদের মতাদর্শেকে মানতে পারননি।

আবার স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেশে (কেন্দ্রে) ও রাজ্যে কংগ্রেস রাজত্ব করলেও তিনি তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শকে খুব ভালোভাবে মেনে নিতে পারতেন না তবে বিধানচন্দ্র রায়কে দাদামশাই খুব শ্রদ্ধা করতেন এবং বলতেন "এনাদের মতো মানুষের বড়ো অভাব আমাদের দেশে"।

আজ আমরা ৭২ তম গণতন্ত্র/ প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করছি কিন্তু নিজের মনকে একটু প্রশ্ন করে দেখুন তো আমরা সত্যিই কি নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করি বলে মনে হয়? প্রশ্ন জাগে না আপনাদের মনে? আমাদের মতো মানুষের মতামতের কোনো দাম আছে এদেশে?                   

আমরা শুধু ভোটের বালাই, ভোট আসলেই আমাদের ডাক পড়ে আর আমরাও অবাক জলপানের মতো ভোটের লাইনে দাঁড়াই।

UPA জোট সরকার, NDA কেউ কি আমাদের কথা ভাবেন? ব্যাঙ্কের সুদ দিন দিন কমতে থাকছে, ভাবতে পারেন যারা MIS ভুক্ত মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ কী?

ভারতবর্ষে এই ৭২টি প্রজাতন্ত্র দিবসের মধ্যেই সমগ্র দেশে ১২০টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। 

বর্তমান মোদী সরকার কেন্দ্রের গদীতে বসেই রাতারাতি নোটবন্দী করলেন, কি জন্য? নাকি বিদেশ থেকে কালো টাকা ফেরৎ আনা হবে। আদৌ কি কলো টাকা ফেরৎ এলো? উল্টে নোটবন্দীর জন্য ব্যাঙ্কের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে  কতগুলো প্রাণ ঝড়ে গেলো। 

বলতে পারেন আমাদের এই প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোন সরকারি চাকরির আশা-ভরসায় থাকবে? এই ৭২ তম প্রজাতন্ত্র দিবসের গর্ভে আজও আমাদের একাংশ দেশবাসী নিরন্ন অবস্থায় মারা যান। চিকিৎসার অভাবে প্রান হারান। কত গঞ্জে আজও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। শিক্ষা আজও তো অধরাই থেকে গেল আসমুদ্রহিমালয়ের কোনে কোনে। দেশটা কি আবার বিদেশের হাতে কেনাবেচা চলছে? এটা আমাদের সংশয়।

আজকাল তো আবার চারিদিকে গুঞ্জন, একটাই রব একটাই শব্দ NRC, জানিনা---এর শুরু বা শেষ কোথায়? কোনটা ঠিক কোনটা ভুল? এদেশের নাগরিকই বা কে? আর অনুপ্রবেশকারীই বা কে?

বর্তমানে "জয় শ্রীরাম" নিয়ে মাতামাতি চলছে, যেন মনে হচ্ছে ভগবান শ্রীরাম জন্মেই বোধহয় 'ভারতীয় জনতা পার্টি' উদ্ভাবন করেছিলেন আর তাই "জয় শ্রীরাম" শুধু ভারতীয় জনতা পার্টির অন্যদের 'রাম' নেই।

আবার নেতাজীকে নিয়ে যে BJP, RSS এত মাতামাতি করছেন কিন্তু কতজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে জানেন যে সেই সময়কার ওনাদের বিশেষ কিছু নেতা মানুষ ব্রিটিশের ধ্বজাধারী ছিলেন এবং নেতাজী তাদের বিরোধীতা করেছিলেন।

আজও আপামর বাঙালী তথা ভারতবাসীর মনে প্রশ্ন জাগে নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যে কাদের সহযোগীতা ছিল, একথা কে বলত পারবে? আমাদের মতো অতি সাধারণ মানুষ এইটুকুই ভাবতে পারি যাদের স্বাধীন দেশের গদীর লোভ ছিল তারাই এই অন্তর্ধান রহস্য জানেন।

যাইহোক আজ ৭২ তম গণতন্ত্র/প্রজাতন্ত্র দিবসে একটাই শপথ নেওয়ার দিন আগামী দিনগুলো নেতাজীর মতাদর্শে চলতে পারলে হয়তো স্বাধীন ভারতবর্ষের মানুষগুলো স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করতে পারবে।

জয় হিন্দ, বন্দেমাতরম।

(www.theoffnews.com - Indian Republic Day)

সুস্মিতা পাল, লেখিকা ও শিক্ষিকা, কলকাতা:

২৬শে জানুয়ারী - ভারতের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যাত্রা শুরুর দিন। ভারতের গৌরবময় প্রজাতন্ত্র দিবস, পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র এই ভারতেই। দেশের শাসনপদ্ধতিতে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো অনুসৃত হয়। জনগণের দ্বারা জনগণের জন্য জনগণের শাসন। এখানে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন জনগণের মতানুসারে। গণতন্ত্রের শীর্ষস্থানীয় পদকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে জনতার বিশেষ ভূমিকাই প্রজাতন্ত্র।

তন্ত্র -শব্দটির অর্থ মত। পরাধীন দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হএয়ার পরে সর্বস্তরের নেতাদের নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়।সভাপতি হন ড: রাজেন্দ্রপ্রসাদ। খসড়া সমিতির সভাপতি ছিলেন ড: বি. আর. আম্বেদকর। ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারী সংবিধান চালু হয় স্বাধীন ভারতের।

প্রজাতন্ত্র মানে প্রজার জন্য। তাই বোধহয় নির্বাচনের আগে প্রজাদের জন্য বয়ে যায় প্রতিশ্রুতির বন্যা। বুক ভরা আশা নিয়ে ভোট দেয় জনগণ। কিন্ত তারপর আর হাল ধরতে এগোয় না কেউ, রাশ থাকে না নিজেদের হাতে। এতদিন পরেও প্রজারা দাপটের সঙ্গে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এজন্য শাসকের ওপর নিরন্তর চাপ বজায় রাখা দরকার। নয়তো শাসক পরিণত হয় শোষকে। ভারতে সবই বজায় আছে - বহুদলীয় ব্যবস্থা, নিয়মিত নির্বাচন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সংবাদপত্র বা মিডিয়ার স্বাধীনতা। কিংবা কিছুই কি ঠিকভাবে বজায় আছে? কোনওকিছুতেই রাষ্ট্রের অকারণ হস্তক্ষেপ ঠিক নয়। একথা আমরা মনে না রাখলে বা দেশ তা মেনে না চললে 'উই দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া' স্বাধীনতার এতদিন পরেও প্রজাই থেকে যাব, নাগরিক হয়ে উঠতে পারব না।

(www.theoffnews.com - Republic Day India)

কাকলি সেনগুপ্ত, চিত্রশিল্পী ও সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

(www.theoffnews.com - painting)

মৌসুমী প্রামাণিক, লেখিকা, কলকাতা:

'কদম কদম বাড়ায়ে যা

খুশীকে গীত গায়ে যা

ইয়ে জিন্দেগী হ্যায় কৌম কি

তু কৌম পে লুটায়ে যা..."

