Articles by "উফ ইসসস আঃ"
Showing posts with label উফ ইসসস আঃ. Show all posts

রূদ্রাণী মিশ্র, লেখিকা ও কবি, কলকাতা:

জীবনে বোধহয় সবাই প্রেম করে, তাই না? আহা প্রেম করা মানেই হাত ধরে ঘোরা বা ফুচকা খাওয়ার কথা বলছি না। প্রেম মানে বলছি, কাউকে খুব ভাল লাগা বা ভালবাসা হয়তো তার অজ্ঞাতে, অজান্তে। তাও কিন্তু প্রেম। কেউ অবশ্য এক প্লেটোনিক লাভ বলেন।

তা আপনাদের মতে কত রকমের প্রেম আছে? আরে দাঁড়ান ঐ পূর্ব রাগ, অনুরাগের কথা বলছি না। আমি বলছি, কিরকম বৈশিষ্ট্যের প্রতি মানুষ প্রেমে পড়ে। রূপ দেখে মানে ঐ সৌন্দর্য দেখে, চরিত্র দেখে, অর্থ দেখে, কথাবার্তা শুনে। আবার অনেক সময় তো আচার ব‍্যবহার দেখেও মানুষ প্রেমে পড়ে। এতদূর আপনাদের জানা। এবার আপনাদের এক নতুন প্রেমের খোঁজ দিই, বুদ্ধি দেখে প্রেমে পড়া। শুনেছেন কখনও? হমম বাওয়া, পশ্চিমাদেশগুলো থেকে তার একটা নামকরণ ও হয়েছে। স‍্যাপিওসেক্সুয়াল (sapiosexual)। মাত্র ২০০৪ সালে এই শব্দটি মান‍্যতা পেয়েছে। 

তা এই শব্দ নিয়ে একটু কাটাছেঁড়া করা যাক। sapio কথাটা এসেছে ল‍্যাটিন শব্দ sapien থেকে, তার অর্থ হল জ্ঞানী বা wise আর sexual নিয়ে কী বলব? এতো আজকালকার তিন বছরের বাচ্চাও জানে। তাহলে মানে দাঁড়াল এই গোষ্ঠীর লোকজন আপনার বুদ্ধি থাকলে, আপনার প্রেমে পড়বে। আমি যখন প্রথম গুগল বাবাজীকে জিজ্ঞেস করলাম, বাবাজী, স‍্যাপিওসেক্সুয়াল মানে কী? বা তার সংজ্ঞা কী হবে? তিনি বললেন। "sapiosexuality means that a person is sexually attracted to highly intelligent people. So much so that they consider it to be the most important trait in a partner.

বেশ, ভাল কথা। তা এই দলে কে বা কারা আছে? LGBTQ+ আর straight রা এই দলে পড়ে, মানে তারা sapiosexual হতে পারে। তার মানে, এদের কাছে যতক্ষণ আপনি দেখাতে পারবেন, আপনি গ্ৰে ম‍্যাটারটি যথেষ্ট পরিমাণে ব‍্যবহার করেন। ততক্ষণ এরা আপনাকে কাছে রাখবে। এক্ষেত্রে একটা মোটা দাগের উদাহরণ দিতে চেষ্টা করছি। ধরুন আপনি তার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন, রোলস রয়েস বা মার্সিডিজ বেনজ বা পোরশে নিয়ে, সে ততক্ষণে ভেবে নেবে, এই গাড়ির কয়টা গিয়ার, কত কিমিতে কত তেল খাবে, এর পাটর্স নষ্ট হলে যেখানে থাকে, সেখানে পাওয়া যাবে কি না, মানে সব ধরণের প্রস এ্যাণ্ড কনস। হ‍্যাঁ তার মধ্যে আপনার শারীরিক ভঙ্গি বা আপনার কথা বার্তার ও কাটাছেঁড়া সে পুরো সময় ধরে করবে। তাই বলছি, আপনার বিপরীতে বসা ব‍্যক্তি (সবধরনের লিঙ্গের কথা আগেই বলেছি) স‍্যাপিওসেক্সুয়াল হয়ে থাকেন। তাহলে সাধু সাবধান। লোকজন পটানোর জন্য অর্থ ব‍্যয় করে, আপনি আপনার গ্ৰে ম‍্যাটারটি ব‍্যবহার করুন। জানি দিনের শেষে ক্লান্ত লাগবে। তাও ইয়ে করতে একটু বেশি বুদ্ধি খরচ করতে পারবেন না? নাহলে কিন্তু সব ভেস্তে যাবে।

সব ঘেঁটে যা দেখলাম এরা, রূপ, বর্ণ, চেহারার আকার আকৃতি কেমন? আপনার টাক আছে না নেই বিচার করে না, বা বলা ভাল এসবের পরোয়া করে না, অন‍্য আর সাধারণদের মত। এরা অভদ্র চিৎকার চেঁচামেচি ড্রামা একদম পছন্দ করে না। এরা একটু পেঁচিয়ে পিন মারতে বেশ ভালবাসে। বুঝলে ব‍্যথা, না বুঝলে সমস‍্যাই নেই। আরে, শব্দটি নতুন এলেও ইংরেজি জানা জ‍্যোতিষগুলো, এই দলে কারা পড়ে তারও একটা তালিকা বের করেছে। আ প দ। এই শব্দটি  নতুন হলেও, এই গোষ্ঠী আগেও ছিল, হয়তো সংখ্যায় কম ছিল। তখন তাদের নামাকরন হয়নি শুধু। এতে কোনও সন্দেহ থাকা উচিত নয়। তবে এখন নতুন সমীক্ষা বলছে, এদের সংখ্যা বাড়ছে। 

তাই আবার বলছি, আপনি ও আপনার গ্ৰে ম‍্যাটারটি সবসময় ব‍্যবহার করুন। কে বলতে পারে, কখন তেনাদের একজন আপনার সামনে পড়ে গেলেন...

(www.theoffnews.com - sapiosexual)


তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতায় এসে বুঝে ছিল বাংলার এই বাবু সমাজকে অনুগত করে রাখতে পারলে তাদের শাসন করতে সুবিধা হবে তাই ব্রিটিশরা বাবু কালচারকে উৎসাহ দেয়। তাদের প্রভাব ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করে| আরো নতুন নতুন উপাধি তৈরী হয় যেমন রাজা, রায়, রায় চৌধুরী, রায় বাহাদুর  ইত্যাদি|

ব্রিটিশ আমলে এক নতুন অভিজাত শ্রেণীর তৈরী হলো। শিক্ষা ও বংশ পরিচয়কে ছাপিয়ে গেলো অর্থ| কেউ বা ব্যবসা করে কেউ আবার রাজ কর্মচারী হয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে রাতারাতি হয়ে গেলো বাবু। কলকাতার বাবু কালচারের তখন স্বর্ণ যুগ বলা যায়। বাবুয়ানা ও সৌখিনতা প্রায় সমার্থক শব্দ| এর কারণ বাবু হওয়ার প্রধান শর্ত ছিলো ওই সৌখিনতা। শুধু অর্থ উপার্জন নয় অর্থ ব্যয়ের প্রতিযোগিতা এ নামতে হবে| তবেই বাবু উপাধি স্বার্থক হবে এই ছিলো মানসিকতা। ব্রিটিশরা চেয়েছিল সম্পদশালী এক চাটুকার এর দল তৈরী করতে। তাই হয়েছিল। দামি গাড়ি, লক্ষ টাকার বাইজি, বিশাল বিশাল বাড়ি, পায়রা ওড়ানো, রক্ষিতাকে নিয়ে গান বাজনা করে আর মদ খেয়ে রাতের পর রাত কাটানো ছিল এই ধনী বাবু সমাজের প্রতিদিন এর জীবন।

কালী প্রসন্ন সিংহের লেখা থেকে আমরা জানতে পারি সেকালের বাবুদের স্ত্রীরা কোনো রাতেই তাদের স্বামীদের মুখ দেখতো না| কারন বাবুদের প্রতিটা রাত কাটতো বাইজি বা রক্ষিতার সাথে নাচ মহলে। বঙ্কিম চন্দ্র তার বাবু নামক রম্য রচনায় লিখে ছিলেন যিনি দূর্গা উৎসব এর উদ্দেশ্য দূর্গা পুজা করবেন, গৃহিণীর অনুরোধে লক্ষী পুজো করবেন, উপপত্নীর অনুরোধে স্বরূস্বতী পুজো করবেন এবং মাংস খাওয়ার লোভে পাঠা বলী দেবেন তিনিই বাবু|

শিক্ষাবিদ, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক শিবনাথ শাস্ত্রী ‘বাবু’দের সম্পর্কে  লিখেছেন, ”বাবু মহাশয়েরা দিনে ঘুমাইয়া, ঘুড়ি উড়াইয়া, বুলবুলির লড়াই দেখিয়া, সেতার, এসরাজ, বীণা প্রভৃতি বাজাইয়া, কবি, ফুল আখড়াই, হাফ আখড়াই,পাঁচালী প্রভৃতি শুনিয়া রাত্রি কালে বারাঙ্গানাদিগের গৃহে গৃহে গীত বাদ্য ও আমোদ প্রমোদ করিয়া কাল কাটাইত এবং খড়দহের ও ঘোষপাড়ার মেলা এবং মাহেশর স্নান যাত্রা প্রভৃতির সময়ে কলিকাতা হইতে বারাঙ্গানাদিগকে সঙ্গে লইয়া দলে দলে নৌকা যোগে আমোদ করিতে যাইতেন।”

কলকাতার বিখ্যাত আট বাবু ছিলেন।

নীলমনি হালদার।

রামতানু দত্ত।

গোকুলচন্দ্র মিত্র।

রাজা রাজকৃষ্ণ।

কালীপ্রসন্ন সিংহের পূর্বপুরুষ ছাতু সিংহ।

দর্পনারায়ণ ঠাকুর।

রাজা সুখময় রায়।

এবং চোরাবাগান মিত্র বংশের এক বাবু। এরা ছিলেন প্রধান, তাছাড়া আরো অনেক বাবু গজিয়ে উঠেছিল রাতারাতি। জোড়া সাঁকো ঠাকুর বাড়ির সদস্যরাও বাবুয়ানাতে খুব একটা পিছিয়ে ছিল না | দ্বারকানাথ ঠাকুর তার বিলাসিতা ও সৌখিনতার জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিত ছিলেন।কিছু প্রতিভা সম্পন্ন, ব্যতিক্রমী চরিত্রের  বাবুও ছিল সে সময়। যেমন আশুতোষ ও প্রমথনাথ। এঁরা যথাক্রমে সাতু (ছাতু) বাবু ও  লাটু বাবু  নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। আশুতোষ বাবু ছিলেন তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ  সেতারিদের মধ্যে অন্যতম। লাটু বাবু  যেমন ছিলেন দানশীল, তেমন  ছিলেন বিলাসী। এই ছাতু বাবুর নামেই কিন্তু ছাতু বাবুর বাজার।

বাবুদের বিলাসিতা বা সৌখিনতা কখনো কখনো হাস্যকর পর্যায় পৌঁছাতো| কেউ কুকুরের বিয়েতে হাজার হাজার টাকা খরচ করছে তো কেউ পোষা বেড়ালের বিয়েতে দশটা গ্রামের লোক নিমন্ত্রণ করে খাওয়াচ্ছে। কেউ পায়রার পেছনে লক্ষ টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে। সোনা যায় কিছু ধনী বাবু জুতোর ডগায় হিরে বসিয়ে রাখতেন| ভাবা যায়!

