গুরুত্বপূর্ণ খবর

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

১৮৮৪ সালে দুর্গাচরণ রায়ের লেখা ‘দেবগণের মর্তে আগমন’ বইয়ে দেবতা বরুণ, ব্রহ্মাকে ভারতে রেলপত্তনের ইতিহাস বর্ণনা করে বলেছেন— ‘যে দিন প্রথমে চলে অনেকে সাহস করিয়া উঠে নাই। তৎপরদিন আরোহীর সংখ্যা দেখে কে?’। দীনবন্ধু মিত্র, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণকামিনী দাসী, রূপচাঁদ পক্ষী থেকে শুরু করে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ বহু লেখকের লেখায় এই নতুন আশ্চর্য যানের উল্লেখ ছিল। তা থেকে জনজীবনে এই দ্রুতগতির ট্রেনগাড়ির ভূমিকা ও অভিঘাত কী বিপুল ছিল, আন্দাজ করা যায়।

স্ট্যান্ডার্ড গেজ বা ব্রড গেজ রেললাইন ছাড়াও অজস্র ছোট আকারের মিটার গেজ ও ন্যারো গেজ রেললাইন ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। বাংলায় ছোট রেললাইনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল ‘ম্যাকলিয়ড রাসেল অ্যান্ড কোম্পানি’ এবং ‘মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি’। স্বল্প ব্যয়ে, স্বল্প মূলধনে, কম পুঁজি ও গ্যারান্টি মানির সাহায্যে এই ফিডার লাইনগুলো বসানো সম্ভব ছিল বলে ১৮৯০ থেকে ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা পর্যন্ত এই প্রাইভেট কোম্পানির অজস্র ছোট রেলগাড়ির স্বর্ণযুগ হয়ে ওঠে ভারতবর্ষ। এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘মার্টিন রেল’। হাওড়া, হুগলির গ্রামাঞ্চলের বিরাট সংখ্যক মানুষের কাছে তো বটেই, পরবর্তী কালে বারাসত-বসিরহাট লাইট রেলওয়ে চালু করে তিনটি জেলার মানুষের কাছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল এই লাইট রেলওয়ে। আজও হয়তো হাওড়া, হুগলি, বারাসত, বসিরহাটের জায়গায় জায়গায় এই ন্যারো গেজ রেললাইনের অবশিষ্টাংশ কোথাও কোথাও রয়ে গিয়েছে, তার উপরে উঠেছে দোকানপাট, তৈরি হয়েছে বাস রুট। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে আজও অমলিন এই ট্রেন। বিশেষত যাদের জন্ম পঞ্চাশের দশকে, তারা ছেলেবেলার স্মৃতি হিসেবে আজও রোমন্থন করেন এই ট্রেনে চড়ার কাহিনী। ষাটের দশকের শেষ অবধি মার্টিন রেল চলেছিল। সত্তর দশকের গোড়ায় পৌঁছে আস্তে আস্তে উঠে যায় এই লাইট ট্রেন। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫০-৫১ সালে চালু লাইট রেলওয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে হাওড়া-আমতা, হাওড়া-শিয়াখালা এবং বারাসত-বসিরহাট লাইনের মার্টিন রেলওয়ের বিবরণ। অথচ আজ তা ধূসর ইতিহাস, বিস্মৃতির আবরণে ঢাকা।

ব্রিটিশ-বাঙালি যৌথ মালিকানায় গড়ে উঠেছিল মার্টিন লাইট রেলওয়ে। ইংরেজ ব্যবসায়ী টমাস অ্যাকুইনাস মার্টিনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই রেল-পরিষেবা গড়ে তুলেছিলেন বাঙালি উদ্যোগপতি স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ব্রিটিশ ভারতে, ইউরোপীয় পার্টনারদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ছেড়ে টমাস মার্টিন যে ভাবে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন এক জন বাঙালি ভাগ্যান্বেষী শিল্পপতির সঙ্গে, তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় এই কঠোর পরিশ্রমী ও সৎ বাঙালি এক জন শীর্ষস্থানীয় সফল ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর পুত্র বীরেন মুখোপাধ্যায় বাবার মৃত্যুর পর ব্যবসার হাল ধরেন এবং ১৯৪৬ সালে যখন ‘মার্টিন অ্যান্ড বার্ন’ কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়, তিনি তার ম্যানেজিং ডিরেক্টর হন। বীরেন মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী লেডি রাণু মুখোপাধ্যায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ স্নেহভাজন। বীরেন মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় ১৯৪৫ সালে মার্টিন কোম্পানির ট্রেনের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডিজেল ইঞ্জিন চালু হয়। হাওড়া-আমতা, হাওড়া-শিয়াখালা, বারাসত-বসিরহাট— সব ক’টি শাখারই ডিরেক্টর ছিলেন স্যার বীরেন মুখোপাধ্যায়। তুখোড় ব্যবসায়িক বুদ্ধির অধিকারী রাজেন্দ্রনাথ টের পেয়েছিলেন যে, হাওড়া, হুগলি, চব্বিশ পরগনার বিস্তৃত অঞ্চলের প্রচুর মানুষজন কাজের সূত্রে কলকাতা যাতায়াত করেন, কিন্তু তাঁদের জন্য কোনও সস্তা সুগম যাতায়াত-ব্যবস্থা নেই। সেই অভাব দূর করতেই হাওড়া-আমতা লাইট রেলওয়েজ় (এইচএএলআর) এবং হাওড়া-শিয়াখালা লাইট রেলওয়েজ় (এইচএসএলআর) গড়ে ওঠে। এর পর এই দুই প্রধান রেলপথের আরও শাখাপথ বেরিয়েছিল। মার্টিন রেলের অপর গুরুত্বপূর্ণ শাখা ছিল বারাসত-বসিরহাট লাইট রেলওয়ে (বিবিএলআর)। চব্বিশ পরগনা জেলার এই বর্ধিষ্ণু জনপদকে রেললাইনের মাধ্যমে যুক্ত করার এই প্রয়াস ছিল ঐতিহাসিক। ১ ফেব্রুয়ারি ১৯০৫, বারাসত থেকে বসিরহাট, ২৬ মাইল দীর্ঘ এই রেলপথের সূচনা হয়। এর পর টাকি এবং ইছামতী-তীরবর্তী হাসনাবাদ পর্যন্ত দু’টি এক্সটেনশন লাইন খোলা হয়েছিল। যাত্রীর সংখ্যা অতি দ্রুত বৃদ্ধির কারণে ১৯০৮ সালে এই লাইনেই শ্যামবাজার শাখা খোলা হয়। গোটা উত্তর এবং পূর্ব কলকাতাকে ছুঁয়ে চলত এই মার্টিন রেল। শ্যামবাজার থেকে শুরু হয়ে পাতিপুকুর, বাগুইআটি, হাতিয়ারা, রাজারহাট, লাঙলপোতা, হাড়োয়াখোল, খড়িবেড়ি, আমিনপুর, বেলেঘাটা জংশন হয়ে এই ট্রেন পৌঁছত হাসনাবাদ। নিত্যযাত্রী ছাড়াও কাঠ, পাট, মাছ, দুধ, মাদুর ও কৃষিজ পণ্যও নিয়ে যেত এই লাইনের গাড়িগুলি। বাষ্প-ইঞ্জিনচালিত পাঁচ কামরা বিশিষ্ট এই ধীরগতির ট্রেনে শ্যামবাজার থেকে বসিরহাট পর্যন্ত পৌঁছতে সময় লাগত সাড়ে চার ঘণ্টা। কিন্তু খুব দ্রুত শ্যামবাজার থেকে বাস-পরিষেবা চালু হয়। ট্রেনের চেয়ে ঢের কম সময়ে এবং কম খরচে বাসে চড়ে মানুষ পৌঁছতেন গন্তব্যে। ১৯২৭ সালে মার্টিন কোম্পানির এই শ্যামবাজার-হাসনাবাদ লাইন বিক্রি করে দেওয়া হয় অন্য কোম্পানির কাছে। আরও পরে যাত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়া, রেলপথ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় ১৯২৭ সালে কোম্পানি নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে। পঞ্চাশ বছর চলার পর ১ জুলাই ১৯৫৫ এই লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শেষ ট্রেনটি যে দিন শ্যামবাজার থেকে ছাড়ে, সে দিন লাইনের দু’ধারে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত ছিল শেষ বিদায় জানাতে। ১৯৫৫-র পর এই রেলপথ ভারত সরকার অধিগ্রহণ করে এবং ইস্টার্ন রেলের শিয়ালদহ ডিভিশনের অন্তর্গত হয়ে যায় এই লাইট রেললাইন। ১৯৬২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রেলমন্ত্রী জগজীবন রাম এই নতুন রেললাইনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

মার্টিন রেলের হাওড়া-আমতা এবং হাওড়া-শিয়াখালা শাখার গভীর প্রভাব পড়েছিল তখনকার সামাজিক জীবনে। পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত হাওড়া-হুগলি-চব্বিশ পরগনার সামাজিক ইতিহাসে এই রেলের ভূমিকা বিরাট। এই রেললাইনের স্টেশনগুলোয় হাটবাজার, স্কুল, কলেজ, জনবসতি গড়ে ওঠে। কৃষিজাত পণ্য এবং গ্রামীণ কুটিরশিল্পে উৎপন্ন দ্রব্য খুব সহজেই মার্টিন ট্রেনের মাধ্যমে শহরের বাজারে চলে আসতে লাগল। মার্টিন রেলের দৌলতে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল বলেই আমতা-রামসদয় কলেজ এবং কদমতলায় হাওড়া নরসিংহ কলেজ তৈরি হয়, গ্রামাঞ্চলের বহু ছাত্র এখানে ভর্তির সুযোগ পায়। হাওড়া-হুগলির গ্রামগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ এই মার্টিন রেল ধরেই হাওড়া এবং কলকাতা শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত যাতায়াত করত। একটা সময়ে হাওড়া-আমতা শাখায় মোট ৭৫টি ট্রেন চলাচল করত। পাশাপাশি বাস রুটেও চলত বেশ কিছু গাড়ি, বাস, টেম্পো ইত্যাদি।

সামাজিক ইতিহাসের অন্যতম উপাদান যে লোকবাহিত গল্পগাছা, মার্টিন রেল নিয়ে সেই পরম্পরাও খুব একটা কম নেই। গ্রামের মেয়েরা নাকি রেললাইনে সিঁদুর মাখিয়ে দিয়ে ছড়া কাটত— “রেল রেল রেল তোমার পায়ে দিই দেল”। কেউ হয়তো আত্মহত্যা করার জন্য মার্টিন রেলের লাইনে শুয়ে রয়েছে। অত্যন্ত ধীরগতির ট্রেন বলে ড্রাইভার হয়তো কেবিন থেকে নেমে এসে লোকটিকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়িতে ফেরত পাঠালেন। কোনও চাষি হয়তো চলার পথে ড্রাইভারকে অনুরোধ করলেন গাড়ি থামাতে। পার্শ্ববর্তী কোনও পরিচিতের বাড়িতে তিনি রেখে এলেন তাঁর মাচার লাউ। পুকুরের মাছও গাড়ি দাঁড় করিয়ে তুলে দেওয়া হত গার্ডের কামরায়। গ্রামের পরিচিত কোনও মহিলা ট্রেনলাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ড্রাইভার সদয় হয়ে তাকে বললেন— “মাসি, হাঁটছ কেন? ট্রেনে উঠে পড়ো।” মহিলা জবাব দিল— “তুমি এগোও বাবা, আমার তাড়া আছে।” অর্থাৎ গোড়ার দিকে ট্রেনের গতি ছিল মানুষের পায়ে হাঁটার গতির চেয়েও শ্লথ। স্টেশনে ঢোকার আগে কিছু ক্ষণের জন্য পাদানিতে চড়া এবং স্টেশন ছেড়ে ট্রেনের গতি বাড়ানোর আগে গাড়ি থেকে নেমে পড়া অনেকের কাছেই ছিল এক মজাদার খেলা। বাংলা সাহিত্য, ছড়া, প্রবাদবাক্য, বাংলা-হিন্দি সিনেমায় মার্টিন রেলের উল্লেখ এবং অনুপ্রবেশ তাই সে দিন ছিল অবশ্যম্ভাবী। শিবরাম চক্রবর্তীর ‘হাওড়া-আমতা ট্রেন দুর্ঘটনা’ নামক উপন্যাস, কবি বিষ্ণু দে-র লেখা ‘ছড়ানো এই জীবন’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অভিযাত্রিক’-এ মার্টিন রেলের উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দি এবং বাংলা ছবিতেও এসেছে এই রেলের দৃশ্য। ১৯৬৬ সালে গুরু দত্তের ছবি ‘বাহারে ফির ভাই আয়েগি’-তে ধর্মেন্দ্র ও জনি ওয়াকারের অভিনয়ে এবং মহেন্দ্র কপূরের কণ্ঠে ‘বাদল যায়ে অগর মালি, চমন হোতা নহি মালি’ গানটি দৃশ্যায়িত হয়েছে। ১৯৭১ সালের সুপারহিট ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবিটিতে ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’ গানটি মার্টিন ট্রেনের সিকোয়েন্সে গাওয়া হয়, যদিও স্টুডিয়োতে দৃশ্যটি পুনর্নির্মিত হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে দীনেন গুপ্ত পরিচালিত রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘নতুন পাতা’ সিনেমায় নায়িকা এই মার্টিন রেলওয়ের অন্তর্গত পাঁতিহাল স্টেশনে স্টেশনমাস্টারের ঘরের ছাদে উঠে বাঁদর ধরার কসরত করেছিল। স্টেশনে ট্রেন এসে দাঁড়ানো, ট্রেন ছেড়ে চলে যাওয়া, স্টেশনে ট্রেনে চড়ে নব বরবধূ আসার দৃশ্য এখানে দেখানো হয়েছে। ১৯৬৪ সালে কিশোরকুমার পরিচালিত ‘দূর গগন কে ছাঁও মে’ ছবিতেও মার্টিন ট্রেনের দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। জনস্মৃতিতে রয়ে গেছে ট্রেনের হকার বা ফেরিওয়ালাদের কথাও। হকাররা এক কামরা থেকে অন্য কামরায়, এমনকি ছাদে-বসা যাত্রীদের কাছেও চা-ফুলুরি-বেগুনি পৌঁছে দিত। মাজুর ‘খৈচুর’, জগৎবল্লভপুরের পান, মাকড়দহের চা, ডোমজুড়ের তেলেভাজা, আমতার পান্তুয়া রীতিমতো আদরের ছিল যাত্রীদের কাছে। এ ছাড়াও এই অঞ্চলের তেভাগা আন্দোলন, মার্টিন রেল-কর্মচারী আন্দোলন, যাত্রী সমিতি, রেলকর্মচারীদের স্ট্রাইক ইত্যাদির স্মৃতিও সে কালের বহু মানুষের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল।