(এই গানটি শুনলেই শিহরণ জাগে শরীরে ও মনে। অনুপ্রাণিত হয় আমার লেখনী। সেই অনুপ্রেরণা যা তিনি জাগিয়ে চলেছেন আজও ১২৫ বছর পরেও আপামোর বাঙালির মনে। সেই মহান পুরুষ, বাঙালির আইকন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার আজকের প্রতিবেদন শুরু করছি।

এটি দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদীকে খোলা একটি খোলা চিঠি।)

ডিয়ার মোদীভাই,

বলিতেছি যে আজ নেতাজীর জন্ম জয়ন্তী পালন করিতে বাংলায় আপনার পদধূলি পড়িতেছে। জানি, যাহাই করিতেছেন, আসন্ন বিধানসভা ভোটের কথা মস্তকে রাখিয়াই করিতেছেন। তবে কদম কদম বাড়াইয়া বাংলায় আইলেন নেতাজীর জন্মবার্ষিকী উজ্জাপন করিতে। তাহা মন্দের ভালো। কালকা মেলের নামও নেতাজী এক্সপ্রেস হইবে। পূর্বে ছিল মেল আর এখন হইবে এক্সপ্রেস। এই সুযোগে টিকিটের মূল্য নিশ্চিতরূপে বাড়িবে। বোকা বাঙালির কিয়দংশ তবুও আবেগে ভাসিবে। এমনটা আপনারা ভাবিতেছেন। তবে সকল বাঙালির ভবি তো ভুলিবার নহে। 

আমাদিগের নেতাজীর জন্য আপনার এতখানি দরদ উথলাইয়া উঠিতেছে অথচ তাঁহার অন্তর্ধান রহস্য অদ্যাব্ধি উদ্ধার হইলো না। জানিয়া শুনিয়া আপনিও চাপিয়া গেলেন। আপনার স্বঘোষিত শত্রুদিগের বেইজ্জতি হইতে দিলেন না। ইহাও বুঝি ভোটেরই অংক। 

যাহা হোউক, সুভাষ বোস আমাদিগের হৃদয়ে রহিয়াছেন বহু বৎসর ধরিয়া। আর থাকাবেনও এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।

প্রতিবৎসরই বাঙালি মেলা, পদযাত্রা, রক্তদান উৎসব, সভা ইত্যাদি সহযোগে মহাসমারোহে তাঁহার জন্মদিন পালন করিয়া থাকেন। তাই উহাদের আবেগে সুড়সুড়ি দিয়া কোন লাভ নাই।

তদানিন্তন হিন্দু মহাসভা দ্বারা যে দেশ উদ্ধার হয় নাই ইহা শিক্ষিত বাঙালি ভালো করিয়াই জানেন। ইহা ব্যতীত আজিকার হিন্দু ধ্বজাধারী গেরুয়া শিবির যে দেশকে বিক্রয় করিতে কোন উপায় ছাড়িতেছেন না তাহাও দেখিতেছি ও বুঝিতেছি। দেশপ্রেম তো আজিকার রাজনৈতিক ব্যক্তিদিগের নিকট নাটকে রূপান্তরিত হইয়াছে। ইহা ব্যতীত একখানা প্রশ্ন মনে উদয় হইয়াছে, যদি অভয় দেন তো করি? আমাদিগের নেতাজীও বিদেশিনী মানে জার্মানী লেডিকে বিবাহ করিয়াছিলেন, তাহা হইলেও কি তিনি ভারতীয় হইলেন? না। মানে আপনারাই তো বলিয়াছিলেন যে....থাউক। 

অদ্য আমাদিগের একখানি উৎসবের দিনই বটে। আমরা তাঁহাকে লইয়া গর্ব অনুভব করি; আজও নস্টালজিক হই। তদাপি আপনি কিভাবে না জানি নেতাজির গুজরাট যোগ উথ্থাপিত করিয়া উৎফুল্ল হইতেছেন। বিস্ময়ের অবকাশ ফাঁকা রাখিতেছেন না!

যাক হউক! আর একখানা অন্য কথাও ছিল। বলিতেছি যে উৎসব কিংবা ছুটির দিবস আইলেই বাঙালির জিহবা ও স্টমাক মটন মটন করিতে থাকে। না। আসলে খাদ্যাভ্যাসের কথা কহিতাম না। কিন্তু দেখিতেছি ইহা আপনাদিগের পরম্পরা হইয়া উঠিয়াছে। আপনার দূতগন আসিয়া বাঙালি খাবার উদরস্ত করিতেছেন ও প্রসন্ন হইতেছেন। এই বিষয়ে সর্বসময় গুজরাট যোগ খুঁজিলে তো চলিবে না। বাংলা দখল করিবার পূর্বে জানিতে ও মানিতে হইবে যে বাঙালি খাদ্যরসিক। ছুটির দিবস, উৎসব, পার্বন, পিকনিক,বিয়াঘর নিমন্ত্রণ ইত্যাদে সর্বপ্রকার অতিথি আপ্যায়নে কষা মাংস নইলে মটন কারী থাকিতেই হইবে। কারণ উহারা যতো রাজ্যের ঘাসফুস হজম করিতে পারেন না যে! হাজার হউক  বাঙালি তো আর হাম্বা হাম্বা রবে ডাক পাড়েন না! বড়োই মিষ্টভাষী। বাঙালি অলস হইতে পারেন, ঝগড়ুটে হইতে পারেন, কাঁকড়াও হইতে পারেন তথাপি স্বর্ণখচিত দুগ্ধ প্রদানকারী পশু কিছুতেই নহে।

যাহা কহিতেছিলাম ঐ মটনের বিষয়ে, বর্তমানে ঐ খাদ্যবস্তুটির দাম ৮০০টাকা কেজিতে আসিয়া ঠেকিয়াছে। চাহিলেও তাই রসনার তৃপ্তি ঘটিতেছে না। সুদের হার কমাইয়া পকেটকে গড়ের মাঠে পরিণত করিয়া দিয়াছেন। তাই যদি খাসি ও পাঠা, রেওয়াজী মটনের প্রোডাকশান যথাযথ বাড়াইয়া চাহিদার তুলনায় যোগান বাড়াইয়া যদি মূল্য খানিক কমাইতে পারিতেন তাহা হইলে বাঙালি যারপরনাই উপকৃত হইতো। ইস্তেহারে বিষয়টি যুক্ত করিলে ভোটবাক্সে ইহার প্রভাব দেখিতে পাইলেও পাইতে পারেন।

 আমরা রামছাগল পছন্দ করি না। বড়ো দুর্গন্ধ বাহির হয় ঐ আচার আচরণ; কথাবার্তায়। তাই দয়া করিয়া উহাদিগের উইথড্রো করিবার বন্দোবস্ত করিবেন।

পরিশেষে বলি, আপনি যে কলিকাতায় শুধুমাত্র রাজনীতি করিতেই আসিয়াছিলেন তাহা আপনার ভাষনে ও আপনার অনুরাগীদিগের 'জয় শ্রীরাম' স্লোগানে সুস্পষ্ট হইয়াছে। করুন। যথেচ্ছ রাজনীতি করুন। আপত্তি নাই। তবে আমাদিগের সুভাষকে দয়া করিয়া অব্যাহতি দিলে বাধিত হইবো। 