শোনা যায় রাজা কৃষ্ণ চন্দ্র তার পোষা বাঁদরের বিয়েতে এক লক্ষের বেশি টাকা খরচ করে তাক লাগিয়ে দিয়ে ছিলেন| বানরের মাথায় ছিলো হিরে মুক্ত খচিত মুকুট। সঙ্গে বিলাস বহুল পালকি ও শোভাযাত্রা। রাজা ইন্দ্র নারায়ণ রায় তার বিড়ালের বিয়েতে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন বলে শোনা যায়| নিমাই চাঁদ মল্লিক এর নাতি রাম রতন মল্লিক এর বিয়েতে চিৎ পুরের দুমাইল রাস্তা ভেজানো হয়েছিলো খাঁটি গোলাপ জল দিয়ে। ঘোড়া গাড়িতে বাবুরা হাজার হাজার টাকা উড়িয়ে দিতো| কত রকম বাহারের গাড়ি ছিল সেকালে, ফিটন, বগি, বৃতস কাস, পালকিও হতো মহা মূল্যবান, সৌখিন, জমকালো| পরে মোটর গাড়ি উঠলে বাবুরা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে তা আনাতে শুরু করে|

মদ ছাড়াও বাবুরা সাহেবদের থেকে আরেকটা জিনিস শিখে ছিলেন তা হলো নাট্য চর্চা। আশুতোষ দেব বা ছাতু বাবু, শোভাবাজার রাজ বাড়ির বাবুরা এবং ঠাকুর বাড়ির বাবুরা নাটকে অর্থাৎ ব্যয় করলেন। এই ভাবে বাংলা থিয়েটারের ভিত্তি স্থাপন হলো। পরে গিরিশ ঘোষ এর হাত ধরে তা আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল| শুধু নাটক কেন, বাংলা গান, যাত্রা এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্র বাবুদের অর্থ সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব ছিল না| সেদিক দিয়ে বাংলা শিল্প ও সংস্কৃতি জগৎ শুধু বাবুদের কাছে নয়, বাইজিদের কাছেও অনেকটা ঋণী। (সমাপ্ত)

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

বাঈজীর ব্যাপারে পুরনাে কলকাতার দু-জন বাবু খুব বিখ্যাত ছিলেন। একজন হচ্ছেন মহারাজা নবকৃষ্ণ দেবের পুত্র রাজকৃষ্ণ দেব, যার কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। অন্যজন হচ্ছেন চুড়ামণি দত্তের সন্তান কালীপ্রসাদ দত্ত। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একজন। নিম্নপদস্থ সামরিক অফিসার ছিলেন ফ্রেডরিক উইন। তিনি রাজকৃষ্ণের বাড়িতে নাচের আসরে উপস্থিত ছিলেন। তার লেখা থেকে জানা যায়, রাজকৃষ্ণ সেবার তিন রাত ধরে চার-পাঁচ দল বাঈজীকে নাচানাের জন্যে বায়না করেছিলেন। এই বাঈজীদের মধ্যে নিকীও ছিল। তার বয়স তখন চোদ্দ বছর। উইনের ভাষায় ‘নিকীর মুখাকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন রতিদেবী স্বয়ং গঠন করিয়াছেন। আমি স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম যে, তিনরাত্রি নাচিবার জন্য নিকীকে যে বারােশত টাকার নগদ এবং সেই দামের দু-জোড়া শাল পারিশ্রমিক দেওয়া হইল, তাহা তাহার গুণের সমতুল্য বটে।’ ১৮১৪ সালে কিষাণচন্দ্র রায়ের বাড়িতে, ১৮১৫ সালে রামচন্দ্র রায়ের বাড়িতে আর ১৮৩২ সালে আশুতােষ দেবের বাড়িতে নিকী নেচেছিল বলে খবরে প্রকাশ। ১৮১৯ সালেও নিকী রামচন্দ্র রায়ের বাড়িতে নেচেছিল বলেও জানা যায়। এরপর চারবছর তার কোনাে খবর পাওয়া যায়নি। ১৮২৩ সালে সে রামমােহন রায়ের মানিকতলার বাগানবাড়ির মুজরােয় হাজির ছিল। 'ক্যালকাটা জার্নাল’-এ খবর বেরিয়েছিল।

নিকী আর আশরুনের পরেই থাকার কথা ছিল নূরবক্সের স্থান। কলকাতার বাঈজীদের নামের তালিকায় প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকা উচিত ছিল তার নাম। কিন্তু কোথায় কী! ১৮১৯ সালে আবির্ভাব-লগ্নেই তিরােভাব ঘটলাে কলকাতার প্রতিভাময়ী বাঈজী নূরবক্সের। টলে উঠলাে বাঈজী -সম্রাজ্ঞী নিকী বা আশরুনের সিংহাসন। একটা অসাধারণ প্রতিভার বিনাশ ঘটলাে।

১৮১৪ সালের ২০ অক্টোবর ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ খবর বেরােলাে আশরুন দুর্গাপুজোয় নীলমণি মল্লিকের বাড়িতে নেচেছে। ১৮১৫ সালে আশরুন আবার দুর্গাপুজো উপলক্ষে রামচন্দ্র রায়ের বাড়িতে নেচেছিল। আশরুনের শেষ খবর ছাপা হয়েছিল ১৮১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ‘ক্যালকাটা জার্নাল’-...তবে রামদুলাল দের পুত্র ছাতুবাবুও পিছিয়ে ছিলেন না। ছাতুবাবুর বাগান বাড়ি বিখ্যাত ছিল বাই নাচের জন্য। শুধু ছাতু বাবু নয়, বাবু খেলাত ঘোষ ছিলেন উৎকর্ষ সংগীতের পৃষ্ঠপোষক। বাগানবাড়িতে হিন্দু মেলার বৈঠকও ঐতিহাসিক ভাবে মূল্যবান। তবে মজার ব্যাপার হল যারা হিন্দু ধর্মের সংস্কারের বিরোধিতা করেছিলেন যেমন রাধকান্তদেব এবং আর যারা নবজাগরণের আন্দোলনের অভিমুখে ছিলেন  তাদের প্রায় অনেকেই বাবু কালচারের ও বাইজি গান ও নাচের স্বপক্ষে ছিলেন। তবে শেষ করি গহরজানের কথা দিয়ে। প্রথম বাংলা গানের রেকর্ড  সফল ভাবে প্রকাশিত হয় এইচএমভি থেকে। তিনি সব রকমের গান গেয়েছেন। তাঁর অবদানও কম নয়।

গওহরজান আর এক নামকরা বাঈজী। তার জন্ম ১৮৭৩ সালে। গওহরের আসল নাম এঞ্জেলিনা, বাবার নাম রবার্ট উইলিয়াম, ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। কাশীতে ছিল তাঁর বাসস্থান। মায়ের নাম ভিক্টোরিয়া হেমিংস। ভিক্টোরিয়া ছিলেন অসাধারণ রূপসী। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। নতুন তার নাম হয় মালকাজান। এসময় সে মেয়ের নামও পাল্টে দিল—এঞ্জেলিনা হল গওহরজান, সংক্ষেপে গহর। 

গওহরজানকে বলা হত ‘ইণ্ডিয়ান নাইটিঙ্গেল’। তার দক্ষিণা ছিল ১৫০০ টাকা। জানা যায়, ১৯০২ সালে পাটনায় একটা বিয়েবাড়ির আসরে গওহরজান একখানা স্বরচিত গজল গেয়ে সবাইকে মােহিত করে দিয়েছিল। ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, পাথুরিয়াঘাটার জমিদার ভূপেন্দ্রকৃষ্ণ ঘােষ গওহরকে নানাভাবে সাহায্য করতেন। ১৯২০ সালে ভূপেনবাবুর বাড়িতে মালকাজানের সঙ্গে গওহরও নেচেছিল। পরে গওহর বােম্বাই চলে যায়। তারপর সেখান থেকে মহীশূরের মহারাজা কৃষ্ণরাজ ওয়ারিয়রের দরবারে গিয়ে হাজির হয়। মহারাজা তাকে মাসে দু’হাজার টাকা মাইনের গায়িকার চাকরিতে নিয়ােগ করেন। কিন্তু মহীশূরে যাওয়ার দু’বছর পরে ১৯২৯ সালে গওহর মারা যায়। গওহরের সংক্ষিপ্ত জীবনী ছাপা হয় ১৯৩০ সালের ১৮ জানুয়ারি ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায়। এতে লেখা হয়েছিল,

“A loss has been sustained by the death in Mysore of Madame Gauhar Jan, where she was Court singer and dansense to H. H. the Maharaja of Mysore.”

এই কাগজে আরও লেখা হয়,

“Her fame as a songstress earned her the title of ‘Indian Nightingle’ and when gramophone records were first made of Indian songs, she was the first to be approched.”

দুর্গাপুজো ছাড়াও দোল আর রাসের সময়ও বাঈজী নাচ হত। তবে সে খুব কম। (ক্রমশঃ)

তথ্যসূত্রঃ উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, আশুতোষ ভট্টাচার্য, দ্বিতীয় খণ্ড।

বিনোদনে পাইকপাড়া বেলগাছিয়া, সান্তুনু ঘোষ

কলকাতা রাজপথ সমাজও সংস্কৃতিতে, অজিত বসু

অতুল সুর, কলকাতার চালচিত্র, কলকাতা, পৃ. ১৯৩ ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সংবাদপত্রে সেকালের কথা, ১ম খণ্ড, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কলকাতা, পৃ. ১২১।

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

আসলে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে কলকাতা মহানগরীতে ইংরেজদের সহযােগিতায় নবকৃষ্ণের মতাে জমিদার বা রূপলাল মল্লিকের মতাে বেনিয়ানরা, যাঁরা প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হয়ে বাঙালি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তাদের তখনও পর্যন্ত কোনাে স্পষ্ট সাংস্কৃতিক রুচি গড়ে ওঠেনি। মুঘল রাজদরবারের ধ্বংসাবশেষের প্রতিনিধিরূপে বাঈ নৃত্যের পাশাপাশি গ্রাম বাংলা থেকে শহরে আগত লােকসংস্কৃতির নতুন অভিব্যক্তি কবিগান, আখড়াই-এর নব্যরূপ ইত্যাদির সহাবস্থান সে যুগের কলকাতার সাংস্কৃতিক জগতের এক কৌতুহলােদ্দীপক বৈশিষ্ট্য। এক যুগ পরিবর্তনকালীন অবস্থায় এক শ্রেণির সাংস্কৃতিক চিন্তায় ও চর্চায় যে অসামঞ্জস্য ভাবধারার অরাজকতা ঘটেছিল, তার সব চেয়ে প্রকৃষ্ট নিদর্শন—শােভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেবের রাজবাড়ির অনুষ্ঠানগুলি। মুঘল বাদশাহ শাহ আলম দ্বারা মহারাজ উপাধিতে বিভূষিত নবকৃষ্ণ একই সঙ্গে নতুন ইংরেজ শাসকদের কৃতজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, যখন ১৭৫৭ সালে সিরাজউদ্দৌলার কলকাতা আক্রমণের পর পলাতক ইংরেজদের তিনি খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়েছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপােষকতায় যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল তার বর্ণনা দিতে গিয়ে তার জীবনীকার লিখছেন,