১৯৫৭-৫৮ থেকে সমস্যা শুরু হলেও ষাটের দশকের শেষে মার্টিন রেলের হাওড়া-আমতা এবং হাওড়া-শিয়াখালা শাখায় কোম্পানির আর্থিক অবনতি প্রকট হয়ে ওঠে। বাস ও মোটর পরিষেবার উন্নতির সঙ্গে তাল রাখতে না পেরে, ক্রমবর্ধমান শ্রমিক অসন্তোষ ও ধর্মঘটের চাপে মার্টিন রেল কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১ জানুয়ারি ১৯৭১ থেকে এই লাইনের সমস্ত রেল চলাচল বন্ধ করে দেন। ১৯৭২ সালে লোকসভার প্রাক্‌-নির্বাচনী জনসভায় এসে তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী এই লাইট রেলওয়ে পুনরায় চালু করার প্রতিশ্রুতি দেন। ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে এই মিটার গেজ রেলওয়ের বদলে ব্রড গেজ রেলওয়ে চালু হয়। দায়িত্ব নেন ভারতীয় রেল মন্ত্রক। মার্টিন রেলের বেশির ভাগ কর্মচারীদের রেল দফতরের বিভিন্ন বিভাগে চাকরি দেওয়া হয়। ক্রমে সমস্ত রেলপথটি ভারতীয় রেলের দক্ষিণ-পূর্ব শাখার অন্তর্ভুক্ত হয়। মার্টিন রেল আর নেই। কিন্তু আজও মানুষের স্মৃতিতে এর অস্তিত্ব অম্লান। (সমাপ্ত)

(www.theoffnews.com - Martin rail Rajendranath Mukherjee)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

ভারতীয় রেল সরকারের সহযোগিতা ছাড়াই প্রথম ব্যক্তিগত উদ্যোগ্যে যে ব্যক্তি প্রথম রেললাইন পাতার কাজ করতে চেয়েছিলেন তিনি হলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। ১৮৪২ সালে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর কলকাতা-  হাওড়া থেকে রানীগঞ্জ পর্যন্ত রেল চালাবার পরিকল্পনা করেন, কোম্পানির নাম গ্রেট ওয়েস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে। কিন্তু তাঁর অকাল মৃত্যুতে সেই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেয়। পরে এলো ভারতবর্ষের অন্যতম খ্যাতনামা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির নাম মার্টিন এন্ড কোম্পানী।

এই বৃহত্তর পাইকপাড়া বাসীরা যেটা জানতেন সেটা মার্টিন এন্ড কোম্পানী লিমিটেড, কিন্তু অনেকেই জানতেন না এর রূপকার ছিলেন বাঙালি শিল্পদ্যোগী স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। এই বৃহত্তর পাইকপাড়ার সাথে রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্ক ছিল গভীর।

পাইকপাড়ার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সেভেন ট্যাংকস এর জমি হস্তান্তরিত হয়ে যায় এই মুখোপাধ্যায় পরিবারের হাতে, স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভাইপো ডা: মতিলাল মুখোপাধ্যায় কেনেন ওই সম্পত্তি। যাইহোক একমাত্র নেটিভ হওয়ার কারণে তাঁর নাম বাদ যায়, মার্টিন কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯২ সালে।

কলকাতার যে রাস্তাটির নাম ছিল মিশন রোড, বর্তমানে তা আমাদের কাছে আর.এন.মুখার্জি রোড নামে পরিচিত। ডালহৌসি অঞ্চলের এই রাস্তাটা প্রায় সারাবছরই মুখর থাকে মানুষের ব্যস্ততায়, অথচ পথচলতি বেশিরভাগ মানুষই খোঁজ রাখেন না কে এই আর.এন. মুখার্জী? জিজ্ঞাসা করলে কেউ কেউ যেমন কিছুই বলতে পারেন না, আবার কেউ কেউ তেমন জানান, "উনি খুব নামকরা ব্যবসায়ী ছিলেন।" ব্যাস ওইটুকুই। বিদেশী অনেক ব্যবসায়ী যাকে নিজের আইডল মনে করেন, সেই মহান বাঙালি স্থপতি-ব্যবসায়ী স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে এর বেশি আর কিছুই বলতে পারেন না। এ বোধহয় একমাত্র আত্মমগ্ন, আত্মবিস্মৃত বাঙালির পক্ষেই সম্ভব। বাঙালি ব্যবসা করে না - এ যেমন বাঙালির এক বদনাম; তেমনি স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কিত এই বিস্মৃতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কোনও বঙ্গসন্তান ব্যবসা করে সফল হলেও তাঁকে মনে রাখার কোনওরকম চেষ্টা নেই এই জাতির। তাই ক্রমশই বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছেন এক কালের খ্যাতনামা এই বঙ্গতনয়।

অতীতের পাতা উল্টে খানিক পিছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখব, আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতার বুকে রমরমিয়ে চলছে ব্রিটিশ জমানা। এমন সময়েই একদিন কলকাতা কর্পোরেশনের তৎকালীন মুখ্য ইঞ্জিনিয়ার ব্রাডফোর্ড লেসসি সাহেব এক চূড়ান্ত ফাঁপড়ে পড়লে একরকম তাঁর রক্ষাকর্তা হিসাবেই আবির্ভাব ঘটে রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের। ভাষাগত সমস্যার জেরে মিস্ত্রিদের কাজ বোঝাতে লেসসি সাহেব যখন বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন, তখন রাজেন্দ্রনাথই তাঁর কাছ থেকে সব বুঝে নিয়ে দেশীয় মিস্ত্রিদের তা বুঝিয়ে দেন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন লেসসি। রাজেন্দ্রনাথের দিকে ছুঁড়ে দেন নতুন চ্যালেঞ্জ। কপর্দকশূন্য, অভিজ্ঞতাহীন যুবক রাজেন্দ্রনাথও সেদিন শুধুমাত্র মনের জোরেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। আর এই ঘটনাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের টার্নিং-পয়েন্ট।

১৮৫৪ সালের ২৩ জুন বসিরহাটের ভ্যাবলা গ্রামে রাজেন্দ্রনাথের জন্ম। মাত্র ছ'বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তাঁর বড়ো হয়ে ওঠা মায়ের কাছেই। নানা বিপর্যয়, অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে শৈশব কাটলেও, নিজের মেধার জোরেই তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। আসলে সে সময় শিবপুর বসিরহাটের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ক্লাস প্রেসিডেন্সির ক্যাম্পাসে চলত। দীর্ঘ তিন বছর পড়াশোনা করার পরও হঠাৎই স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে পরীক্ষায় বসা হয়নি তাঁর। তাই সেইসময় থেকেই গতানুগতিক চাকুরি-জীবনের স্বপ্ন না দেখে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার। এরপরই একদিন লেসসি সাহেবের সঙ্গে আলাপ এবং তারপরই পলতার জল প্রকল্পের হাত ধরে তাঁর ব্যবসায়ী জীবনে অভিষেক। এরপর একে একে তিনি লখনউ, এলাহাবাদ, আগ্রা, কানপুর জলপ্রকল্প তৈরি করেন এবং এই বঙ্গসন্তানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশময়। কিন্তু এত কিছুর মাঝেও শুধুমাত্র ‘নেটিভ’ হওয়ার দরুন তাঁকে বারবার হতে হয়েছে অবিচারের শিকার৷ ফলে এরপর যখনই স্যার টমাস অ্যাকুইনাস মার্টিনের সঙ্গে অংশীদারিত্বে ব্যবসা করার প্রস্তাব তাঁর কাছে আসে তখনই তিনি তা লুফে নেন৷ এরপর ১৮৯২ সালে মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি গড়ে উঠলে তাঁর ব্যবসার পরিধিও বেড়ে যায়। এদিকে ১৯০৬ সালে মার্টিন সাহেব মারা গেলে রাজেন্দ্রনাথই হয়ে ওঠেন ওই সংস্থার সিনিয়র পার্টনার। এই মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি একে একে কলকাতা সহ ভারতের নানা শহরে গড়ে তোলে নানা স্থাপত্য৷ এমনকি  কলকাতার অন্যতম আকর্ষণ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ, বেলুড়মঠ ও মন্দির, টিপু সুলতান মসজিদ, বিধানসভা ভবন ইত্যাদির নির্মাণেও রয়ে গিয়েছে স্যার রাজেন্দ্রনাথের সংস্থার অবদান। এদিক থেকে দেখলে কার্যত কলকাতার রূপকার বলা যায় তাঁকে।

সেই সময় ব্রিটিশ সরকার ভারতে রেলপথ চালু করে দেশের বড় বড় শহরকে যুক্ত করতে চেয়েছিল৷ কিন্তু সে যুগে বসেও রাজেন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন যে শুধু বড়ো বড়ো শহর নয়, দেশের মানুষের সার্বিক উন্নয়ন ঘটাতে শহরের সঙ্গে আশেপাশের গাঁ-গঞ্জকেও রেলপথে যুক্ত করতে হবে৷ তাই মূলত বেসরকারি উদ্যোগ হিসেবেই তিনি ‘মার্টিন লাইট রেলওয়ে’ নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন৷ যা পরিচিত ছিল ‘ন্যারোগেজ রেল’ বা ‘ছোটো রেল’ নামেই৷ গোটা দেশ জুড়েই এরকম বেশ কয়েকটি ছোট বেসরকারি রেল ব্যবস্থা চালু করে তিনি সাধারণ মানুষকে পরিষেবা দিতে শুরু করেন৷ সেগুলির মধ্যে হাওড়া-আমতা, বারাসত-বসিরহাট, বক্তিয়ারপুর-বিহার, আরা-সাসারাম, দিল্লি-সাহারানপুর ইত্যাদিও রয়েছে। অন্যদিকে পূর্ত বিভাগের বিভিন্ন বরাত পাওয়া কাজ করতে গিয়ে তিনি অনুভব করেন লৌহ ইস্পাত কারখানার প্রয়োজন সেইসময় ভারতে ঠিক কতটা! তাই তিনি ও তাঁর মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি ১৯১৮ সালে গড়ে তোলেন ইস্কো। যার বার্ণপুরের কারখানাটিই দেশের দ্বিতীয় ইস্পাত কারখানার মর্যাদা পায়। এর আগে ১৯০৭ সালে জামশেদপুরে দেশের প্রথম ইস্পাত কারখানাটি গড়ে ছিলেন টাটা গোষ্ঠী। আজও এই দু’টি কারখানাই ভারতের অন্যতম ইস্পাত উৎপাদনের উৎস। ১৯৩৬ সালে রাজেন্দ্রনাথের মৃত্যু হলেও তাঁর ছেলেরা, বিশেষত স্যার বীরেন মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে সম্প্রসারণ হওয়ায় ইস্কোর রমরমা অবস্থা দেখা গিয়েছিল। ফলে ছয়ের দশকের শেষ দিকেও বাঙালি নিয়ন্ত্রিত এই শিল্পগোষ্ঠী সম্পত্তির পরিমাণে সারা দেশের মধ্যে তৃতীয় স্থান দখল করেছিল। কিন্তু তারপর দ্রুত এই গোষ্ঠী তার পূর্ব গৌরব হারায়৷ হাত বদল হয়ে যায় এই গোষ্ঠীর হাতে থাকা একের পর এক সংস্থাগুলি এবং এই মুখোপাধ্যায় গোষ্ঠীর পতন ঘটতে থাকে।

শিল্প-বাণিজ্যের পাশাপাশি রাজেন্দ্রনাথের খেলাধূলার প্রতিও ছিল এক অমোঘ আকর্ষণ৷ এমনকি তিনি বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বেঙ্গল ফ্লাইং ক্লাব, মোহনবাগান ক্লাবের মতো সংগঠনের সভাপতির আসনও অলংকৃত করেছেন৷ ব্রিটিশ আমলেও তিনি বহু বিদেশী কমিটির সদস্য ছিলেন৷ কিন্তু এত কিছুর মাঝেও তাঁর কাছে ব্যবসাই সর্বক্ষণ অগ্রাধিকার পেয়েছে৷ তাই বারবার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও তিনি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় ইংরেজ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন৷ ১৯১০ সালে এডওয়ার্ড বেকার তাঁকে কৃষি ও শিল্প দফতর দিতে চাইলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি৷ একইরকম ভাবে আরও বছর দশেক বাদে চেমর্সফোর্ডের মন্ত্রীসভার শিল্প দফতরের দায়িত্ব নিতে বলায় তিনি সেই প্রস্তাবও এড়িয়ে গিয়েছিলেন৷ এই বিখ্যাত বাঙালি তাঁর জীবৎকালে নানান পুরস্কার, উপাধি দ্বারাও সম্মানিত হয়েছেন। এমনকি তাঁর ঝুলিতে রয়েছে নাইট উপাধিও। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে সাম্মানিক ডি.এসসি উপাধিও প্রদান করা হয়েছে। কলকাতার কারিগর এই মানুষটিকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে তাঁর একটি মুর্তিও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল প্রাঙ্গনে স্থাপিত রয়েছে। কিন্তু খুব দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি যে, বাঙালি সমাজ এই বিশ্বখ্যাত বঙ্গসন্তানকে মনে রাখেনি।

