গুরুত্বপূর্ণ খবর

(www.theoffnews.com - NATO Estonia Russia border army)
 

সুকন্যা পাল, ম্যানেজিং এডিটর, দ্য অফনিউজ, কলকাতা:

"দুর্গাপুর নগর নিগম এলাকা যদি আমার সামগ্রিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হয়, তবে 'বাদশা' হল আমার একান্ত অন্তরাত্মা। এখানকার আবাসিক গুরুজনদের বিভিন্ন জীবন অভিজ্ঞতা আমাকে সমৃদ্ধ করে। আমাকে প্রেরণা দেয়।" মাত্র দিন পাঁচ আগে প্রকাশ্যে এমন প্রানময় মন্তব্য দুর্গাপুরের প্রথম নাগরিক তথা মেয়র অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের।

যার আবর্তে শিল্পনগরীর মেয়রের এহেন হৃদয় গাঁথা বক্তব্য, সেই 'বাদশা' বা 'বর্ধমান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি ফর হিউম্যান অ্যাক্টিভিটিস' আসলে একটি বৃদ্ধাশ্রমের আদুরে নাম। রূপসী বাংলার রূঢ় অঞ্চলের ইস্পাত নগরীর এক বৃদ্ধাবাসের যে এটাই অহংকারী পরিচিতি। ২০০৫ সাল। এ যেন বৃদ্ধ বৃদ্ধার তুঙ্গ বৃহস্পতির মাহেন্দ্র যোগ। স্থানীয় ভূমি মানুষ মানবেন্দ্র মন্ডল, সুনীল মুখোপাধ্যায়, সুকুমার রায়, চন্ডী কোনার, শঙ্কর রায়, দীপক মন্ডল সহ বেশকিছু সুধীজন সেদিন ভেবেছিলেন, এই চিমনি এলাকায় একটা বৃদ্ধাবাস গড়ে তুললে কেমন হয়। ব্যাস, ভাবনার ক্যানভাসে লাগলো বাস্তবতার রঙিন রামধনু ছোপ। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল 'বাদশা'। এদিকে বাদশার পথ চলার নুপুরে সিম্ফনির বোলে বেজে উঠলো আরও এক একতারা বাউল মনে। হরিহর আত্মা হিসেবে আত্মীয়তার বন্ধনে যুক্ত হয়েছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক তথা এডিটর সুকুমার রায়। একদা এই শহরের বাসিন্দা হলেও আপাদমস্তক এই ভারতীয় বর্তমানে কিন্তু আমেরিকার ফ্লোরিডায় 'নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়' গান গেয়ে থাকেন অবিরাম। বর্তমানে তিনি বাদশার প্রেসিডেন্ট।

বাদশায় একটি মনোজ্ঞ আলোচনা সভায় বক্তারা বক্তব্য রাখছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকার প্রসঙ্গে। প্রানঞ্জল ভাষায় একটু আগেই বক্তব্য রেখেছিলেন ডা. দেবাশিস বক্সি, তিনি হাওড়ার মৌরীগ্রামে অব অবস্থিত আইআরআইআইএম (IRIIM)-এর অধ্যক্ষ, মিশন হাসপাতালের ডা: পার্থ পাল, বিবেকানন্দ হাসপাতালের ডা:এস কে সরকার, ডা: দেবাশিস চ্যাটার্জি প্রমুখ। ডায়াসের একাসনেই তখন বসেছিলেন এই শহর-মেয়র অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়, সাংসদ সুনীল মন্ডল, বোড়ো চেয়ারম্যান রমা হালদার ও প্রবীণ সমাজকর্মী সুদেব রায়। অনুষ্ঠানের স্টপগ্যাপে অবশ্য ততক্ষণে সঙ্গীত পরিবেশন করে ফেলেছেন দুই প্রবীণা আবাসিক ঝর্ণা মুখোপাধ্যায় এবং পুতুল সেন। একজনের কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ঝরঝর মুর্ছনা তো অপরজনের সুরে শ্রীরামকৃষ্ণের পবিত্র বন্দনা। আর তাতেই বাদশার বেতাজ মুকুটে মূহুর্তে উদ্ভাসিত হয়েছিল জীবন-সংস্কৃতির নানান আঙ্গিকের এক মিশ্র পারিবারিক ককটেল। বুঝে নিতে এখানে মোটেও তাই অসুবিধা হয়নি, সমাজের রকমারি স্তর থেকে উঠে আসা প্রবীণ-প্রবীণারা এখানে হাজির হয়েছেন বৃদ্ধাবাসে নয়, আসলে জড়ো হয়েছেন এক লাল নীল সবুজের অকৃত্রিম হরিহর হট্টমেলায়। যেখানে আছে হাসি দুঃখ সুখ আনন্দ পরস্পরে ভাগ করে নেওয়ার এক অপার প্ল্যাটফর্ম। যেখানে আছে সুস্থ সংস্কৃতির সঙ্গে মানবিক স্পন্দনগুলো খুঁজে নেওয়ার এক 'বয়স তুবড়ি মারার' বৃত্তময় সাতনুড়ি গলার হার।

