Articles by "বিষ্ময়ের অমৃত সন্ধান"
Showing posts with label বিষ্ময়ের অমৃত সন্ধান. Show all posts


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

পূর্ব আফ্রিকায়, টেকটোনিক শক্তি ধীরে ধীরে মহাদেশটিকে বিভক্ত করছে, ভবিষ্যতের সমুদ্র অববাহিকা তৈরি করছে।

২০০৫ সাল থেকে, পূর্ব আফ্রিকান রিফ্ট নামে পরিচিত ৩৫ মাইল দীর্ঘ একটি ফাটল তৈরি হচ্ছে।

পূর্ব আফ্রিকার জ্বলন্ত মরুভূমিতে, মাটি ধীরে ধীরে নিজেকে ছিঁড়ে ফেলছে - একটি ধীর গতির, ভূতাত্ত্বিক নাটক। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে, আফ্রিকা মহাদেশ দুটি ভাগে বিভক্ত হবে, এবং বিজ্ঞানীরা বলছেন যে একটি নতুন মহাসাগর একদিন এই শূন্যস্থান পূরণ করবে।

আফার অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ এবং সবচেয়ে অপ্রীতিকর স্থানগুলির মধ্যে একটি হিসেবে সবচেয়ে বিখ্যাত। কিন্তু ভূতাত্ত্বিকদের কাছে, আরও আকর্ষণীয় বিষয় হল জ্বলন্ত মাটির নীচে কী রয়েছে। আফার তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত - নুবিয়ান, সোমালি এবং আরব - যা ধীরে ধীরে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়া, যাকে রিফটিং বলা হয়, ভূদৃশ্যকে নতুন আকার দিচ্ছে এবং বিজ্ঞানীদের মহাদেশগুলি কীভাবে বিভক্ত হয় এবং মহাসাগরের জন্ম হয় তা অধ্যয়নের জন্য একটি বিরল সুযোগ প্রদান করছে।

"পৃথিবীতে এটিই একমাত্র স্থান যেখানে আপনি অধ্যয়ন করতে পারবেন কীভাবে মহাদেশীয় ফাটল একটি মহাসাগরীয় ফাটল হয়ে ওঠে," লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্র ক্রিস্টোফার মুর, যিনি এই অঞ্চলের আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য স্যাটেলাইট রাডার ব্যবহার করেন, এনবিসিকে বলেন ।

একটি ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষাগার

আফার অঞ্চলে পূর্ব আফ্রিকান রিফ্ট ভ্যালি অবস্থিত, যা ইথিওপিয়া এবং কেনিয়ার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত পৃথিবীর পৃষ্ঠে একটি বিশাল ফাটল। ২০০৫ সালে, ইথিওপিয়ার মরুভূমিতে ৩৫ মাইল দীর্ঘ একটি ফাটল তৈরি হয়েছিল, যা ভূপৃষ্ঠের নীচে কাজ করা শক্তির একটি নাটকীয় স্মারক।

"এই বিভাজন মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে কয়েকশ বছরের টেকটোনিক প্লেট চলাচলের সমতুল্য ছিল," বলেন তুলান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ সিনথিয়া এবিঙ্গার, যিনি এই অঞ্চলটি নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা করেছেন।

এবিঙ্গারের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ভাঙনের প্রক্রিয়া সবসময় মসৃণ হয় না। বরং, হঠাৎ, বিস্ফোরক ঘটনা দ্বারা এটিকে বিরাম চিহ্নিত করা যেতে পারে। তিনি এই প্রক্রিয়াটিকে একটি বেলুনে অতিরিক্ত ভরে ফেলার সাথে তুলনা করেছেন: "আমরা উটের কোমর ভেঙে ফেলার খড় বোঝার চেষ্টা করছি।"

এই ঘটনাগুলি ক্রমবর্ধমান ম্যাগমার চাপের কারণে ঘটে, যা অবশেষে ভূত্বককে ফাটল ধরতে বাধ্য করে। সময়ের সাথে সাথে, এই ফাটলগুলি বৃদ্ধি পাবে এবং এডেন উপসাগর এবং লোহিত সাগর ফাটলের মধ্যে প্লাবিত হবে, যার ফলে একটি নতুন মহাসাগর তৈরি হবে । 

ষষ্ঠ মহাসাগর

কয়েক দশক ধরে, বিজ্ঞানীরা আফ্রিকান রিফট নিয়ে গবেষণা করে আসছেন, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। উদাহরণস্বরূপ, জিপিএস যন্ত্রগুলি গবেষকদের অসাধারণ নির্ভুলতার সাথে টেকটোনিক প্লেটের গতিবিধি পরিমাপ করতে সাহায্য করে।

"জিপিএস পরিমাপের সাহায্যে, আপনি প্রতি বছর কয়েক মিলিমিটার পর্যন্ত চলাচলের হার পরিমাপ করতে পারেন," বলেছেন কেন ম্যাকডোনাল্ড, একজন সামুদ্রিক ভূ-পদার্থবিদ এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা বারবারার এমেরিটাস অধ্যাপক।

আরবীয় প্লেট প্রতি বছর প্রায় ১ ইঞ্চি হারে আফ্রিকা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে নুবিয়ান এবং সোমালি প্লেটগুলি আরও ধীরে ধীরে পৃথক হচ্ছে, বার্ষিক আধা ইঞ্চি থেকে ০.২ ইঞ্চি হারে। এই নড়াচড়াগুলি তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর ধরে, এগুলি এই অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণরূপে নতুন আকার দেবে।

প্লেটগুলি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথে, পৃথিবীর গভীর থেকে উপাদানগুলি পৃষ্ঠে উঠে আসে, নতুন মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরি করে। "আমরা দেখতে পাচ্ছি যে মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরি হতে শুরু করেছে, কারণ এটি গঠন এবং ঘনত্বের দিক থেকে মহাদেশীয় ভূত্বক থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা," মুর ব্যাখ্যা করেন।

বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন যে আফার অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে ডুবে যেতে কমপক্ষে ৫০ থেকে ১ কোটি বছর সময় লাগবে। যখন এটি ঘটবে, তখন এডেন উপসাগর এবং লোহিত সাগর ফাটল ধরে প্লাবিত হবে, একটি নতুন সমুদ্র অববাহিকা তৈরি করবে এবং আফ্রিকার শৃঙ্গকে তার নিজস্ব ছোট মহাদেশে পরিণত করবে।

আপাতত, আফার অঞ্চলটি একটি কঠোর এবং ক্ষমাহীন ভূদৃশ্য হিসেবে রয়ে গেছে। দিনের তাপমাত্রা প্রায়শই ১৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত বেড়ে যায়, রাতে তাপমাত্রা কেবল ৯৫ ডিগ্রি (৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত ঠান্ডা হয়। তবুও, এবিঙ্গারের মতো বিজ্ঞানীদের জন্য, এটি একটি প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার যা আমাদের গ্রহকে গঠনকারী শক্তি সম্পর্কে অতুলনীয় অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

“এটিকে দান্তের নরক বলা হয়েছে,” তিনি বলেন। কিন্তু যারা তাপের মুখোমুখি হতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য এটি পৃথিবীর ভূতত্ত্বের ভবিষ্যতের একটি জানালা - এমন একটি ভবিষ্যৎ যেখানে আফ্রিকা আর একটি মহাদেশ নয়, বরং দুটি; একটি নতুন মহাসাগর দ্বারা বিভক্ত।

(www.theoffnews.com Africa ocean)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

আশ্চর্য পৃথিবীর এক অন্যতম বিশ্ববিস্ময়! ১১,০০০ বছর বয়েসের একটি পাথুরে স্থাপত্য, মানুষের বিকাশ সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞদের এতদিনের লালিত পালিত ধ্যান ধারণাকে তছনছ করে কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মানুষ যখন চাকা আবিষ্কার করেনি, হায়ারোগ্লিফিক্স লেখা বহু দূরের কথা, এমনকি স্টোনহেঞ্জেরও আগে একদল আদিম মানুষ এখন যাকে তুরস্ক বলা হয় সেখানে এই ছকভাঙা বিশাল প্রার্থনালয় গড়ে তুলেছিল। এটাই কি বিশ্বের প্রাচীনতম উপাসনালয়? সানলিউরফাতে অবস্থিত ‘গোবেকলি তেপে’ নামের এই ভজনালয়টি নিওলিথিক যুগের অন্যান্য সব বিখ্যাত স্মৃতি স্তম্ভের থেকে হাজার হাজার বছরের পুরনো।

তুর্কি ভাষায় ‘গোবেকলি তেপে’ মানে “নাভির পাহাড়” বা “পেটের পাহাড়” কারণ প্রত্নস্থলটি একটি ‘টেল’ - মানুষের বসতির জন্য মানুষের তৈরি একটি ঢিবি। এটি সিরিয়ার সীমান্তের কাছে উরফা প্রদেশে অবস্থিত।

তুর্কি এবং আমেরিকান নৃবিজ্ঞানীরা উনিশশো ষাটের দশকে এর কিছু অংশ খুঁজে পেয়েও ভুল করে মধ্যযুগের কবরস্থান মনে করে ততটা গুরুত্ব দেননি। কিন্তু আরও বিশদ খনন আর নব্বইয়ের দশকে জার্মান প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্লাউস স্মিটের (Klaus Schimdt) রেডিওকার্বন ডেটিং থেকে জানা যায় যে মানব সভ্যতার উন্মেষ পর্বের এটি সমসাময়িক। এজন্য, অনেকে এটিকে তুর্কি স্টোনহেঞ্জ বলে থাকেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের স্টোনহেঞ্জের থেকে এটি ৬,০০০ হাজার আগে তৈরি হয়েছিল - ধাতুর সরঞ্জামের ব্যবহার আর মানুষের আদিমতম অনেক আবিষ্কারের আগে।

আনুমানিক ৯৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে ‘গোবেকলি তেপে’র নির্মাণ। তখনও চলছে প্রস্তর যুগ, অধিকাংশ মানুষই যাযাবর গোষ্ঠীর। সেই সময়ে কিনা স্থায়ী উপাসনালয়? এটাই সবচেয়ে অদ্ভুত লেগেছিল স্মিটের। খননকার্য থেকে যে ধরনের পাথর ফলক পাওয়া গেছে, তাতে অন্তত এটা পরিষ্কার যে এখানে মানুষ বসবাস করত না। শয়নকক্ষ, স্নানাগার ইত্যাদির সন্ধানও মেলেনি। আয়তনেও খুব বেশি বড়ো নয় স্থানটি। ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের মতো ১৫ মিটারের ২০টি পাথরফলক দাঁড়িয়ে আছে বৃত্তাকারে। নিশ্চয়ই গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ মাত্র কয়েকজনের জন্য বাড়িঘর বানাবে না? অথচ স্থাপত্যের প্রবেশ পথটি দেখে মনে হয় যেন এখানে নিত্য যাতায়াত ছিল মানুষের। কয়েকটি ফলকে বিভিন্ন পশুপাখির মূর্তি খোদাই করা। সব মিলিয়ে দৃঢ় হতে থাকে স্মিটের ধারণা। 

তাঁর গবেষণায় উঠে আসে আরও একটি তথ্য। শুধু উরফা নয়, মিশর, ইজরায়েল থেকে বহু মানুষ আসতেন এখানে। কয়েক হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ঘুরতে যাওয়া আজকের দিনে মামুলি ব্যাপার, কিন্তু প্রস্তর যুগে নিশ্চয়ই সহজ ছিল না বিষয়টি। একমাত্র তীর্থ দর্শনের জন্যই এত দূর যেতে পারে মানুষ। স্মিট ‘প্রার্থনাগৃহ’ নির্মাণকার্যের যে নমুনা সামনে রেখেছেন, তাও রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। কয়েকশো মানুষের চেষ্টায় প্রায় দশ বছর লেগেছে মন্দিরটি তৈরি হতে। কিন্তু প্রশ্ন অন্য জায়গায়। কৃষিকাজের জন্য মানুষ স্থায়ী বাসস্থান খুঁজে নিয়েছে আরও কয়েক হাজার বছর পরে।  তাহলে গোবেকলি তেপে কি বিস্ময়করভাবে ব্যতিক্রম? সেক্ষেত্রে তো মানব সভ্যতার ইতিহাসকে দেখতে হয় নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে। কীভাবে যে ওই যুগে এত ভারি পাথরকে কেটে প্রার্থনাগৃহের রূপ দেওয়া হল সেটাও আশ্চর্যের। আবার, গোবেকলি তেপে-র পাথর ফলকগুলি পাওয়া যায় প্রায় অক্ষত অবস্থায়। অনুমান, অধিবাসী যাওয়ার আগে মাটির নিচে পুঁতে রেখে যায় উপাসনালয়ের অংশগুলি। সেক্ষেত্রে প্রশংসা করতে হয় তাদের বুদ্ধিমত্তারও।

চুনাপাথর সমৃদ্ধ টরাস পর্বতমালায় ১০ হেক্টর প্রত্নস্থানটিতে ১৫ মিটার উঁচু গোলাকার এবং আয়তাকার স্তম্ভ রয়েছে। কোনও এক সময়ে হয়তো ছাদও ছিল। এই স্তম্ভগুলিতে শকুন, সাপ, শেয়াল, হরিণ এবং গৃহপালিত জন্তুর আকৃতি খোদাই করা আছে। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে এই খোদাই মূর্তিগুলি এই শিকারী-সংগ্রাহক গোষ্ঠীগুলির ধর্মীয় বিশ্বাসের পাথুরে নিদর্শন। কিন্তু এটা এখনও স্পষ্ট নয় যে এগুলি দেবতা হিসেবে পূজিত হতো নাকি টোটেম ছিল নাকি অমঙ্গল থেকে বাঁচতে ব্যবহার করা হত।  

পাঁচ মিটার পর্যন্ত লম্বা এই স্তম্ভগুলিতে শকুন, সাপ, শেয়াল, হরিণ এবং গৃহপালিত প্রাণীর খোদাই করা আছে। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে এই রিলিফগুলি এই শিকারী-সংগ্রাহক গোষ্ঠীগুলির ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রদর্শন করেছিল। এটা স্পষ্ট নয় যে এই খোদাইগুলি দেবতা ছিল, নাকি টোটেম ছিল, নাকি মন্দ ভাগ্য থেকে বাঁচতে ব্যবহৃত হয়েছিল। কেউ কেউ মনে করেন যে এটি একটি তীর্থস্থান ছিল। অন্যরা আবার মনে করেন যে এটি একটি সাম্প্রদায়িক সমাবেশের জায়গা ছিল।

একটি তুর্কি কিংবদন্তি আছে যে্টির সঙ্গে কেউ কেউ মন্দিরের বারংবার ব্যবহৃত সাপের মোটিফের সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। গল্পটি হল তাহমাস্প নামে এক দরিদ্র যুবক সাপের গুহায় আটকা পড়েছিল। এখানে, তিনি সাপের রানী শাহমরানের মুখোমুখি হন, যিনি ছিলেন অর্ধেক সাপ, অর্ধেক নারী। দুজনের প্রেম হয়। যখন পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসার সময় হয়েছিল, তখন তাহমাস্প ভূগর্ভস্থ রাজ্য সম্পর্কে গোপনীয়তার শপথ নিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, ভূপৃষ্ঠের বাসিন্দারা তার গোপন রহস্য আবিষ্কার করে এবং শাহমরানকে হত্যা করে। তার মৃত্যুর কারণে, সাপ হয়ে ওঠে মানবতার নেমেসিস।