“খ্যাতনামা গীতিকার হয়ে ঠাকুর এবং নিতাই দাস (সে যুগের বিখ্যাত কবিওয়ালা হয় ঠাকুর ও নিতাই বৈরাগী) তারই আশ্রিত ছিলেন। কলকাতার সমাজে ‘নচ’ (বাঈজী নাচ) ঢােকালেন তিনি এবং তাকে জনপ্রিয় করে তুললেন। ইংরেজদের ধারণা সাধারণ্যের প্রমােদ ব্যবস্থায় এটা আমাদের প্রধান উপকরণ। এ হলাে বাঈ না।”

নবকৃষ্ণের ইতিহাস-প্রসিদ্ধ নাচঘরে বাঈনাচের বিবরণ আমরা ইতিহাসে পাই, “ঝাড়বাতি জ্বলছে। টানাপাখা দুলছে। নাচঘরের পুবমাথায় তাকিয়ার ওপর মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন নবকৃষ্ণ দেব। তার পরণে জোড়। মাথায় খিড়কিদার পাগড়ি। পায়ে লপেটা-পাদুকা। তাঁর দু-পাশে বসে আছেন দামী পােশাক পরা এদেশীয় ইয়ার-বন্ধুরা। নবকৃষ্ণ তখন চব্বিশ বছরের তরুণ। নাচঘরের পশ্চিম দিকে সােফার ওপর গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছেন ক্লাইভ সাহেব। তাঁর দু-পাশে বসে আছেন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পনির হােমরা চোমরারা। সবারই পরণে আঠারাে শতকের ইউরােপীয় পােশাক। সবারই হাতে পানপাত্র। পর্তুগিজ খানসামা পানীয় পরিবেশন করছে। ঘরের দক্ষিণ দিকে বসে আছে বাজনাদাররা। মাঝখানে বাঈজী নাচছে। গান গাইছে।"

কে এই বাঈজী? কী তার নাম? কেউ বলেন বুলবুল, কেউ বলেন ময়না, আবার কেউ বলেন মুনিয়া। ক্লাইভ তার নাম দিয়েছেন জেম। সাহেব আর বাবুদের দেওয়া নামের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে তার আসল নামটি। মুনিয়ার বয়স কত হবে? খুব বেশি হলে আঠারাে। যৌবন উপছে পড়ছে তার শরীরে। অঢেল তার রূপ। যেন কোনাে বিখ্যাত শিল্পী মাটি দিয়ে নিজের হাতে তৈরি করেছেন তার শরীরটা। তারপর মনের মতন করে তাতে বুলিয়ে দিয়েছেন রঙের তুলি। এরকম কাম-উদ্দীপক শরীর কলকাতার নারীদের মধ্যে নেই বললেই চলে। তার নাচ? যেন কল্পনার স্বর্গ থেকে বাস্তবের পৃথিবীতে নেমে এসেছে অপ্সরা রম্ভা। কলকাতার প্রথম মুজরােয় এরকম আশ্চর্য তয়ফার আবির্ভাবের কথা ভাবাই যায় না। আর তার গান? গলা? সুর? এরকম মিষ্টি গলা কলকাতার বাবুরা আগে কখনাে শােনেননি। খাঁটি বিলিতি সাহেব ক্লাইভও শােনেননি এরকম মনভােলানাে সুর।

মুনিয়া একটা গান শেষ করতে না করতেই বাবুদের কাছ থেকে আর একটা গানের ফরমাস আসছে। তার নাচ দেখে গান শুনে খুশি হয়ে বকশিশ হিসেবে বাড়িয়ে ধরছেন মুঠো ভর্তি মােহর। কেউ বা তার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন দামী মুক্তোর মালা। নাচতে নাচতেই দু-হাতে মালাটা লুফে নিয়ে গলায় পরে নিচ্ছে সে। কোনাে বাবু টাকা দিচ্ছেন খেলিয়ে। এক হাতে বাড়িয়ে ধরছেন টাকা। মুনিয়া নিতে আসছে। বাবুটি অমনি অন্য হাতে টাকাগুলাে সরিয়ে ফেলছেন পাকা খেলুড়ে। কিন্তু মুনিয়াও কমতি যাচ্ছে না।

নবকৃষ্ণ বাঈজীকে বলছেন, ‘নাচো, নাচো। আচ্ছারকম নাচ দেখাও। ক্লাইভ সাহেব এসেছেন। ওঁর বন্ধুরা এসেছেন। নাচ দেখিয়ে ওঁদের আনন্দ দাও।’ বলেই তিনি ফুড়ুক ফুড়ুক করে আলবলার নল টানতে লাগলেন।…

মুনিয়া নাচতে নাচতে সাহেবদের দিকে এগিয়ে এলাে। ক্লাইভ হাততালি দিয়ে তাকে উৎসাহিত করলেন। মুনিয়া সাহেবের আরাে কাছে এলাে। ক্লাইভের গা ঘেঁসে নাচতে লাগলাে।..মুনিয়া নাচতে নাচতে সাহেবদের কাছ থেকে বাবুদের দিকে এগিয়ে এলাে। নবকৃষ্ণ আর তার বন্ধুরা মুগ্ধ হয়ে তার নাচ দেখছেন, গান শুনছেন।”

মুনিয়ার জন্ম লক্ষ্ণৌ শহরে। ভারতের খানদানী বাঈজীদের জন্ম এই শহরেই। বাঈজী -মহল্লায় তাদের কোঠা। মহল্লার নাম চক অথবা চৌক। শহরের নামী বাঈজীদের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন অযােধ্যার নবাব। এরকম একজন বাঈজী হচ্ছে রােশনী। মুনিয়া তারই একমাত্র মেয়ে। মেয়েকে নিজের হাতে নিজের মতন করে তালিম দিয়ে তৈরি করেছে রােশনী। অনেক সময় মা আর মেয়ে দুজনেই একই আসরে নেচে থাকে। মায়ের বয়স ছত্রিশ, মেয়ের বয়েস তার অর্ধেক। নবকৃষ্ণ চেয়েছিলেন মা আর মেয়ে দুজনকেই তাঁর বাড়ির প্রথম নাচের আসরে নাচাতে। কিন্তু রােশনীর অন্য জায়গায় বায়না থাকায় আসতে পারেনি। কাজেই কেবল মুনিয়াকে পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে নবকৃষ্ণকে।

সেকালের বাবুদের সবচেয়ে সেরা নারী ছিল নিকীবাঈ। সংসদ বাঙালী চরিতাভিধানে নিকী সম্বন্ধে বলা হয়েছে, “১৯শ শতাব্দীর এক নামকরা বাঈজী। ঐ শতাব্দীর প্রথম থেকেই পশ্চিমের বাঈজীরা কলিকাতায় আসতে থাকেন এবং পােষকতা পেয়ে অনেকেই পেশাদার জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ক্রমে কলিকাতায় পশ্চিমা বাঈজীদের রীতিমত একটা সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। তৎকালীন সংবাদপত্র থেকে জানা যায়, ১৮২৩ খ্রীঃ নর্তকী নিকী রাজা রামমােহন রায়ের মানিকতলার বাগানবাড়িতে নাচেন। ঐ সময়ে বেগমজান, হিঙ্গুল, নান্নিজান, সুপনজান প্রভৃতি আরও কয়েকজন নর্তকী-গায়িকার নাম পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হত। উক্ত ১৯শ শতাব্দীর প্রথমভাগে নিকী, মধ্যভাগের হীরাবুলবুল এবং শেষভাগে শ্রীজান বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিলেন।”

নিকীকে নিয়ে সেকালের কলকাতার বাবুরা নিজেদের মধ্যে নির্লজ্জভাবে দরকষাকষি করতেন। ফলে নিকীর বাজার দর বেড়ে যেতাে হু হু করে। অনেক সময় তা হয়ে পড়তাে আকাশছোঁয়া। ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, শহর কলিকাতায় নিকী নামে এক প্রধান নর্তকী ছিল। কোনও ভাগ্যবান লােক তাহার গান শুনিয়া ও নৃত্য দেখিয়া সন্তুষ্ট হইয়া এক হাজার টাকা মাসে বেতন দিয়া তাহাকে চাকর রাখিয়াছেন। ১৮০৮ সালের ৬ অক্টোবর দুর্গাপুজোর সময় মহারাজা নবকৃষ্ণেরর পুত্র রাজকৃষ্ণ শােভাবাজার রাজবাড়ির নতুন মহলে বাঈ-নাচের আসর বসিয়েছিলেন। নিকীর নর্তকী হিসেবে সেখানেই আবির্ভাব ঘটে। এই আসরে উপস্থিত ছিলেন লর্ড মিন্টো। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

সে যুগে সমাজের নেতৃস্থানীয়া মহা মাননীয়া মিস্ ইডেনের উদ্দেশ্যে দ্বারকানাথ এখানে একটি নৈশ ভােজ এবং নৃত্যোৎসবের আয়ােজন করেন। এ উৎসবটি ছিল উৎসবকর্তা এবং অভ্যাগত উভয়ের পথেই পরিতৃপ্তিদায়ক। এ উৎসব উপলক্ষে কক্ষ গুলাে করা হয়েছিল আলােকোদ্ভাসিত, দর্পণের প্রতিবিম্বে উজ্জ্বল। মির্জাপুর কার্পেট ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কক্ষে কক্ষে, বুটিদার রক্তিমাভ কাপড় এবং সবুজ সিল্কের সমারােহে কক্ষ গুলাের উৎসব-সজ্জিত রূপ ছিল অনিন্দ্য। টেবিলগুলাের ওপরের আচ্ছাদন ছিল তে পাথরের। তাতে শােভা পাচ্ছিল বর্ণবৈচিত্রময় পুষ্পস্তবক। দুষ্প্রাপ্য বহু অর্কিড, বিচিত্রভাবে শােভিত ছােট ছােট ঝােপ ও লতাপাতা দিয়ে সাজনাে হয়েছিল সিঁড়ি, বারান্দা, বৈঠকখানা এবং কেন্দ্রস্থিত প্রশস্ত হলঘর। গ্রীষ্মবাস এবং ঝুলন্ত সেতুটিকে সজ্জিত করা হয়েছিল লতাপাতা, পুষ্প, দেওদার পাতা ও বহু বর্ণ-বিচিত্র পতাকা দিয়ে। প্রাঙ্গন এবং জলসরবরাহের কেন্দ্রটি আলােকোজ্জ্বল করা হয়েছিল হাজার হাজার অলঙ্কৃত বাতি দিয়ে। সেকালের জনৈক লেখক উৎসব-স্থানটির বর্ণনা করেছেন। ইন্দ্রপুরীর দৃশ্য বলে। হলঘরটি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল মধুর সঙ্গীতে, বহু রাত্রি পর্যন্ত উৎসবের নৃত্য চলেছিল সমানভাবে। সেদিনের রাত্রির মত এত চমৎকার বাজি পােড়ানাে ভিলায় আর দেখা যায়নি। কলকাতার সমস্ত অভিজাত সম্প্রদায় উপস্থিত ছিলেন সে রাত্রির উৎসবে। অভূতপূর্ব আড়ম্বরের মধ্যে সে রজনীর উৎসব সমাপ্ত হয়েছিল।”