নমস্কার জানিবেন।

ইতি 

প্রতিবাদী এক বাঙালি লেখিকা (ভোটার বলিয়া গন্য নাও করিতে পারেন)

(www.theoffnews.com Netaji birthday Modi prime minister open letter)

ইসহাক খান, মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ:

আমরা যখন শুভগাছা পৌঁছলাম তখন গোটা গ্রাম নিরব নিস্তব্দ। কোথাও কোন জনমুনিশ্যির সাড়া নেই। মনে হচ্ছে গভীর গহীন রাতে আমরা কোন নির্জন দ্বীপে এসে পড়েছি। কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই। কোথাও আলোর দেখা নেই। যুদ্ধের সময় ব্লাকআউট হয়। মনে হচ্ছে তেমন অবস্থা। যদিও দেশে কোথাও কোথাও যুদ্ধ চলছে। তার ঢেউ এসে পড়েছে এই জনপদে। এই গ্রামই যে শুভগাছা আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। রাস্তায় লোকজন যেভাবে আমাদের মাইল দেখাতে গিয়ে হাইকোর্ট দেখিয়েছে তাতে এই গ্রামই শুভগাছা সেটা নিশ্চিত হতে আমরা দ্বিধায় পড়ে গেছি। কাউকে ডেকে জিজ্ঞেস করবো তেমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা রাস্তার পাশে একটি বাড়ির আঙ্গিনা দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের কথাবার্তার আওয়াজে পাশের বাড়ির একজন গলাখাকারি দিয়ে উঠলে আমরা উল্লসিত হই। মানুষের সাড়া মিলেছে। আমরা ওই ঘরের পাশে গিয়ে খুব তাজিমের সঙ্গে তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাইজান, এই গাঁয়ের নাম কি শুভগাছা? ভাইজান স্বীকার করলেন, হ্যা শুভগাছা। সত্যি সত্যি আমরা উল্লসিত হয়ে উঠলাম। যেন বাঁচা গেছে। আমরা শুভগাছা এসে গেছি। 

-আপনারা শুভগাছা কার বাড়ি যাইবেন? লোকটির প্রশ্নে আনন্দের আতিশয্যে আমরা সবাই বলে উঠলাম, বিচিত্রদের বাড়ি।  

লোকটি বললো, সামনে যান। দেখবেন একটি তালগাছওয়ালা বাড়ি। ওটাই বিচিত্রদের বাড়ি। 

আমাদের এবার অন্ধকারে তালগাছ খোঁজার পালা। পেয়ে গেলাম তালগাছয়ালা বাড়ি। কোনরকম ভাবনা চিন্তা ছাড়াই আমরা গলা ছেড়ে বিচিত্রকে ডাকতে শুরু করলাম। 

আমাদের ডাকা-ডাকিতে একজন গলা কেশে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কারা? কোত্থেকে আইছেন? 

আবার আগের মতো সম্মিলিত কণ্ঠে বললাম, আমরা কানসোনা থেকে আসছি। কানসোনার কথা শুনে তিনিও উঠে এলেন। বিচিত্রকে ডেকে তুললেন। তিনি বিচিত্রর বড়ভাই। আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য জেনে তারা ভীষণ অবাক। আমাদের খাতির যত্ন করতে লাগলেন বেশ। 

আমাদের দেখে বিচিত্র এতটাই অবাক হয়েছে যে ওর মুখে কোন কথা আসছে না। অমায়িক ভাবে হাসছে। এমনিতে বিচিত্র সরল প্রকৃতির এক কিশোর। কিন্তু খুব দায়িত্বশীল। কৃষ্ণবর্ণের বিচিত্র দাশ শুধু ধবল দাঁত বের করে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। আমরা ভীষণ ক্ষুধার্ত এই কথা শোনার পর বিচিত্র ওর দাদা এবং আরও যারা আমাদের দেখতে এসেছিল সবাই ব্যস্তভাবে ভেতরে চলে গেল। 

খাওয়ার আয়োজন শেষে আমাদের ডাকতে এসে বিচিত্র দেখে আমরা সবাই ঘুমের রাজ্যে ঢলে পড়েছি। সবাইকে সে ডেকে ওঠায়। খাওয়ার তাগাদা দিতে থাকে।

খাওয়া এবং ঘুম দুটোই তখন আমাদের ভীষণ প্রয়োজন। খাওয়ার কথা শুনে আমাদের কেউ কেউ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে হাত মুখ না ধুয়ে খেতে বসে গেল। 

খেতে বসে দেখা গেল আমরা ৮ জন। রফিক মামু-যিনি আমাদের নেতা। যার ডাক নাম সুকুর। আমি ডাকি সুকুর মামু বলে। তার পাশে সরকার আলি আসগর, রাজ্জাক, এই বন্ধুটি গায়ে গতরে বেশ নাদুস নাদুস। বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে সহজ সরল। মনে কোন ঘোর প্যাঁচ নেই। সোজা কথায় সাদা মনের মানুষ। এই সরল বন্ধুকে নিয়ে সবাই মজা করে। তবু সে রাগ করে না। রাজ্জাকের পাশে মোস্তফা, জহুরুল তারপর আমি।এক পাশে শাজাহান এবং সাইফুল ইসলাম মিন্টু। 

শাজাহানকে দেখে আমরা সবাই অবাক। মনে খটকাও লেগেছে ভীষণ। সামান্য কিছু লেখাপড়া জানে শাজাহান। মুলত সে তাঁত শ্রমিক। খুবই সাধারণ একজন। যাকে সহজ কথায় আমজনতা বলা যায়। সে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। কোনদিন যাকে আমরা মিছিলে দেখিনি। আমাদের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনায় তার অংশগ্রহণ ছিল না কখনও। তাকে যুদ্ধ-যাত্রায় দেখে আমাদের সবাই পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলাম। একই সঙ্গে আমরা মনে মনে খুশি হচ্ছিলাম। দেশের স্বাধীনতার জন্য ছাত্র-জনতা সবাই ছুটে এসেছে। 

সবার বয়োঃকনিষ্ঠ সাইফুল ইসলাম মিন্টু। ক্লাস এইটের ছাত্র। যুদ্ধে যেতে আমরা ওকে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করেছি কিন্তু ও শোনেনি। আমরা তারপর আমাদের যাত্রাপথে ওকে আর দেখিনি। ভেবেছি ফিরে গেছে। যাত্রা পথে আর দেখা না হওয়ার কারণ আমরা ৮ জন একসঙ্গে পথ হাটিনি। দুজন দুজন করে আমরা ভাগ-ভাগ করে পথ হেঁটেছি। দলবেঁধে হাঁটলে যে কেউ সন্দেহ করতে পারে। এই জন্যে আমরা দুজন দুজন ভাগ ভাগ করে-করে পথ চলেছি। তাছাড়া লম্বা পথ চলতে কে কখন এগিয়ে গেছে আবার পিছিয়ে পড়েছে সে খোঁজ কে রাখে।

খেতে বসে পরস্পরকে দেখছি। আমাদের আরও একজন বন্ধু আসার কথা ছিল, আসাদুজ্জামান খোকন। ওর জন্যে আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। পরে সে আমাদের বললো, কাল আমাদের সঙ্গে ও শুভগাছায় মিলিত হবে। দেখা যাক আসে কিনা। আমি অবশ্য খোকনের আশা ছেড়ে দিয়েছি। 

পরদিন আমরা যমুনা থেকে নেমে আসা খালে গোসল করছি। খালের উপর বাঁশের তৈরি একটি সাঁকো। সেই সাঁকো পেরিয়ে আসছে খোকন। আমরা বিস্ময়ে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলাম। খোকন কথা রেখেছে। আমার ধারণা মিথ্যে প্রমাণ করে অবশেষে খোকন ঠিকই আমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। 

জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে এলি?