আসলে ব্যবসা বিষয়টিকে একেবারে প্রথম থেকেই বাঙালিরা 'নট আওয়ার কাপ অফ টি' বলে দাগিয়ে দিয়েছে। তাই তো স্বাধীনতার এত বছর পরেও অর্থনৈতিক দিক থেকে বাঙালি আজও মোটের ওপর কোণঠাসা৷ স্যার রাজেন্দ্রনাথের মতো মানুষকে বাঙালি তার আইডল তালিকায় রাখে না, সে দুর্ভাগ্য বাঙালিরই।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি বাংলায় রেলপথ প্রতিষ্ঠা এবং রেল-চলাচলের সূচনা সাধারণ মানুষের মনে বিশেষ আলোড়ন তুলেছিল। ১৮৫৪ সালের ১৫ আগস্ট, প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ২৪ মাইলের রেললাইন ব্যবহৃত হয়। এর পর প্রথমে হাওড়া থেকে পাণ্ডুয়া, পরে ১৮৫৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাওড়া থেকে রানিগঞ্জ পর্যন্ত নিয়মিত ট্রেন চালু হয়। প্রথমে পণ্য পরিবহণের জন্য চালু হলেও অচিরেই আরও বহু রেললাইন বসে এবং মানুষের যাতায়াতের অঙ্গ হয়ে ওঠে রেলগাড়ি। ‘সম্বাদ প্রভাকর’ কাগজে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর ‘শারদ্বর্ণন’ কবিতায় লিখলেন— ‘টাকা ছেড়ে থাবড়ায়/ পার হয়ে হাবড়ায়/ চালিয়েছে রেলওয়ে পথে। হুগলির যাত্রী যত/ যাত্রা করি জ্ঞান হত/ কলে চলে স্থলে জলে সুখ। বাড়ী নহে বড়ো দূর/ অবিলম্বে পায় পুর/ হয় দূর সমুদয় দুখ’। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Martin rail Rajendranath Mukherjee)

সুকন্যা পাল, ম্যানেজিং এডিটর, দ্য অফনিউজ, কলকাতা:

দুর্গাপুর ব্লাইন্ড রিলিফ সোসাইটি'র পরিচালিত "অন্ধত্ব দূরীকরণ এবং অন্ধত্ব প্রতিরোধ" বিষয়ক আন্দোলনে রবিবার সামিল হলেন দুই বিশিষ্ট সমাজকর্মী জয়ন্ত বিষয়ী ও অভীক রায়। যথাক্রমে উনারা দুর্গাপুর ও মালদহের বাসিন্দা।

প্রতিষ্ঠানের আউটডোর বিভাগের খাতে তাঁর স্বর্গীয়া মা কিশোরীবালাদেবীর স্মৃতি স্মরণে দুস্থ রোগীদের যাবতীয় চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করেন জয়ন্তবাবু। তিনি জানান, এই ব্যয়ভার প্রক্রিয়া ধারাবাহিক পর্যায়ে চালু থাকবে।

অন্যদিকে এদিন বেশকিছু সংখ্যক দুস্থ মানুষের চোখের ছানি অপারেশন করানো হয় ওই প্রতিষ্ঠানেই। এই অপারেশন প্রক্রিয়ার সামগ্রিক ব্যয়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন অভীকবাবু। তাঁর মতে, আমরা সমাজেই বসবাস করি। তাই সমাজের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা সবারই।

মূলতঃ এই প্রতিষ্ঠানটি 'অন্ধজনে দেহ আলো' এই স্লোগানকে সামনে রেখে পথ চলা শুরু করে। বর্তমানে দুর্গাপুর ও তার সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার দুস্থ মানুষের কাছে এক মানবিক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। মানুষের মৃত্যুর পর চক্ষুদানে উৎসাহ ও মৃতদেহ থেকে কর্ণিয়া সংগ্রহের কর্মকান্ডে এই সংস্থা আজ সারা রাজ্যের দৃষ্টান্ত। গরীব ও অসহায় মানুষের চক্ষু চিকিৎসার নানাবিধ ক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি সুখ্যাতি অর্জন করেছে বিভিন্ন মহলে।

(www.theoffnews.com - Durgapur Blind Relief Society)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

১৮২৯ সালের ১৩ আগস্ট তার এমডি উপাধিপ্রাপ্তির সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে প্রদত্ত ভোজসভায় গঠিত হয় জার্মান সেন্ট্রাল হোমিওপ্যাথিক ইউনিয়ন। ১৮৩১ সালে তিনি হোমিও মতে কলেরা রোগের চিকিৎসা নামক গ্রন্থ রচনা করেন। ১৮৩৩ সালে তিনি লিপজিগে একটি হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল স্থাপন করেন। একই বছরে অর্গাননের পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশ করেন। ১৮৩৪ সালে আমেরিকার সুপ্রসিদ্ধ চিকিৎসক হেরিং হোমিওপ্যাথির অসারত্ব প্রমাণ করতে এসে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি স্বদেশ গিয়ে হোমিওপ্যাথিক কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।

ভাষাবিদ, অনুবাদক ও লেখক হিসেবে হ্যানিম্যানের যথেষ্ট সুখ্যাতি ছিল। তার জানা ১১টি ভাষায় লেখা হিপোক্রেটিস থেকে শুরু করে পরবর্তী আড়াই হাজার বছরের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস পড়েন ও এর বিশ্লেষণ করেন। তিনি বিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃষিবিদ্যা, দর্শন ও সাধারণ সাহিত্যকর্ম বিষয়ে বিভিন্ন ভাষা থেকে জার্মান ভাষায় অসংখ্য বইপত্র অনুবাদ করেন। প্রতিটি অনুবাদেই তিনি প্রয়োজনীয় মন্তব্য ও ব্যাখ্যা দিতেন। তা অনেক সময় মূল লেখা থেকেও বেশি আকর্ষণীয় হতো।

তিনি প্রায় ১১৬টি বৃহৎ গ্রন্থ ও অসংখ্য ছোট প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে শুধু ২৩টি রসায়ন শাস্ত্রের। রসায়ন বিদ্যা ও ওষুধ প্রস্তুতকারক হিসেবেও তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। তিনি এ বিষয়ে অনেক মৌলিক প্রবন্ধ ও বই রচনা করেন। হ্যানিম্যানের এসব অবদানের জন্য প্রখ্যাত রসায়নবিদ প্রফেসর বার্জেনিয়ার্স তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। হ্যানিম্যান পরীক্ষার লক্ষ্যে নিজের দেহে ৯৯টি (গার্থবোরিক ও ডা. রিচার্ড হেলের মতে ১০০টি, ডা. জেমস ক্রস ও ডা. আর ই ডাজেনের মতে ৯০টি) ওষুধ প্রয়োগ করেছিলেন। কিন্তু এ নতুন ওষুধ প্রস্তুত ও প্রচলন এবং একজন চিকিৎসক হয়ে নিজের ওষুধ নিজে প্রস্তুত করায় লিপজিগ অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতারা হ্যানিম্যানের চরম বিরোধিতা করেন। এমনকি তাকে লিপজিগ থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন হ্যানিম্যান। অ্যালোপ্যাথিক গ্রন্থকার ডা. হিউজেস বেনোউ, লন্ডনের রয়াল মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. ইভান্স, ফিলাডেলফিয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. বেঞ্জামিনরাশ সহ অনেক বিশ্ববিখ্যাত অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকের উক্তিতে দেখা যায়, অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে আরোগ্যের কোনো মৌলিক নীতি নেই। অন্যদিকে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সার্জন এবং বায়োলজির গবেষক ডা. আগস্ট বায়ার হোমিওপ্যাথি অধ্যয়ন ও চর্চা করার পর লিখেছেন, হ্যানিম্যান আমাদের চেয়ে এক শতাব্দী এগিয়ে আছেন। 

ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক স্যার জন ওয়্যার বলেন, হোমিওপ্যাথিকে যাচাই করতে এসে হোমিওপ্যাথ হয়ে গেছি। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মরগ্যান বলেন, আরোগ্যের বিশ্বজনীন নিয়ম আবিষ্কার এবং ভেষজ বস্তুকে শক্তিকৃত করে ব্যবহার করার নিয়ম প্রবর্তনের অক্ষয় সম্মান ও খ্যাতি হ্যানিম্যানের প্রাপ্য। 

হ্যানিম্যান মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। কথিত আছে, তার চেম্বারে এত রোগী হতো যে, রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম পড়ে যেত। প্যারিসে আট বছর অবস্থানকালে তিনি চিকিৎসা সূত্রে চার লাখ ফ্রাঙ্ক আয় করেন। ১৮৪৩ সালের ২ জুলাই ভোর ৫ টায় প্যারিসে নিজ ঘরে আর্তজনের হ্যানিম্যান জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১১ জুলাই প্যারিসের মন্ট হ্যাচারি গোরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

হ্যানিম্যান পুরো জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন হোমিওপ্যাথির পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নের সাধনায়। চিকিৎসা জগতে দুর্যোগের ঘনঘটা তাকে আশঙ্কামুক্ত করতে পারেনি। তাই তিনি গবেষণার পাশাপাশি চিকিৎসক সমাজের দায়িত্বহীনতা, চিকিৎসার নামে অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন।

হ্যানিম্যান ছিলেন নীতিতে অটল এক মানুষ। শত বাধাও তাকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি সব চিকিৎসককে আদর্শ-নিয়মে বৈজ্ঞানিক ও নির্ভরযোগ্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতির অনুসারী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তিনি টনিক, মলম, ইনজেকশন এবং ওষুধের মূল আরক ও স্থূল মাত্রার ওষুধ প্রয়োগের চরম বিরোধিতা করেন। যারা এ ধরনের নীতিহীন চিকিৎসা করেন, তিনি তাদের উভয় লিঙ্গ, জারজ ইত্যাদি বলে মন্তব্য করেন। হ্যানিম্যানের আত্মোৎসর্গের সুফল তার জীবনকালেই পৃথিবীতে বৈপ্লবিক সাড়া জাগায়। তাই তো বিদায় বেলায় তিনি বলতে পেরেছিলেন ‘ইহজগতে আমি বৃথা জীবন ধারণ করি নাই। ’

ডা. হ্যানিম্যান দুবার বিয়ে করেন। জার্মানির গোয়েরনে থাকার সময় তিনি প্রায় ২৮ বছর বয়সে ১৯ বছরের জোহনা হেনরিয়েটি লিও পোলডিনি কুসলারকে ১৭৮২ সালের ১৭ নভেম্বর বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন হ্যানিম্যানের দুঃখ, দারিদ্র্য, নিপীড়িত ও যাযাবর জীবনের সুযোগ্য সহধর্মিণী। তার গর্ভে হ্যানিম্যানের দুই ছেলে ও নয় মেয়ের জন্ম হয়। তারা হলেন হেনরিয়েটি, ফ্রেডিক, ভিলহেলমিনি, এমিলি, ক্যারোলিনি, আনস্ট, ফ্রেডিকি, ইলিওনোরি, চার্লোটি ও লুইসি। ১৮৩০ সালের ১৩ মার্চ জোহনার মৃত্যু হয়।

১৮৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি জার্মানির কোথেনে অবস্থানের সময় হ্যানিম্যান প্রায় ৮০ বছর বয়সে মাদার মেরি মেলানি ডি হারভিলি নামে ৩২ বছর বয়সী এক ফরাসি মহিলার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি অত্যন্ত সুন্দরী, বিশিষ্ট চিত্রকর ও নামকরা কবি ছিলেন। হ্যানিম্যানের চরম সাফল্যের দিনগুলোতে তিনি সুযোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে যথেষ্ট অবদান রাখেন। শেষ জীবনে তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন। হ্যানিম্যানের চিকিৎসার কাজেও তিনি সহযোগিতা করতেন। মাদার মেলানি নিঃসন্তান ছিলেন; কিন্তু হ্যানিম্যানের মৃত্যুর কিছুদিন আগে হ্যানিম্যানের বিশেষ অনুরোধে সোফি বোরার নামে পাঁচ বছরের এক মেয়েকে মেলানি তার পালিতা মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেন। অপরদিকে, দ্বিতীয় বিয়ের প্রায় চার মাস পর হ্যানিম্যান তার সব সম্পত্তি কন্যা ও অন্যান্য উত্তরাধিকারীর নামে উইল করে দিয়ে যান।

হ্যানিম্যান মাত্র ২৪ বছর বয়সে এমডি ডিগ্রিধারী চিকিৎসক হিসেবে জার্মানির ম্যানস্ফিল্ড প্রদেশের হেটস্টেড শহরে প্রথম চিকিৎসা শুরু করেন। এখান থেকে তিনি দেশাই শহরে যান এবং রসায়ন শাস্ত্রে বিশেষ মনোনিবেশ করেন। পরে তিনি শ্রেষ্ঠ রসায়নবিদ রূপে খ্যাতি লাভ করেন। চিকিৎসা পেশায় আত্মনিয়োগের পর প্রচলিত পদ্ধতির ওপর তার সন্দেহ গাঢ় হতে থাকে। তিনি প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি পরিত্যাগ করে সাহিত্য ও রসায়ন শাস্ত্র আলোচনা করার মনস্থ করেন।