তৎকালে প্রচলিত একটি ব্যঙ্গাত্মক ছড়ার মধ্যেও বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে আয়ােজিত আমােদ-অনুষ্ঠানের খ্যাতির পরিচয় পাওয়া যায়, “বেলগাছিয়ার বাগানে হয় ছুঁরি কাটারি ঝঝনি, খানা খাওয়ার কত মজা, আমরা তার কি জানি? জানেন ঠাকুর কোম্পানী।”

আমােদ উৎসবে টাকা ওড়ানাের প্রতিযােগিতায় ইংরেজ নবাবরা দেশীয় বাবু নবাবদের তুলনায় পিছিয়ে ছিলেন না। তারাও উৎসব উপলক্ষে নাচগানের আসর বসাতেন এবং লক্ষ টাকার আতসবাজীর খেলা দেখানাে হত। ১৮০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আতসবাজীর খেলার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে  বিভিন্ন সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায়—

জীবিকা নির্বাহের জন্য রাজা রামমােহনের অর্থোপার্জনও সর্বাংশে সুস্থ ও নিষ্কলঙ্ক ছিল না বলে কেউ কেউ অভিমত প্রকাশ করেছেন। কিশােরীচাঁদ মিত্রের মতাে সেকালের বিধাসযােগ্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রচলিত জনরবের প্রতি অঙ্গুলি সঙ্কেতে বলেছেন যে, সেকালের অন্যান্য বাঙালি দেওয়ানের মতাে রাজা রামমােহনও সরকারি কর্মে লিপ্ত থাকাকালীন উৎকোচ গ্রহণ করে আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। ক্যালকাটা রিভিউ’তে কিশােরীচাঁদ মিত্র লিখেছেন,

“দেওয়ান হিসাবে কাজ করে তিনি এত টাকা উপার্জন করেছিলেন, যাতে ‘বছরে দশ হাজার টাকা আয়ের জমিদার হতে পেরেছিলেন। একথা সত্য হলে এই অসাধারণ মানুষটির নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে গুরুতর সন্দেহ জাগে।” এ সম্পর্কে কে.এস. ম্যাকডােনাল্ড বলেছেন, “দেওয়ান হিসাবে দশবছরের চাকরিজীবনে তিনি এত টাকা সঞ্চয় করেছিলেন, যা দিয়ে তিনি বার্ষিক ১০০০ পাউণ্ড অথবা মাসিক ১০০০ টাকা আয়ের সম্পত্তি কিনেছিলেন। এই ঘটনা তার খ্যাতি বৃদ্ধির সহায়ক হয়নি। তাছাড়া সলােমনের মতাে না হয়ে ধন-উপার্জন ও সম্পদ রক্ষা করাকে জীবনের লক্ষ বলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, এমনকি সেটাকে জ্ঞানের কাছে দ্বিতীয় স্থান পর্যন্ত দেননি।”

উপরের বিষয়গুলি মনে রেখে রাজা রামমােহনের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তার কর্মপ্রয়াস সম্পর্কে আলােচনা করলে তাঁর মূল্যায়ন যথার্থ ও ইতিহাস-সম্মত হবে। কারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা ও চরিত্র তার মতামত ও কর্মপ্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করে। পােষাক-পরিচ্ছদ, জীবনযাত্রা জীবিকা নির্বাহ বিষয়ে শহরের অন্যান্য ধনিক বাবুদের সঙ্গে রাজা রামমােহনের কোনাে প্রভেদ ছিল না। তিনি এদের মতাে পােষাক-পরিচ্ছদ, এদের মতাে জীবনযাত্রা এবং এদের মতাে কোম্পানির কাগজ, ভূসম্পত্তি ও নানারকম আয়ের (জ্ঞাত ও অজ্ঞাত) উপর নির্ভরশীল ছিলেন। তবে রামমােহন শিক্ষাদীক্ষায় এদের চেয়ে অনেক উন্নত ছিলেন। দেওয়ানি লাভের পূর্বে তিনি আরবি-ফারসি ও সংস্কৃত শাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। জন ডিগবির দেওয়ান রূপে রংপুরে থাকা কালে রামমােহন ইউরােপীয় ইতিহাস-বিজ্ঞান-দর্শনের বহু গ্রন্থ পাঠ করেন এবং বিধের বিভিন্ন দেশসমূহের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কিত বহু গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। বেন্থাম, হিউম, রিকার্ডো, জেমল মিল, জন স্টুয়ার্ট মিল প্রমূখ সেকালের শ্রেষ্ঠ ইউরােপীয় চিন্তাশীলদের রচনাবলী পাঠে তিনি প্রভাবিত হয়েছেন।

কলকাতায় ও ইংল্যাণ্ডে বসবাস কালে রাজা রামমােহনের বিভিন্ন কর্মপ্রয়াসের মধ্যে তাদের প্রভাব অনুভূত হলেও তা সামন্ত-স্বার্থের জন্য খণ্ডিত ও পরস্পর-বিরােধী ছিল। উল্লেখ্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই আমরা দেখতে পাই সে যুগের কলকাতার নব্য ধনী পরিবারে বাঈ নাচের প্রচলন। আশুতােষ ভট্টাচার্য লিখেছেন, “অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে যেসকল নৃত্য উত্তর ভারত অঞ্চল হইতে বাংলাদেশে প্রসার লাভ করিয়াছে, তাহাদের মধ্যে…বাঈজী নাচ অন্যতম। যতদূর জানা যায়, বাঈ নর্তকীরা কলকাতায় এসেছিলেন উত্তর ভারত থেকে।  যেহেতু মহারাষ্ট্রে মহিলাদের উপাধি বাঈ, তার থেকেই অনুমিত হয় যে এই নর্তকীরা মহারাষ্ট্র থেকে আগত। বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ লিখেছিল বাইদিগের নৃত্য মহারাষ্ট্রীয়।…

বাঈজীদের মধ্যে যাঁরা তদানীন্তন ইউরােপীয় পর্যটকদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশংসা পেয়েছিলেন তারা অধিকাংশই গায়িকা রূপে পরিচিতা। রামমােহন রায় প্রভৃতি বাঙালি ধনী পৃষ্ঠপােষকদের বাড়িতে নিমন্ত্রিত ইউরােপীয় শ্রোতারা ‘নিকী’-র কণ্ঠস্বরের সঙ্গে তখনকার ইতালীয় অপেরা গায়িকা অ্যাঞ্জেলিকা ক্যাটলানি (১৭৮০-১৮৪৯) ও জার্মান গায়িকা এলিজাবেথ বিলিংটন (১৭৬৮-১৮১৮)-এর তুলনা করতেন। এই দুই ইউরােপীয় গায়িকার মতাে ‘নিকী’র গলা খেলত উচ্চ সপ্তকে।

শােভাবাজারের রাজকৃষ্ণ দেব, জোড়াসাঁকোর সিংহ পরিবার, সিমলের দে-রা দুর্গাপূজার সময় এইসব বাঈজী নর্তকীদের দৈনিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা প্রণামী দিয়ে নিযুক্ত করতেন। যদিও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে, এইসব রাজা-রাজড়ারা আর ছিলেন না, ওইসব বাঈজী নর্তকী ও তাদের বংশধরেরা তখনও কলকাতায় আসর জমিয়ে বসে ছিলেন। দুর্গাচরণ রায়ের ‘দেবগণের মর্তে আগমনে’ (১৮৮৯) খবর পাচ্ছি তখনকার দিনের ‘বাঈওয়ালির মধ্যে ইলাহিজান…বিখ্যাত’। সঙ্গে সঙ্গে যােগ করা হচ্ছে— “খেমটাওয়ালিদের মধ্যে হরিদাসী ও কামিনী বিখ্যাত।” পৃথকীকরণের চেষ্টাটা লক্ষণীয়। পুজোয় এবং বিবাহ উপলক্ষে, গ্রামাঞ্চলে জমিদার ও ধনীগৃহে এ শতাব্দীর শুরুতেও এঁদের বায়না দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতাে। যদিও ব্রাহ্ম সমাজের নেতারা খেমটার সঙ্গে সঙ্গে বাঈ নাচেরও বিরােধিতা করতেন। 

পলাশি যুদ্ধের পর দুর্গাপুজো উপলক্ষে শােভাবাজারের মহারাজা নবকৃষ্ণ তৈরি করিয়েছিলেন আদি রাজবাড়ির সঙ্গে আদি-ঠাকুরদালান। আর সেই সঙ্গে তৈরি করিয়েছিলেন একটা নাচঘর, যেখানে বসে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ক্লাইভরা বাঈ-নাচ দেখে কৃতার্থ হয়েছিলেন। রেভারেন্ড ওয়ার্ডের বিবরণীতে একটা জিনিস লক্ষণীয়—শােভাবাজারের রাজকৃষ্ণদেব, যিনি বাবা নবকৃষ্ণের মত, একদিকে অভিজাতবর্গের বিনােদন—বাঈ নাচের পৃষ্ঠপােষক। আবার একই সঙ্গে নিম্নবর্গের জনপ্রিয় কবিগান অনুষ্ঠানেরও উদ্যোক্তা। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

বহুমূল্য ইউরােপীয় আসবাবপত্রে মাণিকতলার বাড়িটি সুসজ্জিত করে রাজা রামমােহন কলকাতার জীবনযাত্রা শুরু করেছেন। এখানে উল্লেখযােগ্য যে, সমসাময়িক কালে রাজা রামমােহন রায়ের এক যবনী রক্ষিতা ছিল। উমানন্দন ঠাকুরের এক প্রশ্নের উত্তরে রাজা রামমােহন রায় বলেছিলেন যে, ওরূপ যবনী রক্ষিতা শৈবমতে বিবাহিতা স্ত্রীর সামিল।