এমন একটি জটিল নকশা অনুসরণ করে প্রার্থনাগৃহটি তৈরি করা হয়েছিল যা আপাতদৃষ্টিতে সেই সময়ের মানুষের সামর্থ্যের বাইরে ছিল। ইজরায়েলের পণ্ডিত গিল হ্যাকলে এবং আভি গোফার লক্ষ্য করছেন যে প্রত্নস্থলটি “প্রায় নিখুঁত একটি সমবাহু ত্রিভুজে মিলিত হয়েছে।” এই ইচ্ছাকৃত প্রতিসাম্যের একটি উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু কি? তারার সঙ্গে একই সারিতে থাকতে, নাকি তাদের দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে? আশ্চর্যজনকভাবে, প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানে পশু বলির অবশিষ্টাংশ এবং এমনকি মানুষের মাথার খুলিও খুঁজে পেয়েছেন।

‘গোবেকলি তেপে’র অসামান্য গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও প্রত্নবিদরা পাঁচ শতাংশেরও কম জায়গায় খননকার্য চালাতে পেরেছেন। এই স্থাপত্যের নীচে আরও নির্মাণ থাকতে পারে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে আরও ১৫ থেকে ২০টা পাথর দিয়ে ঘেরা কবরস্থান আর বেশ কিছু ধ্বংসাবশেষ ওখানে রয়েছে। আবহাওয়াজনিত কারণে কিছু ক্ষয় হলেও বেশিরভাগ পাথর ভাল অবস্থায় আছে।

প্রাথমিক ভাবে আমাদের যাযাবর পূর্বপুরুষরা পরিযায়ী প্রাণীদের অনুসরণ করেছিল। কিন্তু ‘গোবেকলি তেপে’ মানুষের স্থায়ী বসবাসের দিকে ইঙ্গিত করছে। এর ফলেই হয়তো এই মন্দিরের মৃত্যুঘন্টা বেজে ওঠে। গবেষক সান্দ্রা স্ক্যাম দাবি করেছেন যে চাষবাসের উৎপত্তি ‘গোবেকলি তেপে’র কিছু অংশের ধ্বংসের জন্য দায়ী কারণ নিয়মিত কৃষিকাজের ফলে শিকারী-সংগ্রাহকরা তাদের আদি রীতিনীতি, ধর্মীয় আচার ব্যবহার ত্যাগ করে প্রাচীন উপাসনালয়কে অবহেলা করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

প্রস্তর যুগের এই অসামান্য স্থাপত্যের গুরুত্ব সত্ত্বেও এর উৎপত্তি এবং তাৎপর্য এখনও রহস্যাবৃত। মাঝে মাঝে কিছু খবর ভেসে উঠলেও বেশিরভাগটাই অজানা। অতি সম্প্রতি প্রত্নবিদরা এখানে নোড়া পাথর আর হাতুড়ি পাথর আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু ‘গোবেকলি তেপে’র মানে ছাড়াও প্রশ্ন রয়েই গেল যে প্রস্তর যুগের প্রথম দিকের মানুষরা এরকম একটি জটিল স্মৃতিসৌধের ধারণা আর নির্মাণ করতে পেরেছিল।

(www.theoffnews.com Gobekli Tepe)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর: 

বিজ্ঞানীদের মতে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ও শিশুদের একটি দল সম্ভবত একটি পাথুরে উপকূল বরাবর হাঁটার সময় তাদের পায়ের ছাপের প্রমাণ রেখে গেছে। 

ওই আঁকাবাঁকা যে পথ  যায় সুদূরে                          যুগ যুগ ধরে মাটিতে রয়ে যাওয়া আদিম মানুষের পদচিহ্ন আমাদের আদি পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে কী বলতে পারে? অপ্রত্যাশিত ও আশ্চর্যজনকভাবে অনেক কিছুই।

সাম্প্রতিক কালে মরক্কো, ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেনের বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল এক চমকপ্রদ আবিষ্কারের বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেছে, এক লক্ষ বছরের পুরনো মানুষের পদচিহ্ন সমূহের একটি সুসংরক্ষিত নমুনা। পায়ের ছাপগুলি পাঁচটি মানুষের একটি দলের বলে মনে করা হচ্ছে এবং উত্তর মরক্কোর লারাচে নামক একটি পাথুরে সৈকতে এগুলি পাওয়া গেছে। 

বিজ্ঞানীরা বহু কাল ধরে মানুষের সত্যিকারের উদ্ভবের রহস্যময় জিগস পাজলের সূত্রগুলো খাপে খাপে বসানোর চেষ্টা করছেন। সুবিখ্যাত ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রটি সেই প্রচেষ্টায় আর একটি সূত্র যোগ করেছে। কিন্তু যদিও তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার একটি প্রত্নতাত্ত্বিক কৃতিত্ব, তা সত্বেও এই প্রাচীন পায়ের ছাপের সমষ্টি উপকূলীয় ক্ষয়ের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে। এবার দেখা যাক বিজ্ঞানীদের এই সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এবং এতদিন পর্যন্ত বিভিন্ন আবিষ্কারে প্রাচীন মানুষের কী কী অবশেষ পাওয়া গেছে। 

মরক্কোতে বিজ্ঞানীরা কী খুঁজে পেয়েছেন? ২০২২ সালের জুন মাসে প্রত্নতাত্ত্বিক মুন্সেফ সেদ্রাতির নেতৃত্বে একদল গবেষক টাঙ্গিয়ারের দক্ষিণে মরক্কোর উপকূলের কাছাকাছি একটি এলাকায় বড় বড় পাথরের মধ্যে অনুসন্ধান চালাবার সময় লারাচে শহরের মাটিতে এই পায়ের ছাপগুলির গর্ত দেখতে পান। খুঁটিয়ে দেখার পর তাঁরা বুঝতে পারেন যে গর্তগুলি আসলে প্রাচীন মানুষের বিভিন্ন আকারের পায়ের ছাপ। ফ্রান্সের ‘য়ুনিভার্সিটি অভ সাদার্ন ব্রিটানি’-র ‘কোস্টাল ডাইনামিক্স অ্যান্ড মেরিন জিওলজি’ বিশেষজ্ঞ সেদ্রাতির চোখে এটি ছিল একটি “বিরল” দৃশ্য। তিনি “আল জাজিরা”-কে বলেছেন - “প্রথম পায়ের ছাপটি দেখে আমরা একশো শতাংশ নিশ্চিত ছিলাম না, কিন্তু ক্রমে ক্রমে আমরা দ্বিতীয়, তৃতীয়, তারপরে একদম স্পষ্ট একটা পায়ে চলা রাস্তা এবং আরও অনেক কিছু খুঁজে পেয়েছি। সেই সময়ই আমাদের সব সন্দেহ দূরীভূত হল। প্রায় এক লক্ষ বছর আগে একদল সুস্থ হোমো সেপিয়েন্স একটি বালুকাময় বেলাভূমির পলিমাটিতে এই পায়ের চিহ্নগুলো রেখে গিয়ে ছিল”। সম্ভবত পাঁচজন মানুষের একটি দলের সর্বমোট প্রায় ৮৫টি পদচিহ্ন পাওয়া গেছে যারা এই জায়গাটিকে চলার জন্য ব্যবহার করে জলের দিকে যাচ্ছিল। উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরে এই প্রথম আদিম মানুষের পায়ের ছাপ আবিষ্কৃত হল।

পায়ের ছাপে ধনুকের মত খিলান, গোলাকার গোড়ালি এবং কড়ি আঙ্গুলের দাগগুলি নিশ্চিত করে যে সেগুলি হোমো সেপিয়েন্স বা আমাদের মত আধুনিক মানুষের পদচিহ্ন। এখানে বিভিন্ন আকারের পায়ের ছাপ দেখে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে ওই দলটিতে প্রাপ্তবয়স্ক এবং বিভিন্ন বয়সের বাচ্চা ছিল। বিজ্ঞানীরা অবশ্য এখনও জানেন না যে দলটি ওই জায়গায় কী করছিল। তারা কি সমুদ্র থেকে খাবার সংগ্রহ করতে চেষ্টা করছিল? নাকি তারা শুধুমাত্র ওই জায়গা দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল আর দৈবাৎ তারা সমুদ্রতীরে উপস্থিত হয়েছিল?

এখন প্রশ্ন যে এতদিন ধরে এই পায়ের ছাপ টিকে আছে কী করে? সেদ্রাতির টীম নিজেরাই ওই অঞ্চলের পলিমাটি এবং পায়ের ছাপগুলি পরীক্ষা করে দেখেছে এগুলির বয়েস নির্ধারণের জন্য। অপটিক্যালি স্টিমুলেটেড লুমিনেসেন্স ডেটিং এমন একটি গবেষণা পদ্ধতি যা প্রত্নতাত্ত্বিকদের নির্ধারণ করতে সাহায্য করে যে আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তুগুলির আশপাশের খনিজ বা কার্বন শেষ কখন তাপ বা সূর্যালোকের সংস্পর্শে এসেছিল এবং তার থেকে তাঁরা অনুমান করতে পারেন যে ছাপগুলি কতদিনের পুরনো। তাঁদের অনুমান এগুলি লেট প্লাইস্টোসিন যুগের যে সময়ে শেষ তুষারযুগ ঘটেছিল। বিজ্ঞানীদের ব্যাপক বিশ্বাস যে মিডল থেকে লেট প্লাইস্টোসিন যুগে বা ৭,৭০,০০০ থেকে ১,২০,০০০ বছর পূর্বে প্রাচীন মানুষ পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করত যারা আধুনিক মানুষের থেকে আলাদা ছিল।

গবেষকরা একটি ড্রোনের সাহায্যে পায়ের চিহ্নগুলির ৪৬১টি ছবি তুলে একটি বিশেষ সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে ছবিগুলিকে প্রসেস করে প্রত্যেকটি ছবির ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করছেন যাতে ছাপগুলির অবতল ও প্রস্থের সঠিক পরিমাপ করে ওই পাঁচজনের বয়েস নির্ধারণ করা যায়।

গবেষকরা তাঁদের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন যে ‘লারাচে পদচিহ্নগুলি’ এতদিন টিকে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে যেমন ছাপগুলির অবস্থান, সেখানের মাটির ধরণ এবং সমুদ্রের ঢেউ। তাঁরা অনুমান করেছেন যে পাথুরে চাতালে সমুদ্র সৈকত হওয়ার ফলে জোয়ারের সময় পলিমাটিতে পায়ের ছাপগুলি চাপা পড়ে গিয়ে রক্ষা পেয়ে গিয়েছিল যতদিন না সাম্প্রতিক ভূমিক্ষয় সেগুলিকে আবার অনাবৃত করে দেয়। 

উত্তর আফ্রিকান সেদ্রাতির জন্য এই আবিষ্কারটি খুবই ব্যক্তিগত। তিনি বলেছেন - “এই আবিষ্কারটি যে গবেষক দলটি করেছে তাদের নেতৃত্ব দিতে পেরে আর সেটা আমার হৃদয়ের কাছাকাছি মরক্কো শহরে হওয়ার জন্য যে আমি কতটা গর্বিত সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারবেন না”। সঙ্গে তিনি এও জানিয়েছেন যে ভূতত্ত্বের মত অন্যান্য বিষয়ের সহকর্মীদের সঙ্গে কাজটি সম্পূর্ণ করতে তিনি ভীষণ আনন্দ পেয়েছেন। তবে তাঁদের কাজ এখনও বাকী আছে। ছাপগুলির শুধুমাত্র আংশিক প্রসেস করা হয়েছে এবং গবেষকদের অনেক প্রশ্ন আছে। সেদ্রাতি শুধিয়েছেন - “সেই সময়ের জলবায়ু এবং আবহাওয়া পরিস্থিতি কেমন ছিল? কোথায় ছিল উপকূলরেখা, সমুদ্রতল?” আদি মানবের এই বিরল চিহ্নের অবলুপ্তি আধুনিক মানুষকেই যে কোন মূল্যে রোধ করতে হবে।

(www.theoffnews.com ancient human footprints)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

অস্ট্রিয়ার গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অতি সম্প্রতি দাবি করা হয়েছে যে থেরেসা জাম্মিত লুপি, মাল্টার একজন বই সংরক্ষক, মানুষের জানা বইয়ের প্রাচীনতম একটি টুকরোর চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার করেছেন যার ফলে ইতিহাস নতুন করে লিখতে হতে পারে। প্যাপিরাস খণ্ডটি অস্ট্রিয়ার গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সংগ্রহের অংশ, যেখানে জাম্মিত লুপি কাজ করেন। খণ্ডটি মূলত ১৯০২ সালে মিশরের ফায়ুমের দক্ষিণে এল হিব্বার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে খননের সময় পাওয়া গিয়েছিল। সাম্প্রতিক কালের এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয় যে খণ্ডটি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর। তারা আরও জানিয়েছে বই আকারে সেলাইয়ের প্রমাণ সহ প্রাচীনতম কোডিস যার সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে ১৫০-২৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। গ্রাজ ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির স্পেশাল কালেকশনের প্রধান এরিখ রেনহার্ট এবং থমাস ক্যাসানাডি বলেছেন, "গ্রাজ মমি বইটি তার থেকেও ৪০০ বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল, তার ফলে এটি আমরা এখনও পর্যন্ত জানি এমন একটি বইয়ের সবচেয়ে পুরানো টিকে থাকা অংশ।" রেনহার্ট বলেছেন, "তবে, এটি অসম্ভাব্য নয় যে এই ধরনের আরও কোডেক্স টুকরো অন্যান্য সংগ্রহগুলিতে রয়ে গেছে যা এখনও পর্যন্ত সঠিকভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। সর্বোপরি, প্যাপিরাস তুলনামূলকভাবে সস্তা লেখার উপাদান ছিল এবং প্রচুর পরিমাণে ভগ্নাংশ টিকে আছে।"

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বুলেটিনে জাম্মিত লুপি বলেছেন যে এই আবিষ্কারটি করে তিনি কাল্পনিক দুর্বৃত্ত প্রত্নতাত্ত্বিক ইন্ডিয়ানা জোনসের মতো অনুভব করেছেন। "আমার কেরিয়ারে আমার সাথে এমন কিছু ঘটতে পারে আমি কল্পনাও করিনি এবং এরকম সুযোগ জীবনে সত্যিই একবারই আসে। আমি নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করি যে আমার চোখ এই টুকরোটির উপর পড়েছিল এবং আমার মনে হয় যেন আমি গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডিয়ানা জোনস।" 

কিন্তু ভেঙ্গে পড়া উপাসনা স্থলের করিডোর ভেদ করে বা চাবুকের রোমাঞ্চকর যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে, প্যাপাইরি টুকরোগুলির একটি গ্রুপের রুটিন মূল্যায়নের সময় জাম্মিত লুপির তীক্ষ্ণ নজর প্যাপাইরাস থেকে বেরিয়ে থাকা সুতোর ওপর পড়ে যেটা থেকে এই যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্ভব হয়।