১৭৮৫ সালে হ্যানিম্যান ড্রেসডেনে আসেন। এখানে তিনি প্রায় এক বছর শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করেন ও চিকিৎসাবিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেন। ড্রেসডেনে থাকার সময় অ্যালোপ্যাথির প্রতি তার আরও বিরাগ জন্মে। এ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা ও মতামত বিভিন্ন প্রবন্ধে প্রকাশ করেন। যদিও হোমিওপ্যাথি নিয়ে বিতর্ক আজও চলছে। কারণ বিজ্ঞানীরা বলছেন এটা বিজ্ঞান সম্মত নয়। কিন্তু  বিজ্ঞান ও মানব শরীরের সমস্ত সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

তাই বিতর্ক চলুক এটা স্বাস্থ্য সম্মত, সত্য সামনে আসবে, প্রকট হবে। কিন্তু আমার লেখার উদ্দেশ্য বিজ্ঞান চর্চা নয়। এই সাধক মানুষটির জীবন কথা ও বোধকে সামনে নিয়ে আসা। (সমাপ্ত)

(www.theoffnews.com - Hahnemann homoeopathy)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

হোমিওপ্যাথির চিকিৎসার রীতির জনক ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেডিক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ওরফে ডা. হ্যানিম্যান বিশ্বব্যাপী হ্যানিম্যান নামে পরিচিত। এই মহাজ্ঞানী পণ্ডিতের জন্ম ১০ এপ্রিল ১৭৫৫। মৃত্যু ২ জুলাই ১৮৪৩। হ্যানিম্যান নিজেকে কখনও হোমিওপ্যাথি পদ্ধতির আবিষ্কারক দাবি করেননি। তবে এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে, হ্যানিম্যানই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সদৃশবিধানের ওপর ভিত্তি করে পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক এ চিকিৎসা পদ্ধতির প্রবর্তন করেছিলেন। প্রচলিত সব চিকিৎসা পদ্ধতি থেকে এর নীতি ও প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তাই তিনি নিঃসন্দেহে প্রচলিত হোমিওপ্যাথির জনক।

প্রায় চার শতাব্দী পূর্বের প্রটেস্টান্ট ধর্মের প্রবর্তক ও জার্মান দেশীয় ধর্মযাজক মার্টিন লুথারের মতন হ্যানিম্যানকে তৎকালীন গোঁড়া চিকিৎসকদের চিকিৎসা পদ্ধতির নানা প্রকার ভ্রম, কুসংস্কার ও মতবাদের বিরুদ্ধে একাকি দাঁড়াতে হয়েছিল। এজন্য তাকে অনেক লাঞ্ছনা, অনেক নিগ্রহ আর দুঃখ ভোগ করতে হয়েছিল। তথাপি তিনি অচল, অটলভাবে উচ্চকণ্ঠে ‘সদৃশ বিধান মন্ত্রের জয়’ ঘোষণা করে গিয়েছেন।

১৭৫৫ সালের ১০ এপ্রিল বর্তমান জার্মানির স্যাক্সনি প্রদেশের এল্ব নদী তীরবর্তী মিসেন নগরে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হ্যানিম্যান। তার বাবা ক্রিশ্চিয়ান গটফ্রয়েড হ্যানিম্যান জার্মানির মিসেনে মাটির তৈজসপত্র তৈরির কারখানায় চিনামাটির পাত্রে রঙ-তুলির কাজের দক্ষ শিল্পী ছিলেন।

শিশুকাল থেকেই হ্যানিম্যান অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। বিষয়টি টের পেয়ে পিতা ক্রিশ্চিয়ান পাঁচ বছর বয়স থেকেই প্রতিদিন হ্যানিম্যানকে নির্দিষ্ট সময়ে চিন্তা করার দীক্ষা দেন। সব নিজের স্বাধীন বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করার বিষয়ে হ্যানিম্যানকে শিশুকাল থেকেই গড়ে তোলেন তিনি।  কোনও কিছু যুক্তিগ্রাহ্য না হলে শুধু বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করো না। অভিজ্ঞতার আলোকে যা সত্য বলে প্রমাণিত হবে, কোনো অবস্থাতেই তা থেকে সরে এসো না। পিতার এ উপদেশকে অনুসরণ করেই হ্যানিম্যান যে কোনো বিষয়কে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ করার নীতি ও রীতি আয়ত্ব করেন।

তবে চরম দারিদ্র্য তার বিদ্যাচর্চার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। স্কুলজীবনে লেখাপড়ার জন্য রাতের বেলা প্রয়োজনীয় বাতির তেলের পয়সা জোগাড় করাও কষ্টকর ছিল তাদের পরিবারের পক্ষে। এ অবস্থায় হ্যানিম্যানের লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন তার বাবা। পরে স্কুলশিক্ষক রেক্টর এম মুলার অসাধারণ প্রতিভাবান হ্যানিম্যানকে বিনামূল্যে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেন। তার প্রখর মেধার কারণে শিক্ষক মুলার তাকে স্কুলের অন্যান্য ছাত্রকে গ্রিক ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার ভার দেন।

হ্যানিম্যান ১৭৬৭ সালের ২০ জুলাই মিসেনের টাউন স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে পাঠ চুকিয়ে বিদেশি ভাষা রপ্ত করতে ১৭৭৪ সালের ২০ নভেম্বর ভর্তি হন কাস্টেন এনডল্যান্ডের স্কুল সেন্ট আফ্রাতে। তিনি খুব অল্প সময়ে ১১টি ভাষায় (জার্মান, গ্রিক, লাতিন, ইংরেজি, হিব্রু, ইতালিয়ান, সিরিয়াক, আরবি, স্প্যানিশ, ফরাসি ও চ্যালডেইক) সুপণ্ডিত হন।  

তবে চিকিৎসাবিদ্যা ছিল হ্যানিম্যানের প্রিয় বিষয়। ১৭৭৫ সালে তিনি লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিদ্যা পড়ার জন্য ভর্তি হন। এরপর সেখান থেকে ১৭৭৭ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার লিওপোল্ডস্ট্যাট জেলার ব্রাদার্স অব মার্সি হাসপাতালে চিকিৎসাবিদ্যা শিখতে যান। সেখানে তিনি হিপোক্র্যাটিস, গ্যালন ও স্টোয়ার্কের লেখাগুলো সম্পর্কে বিশদ ধারণা পান। তিনি তার প্রখর ধীশক্তি, অসাধারণ অধ্যাবসায় ও চারিত্রিক সরলতার দ্বারা তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অধ্যাপক ও চিকিৎসক ডা. কোয়ারিনের প্রিয়তম শিষ্য হয়ে ওঠেন। হ্যানিম্যান তার কাছে হাতে-কলমে রোগী দেখার শিক্ষা পান।

এ হাসপাতালে ৯ মাস থাকার পর হঠাৎ ছাত্রাবাস থেকে হ্যানিম্যানের সব টাকা-পয়সা চুরি হয়ে যায়। এতে তার লেখাপড়ায় ছেদ পড়ে। তখন ডা. জে ফন কোয়ারিনের সহযোগিতায় তিনি ট্রানসিলভেনিয়ার গভর্নর ব্যারন এস ফন ব্রুকেনহলের সঙ্গে হার্মানেস্ট্যাটে চলে যান। এখানে তিনি গভর্নরের মুদ্রা ও চিত্রকর্মের সংগ্রহশালার তত্ত্বাবধায়ক হয়ে লাইব্রেরিতে ব্যাপক পড়াশোনার সুযোগ পান। ১৭৭৯ সালে তিনি এনলার্জেন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে তিনি হোফ্রাথ স্কোবারের কাছে এসে উদ্ভিদবিদ্যার পাঠ নেন। ১৭৭৯ সালের ১০ আগস্ট চিকিৎসাবিদ্যায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি এমডি উপাধি লাভ করেন। এই ডিগ্রি লাভের জন্য হ্যানিম্যান আপেক্ষিক রোগের কারণ ও ইহার চিকিৎসা বিষয়ে ২০ পৃষ্ঠার একটি ছাপানো গবেষণাপত্র পেশ করেছিলেন।

১০ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত প্রতিপত্তির সঙ্গে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে তিনি লক্ষ্য করলেন, তৎকালীন চিকিৎসা পদ্ধতি আন্দাজ, অনুমান, ব্যক্তিগত মতামত ও কিছু ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, চিকিৎসার পরও রোগের পুনরাক্রমণ বারবার উপলব্ধি করেন তিনি। এভাবে তিনি ধীরে ধীরে অ্যালোপ্যাথির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন। 

তিনি রসায়ন শাস্ত্র অনুশীলন এবং এসব বই অনুবাদ করে জীবিকা অর্জন করতেন। সে সময় চিকিৎসা পদ্ধতি দেখে হতাশ হয়ে বললেন, সব চিকিৎসা প্রথাই কাল্পনিক রোগ প্রতিকারের, প্রকৃত ওষুধ কোথায়? এমন দিনে হঠাৎ তার নিজের ঘরেই রোগের ভয়াল আক্রমণ শুরু হলে নিজের প্রাণাধিক প্রিয় শিশুদের রোগযন্ত্রণা তাকে নতুন এক চিকিৎসার পদ্ধতি আবিষ্কারের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এভাবে একদিন (১৭৯০ সালে) এডিনবার্গের বিখ্যাত অধ্যাপক, শ্রেষ্ঠ রসায়নবিদ ডা. উইলিয়াম কালেনের লেখা চিকিৎসা বিষয়ক বই জার্মান ভাষায় অনুবাদকালে হোমিওপ্যাথির মূল সূত্র আবিষ্কার করেন।

হ্যানিম্যান গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন, যে পদার্থ সুস্থ শরীর যন্ত্রকে বিকৃত করে যেসব যন্ত্রণাদায়ক কৃত্রিম লক্ষণ সৃষ্টি করে, সে পদার্থের সূক্ষ্মমাত্রা বা শক্তিকে ওষুধ হিসেবে প্রয়োগ করলে ওই লক্ষণাদি বিদূরিত করে শরীরযন্ত্রকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলতে পারে। এ পদ্ধতি অন্য চিকিৎসা পদ্ধতির মতো জল্পনা-কল্পনা কিংবা অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। টানা ছয় বছর এ পদ্ধতিতে তিনি নানা ওষুধ ও বহুবিধ তরল সেবন করে নিজ দেহের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালালেন। এ কাজে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন তার অনেক হিতৈষী।

এরপর তিনি প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির নীতিমালার বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, মানুষের ওষুধ একমাত্র মানবদেহেই পরীক্ষিত হতে পারে; ইঁদুর, বিড়াল, গিনিপিগ, ঘোড়া, বানর কিংবা কোনো প্রাণীর ওপর নয়।  তিনি তার এই বৈপ্লবিক চিকিৎসা পদ্ধতির নাম রাখলেন হোমিওপ্যাথি।

১৮১০ সালে প্রকাশ করেন অমর গ্রন্থ অর্গানন অব মেডিসিন। এ গ্রন্থের মাধ্যমে হ্যানিম্যান হোমিওপ্যাথি নামটি প্রকাশ করেন। অর্গাননের অর্থ হলো আরোগ্য সাধন। এ গ্রন্থে তিনি হোমিওপ্যাথির নীতিগুলোকে সূত্রবদ্ধ করেন। এতে রয়েছে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সম্পর্কিত ২৯১টি সূত্র। এটি এমন গ্রন্থ বিশেষ যার মাধ্যমে দার্শনিক তত্ত্ব, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আবিষ্কারের নীতিমালার নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে।

১৮১১ সালে হ্যানিম্যান বিখ্যাত গ্রন্থ মেটেরিয়া মেডিকা পিউরা প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন। এ গ্রন্থে তিনি সুস্থ মানবশরীরে পরীক্ষিত প্রতিটি ওষুধের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। ১৮১৭ সালে তিনি রেপাটারিয়াম নামক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এতে তিনি চিকিৎসা ক্ষেত্রে ওষুধের বাছাই ও বিশ্লেষণ সম্পর্কে আলোচনা করেন। ১৮১১-১৮২০ সাল পর্যন্ত তিনি লিপজিগে প্রকাশ্যভাবে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা চালিয়ে যান। বিভিন্ন ভাষায় বুৎপত্তির জন্য লিপজিগে তার সম্মান বর্ধিত হয়। কিন্তু পুনরায় অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকদের ষড়যন্ত্র রাজরোষে পতিত হন। ১৮১৯ সালে সর্বসাধারণ্যে প্রচারের জন্য মেডিকেল ইনস্টিটিউট নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। এরপর তিনি আনহ্যান্টিকিথেনে চলে যান। ১৮২১ সালে তিনি কিথেনের ইফারথ, অর্থাৎ কোটের কাউন্সিলর উপাধি পান। মূলত এ সময় থেকেই হোমিওপ্যাথিক জয়যাত্রা শুরু হয়।

বহু অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকের হোমিওপ্যাথির ওপর ভক্তি বাড়তে থাকে। তখন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত চিকিৎসক কোয়েন হোমিওপ্যাথির অসারত্ব প্রমাণ করতে এসে হ্যানিম্যানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং স্বদেশ ফিরে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শুরু করেন। ১৮২৮ সালে হ্যানিম্যান ক্রনিক ডিজিজেস নামক গ্রন্থটি চার খণ্ডে প্রকাশ করেন। এতে তিনি চিররোগের কারণ, তাদের স্বরূপ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ১৮২৯ সালে কেবল সংবাদপত্রে কলেরা রোগের লক্ষণগুলো পাঠ করে হোমিওপ্যাথিক মতে এর চিকিৎসা প্রচার করে সেই মতে বহুরোগী আরোগ্য লাভ করে। এতে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা আরও একবার প্রমাণ করেন হ্যানিম্যান। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Hahnemann homoeopathy)

দেবর্ষি মজুমদার, লেখক, বীরভূম:

সামাজিকতা বলতে আগে ছিল সমাজে সকলের সাথে মেশা। যেটা শুধুমাত্র এক পাড়ার মধ‍্যে সীমাবদ্ধ থাকত না। যাত্রা, নাটক, থিয়েটার, বিয়ে, পুজো পার্বণ, মচ্ছব এমনকি কেচ্ছা সব কিছুতেই আমার অবাধ সম‍্যক উপস্থিতি ও মতামত দেওয়ার অধিকার। এখন তো ফোনে কাউকে না পাওয়া গেলে, ফেসবুকে একটা ছোট্ট  স্টেটাস-- অমুক, তোকে ফোনে পাচ্ছি না... কাজ শেষ। ফাউ পেয়ে যাবেন চোখের জল, হাত তালি, রাগ, স্মাইলি, লাভ সব ধরণের ইমোজি!