অনেকের ধারণা রামমােহন গােপনে এক মুসলমান রমণীকে বিবাহ করেন এবং তার ঘরে এক পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করে। পুত্রটি আর কেউ নন, তিনি রাজারাম রায় যাকে রামমােহন নিজের পালিত পুত্র হিসেবে ঘােষণা করে তাকে নিয়ে ১৮৩১ সালে বিলেতে যান এবং সেখানে তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেন। রামমােহনের মৃত্যুর পর রাজারাম বিলেতেই থেকে যান। রামমােহনের মেয়েটিকে হুগলির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বিবাহ দেওয়া হয়। কিন্তু বিনয় ঘােষ এমন তথ্য স্বীকার করেননি। তিনি জানিয়েছেন রাজারাম রায় রামমােহনের নিজের সন্তান নন, দত্তক নন, আশৈশব পুত্রবৎ পালিত একজন এদেশীয় সন্তান। তিনি হিন্দুর, না মুসলমানের, না খ্রীস্টানের, না ইহুদীর, কার সন্তান তা আজও জানা যায়নি। ১৮২৩ সালে রামমােহনের মাণিকতলার বাগানবাড়িতে আয়ােজিত ভােজসভায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তার ডায়রিতে ঘটনার আরও বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন, “বেশ বড় চৌহদ্দীর মধ্যে তার বাড়ী, ভােজের দিন নানা বর্ণের আলাে দিয়ে সাজানাে হয়েছিল। চমৎকার আতসবাজীর খেলাও হয়েছিল সেদিন। আলােয় আলােকিত হয়েছিল তার বাড়ী। বাড়ীতে বড় বড় ঘর ছিল এবং একাধিক ঘরে বাঈজী ও নর্তকীদের নাচগান হচ্ছিল। বাঈজীদের পরণে ছিল ঘাঘরা, সাদা ও রঙ্গীন মসলিনের ফ্রিল দেওয়া, তার উপর সােনা রূপাের জরির কাজ করা। সাটিনের ঢিলে পায়জামা দিয়ে পা পর্যন্ত ঢাকা। দেখতে অপূর্ব সুন্দরী, পােষাকে ও আলােয় আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল। গায়েতে অলঙ্কারও ছিল নানারকমের। তারা নাচছিল দলবেঁধে বৃত্তাকারে, পায়ের নূপুরের ঝুমঝুম শব্দের তালে তালে।…নর্তকীদের সঙ্গে একদল বাজিয়ে ছিল, সারেঙ্গী মৃদঙ্গ, তবলা ইত্যাদি নানারকম বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিল তারা। …বাঈজীদের মধ্যে একজনের নাম নিকী, শুনেছি সারা প্রাচ্যের বাঈজীদের মহারাণী সে, এবং তার নাচগান শুনতে পাওয়া রীতিমত ভাগ্যের কথা। বাঈজীদের নাচগান শােনার পর রাতের খাওয়া-দাওয়াও শেষ হল। তারপর এদেশের ভেলকিবাজ জাগলারদের অদ্ভুত সব ত্রীড়াকৌশল আরম্ভ হল। কেউ তলােয়ার লুতে হাঁ করে সেই ধারালাে অস্ত্রটা গিলে ফেললে, কেউ বা অনর্গল আগুন ও ধোঁয়া বার করতে লাগল নাকমুখ দিয়ে। একজন শুধু ডান পায়ের উপর দাঁড়িয়ে পিছন দিক দিয়ে বাঁ পা তুলে ধরল কাধের উপর। এই ধরণের কৌশল দেখে নকল করার চেষ্টা করাও বিপজ্জনক। বাড়ীর ভিতর সুন্দর ও মূল্যবান আসবাবপত্র সাজানাে এবং সবই ইউরােপীয় স্টাইলে, কেবল বাড়ীর মালিক হলেন বাঙ্গালীবাবু (রামমােহন রায়)।”

রাজা রামমােহনের অন্তরঙ্গ সুহৃদ প্রিন্স দ্বারকানাথও নিকৃষ্ট আমােদ-প্রমােদ করতেন। ১৮২৩ সালে তার নতুন বাড়িতে গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে অনেক কৌতুকাবহ ভাঁড়ামির অভিনয় হয়েছিল। ‘সমাচার দর্পণ’-এর সংবাদে প্রকাশ “মােং কলিকাতা ১১ ডিসেম্বর ২৭ অগ্রহায়ণ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরে শ্ৰীযুত বাবু দ্বারিকানাথ ঠাকুর স্বীয় নবীন বাটীতে অনেক ভাগ্যবান সাহেব ও বিবীরদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনাইয়া চতুর্বিধ ভােজনীয় দ্রব্য ভােজন করাইয়া পরিতৃপ্ত করিয়াছেন এবং ভােজনাবসানে ওই ভবনে উত্তম গানে ও ইংলণ্ডীয় বাদ্য শ্রবণে ও নৃত্য দর্শনে সাহেবগণে অত্যন্ত আমােদ করিয়াছিলেন। পরে ভাঁড়েরা নানা সঙ করিয়াছিল কিন্তু তাহার মধ্যে একজন গাে-বেশ ধারণপূর্বক ঘাস চর্বণাদি করিল।”

দেশীয় জমিদার-দেওয়ান-বেনিয়ান ও ইউরােপীয় বণিক-কর্মচারীদের আনন্দ দানের জন্য প্রিন্স দ্বারকানাথের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ির অনুষ্ঠানে আতসবাজী ও আলাের বিচিত্র খেলায়, আমােদ-প্রমােদের বিলাসে লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল। গভর্ণর জেনারেল লর্ড অকল্যাণ্ডের ভগ্নী মিস ইডেনের সম্মানে যে বিরাট উৎসবানুষ্ঠানের আয়ােজন এই বাগানবাড়িতে করা হয়েছিল, তার বর্ণনা দিয়েছেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, “যখন গবর্নর জেনারেল লর্ড অকলণ্ড ছিলেন, তখন আমাদের বেলগাছিয়ার বাগানে। অসামান্য সমারােহে গবর্নর জেনারেলের ভগিনী মিস ইডেন প্রভৃতি অতি প্রধান প্রধান বিবি ও সাহেবদিগের এক ভােজ হয়। রূপে, গুণে, পদে, সৌন্দর্য্যে, নৃত্যে, মদ্যে, আলােকে বাগান একেবারে ইন্দ্রপুরী হইয়া গিয়াছিল।”

দ্বারকানাথের জীবনীকার কিশােরীচাঁদ মিত্র বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ির বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, “এখানেই তাঁর আতিথেয়তা রাজকীয় আড়ম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল। এবাড়ির প্রশস্ত উদ্যানের মধ্যে এঁকে বেঁকে প্রসারিত মতিঝিল ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়। মতিঝিলটি ঝলমল করত হিন্দু কবির অতি প্রিয় নীলপদ্ম ও অন্যান্য হরেকরকম সুন্দর সুন্দর ফুলের ঐশ্চর্য্য। ফেব্রুয়ারী ও মার্চ চতুর্দিক প্রসারিত প্রাঙ্গনে যেন পিটুনিয়া, পিঙ্ক, ফ্লস্, সাক্ পার্স, গােলাপ, জিনিয়া প্রভৃতি ফুলের আগুন লাগত। এ বাড়ির সুপ্রশস্ত বৈঠকখানা এমন রীতিতে সজ্জিত হয়েছিল যা সে-যুগে দুর্লভ। ভিলার শিল্পশালার দেওয়ালগুলাে ছিল আধুনিক শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনে অলঙ্কৃত এর কারণ স্বরূপ বলা যায় এর মালিক ছিলেন চিত্র এবং ভাস্কর্যের উৎকর্ষ বিচারে যথার্থ অভিজ্ঞ। বৈঠকখানার পিছনে ঝকমক করত মার্বেল পাথরে বাঁধানাে ফোয়ারা, তার উপরে ছিল কিউপিডের একটি মুর্তি। মতিঝিলের মাঝখানে ছিল একটি দ্বীপ, দ্বীপের উপর একটি গ্রীষ্মবাস। একটি ঝােলানাে লােহার সেতু ও একটি হালকা কাঠের সেতুর সাহায্যে গ্রীষ্মবাসটি মূল বাগানের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এ গ্রীবাস ছিল আমােদ-প্রমােদের কেন্দ্র। পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত হলেও বেলগাছিয়া ভিলাকে বলা চলত কলকাতার ওয়েস্ট এণ্ড বা কেনসিংটন। এখানে দ্বারকানাথ অতিথিদের আপ্যায়ন করতেন। বলতে কী, বেলগাছিয়া ভিলার উৎসবগুলাের মত বিলাসবহুল ও জমকালাে উৎসব সে যুগে খুব কমই হত। অভ্যাগতদের জন্য যে রান্না হত তার প্রণালী ছিল অতুলনীয়। আভিজাত্যে ও শ্রেণী মর্যাদায় অতিথিরাও হতেন অনন্য। খাদ্য তালিকায় থাকত ফরাসী ও প্রাচ্য দেশীয় খাদ্যের অফুরন্ত বৈচিত্র। তাদের মধ্যে অবশ্য সবচাইতে কদর ছিল কাবাব, পােলাও এবং হােসেনীর। মদ আমদানি করা হত সােজা ইউরােপ থেকে। আর দ্রাক্ষা মদিরার মধ্যে সেগুলাে ছিল সেরা জাতের।…

কাউন্সিলের সদস্যরা এবং সুপ্রিম কোর্টের জজরাও দ্বারকানাথের আতিথ্য গ্রহণ করতেন। আর আসতেন বিভাগীয় জেনারেলগণ আর পরগণার জমিদাররা। এধরণের ভােজসভায় পুরনাে সিভিলিয়ানরা এবং ভােগক্লান্ত সামরিক কর্মচারীরা তরুণ সহকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করতেন।… বেলগাছিয়া ভিলাই ছিল সেযুগের একমাত্র ব্যক্তিগত বাগানবাড়ি বা একমাত্র স্থান যেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর ইউরােপীয় ও দেশীয় ভদ্রলােকেরা মিলিত হতেন, মেলামেশা করতেন স্বচ্ছন্দ অন্তরঙ্গতায়। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

নর্তকীদের আনার জন্য পাল্কী পাঠিয়ে দেওয়া হত। সঙ্গে যেত পাইক ও বরকন্দাজ। পাল্কীটাকে বেহারারা নাটমন্দিরের সামনে এনে নামাত। “রাজা সাহেব এগিয়ে আসতেন খুশী উজ্জ্বল দুটো কামাতুর চোখ নিয়ে। মােসাহেবের দল অপরিসীম কৌতুহল নিয়ে পাল্কীর রুদ্ধ দুয়ারের দিকে তাকাতেন। তারপর দরজা দুটো খুলে যেত। নর্তকী নামত, পরনে মসলিনের পেটিকোট ও ওড়না ও সমস্ত দেহ অলঙ্কারে মােড়া, ঠোঁটে উজ্জ্বল হাসি ঠিকরে পড়ত। রাজা সাহেব এগিয়ে আসতেন, বলতেন, এস বিবিজান।” নিকী বাঈজীকে সেই সময়ে (১৮১৯) কলকাতার এক ধনী ব্যক্তি মাসিক এক হাজার টাকা দক্ষিণা দিয়ে রক্ষিতা রূপে গ্রহণ করে সমাজে প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। মহারাজ সুখময় রায়ের বাড়ির ১৭৯২ সালের দুর্গাপূজা আর বাঈজী নাচের বিবরণ ‘ক্যালকাটা ক্রনিকল’-এ প্রকাশিত হয়।

“The only novelty that rendered the entertainment different from those of lost year, was the introduction or rather the attempt to introduce some English tunes among the Hindusthani Music.