“এই আবিষ্কারটি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। প্রথমে আমি একটি সুতোর টুকরো দেখেছি, তবেই আমি একটি বইয়ের বিন্যাস লক্ষ্য করেছি। আমি প্যাপিরাসে স্পষ্টভাবে দেওয়া মার্জিনের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ভাঁজ, সেলাইয়ের ছিদ্র এবং লিখিত পাঠ্য দেখেছি”, জাম্মিত লুপি বলেছেন। “একজন সংরক্ষক হিসাবে, বইটির ইতিহাসে অবদান রাখা খুব বিশেষ একটা অনুভূতি। একই সময়ে, আপনি মনে করেন এটি পরাবাস্তব। এটা একটা সিনেমা দেখার মতো।”

ব্রিটিশ ইজিপ্টোলজিস্ট গ্রেনফেল এবং হান্ট নেক্রোপলিস খনন করেছিলেন। এর খরচ আংশিক ভাবে গ্রাজ শহর বহন করেছিল এবং ১৯০৪ সালে খননে তাদের আর্থিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে টুকরোগুলি উপহার দেওয়া হয়েছিল।  জাম্মিত লুপির মতে, টুকরোটির প্রথম ব্যবহার ছিল একটি নোটবুকের, যেখানে বিয়ার এবং তেলের কর আরোপের বর্ণনা দেওয়া পৃষ্ঠায় সুস্পষ্ট গ্রীক পাঠ্য ছিল। টুকরোটি পরে কার্টোনেজ হিসাবে ব্যবহার করার জন্য পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল এবং একটি মমি ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। 

জাম্মিত লুপি বলেছেন যে এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে সংরক্ষণকারীদের বই অধ্যয়নের ধরণকে বদলে দিতে পারে। "আমি মনে করি এটি এখন আরও সচেতনতা তৈরি করতে চলেছে, যখন আমরা টুকরো এবং বইগুলি দেখি, আমরা কেবল পাঠ্য এবং অলঙ্করণের দিকেই তাকাই না, কাঠামোর দিকেও তাকাই, এটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। যখন আমরা প্যাপিরি টুকরোগুলি দেখি, তখন যেটি গুরুত্বপূর্ণ তা হল লেআউট, পাঠ্যের অবস্থান এবং খণ্ডটি কীভাবে সাজানো হয়েছে, এটি একটি স্ক্রোল কিনা বা এটির একটি বইয়ের বিন্যাস, একটি কোডেক্স বিন্যাস আছে কিনা। তাই এটি সত্যিই বই সংরক্ষণের পদ্ধতির পরিবর্তন করে দিয়েছে।"

সূত্রঃ জেসিকা এরিনা/ টাইমস অফ মাল্টা/ জুন ২২, ২০২৩

(www.theoffnews.com oldest book Austria University of Graz The Graz Mummy Book zammit Lupi)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

অতি সম্প্রতি প্রাচীন কিছু ফুলের গুচ্ছ নমুনা বর্তমান মায়ানমারে আবিষ্কৃত হয়েছে যা নিখুঁতভাবে অ্যাম্বারে সংরক্ষিত ছিল। অ্যাম্বার বা তৈলস্ফটিক হল জীবাশ্মে পরিণত হওয়া গাছের রজন বা তেল। নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে এগুলি রঙ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য প্রশংসিত হয়ে আসছে। যেহেতু এটি একটি নরম ও আঠালো অবস্থায় গাছের রজন হিসেবে উদ্ভূত হয় সেইজন্য অ্যাম্বারের আঠায় (যা বহু বছর পর জীবাশ্ম হয়) মাঝে মাঝেই প্রাণী, কীটপতঙ্গ এবং গাছে বিভিন্ন অংশ আবৃত থাকে। ফুলগুলির বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে ওই গবেষণা থেকে জানা গেছে যে এই ফুলগাছগুলি প্রায় ১০ কোটি বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। 

সাধারণত ফুলের কোমল প্রকৃতির কারণে প্রাচীন ফুলের নমুনা পাওয়া দুষ্কর। পূর্ণতা পাওয়ার পর ফুল ফলে পরিণত হয় এবং তারপর প্রাকৃতিক কারণেই সেটির মৃত্যু হয়। পলকা গঠনের জন্য তারা প্রস্তরীভূত না হয়ে চিরতরে হারিয়ে যায় বা বিনষ্ট হয়। চার্লস ডারউইন সপুষ্পক উদ্ভিদের বিবর্তনকে প্রাকৃতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উদ্ভট ঘটনাগুলির মধ্যে একটি বলে মনে করেছিলেন এবং এটিকে “একটি জঘন্য রহস্য” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কবি একেই বলেছিলেন - “ফুল যে আসে দিনে দিনে, বিনা রেখার পথটি চিনে, এই যে ভুবন দিকে দিকে পুরায় কত সাধ।”

ইংল্যান্ডের ‘ওপেন য়ুনিভার্সিটি’র ‘স্কুল অফ এনভায়রনমেন্ট, আর্থ অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সায়েন্সেস’-এর একজন এমেরিটাস অধ্যাপক এবং এই গবেষণা পত্রের লেখক রবার্ট স্পাইসার বলেছেন - “পাতা সাধারণত ফুলের চেয়ে বেশি সংখ্যায় উৎপন্ন হয় এবং তারা অনেক বেশি শক্তপোক্ত হওয়ায় তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। একটি পাতার কার্যকরী জীবন শেষ হয়ে গেলে ‘যে অবস্থায় আছে’ সেভাবেই বাতিল হয়ে যায় কিন্তু একটি ফুল একটি ফলে রূপান্তরিত হয়, যা পরে খাওয়া হয় অথবা বীজ বিচ্ছুরণের প্রক্রিয়া হিসেবে কাছেপিঠে ছড়িয়ে পড়ে”। 

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে যে ফুলের বিবর্তন পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয় কারণ বিভিন্ন প্রজাতির পোকামাকড়, স্তন্যপায়ী প্রাণী, উভচর প্রাণী এবং পাখিদের মধ্যে বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করে এবং ভূভাগে একটা বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করে যাতে সমুদ্রের নীচের থেকে স্থলভাগে প্রাণী বৈচিত্র্যের প্রাচুর্য বহুগুণে বেশি চোখে পড়ে।

স্পাইসার আরও বলেছেন - “সপুষ্পক গাছগুলি অপুষ্পক গাছের তুলনায় অনেক দ্রুত বংশবিস্তার করে, ফুলেদের বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে, তাদের আরও জটিল প্রজনন পদ্ধতি আছে, যেমন প্রায়শই পরাগায়নকারীদের সঙ্গে ফুলেদের ঘনিষ্ট ‘সহযোগিতা’ লক্ষ করা যায়। এর ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণীর ‘পারস্পরিক সহবিবর্তন’কে বংশের পর বংশ ধরে চালিত করে ইকোসিস্টেমকে মজবুত করেছে।

গবেষকরা অশ্মীভূত একটি ফুলের নাম দিয়েছেন ‘ইওফিলিকা প্রিস্কাটেলাটা’ এবং অন্যটির ‘ফিলিকা পিলোবারমেনসিস’ যেটি বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার দেশীয় প্রজাতি। 

১০ কোটি বছরের প্রাচীন ফুল পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তনের প্রাচীন রহস্যের ওপর আলোকপাত করেছে। ডারউইন ১৪ কোটি ৫০ লক্ষ থেকে ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে ক্রিটেসিয়াস যুগে সপুষ্পক উদ্ভিদের অবর্ণনীয় উত্থানে স্তম্ভিত হয়েছিলেন। বিজ্ঞানীরা এখনও সপুষ্পক উদ্ভিদের  সঠিক উৎস নির্ধারণ করতে পারেননি কিন্তু স্পাইসার বলেছেন যে অ্যাম্বারে সংরক্ষিত এই ফুলগুলি অনেক নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে। নমুনাগুলিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ফিনবোসের মতো দাহ্য অঞ্চলের সমৃদ্ধ ফুলগুলির অনুরূপ গুণাবলী রয়েছে। ফিলিকা প্রজাতি এই এলাকার স্থানীয় গাছ আবার অ্যাম্বারে সংরক্ষিত আধপোড়া গাছপালাও পাওয়া গেছে। 

তিনি জানিয়েছেন - “এখানে রেজিনে আদি পর্বের এমন একটি ফুলের সমস্ত অংশ সংরক্ষিত হয়েছে যে সময়ে ফুলের গাছগুলো বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল এবং ঋতু অনুসারে শুকনো পরিবেশের অনুকূলে দুরন্ত অভিযোজন দেখায় যে পরিবেশে গাছগুলি ঘন ঘন দাবানলের সংস্পর্শে আসত”। স্পাইসার বুঝিয়ে বলেছেন - “যদি এই ধরণের আধ-শুকনো এলাকাগুলোতে প্রচুর সংখ্যায় প্রাচীন ফুল দাবানলের কবলে পড়ে তাহলেই এটা ব্যাখ্যা করা যায় যে কেন অ্যাঞ্জিওস্পার্ম বিবর্তনের প্রারম্ভিক পর্যায়গুলি জীবাশ্ম-রেকর্ডে এত কম পরিমাণে পাওয়া যায় - কারণ এই ধরণের আধ-শুকনো পরিবেশে সাধারণত ফসিল তৈরি হয় না।”

(www.theoffnews.com Amber Fossil flower Myanmar)

সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

সম্ভবত পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত গ্রীক সভ্যতার শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে আর ধ্বংস হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৭ অব্দে রোমান সাম্রাজ্যের উদয়ের সাথে সাথে। গ্রীসের প্রাচীন নাম ছিল ইউনান। আর এর রাজধানী ছিল আথেন্স। প্রাচীন গ্রীসের বৈশিষ্ট্য ছিল ‘পোলিস’ বা একটি নগর-রাষ্ট্র। এটিই গ্রীক রাজনৈতিক শাসনকে অনন্য করেছে। 

পোলিসে বাস করবার আগে, “গ্রীক অন্ধকার যুগ”-এ, গ্রীকরা সারা গ্রীস জুড়ে ছোট ছোট কৃষি-গ্রামে বাস করত। এই সব গ্রামের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে একটা শাসনতন্ত্রের উদ্ভব হতে শুরু করল। অধিবাসীরা একটা নগর চত্বর (যেখানে বাজার বসত) আর একটা যৌথ চত্বর গড়ে তুলল যেখান থেকে এক রকমের শাসন ব্যবস্থা আর এক ধরণের সংবিধানের (এক গুচ্ছ আইন) উদ্ভব হলো। এই আইনগুলি নগর (‘পোলিস’) গঠনে সাহায্য করল। যেখানে নাগরিকদের ভোটদানের আর সরকার নির্বাচন করার অধিকার ছিল যে সরকার কর সংগ্রহ করত আর একটা সৈন্যদল গঠন করে রক্ষণাবেক্ষণ করত। এটা স্পষ্ট যে গ্রীসে সে সময়েই আধুনিক গণতন্ত্রের প্রচলন ছিল এবং ‘পলিটিক্স’, ‘ডেমোক্রেসি’, ‘সিটিজেন’ প্রভৃতি শব্দগুলির উৎপত্তি সেখানেই। গ্রীকদের দেবতাদের দেবতা ছিলেন জিউস আর তারা এটাও বিশ্বাস করত যে প্রত্যেকটি ‘পোলিস’-এর রক্ষাকর্তা বা রক্ষাকর্ত্রী ছিলেন নির্দিষ্ট দেব বা দেবী, যাদেরকে তারা প্রভূত শ্রদ্ধা ভক্তি করত। ‘পোলিস’-এ জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর পরিমাণে লোক বাস্তু ত্যাগ করতে শুরু করে। নাগরিকবৃন্দ (প্রধানত পুরুষরা) তাদের নিজের ‘পোলিস’ ত্যাগ করে নিকটবর্তী দেশ দখল করতে থাকে বসতি স্থাপন বা কৃষি কাজের জন্য। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ থেকে ৬০০ অব্দের মধ্যে এশিয়া মাইনর, উত্তর আফ্রিকা আর কৃষ্ণ সাগরের উপকূল রেখা বরাবর ছোট ছোট গ্রীক উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল।

আধুনিক যুগের অলিম্পিক গেমস্‌-এর আদি সূচনা হয়েছিল গ্রীসে। খ্রিস্টপূর্ব ৭৭৬ অব্দে প্রথম অলিম্পিক গেমস্‌ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রচলিত একটি মিথ অনুযায়ী অলিম্পিক গেমস্‌-এর সূচনা করেন গ্রীক বীর হারকিউলিস যিনি অলিম্পিয়াতে একটি অলিভ ট্রি (জলপাই গাছ) রোপণ করেন, আবার একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী রাজা ঈনমওস-কে মহানায়ক পোলিস পরাজিত করার পর অলিম্পিক খেলার আয়োজন করেন। কিন্তু অলিম্পিক গেমস্‌ যেভাবেই বা যে কারণেই শুরু হোক না কেন, গ্রীক সভ্যতার মূল কেন্দ্রীয় বন্ধন শক্তি ছিল এই অলিম্পিক গেমস্‌। অলিম্পিকের সময় প্রতিটি পোলিস বা নগর-রাষ্ট্র তাদের সেরা খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ করতে পাঠাত। তারা সবাই নির্দিষ্ট জায়গায় একত্রিত হতো আর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করত। পোলিসগুলির মধ্যে এর ফলে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রভূত যোগাযোগ বাড়ত।

গ্রীসের মাটি চাষযোগ্য ছিল না। ফলে গ্রীক নাগরিকদেরকে দেশের বাইরে চাষাবাদের জন্য জমি ও বসবাসের জন্য জায়গার বন্দোবস্ত করতে যেতে হতো। খাদ্যশস্য ফলানোর থেকে অর্থকরী ফসল উৎপাদনের দিকে গ্রীকদের বেশী নজর ছিল – যেমন তেলের জন্য অলিভ, মদিরার জন্য আঙুর ইত্যাদি। খাদ্যশস্য আমদানি করা হতো মধ্য প্রাচ্য, সিসিলি আর উত্তর আফ্রিকা থেকে।

গ্রীসের জনগণের জীবিকা নির্বাহ হতো প্রতিদিন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করে বা বিনিময় করে। অন্যান্য সভ্যতার চাইতে গ্রীক সভ্যতা খুব বেশি রকম বাজার-অর্থনীতি নির্ভর ছিল। অধিকাংশ গ্রীসবাসী ছিল যাযাবর জেলে যারা ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি মাছ ধরে বেড়াত আর অন্যরা মাটির বাসনপত্র বানাত আর বাকীরা বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকত। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, জেলের দল আর চাষীরা তাদের জিনিসপত্র স্থানীয় বাজারে বিক্রি করত।

অন্যদিকে, গ্রীক সংস্কৃতি বৈচিত্র্যে ভরপুর। গ্রীস দেশে হস্তশিল্প, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, মৃৎশিল্প প্রভৃতি শিল্পকলা উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছেছিল। এইসব শিল্পের ওপর ধর্মের প্রভাব ছিল অপরিসীম সেজন্যেই আমরা যত অপরূপ মন্দির আর ভাস্কর্য দেখি, সবই দেব দেবীদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জ্ঞান ও যুদ্ধবিগ্রহের দেবী এবং অ্যাথেন্স নগরের রক্ষাকর্ত্রী অ্যাথিনার মন্দির পার্থেনন, অ্যাথিনা ও পসিডনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাচীন মন্দির অ্যারাকথিয়ন এবং অ্যাপোলো, জিউস ও আরও অনেক দেবদেবীর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখতে পাওয়া যায়। 

সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের মতামত ছিল সমাজে অগ্রগণ্য। মহাকবি হোমার রচনা করেছিলেন ইলিয়াড ও ওডিসি, যেগুলি পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে বহুল ভাবে প্রভাবিত করেছিল। গণিতবিদ পুথাগোরাস আবিষ্কার করেছিলেন ‘পুথাগোরাস থিয়োরেম’। সক্রেটিস তাঁর “সক্রেটিক মেথড” বইয়ের মাধ্যমে পাশ্চাত্য পদ্ধতির যুক্তিবিজ্ঞান ও দর্শনের প্রবর্তন করেন। তিনি তাঁর মতবাদকে তাঁর মৃত্যুর থেকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে শাসকের দেওয়া হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুবরণ করেন। প্লেটো লিখলেন “রিপাবলিক” যেটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রাজনৈতিক এবং নৈতিক নির্দেশনার  সর্বকালের সর্বসেরা আকর গ্রন্থ। অ্যারিস্টটল-কে মোটের ওপর একজন বিজ্ঞানী বলা যায়। তিনি তাঁর গুরু প্লেটোর প্রবর্তিত ‘থিয়োরি অভ ফর্মস্‌’ নাকচ করে দিয়েছিলেন। তিনিই মানব জ্ঞানকে অঙ্ক, জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যা এবং নীতিশাস্ত্র প্রভৃতি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছিলেন। আলেকজান্দার দ্য গ্রেট-র তিনি গৃহশিক্ষক ছিলেন। 

গ্রীক সভ্যতার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের আজকের আধুনিক সমাজের পত্তন। 

(www.theoffnews.com  Greece civilization)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

যদিও এতে কোনও সন্দেহ নেই যে অনেক মেসোজোয়িক স্তন্যপায়ী জীব খাবার হয়ে উঠেছিল ডাইনোসরের, তবুও এটা জেনে অবাক হতে হয় যে কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীও ডাইনোসরকেই খাদ্যে পরিণত করেছিল।                                                  সম্প্রতি একদল গবেষক দাবি করেছেন যে উত্তর-পূর্ব চীনে একটি চমকে দেওয়া জীবাশ্মের সন্ধান পাওয়া গেছে যাতে প্রায় ১২৫ মিলিয়ন বছর আগে একটি খেঁকুড়ে ভামের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণী একটি তৃণভোজী ডাইনোসরের ওপরে উঠে তাকে আক্রমণ করে তার পাঁজরে দাঁত ঢুকিয়ে দিয়েছে।

কার্বন ডেটিং-এ প্রমাণিত যে ফসিলটি ক্রিটাসিয়াস যুগের এবং চার পায়ের স্তন্যপায়ী প্রাণীটি রেপেনোমামাস রোবস্টাস - একটি গৃহপালিত বিড়ালের সাইজের - হিংস্রভাবে কামড়ে ধরেছে দুই পায়ের চঞ্চুওলা ডাইনোসর সিটাকোসরাস লুজিয়াটুনেসিসকে যা একটি মাঝারি আকারের কুকুরের মতো বড়। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস যে তারা মারণ যুদ্ধের সময় হঠাৎ একটি আগ্নেয়গিরির কাদার স্রোতে ডুবে গিয়েছিল এবং জ্যান্ত কবরস্থ হয়েছিল।

"ডাইনোসররা প্রায় সবসময়ই তাদের স্তন্যপায়ী সমসাময়িকদের চেয়ে আকারে বড় ছিল, তাই চালু ধারণা ছিল যে তাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া একতরফা ছিল - বড় ডাইনোসররা সর্বদা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খেয়েছিল," বলেছেন অটোয়ার কানাডিয়ান মিউজিয়াম অফ নেচারের প্যালিওবায়োলজিস্ট জর্ডান ম্যালন, যিনি সায়েন্টিফিক রিপোর্টস্‌ জার্নালে গবেষণালব্ধ তথ্য প্রকাশে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

"এটি একটি দারুণ প্রমাণ যে একটি ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী একটি বৃহত্তর ডাইনোসরকে শিকার করছে, যা এই জীবাশ্ম ছাড়া আমরা অনুমান করতে পারতাম না," ম্যালন যোগ করেছেন।

মেসোজোয়িক যুগে, যা ডাইনোসরের যুগ বলে পরিচিত, বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীরা জীবনের বৃহত্তর নাট্যমঞ্চে চতুর কুশীলব ছিল, অন্য কারও মধ্যাহ্নভোজন হওয়া থেকে নিজেদেরকে ভালই এড়াতে পারত। রেপেনোমামাস দেখায় অন্তত কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন পেয়েছে তেমনিই ভালো জবাব দিয়েছে।

ম্যালন বলেন, "আমি মনে করি এখানে আসল কথা হল মেসোজোয়িক যুগে খাদ্য শৃংখলগুলি আমাদের যা মনে করেছিলাম তার চেয়ে ঢের জটিল ছিল।"

লিয়াওনিং প্রদেশের যে অঞ্চলে কার্যত সম্পূর্ণ জীবাশ্ম পাওয়া গেছে তাকে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সমাহিত প্রাণীর বিভিন্ন জীবাশ্মের কারণে "চীনা পম্পেই" বলা হয়।

জীবাশ্মটি পরীক্ষা করা একটি অপরাধ দৃশ্য বিশ্লেষণের মত ছিল। রেপেনোমামাস বৃহত্তর আকারের সিটাকোসরাসের পিঠে উঠে, পাঁজরের মধ্যে কামড়ানোর সময় চোয়াল এবং পিছনের পা আঁকড়ে ধরে আছে। রেপেনোমামাস ১-১/২ ফুট (৪৭ সেমি) লম্বা। সিটাকোসরাস ৪ ফুট (১২০ সেমি) লম্বা। দুজনেই পুরোপুরি পূর্ণ বয়স্ক নয় বলে মনে করা হয়।

কানাডিয়ান মিউজিয়াম অফ নেচার প্যালিওন্টোলজিস্ট এবং অধ্যয়নের সহ-লেখক জিয়াও-চুন উ বলেছেন, "এর আগেও মাংসাশী ডাইনোসরের নমুনা পাওয়া গেছে যা উদ্ভিদ-ভোজী ডাইনোসরদের শিকার করেছে, তবে স্তন্যপায়ী প্রাণীর ডাইনোসর শিকারের উদাহরণ কখনও পাওয়া যায়নি।"

প্রাণীদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখায় এমন জীবাশ্ম পাওয়া বিরল ঘটনা। মঙ্গোলিয়ায় ১৯৭০ এর দশকে পাওয়া আরেকটি জীবাশ্ম দেখায় যে দুটি ডাইনোসর - শিকারী ভেলোসিরাপ্টর এবং উদ্ভিদ-খাদক প্রোটোসেরাটপস - প্রায় ৮০ মিলিয়ন বছর আগে জীবিত কবর দেওয়ার আগে লড়াই করেছিল, সম্ভবত একটি ধসে পড়া বালির টিলায়।

গবেষকরা এই ভাবনাকে প্রশয় দেননি যে রেপেনোমামাস এবং সিটাকোসরাস জীবাশ্ম দেখাচ্ছে যে একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী কেবলমাত্র একটি মড়াকে সাফ করছিল।

"প্রথমতঃ, স্তন্যপায়ী প্রাণীটি ডাইনোসরের উপরে রয়েছে যেন এটি এটিকে বশীভূত করার চেষ্টা করছে, যা স্ক্যাভেঞ্জিং হাইপোথিসিস-এর মানানসই নয়," ম্যালন বলেছিলেন।

“দ্বিতীয়ত, ডাইনোসরের হাড়ে কোনও কামড়ের চিহ্ন নেই, যা আমরা আশা করতাম যদি এটি দীর্ঘক্ষণ বসে থাকত, মৃতভোজীদের সংস্পর্শে থাকত। আর শেষ কথা হল, স্তন্যপায়ী প্রাণীর পিছনের পা ডাইনোসরের ভাঁজ করা পিছনের পা দ্বারা আটকা পড়ে, যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই যদি ডাইনোসরটি ইতিমধ্যেই মারা যেত যখন স্তন্যপায়ী প্রাণীটি এটিকে খুঁজে পেত,” ম্যালন যোগ করেছেন।

যদিও সিটাকোসরাস প্রজাতি শিংওয়ালা ডাইনোসর বংশের প্রাচীন জ্ঞাতি ছিল, কিন্তু তার মুখের শিং এবং মাথার ক্রেস্ট ছিল না। গাছ খাওয়ার জন্য এটির টিয়াপাখির মতো ঠোঁট ছিল।

রেপেনোমামাস, ডাইনোসর যুগের অন্যতম বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণীর হাত-পা ছিল ছোট এবং ছড়ানো, একটি লম্বা লেজ, একটি পাতলা শরীর, একটি মজবুত মাথার খুলি এবং কাটা কাটা তীক্ষ্ণ দাঁত ছিল। ম্যালন এর চেহারাকে বর্তমানের চীনা ফেরেট-ব্যাজারের সাথে তুলনা করেছেন।

রেপেনোমামাসের ডাইনোসর খাওয়ার অভ্যাসের পূর্বে প্রমাণ ছিল। একই এলাকার একটি রেপেনোমামাস জীবাশ্মের পেটে পিসিটাকোসরাসের হাড় ছিল।

ম্যালন বলেন, "আমাদের (প্রাপ্ত এই) জীবাশ্মটির স্বতন্ত্রতা হল এটি প্রমাণ করে যে রেপেনোমামাস বড় আকারের ডাইনোসর শিকারকে মোকাবিলা করতে সক্ষম ছিল।"

(www.theoffnews. com dinosaur)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

পাখির ভাষা মানে তো পাখির ডাক। এই ভাষাতে কি মানুষ নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারে? 

তুরস্কের কুসকয় গ্রামে কিন্তু পাখির ভাষাতেই এখনও কথা বলেন মানুষজন। এ গ্রাম পাহাড়ের কোলে অবস্থিত। চারদিকে পাহাড়। তার ঢাল ধরে সবুজ বনানী। নীল আকাশের তলায় এই পাহাড়ের ঢালে গড়ে উঠেছে জনবসতি। এখানেই রয়েছে একটি অপূর্ব সুন্দর গ্রাম যেখানে মানুষকে পাহাড়ের ঢালেই ফসল ফলাতে হয়, অন্যান্য কাজ করতে হয়। বহু দূরে এ পাহাড়, ও পাহাড়ের ঢালে এ গ্রামের মানুষজন কাজে ব্যস্ত থাকেন। তখন যদি তাঁদের নিজেদের মধ্যে কথা বলার দরকার পড়ে তখন তাঁরা পাখির ডাকের মত শিস দিয়ে বার্তা পৌঁছে দেন। আর এভাবেই চলতে থাকে কথা। এ প্রান্ত থেকে শিস দিয়ে কিছু জানানোর পর তার উত্তরও আসে শিস দিয়ে। ঠিক যেমন করে পাখিরা কথা বলে। তাই এই গ্রামকে বলা হয় পাখির ডাকের গ্রাম। বলা হয় ৪০০ বছর ধরে এই গ্রামে বংশ পরম্পরায় চলে আসছে এই পাখির ডাকে কথা বলা। ঠিক কবে কে বা কেন এই পাখির ডাকের ভাষা তৈরি করেছিলেন তা পরিস্কার করে জানা নেই। তবে এই পাখির ডাকে কথা বলা এখানকার শিশুরা জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই রপ্ত করতে থাকে। পাহাড়ে বহু দূরে দূরে কাজ করা গ্রামবাসীরা নিজেদের মধ্যে প্রয়োজনীয় বার্তা আদান প্রদান করতে এই পাখির ডাকের শিস ব্যবহার করেন। যা স্পষ্ট শোনা যায় পাহাড় ঘেরা এই এলাকায়। ইউনেস্কো এই পাখির ডাকের ভাষাকে প্রাচীন সংস্কৃতি হিসাবে বিশেষ স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

(www.theoffnews.com Turkey Kuskoy whistling language)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি দল অতি সম্প্রতি তেলঙ্গানার মুলুগু জেলার এসএস তাদভাই মন্ডলের বান্দালা গ্রামের কাছে ওরাগুট্টায় একটি অনন্য লৌহ যুগের মেগালিথিক সাইট আবিষ্কার করেছে বলে জানিয়েছে।

হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক কেপি রাও এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কাদাপার আদিবাসী অধ্যুষিত জেলার বনাঞ্চলে যোগী ভেমানা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্রবীণ রাজুর নেতৃত্বে প্রত্নতাত্ত্বিকদের দলটি এই স্থানটি আবিষ্কার করেছে।

অধ্যাপক রাও, যিনি একজন সক্রিয় ক্ষেত্র-প্রত্নবিদ এবং যিনি প্রাচীন ইতিহাস, ফিল্ড আর্কিওলজি, প্রাগৈতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিষয়ের শিক্ষকতা করেন, বলেছেন যে পাহাড়ের ঘন জঙ্গল ও ঢালে স্মৃতিস্তম্ভের সঠিক সংখ্যা গণনা করা না গেলেও ২০০টিরও বেশি মেগালিথিক স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। 

প্রফেসর রাও আরও বলেছেন - “এখানে একটা খুব কৌতূহলোদ্দীপক নতুন ধরণের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, যা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। সাধারণত এই অঞ্চলে, আমরা 'ডলমেনয়েড সিস্ট' নামে পরিচিত এক ধরনের মেগালিথিক স্মৃতিস্তম্ভ খুঁজে পাই। এই অঞ্চলের বেশিরভাগ স্মৃতিস্তম্ভের বর্গাকৃতি বা আয়তক্ষেত্রাকার আকৃতি রয়েছে। কিন্তু এই প্রত্নস্থলটির (ওরাগুট্টা) অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মেগালিথিক স্মৃতিস্তম্ভের পাশের পাথরের খন্ডগুলি ক্যাপ-স্টোনের আকৃতি অনুসরণ করে পাথরের চাঙড় দিয়ে সাজানো হয়। তাই, ক্যাপ-স্টোনটি যেমন আকৃতির প্রতিটি 'ডলমেনয়েড সিস্ট'ও তেমনি একটি অনন্য আকৃতির। এই স্মৃতিস্তম্ভগুলি খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালের আশপাশে হতে পারে।”

অধ্যাপক রাও আরও বলেন, “ইউরোপে এই ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ প্যাসেজ চেম্বার নামে পরিচিত। সম্ভবত এই ধরণের স্মৃতিস্তম্ভগুলি আরও বিবর্তিত ধরণের বর্গাকার এবং আয়তক্ষেত্রাকার স্মৃতিস্তম্ভের জন্ম দিয়েছে।"

দলটি ভদ্রদ্রি কোথাগুডেম জেলার গুন্ডালা মন্ডলের দামরাতোগুতে দুটি নতুন রক আর্ট সাইটও আবিষ্কার করেছে।