এতে কোনো অসুবিধা নেই। ফেসবুকে অনেক সুবিধা। অসুবিধাও অনেক। যেহেতু পাড়া ছাড়িয়ে বন্ধুত্ব। আপনার পরিচিত বন্ধুদের তালিকা দেখে আপনার ব‍্যক্তিগত তথ‍্য হাতিয়ার করে বিব্রত করার যথেষ্ট সুযোগ। তাই ব‍্যক্তিগত তথ‍্য যত কম দেওয়া যায় তত মঙ্গল। শুধু কি তাই প্রাইভেসি বটন যতই থাক, নেট দুনিয়ায় আপনার করেসপণ্ডেস ডাটা চুরিতেও চোরের অসুবিধা নেই। তাই তো সহজেই আপনার কনটেন্ট যেমন পছন্দ না হলে বাদ দিতে পারেন জুকারবার্গ সাহেব। কারণ হিপোক্রিশি কোনযুগে ক্লিশেই হয় না!

একবার কনটেন্ট কর্তৃত্ব নিয়ে আটত্রিশ হাজার ফেসবুক ব‍্যবহারী একজোট হয়ে অভিযোগ করেন। দুহাজার নয় সালের সতেরো ফেব্রুয়ারি জুকারবার্গ সাহেব বাধ‍্য হন লিখতে যে ওই জায়গাটা পরিবর্তন করা হচ্ছে না। যদিও তারপরও পরিবর্তনের কাজ থেমে নেই। 

এসব লেখার উদ্দেশ্য যে পৃথিবীতে বাস করবো, আর সেই পৃথিবী নিয়ে কিছু ভাবনা থাকবে না, তা হতে পারে না। আর সেটা লেখার শুরুতে আমার নিজেকে মনে হচ্ছে আমি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ‍্যায়ের "তিন নম্বর বেঞ্চ" গল্প থেকে বেরোতে না পারা কারো অপেক্ষায় বসে থাকা সেই আহাম্মক ব‍্যক্তিটি, যিনি রাগতভাবে আমায় বলছেন,

"একজন অজ্ঞাত কুলশীলের রহস্যময় বার্তা পেয়ে লেকের ধারে শীতের রাতে সাড়ে নটায় দেখা করতে আসাটা কি অবিমৃশ‍্যকারিতা নয়? একজন গুণ্ডা, অপহরণকারী, ব্ল‍্যাকমেলার বা খুনিও তো হতে পারি।" স্ত্রী খুনের দায়ে এক বছর জেল খাটা ব‍্যক্তি (যদিও পরে বেকসুর খালাস প্রাপ্ত) বলছেন। আর আমি বোকা বোকা থ্রিল নিয়ে শুনছি। এটা বুঝতে গেলে চট করে গল্পটা পড়ে ফেলুন। আর পড়া থাকলে কোন অসুবিধা নেই। ফেসবুকে অনেক প্রপাজ্ঞাণ্ডিস্ট আছেন যাদের কাজ সুক্ষ ও সুচারুভাবে নিজের কাজ চালিয়ে যাওয়া। সেটি ধর্ম হতে পারে, রাজনীতি, ভোট রাজনীতি, ধর্ম রাজনীতি বা দেশ বিরোধীতা আবার কখনও স্ববিরোধীতা। যারা আপনার কমেন্ট স্টাডি করে আপনাকে মার্ক করে। আর আপনাকে টার্গেট করে সমমতাদর্শ মিলে দলগতভাবে রিপোর্ট মারে। আর ফেসবুক আকা কমিউনিটি স্টাণ্ডার্ড বলে একটি একপেশে অফিস খুলে রেখেছে। সেটা দেখলে শীর্ষেন্দুবাবুর সেই গল্পের আসামীর কথা মনে পড়ে-- সরকার মানে হচ্ছে একটি সিস্টেম। আর এই সিস্টেমটা যারা চালায় তাদের অধিকাংশ হলো যন্ত্রাংশের মতো। সিস্টেমটা যা বলায় এবং করায়, তারাও তাই বলে এবং করে। 

হেট স্পিচ কলামে নির্দিষ্ট করে বলা আছে সমকামিতা, জাতি বিদ্বেষ বা ইসলামফোবিয়া নিয়ে কিছু বলা যাবে না। কিন্তু হিন্দু ফোবিয়া নিয়ে বলা যাবে না, এমন কথা বলা নেই। অথচ অসহিষ্ণুতা নিয়ে বলা যাবে। তাই বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের অসহিষ্ণুতা প্রসঙ্গে হিন্দু সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে "সুনাম নেই, সুনাম গঞ্জে" শিরোনামে একটি কবিতা লিখি। পোস্ট করি সাহিত্য প্রবাহ নামে একটি সাহিত্য গ্রুপে। ব‍্যস! অভিযোগ হয়। ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট‍্যাণ্ডার্ড আমার একাউন্ট রেসট্রিক্ট করে আমাকে মেসেজ করে। এটা নাকি হেট স্পিচ। কবিতাটি ফেসবুক থেকে সরিয়ে নেয়। অথচ যখন ভারতে তাবরেজ আনসারি খুন নিয়ে সোচ্চার হয়ে কবিতা লিখি কোন অসুবিধা হয়নি। একটি ঘটনার উল্লেখ করি, বাংলাদেশে এক হুজুরকে পুলিশ গ্রেফতার করার প্রসঙ্গে বাংলাদেশের একজন কবি শ্রীকৃষ্ণের উপস্থাপন করতে গিয়ে কাঁচা খিস্তি দিয়ে যা বললেন, তা এখানে উল্লেখ করা উচিৎ হবে না। আমি ফেসবুক কমিউনিটি স্ট‍্যাণ্ডার্ড নিয়ম অনুযায়ী যথা স্থানে অভিযোগ করলাম। উত্তর পেলাম -- অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে। উক্তিটি ফেসবুক কমিউনিটি স্ট‍্যাণ্ডার্ড বিরোধী নয়। অর্থাৎ হিন্দু ফোবিয়ায় কোন বাধা নেই! আমি সেই কবিকে অবশ্যই উত্তর দিয়েছিলাম। কারণ আমি একজন সাধারণ বুদ্ধিহীন (বুদ্ধিজীবী নই) সেক‍্যুলার তকমার প্রত‍্যাশী নই। তবে যেকোন গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে।

তবে বাঙালি অবিমৃশ‍্যকারী হিসেবে আমি আরেকটি অপরাধ  করে বসলাম একইভাবে। অন্তত ফেবু কর্তারা তাই মনে করলেন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ‍্যাপক হিন্দু দেবদেবী নিয়ে কু-মন্তব‍্য করেন। বাংলাদেশের হিন্দু ঐক‍্যজোট মামলা করলে আইনী বেকায়দায় ক্ষমা চান ওই অধ‍্যাপক। ক্ষমাও পেয়ে যাবেন। কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মের উপর আক্রমণের উপর প্রতিবাদ করায় নির্মমতার শিকার অনেকেই। তাদের কোন উপায় নেই! জেলে পঁচে মরা ছাড়া। সেটা  বলতে গেলেই একাউন্ট রেসট্রিক্টেড হবে। তাই সিস্টেমে চলা ফেসবুক, অমানবিক সামাজিক মাধ্যম ছাড়া কিছুই নয়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ‍্যায়ের  "তিন নং বেঞ্চ"  ছোট গল্পের সেই অভাজনের একটি ফ্রী জ্ঞান আপনাদের সাথে শেয়ার করে লেখার ইতি টানতে চাই-- এখানে "সময় মতো পরিস্থিতি বুঝে ভয় পাওয়াটাও বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণের  লক্ষণ।"

(www.theoffnews.com - facebook)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

যেটার আশঙ্কা ছিল সেটাই হয়েছে। পেগাসাস নামের একটা জুজু বাজারে ছড়িয়ে দিয়ে পেট্রোপন্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সব প্রতিবাদের মিছিলকেই এখন ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আসলে পেট্রোপন্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কোনও রাজনৈতিক দলই প্রকৃত বিদ্রোহ করতে চায় না। কারন ক্ষমতায় এলে সব রাজনৈতিক দলেরই আয় বৃদ্ধির বড় উপায় হল পেট্রো পন্য। এর জলজ্যান্ত উদাহরণ বিজেপি, যারা বিরোধী থাকাকালীন ইউপিএ আমলে পেট্রোপন্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যপক হইচই করেছিল আজ তারাই ক্ষমতায় এসে জ্বালানি তেল বা গ্যাসের দাম কোথায় তুলে দিয়েছে তা সকলেরই জানা। অন্যদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা একই রকমের। তাই জনগনের মন রাখতে পেট্রোল ডিজেল বা গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য প্রতিবাদ করলেও মন থেকে কোনও রাজনৈতিক দলই পেট্রোপন্যের জন্য আন্দোলনে উৎসাহী নয়। 

লুকিয়ে অন্যের কথা শোনা অপরাধ। অন্যের ফোনে আড়ি পাতা সুস্থ গণতন্ত্রের বিপক্ষে। কিন্তু পেগাসাস ব্যাপারটাই একটু ধোঁয়াশায় মোড়া। শোনা গিয়েছে ফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে, এখনও ঠিক বিষয়টা কারও জানা নেই। তবু শুরু হয়ে গিয়েছে আন্দোলন। এ ব্যাপারে রহস্য বাড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্রও, তারাও কিছুতেই ব্যাপারটা খোলসা করছে না। আদৌ পেগাসাসের ব্যাপারটা সত্যি কিনা, কেন্দ্রের এই ব্যাপারে সত্যিই কোনও দায় বা ভূমিকা আছে কিনা, কিছুই স্পষ্ট করে বলছে না কেন্দ্র সরকার। এতেই রহস্য বেড়েছে। কারও কারও মতে কেন্দ্র ইচ্ছে করেই বিষয়টা নিয়ে খেলছে। কারণ পেগাসাস নিয়ে বিরোধীদের এই আন্দোলন, প্রতিবাদ কেন্দ্রের অন্য বহু জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে তলায় ফেলে উঠে এসেছে এক নম্বরে। এই আন্দোলন নিয়ে কেন্দ্রের খুব একটা ভয় নেই, কারণ তারা জানে সাধারণ মানুষের কাছে পেগাসাস খুব একটা নিত্য প্রয়োজনীয় ইস্যু নয়। খেটে খাওয়া আম জনতা ব্যাপারটা ভাল করে বোঝেই না। বরং পেট্রোপন্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অনেক বেশি প্রভাব পড়বে সাধারণের মনে। তাই কেন্দ্রও চায় পেগাসাসের পিছনে পড়েই সময় এবং জনসমর্থন নষ্ট করুক বিরোধীরা। 

একটু খেয়াল করে দেখুন সামনে বছর দেড়েকের মধ্যে কোনও বড়সড় ভোট নেই। কেন্দ্রের বিজেপিও তাই নিশ্চিন্ত, বেপরোয়া। তাই তো এখনও থেমে নেই পেট্রোপন্যের দাম। পেট্রোলের দাম ১০০ ছাড়িয়েছে কবেই। এখন তা ১০২ টাকা পার করে ছুটছে। আরও কত দূর, কোথায় গিয়ে থামবে এই দৌড় কেউ জানে না। কেন্দ্র ভুলেও বলেনি তারা পেট্রোপন্যের দাম কমানোর ব্যাপারে ভাবছে। বাজারে সব জিনিসের দাম আগুন। কোভিড পরিস্থিতিতে বহু মানুষের খাওয়া জুটছে না। এই সময়ে ধীরে ধীরে পেট্রোপন্যের মূল্যবৃদ্ধিতে আন্দোলন শুরু করেছিল বিভিন্ন বিরোধীদলগুলি। সাধারণ মানুষের পূর্ণ সমর্থনও ছিল সেই আন্দোলনে। কেন্দ্র বুঝতে পারছিল জনরোষ বাড়ছে, সুযোগ নিচ্ছে বিরোধীরা। সেই মুহূর্তেই বাজারে এসে পড়ল পেগাসাস। ব্যস… বিরোধীরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, নিশ্চিন্ত হল কেন্দ্রও। সব আন্দোলন এখন পেগাসাসকে ঘিরে, আগ্রাসী পেট্রোপন্য চাপা পড়ে গিয়েছে ফোনে আড়ি পাতার চক্রান্তের নিচে। 