খোকন বললো, ট্রেনে সিরাজগঞ্জ ঘাট। ঘাটে নেমে তারপর হাঁটা দিলাম। 

বললাম, ভয় করলো না? যদি মিলিটারির হাতে ধরা পরে যেতিস? 

বলে, আমাকে পাবে কিভাবে? ট্রেনে উঠেই আমি টয়লেটে ঢুকে পড়েছি। 

খোকনের অদ্ভুত বুদ্ধির কথা শুনে আমরা হা হা করে হেসে উঠলাম। আমাদের এই বন্ধু কারিগরি কাজে ছিল ভীষণ দক্ষ। হাইস্কুলে পড়ার সময় কাঠ দিয়ে সুন্দর করে বইয়ের র‍্যাক বানিয়ে ছিল। আমাকেও একটা র‍্যাক বানিয়ে দিয়েছিল। টর্চলাইটের ব্যাটারি দিয়ে পড়ার ঘরে বাল্ব জ্বালিয়ে পড়তো। আমরা নাটক করতাম। মঞ্চের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজের দায়িত্ব পড়তো খোকনের উপর। এই জাতীয় খুঁটিনাটি কাজ সে খুব সুচারু রূপে সম্পাদন করতে পারতো।

সন্ধ্যায় বিচিত্র আমাদের নিয়ে গেল দালালের বাড়ি। সেইখানে দালালের সঙ্গে আমাদের ভারত যাওয়ার ব্যাপারে কথা হলো। এই দালাল সাহেবের নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন অনেকগুলো নৌকা ভারত যাতায়াত করে। বেশিরভাগ যাত্রী শরণার্থী। তারা পাকআর্মির ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যাচ্ছে। 

দালাল আমাদের জানালেন নৌকা ভাড়া হিসেবে আমাদের মাথা পিছু ত্রিশ টাকা দিতে হবে। আমরা দর কষাকষি করলাম ভাড়া কমাতে। দালাল বললো, অন্যদের কাছ থেকে আমরা বেশি নেই। আপনারা যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন জন্যে আপনাদের কাছ থেকে কম নিচ্ছি। 

সমস্যা বাঁধলো মিন্টু এবং তার চাচাতো ভাই শাজাহানকে নিয়ে। এই দুজনের কাছে কোন টাকা নেই। এই দুজনের টাকাও আমাদের দিতে হবে। বাড়তি খরচ করার মতো আমাদের কারো কাছে যথেষ্ট টাকা নেই। কি করা যায়? আমরা ভেবে কোন পথ পাচ্ছিলাম না।

মাত্র ৬০ টাকা নিয়ে আমি পথে নেমেছি। এই টাকাও অনেক ধান্ধাবাজি করে যোগাড় করতে হয়েছে। যুদ্ধের সেই সময় আমার মামাতো ভাই জুটমিলের শ্রমিক সাত্তার আমাদের বাড়িতে এসেছিল। আর বাড়ি যাওয়া হয়নি। সাত্তারও যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। সাত্তার একদিন আম্মাকে বললো, সেউ যুদ্ধে যাবে। একটাই সমস্যা টাকা। টাকা কোথায় পাবে? তাকার ব্যাপারটা নিয়ে আমরা ভাবতে থাকি। আমি বাবা-মার শয়ন ঘরে গিয়ে দেখি বড় বস্তায় সর্ষে রাখা। হাটের দিন সাত্তারকে বললাম, হাটে নিয়ে এই সর্ষে বিক্রি করতে হবে। মজার ব্যাপার হলো সেদিনই হাটবার। ভাবামাত্র সাত্তারের মাথায় দিলাম তুলে সর্ষের বস্তা। মা দেখতে পেয়ে ছুটে এসে আমাকে বারণ করতে লাগলো। ভয় দেখাল, তোর বাপ জানলে তোকে মেরে ফেলবে। বললাম, তুমি না বললে বাবা জানবে না। একটি শরণার্থী পরিবার এসেছে ঢাকা থেকে। তাদের একজন বয়স্কা রুগি আছে। তার চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। চিকিৎসা করতে না পারলে তাঁকে বাঁচানো যাবে না। এই কথার পর আর কিছু বলতে হয়নি। হাটে নিয়ে সেই সর্ষে ১২০ টাকা বিক্রি করে আমি ৬০ টাকা সাত্তার ৬০ টাকা ভাগাভাগি করে নেই। সাত্তার সেই রাতেই মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়। মুক্তিযুদ্ধে সাত্তার শহীদ হয়। আহতাবস্থায় সাত্তার পাকআর্মির হাতে ধরা পরে। নির্মম নির্যাতন করে সাত্তারকে হত্যা করে পাকআর্মি। জিপের পেছনে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে ময়মনসিং শহরে ঘুরিয়ে হত্যা করে সাত্তারকে। দেশের স্বাধীনতার জন্য আমার ভাই সাত্তার জীবন উৎসর্গ করেছে। এই দেশকে আমরা কিভাবে ভুলবো? 

আমাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হলো আমরা একজনকে তার যাওয়ার খরচ বহন করবো। এখন তোমরা ঠিক করো কে যাবে আর কে থাকবে। মিন্টুর সোজাসাপটা কথা আমি প্রয়োজনে হালের বৈঠা ধরে যাব। তবু আমি যাব। শাজাহান এবার আবেগি কণ্ঠে বলে উঠলো তুই কোন দুঃখে যাবি? আমি কি কম দুঃখে যাচ্ছি। এই কথা বলার পর সে এমন একটি কথা বলে উঠলো মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যার কোন সম্পর্ক নেই। আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেলাম তার কথা শুনে। পারিবারিক একটি সমস্যার কথা বলে চোখের পানি মুছতে লাগলো। আমরা হাসবো না কাঁদবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। 

শেষ পর্যন্ত দুজনকেই আমরা আমাদের খরচে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভোরে বিশাল বজরা নৌকায় আমরা গিয়ে উঠলাম। মাঝিরা আলী আলী বলে নৌকা ছেড়ে দিল। মা বাবা ভাইবোন আত্মীয়স্বজন অরক্ষিত রেখে আমরা চললাম মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে। [চলবে] 

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)  

(www.theoffnews.com - Bangladesh muktijuddho)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