রাজেন্দ্র মল্লিকের কান-ফোঁড়া উপলক্ষে যে জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবানুষ্ঠান হয়েছিল, তার বিবরণ ১৮২৩-র ১৫ মার্চ ‘বেঙ্গল হরকরা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, “বাটির বাহিরে যেরূপ আলাে দেওয়া হইয়াছিল ভিতরের আড়ম্বর উহা অপেক্ষা কোন অংশে নূন ছল না। লাল ভেলভেট পাতা পথের উপর দিয়া ভিতরে যাইবার ব্যবস্থা, চারিদিকে সুবর্ণ খচিত ফুলের মালা ও ফুলে সুসজ্জিত, সঙ্গীত ও সৌন্দর্য্যে যেন স্বর্গের নন্দনকানন বলিয়া ভ্রম হয়। নর্তকী গায়িকার সংখ্যা অধিক না হইলেও যে দুইজন নাচিতেছিল তাহারা অলৌকিক সৌন্দৰ্য্যশালিনী। নিকীর গান ও রূপের বর্ণনা তাহার সঙ্গিনীর সঙ্গে মানাইয়াছিল। গােলাপের সহিত পদ্মের বর্ণ যেন মিশ্রিত হইয়া অনুপম কপােলে উজ্জ্বলাভা বিকীর্ণ করিতেছে, চক্ষু হইতে আনন্দ উৎস বিচ্ছুরিত হইতেছে, অন্যটিকে ইউরােপের রবিন পক্ষীর মত সুন্দর মনে হয়, তাহারা যেন কন্দর্পের শর লইয়া ত্রীড়া কন্দুক করিতেছিল। যাহা যেরূপ হওয়া উচিৎ উহা সেইরূপই হইয়াছিল। সুনির্বাচিত সম্মিলনীতে সুমিষ্ট সুরা লেহ্য পেয় শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতের সহিত নৃত্যাদিতে যথারীতি আদর আপ্যায়নে আমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ পরিতুষ্ট, কিছুরই ত্রুটি ছিল না।”

আসুন এবার যাই ১৮০৬ সালের শােভাবাজারের রাজা রাজকৃষ্ণের রাজবাড়িতে দুর্গাপূজা ও বাঈজী নাচ দেখতে। সত্যি সত্যি তাে যাওয়া যাবে না, তাইভিসা দেখা যাক আমন্ত্রিত অতিথি ধর্মযাজক ওয়ার্ড কি দেখেছিলেন। তিনি শােভাবাজর রাজবাড়িতে এ বছরের দুর্গাপুজোয় উপস্থিত ছিলেন। তিনি লিখেছেন,

“আমি শােভাবাজার রাজবাড়ীর দুর্গোৎসবে উপস্থিত ছিলাম। চারমহল প্রাসাদের মাঝে উৎসব প্রাঙ্গণ, সামনে ঠাকুর দালান। পুবদিকে একখানা ঘরে মদ ও সাহেবি খানার আয়ােজন হয়েছে সাহেব অতিথিদের জন্যে। ঘরের সামনে দুজন পর্তুগিজ খানসামা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দু’পাশের ঘরে নিমন্ত্রিত এদেশীয় অতিথিরা উপস্থিত। মাঝখানে বিশাল অঙ্গণে হিন্দু নর্তকীদের নাচগান চলছে। সাহেব অতিথিরা চারদিকে কৌচে বসে তন্ময় হয়ে দেখছেন। মাঝে মধ্যে মুসলমান বাঙ্গরা হিন্দুস্থানী গান গেয়ে ও রঙ্গ তামাশা করে আসরের সকলকে আপ্যায়ন করছে। রাত তখন দুটো। বাঈজী ও নাচের মেয়েরা চলে গেল। ক্রমে সাহেব অতিথিরাও বিদায় নিলেন। কেবলমাত্র আমরা কয়েকজন তখনও বসে।”

অভিজাত সমাজের মানুষদের বাড়িতে দরজা বন্ধ করে কড়া পাহারা’র আড়ালে অনুষ্ঠিত হত বাঈজী নাচ, সাহেবদের আপ্যায়ণের উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ আগে নিশ্চিত মনে রেভারেন্ড ওয়ার্ড দেখছিলেন বাঈজীদের, “সুবেশে সজ্জিত, গাইছে, নাচছে যেন নিদ্রাতুর পদক্ষেপে, তাদের ঘিরে আছে সােফায় কাউচে বসা ইউরােপীয় অতিথিবৃন্দ…।” 

এমনই একটা বিনােদনের আয়ােজন হয়েছিল রাজা রামমােহনের বাসভবনে। সেখানে নিকী বাঈর মত আধুনিক ‘বসন্ত সেনা’ বহুবার নৃত্যগীতাদি প্রদর্শন করেছিল। এদের উৎসবানন্দের জলসায় দেশীয় ধনিক ও কোম্পানির তােঙ্গ সাহেব কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করতেন। এদের বল্গাহীন আমােদ-প্রমােদের একটি সংযত ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন ফ্যানি পার্ক। তিনি সে সময়ে কলকাতায় এসেছিলেন এবং একজন ধনিক বাঙ্গালী বাবুর বাড়ী’র উৎসবে উপস্থিত হয়েছিলেন। তার বিবরণে জানা যায়,

“...পাশের একটি বড় ঘরে নানারকমের উপাদানে উপাদেয় সব খাদ্যদ্রব্য প্রচুর পরিমাণে সাজানাে ছিল। সবই বাবুর ইউরােপীয় অতিথিদের জন্য বিদেশী পরিবেশক ‘মেসার্স গাণ্টার অ্যাণ্ড হুপার’ সরবরাহ করেছিলেন। খাদ্যের সঙ্গে বরফ ও মদ্যও ছিল প্রচুর। মণ্ডপের অন্যদিকে বড় একটি হল ঘরে সুন্দরী সব পশ্চিমা বাঈজীদের নাচগান হচ্ছিল এবং ইউরােপীয় ও এদেশী ভদ্রলােকরা সােফায় হেলান দিয়ে চেয়ারে বসে সুরা সহযােগে সেই দৃশ্য উপভােগ করছিলেন।”

১৮১৪ সালে রাজা সুখময় রায়ের ছেলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের বাড়ির দুর্গাপুজোর খবর বেরিয়েছিল ক্যালকাটা গেজেটে। সেদিন শহরের বিখ্যাত বাঈজী নিকী নেচেছিলেন। ২০ অক্টোবর প্রকাশিত এ খবরে জানা যায় দুর্গোৎসবের সময় কলকাতার ধনিক হিন্দুরা পরস্পর অমিতব্যয়ের প্রতিযােগিতায় অবতীর্ণ হন এবং তাদের কাণ্ডকারখানা দেখে মনে হয় টাকার জেল্লা দেখিয়ে যেন তারা সমাজে মান-মর্যাদা অর্জন করতে চান এবং গণ্যমান্য হতে চান সাধারণ মানুষের মধ্যে। রাজা সুখময় রায়ের পুত্র রাজা কিষাণচাঁদ রায় ও তার ভায়েদের গৃহে পুজোর কয়েকদিন নিকী নামে বিখ্যাত বাঈজীর নৃত্যগীত পরিবেশিত হবে। পূর্বাঞ্চলের একজন শ্রেষ্ঠ বাঈজী বলে নিকীর নামডাক আছে। অতএব শহরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় উৎসব হবে রাজা সুখময় রায়ের গৃহে। নীলমণি মল্লিকের গৃহে নৃত্যগীত হবে বাঈজী ঊষারাণীর। সারা হিন্দুস্থানে ঊষারাণীর মতন সুকণ্ঠ গায়িকা আর দ্বিতীয় নেই।”

এর দু’বছর পরে এক বাঈনাচের খবর বেরিয়েছিল ‘এশিয়াটিক জার্নাল’-এ। এই সংবাদ থেকে বাবুদের বাঈজী নাচের ও অন্যান্য আড়ম্বরের প্রতিযােগিতার কথা জানা যায়। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, হয়তো এই কারণেই শরৎচন্দ্র রাজলক্ষ্মীকে খেমটাওয়ালি না বানিয়ে মোগলাই জগতের বাইজি বানিয়ে তুলেছেন। এই বিচারে রামমোহন, অবনীন্দ্রনাথের বাইজি গানের প্রতি মুগ্ধতা অবিশ্বাস্য ঠেকে না। কিন্তু এই গল্পে যদি বিবেকানন্দও প্রবেশ করেন, তাহলে? অবাক করা গল্প আমাদের শুনিয়েছেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ। খেতরীর রাজসভায় উপস্থিত বিবেকানন্দ। এক বাইজি গান শোনাতে এসেছেন। বিবেকানন্দ তো এমন গান শুনবেন না। রাজা বহু অনুরোধে তাঁকে একখানা গান শোনার জন্য রাজি করালেন। বাইজি গান ধরলেন- “প্রভু মোর অবগুণ চিত না ধর।/ সমদরশি হ্যায় হাম তোমার।" গান শুনে চোখ জলে ভরে উঠল বিবেকানন্দর। নিজের সন্ন্যাসকেও মনে মনে দুষলেন তিনি। এরপর থেকে সেই বাইজিকে ‘মা’ সম্বোধন করতেন বিবেকানন্দ। খেতরীতে গেলেই রাজাকে বলতেন, “আমার মাকে ডাক, আমার গান শুনিতে ইচ্ছা হইয়াছে।”

কলকাতায় কলের গানের রেকর্ডকে ভরিয়ে তুললেন সালকাজান, গওহরজান, কৃষ্ণভামিনী, হরি বাইজিরা। গওহরজান গাইলেন রবীন্দ্রনাথের “কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলাম না”, রবীন্দ্রনাথের গানে কণ্ঠ দিলেন কৃষ্ণভামিনীও। ১৯২৯-এ শরচ্চন্দ্র শীল-এর সংগ্রহে প্রকাশ পেল ‘বাইজি সংগীত’। মোট ১৩৮টি গানের সংকলন। যার শুরুতেই রবীন্দ্রনাথের গান—‘ভালবেসে যদি সুখ নাহি’, এছাড়াও রয়েছে অমৃতলাল বসু, গিরিশচন্দ্র, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের গান। সেইসব গান বাইজি কণ্ঠে গিয়ে নিশ্চয়ই চরিত্র হারায়নি, বরং নতুন ঐশ্বর্য পেয়েছিল।

উনিশ শতকের কলকাতায় বাবু বিলাসের মধ্যে দিয়ে বাগানবাড়িতে মনোরঞ্জনের জন্য শুরু হয়েছিল বাইজি প্রথা। সেই সময়ে সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষিত মানুষরা খুব ভালো চোখে নিত না। বাই এবং বারঙ্গনা প্রায় সমার্থক ছিল। ওই একই ভুল বহু ঐতিহাসিক করেছেন। বারঙ্গনা হলো শারীরিক আনন্দ দেওয়া আর বাইজি হলো যদি ভালো লাগে তবে মনও দেব। সব নয় কিছু বাবুদের সাথে তো দেহের বাইরেও সম্পর্ক ছিল। বাইজি গান মানে কি? ঠুমরি দাদরা গজল, চৈতি আজ যেটা শাস্ত্রীয় সংগীতের সাথে যুক্ত। অর্থাৎ বাইজি গান ভারতীয় সংস্কৃতিকে শুধু পুনর্জীবন দেয়নি বৈচিত্রও এনে দিয়েছে। ওই সময়ে নব্য বাবুরা শুধু যে মেয়ে আর মদ্য পানে ডুবে থাকতো এটা যেমন সত্যি ,আবার উল্টো দিকে এই বাবুরাই নাট্য চর্চায় পয়সা ঢালতেন। তার ফলে নাটক ও যাত্রার গণ ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। তাঁর ফলে গিরিশ ঘোষের উথ্যান। বাগান বাড়ি গুলো ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। এই বাগান বাড়িতে আসতো বিত্তশালী সৌখিন বাবুরা। এই বাগানবাড়ি ছিল যেখানে সেটা প্রায় জনবসতি শূন্য। যাতে সাধারণ মানুষ আসতে না পারে।