এদিকে আলোচনায় অংশ নিয়ে একটু ভিন্ন পর্যায়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সুকুমার রায় বলেন, "আমরা আবাসিকদের কাছে সাধারণত কোনও অগ্রিম নিই না। এমনকি সর্বনূন্যতম হিসেবে আমরা কিছু আবাসিকদের কাছে মাসিক মাত্র আড়াই হাজার টাকা নিয়ে থাকি খাওয়া ও থাকা বাবদ। যা বহু বৃদ্ধাশ্রমের কাছে এই বিষয়টা আজকের দিনে ভাবনার অতীত।" তিনি আরও সংযোজন করেন, "বাদশায় যা ঘাটতি হয় তা বিভিন্ন অনুদান থেকে ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজ্যের সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য, প্রাক্তন সাংসদ প্রয়াত অবনী রায় ও বরুন মুখোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পেরেছি। আমাদের কাজ অনেক অনেক অনেকাংশে বাকি। বাদশাকে সমৃদ্ধ করাই যে আমাদের কাছে এখন অর্জূণের পাখির চোখ।"

আলোচনার আসর যখন মধ্যগগণে তখন একটু পাশেই 'আমার হাত ধরে নিয়ে চলো সখা' মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে চলছিল রক্তদান শিবির, চক্ষু চিকিৎসা শিবির এবং সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির। বিবেকানন্দ হাসপাতাল ও নেশন হাসপাতালের সহচর্যে এই শিবিরগুলোতে সাধারণ মানুষের উৎসাহ কিন্তু বেশ নজর কাড়া। মেয়র অনিন্দিতা দেবী রক্তদাতাদের মাথায় বুলিয়ে দিচ্ছেন পরমতম স্নেহে। আসলে তাঁর মমতা-স্পর্শে তিনি বুঝিয়ে দিলেন উপস্থিত বাদশার আবাসিকদের, 'আমি তোমাদেরই লোক।'

সাংসদ সুনীল মন্ডল এর আগেও বাদশায় এসেছেন মনের আহ্বানে। আপন আনন্দে। তাই তো তিনি বলে উঠলেন কথা প্রসঙ্গে, "বাদশার সঙ্গে আমার সংযোগ শুধু একদিনের নয়। বহুদিনের। বাদশার মঙ্গল কামনা হল আমার শ্বাস প্রশ্বাস। আমি অবশ্যই সমাজের মানবমন বন্ধুদের কাছে আবেদন করবো, আপনারা এগিয়ে আসুন বাদশার উন্নতি সাধনে। আমি নিজেও কিছু সাংসদকে একই অনুরোধ করবো।"