এটাই তো চেয়েছিল কেন্দ্র। পেগাসাস ইস্যুতে শেষমেশ কি হতে পারে? প্রথমত কেন্দ্র তো স্বীকারই করবে না, প্রমাণ হলেও বড় জোড় একটু ক্ষমা চেয়েই ঝামেলা মুক্ত হয়ে যাবে। ভাবমুর্তিতে সামান্য কালি পড়লেও আর্থিক বা অন্যান্য ক্ষতি খুব একটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু পেট্রোপন্য সোনার ডিম দেওয়া হাঁস। তাকে কেটে খাওয়ার ভুল কেন্দ্রের অতি ব্যবসায়ী সরকার করবে বলে ভুলেও ভাবা ঠিক হবে না। তাই পেগাসাস নিয়ে চলতে থাকুক গন্ডগোল, অচল হোক সংসদ। এই সুযোগে বাড়তে থাকুক তরল সোনার দাম। ভরতে থাকুক কেন্দ্রের ভাণ্ডার। কেন্দ্রের বিজেপি একটা কথা ভাল মতই বুঝে গিয়েছে দেশে তাদের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মত কোনও বড় জাতীয় দল এখন নেই, কিছু আঞ্চলিক দল আছে বটে, কিন্তু নানান স্থানীয় ইস্যুতে তারাও ছন্নছাড়া। তাই দেশে ঠিকঠাক বিরোধী দল এবং সামনে কোনও নির্বাচন না থাকার পরিপূর্ণ সুযোগ তারা নিচ্ছে। এলোমেলো বিরোধী দলগুলি এক হওয়ার চেষ্টা করলেও এক সঙ্গে এক ইস্যুতে বিরোধীতার মত অস্ত্র এখনও শানাতে সক্ষম হয়নি। এই তো চাই… বেনিয়া সরকার এটারই সুযোগ নিচ্ছে চেটেপুটে। তিলোত্তমা যেমন ছলাকলায় অসুরদের ভুলিয়ে দেবতাদের অমৃতপানের সুযোগ করে দিয়েছিলেন, তেমনই কেন্দ্র বিরোধীদের পেগাসাস দেখিয়ে, তাই নিয়ে ব্যস্ত রেখে পেট্রোপন্যের আরও দাম বাড়িয়ে রাজকোষাগার ভরে চলেছে নিরন্তর, নিরুপদ্রবে, নিরুদ্বেগে।

(www.theoffnews.com - petroleum Pegasus Central Government opposition)

দেবর্ষি মজুমদার, লেখক, বীরভূম:

যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির বিশ্ববিখ‍্যাত পেরোটিস আর্ট গ‍্যালারিতে প্রদর্শিত একটি ছবিতে পাকা কদলী চিপকে দিয়েছেন ইটালির শিল্পী মরিজিও কেটলান। তার মূল্য এক লক্ষ কুড়ি হাজার ডলার। তিন জন ক্রেতা মিলে ওই শিল্পকর্মটি ক্রয় করেন। কিন্তু ভাবতে পারেননি, কেউ কলাটি কেউ খেয়ে ফেলতে পারে! মিস ডাটুনা খপাৎ করে কলাটি টেনে খুলে খেয়ে সেলফি তুলে ইন্সট্রাগ্রামে পোস্ট করেন। আর্ট গ‍্যালারীর পরিচালক এর জন্য কোনো আইনী ব‍্যবস্থা নেননি। শুধু বলেন, কলাটি তো শিল্পীর ধারণা মাত্র। শিল্প কর্ম ঠিকই আছে। 

এই ধারণা আসলে শিল্পীর খেয়াল। আর সেই খেয়ালেই তো শিল্পী অবন, রবি ঠাকুর ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায় আসর জমাতেন। আর তার নির্মিতি ছিল জিলিপি অমৃতি। সেই খেয়ালেই অবন বলেন, “ধীরে ধীরে পথ ধরো মুসাফির, সীড়ী হৈ অধবনী!”—দুর্গম সোপান, হে যাত্রী, ধীরে পা রাখ।এ পা রাখতে গেলে পার্থিব জ্বালানি নয়, মনের জ্বালানির দরকার পড়ে।

জ্বালানির অগ্নিমূল‍্যে যখন গণপরিবহন বেসামাল, ঠিক তখনই গরীবের ঘোড়া রোগ পাঁড়ুইয়ের এক শিল্পীর। শিল্পী উদয় দাস তাঁর মা লক্ষ্মীর নামে নিজেই বানিয়ে ফেললেন "লক্ষ্মী ট্র‍্যাভেলস" বাস। শুরুতে এমন মন্তব্য গ্রামের অনেকেই করেছিলেন। অবশ‍্য যতক্ষণ না কোন রূপকথার কাহিনীর মত তার বাস সজীব হয়ে জ্বালানির তেল দাবী করছে! ততক্ষণ নো চিন্তা বাস মালিকের! এটাই যা আশার কথা!

বাসের রুট বোলপুর শান্তিনিকেতন বাইপাশ রোড। রাজ‍্য সরকারের নিয়মে করোনা বিধি মেনে পঞ্চাশ শতাংশ যাত্রী নিয়ে দূরত্ববিধি মেনে চলতে হবে বাস। বোলপুর শান্তিনিকেতন ছেড়ে কসবা পাঁড়ুই হয়ে সিউড়ী যাবে বাস। রিজার্ভ করা যাবে। কন্টাক্ট নাম্বার দেওয়া আছে বাসের গায়ে।

বাস তো হলো, কিন্তু তেলের যা দাম! তবুও এই  খেয়াল! শিল্পী মাত্রেই খেয়ালী, আর শিল্প মানেই খামখেয়ালের ফসল। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে পাঁড়ুই পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ধানাইগ্রামে যেতে হবে। পাঁড়ুই থেকে মাত্র এক কিমি হাঁটা পথ।

ব‍্যাঙ্ক থেকে আশি হাজার টাকা লোন নিয়ে একা হাতে নিখুঁত বাসের আদলে তৈরী করে ফেলেন এক আস্ত বাসা। দূর থেকে সাধারণ মানুষের মনে হবে বাস দাঁড়িয়ে আছে প‍্যাসেঞ্জার নেওয়ার জন‍্য।  পাক্কা এক বছর লাগে। তাঁকে সাহায্য করেছেন স্ত্রী আর বড় ছেলে। দুএকজন শ্রমিক ছাড়া পুরো কাজটা নিজে একা হাতে করেছেন। এমনিতে মৃৎ শিল্পী। পুরন্দরপুরে পঁয়তাল্লিশ ফুট কালি মুর্তি তিনি তৈরী করেন। পড়াশোনা করা হয়নি। তাই বিশ্বভারতীর কলাভবনে পড়ার সাধ তাঁর মেটেনি। কৃষিমেলায় তাঁর শিল্প সকলের নজর কাড়ে। পুরস্কারও পান। তবে অভাব তাঁর নিত‍্যসঙ্গী। শিল্পী ভাতা পাননি। পাননি অন‍্যান‍্য সাহায্য। 

প্রথম যখন বাসা বানাতে গিয়ে বাস বানাচ্ছিলেন, অনেকেই ভাবছিলেন একি ছেলেখেলা! আজ সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে বাস খুঁজতে সবাই চলে আসছেন, রসিকতা করে বলছেন, বাসে চড়তে এলাম। দাদা, বাস কখন ছাড়বে? সবার  তারিফ শুনে উদয় দাস বলেন, সবাইকে আনন্দ দিতে পারছি এতেই  আনন্দ। এখনো গৃহপ্রবেশ হয়নি। তবে বাইরে ওয়েদার কোট পেন্টিং, জানালার কাঁচ লাগানো সম্পূর্ণ। দূরদূরান্তের লোকের কাছে এখন পরিচিত শিল্পীর গ্রাম ধানাইগ্রাম। বাসের আদলে বাসা দেখতে ভিড় জমছে মানুষের। এখন পোড়ো ভগ্নপ্রায় বাড়িতে বড় ছেলের পরিবার, ছোট ছেলে, স্ত্রী ও অসুস্থ মা বাবাকে নিয়ে মাত্র দুটি রুমে  থাকেন উদয় দাস। দুই ছেলে ও এক মেয়ে। এক ছেলে ও মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। 

বাস বাড়ি। অথচ বাস বলে ভুল হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে। বাসের রঙ, বাসের জানালা, বাসের ঘেরা ছাদ, বাসের মুখ, হেড লাইট, বাসের চাকা এত নিখুঁত যা একমাএ কোন শিল্পীর পক্ষে এমনভাবে প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব। চাকায় নাটবোল্ট পর্যন্ত আসল মনে হবে। শিল্পীর কথায়, ঢালাই দিয়ে চাকা তৈরী হয়। তারপর ছোট কুর্ণি দিয়ে সিমেন্টের মশলা ধরিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় বাসের চাকা।  শুধু তাই নয় বাসের গায়ে যেসব লেখা থাকে তাও হুবহু লেখা রয়েছে। বাসের ভেতরে ঢুকলে একটি রান্নাঘর ও একটি বেডরুম আছে। কিন্তু  রান্না ঘর পুরো বাসের কেবিন। কেবিনের দেওয়ালে শিবের মুর্তি। বাসা মনে হবে না। মনে হবে যেন বাসেই আছি। গন্তব্যস্থল চলে এলো না তো?

খালাসী যেন হাঁক মারছে-- পাঁড়ুই, কসবা, সিড়ড়ী...

কিন্তু শিল্পীর খেয়াল জমাটিয়া আসর। সেখানে অভাব নয়, নিয়ম নয়, খেয়ালটাই আসল! বাসা আর বাসের প্রভেদ থেকে একটু দূরে!

(www theoffnews.com - bus house Birbhum)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতায় এসে বুঝে ছিল বাংলার এই বাবু সমাজকে অনুগত করে রাখতে পারলে তাদের শাসন করতে সুবিধা হবে তাই ব্রিটিশরা বাবু কালচারকে উৎসাহ দেয়। তাদের প্রভাব ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করে| আরো নতুন নতুন উপাধি তৈরী হয় যেমন রাজা, রায়, রায় চৌধুরী, রায় বাহাদুর  ইত্যাদি|

ব্রিটিশ আমলে এক নতুন অভিজাত শ্রেণীর তৈরী হলো। শিক্ষা ও বংশ পরিচয়কে ছাপিয়ে গেলো অর্থ| কেউ বা ব্যবসা করে কেউ আবার রাজ কর্মচারী হয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে রাতারাতি হয়ে গেলো বাবু। কলকাতার বাবু কালচারের তখন স্বর্ণ যুগ বলা যায়। বাবুয়ানা ও সৌখিনতা প্রায় সমার্থক শব্দ| এর কারণ বাবু হওয়ার প্রধান শর্ত ছিলো ওই সৌখিনতা। শুধু অর্থ উপার্জন নয় অর্থ ব্যয়ের প্রতিযোগিতা এ নামতে হবে| তবেই বাবু উপাধি স্বার্থক হবে এই ছিলো মানসিকতা। ব্রিটিশরা চেয়েছিল সম্পদশালী এক চাটুকার এর দল তৈরী করতে। তাই হয়েছিল। দামি গাড়ি, লক্ষ টাকার বাইজি, বিশাল বিশাল বাড়ি, পায়রা ওড়ানো, রক্ষিতাকে নিয়ে গান বাজনা করে আর মদ খেয়ে রাতের পর রাত কাটানো ছিল এই ধনী বাবু সমাজের প্রতিদিন এর জীবন।

কালী প্রসন্ন সিংহের লেখা থেকে আমরা জানতে পারি সেকালের বাবুদের স্ত্রীরা কোনো রাতেই তাদের স্বামীদের মুখ দেখতো না| কারন বাবুদের প্রতিটা রাত কাটতো বাইজি বা রক্ষিতার সাথে নাচ মহলে। বঙ্কিম চন্দ্র তার বাবু নামক রম্য রচনায় লিখে ছিলেন যিনি দূর্গা উৎসব এর উদ্দেশ্য দূর্গা পুজা করবেন, গৃহিণীর অনুরোধে লক্ষী পুজো করবেন, উপপত্নীর অনুরোধে স্বরূস্বতী পুজো করবেন এবং মাংস খাওয়ার লোভে পাঠা বলী দেবেন তিনিই বাবু|

শিক্ষাবিদ, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক শিবনাথ শাস্ত্রী ‘বাবু’দের সম্পর্কে  লিখেছেন, ”বাবু মহাশয়েরা দিনে ঘুমাইয়া, ঘুড়ি উড়াইয়া, বুলবুলির লড়াই দেখিয়া, সেতার, এসরাজ, বীণা প্রভৃতি বাজাইয়া, কবি, ফুল আখড়াই, হাফ আখড়াই,পাঁচালী প্রভৃতি শুনিয়া রাত্রি কালে বারাঙ্গানাদিগের গৃহে গৃহে গীত বাদ্য ও আমোদ প্রমোদ করিয়া কাল কাটাইত এবং খড়দহের ও ঘোষপাড়ার মেলা এবং মাহেশর স্নান যাত্রা প্রভৃতির সময়ে কলিকাতা হইতে বারাঙ্গানাদিগকে সঙ্গে লইয়া দলে দলে নৌকা যোগে আমোদ করিতে যাইতেন।”

কলকাতার বিখ্যাত আট বাবু ছিলেন।

নীলমনি হালদার।

রামতানু দত্ত।

গোকুলচন্দ্র মিত্র।

রাজা রাজকৃষ্ণ।

কালীপ্রসন্ন সিংহের পূর্বপুরুষ ছাতু সিংহ।

দর্পনারায়ণ ঠাকুর।

রাজা সুখময় রায়।

এবং চোরাবাগান মিত্র বংশের এক বাবু। এরা ছিলেন প্রধান, তাছাড়া আরো অনেক বাবু গজিয়ে উঠেছিল রাতারাতি। জোড়া সাঁকো ঠাকুর বাড়ির সদস্যরাও বাবুয়ানাতে খুব একটা পিছিয়ে ছিল না | দ্বারকানাথ ঠাকুর তার বিলাসিতা ও সৌখিনতার জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিত ছিলেন।কিছু প্রতিভা সম্পন্ন, ব্যতিক্রমী চরিত্রের  বাবুও ছিল সে সময়। যেমন আশুতোষ ও প্রমথনাথ। এঁরা যথাক্রমে সাতু (ছাতু) বাবু ও  লাটু বাবু  নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। আশুতোষ বাবু ছিলেন তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ  সেতারিদের মধ্যে অন্যতম। লাটু বাবু  যেমন ছিলেন দানশীল, তেমন  ছিলেন বিলাসী। এই ছাতু বাবুর নামেই কিন্তু ছাতু বাবুর বাজার।

বাবুদের বিলাসিতা বা সৌখিনতা কখনো কখনো হাস্যকর পর্যায় পৌঁছাতো| কেউ কুকুরের বিয়েতে হাজার হাজার টাকা খরচ করছে তো কেউ পোষা বেড়ালের বিয়েতে দশটা গ্রামের লোক নিমন্ত্রণ করে খাওয়াচ্ছে। কেউ পায়রার পেছনে লক্ষ টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে। সোনা যায় কিছু ধনী বাবু জুতোর ডগায় হিরে বসিয়ে রাখতেন| ভাবা যায়!