'দেবরলাবন্দ মুলা' নামে পরিচিত প্রথম সাইটটিতে শুধুমাত্র প্রাণীদের চিত্রাঙ্কন রয়েছে এবং কোনও মানুষ নেই। যেহেতু কোনও অস্ত্র বা গৃহপালিত প্রাণী দেখানো হয়নি, তাই বিশ্বাস করা হয় যে চিত্রগুলি মেসোলিথিক যুগের এবং ৮০০০-৩০০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়ের মধ্যে যে কোন সময়ের হতে পারে।

(www.theoffnews.com Telengana archaeological places)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক দুর্গাপুর:

রাশিয়ার বিখ্যাত ডেনিসোভা গুহায় পাওয়া একটি হরিণের দাঁতের লকেট বা দুল থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ প্রকাশ করেছে যে পুরোনো গয়নাটি ১৯,০০০ থেকে ২৫,০০০ বছর আগে একজন মহিলা গলায় বা কানে পরে ছিল। ওই মহিলার সঙ্গে সাইবেরিয়ায় আরও প্রাচীন কালে বসবাসকারী মানুষের একটি গ্রুপের প্রবল জেনেটিক সম্পর্ক ছিল।

প্রস্তর যুগের নিদর্শনগুলি থেকে আমরা প্রাচীন সমাজ সম্পর্কে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে পারি এবং প্রাগৈতিহাসিক সময়ে মানুষ কীভাবে বসবাস করত তা আমাদের বোঝার জন্য এই নিদর্শনগুলি অপরিহার্য। যদিও দুর্ভাগ্যবশত, এই নিদর্শনগুলি খুব কমই নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে সংযুক্ত করা যেতে পারে কারণ সুদূর অতীত থেকে প্রকৃত মানুষের অবশেষের পাশাপাশি এগুলি খুব কমই পাওয়া যায়।

এই বাধা অতিক্রম করার জন্য, গবেষকরা এখন কঙ্কালের নিদর্শনগুলি থেকে সেগুলির ক্ষতি না করে ডিএনএ বের করার একটি কৌশল তৈরি করেছেন। একটি নতুন গবেষণায় তাদের কাজের বর্ণনা করে, লেখক এলেনা এসেল ব্যাখ্যা করেছেন যে দাঁত বা হাড় থেকে তৈরি জিনিসগুলি পাথর থেকে তৈরি জিনিসগুলির চেয়ে বেশি ছিদ্রযুক্ত, এবং তাই প্রাচীন মানব দেহের তরলগুলিকে ধরে রাখার সম্ভাবনা বেশি।

অ-ধ্বংসাত্মক পদ্ধতিতে আইটেমগুলিকে সোডিয়াম ফসফেট বাফারে নিমজ্জিত করা হয় এবং ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করা হয়, যাতে ছিদ্রের মধ্যে আটকে থাকা ডিএনএ বেরিয়ে আসতে পারে। "কেউ বলতে পারে যে আমরা আমাদের পরিষ্কার পরীক্ষাগারের মধ্যে প্রাচীন শিল্পকর্মের জন্য একটি ওয়াশিং মেশিন তৈরি করেছি," গবেষণার লেখক এলেনা এসেল একটি বিবৃতিতে বলেছেন । "৯০°সে [১৯৪°ফা] তাপমাত্রায় আর্টিফ্যাক্টগুলি ধোয়ার মাধ্যমে, আমরা নিদর্শনগুলিকে অক্ষত রেখে ধোয়ার জল থেকে ডিএনএ বের করতে সক্ষম হই।"

গবেষকরা ২০১৯ সালে ডেনিসোভা গুহায় আবিষ্কৃত হরিণের দাঁতের লকেট থেকে জেনেটিক উপাদান পেতে তাঁদের এই কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। ডেনিসোভান নামে পরিচিত একটি প্রাচীন মানব প্রজাতির প্রমাণ রাখার জন্য বিখ্যাত ডেনিসোভা গুহাটি  নিয়ান্ডারথাল এবং আধুনিক মানুষের আবাসস্থল ছিল।

প্রাগৈতিহাসিক আইটেমটি তৈরি করা ওয়াপিটি হরিণ থেকে জেনেটিক উপাদান আহরণের পাশাপাশি, গবেষকরা সেই মানুষের চিহ্নও খুঁজে পেয়েছেন যিনি দুলটি তৈরি করেছিলেন, বা করিয়ে ছিলেন বা পরতেন। "দুল থেকে আমরা যে পরিমাণ মানব ডিএনএ উদ্ধার করেছি তা সাধারণত পাওয়া যায় না," বলেছেন এসেল। "আমরা যেন প্রায় একটি মানুষের দাঁতের নমুনা নিয়েছি।"

আর্টিফ্যাক্ট থেকে প্রাপ্ত মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ পরীক্ষা করে, গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে এই জেনেটিক উপাদানগুলির বেশিরভাগই একক ব্যক্তির অন্তর্গত। মানব এবং ওয়াপিটি জিনোমগুলি গবেষকদের ধ্বংসাত্মক রেডিওকার্বন ডেটিং ছাড়াই দুলটির বয়স অনুমান করার সু্যোগ দিয়েছে। তাদের ফলাফল অনুসারে, টুকরোটি ১৯,০০০ থেকে ২৫,০০০ বছর আগে তৈরি এবং ব্যবহার করা হয়েছিল।

দুল থেকে নিষ্কাশিত পারমাণবিক ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে প্রাচীন মালিকের আধুনিক দিনের নেটিভ আমেরিকানদের সাথে খুব বেশি পরিমাণে জেনেটিক মিল ছিল। অন্যান্য প্রাচীন জিনোমের সাথে এই উপাদানটির তুলনা করার সময়, গবেষকরা আবিষ্কার করেছিলেন যে দুল পরিধানকারীরা প্রাচীন উত্তর ইউরেশিয়ান নামক একটি প্রাগৈতিহাসিক মানবগোষ্ঠীর সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত ছিল। এই বংশের চিহ্নগুলি পূর্বে সাইবেরিয়ার আরও পূর্বের গুহাগুলিতে পাওয়া গেছে এবং এটি ১৭,০০০ থেকে ২৪,০০০ বছর আগের।

গবেষণা লেখক উপসংহারে বলেছেন - "সংক্ষেপে, আমাদের গবেষণা এটাই দেখায় করে যে হাড় বা দাঁত থেকে তৈরি প্রত্নবস্তুগুলি প্রাচীন মানব ডিএনএর একটি অব্যবহৃত উৎস যা আগে পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়নি এবং যা সুদূর অতীতে এই প্রত্নবস্তুগুলির কারিগর, বহনকারী বা পরিধানকারী ব্যক্তিদের বংশ এবং জৈবিক লিঙ্গ সম্পর্কে আলোক প্রদান করতে পারে।" গবেষণা পত্রটি নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে ।

সূত্র - সায়েন্স এলার্ট, কার্লি ক্যাসেল্লা, ৪ মে, ২০২৩

(www.theoffnews.com  stone age young lady pendant deer teeth)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

মিশরের শুষ্ক মরুবালুর মধ্যে শত শত বছর চাপা পড়ে থাকা একজন সন্ন্যাসীর বাড়ি পুনরায় প্রাকৃতিক কবর থেকে উঠে এল। বাড়ির মালিক অনেক আগেই চলে গেলেও তার লেখাগুলো  দেয়ালে রয়ে গেছে।

মিশরের পর্যটন ও পুরাকীর্তি মন্ত্রক সম্প্রতি একটি প্রেস রিলিজে জানিয়েছে যে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এল কুসিয়ায় মির নেক্রোপলিস কবরস্থান খনন করার সময় সন্ন্যাসীর বাড়ির এই ধ্বংসাবশেষটি আবিষ্কার করেছিলেন। 

বাড়িটিতে একটি বহিঃপ্রাঙ্গণ বা উঠোন ধরনের ঘর, বেশ কয়েকটি গুদাম ঘর এবং একটি ফায়ারপ্লেস ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বাড়ির দেয়ালে একটি কালো পেন্সিল ব্যবহার করে কপ্টিক ভাষায় লেখা প্রার্থনার আট লাইন খুঁজে পেয়েছেন যা প্রমাণ করে যে বাড়িটিতে একজন সন্ন্যাসী বাস করতেন।

বিজ্ঞপ্তিতে এও বলা হয়েছে যে ১৪০০ বছরের পুরানো ভবনের অন্যান্য স্থান সম্ভবত সন্ন্যাসীর ভোগ্যপণ্য এবং লিখিত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।

মিশরের পর্যটন ও পুরাকীর্তি মন্ত্রকের মতে, মিশরের বাইজেন্টাইন যুগ ৩৩০ থেকে ৬৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এবং কখনও কখনও কপ্টিক যুগ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন - এই যুগের প্রথম দিকে, মিশরীয় খ্রিস্টানরা, যারা প্রায়শই কপ্টিক গির্জার অন্তর্গত ছিল, তারা অন্যান্য ধর্মের মতো "সমান অধিকার" পাওয়ার আগে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হয়েছিল।

বিবৃতিটিতে বলা হয়েছে, প্রত্নতাত্ত্বিকরা মীর কবরস্থানে আরও কয়েকটি সমাধি খুঁজে পেয়েছেন। এই সমাধিগুলি খুব বাজেভাবে সংরক্ষিত ছিল।

(www.the.theoffnews.com Misor Saint house cemetery Byzantine era script)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

লোয়ার স্যাক্সনিতে অবস্থিত হোমো হাইডেলবার্গেনসিসের  জীবাশ্মকৃত পায়ের ছাপ এখনও পর্যন্ত জার্মানিতে আবিষ্কৃত প্রাচীনতম পায়ের ছাপ।

তিন লক্ষ বছরের পুরনো প্রত্নস্থলটিতে প্রাচীন মানুষের পায়ের ছাপগুলিকে ঘিরে রয়েছে অধুনালুপ্ত হাতি ও গণ্ডারের পদচিহ্ন।

শত সহস্র বছর আগে লোয়ার স্যাক্সনিতে জীবনযাত্রা কেমন ছিল তা বুঝতে একটি হ্রদের কাছে সদ্য আবিষ্কৃত এই পায়ের ছাপগুলি বিজ্ঞানীদের প্রভূত সাহায্য করবে।

জীবাশ্ম কাদায় পাওয়া নতুন আবিষ্কৃত পায়ের ছাপের বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের দৃঢ় বিশ্বাস যে তিন লক্ষ বছর আগে লোয়ার স্যাক্সনিতে, হোমো হাইডেলবার্গেনসিস  প্রজাতির মানুষরা একটি হ্রদের তীরে একটি অধুনা-বিলুপ্ত প্রজাতির হাতির (প্যালেওলোক্সোডন অ্যান্টিকাস ) পাশাপাশি ঘোরাফেরা করেছিল৷

এই ফসিলাইজড পদচিহ্নগুলি নিয়ে গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি কোয়াটার্নারি সায়েন্স রিভিউজ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে যেখানে প্রত্নবিজ্ঞানীরা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন যে কিভাবে একটি উন্মুক্ত বার্চ এবং পাইন বনে অবস্থিত একটি হ্রদের কর্দমাক্ত তীরে হাতি, গণ্ডার, এমনকি জলহস্তীর পাল এবং স্পষ্টত, অধুনালুপ্ত “হেইডেলবার্গ মানুষের একটি পরিবারের সদস্যরা”, স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করতো।

"তিন লক্ষ বছর আগে লোয়ার স্যাক্সনির শোনিনজেনে একটি সাধারণ দিনের জীবনযাপনের চিত্রটা এমনই দেখতে হতে পারে," টুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনকেনবার্গ সেন্টার ফর হিউম্যান ইভোলিউশন অ্যান্ড প্যালিওএনভায়রনমেন্টের ফেলো ফ্লাভিও আলতামুরা একটি প্রেস রিলিজে বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন যে - “এটাই প্রথমবার যে আমরা শোনিনজেনের দু'টি প্রত্নস্থল থেকে জীবাশ্ম পদচিহ্নগুলির একটি বিশদ পর্যালোচনা করেছি। ওই প্রত্নস্থল থেকে সমস্ত তথ্য এক জায়গায় জড়ো করে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলটি প্রাচীন যুগে বসবাসকারী প্রাণীদের সম্পর্কে এবং অধুনালুপ্ত মানব প্রজাতির জার্মানি থেকে প্রাপ্ত এখনও পর্যন্ত প্রাচীনতম পায়ের ছাপগুলি সম্বন্ধে অজানা পাথুরে ইতিহাস আবিষ্কার করেছেন৷

বিশেষজ্ঞ দলটি তিনজন মানুষের পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়েছে যা্রা তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী একটি পরিবারের সদস্য ছিল। মোট তিনটি ট্র্যাকের মধ্যে দুটি সম্ভবত যুবক যুবতীদের। "এই যুবা এবং শিশু এবং কিশোরদের পায়ের ছাপের উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে এটি সম্ভবত প্রাপ্তবয়স্ক শিকারীদের একটি দলের পরিবর্তে একটি পারিবারিক ভ্রমণ ছিল", সমীক্ষাটিতে এমনটাই দাবি করা হয়েছে।

আলতামুরা আরও বলেছেন - "কখন কি ঋতু তার উপর নির্ভর করে লেকের চারপাশে বিভিন্ন গাছপালা, ফল, পাতা, অঙ্কুর এবং মাশরুম পাওয়া যেত৷ আমরা যা জানতে পেরেছি তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে বিলুপ্ত মানব প্রজাতিগুলি হ্রদ অথবা অগভীর জলের নদীর তীরে বাস করত।"

একটি হ্রদের তীরে একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের এই তিন-ট্র্যাকের স্ন্যাপশট হোমো হাইডেলবার্গেনসিসের আচরণ এবং সামাজিক গঠন সম্পর্কে আরও অনেক অজানা তথ্য জানাতে পারবে। অন্যান্য প্রজাতিগুলি যেমন যেমন হাতি ও ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা যারা নিয়মিত হ্রদে আসত তাদের সঙ্গে হোমো হাইডেলবার্গেনসিসের  কি সম্পর্ক ছিল সে বিষয়েও আলোকপাত করতে পারবে।

মানুষের পায়ের ছাপ নিয়ে এতো বিজ্ঞানী মহলে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এতো আলোড়ন পড়ে গেছে যে এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটা চাপা পড়ে গেছে যে গবেষকরা এখানে অধুনাবিলুপ্ত খুরযুক্ত বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর পায়ের ছাপও খুঁজে পেয়েছেন। বিলুপ্তপ্রায় হাতির প্রজাতি Palaeoloxodon antiquus, তাদের সোজা দাঁত এবং ১৩ টন ওজনের জন্য সুপরিচিত, কোনও ভাবে মানব পরিবারের সঙ্গে মেলামেশা করেছে। এমনকি তাঁরা যে গন্ডারের ছাপগুলি খুঁজে পেয়েছেন তাও ছিল চমকপ্রদ - সম্ভবত দুটি প্লাইস্টোসিন প্রজাতির একটির পায়ের ছাপ (Stephanorhinus kirchbergensis বা Sephanohinus hemitoechus) - এবং ইউরোপে এটিই প্রথম পাওয়া গেল।

লোয়ার স্যাক্সনির হ্রদের তীরবর্তী প্রত্নস্থল থেকে প্রাপ্ত পায়ের ছাপ তিন লক্ষ বছর আগের মানব ও প্রাণীর মেলামেশা সম্পর্কে নতুন তথ্য জানিয়েছে। এবং সেই পায়ের ছাপ অনুযায়ী, এই মেলামেশা ছিল ‘ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি’।

(www.theoffnews.com oldest footprints human German archaeology)


সুকন্যা পাল, ম্যানেজিং এডিটর, দ্য অফনিউজ, কলকাতা:

শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব। বসকে চুমু দিয়ে দিনের কাজ শুরু হয় অফিসের মহিলা কর্মীদের...