অতিথিদের উপস্থিতি, আলোচনাচক্র, রক্তদান ও স্বাস্থ্য শিবির, আবৃত্তি ও সঙ্গীত পরিবেশন সঙ্গে মধুরেণ সমাপ্তি হিসেবে একটু হৈ চৈ করা সবাই মিলে মধ্যাহ্নভোজনের আয়োজন, সবই যেন চলছিল নিখুঁত পরিশীলিত অভ্যাসে। কিন্তু তারই মধ্যে সাগর মন্থনে অমৃত ভান্ডের ন্যায় আসল কথাটি বলে ফেললেন নাম প্রকাশে এক অনিচ্ছুক আবাসিক। তাঁর নিজস্ব মনচারিতা, "আপনারা কি ভাবেন বলুন তো? বাদশার কি শুধু একটা নাম? বাদশা কি স্রেফ একটা বৃদ্ধাশ্রম? ভুল ভুল, বুঝলেন। আসলে এখানে 'বাদশা' অর্থ কি জানেন?" বিরবির করে আপন খেয়ালে আচমকা এবার মেলোডি গেয়ে উঠলেন, "আমরা সবাই বাদশা আমাদের এই বাদশার রাজত্বে, নইলে মোদের বাদশার সনে মিলব কি স্বত্বে?

(www.theoffnews.com - Badsha oldage home)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

এ যেন বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলের গল্প। যে তার বিলাসের জন্য, জীবনধারণের জন্য পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া সম্পত্তি বিক্রিই একমাত্র উপায় ভাবে। একের পর এক সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা জলের দরে বেসরকারি হাতে তুলে দিয়ে দেশবাসীর ভাবনা এবং সন্দেহে ধারাবাহিক সিলমোহর দিয়ে চলেছে কেন্দ্রের মোদি সরকার। এবার ১০ হাজার কোটির সরকারি সংস্থা “পবন হংস" মাত্র ২১১ কোটি টাকায় তুলে দেওয়া হলো রামদেব বাবার সংস্থা স্টার-৯ মোবিলিটি কোম্পানির হাতে। যদিও সরকার বেশ কয়েক বছর ধরে পবন হংসকে অলাভজনক বলে দাগিয়ে আসছিল। কিন্তু পবন হংস ১৯৯২ সাল থেকে বাণিজ্যক লাভ করে চলেছে, ২০১৪-১৫ সালেও সরকারকে ২২৩.৬৯ কোটি টাকার লাভ দিয়েছে, মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এটি ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল। ইচ্ছাকৃতভাবেই এটিকে অলাভজনক দেখিয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। সরকার তার ৫১ শতাংশ শেয়ারের জন্য কমপক্ষে ৫০০ কোটি পাবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সরকার বেস প্রাইস বা ন্যূনতম মূল্য ধার্য করে মাত্র ২০০ কোটি টাকা। স্টার-৯ মোবিলিটি কোম্পানিটি বেসপ্রাইজের চেয়ে মাত্র ১১ কোটি টাকা বেশি দিয়ে কিনে নেয় পবন হংস। এশিয়ার বৃহত্তম হেলিকপ্টার পরিষেবা সংস্থাকে ২১১ কোটি টাকায় কোন যুক্তিতে মাত্র ছমাস আগে তৈরি হওয়া একটি সংস্থার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হল, সেটা কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রী এবং তার কিছু মোসায়েব ছাড়া আর কেউ জানেন না।