শোনা যায় রাজা কৃষ্ণ চন্দ্র তার পোষা বাঁদরের বিয়েতে এক লক্ষের বেশি টাকা খরচ করে তাক লাগিয়ে দিয়ে ছিলেন| বানরের মাথায় ছিলো হিরে মুক্ত খচিত মুকুট। সঙ্গে বিলাস বহুল পালকি ও শোভাযাত্রা। রাজা ইন্দ্র নারায়ণ রায় তার বিড়ালের বিয়েতে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন বলে শোনা যায়| নিমাই চাঁদ মল্লিক এর নাতি রাম রতন মল্লিক এর বিয়েতে চিৎ পুরের দুমাইল রাস্তা ভেজানো হয়েছিলো খাঁটি গোলাপ জল দিয়ে। ঘোড়া গাড়িতে বাবুরা হাজার হাজার টাকা উড়িয়ে দিতো| কত রকম বাহারের গাড়ি ছিল সেকালে, ফিটন, বগি, বৃতস কাস, পালকিও হতো মহা মূল্যবান, সৌখিন, জমকালো| পরে মোটর গাড়ি উঠলে বাবুরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে তা আনাতে শুরু করে|

মদ ছাড়াও বাবুরা সাহেবদের থেকে আরেকটা জিনিস শিখে ছিলেন তা হলো নাট্য চর্চা। আশুতোষ দেব বা ছাতু বাবু, শোভাবাজার রাজ বাড়ির বাবুরা এবং ঠাকুর বাড়ির বাবুরা নাটকে অর্থাৎ ব্যয় করলেন। এই ভাবে বাংলা থিয়েটারের ভিত্তি স্থাপন হলো। পরে গিরিশ ঘোষ এর হাত ধরে তা আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল| শুধু নাটক কেন, বাংলা গান, যাত্রা এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্র বাবুদের অর্থ সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব ছিল না| সেদিক দিয়ে বাংলা শিল্প ও সংস্কৃতি জগৎ শুধু বাবুদের কাছে নয়, বাইজিদের কাছেও অনেকটা ঋণী। (সমাপ্ত)

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)

(www.theoffnews.com - Russia Alexie Navalny website)
 

দেবিকা ভট্টাচার্য, লেখিকা ও লেকচারার, চন্দননগর, হুগলি:

পূর্ব বর্ধমান জেলার অন্তর্গত অম্বিকা কালনা শহর ভাগীরথীর কোলে অবস্থিত এবং  শ্রীচৈতন্যদেবের পদধূলিধন্যা। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুণীজনের পদধূলি শহরটির মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। প্রত্যেক জায়গারই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থেকে থাকে। কোনো জায়গার কোনো উৎসব, পরব, ঝাপান বা পুজো উপলক্ষে মেলা সেই জায়গায় বহু মানুষকে কাছে টানে, আপন করে নেয়। তেমনই কালনা শহরকে আনন্দে ভরিয়ে দেয় এখানকার সরস্বতী পুজোর আড়ম্বর। সেই সময় তো তবু স্কুলে, ক্লাবে এবং ঘরে ঘরে পুজো হয় কিন্তু যে  একটি মাত্র পুজো উপলক্ষ করে শুধু কালনাবাসী নয়, আশেপাশের ছোটো বড়ো গ্রাম মেতে ওঠে তা হলো শ্রাবণ মাসে শুক্লপক্ষের সপ্তমী বা পূর্ণিমা তিথিতে মা মহিষমর্দিনীর পুজো। কিন্তু এই পুজোর প্রচলন কবে তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। তবে প্রামাণ্য কিছু তথ্য থেকে বাংলা ১২৭০ সালের ১৫ই শ্রাবণ, ইংরেজি ১৮৬৩ খ্রীষ্টা‌ব্দের ৩০শে জুলাই, বৃহস্পতিবার এই দিনটিকে চিহ্নিত করা গেছে। কিন্তু হঠাৎ শ্রাবণ মাসে দুর্গা মূর্তিতে পুজো কেন? না, এ মূর্তি সম্পূর্ণ দুর্গার নয়। মা দুর্গা সপরিবার আসেন। মা মহিষমর্দিনী মহিষাসুরমর্দিনী। পাশে দুই সহচরী জয়া এবং বিজয়াকে সঙ্গে নিয়ে বিরাজমানা। তাঁদেরও পুজো আলাদা করে হয়। জয়া ভোগশক্তি বর্ধনকারিণী, ভোজ্য বস্তু প্রদান কারিণী। বিজয়া জ্বালা যন্ত্রণা নিবারণকারিণী। প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে তো পাকাতেই হয়! চলে যাই সলতে পাকাতে।

তখন পরাধীন ভারত। কিন্তু বর্ধমান মহারাজের আমল। রাজন্যপ্রথা বিলুপ্ত হয়নি। কালনার রাজবাড়ি তাঁদের বাগান বাড়ি। ভাগীরথীর কোলে এ শহরে ব্যবসা চলে কলকাতার সঙ্গে। কালনার ফেরিঘাট, নয়াগঞ্জে সপ্তাহে সপ্তাহে নৌকা এসে লাগে। নৌকা করে জিনিসপত্র যাতায়াতে একসপ্তাহ সময় লাগে। তাই  সে হলো হপ্তাঘাট। পরে অবশ্য  'হরমিলা কোম্পানি'র স্টিমার চালু হয়, তখন কলকাতা থেকে রাতে ছাড়া স্টিমার কালনা ঘাটে সকালে আসত; আর সকাল বেলা কালনা থেকে ছাড়া স্টিমার সন্ধ্যায় কলকাতায় নাকি পৌঁছে যেত। 'নাকি' বললাম। কারণ এককালের ঘটনা আজ গল্প। যেমন আজকের কথাও একদিন গল্প হয়ে যাবে!

যাইহোক, সেই হপ্তাঘাট সংলগ্ন এলাকা স্বাভাবিক ভাবেই ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। একজন আড়তদার ঈশ্বরীপ্রসাদ পাল চৌধুরী স্বপ্ন দেখেন রাণাঘাটের পালচৌধুরীদের মা মহিষমর্দিনীর পাটাতন হপ্তাঘাটে ভেসে আসছে। উনি যেন তা তুলে নিয়ে পুজো শুরু করেন। সকালে গঙ্গাস্নানে গিয়ে উনি সত্যিই একটি কাঠের পাটাতন পান এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীদের সকল কথা জানান। নবদ্বীপ, ভাটপাড়া, বেলপুকুর, বৈদ্যপুরের সকল পণ্ডিত ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে সকল ব্যবসায়ীর উদ্যোগে বাংলা ১২৭০ সালের ১৫ই শ্রাবণ পূজারম্ভ হয়। সভাপতি হন স্বর্গীয় ঈশ্বরী প্রসাদ পাল চৌধুরী। প্রথমদিকে রাণাঘাটের পাল চৌধুরীদের তরফ থেকে পুজো নিয়ে আসা হতো এবং সংকল্প ওনাদের নামে হতো। সাংসদ ইলা পালচৌধুরীর দেহাবসানের সঙ্গে সঙ্গে সে প্রথা অবলুপ্ত হয়। সেই থেকে এ পুজো কালনা বাসীর একান্ত আপনার। যদিও আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক সমাগম হয়েই থাকে। এখানে একটি কথা না বললেই নয়,  বর্ধমান মহারাজার শাসনাধীন হলেও এই পুজোর জন্য কোনদিন বর্ধমান মহারাজার কাছ থেকে কোনো সাহায্য নেওয়া হতো না।

১২৭০ সাল থেকে ১৩০০ সাল পর্যন্ত তাল পাতা দিয়ে ছাওয়া মণ্ডপ শ্রাবণ মাসের বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তো, জল জমে যেত চারপাশে। ১৩০১ সাল থেকে ১৩৫০, ইংরেজি - ১৮৯৪—১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে সভাপতি কালিপদ সরকার এবং সম্পাদক সচ্চিদানন্দ সাহার সময়ে স্থায়ী মণ্ডপ স্থাপন, ট্রাস্ট গঠন, মায়ের গয়নার ব্যবস্থা, এককথায় সামগ্রিক উৎকর্ষ সাধিত হয়।

সর্বশ্রী ব্রজগোপাল নন্দী, বেণীমাধবসাহা, কালিপদ সরকার, সচ্চিদানন্দ সাহা, রবীন্দ্রনাথ সাহা, দীনবন্ধু সাহা, পঞ্চানন সাবুই, পাঁচুগোপাল পান, শম্ভুচরণ মল্লিক, নারায়ণ সাবুই, বিশ্বনাথ সাহা, সুশীল মিশ্র, শঙ্কর পান এবং বিজন শেঠ বিভিন্ন সময়ে পূজাকমিটির সভাপতি ও সম্পাদকের ভূমিকা পালন করেছেন এবং করছেন।

জ্যৈষ্ঠ মাসে পুষ্যা নক্ষত্রে মায়ের গাত্র মৃত্তিকা হয় এবং মূর্তি তৈরির কাজ শুরু হয়। কমিটি সভা আয়োজন করে স্থির করে পূর্ণিমা বা শ্রাবণের শুক্ল পক্ষের সপ্তমী তিথি, কোন দিন নির্দিষ্ট হবে পুজোর জন্য। পূর্ণিমাতে পুজো হলেও পুজোর প্রথম দিনটিকে সপ্তমী ধরা হয়। ঐদিন সকালে ঢাক বাদ্যি সহযোগে গঙ্গা থেকে ঘট ভরে আনা হয় মায়ের স্নানের জন্য। 

"শ্রী পঞ্চমীর দিন পালকি করে ঘট নিয়ে সারা কালনা পরিক্রমা করা হয়" এই তথ্য একদমই ঠিক নয়। পুজোর তিনদিন অন্নক্ষেত্র, বস্ত্রদান বিভিন্ন সৎ কাজের আয়োজন করা হয়। মায়ের কাপড় গরীব, দুঃস্থ মেয়েদের  বিয়েতে কমিটির মাধ্যমে দান করা হয়। বলিদান মানবিক না অমানবিক সে আলোচনা তার্কিক মহলে চললেও এখানে বলিদান প্রথা রয়েছে। 

গতবছর ৩রা আগস্ট পুজোর দিন স্থির করা হয়েছিল, কিন্তু গাত্রমৃত্তিকা অনুষ্ঠান হয়নি। এবছরও কোনোরকম আয়োজন সম্ভব হলো না। 

এবার বলা যাক, মায়ের মূর্তির বিষয়ে। মহিষাসুর প্রভূত বলশালী, অতুলনীয় শক্তির অধিকারী। কিন্তু সে অসংযত, মদমত্ত। ভোগতৃষ্ণা এবং ইন্দ্রিয়পরতা দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে শুভাশুভ বোধ হারিয়ে মহা বিপর্যয় ঘটিয়ে দেয়। সেই শক্তিকে কল্যাণ বুদ্ধি, বিবেক বুদ্ধি দ্বারা বা শিব শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করতে হয়। শিব সুখদ, শুভদ। মর্দন অর্থে দমন। অশুভ শক্তিকে দমন করা প্রয়োজন আর দমন করার জন্য বীর্য রূপী পশুরাজ সিংহের প্রয়োজন। মহিষাসুর তমোগুণের প্রতীক, সিংহ রজঃ গুণের প্রতীক, জ্ঞানময়ী দেবীর মধ্যে সত্ত্বগুণ কায়াবতী। তমোগুণকে দমন করার জন্য রজঃ গুণ, রজোগুণকে দমন করতে সত্ত্ব গুণের প্রয়োজন। সেজন্য মহিষাসুরের উপর সিংহ এবং সিংহের উপর দেবী অধিষ্ঠিতা।

কালনায় মহিষমর্দিনী পুজো হলে আজ নবমী পুজো হতো। হতো, কিন্তু হলো না। কারণ তো সবারই জানা। আমরা হয়তো একদিনের জন্য যাই, কোনো কোনো বছর তাও হয় না। তাতেই মনটা কেমন কেমন করছে। আর যে সব কলাকুশলী এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত? প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ সজ্জা, আলোকসজ্জা, রকমারি দোকানদারি, পুতুল নাচ, নাগরদোলা, নহবত সবকিছু বন্ধ, মানে এতো মানুষের কাজ বন্ধ। ভাবলে আরও মন খারাপ হয়ে যায়। আকাশ-মাটি কান্না ভেজা। আশা রাখি,  ঈশ্বরের ইচ্ছায় সকল কালো, সকল দ্বন্দ্ব ঘুচে গিয়ে 'ভালো' জাগ্রত হবে। শুধু ধৈর্য ধরতে হবে।

(www.theoffnews.com - Kalna puja)



শামা আরজু, লেখক, বাংলাদেশ:

আজ সহ তিন রাত আমার ঘুম নেই বললেই চলে। আচ্ছা, আমার জন্য কখনোই তোমার কষ্ট লাগতে নেই বুঝি! আমি তো তোমার কষ্টগুলোকে নিজের কষ্ট করে নিতে শুরু করেছি সেই শুরু থেকেই। তুমি কেন পারলে না! আমার কোথায় ঘাটতি ছিলো বলো!