দলবদলের মরসুমে রাজনীতির কারবারিদের ব্যপক ব্যস্ততা এখন। কারবারি বললাম বলে অনেকেই চোখ তুলে তাকাতে পারেন, আমি অবশ্য বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত না হয়ে বলব রাজনীতির ব্যবসায়ী বলাটাই শ্রেয় ছিল। তা যাই হোক এই কারবারি বা ব্যবসায়ীরা দল বদল বা দোকান বদল করতেই পারেন। কিন্তু আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি তথাকথিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে যারা ভোটে জিতে জনতার রায়ে কোনও একটা পদে এসেছেন বা বসেছেন। জনপ্রতিনিধি মানে তো জনতার হয়ে যিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাই তো? কি গাল ভরা নাম, দায়িত্ব। আচ্ছা বলুন তো এই জনপ্রতিনিধিরা যখন দল বদলান তখন কি কখনও জনতার সঙ্গে কথা বলেন। সাম্প্রতিক অতীতে কাউকে কখনও দেখেছেন প্রকাশ্য জনসভা করে জনতার কাছ থেকে দলবদল করবেন কিনা সেই রায় নিতে। ক দল ছেড়ে খ অথবা গ দলে যাওয়ার আগে যে জনগন তাকে নির্বাচিত করেছেন তাদেরকে একবার সৌজন্যের খাতিরেও জানাতে, যে তিনি অন্য দলে যাওয়ার কথা ভাবছেন বা যাচ্ছেন। 

না, এমনটা দেখা যায় না। প্রচুর ফুটেজ খেয়ে, বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমের রান টাইম বা খবরের কাগজের জায়গা নষ্ট করে তারা দলবদল করেন নিজের গুটিকয়েক মোসায়েবদের সঙ্গে নিয়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনতা সংবাদ মাধ্যমে খবর পায়, যে তাদের প্রিয় নেতা অন্য দলে চলে গিয়েছেন। অনেকে অবশ্য দল বদলের পর ঘটা করে সভা করেন, ঘোষণা করেন। এটাকে কি জনতার অপমান বলা যায় না? আমি একটা রাজনৈতিক কারণ বা আদর্শগত ভাবেই যাকে ভোট দিয়েছিলাম। সে যখন সম্পূর্ণ বিপরীত চিন্তার একটি দলে চলে যায় তখন আমাদের মানসিকতা কি হতে পারে, সেটা কখনও রাজনীতির কারবারিরা ভেবে দেখেননি। বলা ভাল ভেবে দেখার প্রয়োজনই অনুভব করেননি। তারা জানেন শুধু দেখা ছাড়া জনতার কোনও গতি নেই। এই দলবদলের পিছনেও অনেক গল্প থাকে, অনেক হিসেব থাকে। কিন্তু সকলেই জানেন দল বদলের এই হিসেব বা চাওয়া পাওয়ার মাঝে দূর দূর পর্যন্ত কোথাও জনহিতের চিহ্নমাত্র থাকে না। 

জনতা জনার্দন। জনতার রায় মাথা পেতে নিয়েছি। জনতার আশীর্বাদেই ক্ষমতায় এসেছি আমরা। জনতাই শেষ কথা বলবে। জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে এমন জনতা বাক্য শুনতে শুনতে আমজনতা মাঝে মধ্যেই ধরে নেওয়ার ভুল করেন তারাই সব। কিন্তু আদতে জনতাকে উপেক্ষা, অবহেলা, অনাদর করেই ধারাবাহিক ভাবে জনপ্রতিনিধিদের বাড়বাড়ন্ত। সামনে এমন ভাব দেখান সকলে জনতা ছাড়া আর কারও বিষয়ে তাদের কোনও কিছু ভাবার অবকাশ নেই। 

তর্কের খাতিরে কেউ কেউ বলতে পারেন ভোট কিন্তু জনতাই দেয়। তাই ভোটের সময় সকলেই নত হন জনতার সামনে। আদতে ভোটের সময় যা দেখি সেটা নাটক। ভোটের আগে উন্নয়ন, ভোটের আগে প্রকল্প, ভোটের আগে জনতার জন্য চোখের জল ফেলা, বছরের পর বছর এই নাটকই আমরা দেখে আসছি। দীর্ঘদিন সংবাদ জগতে থাকার সূত্রে এটুকু বলতে পারি রাজ্যের বিভিন্ন জায়গাতে কিভাবে ভোট হয়, কারা ভোট করেন, কারা ভোট দেন তা অনেকটাই আমার জানা বা দেখা। এই ছবি সব আমলেই। তাই আপনি ভোট দেবেন কি দেবেন না, তা নিয়ে কিন্তু বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয় জনপ্রতিনিধিরা। বরং আপনি ভোট দিতে না গেলেই মঙ্গল।  

আমি বা আমরা ভিতু, অশক্ত মানুষ। আমাদের অভিযোগ করবার সাহস নেই। সাহস করলেও উপায় নেই। উপায় থাকলেও পাশে দাঁড়াবার লোক নেই। তাই নেতারা যখন প্রকাশ্যেই অভিনেতা তখন তাদের সেই অভিনয় দেখা ছাড়া গতি কি? আমরা বুঝে গিয়েছি জনতা মানে নেতার স্ত্রী, ছেলে – মেয়ে, ভাই বন্ধু আত্মীয় পরিজন। বাকি আমাদের সকলের মুখে সভ্য জনতার মাস্ক পরানো। সেই মাস্ক খুললেই আমরা সকলেই কখনও মাওবাদী, কখনও উগ্রপন্থী, কখনও শহুরে নকশাল। জননেতারা চান জনতা থাকুক গান্ধীজীর তিন বাঁদরের মত। তার বাইরে গেলেই, বেচাল করলেই ভ্যানিশ।

(www.theoffnews.com vote voter leader)

সাজিয়া আক্তার, রেসিডেন্সিয়াল এডিটর (বাংলাদেশ), দ্য অফনিউজ:

প্রেমিকা বা প্রেমিকের প্রতি মনের ভেতর অনেক ক্ষোভ, ঘৃণায় কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। কিন্তু আপনি জানেন কি, এসব কারণে প্রতিদিন তিল তিল করে বিশাল ক্ষতি হচ্ছে আপনার। স্ট্রেস ও দুশ্চিন্তার মতো হাজারও সমস্যা বাড়ছে প্রতিদিন। হয়তো প্রেমিকা/প্রেমিক আপনার কথা ভেবেই ছেড়ে গেছেন। তিনিও চান ভালো থাকুন। 

আপনার মধ্যেও যদি এরকম সমস্যা থাকে তাহলে আজই ক্ষমা করা শিখুন। সাবেকের ভুল ভ্রান্তিগুলো ক্ষমা করে দিন। সে হতে পারে আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকা, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন বা অন্য যে কেউ। আপনি যদি নিজের ভেতর অন্যের উপর রাগ পুষে রাখেন তাহলে আপনারই সমস্যা বাড়বে। তাই নিজের ক্ষতি করতে না চাইলে আজই অপরকে ক্ষমা করতে শিখুন।

যদি নতুন করে সবকিছু শুরু করতে চান তাহলে সাবেককে ক্ষমা করুন এবং ভুলে যান অতীতকে। তবে এসবের জন্য প্রথমেই সাবেককে ক্ষমা করতে শিখুন। তাহলে শান্তি মিলবে আপনার মনে। এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে কেন ক্ষমা করব।

তার কথা ভাবলেই প্রতিনিয়ত এলোমেলো হয়ে গেলে এখনই ওই মানুষটির কথা ভাবা ছেড়ে দিন। তাকে ভাবা ছেড়ে দিতে গেলে প্রথমে তার ওপর থেকে সকল রাগ সরিয়ে নিন। দেখবেন এতে করে আপনার স্ট্রেস অনেকটাই কমে গিয়েছে।