পবন হংসের হেলিকপ্টার মূলত দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ স্থাপন, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকার্যের জন্য ব্যবহৃত হত। ওএনজিসির অধীনেও সংস্থাটির শেয়ার রয়েছে, অবশিষ্ট ৪৯ শতাংশের শেয়ারহোল্ডার তারা, এছাড়া তারাও অপারেশনের জন্য পবন হংস হেলিকপ্টার ব্যবহার করে। সাধারণের জন্য ফ্লাইট ছাড়াও বিএসএফ-এর ছয়টি ধ্রুব হেলিকপ্টারও হ্যালের জন্য পবন হংস দ্বারা পরিচালিত হয়। বৈষ্ণোদেবী, কেদারনাথ-বদ্রীনাথ তীর্থ যাত্রার ক্ষেত্রে পবন-হংস গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে এসেছে। এছাড়া, বিভিন্ন প্রাইভেট সেক্টর এবং নেতা-মন্ত্রী, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এই সংস্থা পরিষেবা দিয়ে থাকে। ২০২১ এর মার্চে অর্থমন্ত্রী যে সমস্ত সরকারি সংস্থা বিক্রি করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন পবন-হংস তার মধ্যে ছিল না।। হঠাৎ করে কেন এবং কোন উদ্দেশ্য সাধন করতে এই সংস্থা বিক্রি করে দেওয়া হল, সেটা জানার আগেই তা হাতবদল হয়ে গেল। পবন হংসের মোট ৪৬ টি হেলিকপ্টার রয়েছে, যেগুলোর দাম সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এরই সঙ্গে গোটা দেশের কয়েক হাজার সরকারি হেলিপ্যাডও প্রকারান্তরে রামদেবের দখলে চলে গেলো। ২৯ শে অক্টোবর ২০২১ সালে তৈরি হয় স্টার-৯ মোবিলিটি প্রাইভেট লিমিটেড। ছয় মাসের একটা সংস্থা, মাত্র ৩১১ কোটি টাকার বিনিময়ে, একটা সরকারি কোম্পানীর ৫১% শেয়ার ৩৫ গুণ কম দামে কিনে, মালিকানার অধিকার পেয়ে গেল! শোনা গিয়েছে এই কোম্পানির মাত্র ১ লাখ টাকা পুঁজি, বাকি ২৯৯.৯  কোটি লোন দেবে সরকারি ব্যাঙ্ক। মাত্র এক লাখ টাকার বিনিময়ে…! 

অস্থির বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার ছাড়া কার্যত নজিরবিহীন। যে কারণে পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী গত মার্চে এলআইসির শেয়ার ছাড়া হয়নি। এখন যখন গোটা অর্থবর্ষ হাতে রয়েছে তখন তড়িঘড়ি আইপিও-র বাজারে পা ফেলার কারণ কি? অনেকের বক্তব্য, এই আইপিও থেকে সরকার হয়তো লাভবানই হবে। কিন্তু কার স্বার্থে পড়তি বাজারে আইপিও এনে আরও বড় অঙ্কের অর্থ রাজকোষে তোলার সুযোগ হাতছাড়া হল? 

২মে  লঞ্চ হয়েছে এলআইসির আইপিও। তবে প্রথম দুদিন শুধু বড় মাপের বিনিয়োগকারী বা অ্যাঙ্কর ইনভেস্টররাই দেশের বৃহত্তম বিমা সংস্থার শেয়ার কেনার সুযোগ পেয়েছেন। এরপর তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আওতায় আসে ৪ মে থেকে ৯ মে-র মধ্যে। মঙ্গলবার কেন্দ্র দাবি করেছে, প্রথম দু’দিনে ৫ হাজার ৬২৭ কোটি টাকার আইপিও বিক্রি হয়েছে। কিন্তু কংগ্রেস সহ অন্য বিরোধী দলগুলির দাবি, সরকার যে দরে এলআইসির শেয়ার বিক্রি করছে তাতে মোটা অঙ্কের লোকসান হতে চলেছে সরকারি কোষাগারের।  ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই যেখানে দেশের বৃহত্তম বিমা সংস্থার মূল্য ধরা হয়েছিল ১২ থেকে ১৪ লক্ষ কোটি টাকা, সেখানে এখন মূল্য ধরা হচ্ছে মাত্র ৬ লক্ষ কোটি টাকা। মাত্র দুমাসে কোন জাদুতে এত কমে গেল এলআইসির ব্র্যান্ড ভ্যালু? প্রশ্ন সকলের। কংগ্রেসের  রণদীপ সুরজেওয়ালার দাবি, এলআইসির প্রতিটি শেয়ারের দাম প্রথমে ঠিক হয়েছিল ১ হাজার ১০০ টাকা। কিন্তু সেখান থেকে দাম কমিয়ে করা হয়েছে ৯০২ থেকে ৯৪৯ টাকা। এতে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে। এলআইসির এমবেডেড ভ্যালু ৬ লক্ষ কোটি টাকা ধরে এই ৯০২ থেকে ৯৪৯ টাকা শেয়ারের দর ঠিক করা হয়েছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে এমবেডেড ভ্যালুর আড়াই থেকে চার গুণ বাড়িয়ে শেয়ারের দর ঠিক হয়। সেক্ষেত্রে এই দর ন্যুনতম আড়াই গুণ বাড়ালেও এক একটি শেয়ারের দর হওয়ার কথা ছিল ২১০০ থেকে ৩০০০ টাকা। সরকার যেখানে এলআইসির ৫ শতাংশ শেয়ার বেচে ৭০ হাজার কোটি টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল, সেখানে এখন ৩.৫ শতাংশ শেয়ার বেচে কেন্দ্রের আয় হতে চলেছে মাত্র ২১ হাজার কোটি টাকা। ক্ষতি? ২৫ থেকে ৫৪ লক্ষ কোটি টাকার মত। এত কম দামে এলআইসির শেয়ার বেচতে কেন মরিয়া কেন্দ্র? সম্পদের বিচারে এলআইসি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম সংস্থা। এলআইসির মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তা সত্ত্বেও কার স্বার্থে এত সস্তায় এলআইসির শেয়ার বিক্রি করছে কেন্দ্র?” অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা এর ফলে বিভিন্ন বেসরকারি বিমা সংস্থা এবং বিদেশী সংস্থাগুলি কম দামে এলআইসির শেয়ার নিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে।  