বেলগাছিয়া ভিলা, গৌরী সেনের বাগানবাড়ি, গোবিন্দ রাম মিত্রের বাগানবাড়ি, দমদমে শেঠ দুনি চাঁদের বাগানবাড়ি, সেনদের বাগান বাড়ী, মোহন কানন, ছিল শীলদের বাগানবাড়ি, ঘোষেদের বাগান (বাবু খেলাত ঘোষ), এছাড়া দাসদের বাগান ও গোয়েনকাদের বাগান ইত্যাদি। এই বাগানবাড়ির ইতিহাস প্রায় দুশো বছরের। এর প্রসার ঘটে মোঘল আমলে। বাইজিরা মূলতঃ এসেছেন তিনটি জায়গা থেকে। সেটা হলো লখনৌ, বারাণসী ও আগ্রা থেকে। কেউ কেউ গান শিখে মানে তালিম নিয়ে এসেছেন। কেউ আবার সারেঙ্গি বাদকের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। বাইজিরা প্রধানতঃ বাবুদের ব্যবহার করেছেন। একমাত্র প্রেম হলো সংগীত আর যেখানে পয়সা পাওয়া যায় সেখানে তো প্রেম দেখাতেই হবে। সুতরাং বাইজি গান লজ্জার ইতিহাস নয় আমাদেরই সংস্কৃতির অঙ্গ।

পরবর্তীকালে অনেক বাই বাইজি নাটকে কাজ করেছেন এবং বড় বড় সংগীত সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন আর সংগীত রসিক মানুষ ভীড় রাতের পর রাত জেগে গান শুনেছেন। বহু বাইজি শিল্পীদের কলকাতায় সংগীত জগতে প্রতিষ্ঠা করতে হাত বাড়িয়ে ছিলেন অত্যন্ত গুণী সাধক গিরিজা শংকর চক্রবর্তী আর ছিলেন টালার মন্মথ নাথ গাঙ্গুলী, হিরু গাঙ্গুলির পিতা আর অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন রাজা মনিন্দ্র ও বাবু খেলাত ঘোষ। এটাই ইতিহাস যার উৎস এই বৃহত্তর পাইকপাড়ায়।

আর এক বাইজি বা বাই এর কথা না বললে লেখা শেষ হবে না। তিনি হলেন আখতারি বাই। মানে বেগম আখতার। যিনি জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের সুরে বাংলা গান গেয়েছেন। 'জোছনা করেছে আড়ি।' মানুষ আজও মনে রেখেছে। এই বাইজিদের কি যন্ত্রনা ছিল কোনো দিন কোনো বাবুকে বুঝতে দেয় নি। সবই প্রকাশ করেছে সুর আর গাইওকির মাধ্যমে। এই বাগান বাড়িতেই আবার সাহিত্যের আড্ডা বসতো। যেমন কিশোরী চাঁদের মিত্রর বাগান বাড়ী। আড্ডা দিতেন ভাই প্যারি চাঁদ মিত্র ও প্রমুখ। এই বেলগাছিয়ার বাগান বাড়িতে বসতো হিন্দু মেলার বৈঠক। প্রচুর কংগ্রেসের অধিবেশন ও হয়েছে। এই কাশীপুরের বাগানবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ। আর এখানেই বসেই ভক্তি মার্গের কথা বলেছেন।

ওই সুন্দরী বাঈজীদের বাবু ও জমিদারেরা ভাড়া করে আনতেন। নাচ, গান, বাজনা আর খাওয়া দাওয়ার সঙ্গে বাজী পােড়ানাে এবং আরও কুৎসিত আমােদ-প্রমােদের উৎসব চলতাে ঢালাও ভাবে। বাড়ির এই উৎসবে ইংরেজ মনিবদের নেমন্তন্ন করা হােত। এই ছিল নগর কলকাতার নাগরিক জীবনের একমাত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়। ‘আত্মীয়সভা’ ও ‘ধর্মসভা’র গােষ্ঠীভুক্ত রাজা রামমােহনের বাড়িতে, প্রিন্স দ্বারকানাথের বাগান বাড়িতে, রাজা রাধাকান্ত দেবের গৃহে, মহারাজ সুখময় রায়ের বাড়িতে( পোস্তা রাজবাড়ীর বংশধর) রাজা গােপীমােহন দেবের বাড়িতে, (যিনি ছিলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেবের ভ্রাতুষ্পুত্র) বেনিয়ান বারাণসী ঘােষের বাড়িতে এসব জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান নিয়ে পারস্পরিক প্রতিযােগিতা চলত। ১৮২৯ সালে গােপীমােহন দেবের বাড়িতে পূজা উপলক্ষে লর্ড ক্যাম্বারমিয়ার-সহ লর্ড ও লেডি বেন্টিঙ্ক বাঈজী -নাচ দেখার জন্য উপস্থিত ছিলেন। নিকী ছিলেন সেকালের এক নামকরা বাঈজী। নিকী ছাড়াও আশরুন, ফৈয়াজ বক্স, বেগমজান, হিঙ্গুল, নান্নিজান, সুপনজান, জিন্নাত প্রভৃতি সেকালের বিখ্যাত বাঈজীদের নিয়ে এসে নাচগানের ব্যবস্থা করা হত। এই সমস্ত বাঈজীরা তখন শােভাবাজার, চোরাবাগান, বটতলা, শুরাে, মাণিকতলা এককথায় সারা কলকাতা মাতিয়ে রেখেছিল। এইসব বাঈজী নাচের আসরে একদিকে চণ্ডীমণ্ডপে চলেছে দেবী দুর্গার পূজা অন্যদিকে উঠোনের সামিয়ানার তলায় লম্বা খাবার টেবিল তাতে টার্কি, শুয়ােরের মাংস, দেশি বিদেশি কতসব খাবার আর দামি মদ সাজানাে। পর্তুগিজ আর মুসলমান বাবুর্চিরা সেদিন দারুণ ব্যস্ত। বাবুরা দামি পােশাক এমনকী গয়না পরে (অবশ্য হার, বাজু ইত্যাদি) সেজেগুজে কোচানাে কেঁচা হাতে করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘরের ভিতর বাঈজী নাচ চলছে আর অন্য এক বিরাট বলরুমে ইউরােপীয় নাচ। এ ছিল সেদিনের দুর্গাপুজোর আসর। (ক্রমশঃ)

তথ্যসূত্রঃ উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, আশুতোষ ভট্টাচার্য, দ্বিতীয় খণ্ড।

বিনোদনে পাইকপাড়া বেলগাছিয়া, সান্তুনু ঘোষ।

কলকাতা রাজপথ, সমাজও সংস্কৃতিতে, অজিত বসু।

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

একদম প্রথম দিকে বাইজিরা থাকতেন চিৎপুরে। ওয়াজেদ আলী শাহ প্রথম চিৎপুরে বাইজিদের থাকার ব্যবস্থা করেন। ভারত থেকে ঢাকায় ‘মুজরা’ করতে আসা বাইজিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন—গওহর জান, নূরজাহান, মালকা জান, সিদ্ধেশ্বরী, জানকি বাই (ছাপ্পান ছুরি), জদ্দন বাই (ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী নার্গিসের মা), কোহিনূর ও ইন্দুবালা। 

উনবিংশ প্রথম ৩৫ বছরের মধ্যে যে বিখ্যাত বাইজিদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন, নিকি বাই, অসরুন জিন্নাত, বেগম যান, মির্জা যান, হিরা বুলবুল, গহরজান, মালকাজান, এরকম অনেকেই।

১৮২৩ সালে মিস ফানি পার্কস রাজা রাম রামমোহন রায়ের বাগানবাড়িতে নিকি বাইজির নাচ দেখেছিলেন। তবে উনবিংশ শতাব্দীর  এক সুপ্রসিদ্ধ গায়িকা ছিলেন হিরা বুলবুল। অসামান্য কন্ঠ মাধুর্যের জন্য বুলবুল শব্দটা তাঁর নামের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। তিনি অন্যান্য বাইজিদের মতো ধ্রুপদ গাইতেন। এরা সব রীতি মত ট্রেনিং প্রাপ্ত শিল্পী।

হিরা বুলবুল থাকেন বউবাজার অঞ্চলে। তবে একদম প্রথম দিকে এই বাইজিরা ছিলেন চিৎপুরে। সেকালের কলকাতায় হিরা বুলবুল সামাজিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। শিবনাথ শাস্ত্রী রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গ সমাজ গ্রন্থে এই বিষয়ে আলোকপাত করেন।

হিরা আপন পুত্ৰকে (পালিত কী আপন সন্তান জানা নেই) হিন্দু কলেজে ভর্তি করার চেষ্টা করেন। এই নিয়ে তুমুল বাদানুবাদ, ঝগড়া হয়। এটাকে আন্দোলন বললে ভুল হবে না। কলেজটার নাম হলো হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজ। ঠিকানা ৭৭ নম্বর চিৎপুর রোড। তবে হিন্দু শিক্ষকদের অনৈক্যের জন্য এই কলেজটি ১৮৫৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

বুঝুন অবস্থাটা বাইজির মেয়ে বলে কলেজে ভর্তি হতে পারবেন না। তবে হিরা বুলবুল সমর্থন পেয়েছিলেন অনেক তবে তাঁর বিরোধীরা অনেক বেশী এবং শক্তিশালী ছিলেন।

একটা অদ্ভুত ঘটনার উল্লেখ করি। সেকালের স্বনাম ধন্য মৃদঙ্গ বাদক গোলাম আব্বাস ছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের খুব প্রিয় মানুষ। তিনি গোলাম আব্বাসকে অনুরোধ করেন হিরা বুলবুলের সাথে বাজাবার জন্য। গোলাম আব্বাস রাজি হননি।কারণ বাইজির সাথে বাজালে তাঁর মর্যাদা কমে যাবে তাছাড়াও এটা তাঁর ঘরানার অপমান। পরে অনেক অনুরোধ করার পর তিনি রাজি হলেন।

হিরা বুলবুল সেটা বুঝেছিলেন এবং কূট লয়ে ধ্রুপদ গান ধরলেন। গোলাম আব্বাস কোথায় সোম বুঝতে পারলেন না। শুধু ব্যর্থ হলেন তাই নয় তিনি এত অপমানিত হলেন যে ওই আসরেই উনার মৃত্যু হলো। এই ঘটনাটা হয়েছিল শোভাবাজার রাজবাড়িতে। এরকম অনেক গাইয়েরা বিপদে পড়তেন যারা হিরা বুলবুলকে চ্যালেঞ্জ করতেন।

এই বাইজিরা থাকতেন মূলত বউবাজার, বাগবাজার, পাইকপাড়ায় আর বেলঘড়িয়াতে। সারা কলকাতাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। একটা প্রবাদ লোকের মুখে মুখে চল পানসি বেলঘড়িয়া। নব্য বাবুরা নৌকা করে যেতেন বেলঘড়িয়াতে।