অফিসের প্রধান বা বসকে সম্ভাষণ করতে হয় সবখানেই। সেটা হয়তো কুর্ণিশ বিনিময়, 'গুডমর্নিং' বা 'হাই' বলেও করা হয়। কিন্তু দিনের শুরুতে বসকে চুমু দিয়ে কাজ শুরু করার রেওয়াজ এই প্রথম শুনছেন বোধহয়!

হ্যাঁ। এমনটাই নিয়ম চীনের একটি সংস্থায়। সেখানে দিনের শুরুতে সব মহিলাদের বসকে চুমু দিয়ে কাজ শুরু করতে হয়। সেই চুমু আবার দায়সারা চুমু নয়। রীতিমত ওষ্ঠচুম্বন করতে হবে। প্রতিদিন সকাল ন'টার সময়ে।

বেজিংয়ের টোংঝোউ জেলার একটি হোম ব্রিউয়ারি মেশিন বিক্রেতা সংস্থায় এমন নিয়ম চালু করা আছে। সেখানে প্রতিদিন কাজের শুরুতে কোম্পানির প্রতিটি মহিলা কর্মচারী তাদের বস'কে একটি করে চুমু খাবেন। এবং সেটা ওষ্ঠচুম্বন।

জানা গেছে, কোম্পানির মালিক বিশ্বাস করেন, চুম্বনই একমাত্র ব্যাপার, যা মানুষে-মানুষে বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। তাই কর্পোরেট সংস্কৃতির অঙ্গ করে তোলা হয়েছে চুম্বনকে।

এই সংস্থায় মহিলা কর্মীদের সংখ্যাই বেশি। তাদের সবাই এই নিয়মকে ভাল দৃষ্টিতে নেননি। অনেকে  ক্ষুব্ধ হয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

(www.theoffnews.com kiss boss office China)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

কর্ণাটক রাজ্যের উড়ুপি জেলার উড়ুপি শহরে সম্প্রতি কিছু বিরল ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে যেগুলি বিশেষজ্ঞদের মতে হিন্দু দেবতা মাইলারেশ্বরের। দাক্ষিণাত্য এবং উপকূলীয় কর্ণাটক অঞ্চলে মাইলারেশ্বর সম্প্রদায়ের একসময় চরম বিকাশ ঘটেছিল। এই আবিষ্কারটি সেই ঐতিহাসিক গুরুত্বের ওপর নতুন আলোকপাত করেছে। 

প্রত্নতত্ত্বের অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক টি মুরুগেশি বলেছেন, "যদিও মাইলারেশ্বরকে উৎসর্গ করা একটি মন্দির কুন্দপুরে বর্তমান যেখানে তাঁকে একটি লিঙ্গের আকারে উপাসনা করা হয় এবং অতীতে ময়লারেশ্বরের উপাসনার শিলালৈখিক নিদর্শন পাওয়া গেছে কিন্তু সাম্প্রতিককালে উডুপি জেলায় মাইলারেশ্বরের একটি মূর্তি এবং এই ধরনের তাক্তির আবিষ্কার কর্ণাটকের উপকূলীয় অঞ্চলে এই প্রথম”।

মাইলারেশ্বর মহারাষ্ট্র এবং উত্তর কর্ণাটক অঞ্চলে খন্ডোবা নামে পরিচিত। মাইলারেশ্বর ভজনা একটি সুপ্রাচীন আধ্যাত্মিক ঘটনা, যা দাক্ষিণাত্য এবং উপকূলীয় কর্ণাটক জুড়ে প্রবল অনুরক্তির জন্ম দিয়েছিল। ভক্তির এই ধারা আমাদের বাসরুর কাছে নিয়ে যায় যেটি উদুপি জেলার কুন্দাপুরার কাছে অবস্থিত একটি শহরতলি যেখানে প্রাচীন ইতিহাস নতুন আবিষ্কারের সঙ্গে মিশে যায়। এখানেই উপকূলীয় অঞ্চলে ময়লারেশ্বর পূজার পাথুরে প্রমাণ পাওয়া গেছে। কয়েক মাস আগে আবিষ্কৃত একটি ক্ষুদ্রায়তন পাথরের ফলক ঘুমন্ত ইতিহাসকে জীবন্ত করেছে। এটিতে একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার ওপর মাইলারা এবং মাইলালাদেবীর রাজকীয় ভাবে বসার ভঙ্গীতে খোদাই করা আছে। তাদের দুজনের ডান হাতে তরবারি ধরা আছে। এই ১৭ শতকের নিদর্শনটি সে যুগের কারুশিল্প এবং ভক্তির একটি অকাট্য প্রমাণ এবং হালনাদের একটি পুকুরে পাওয়া গিয়েছিল যার মালিক দেবানন্দ শেট্টি এটি মুরুগেশীর কাছে নিয়ে এসেছিলেন।

বাসরু থেকে আরও একটি সাম্প্রতিক আবিষ্কার এই অনুসন্ধান পর্বকে আরও গভীর নিয়ে গেছে - একটি ক্ষতিগ্রস্ত অথচ অসাধারণ সুন্দর ১৫ শতকের ভাস্কর্য একটি কুয়ো থেকে উদ্ধার করা হয়েছে যেটিতে একজন রাজবেশে বীরপুরুষকে ঘোড়ায় চড়া অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। রাজপুরুষের ডান হাতে একটি তলোয়ার আর বাঁ হাতে একটি বাটি - মূর্তিটি থেকে ক্ষমতা এবং গভীরতা - দুইই বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তবে ঘোড়ার পিঠে বসে নেই মৈলালাদেবী। ঘোড়াটির বসা ভঙ্গি ভাস্কর্যটিকে আরও অনন্য করে তুলেছে। মুরুগেশী বলেছেন - “সম্ভবত প্রাচীন যুগে এই মূর্তিটি মন্দিরে পুজো করা হত”। 

মধ্যযুগীয় ইতিহাসে বাসরু নগরী ছিল একটি ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র, যেখানে ‘উহায়াদেশী’ এবং ‘নানাদেশী’র মতো বিভিন্ন বাণিজ্য সঙ্ঘের নিয়ন্ত্রণে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলেছিল যেখানে বিভিন্ন ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল।

(www.theoffnews.com Udupi archeology)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:             

ফরাসিরা বলেন - “আতেন লু ক্যুরর পা এস্তোমা” বা হৃদয়ে পৌঁছবার সহজতম রাস্তা উদর দিয়ে। সিন্ধু সভ্যতার লিপির পাঠোদ্ধার এখনও অজানা, ফলে সিন্ধু সভ্যতা একটা প্রহেলিকা। হরপ্পার আদি বাসিন্দাদের অনেক তথ্যই আমাদের অজানা। কিন্তু তাদের খাদ্যাভ্যাস জানার জন্য বিজ্ঞানীরা হরপ্পার প্রাগৈতিহাসিক মাটির বাসনকোসনে লেগে থাকা এঁটোকাঁটার দিকে সম্প্রতি নজর দিয়েছেন। 

 অসংখ্য ভেষজ এবং মশলার মিশ্রণে দক্ষিণ এশিয়ায় যে বৈশিষ্ট্যমূলক রান্না বহুযুগ ধরে প্রচলিত তা বিচিত্র স্বাদ ও গন্ধের জন্য জগৎবিখ্যাত। আমাদের রান্নার প্রক্রিয়া, সেটা যে প্রদেশেরই হোক না কেন, বেশ জটিল। ভেষজ এবং মশলায় সমৃদ্ধ আমাদের প্রত্যেকের রান্নাঘরই তার প্রমাণ।

স্পেনের ‘স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল’ ও ‘ইনস্টিটিউশন মিলা ওয়াই ফন্টানেলে’র (IMF-CSIC) অন্যতম প্রত্ন-উদ্ভিদবিদ ডক্টর জুয়ানজো গার্সিয়া-গ্র্যানেরো বলেছেন - “আমরা কী খাবার খাই এবং কীভাবে রান্না করি তা আমাদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নিরূপণ করে”। 

গবেষণার কাজে গার্সিয়া-গ্রানেরো এই ধরণের গুপ্ত ঐতিহ্যের সন্ধানে বিশ্বের কয়েকটি প্রাচীনতম সভ্যতার প্রাচীন রান্নাশালে উঁকি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন - “প্রাগৈতিহাসিক খাদ্যপথগুলি (খাদ্যপথ হল মানুষ, অঞ্চল বা ঐতিহাসিক সময়ের খাদ্যাভ্যাস এবং রন্ধনপ্রণালী) অন্বেষণ করলে আমরা প্রাচীন সভ্যতার রীতি রেওয়াজ বুঝতে পারি এবং সেগুলি এখনও টিকে আছে কিনা ধারণা করতে পারি”। 

অন্বেষণের এই অদম্য আগ্রহই গার্সিয়া-গ্রানেরোকে আধুনিক গুজরাটের তিনটি প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নস্থান, দাত্রানা, লোটেশ্বর এবং শিকারপুরে আকর্ষিত করেছিল যাতে অন্তত চার-পাঁচ হাজার বছরের পুরনো হাড়িকুঁড়ির টুকরোগুলিকে গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি টীমকে সঙ্গে নিয়ে গার্সিয়া-গ্রানেরো প্রাচীন বাসনপত্রে খাবারের অবশেষগুলি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যাতে হরপ্পার লোকেরা সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে কী খেত আর কীভাবে রান্না করতো তা সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা হয়। প্রারম্ভিক গবেষণার ফলাফল ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন জার্নাল’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে সিন্ধু উপত্যকার আদি বাসিন্দারা অনেক রকম জটিল প্রক্রিয়ায় খাবার তৈরি করত। গার্সিয়া-গ্রানেরো জানিয়েছেন - “আমরা দেখেছি যে সমস্ত উপাদানগুলি মাটির হাড়িকুঁড়িতে তৈরি এবং/অথবা খাওয়া হয়নি। বিভিন্ন উপাদানগুলি বিভিন্ন রান্নাবান্নার প্রক্রিয়ায় অনেক রকম পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়েছিল - কিছু জিনিসকে ভাজা বা গুঁড়ো করা হতো আবার অন্যগুলো অনেকরকম খাবারের অংশ ছিল”। 

গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে শুয়োর, পাখি বা খরগোশের মতন সর্বভুক প্রাণীর চর্বির সঙ্গে বাজরা, ডাল, গম, বার্লি এবং আদা ওই মাটির পাত্রগুলিতে রান্না করা হয়েছিল। কিন্তু এই পাত্রগুলিতে ডেয়ারি বা মাছের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি - এটা খুব আশ্চর্যজনক আবিষ্কার কারণ মাছ ধরা এবং গবাদি পশুপালন এই অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চালু ছিল বলে আগে সবার ধারণা ছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালবিয়ন কলেজের নৃতাত্ত্বিক-প্রত্নতত্ত্ববিদ ব্র্যাড চেজ, যিনি সিন্ধু সভ্যতা সমেত অনেক প্রাগৈতিহাসিক সমাজ গবেষণা করেছেন কিন্তু এই প্রকল্পে জড়িত ছিলেন না, বলেছেন - “সত্যি বলতে কি এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ কারণ ফলাফলগুলি খানিকটা বিভ্রান্তিকর। একদম মৌলিক স্তরে, এই গবেষণাটি ভারতবর্ষের রন্ধনপ্রণালীর ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে”।

খাদ্যের অবশিষ্টাংশ বিশ্লেষণ

গত কয়েক দশক ধরে প্রত্নতাত্ত্বিকরা গবেষণা করে দেখছেন যে সিন্ধু উপত্যকার আদি বাসিন্দারা কীভাবে গম, যব, বাজরা, চাল, ছোলা, মটর ডাল এবং কুলত্থ কলাইয়ের মত খাদ্যশস্য এবং ডাল ব্যবহার করত। তাঁরা গবাদি পশু, মোষ, ভেড়া, ছাগল, জংলী হরিণ, নীলগাই এবং মিষ্টি জলের এবং সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদি প্রাণীজ খাবার নিয়েও চর্চা করেছেন। স্পেনের ‘ইউনিভার্সিটাট পম্পিউ ফ্যাব্রা’-র একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং এই গবেষণা পত্রের একজ সহ-লেখক, অক্ষেতা সূর্যনারায়ণ বলেছেন - “যে বিষয়টি এখনও কম চর্চিত সেটি হল এই উপাদানগুলি কিভাবে খাবারে বা রন্ধনপ্রণালীতে এসে হাজির হয়েছিল”।

গবেষকরা তিনটি প্রত্নস্থান থেকে খননে প্রাপ্ত বিভিন্ন পাত্র, ফুলদানি, কটোরা এবং বয়াম সমেত মোট ২৮টি চীনামাটির পাত্র বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। এরমধ্যে ১১টি ছিল শিকারপুরের ব্রোঞ্জ যুগের অবিসংবাদী হরপ্পার মৃৎপাত্র এবং ১৭টি ছিল দাত্রানা ও লোটেশ্বরের তাম্র যুগের আধা-যাযাবর ও পশুপালকদের বানানো মৃৎপাত্র। 

গবেষকরা মৃৎপাত্রের নমুনাগুলির ছোট ছোট টুকরো নিয়েছিল, তারপর সেগুলো পরিষ্কার করে, মিহি ভাবে গুঁড়ো করে এবং “অবশিষ্ট” হিসেবে পড়ে থাকা লিপিড (চর্বি অণু) নিষ্কাশন করেন। অক্ষেতা বুঝিয়ে বলেছেন - “মৃৎপাত্রগুলি বহুরন্ধ্র, তাই তাদের মধ্যে যে খাবারগুলি ঢেলে রাখা হত সেগুলির খানিকটা পাত্রে শোষিত হত এবং কালক্রমে মাইক্রোবিয়াল ক্ষয় থেকে অনেকাংশে সুরক্ষিত ছিল”।

একবার লিপিড বার করা হয়ে গেলে গবেষকরা ‘মাস স্পেক্ট্রোস্কোপি’ ব্যবহার করে এগুলির মধ্যে উপস্থিত বিভিন্ন ধরণের অণু চিহ্নিত করেন। অক্ষেতা বলেছেন - “এইভাবে আমরা আধুনিক গাছপালা এবং প্রাণীদের সঙ্গে যা পাই তা তুলনা করতে পারি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক পাত্রে পণ্যের ধরন সম্পর্কে অনুমান করতে পারি”। 

এরপরে গবেষকরা একটি মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে মৃৎপাত্রের টুকরোগুলিকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখেন যাতে শস্য, বীজ, ফল, কন্দ ইত্যাদির মত ভোজ্য উদ্ভিদের অংশে পাওয়া স্টার্চ দানার উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। সিন্ধু উপত্যকার আদি বাসিন্দাদের খাদ্যাভাসের রীতি নির্ধারণ করতে এই গবেষণাটিতেই সর্বপ্রথম দুটি পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। 