গত বছর এয়ার ইন্ডিয়া টাটা সন্সকে বিক্রি করেছে কেন্দ্র। তার পর চলতি বছরে পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেসরকারিকরণের লক্ষ্য নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। সেই তালিকায় রয়েছে ভারত পেট্রোলিয়াম, শিপিং কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া, বিইএমএল ও আইডিবিআই ব্যাঙ্ক। তারই মাঝে টুক করে বিক্রি হয়ে গেল পবন হংস। এভাবে চললে আর কয়েক বছর পরে তো বেচার জন্য সরকারি সংস্থাই থাকবে না, তখন? তখন বোধহয় আপনার আমার পালা। শুনেছি আরব দেশে এখনও ক্রীতদাস নেওয়া হয় অর্থের বিনিময়ে, লোক নেয় জঙ্গি সংগঠনগুলিও। তবে আর কি? আপনি তৈরি হন এখন থেকেই। আমাদের সরকার কিন্তু বেচার জন্য তৈরি।

(www.theoffnews.com - Paban Hans)

(www.theoffnews.com - Mexico two journalists shot dead)
 

রূদ্রাণী মিশ্র, লেখিকা ও কবি, কলকাতা:

আজকালকার সমাজে চারিদিকে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। রোজ নানা মাধ্যম থেকে আমরা খবরগুলো জানি এবং শুনে থাকি। আপনারা বলবেন কেন আগে হত না? নাহ অস্বীকার করার জায়গা নেই। তবে এটাও ঠিক যে এখনকার মত ভয়াবহতা তখন ছিল না।