যতকিছুই করি আমার সময় কাটে আসলে তোমার অপেক্ষায়। জানি তোমার কাছে এই কথাগুলি হাস্যকর মনে হবে। তুমি তো খুব যুক্তিবাদী। আবেগের মূল্য খুব কম। কিন্তু আমাকে তোমার পছন্দ করার কারন গুলোর মধ্যে একটা ছিলো আমার যুক্তিবাদী মনোভাব। হ্যাঁ, আমি এখনো তেমনই আছি। আমি জানি আবেগকে অস্বীকার করে যুক্তি হয় না। ওটা আসলে কুযুক্তি। 

তোমাকে বিশ্বাস করে যেদিন অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালাম সেদিন ভয়ের কাছে পরাজিত হলো বিশ্বাস। তুমি যখন আমার পাশে বসার অনুমতি চাইলে লাজুক ভাবে তখন মনে হলো তুমিই আমার জীবনে প্রথম পুরুষ যাকে আমি পরিণত বয়সে চেয়েছিলাম। বসার পর কিছু কথা। তারপর আবার যখন বললে, আমি কী আপনার হাতটা একটু ধরতে পারি? আমি অবাক হয়ে গেলাম। এ যে দেখি আর্টফিল্মের মতো গো! বাস্তবে পুরুষ এমন হয় কখনো? তোমাকে দেখে শিখেছিলাম পুরুষও পারে সম্মানের সাথে ভালোবাসতে। তুমিই বুঝিয়েছো যৌনতায়ও সম্মান থাকতে হয়, শিক্ষাও থাকতে হয়।ওটাও শিল্প হতে পারে। ওখান থেকে ফেরার সময় যখন গাড়ির ভেতর পেছন থেকে হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলে তখন বুঝলাম আসলে চাইলে পুরুষও পারে ভালোবাসতে। তুমি টের পাওনি আমি সেদিন  আনন্দে কেঁদেছিলাম। অথচ তুমি চাইলে যাচ্ছেতাই আচরণ করতে পারতে আমার সাথে। করোনি।

এই পর্যন্ত খুব ভালোই ছিলো। কিন্তু ভালোটাতো আমার জন্য দুঃস্বপ্ন গো! সেদিন আসলে পুলিশ হোটেলে রেড দিল। রাতের আঁধারে আমাকে নিয়ে গেল পল্টন থানায়। তুমি আর্মিতে চাকুরি করো জেনে তোমাকে ছেড়ে দিলো। আমি সাধারণ মেয়েমানুষ। আমাকে রেখে দিল। সারারাত দুটো মেয়ে পুলিশ আমার কথা শুনে খুব দুঃখ করছিল। আমার কেবল কান্না তখন। আমার ফোনটাও পুলিশ নিয়ে গেল। সকালে আরো বড়ো কোনো পুলিশ এলে তাঁকে সব খুলে বললাম। তিনি বিশ্বাস করলেন। এলাকার গন্যমান্য একজনকে ডেকে এনে তাঁর জিম্মায় আমাকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। জামিনদারকেও আমি চিনি না। দাপ্তরিক কাজ সেরে তিনি চলে গেলেন। আমার ফোনটাও দেওয়া হলো আমাকে। ফোনে আর তোমায় পাই না আমি। ঢাকায় আমি কিচ্ছু চিনি না। কোথায় যাবো, কিভাবে যাবো। একজন পুলিশকে দেওয়া হলো আমাকে বাসে তুলে দেওয়ার জন্য। সে আমাকে একটা হোটেলে গিয়ে ঘুমাতে বললো। আমার চেহারা দেখে তার মায়া লাগলো না লোভ হলো ততক্ষণে আমি বুঝতে পেরেছি। রিকশায় তার বসার ভঙ্গিতেই তার নমুনা ছিলো। আমি বললাম পরে এলে আমি আপনার সাথে অবশ্যই দেখা করবো। বাড়িতে আমার জন্য সবাই খুব চিন্তা করছে। পুলিশ ধরেই নিয়ে ছিল আমি খারাপ। কিন্তু তুমি তো জানতে আসলে আমি কী! বাড়ী আসার পর অনেক চেষ্টা করেছিলে আবার যোগাযোগ করার। আর আমি সেই সুযোগ তোমাকে দিইনি।

দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়া মানেই বাকি জীবন তাকে আরও অন্যায়ের সুযোগ করে দেওয়া, অন্যায় কাজে অনেকটা উৎসাহিত করা।

রাতের বেলা হোটেলে যাওয়া মেয়ে মানেই শখের শরীর বেচা মেয়ে না। মগজে সততা থাকলে এক বিছানায় শুয়েও বডি রিলেশশন না করেও থাকা যায়। আমার একজন মানুষ ছিল যাঁর সাথে আমি অনেক রাত একা এক রুমে একটা বিছানায় বসে বলা শুয়ে সারারাত জীবনের গল্পগুলো শেয়ার করেছি।

সেই মানুষটাই একদিন তাঁর ঘরে ফেরার পথে বাসে বসেই হার্ট এ্যাটাকে নাই হয়ে গেলেন। অথচ আমি এখনো আমার মোবাইল থেকে নাম্বারটা ডিলিট করিনি একরকম অপেক্ষা করি তার ফোনের জানাই এই পেজের উঠল মোবাইল ফোন আর আমি হাতে ফোন নিয়ে দেখলাম তার ফোন এসেছে এখনো আমি তার কথা মনে করে নীরবে কাঁদে যে কান্না কাউকে দেখানো যায় না।

অনেক সময়ই ভেবেছিলাম এই ঘটনাগুো লিখে রাখবো, পারিনি। এই করোনার অস্থির সময়ের নির্ঘুম রাত আমায় সেই সুযোগটা করে দিলো।

এই করোনায় আমি না থাকলেও আমার এই লেখাটা তো থেকেই যাবে।

"হাতের কলম জনম দুঃখী 

তাকে বেইচো না!"

(www.theoffnews.com - Bangladesh self conversation)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

বাঈজীর ব্যাপারে পুরনাে কলকাতার দু-জন বাবু খুব বিখ্যাত ছিলেন। একজন হচ্ছেন মহারাজা নবকৃষ্ণ দেবের পুত্র রাজকৃষ্ণ দেব, যার কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। অন্যজন হচ্ছেন চুড়ামণি দত্তের সন্তান কালীপ্রসাদ দত্ত। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একজন। নিম্নপদস্থ সামরিক অফিসার ছিলেন ফ্রেডরিক উইন। তিনি রাজকৃষ্ণের বাড়িতে নাচের আসরে উপস্থিত ছিলেন। তার লেখা থেকে জানা যায়, রাজকৃষ্ণ সেবার তিন রাত ধরে চার-পাঁচ দল বাঈজীকে নাচানাের জন্যে বায়না করেছিলেন। এই বাঈজীদের মধ্যে নিকীও ছিল। তার বয়স তখন চোদ্দ বছর। উইনের ভাষায় ‘নিকীর মুখাকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন রতিদেবী স্বয়ং গঠন করিয়াছেন। আমি স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম যে, তিনরাত্রি নাচিবার জন্য নিকীকে যে বারােশত টাকার নগদ এবং সেই দামের দু-জোড়া শাল পারিশ্রমিক দেওয়া হইল, তাহা তাহার গুণের সমতুল্য বটে।’ ১৮১৪ সালে কিষাণচন্দ্র রায়ের বাড়িতে, ১৮১৫ সালে রামচন্দ্র রায়ের বাড়িতে আর ১৮৩২ সালে আশুতােষ দেবের বাড়িতে নিকী নেচেছিল বলে খবরে প্রকাশ। ১৮১৯ সালেও নিকী রামচন্দ্র রায়ের বাড়িতে নেচেছিল বলেও জানা যায়। এরপর চারবছর তার কোনাে খবর পাওয়া যায়নি। ১৮২৩ সালে সে রামমােহন রায়ের মানিকতলার বাগানবাড়ির মুজরােয় হাজির ছিল। 'ক্যালকাটা জার্নাল’-এ খবর বেরিয়েছিল।

নিকী আর আশরুনের পরেই থাকার কথা ছিল নূরবক্সের স্থান। কলকাতার বাঈজীদের নামের তালিকায় প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকা উচিত ছিল তার নাম। কিন্তু কোথায় কী! ১৮১৯ সালে আবির্ভাব-লগ্নেই তিরােভাব ঘটলাে কলকাতার প্রতিভাময়ী বাঈজী নূরবক্সের। টলে উঠলাে বাঈজী -সম্রাজ্ঞী নিকী বা আশরুনের সিংহাসন। একটা অসাধারণ প্রতিভার বিনাশ ঘটলাে।

১৮১৪ সালের ২০ অক্টোবর ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ খবর বেরােলাে আশরুন দুর্গাপুজোয় নীলমণি মল্লিকের বাড়িতে নেচেছে। ১৮১৫ সালে আশরুন আবার দুর্গাপুজো উপলক্ষে রামচন্দ্র রায়ের বাড়িতে নেচেছিল। আশরুনের শেষ খবর ছাপা হয়েছিল ১৮১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ‘ক্যালকাটা জার্নাল’-...তবে রামদুলাল দের পুত্র ছাতুবাবুও পিছিয়ে ছিলেন না। ছাতুবাবুর বাগান বাড়ি বিখ্যাত ছিল বাই নাচের জন্য। শুধু ছাতু বাবু নয়, বাবু খেলাত ঘোষ ছিলেন উৎকর্ষ সংগীতের পৃষ্ঠপোষক। বাগানবাড়িতে হিন্দু মেলার বৈঠকও ঐতিহাসিক ভাবে মূল্যবান। তবে মজার ব্যাপার হল যারা হিন্দু ধর্মের সংস্কারের বিরোধিতা করেছিলেন যেমন রাধকান্তদেব এবং আর যারা নবজাগরণের আন্দোলনের অভিমুখে ছিলেন  তাদের প্রায় অনেকেই বাবু কালচারের ও বাইজি গান ও নাচের স্বপক্ষে ছিলেন। তবে শেষ করি গহরজানের কথা দিয়ে। প্রথম বাংলা গানের রেকর্ড  সফল ভাবে প্রকাশিত হয় এইচএমভি থেকে। তিনি সব রকমের গান গেয়েছেন। তাঁর অবদানও কম নয়।

গওহরজান আর এক নামকরা বাঈজী। তার জন্ম ১৮৭৩ সালে। গওহরের আসল নাম এঞ্জেলিনা, বাবার নাম রবার্ট উইলিয়াম, ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। কাশীতে ছিল তাঁর বাসস্থান। মায়ের নাম ভিক্টোরিয়া হেমিংস। ভিক্টোরিয়া ছিলেন অসাধারণ রূপসী। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। নতুন তার নাম হয় মালকাজান। এসময় সে মেয়ের নামও পাল্টে দিল—এঞ্জেলিনা হল গওহরজান, সংক্ষেপে গহর। 

গওহরজানকে বলা হত ‘ইণ্ডিয়ান নাইটিঙ্গেল’। তার দক্ষিণা ছিল ১৫০০ টাকা। জানা যায়, ১৯০২ সালে পাটনায় একটা বিয়েবাড়ির আসরে গওহরজান একখানা স্বরচিত গজল গেয়ে সবাইকে মােহিত করে দিয়েছিল। ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, পাথুরিয়াঘাটার জমিদার ভূপেন্দ্রকৃষ্ণ ঘােষ গওহরকে নানাভাবে সাহায্য করতেন। ১৯২০ সালে ভূপেনবাবুর বাড়িতে মালকাজানের সঙ্গে গওহরও নেচেছিল। পরে গওহর বােম্বাই চলে যায়। তারপর সেখান থেকে মহীশূরের মহারাজা কৃষ্ণরাজ ওয়ারিয়রের দরবারে গিয়ে হাজির হয়। মহারাজা তাকে মাসে দু’হাজার টাকা মাইনের গায়িকার চাকরিতে নিয়ােগ করেন। কিন্তু মহীশূরে যাওয়ার দু’বছর পরে ১৯২৯ সালে গওহর মারা যায়। গওহরের সংক্ষিপ্ত জীবনী ছাপা হয় ১৯৩০ সালের ১৮ জানুয়ারি ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায়। এতে লেখা হয়েছিল,

“A loss has been sustained by the death in Mysore of Madame Gauhar Jan, where she was Court singer and dansense to H. H. the Maharaja of Mysore.”

এই কাগজে আরও লেখা হয়,

“Her fame as a songstress earned her the title of ‘Indian Nightingle’ and when gramophone records were first made of Indian songs, she was the first to be approched.”

দুর্গাপুজো ছাড়াও দোল আর রাসের সময়ও বাঈজী নাচ হত। তবে সে খুব কম। (ক্রমশঃ)

তথ্যসূত্রঃ উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, আশুতোষ ভট্টাচার্য, দ্বিতীয় খণ্ড।

বিনোদনে পাইকপাড়া বেলগাছিয়া, সান্তুনু ঘোষ

কলকাতা রাজপথ সমাজও সংস্কৃতিতে, অজিত বসু

অতুল সুর, কলকাতার চালচিত্র, কলকাতা, পৃ. ১৯৩ ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সংবাদপত্রে সেকালের কথা, ১ম খণ্ড, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলকাতা, পৃ. ১২১।

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)