বিভিন্ন রন্ধনপ্রণালীর ব্যবহার

গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায় তাম্র এবং ব্রোঞ্জ যুগে প্রায় ২০০০ বছরের ব্যবধানে সিন্ধু সভ্যতার লোকেরা একইরকমভাবে উদ্ভিজ্জ এবং প্রাণীজ উপাদান প্রক্রিয়াজাত এবং রন্ধন করেছিল। তারা বিভিন্ন শস্য এবং ডালের চাষ করত, সংগ্রহ করত এবং ক্রয় করত, কিছু অন্যান্য জায়গা থেকেও আমদানি করত। যেমন, দাত্রানাতে ৯৯% পাত্রে গম এবং যবের পরিবারের অন্তর্গত স্টার্চ দানার উপস্থিতি দেখা গেছে। 

অবশ্য এই উদ্ভিদগুলি গুজরাতে জন্মাত না, ফলে বোঝাই যায় যে এগুলিকে অন্য জায়গা থেকে আনা হয়েছিল। এই তিনটি প্রত্নস্থানেই, বাজরার ছোট ছোট দানাকে জাঁতাতে পেষাই করা হত আর ডাল শস্যকে সাধারণত রান্না করা হত। একটি আকর্ষণীয় তথ্য হল, গবেষকরা হাঁড়িকুঁড়িতে আদার চিহ্নও খুঁজে পেয়েছেন, যা বোধহয় প্রথমে থেঁতলে নিয়ে তারপর রান্না করা হয়েছে।

হাঁড়িকুঁড়িতে পাওয়া লিপিডের রাসায়নিক বিশ্লেষণে ক্ষয়িত প্রাণীজ চর্বি পাওয়া গেছে - সম্ভবত শুয়োর থেকে - যা এই অঞ্চলে চাষ করার কথা জানাও ছিল না। শুধুমাত্র কয়েকটি পাত্রে গবাদি পশু বা মোষের মত প্রাণীর চর্বি পাওয়া গেছে।

যদিও অন্যান্য গবেষণায় তামা ও ব্রোঞ্জ যুগে রোমন্থনকারী পশুদের ব্যাপকভাবে লালনপালনের প্রমাণ পাওয়া গেছে কিন্তু গবেষকরা মনে করেন যে তাদের মাংস অন্য ধরনের পাত্রে রান্না করা হত যা এখনও বিশ্লেষিত হয়নি। এই একই মন্তব্য দুধ এবং মাছের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কারণ এগুলি এই অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত বলে জানা যায় কিন্তু বিশ্লেষণে পাত্রগুলিতে এগুলির কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

গার্সিয়া-গ্র্যানেরো আরও বলেছেন - “এটি এবং একই ধরণের যে গবেষণাগুলি সম্প্রতি সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নস্থলগুলিতে করা হয়েছে সেগুলি থেকে আমরা জানতে পারি যে এই জায়গার বাসিন্দারা কীভাবে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যকে রান্না করতো এবং কোনও খাবারগুলি বেশি পছন্দ করতো। এর থেকে তাদের বিশেষ রন্ধনপ্রণালী বেছে নেওয়ার পছন্দের কারণগুলি আমরা সম্ভাব্যভাবে জানতে পারব”। 

ভারতবর্ষে যখন মানুষের পছন্দের বা ঐতিহ্যবাহী খাবার নিয়ে ক্রমশ বিতর্ক হিংস্রভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে সেখানে এই সাম্প্রতিক গবেষণা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে ভারতের প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা বৈচিত্র্যময় খাবার খেতেই অভ্যস্ত ছিল।

চেজ বলেছেন - “সিন্ধু সভ্যতার অনেক বর্তমান পাঠ্যপুস্তকের বিবরণগুলি এই সভ্যতার একজাতীয়তার ওপর যে জোর দেয়, সেটা প্রায়শই আমার বিশ্বাস যে একটি সাংস্কৃতিকভাবে একজাতীয় বর্তমানের আধুনিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে তলায় তলায় সমর্থন করার জন্য। (গার্সিয়া-গ্র্যানেরোদের)এই ধারার গবেষণা প্রমাণ করবে যে সিন্ধু সভ্যতা সাংস্কৃতিকভাবে কতটা বৈচিত্র্যময় ছিল”।

(www.theoffnews.com Harappan Indus valley archaeological kitchen utensils food)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

সিন্ধু উপত্যকার একটি প্রাচীন সমতাবাদী সভ্যতা থেকে আমরা যা শিখতে পারি--

জন মার্শাল ১৯২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর হরপ্পা সভ্যতা আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন। গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এই আবিষ্কারের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার নানা অমীমাংসিত রহস্যর মাত্র একটি অংশ নিয়ে আজ আলোচনা করা যাক।

এক শতাব্দীরও কিছু বেশি আগে ব্রিটিশ এবং ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিকরা সিন্ধু উপত্যকায় প্রত্নস্থলগুলিতে খনন  শুরু করার অল্পদিনের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন যে একেবারে অজানা একটি সভ্যতার তারা সন্ধান পেয়েছেন। পাকিস্তান ও ভারতের কিছু অংশে অনুসন্ধান করে এবং আফগানিস্তানে পৌঁছে এই প্রত্নতাত্ত্বিক-অনুসন্ধানকারীরা যে সংস্কৃতি আবিষ্কার করেছিলেন তা প্রাচীন মিশর এবং মেসোপটেমিয়ার সভ্যতার সমসাময়িক কিন্তু তাদের থেকে অনেক বড় এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এটি আশ্চর্যজনকভাবে উন্নত ছিল - অত্যাধুনিক এবং জটিল - বিরাট বিরাট, নিখুঁত পরিকল্পনামাফিক স্থাপিত শহর, তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধিশালী অধিবাসী, লেখালেখি, চৌবাচ্চা নির্মাণ এবং স্নান, বিস্তৃত বাণিজ্য সংযোগ এবং এমনকি মানসম্মত ওজন এবং পরিমাপ।

সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা কী ধরনের সমাজ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল? কারা সেখানে বাস করত এবং কীভাবে তারা নিজেদের সংগঠিত করেছিল? প্রত্নতাত্ত্বিক এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা আজও এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে চলেছেন, কিন্তু প্রথম অনুসন্ধানকারীরা তখনই কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছিলেন।

স্যার জন মার্শাল, যিনি পাঁচটি প্রধান শহরের মধ্যে দুটি, হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো খননের তত্ত্বাবধান করেছিলেন, লক্ষ্য করছিলেন যে “মেসোপটেমিয়া এবং মিশরে দেবতাদের জন্য জাঁকজমকপূর্ণ মন্দির এবং রাজাদের জন্য রাজপ্রাসাদ এবং সমাধি নির্মাণে প্রচুর অর্থ ও চিন্তা ব্যয় করা হয়েছিল কিন্তু বাকি লোকেদের আপাতদৃষ্টিতে মাটির নগণ্য বাসস্থানেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।" সিন্ধু উপত্যকায়, “ছবিটি উল্টে গেছে এবং নাগরিকদের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে সবচেয়ে কার্যকরী স্থাপত্য। সেখানে মন্দির, প্রাসাদ এবং সমাধি অবশ্যই থাকতে পারে, কিন্তু যদি তাই হয়, তবে সেগুলি হয় এখনও অনাবিষ্কৃত বা অন্যান্য স্থাপত্যের মতোই যাতে তাদের থেকে সহজে আলাদা করা যায় না।"

২৬০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের মধ্যে, সিন্ধু সভ্যতার পূর্ণ বিকাশের সময়, সেখানে জন্ম হয়েছিল এমন একটা সমাজের যা বিশ্বের সবচেয়ে সমতাবাদী প্রাথমিক জটিল সমাজ হতে পারে, যা অতীতে নগরায়ন এবং অসমতার মধ্যে সম্পর্ক সম্বন্ধে দীর্ঘকাল ধরে পোষণ করা অনুমানকে মিথ্যা প্রমাণিত করে। এটির বড় শহরগুলি ছিল বিস্তৃত, পরিকল্পিত এবং গর্ব করার মত বৃহৎ মাপের স্থাপত্যে ভরপুর, যার মধ্যে রয়েছে প্রশস্ত আবাসিক ঘর, এবং আশেপাশের অঞ্চলে ছোট বসতিগুলি একই রকম জীবনযাত্রার মানসম্পন্ন সংস্কৃতিকে অনুসরণ করে।

প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে রহস্যময় বৈশিষ্ট্য হল সেটির অনুপস্থিতি - শাসক শ্রেণী বা অভিজাত পরিচালকদের কোনও চিহ্ন। এটি বহুদিনের তাত্ত্বিক অনুমানকে ভুল প্রমাণ করে যে কোনও জটিল সমাজে অবশ্যই স্তরীভূত সামাজিক সম্পর্ক থাকতে হবে: যে সম্মিলিত কর্ম, নগরায়ন এবং অর্থনৈতিক বিশেষীকরণ শুধুমাত্র একটি খুব অসম সংস্কৃতিতে বিকশিত হয় যা শীর্ষ থেকে দিক নির্দেশ নেয় এবং সমস্ত সামাজিক গতিপথগুলি একটি সাধারণ এবং সর্বজনীন ফলাফলের দিকে বিকশিত হয় - সেটি হল রাষ্ট্র। তবুও, এখানে একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ সভ্যতা ছিল যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাষ্ট্র ছাড়াই, পুরোহিত- রাজা বা বণিক গোষ্ঠী ছাড়া এবং একটি কঠোর বর্ণপ্রথা বা যোদ্ধা শ্রেণী ছাড়াই রয়ে গিয়েছিল। তারা কি করে এটা সম্ভব করে তুলেছিল?

দুর্ভাগ্যবশত, অন্বেষণ এবং গবেষণার প্রথম দশকগুলিতে, প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রমাণ করতে সচেষ্ট ছিলেন যে সিন্ধু উপত্যকায় একটি রাজতন্ত্র ছিল যদিও পাথুরে প্রমাণের অভাবে সেটি প্রকাশ করা যাচ্ছে না তবে সেগুলির আবিষ্কার শুধু সময়ের অপেক্ষা। কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে বৈষম্যের প্রমাণের অভাব শুধু এটাই বোঝায় যে এই অঞ্চলের শাসক শ্রেণী নিজের এবং অন্যান্য সামাজিক স্তরের মধ্যে দূরত্ব খুব চতুরতার সঙ্গে গোপন রেখেছিল।

সিন্ধু উপত্যকার সমাধিস্থলে কোন স্মৃতিস্তম্ভযুক্ত সমাধি নেই - এই বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে কিছু গবেষক ধারণা করেন যে শাসকদের দাহ করা হয়েছিল বা নদীতে সলিল সমাধি দেওয়া হয়েছিল, যেমনটি অন্যান্য সাম্রাজ্য সংস্কৃতিতে ছিল। কিন্তু শ্মশান প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবে অদৃশ্য নয়; অন্যান্য সংস্কৃতির অবশেষ প্রায়ই এর প্রমাণ হাজির করে।

অতি সম্প্রতি, প্রত্নতাত্ত্বিকরা মূল অভিযাত্রীদের পর্যবেক্ষণে ফিরে যেতে এবং সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতার প্রাচীন জীবন সম্পর্কে তত্ত্বগুলি বিকাশের জন্য তাদের সামনের পাথুরে প্রমাণগুলি ব্যবহার করতে সচেষ্ট হয়েছেন।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য ব্যাপকভাবে উন্নমিত হয়েছে এবং এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু রয়েছে। সিন্ধু সভ্যতার অসংখ্য প্রত্নস্থল এখন প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে পরিচিত যেগুলি কয়েক দশক আগেও তা ছিল না এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপট যা এই অঞ্চলে নগরায়নকে সক্ষম করেছিল — জলবায়ু, প্রাকৃতিক সম্পদ — এখন অনেক পরিষ্কার।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা মৃত্যু বা সমাধি সংক্রান্ত তথ্য, প্রাসাদ সমষ্টি, বিশাল স্থাপত্য সৌধ, লিখিত রেকর্ড এবং শীঘ্রই, সম্ভবত, গৃহস্থালীর তথ্য থেকে অসমতা এবং শ্রেণী বিভাজন শনাক্ত করার জন্য একগুচ্ছ শক্তিশালী পদ্ধতিকে নিখুঁত করেছেন। তবুও, এক শতাব্দীর গবেষণায়, প্রত্নতাত্ত্বিকরা সিন্ধু উপত্যকায় শাসক শ্রেণীর এমন কোন প্রমাণ খুঁজে পাননি যা অন্যান্য প্রাচীন জটিল সমাজে উদ্ধার করা তথ্যের সাথে তুলনীয়।

উনিশশো নব্বইয়ের শেষের দিকে, সিন্ধু প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি নতুন ধারণা বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন যা প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে বেশি করে খাপ খেয়ে গিয়েছিল। হেটারার্কি দাবি করে যে শহরগুলি সহ জটিল রাজনৈতিক সংগঠনগুলি অভিজাতদের দ্বারা শীর্ষ থেকে নিম্নগামী সিদ্ধান্তের পরিবর্তে অনেকগুলি ভিন্ন, শ্রেণিবিহীন সামাজিক গোষ্ঠীর পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে, যা বিশেষ কোনও গোষ্ঠী বা শ্রেণির আধিপত্য নয়, সহযোগিতা এবং সম্মিলিত ক্রিয়াকলাপের জন্ম দিতে পারে। এটি এখন ব্যাপকভাবে আলোচিত যে একাধিক সামাজিক গোষ্ঠী সিন্ধু শহরগুলির নির্মাণে এবং তাদের মধ্যে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল তাতে অবদান রেখেছিল এবং কেউই অন্যদের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল বলে মনে হয় না।

এই যুক্তি সমর্থনযোগ্য, কারণ, এমন কোনও প্রমাণ নেই যে সিন্ধু উৎপাদকদের কোনও দলকে দুর্লভ উপকরণ ব্যবহার করা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল যা কারিগরদের দূর দূরান্ত থেকে আনতে হয়েছিল, বা সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলি সিন্ধু সমাজে নিজেদের জন্য একটি উচ্চ অবস্থান দখল করার জন্য দলগুলির উপকরণগুলি পাবার অধিকার সংকুচিত করেছিল। .