এত গৌড়চন্দ্রিকার কারণ, এবার খুলে বলি। আমার মতে যে সমাজ বই পড়তে জানে না বা বই পড়তে ভুলে গেছে, সেই সমাজ অবক্ষয়ের পথে যেতে বাধ্য। সেই সমাজে দয়া, মায়া, বিবেক আশা করা, অনেকটা যেন মরুভুমিতে ধানক্ষেত খোঁজা। আগে যখন টিভি বলতে শুধুমাত্র দূরদর্শন বোঝাত। তার সময়সীমাও ছিল, বাঁধাধরা। ফলতঃ তখন লোকজনের বই ছাড়া আর কোনও কিছুই অবসর যাপনের জন্য ছিল না। সেসময় ছোটদের জন্য চাঁদমামা, শুকতারা, আনন্দমেলা এরকম ছোটদের ম‍্যাগাজিন তো ছিলই। উপরন্তু অমর চিত্রকথা, নামের কমিকসের বইও ছিল, যা ছবি দিয়ে এবং কথপোকথনের সাহায্যে বড় গল্পকে ছোট করে তুলে ধরা হত। ছোট ছেলেমেয়েরা মনের আনন্দে ওইসব পড়ত, তার ফলে বড় আসল গল্পগুলো না পড়া হলেও, মোটামুটি জিস্ট তারা জানত। যেমন, বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা দেবী চৌধুরানী, আনন্দমঠ, রানা প্রতাপ, শিবাজী, বিদ‍্যাসাগরের জীবনী এই রকম নানা গল্প। অনেক স্কুলে লাইব্রেরি বলে একটা পিরিয়ড ও থাকত, ক্লাস ফাইভ থেকে। সেই পিরিয়ডে স্কুল থেকে বই দেওয়া হত, একসপ্তাহ পর ফেরত দিয়ে আবার নতুন বই। এতো গেল ছোটদের কথা। বড়রাও বঞ্চিত হতেন না, বই পড়ার আনন্দ থেকে। পাড়ায় পাড়ায় গ্ৰন্থাগার থাকত, সেখান থেকে তারা বই এনে পড়তে পারতেন। উপরন্তু সন্ধেবেলা ওইসব গ্ৰন্থাগারের রিডিং রুমে সব ধরণের সেদিনের খবরের কাগজও থাকত, অনেকেই ওখানে বসে বসে খবরের কাগজ পড়তেন। আর আবালবৃদ্ধবনিতার জন্য বইমেলার কথা না বললে তো অনেক কিছু বলা বাকি থেকে যাবে। হ‍্যাঁ, ঠিক বলেছেন, এখনও বইমেলা হয়। তবে আমার জানা মতে এখন যারা বই কেনেন, তারা ওই ফ্লিপকার্ট, আ্যামাজনের উপরই পুরোপুরি নির্ভর করেন। কেউ কেউ তো আরেক ডিগ্ৰী উপরে, তারা পিডিএফ নামিয়ে মোবাইল বা কম্পিউটারে পড়ে নেন (আমি তো ভাবতেই পারি না, বইয়ের গন্ধ না শুঁকে, পড়তে পড়তে বইয়ের উপর না ঘুমিয়ে, লোকজন বই কিভাবে পড়ে?) তাই বইমেলা কতটুকু বইয়ের জন্য, সেই প্রশ্নটা থেকে যায়। তবে লিটিল ম‍্যাগাজিন গুলো এখনও একটু অক্সিজেন পায়, এই বইমেলা থেকে। একথা অস্বীকার করার জো নেই।

এতদূর পড়ে নিশ্চয়ই ভালভাবে বোঝা যাচ্ছে, তখনকার লোকজনের মধ্যে পড়ার চল ছিল। কিন্তু অত‍্যন্ত দুঃখের বিষয় সেই বইপ্রীতি আজকাল আমার চোখে পড়ে না। এখনকার বেশিরভাগ বাচ্ছাদের তো আমি পড়তে (পড়ার বই ছাড়া) দেখতেই পাই না। আমার পাশের বাড়ির একটি মেয়ে সে জানে না, তার পড়ার বইয়ের কোথায় কী আছে। কিন্তু ভিনদেশীয় ওয়েব সিরিজ 'স্কুইড গেম' নেটফ্লিস্কে দেখানো হয়েছে। তা সে ইংরেজি ভাল মত না জানলেও, জানে। আমার জানা মতে এই ওয়েব সিরিজটিতে বটম লাইন হল, 'মরো বা মারো'। আপনারা আশা করছেন কিভাবে, যে এইরকম ওয়েব সিরিজের দর্শক যেখানে ভুরি ভুরি, সেখানে লোকজনের মধ্যে দয়া, মায়া, বিবেক, বিবেচনা এইসব সুক্ষ্ম কোমল সুকুমারবৃত্তি গুলো থাকবে? তারা তো মর না হলে মারো মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে গেছে। প্রেম ভালোবাসা, ত‍্যাগ ওগুলো ওদের কাছে 'বাতুলতা'। তাই এখন হয়তো মোমবাতি জ্বালিয়ে নিয়ে খুঁজলেও আগের বাঙালি পাওয়া খুব মুস্কিল।

কয়েকদিন আগে ডঃ কৃষ্ণা বসু একটি কবিসভায় বক্তৃতা দিয়ে বলেছিলেন। "স্বশিক্ষিত মানেই সুশিক্ষিত"। তিনি আরও বলেছিলেন, তিনি একবার তার ভাগ্নের কাছে ফ্রান্সে গেছিলেন। তখন ভাগ্নের কথা মতো তিনি ট্রেন ধরে ভাগ্নের বাড়ী গেলেন। যাওয়ার পথে দেখতে পেলেন, ট্রেনের মধ্যে, ট্রেনের বাইরে, পার্কে সব জায়গায় লোকজন হাতে বই নিয়ে চুপচাপ পড়ে যাচ্ছে। কেউ কাউকে বিরক্ত করছে না। এবার আপনি বলুন পাঠক, সেই দেশ এগোনো উচিত না যে দেশের লোকজন বইকে ভুলে গেছে, তারা এগুবে?