মানসিক শান্তি

মনের ভেতর যদি দীর্ঘদিন খারাপ চিন্তাভাবনা থাকে তাহলে কোনোভাবেই মানসিক শান্তি মিলে না। এ জন্য খারাপ চিন্তাভাবনা দূর করতে তিক্ত মুহূর্ত ভুলে যান। এসবের পেছনের মানুষকে ক্ষমা করে দিন এবং সব ভুলে যান। দেখবেন অজানা কারণেই মনে শান্তি কাজ করছে।

দুশ্চিন্তা কমাতে

কোনো কারণ ছাড়াই দুশ্চিন্তায় ভুগেন অনেকে। অনেক চেষ্টা করেও কারণ খুঁজে পান না? বিভিন্ন কারণে আমাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধে। এই দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য কিছুটা ক্ষমা করুন। আপনি নিজেও যদি দোষী হয়ে থাকেন তাহলে নিজেকেও ক্ষমা করুন। মুহূর্তেই সকল সমস্যার সমাধান পেয়ে যাবেন আপনি। 

রাগ নিয়ন্ত্রণ

সাবেকের মুখ মনে পড়লেই রাগে, ক্ষোভে ও তিক্ততায় শিউরে উঠছেন? তাহলে তো তার মুখ যেভাবেই হোক ভুলে যেতে হবে আপনাকে। তার সকল ভুল ভ্রান্তিগুলো ক্ষমা করে দিয়ে নিজেকে মহৎ ভাবতে শিখুন। হঠাৎ করেই তার মুখটা মিলিয়ে যাবে, যা আপনি নিজেও ভাবতে পারবেন না। সেই সাথে রাগও নিয়ন্ত্রণ করুন। মুহূর্তেই কোনো সিদ্ধান্ত নিবেন না। রাগের মুহূর্তে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না। তাৎক্ষণিক জেগে উঠা রাগগুলো নিজের ভেতর রাখতে শিখুন এবং তা কিছুক্ষণ পর ভুলে যেতে শিখুন। দেখবেন এতে আপনারই লাভ হবে।

সম্পর্কের গভীরতা

খুব কাছের কেউ ভুল করলে তাকে দ্বিতীয়বার না ভেবে ক্ষমা করুন। যেহেতু কাছের তাই আবার নতুন করে তার সাথে শুরু করেন। তবে সে যদি একই ভুল বারবার করে তাহলে ক্ষমা করে দিয়ে তাকে ভুলে যান। জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিন। নতুন করে শুরু করুন নতুন সম্পর্ক। গভীর সম্পর্কে প্রকৃতভাবে জড়াতে পারলে বা মনের ভেতর প্রেম ভালোবাসা থাকলে সে কখনোই উচ্ছৃঙ্খল হতে পারে না। তাই নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে তুলে ধরার জন্য হলেও সকলকে ক্ষমা করতে শিখুন। মনের মধ্যে শান্তি আসবেই।

(www.theoffnews.com - Bangladesh break up respect)

ইসহাক খান, মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ: 

কথা ছিল সূর্য ওঠার আগে আমরা বাড়ি থেকে বেরুবো। আমরা মানে, রফিকুল আলম, গোলাম মোস্তফা, জহুরুল হক খান, আব্দুর রাজ্জাক, সরকার আলী আসগর, আসাদুজ্জামান খোকন এবং আমি। 

আমাদের পরিকল্পনা ছিল অন্ধকার থাকতে থাকতে লোক জানাজানি হওয়ার আগে আমরা গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়বো। তা হলো না। আমাদের সঙ্গে যারা পরে যুক্ত হওয়ার অঙ্গিকার করেছে তারাই নানাভাবে গড়িমসি করছিল। যেতেও চায় আবার মনে নানা দ্বিধা দ্বন্দ্ব।

আমি ভয় পাচ্ছিলাম আমার মাকে নিয়ে। মা কোনভাবে জেনে গেলে আমার যুদ্ধে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আমার মা অনেকগুলো সন্তানহারা একজন দুখি মা। আমাকে নিয়েই তাঁর পৃথিবী। সেই আমি মৃত্যুর সামনে বুক পেতে দিতে যাচ্ছি এ কথা জানলে আমার দুখিনি মা কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। মাথা ঘুরে ঠাস করে পড়ে যাবে। আর না হলে এমন করুণ নাটকীয় দৃশ্যের জন্ম দেবে যা দেখে আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সম্ভব হবে না।

এই নিয়ে আমার ভীষণ টেনশন হচ্ছিল। আমি বার বার তাড়া দিচ্ছিলাম। গ্রাম থেকে বেরুতে পারলে যেন আমি হাফ ছেড়ে বাঁচি। অনেক পরে বেরিয়ে এলো বন্ধু আলী আসগর। তার হাতে তেলের শিশি। আসগর মাকে মিথ্যে বলেছে। বলেছে বাজারে যাবে। বাজারে যাবে শুনে আসগরের মা হাতে তেলের শিশি ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, ঘরে একফোঁটা কেরসিন তেল নেই। তেল না আনলে রাতে অন্ধকারে ভাত খেতে হবে।

আমরা আমাদের মা-বাবা পরিবার আত্মীয়স্বজনকে অন্ধকারে রেখে আলো আনতে পথে বেরুলাম। 

আসগরের মায়ের দেওয়া তেলের শিশি নিয়ে আমরা নানা ধরণের হাস্যরস এবং কৌতুক করতে লাগলাম। 

আমাদের প্রাথমিক গন্তব্য কাজিপুর থানার শুভগাছা গ্রামে। সেই গ্রামে বিচিত্র নামে একজন যুবক আছে। সে আমাদের পরিচিত। বিচিত্র আমাদের গ্রামে মলয় ভৌমিকদের বাড়িতে লজিং থেকে সলপ হাইস্কুলে লেখাপড়া করে। 

আমরা শুনেছি শুভগাছা গ্রাম থেকে যমুনা নদী দিয়ে ভারতের মাইনকার চর পর্যন্ত নৌকা যাতায়াত করে। সেইসব নৌকায় গোপনে লোকজন ভারতে যায়। সেই ভরসায় আমাদের শুভগাছা যাত্রা। এর আগে আমরা নানাভাবে চেষ্টা করেছি ভারতে যাওয়ার। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন পথের সন্ধান না পেয়ে আমাদের যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে। ১৪ এপ্রিল মুজিবনগর প্রবাসি সরকার শপথ নেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে তরুণসমাজকে আহবান করা হয়। সেই আহবানে সাড়া দিতেই আমরা ভারতে যাওয়ার নিরাপদ রাস্তা খুজছিলাম। কিন্তু কোনভাবেই আমরা সঠিক এবং নিরাপদ রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

একবার আমরা জানতে পারলাম সুবর্ণসারা গ্রামের রফিক নামের একজন ভারতে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে। আমরা সেই রফিকের সন্ধানে সুবর্ণসারা গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। স্থানীয় ভাষায় সুবর্ণসারা গ্রামকে মানুষ চেনে এবং ডাকে ‘সবুনসারা’ নামে। আমরা নদী পথে ছোট্ট একটি ডিঙ্গি নিয়ে সবুনসারা গ্রামে রওনা হলাম। আমরা নিজেরাই বৈঠা বেয়ে সবুনসারা গ্রামে গিয়ে হাজির হলাম। তখন দুপুর পেরিয়ে গেছে। অনভ্যাস্ত হাতে বৈঠা বাওয়ায় আমরা ক্লান্ত এবং ভীষণ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লাম। 