সিন্ধু সংস্কৃতির সবচেয়ে স্বতন্ত্র এবং প্রযুক্তিগতভাবে চমকপ্রদ পণ্যগুলির মধ্যে একটি হল ছবি এবং লেখা খোদাই করা স্ট্যাম্পযুক্ত শীল, শুধুমাত্র মহেঞ্জোদারোতেই ২,৫০০ এর বেশি শীল পাওয়া গেছে। কিন্তু শীলগুলি বিভিন্ন জায়গায় কারিগরদের বিভিন্ন গোষ্ঠী দ্বারা উৎপাদিত হয়েছিল, এবং এমন কোনও প্রমাণ নেই যে একটি শাসক শ্রেণী উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করেছিল। প্রযুক্তিগত শৈলীগুলি কারিগরদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আদান-প্রদান করার প্রবণতা ছিল, যা প্রচুর খোলামেলা মানসিকতা এবং জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

সিন্ধু নগরবাসীরা বড় এবং ছোট আকারের সরকারী ভবন নির্মাণ করেছিল। মহেঞ্জোদারোর বিশাল স্নানাগার হল একটি বিশাল স্থাপত্য যাতে রোদে শুকনো ইট দিয়ে তৈরি একটি বড় পাকা স্নানের জায়গা, বিটুমেন দিয়ে জলরোধী এবং পাইপ এবং ড্রেন দিয়ে জল সরবরাহ করা হত যা জলের প্রবাহ এবং তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করতে দিত। মহেঞ্জোদারোতে, ইটের প্ল্যাটফর্মের উপরে অ-আবাসিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল যেগুলি তাদের উপরে নির্মিত কাঠামোর মতোই মজবুত ছিল এবং এর জন্য প্রচুর পরিমাণে সমন্বিত কর্মকান্ডের প্রয়োজন হয়েছিল। গণনায় দেখা গেছে যে শুধুমাত্র ওইধরনের একটি ভিত্তি মঞ্চের নির্মাণের জন্য চল্লিশ লক্ষ দিনের শ্রম বা ১০,০০০ নির্মাতার এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করা হয়েছিল।

তবুও, হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো উভয় স্থানেই, এই বৃহৎ অ-আবাসিক কাঠামোগুলি তুলনামূলকভাবে সুগম ছিল,  যার মানে তারা "সর্বজনীন" ছিল,  অপরদিকে অন্য প্রাচীন সভ্যতায় প্রাসাদ বা প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলি একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি স্থাপত্য আশেপাশের মহল্লায় বা গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও রাস্তার পাশে জড়ো হওয়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিনিময়, আলোচনা এবং মিথস্ক্রিয়া করার জন্য বিশেষ স্থান হিসাবে কাজ করতে পারে। এই স্থানগুলি শহরবাসীদের পরিকল্পনা এবং নীতির উপর উচ্চ মাত্রার ঐকমত্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে এবং নিশ্চিত করেছে যে কোনও একটি গোষ্ঠী বাকিদের শোষণ করে সম্পদ সংগ্রহ করেনি।

সিন্ধু উপত্যকার প্রত্নবস্তু থেকে এখনও অনেক কিছু জানা বাকি রয়ে গেছে। সিন্ধু লিপির এখনও পাঠোদ্ধার করা যায়নি এবং আমরা এখনও জানি না কেন খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে সভ্যতার পতন শুরু হয়েছিল। সবচেয়ে ইতিবাচক সাম্প্রতিক অগ্রগতিগুলির মধ্যে একটি হল সভ্যতার ছোট আকারের বসতিগুলি থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং আগ্রহের অভাবনীয় বৃদ্ধি, যা এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারে যে এই বসতিগুলি একে অপরের থেকে বা শহরগুলির থেকে গুণগতভাবে আলাদা ছিল কিনা - এবং সিন্ধু সমতাবাদ হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারোর সীমানা ছাড়িয়ে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

যাইহোক, আমরা ইতিমধ্যে যা খুঁজে পেয়েছি, তা থেকে বোঝা যায় যে সমতাবাদ সম্মিলিত পদক্ষেপের জন্য একটি আশীর্বাদ হতে পারে: যে স্বতন্ত্র সামাজিক গোষ্ঠীগুলি সম্মিলিত পদক্ষেপে বিনিয়োগ করতে আরও ইচ্ছুক হতে পারে যদি সুবিধাগুলি অভিজাতদের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এর থেকে আরও বোঝা যায় যে সামাজিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে এবং সমগ্র সমাজ জুড়ে জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার উপর বৈষম্য বা ভিন্নতা এক ধরণের নিয়ন্ত্রক হিসাবে কাজ করতে পারে।

যদি এমনটাই হয়ে থাকে এবং সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে একশ বছর গবেষণার পরে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অন্যান্য প্রাথমিক জটিল সমাজে যা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে তার তুলনীয় শাসক শ্রেণীর প্রমাণ খুঁজে না পান, তাহলে সিন্ধু উপত্যকার সমতাবাদকে নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

প্রমাণগুলি ইঙ্গিত করে যে নগরায়ন, সমষ্টিগত পদক্ষেপ এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন একটি বর্জনীয় শাসক শ্রেণীর এজেন্ডা দ্বারা চালিত হয় না বরং তাদের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে ঘটতে পারে। সিন্ধু উপত্যকা সমতাবাদী ছিল কারণ এতে জটিলতার অভাব ছিল না বরং শাসক শ্রেণী সামাজিক জটিলতার পূর্বশর্ত নয়। এটি আমাদেরকে সমষ্টিগত কর্ম এবং অসমতার মধ্যে মৌলিক সংযোগগুলি পুনর্বিবেচনা করার জন্য বাধ্য করে।

পুরোহিত- রাজা মারা গেছেন বা এই সমাজে সম্ভবত কখনও তাঁর অস্তিত্বই ছিল না।

(সৌজন্যে - অ্যাডাম এস গ্রিন। ‘ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে’র সাসটেনেবিলিটির একজন লেকচারার। তিনি একজন প্রত্নতাত্ত্বিক নৃতত্ত্ববিদ যাঁর দক্ষিণ এশিয়া বিশেষায়িত ক্ষেত্র। প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির তথ্যের মাধ্যমে প্রাচীন সভ্যতাগুলির তুলনামূলক গবেষণায় বিশেষজ্ঞ।)

[সূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া ইনস্টিটিউট]

{ক্রেডিট লাইন: এই নিবন্ধটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া ইনস্টিটিউটের প্রকল্প ‘হিউম্যান ব্রিজেস’-র সাহায্যে লেখা সম্ভব হয়েছে।}

(www.theoffnews.com Indus Valley civilization Harappan Mahenjo Daro)



 সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

আন্দাজ খ্রিস্টপূর্ব ১৩৪১ থেকে আন্দাজ ১৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত তুতানখামুন ছিলেন প্রাচীন মিশরের অষ্টাদশ রাজবংশের পূর্ববর্তী ফারাও। আজ থেকে তিন হাজার বছরেরও বেশি আগে মিশরের ফারাও তুতানখামুন কিশোর বয়সেই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এই কৌতূহল নিরসনেই যেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল সম্প্রতি মিশরের ফারাও তুতানখামুনের মুখের পুনর্গঠন করেছে।

 ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া এবং ইতালির বিশেষজ্ঞদের একটি আন্তর্জাতিক দল ফারাও তুতানখামুনের মমি করা খুলির একটি ডিজিটাল মডেল ব্যবহার করে তাঁর মুখের বৈশিষ্ট্যগুলিকে জীবন্ত করে তুলেছে।

এই নতুন গবেষণাপত্রের সহ-লেখক ব্রাজিলিয়ান গ্রাফিক্স বিশেষজ্ঞ সিসেরো মোরেস বলেছেন: "আমার মনে হচ্ছে তিনি একজন কমনীয় মুখের যুবক। তাঁর দিকে তাকালে, প্রশাসনের দায়িত্বে পরিপূর্ণ একজন রাজনীতিবিদের চেয়ে আমরা একজন তরুণ ছাত্রকে বেশি দেখতে পাই, যা তাঁর ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।"

ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক হাওয়ার্ড কার্টার ১৯২২ সালের নভেম্বরে মিশরের ভ্যালি অফ কিংসে কয়েক ডজন অবিশ্বাস্য ধন-সম্পদ সমেত বিখ্যাত "বালক রাজা" আবিষ্কার করেছিলেন ।

ফারাও তুতানখামুনের মুখের নতুন মডেলটি সঠিক ভাবে তৈরি করা বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং ছিল কারণ আন্তর্জাতিক দলটির ফারাওয়ের খুলিতে সরাসরি পরীক্ষানিরীক্ষা করার অনুমতি ছিল না। তুতানখামুনের মুখ নিয়ে আগে যে সব গবেষণাগুলি হয়েছে তাতে ইতিমধ্যেই মাথার খুলির পরিমাপ এবং প্রকাশিত রেফারেন্স চিত্রগুলি ব্যবহার করেছে।

মোরেস বলেছেন, “এটি ছিল গোয়েন্দার কাজ, যেখানে আমাদের খুলির ত্রিমাত্রিক মডেল সরবরাহ করার জন্য তথ্যের চিহ্নগুলিকে একত্রে সংযুক্ত করা হয়েছিল। অনুপাতের ডেটা এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিফালোমেট্রিক পরিমাপের সাহায্যে, ভার্চুয়াল দাতার ডিজিটাল খুলি সাহায্য নেওয়া এবং এটির সামঞ্জস্য করা সম্ভব হয়েছিল যাতে এটি তুতানখামুনের খুলিতে পরিণত হয়ে যায়। সেখান থেকে তারা ঠোঁটের আকার, চোখের বলের অবস্থান, কানের উচ্চতা এবং নাকের সামনের আকার পুনরায় তৈরি করেছেন। এই সমস্ত মডেলগুলি বিভিন্ন প্রাচীন বংশের জীবিত ব্যক্তিদের সিটি স্ক্যানের পরিসংখ্যানগত গবেষণার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে"।

আধুনিক মিশরীয়দের কাছ থেকে একটি গাইড হিসাবে ডেটা ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় নরম টিস্যুগুলির পুরুত্ব নির্দেশ করে মার্কারগুলি তারপরে খুলিতে প্রয়োগ করা হয়েছিল। এই এবং অন্যান্য কৌশলগুলির সাথে, মুখটি ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র মুখমন্ডলে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। চোখের রঙের মতো বিষয়গত উপাদানগুলি তখন বিষয়টিকে আরও মানবিক করার জন্য যুক্ত করা হয়েছিল।

তুতানখামুন ছিলেন তাঁর জীবদ্দশায় দেবতা হিসেবে পূজিত কয়েকজন রাজার একজন; এই সম্মান বেশিরভাগ ফারাওদের মরার পরেই জুটত। তাঁর রাজত্বকালে তুতেনখামুনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ছিল তাঁর পূর্বসূরি আখেনাতে আমর্না সময়কালে যে সব সামাজিক পরিবর্তনগুলো চালু করেছিলেন সেগুলোকে আমূল পাল্টে দেওয়া উল্টানো, প্রাচীন মিশরীয় ধর্মের ঐতিহ্যগত বহুঈশ্বরবাদী রূপকে পুনরুদ্ধার করা, অ্যাটেনিজম নামে পরিচিত ধর্মীয় পরিবর্তনকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনিয়ে আসা আর আখেনাতেনের রাজধানী আমরনা থেকে রাজদরবারকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া। আধুনিক যুগের সাধারণ মানুষদের মধ্যে সর্বজনপ্রিয় ফারাও তুতানখামুন পরিচিত ১৯২২ সালে তার সমাধি, কেভিসিক্সটু আবিষ্কারের সময় পাওয়া বিশাল ঐশ্বর্যপূর্ণ সম্পদের জন্য, যা আজ পর্যন্ত একমাত্র সমাধি যা প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তার সমাধির আবিষ্কারকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

(www.theoffnews.com Tutankhamun)



সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর: 

প্রত্নতাত্ত্বিকরা নেনমারা বন বিভাগের কোলেনগোড রেঞ্জের একটি পাহাড়ের চূড়ায় অস্বাভাবিক সংখ্যায় মেগালিথিক কলস সমাধি আবিষ্কার করেছেন। সমাধিগুলি ২,৫০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন হতে পারে।

নেনমারা বন বিভাগের মালামপাল্লা বা মালাপ্পুরম পাহাড় নামেও পরিচিত, কুন্ডলিক্কাদ পাহাড়ে সমাধিগুলি প্রত্নতাত্ত্বিকদের গোচরেই আসত না যদি না কোডুভায়ুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বৃষ্টির জল সংগ্রহ প্রকল্পের অংশ হিসাবে একদল শ্রমিক পাহাড়ে ৬০টি গর্ত না খুঁড়ত। কলস সমাধিগুলি পরীক্ষা করে একজন প্রত্নতাত্ত্বিক বলেছেন যে এগুলি কেরালায় মেসোলিথিক বা পুরাতন প্রস্তর যুগ এবং লৌহ যুগের মধ্যে সংযোগের একটি গভীর ধারণা দিতে পারে।

পালাক্কাদ সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক এবং প্রত্নতত্ত্ববিদ কে. রাজন ওই প্রত্নস্থলে প্রাপ্ত মাইক্রোলিথগুলি পরীক্ষা করে বলেছে - "পাহাড়ের চূড়ায় এমন একচেটিয়া কবরের সমাধি পাওয়া বিরল৷ কবরগুলি আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো হতে পারে। কিন্তু আরও খনন ছাড়া আমরা নিশ্চিতভাবে এগুলির বয়েস বলতে পারব না”।

ডাঃ রাজন কেরালায় মেসোলিথিক এবং লৌহ যুগের মধ্যে যোগাযোগগুলি অন্বেষণ করছেন৷ তিনি বলেছেন, “বেশিরভাগ পার্বত্য অঞ্চলে আমরা সাধারণত যা দেখি তা হল সীমানা বোঝানোর জন্য পাথরের ঢিবি এবং পাথরের শবাধার এবং  স্মৃতিস্তম্ভ ও পাথরের গোলাকার স্থাপত্য যাদের মাঝে পাথরের শবাধার ও পাথরের ডলমেন বা চ্যাটাল পাথর। কিন্তু এই পাহাড়ে আমরা অস্বাভাবিক রকমের বেশি ক্ল্যাসিক কলস সমাধি খুঁজে পেয়েছি”। 

এখানের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকায় শ্রমিকরা গর্ত খোঁড়ার সময়ে অসতর্ক অবস্থায় বেশ কয়েকটি মৃৎপাত্র ভেঙে ফেলেছে। একটি কলস সমাধির ঢাকনা বা ক্যাপস্টোন অক্ষত আছে। 

তিনি আরও বলেছেন, “এই প্রত্নস্থলে প্রাপ্ত অসংখ্য ঘটকর্পর বা খোলামকুচি থেকে প্রাচীন যুগের কালো মৃৎপাত্র, লাল মৃৎপাত্র এবং কালো ও লাল মৃৎপাত্রের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। মেগালিথ নির্মাতারা ৮ মিমি থেকে ২ সেন্টিমিটার পুরুত্বের বিরাট কলসি রেখেছিল। একটি গর্তে যে কলসি পাওয়া গেছে তাতে আঙুলের ছাপ ছিল। ছোট পাত্রের খোলামকুচিতে দড়ির ছাপের নকশা দেখা যায়। পাহাড়ের অনেক জায়গায় পাথরের ওপর ছেনির দাগ থেকে বোঝা যায় যে ক্যাপস্টোন এবং গোলাকার বোল্ডারগুলো ছেনির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছিল”।

ডাঃ রাজন বিস্তৃত গবেষণার আবেদন জানিয়ে বলেছেন যে “যদিও পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক জায়গায় মেসোলিথিক আর্টিফ্যাক্টস বা পুরাতন প্রস্তর যুগের সরঞ্জাম পাওয়া গেছে, তবে মেসোলিথিক এবং লৌহ যুগ, এই দুই যুগেরই চিহ্ন একসঙ্গে পাওয়া যায় এমন প্রত্নস্থান খনন করা সম্ভব হয়নি। এই প্রত্নস্থানের খননকার্য অবশ্যই আমাদের পুরাতন প্রস্তর যুগ এবং লৌহ যুগের জন্য একটি স্ট্র্যাটিগ্রাফিক সিকোয়েন্স বা ভূতাত্ত্বিক ক্রমের সন্ধান দিতে পারে"।

(www.theoffnews.com archaeology Kerala)