এই বলে ক্ষান্ত দিতে পারছি না। কেন? বলছি। সেদিন বই নিয়ে ফেসবুকের এক বন্ধুর পোস্টে কথা হচ্ছিল। সেখানে একজন লেখিকা (বন্ধুটি জানালেন) আমায় বললেন "মানবিকতা দয়া মায়া বই পড়ে শেখা যায় না। পৃথিবী দেখে শিখতে হয় … কালো অক্ষরে যা লেখা থাকে, তার প্রভাব খুব একটা সুদূরপ্রসারি হয় না ..." বিশ্বাস করুন আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না, যে মহিলা একজন শব্দকর্মী। একজন শব্দকর্মী কিভাবে এই কথা বলতে পারেন?  তাহলে সাধারণ মানুষের দোষ কোথায়? তারা তো টিভি দেখে পৃথিবী শিখছেন। যারা এইরকম মানসিকতায় ভোগেন, তাদের কাছে আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে।

১) লেখকের লেখা ব‍্যান হয় কেন?

২) ছোটবেলা ভাল ভাল কথার বই বাচ্ছাদের পড়ানো হয় কেন? 

৩) খারাপ বই খারাপ মানসিকতা ছড়াবে, এমন বই পোড়ানো হয় কেন?

৪) আগেকার দিনে মেয়েদের পাঁচালি, মেয়েদের ব্রতকথা এসব কিছু ছাড়া পড়তে দেওয়া হত না, কেন?

৫) লেখকদের খুনের হুমকি দেওয়া হয় কেন? 

৬) কিছু লোকজনকে কেন বলতে শোনা যায়, ওই বই আমার জীবন যাত্রা পাল্টে দিয়েছে?

৭) লেখার জন্য হাজতবাস করতে হয় কেন? বা কোর্ট আর বাড়ি করতে হয় কেন? ( মান্টো, ইসমৎ চুগতাই)

মূলকথা কি জানেন, আমরা জন্মের পর থেকে প্রতি মূহুর্তে শিখে চলি। কেউ যখন নতুন রান্না করে, তাকে অভিজ্ঞ রাঁধুনি থেকে গাইড নিতে হয় না? (এখন অবশ্য ইউটিউব আছে) তেমনি লেখা পড়ে আমরা বুঝতে, জানতে, শিখতে চেষ্টা করি। যা লেখক আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চেষ্টা করেছেন। আমার চেনা একজন এক লেখককে বলছিলেন, তখন কান পেতে শুনেছি, তিনি বলছিলেন, "জানেন, আপনি যা লেখেন, তা আমাদের চোখের সামনে রোজ হয়, কিন্তু মনে হয়, ওটা তো স্বাভাবিক, ওটা তো ঘটে আসছে। এমনটাই তো হয়। তারপর আপনার লেখা পড়ে মনে হয়, না সত‍্যি তো, এটা তো অন‍্যায় হয়ে এসেছে। শুধু আমাদের উপলব্ধির অভাবের জন্য আমরা বুঝতে পারি না"। তাই বলছি, কথাটা একটু কিতাবি লাগলেও, বই আমাদের ভাবায়, শেখায়, বোঝায়, চোখে আঙ্গুল দিয়ে ভুল দেখিয়ে দেয়। তবেই তো বলা হয়, বই প্রকৃত মানুষ করতে সাহায্য করে। সেই জন্য বলতেই হচ্ছে, ওই কালো অক্ষরগুলো সত্যিই অনেক সুদুরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখে। বিশ্বাস করুন।

(www.theoffnews.com - book)