বিলেরপাড়ে বিরাট বাড়ি রফিক সাহেবের। আমরা তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি শুনে তিনি অনেক পরে আমাদের সামনে আসলেন। আমরা আমাদের উদ্দেশ্যের কথা জানাতেই তিনি সোজাসাপটা বলে উঠলেন, না না, আমি ভারত যাইনি। বলেই তিনি আর আমাদের সময় না দিয়ে সোজা উঠে গেলেন। আমরা এত কষ্ট করে এত পথ পাড়ি দিয়ে তার কাছে গিয়েছি সেসব তিনি কোন মূল্যই দিলেন না। আমরা হতাশ মুখে কিছুক্ষণ বসে থেকে অগত্যা উঠে পরলাম। খুধায় বৈঠা তুলতে পারছিলাম না। তার উপর রফিক সাহেবের চাঁছাছোলা ব্যবহারে আমাদের কষ্ট কয়েকগুণ বেড়ে গেল। আমরা উপায় খুঁজছিলাম। কি করা যায়। কোথায় খাওয়া পাওয়া যাবে। এইসময় আমাদের একজন বলল, এই গ্রামে আমাদের কুদ্দুস ভাইয়ের শশুর বাড়ি। কুদ্দুস ভাই সম্পর্কে আমাদের চাচাতো ভাই। কৃষি দপ্তরে চাকরি করেন। তিনি এই গাঁয়ে বিয়ে করেছেন। আমরা গহীন অন্ধকারে মৃদু আলোর দেখা পেলাম। আশায় বুক বেঁধে আমরা মুহূর্তে খুঁজে বের করে ফেললাম কুদ্দুসভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। ঘাটে ডিঙ্গি ভিড়িয়ে আমরা কুদ্দুসভাইয়ের শশুরবাড়ির লোকজন খুঁজতে লাগলাম। পাওয়া গেল তাদের। আমরা আমাদের পরিচয় দিলাম। তারা আমাদের অবস্থা দেখে বুঝে ফেলেছেন আমরা অভুক্ত। সময়টা এমন দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে। আমাদের ৬ জন মানুষকে খাওয়াতে হলে আবার নতুন করে চুলোয় রান্না চড়াতে হবে। 

আত্মীয়দের একজন নিম্ন কণ্ঠে আমাদের ডিঙ্গি থেকে নামতে বললেন। এবং খাওয়ার কথা বললেন। আমরা তাতেই খুশি। নামবো নামবো করছি। সেইসময় আমাদের দলনেতা রফিক মামু আকস্মিক বলে উঠলেন, না না, আমরা খেয়েছি। 

এই কথা শোনার পর তারা আর কোন জোরাজুরি করলেন না। একটু পর আমরা ডিঙ্গি ছাড়লাম। বিলের মাঝখানে এসে হাতের বৈঠা ঠাস করে ছুঁড়ে দিয়ে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলো জহুরুল। বললো, এই যে রাখলাম বৈঠা, আপনি একলাই ডোঙা বাইয়া নিয়া যাবেন। আমরা কেউ বৈঠা ধরবো না। ভদ্রতা দেখাইতে কে কইছে আপনারে কি আমার ভদ্রলোক। খুধায় জান বাড়াইয়া যাইতাছে আর উনি ভদ্রতা দেখাচ্ছেন। কি সুন্দর আওয়াজ, না না, আমরা খেয়েছি। জহুরুল কথাগুলো বলছিল ভেংচিয়ে। জহুরুল যেভাবে রফিক মামুকে আক্রমণ করছিল আমরা আর কেউই তাঁকে এভাবে বলতে পারতাম না। তিনি আমাদের সবার সিনিয়র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বাকি আমরা সবে কলেজে ঢুকেছি। রফিক মামু সম্পর্কে আমার মামা। আমি ডাকি মামু। অনেক গুণের একজন মানুষ। মেধাবী, মঞ্চের ভাল অভিনেতা, ভাল গান গাইতে পারেন। অসম্ভব ভদ্র একজন মানুষ। জহুরুলের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক। এই জন্য জহুরুল যা মন চায় বলে যাচ্ছে।  

জহুরুল যেভাবে তাঁকে আক্রমণে করেছে জবাবে তিনি কোন কথা বলেননি। অসহায় ভাবে একবার শুধু বলেছেন, আমি দেখলাম তারা একবার বলেছে। আবার বলুক। এই কথায় জহুরুল আরও গর্জে উঠলো, গালমুখে বলল, আপনাকে ভদ্রতা দেখাইতে কইছে কেডা? নামেন নৌকা থেকে। নামেন বলছি। 

বিলের অথৈ পানি। কোথায় নামবে? আমি পরিস্থিতি সহজ করতে বললাম, চলো, সামনে কোন দোকান পেলে আমরা মুড়িমুড়কি কিনে খাবো।

আমার এ কথার পর বৈঠা আবার সচল হলো। বিলের পর আমরা খাল দিয়ে একটি গ্রামে ঢুকলাম। গ্রামের নাম সেন-ভাঙ্গাবাড়ি। বিখ্যাত সেন পরিবারের জন্ম এই গ্রামে। তাদের নামানুসারে এই গাঁয়ের নাম সেন ভাঙ্গাবাড়ি। তাদের একজন বিখ্যাত কবি রজনিকান্ত সেন। শুনেছি বিখ্যাত চলচ্চিত্রাভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের পূর্ব পুরুষ এই গ্রামের বাসিন্দা। 

এই সময় না চাইতে জল পেয়ে গেলাম। আমরা খাল দিয়ে ডিঙ্গি বেয়ে যাচ্ছি। খালের পাড়ে একটি ছোট্ট দোকান। সেখানে কয়েকজন বসে আড্ডা দিচ্ছিল। তাদের একজন আমার ক্লাসমেট ফজল। আমি ফললকে দেখতে পাইনি। ফজল আমাকে দেখতে পেয়ে বললো, দোস্ত তুমি? এদিকে কোথায় গিয়েছিলে? আমি যেন অকূলে কূল খুঁজে পেলাম। বললাম, দোস্ত কথা পরে হবে। আগে পারলে আমাদের কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করো। খুধায় জান বেরিয়ে যাচ্ছে। ফজল এবং তার সঙ্গিরা আমাদের জন্য ব্যস্ত হয়ে ডিশে অল্প কিছু ভাত আর মুড়ি এনে রাখলো। আমরা গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। আহ। যেন অমৃত। খাওয়ার পর ফজলকে ধন্যবাদ দিয়ে আমাদের পরিকল্পনার কথা বললাম। এ ব্যাপারে ফজলের তেমন আগ্রহ দেখলাম না। তা যাই হোক, সে আমাদের জীবন বাঁচিয়েছে, তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমরা আবার বৈঠা হাতে তুলে নিলাম। 

অনেক খোঁজাখুঁজির পর এই নদী পথের সন্ধান পেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়েছি। দুপুরে আমরা একটি দোকান থেকে মুড়িমুড়কি কিনে খেয়ে পানি খেলাম পেটপুরে। একটু দম নিয়ে আবার হাঁটা। আমরা যাচ্ছি সিরাজগঞ্জ শহর থেকে অনেক পশ্চিমে গ্রামের রাস্তা দিয়ে। যাতে রাজাকার এবং পাকআর্মির মুখোমুখি হতে না হয়। 

খবর নিয়ে জানলাম আমাদের গ্রাম থেকে আমরা মাত্র দশ মাইল পথ এসেছি। শুভগাছা আরও সাত মাইল দূরে। 

মুড়িমুড়কি খেয়ে আমরা হৃষ্ট মনে পথ চলছি। মাইল সাতেক যাওয়ার পর আমরা আবার একজন গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই, শুভগাছা কতদূর? তিনি হাততুলে এমন সরলভাবে বললেন, এইতো,  ভাবখানা যেন আমরা শুভগাছা এসে গেছি। 

সূর্য দিগন্তে নেমে যাচ্ছে। আমাদের শরীরে ক্লান্তির ভার চেপে বসতে চাইছে। কিন্তু পথ কিছুতেই ফুরাচ্ছে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আমরা চিন্তিত হলাম, আমরা ভুল পথে যাচ্ছি নাতো। আবার একজন গ্রামবাসীকে শুভগাছার কথা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন, এইতো সামনে। এবার ওই অঞ্চলের গ্রামবাসীর উপর রাগ ঝারতে ঝারতে আমরা এগিয়ে যেতে থাকি। 

এই সময় আমাদের একজন হঠাৎ বলে উঠলো, আচ্ছা, গিয়ে যদি বিচিত্রকে না পাই। তার এই কথায় আমাদের মধ্যে হতাশা চেপে বসে। কথাটা একেবারে ফালতু কথা না। বিচিত্র হিন্দু পরিবারের সন্তান। পাকআর্মি এবং দেশীয় রাজাকাররা হিন্দুদের উপর বেশি নির্যাতন করছে। দলে দলে হিন্দুরা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। আকাশবাণীর খবরে জানা গেছে প্রায় এক কোটি শরণার্থী দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। সেই হিসেবে বিচিত্রদের পরিবার ভারতে পালিয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু না। আমরা সবাই উচ্চস্বরে আল্লাহকে ডেকে বিচিত্রকে পাওয়ার জন্য দোয়া করছি আর পথ চলছি। 

বিচিত্রকে না পেলে কি করবো আমরা? এই পথ ফেরা কি চাট্টিখানি কথা? ফিরবো বা কোন মুখে? যুদ্ধে এসে খালি হাতে ফিরে যাব? আমরা সমস্ত অনিশ্চয়তা দুপায়ে মারিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি। 

প্রায় চল্লিশ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে রাত দশটা নাগাদ আমরা শুভগাছা পৌঁছলাম। ততোক্ষণে আমরা আর আমরা নেই। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু আনন্দের সংবাদ হলো বিচিত্রকে পাওয়া গেছে। সেই আনন্দে আমরা সমস্ত ক্লান্তি ভুলে গেলাম। 

বিচিত্র আমাদের জন্য খাওয়ার আয়োজন করতে লাগলো। আমরা যে যেখানে বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছি সেখানেই গা ছেড়ে দিয়েছি। একটু পর দেখা গেল আমাদের কেউ জেগে নেই। কেউ খড়ের গাদায় হেলান দিয়ে কেউ বেঞ্চিতে কেউ দুব্বায় হাত পা ছেড়ে অঘোরে ঘুমুচ্ছে। [চলবে]

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Bangladesh muktijuddho)


সাগর দাস, ফিচার রাইটার, কোচবিহার:

আশায় আশায় বন্ধ ঘড়ির দুবার সঠিক সময়ের প্রতীক্ষায় বসে আজ তিন বছর..কাঁটা ঘুরল না।

"আবার দেখা হবে তো?'

"হ্যাঁ অবশ্যই, হবে বৈকি। দেখা তো হবেই, নির্বিকার নদী অববাহিকায় যারা পিতৃ তর্পণ করে, দেখা তাদেরও হয়। অগভীর আমাজনের জঙ্গলের কোলে এক বিন্দু আলোর ভুমিষ্ট হওয়া নয় কেবল, আছে তিলোত্তমার বুকে পয়সা কুরোনো কিছু পাপীর আস্পর্ধায় নাগাল পাওয়ার স্বপ্ন। হ্যাঁ কিছুটা তো পিছতেই হয়। নইলে নিচ্ছিদ্র অবসম্ভাবী মৃত্যুই একমাত্ৰ ভালোবাসা রবে কিনা.." 

"শুনতে চাইনি আমি বর্ণনা" 

"সব উত্তরে প্রত্যুত্তর সাজে না।"

"আচ্ছা আমি কলকাতা আসলে আমায় কলকাতা চেনাবি তো?"

"আমার কলকাতাও তোকে না হয় চিনে নেবে...গলিতে গলিতে গ্রাফিটি দেখতে পারবি তোর নামের।" 

"ছবি তুলবো খুব, তুই এত সুন্দর ছবি তুলিস।" 

"হ্যাঁ, তুই তবে কচি কলাপাতা রঙের জামদানি শাড়িটা পড়িস। খুব মানাবে, ছবি ফুটবে।"

তিন বছরে গ্রাফিটি গুলোও ধাঁধায় অন্ধকার হয়ে পড়েছে। আদৌ বাজবে তো সঠিক সময়ে দ্বিতীয় ঘন্টা! না আমি সস্তা নই, আর আমার ভালোবাসা তো নয়ই... নীল দেওয়ালের শূণ্যতা চিরে যখন দুফোঁটা জল গড়ায়, তখন চাতকের ডাকে সাড়া মেলে মরুদ্দানের ভিড়ে।

ফোনটা হঠাৎই বাজে... চলমান তিলোত্তমার রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ঘড়িতে দম দেওয়া হচ্ছে মনে হলো...।

"হ্যালো"

"অবিশ্রিত কিছু ঘটনার স্বীকারোক্তি। ক্ষমা প্রার্থী।" হৃদ স্পন্দন তুঙ্গে, তাই রক্ত সঞ্চালন শিরায় শিরায় অনেক বেশি বেগে। মগ্নতা বেড়ে গিয়ে "আচ্ছা বেশ, কবে দ্যাখা হচ্ছে!" চোখের সামনে একরাশ আলো আর তারপর সবটা সীমাহীন সুড়ঙ্গে..দুমমম্! 

খোলা চোখের ভ্রুকুটি, শব্দ বিন্যাসে ক্লান্ত। সামনে যেন মহানগরীর প্রতিশ্রুতি রাখার দায়ে বাকরুদ্ধ শহর। 

"এখন কেমন আছিস? আমায় কলকাতা চেনাবি না? সবুজ এই শাড়িটা যে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তাই বড্ড দেরি হলো..."

ঘড়িটা আজও বন্ধ। তবুও দুবার সঠিক সময় দিতে ব্যর্থ। কিন্তু সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত যে অবশ্যম্ভাবী! তাই আমিও সময়ের প্রবাহে আবহমান...

(www.theoffnews.com - Bengali feature wait Kolkata)