নগেন্দ্রনাথ ঘোষ বলছেন, কলকাতায় বাইজি নাচের প্রবর্তক রাজা নবকৃষ্ণ দেব। তাঁর ইংরেজ আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। সে ভালো। এই নবকৃষ্ণই ছিলেন কবিয়াল হরু ঠাকুর ও নিতাই দাসেরও পৃষ্ঠপোষক। তাঁর সভায় বাইজি নাচের আয়োজন হত ‘এলিট’ সাহেব-সুবো আর বাবুদের জন্য। কবিগানের দরজা সেখানে সাধারণের জন্যেও খোলা।

জোড়াসাঁকোর ধারে’-তে সরস্বতী বাইজির গান শোনার স্মৃতি উপুড় করছেন অবনীন্দ্রনাথ। শুনে অবাক লাগতে পারে, বাইজির গান শুনবেন অবন ঠাকুর! তাও, এক রাতে তিনশো টাকা দিয়ে! মাত্র দুটি গান গাইবেন সরস্বতী। নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথও এহেন সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ চেপে রাখেননি— “অবনদা, করেছ কী! তিনশো টাকা জলে দিলে?” এদিকে শ্যামসুন্দর এসে জানালেন, টাকার সঙ্গে দু’বোতল ব্র্যান্ডিও চাই সরস্বতীর। ব্র্যান্ডি না খেলে তিনি নাকি গাইতেই পারেন না। অবনীন্দ্রনাথ তাতেও রাজি। গান তিনি শুনবেনই। সরস্বতী গাইতে শুরু করলেন রাত দশটায়। একটা গানেই এগারোটা বাজল। অবনীন্দ্রনাথ লিখছেন— “এক গানেই আসর মাত। গানের রেশে তখনও সবাই মগ্ন। সরস্বতীবাই বললেন, ‘আওর কুছ ফরমাইয়ে।” তাঁকে এরপর একটা ভজন গাইতে বললেন অবন ঠাকুর। সরস্বতী গাইলেন ‘আও তো ব্রজচন্দলাল।’ মুগ্ধতার মীড়ে আরো একবার টান পড়ল। অবনীন্দ্রনাথ তাড়াতাড়ি করে ছবি এঁকে রাখলেন তাঁর। গান শেষ, বাই উঠে পড়লেন। অবনীন্দ্রনাথের মনে হল, দু’খানা গানের জন্য তিনশো টাকা দেওয়া সার্থক।

এই ঘটনা আগের শতাব্দীর। তার ঢের আগে থেকেই ইংরেজদের আদরে বাঁদর হয়ে তিলে তিলে কলেবরে বেড়ে উঠেছিল কলকাতা। তখন তার এক পা বাংলার গ্রাম্য শিকড়ে, অন্য পা আধুনিকতার গেড়োয়। সাদা চামড়ার বেনিয়াদের পাশাপাশি কালো চামড়ার বাবুতেও এ শহর ভরে উঠল ক্রমশ। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষজন এল ভাগ্য ফেরাবার আশায়। হাজারো রুচি তাদের। গেঁয়ো সংস্কৃতি আর নব্য আধুনিকতার। বাইজিরা ছিলেন  অসামান্য গায়িকা এবং নর্তকী। লোকজন মনে করেন, তাঁরা নষ্ট মেয়েমানুষ। অথচ, তাঁদের গান ফেলতেও পারে না সভ্য সমাজ। চটুল নাচ-গান নয়, উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় ঘরানার সংগীত। বাবুরা তো বটেই, সাহেব-সুবোরাও সেই গানে বুঁদ। অবনীন্দ্রনাথের ওই মুগ্ধতার ইতিহাস এভাবেই রচিত হয়েছে এক শতকেরও বেশি সময় ধরে।

বাইজিরা আসলে সাবেক কলকাতার একটি দ্বন্দ্বের জায়গা। তাঁদের কোন দলে ফেলা হবে? একদিকে তাঁদের উচ্চাঙ্গের গান-নাচের কদর। অন্যদিকে চরিত্র নিয়ে ফিসফাস, বে^...শ্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সমাজে প্রান্তিক করে রাখা। এই দুইয়ের মাঝে বিস্ময়ের সেতুও গড়া হয়েছে অনেকবার। সেইসবই মোহর বুনেছে নানা গল্পে। 

পাজি ‘সঙের দল’ আর সেকেলে কলকাতা মোদ্দায় বলা চলে, আঠেরো শতকের মাঝামাঝি থেকেই বাইজিদের গান ভেসে বেড়াচ্ছিল কলকাতার নানা কোঠাতে। এহেন ‘নষ্ট মেয়েমানুষ’ বাইজিদের নাচ-গানের পরে সেই কবিগানকে ঘোর অশ্লীল মনে হয়েছিল রেভারেন্ড ওয়ার্ডের। ১৮০৬ সালে শোভাবাজারের রাজা রাজকৃষ্ণ দেবের বাসায় তিনি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বাই নাচ দেখতে। এই আয়োজন বাছাই করা মানুষদের জন্য। ভোররাতে বাই নাচের পরে শুরু হল হরু ঠাকুর আর নিতাই বৈরাগীর কবিগান। বন্ধ দরজা হাট করে খুলে দেওয়া হল সাধারণের জন্য। পিলপিল করে ঢুকল লোক। আর, শুরু হল অশ্লীল কবিগান। রেভারেন্ড ওয়ার্ডের মনে হল, বাইজি নাচের একদম বিপরীত মেজাজের অনুষ্ঠান এসব। 

বিলিতি সাহেব, দিশি বাইজি, ১৮০০ সাল, অথচ, কবিয়ালরা সমাজের মূলস্রোতে গৃহীত আর বাইজিরা ‘নষ্ট মেয়েমানুষ’। কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ রায়ের ‘মোকাম কলিকাতা সরকার’ হিসেবের খাতা (১৮২০-২১ সাল) থেকে জানা যায় বাইজিদের আবাস মোটামুটিভাবে বউবাজার-কেন্দ্রিক। এবং এই বউবাজারেই ছিল নিষিদ্ধপল্লিও। সেখানে দ্বারকানাথ ঠাকুরের আত্মীয়র নিজস্ব কোঠাও ছিল দু’খানা। ২৩৫ এবং ২৩৬ বউবাজার স্ট্রিট। 

অতএব, পতিতা আর বাইজি সমার্থক হয়ে যেতে সময় লাগেনি। অথচ, বাইজিদের গান তখন মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে সমাজের উচ্চস্তরে। শোনা যায়, সেই সুরের জাদুতে বুঁদ হয়েই নাকি মীরজাফর বিয়ে করেছিলেন মণি বাইজি আর বব্বু বাইজিকে। রামমোহনের মানিকতলার বাগানবাড়িতে রাতের আসর মাতিয়ে তুলতেন নিকিবাই। তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন ফ্যানি পার্কস। ইতালির কিংবদন্তী অপেরা গায়িকার সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন “Catelani of the east”। নিকির পাশাপাশি আলোচিত হচ্ছে বেগম জান, হিঙ্গুল বাই, নান্নিজান, সুপন্‌জানদের নামও। এঁদের কণ্ঠে বুঁদ হচ্ছে ঠাকুরবাড়ি, মল্লিকবাড়ির বাবুদের জলসা। নিকি বাই এর দর ছিল একরাতে হাজার টাকা।

এই মুগ্ধতার উল্টোপিঠে ছি-ছিক্কার। রূপচাঁদ পক্ষীর ‘কলিকাতা বর্ণন’-এ বাইজি আর খেম্‌টাআলি, যাত্রাআলি, টপ্পাআলি ইত্যাদি সমার্থক। ভবানীচরনের ‘নববাবুবিলাস’-এর বর্ণনা রীতিমতো রগরগে ও তীব্র। যবনী বারাঙ্গনাদের ‘বাই’ বলে ডেকে বাবুরা তাঁদের বাসায় বারবার যায়। কারণ, “তাহারদিগের সহিত সম্ভোগে যত মজা পাইবা এমত কোন রাঁড়েই পাইবা না”। 

কিন্তু, এই নিন্দে মন্দর বিপরীত স্রোতও ছিল। সেখানে খেমটা নাচ আর বাইজি নাচের মধ্যে রুচি আর সংস্কৃতির পার্থক্যও খোঁজা হচ্ছিল। তুলনায় দেখা গেল, বাইজি নাচ অনেক সভ্য, শালীন। বাইজি নাচকে ভুলবশত মহারাষ্ট্রের নৃত্য হিসেবে উল্লেখ করে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’-এর একটি লেখা ঘোষণা করছে—“খেমটা তান্ত্রিক, মহারাষ্ট্র নৃত্য পৌরাণিক। পুরাণের ন্যায় এই নৃত্যের গাম্ভীর্য আছে।” খেমটা এই লেখার লেখকের চোখে ‘ছোটলোকের আমোদ’, কুৎসিত নাচ। বাই নাচ মোটে তেমন নয়। ‘সাধারণী’ পত্রিকাও খেমটাকে ‘নীচ ভাবোদ্দীপক জঘন্য’ নাচ বলে প্রশংসা করছে বাই নাচের। অর্থাৎ, বাই নাচের শ্রেণিচরিত্রগত একটি পার্থক্যও স্বীকৃত হচ্ছে সমাজে। ভাবটা এমন, বাইরা ‘নষ্ট’ মেয়েমানুষ হতে পারে, কিন্তু তাঁদের শিল্পটি উচ্চাঙ্গের। তা উচ্চকোটির আস্বাদনের সামগ্রী। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Baiji babu culture)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

সোনাগাজীর নামকরণ হয়ে গেল সোনাগাছি। কিন্তু কলকাতার ইতিহাসবিদরা কেন নীরব এই ইতিহাসের খোঁজে। দুই একজন ছাড়া। তারা কি অশ্লীলতার ভয়ে আতঙ্কিত ছিলেন। ইতিহাসের লক্ষ্য তো সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা।

অথচ, সোনাগাজী দিব্বি একজন রক্তমাংসের ঐতিহাসিক চরিত্র। তাঁর মাজার বা মসজিদটি এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে। ‘আলালের ঘরে দুলাল’-এ যে মাজার ও মসজিদের কথা বেশ বিস্তারেই বলেছেন টেকচাঁদ ঠাকুর তথা প্যারীচাঁদ মিত্র। এবং এহেন বিখ্যাত ব্যক্তির নামই কেন পরিণত হল একটি স্থান নামে। এমনই এক অঞ্চলের নাম, যাকে নিয়ে কলকাতাবাসীর আজও কৌতূহল, ফিসফিসানি, ঢাকঢাক গুড়গুড়, নাক কোঁচকানোর শেষ নেই। যেন এই নাম বললেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। ভারতবর্ষের সবচাইতে বড়ো ‘নিষিদ্ধ পল্লি’ বলে কথা! সবাই চেনে, তবু এই নাম যেন যত্রতত্র নিতে নেই। আসলে গণিকাদেরকেই বা ভালো চোখে দেখে!‘

‘কলকাতার অনেক তাবড় তাবড় মানুষের গোপন কম্মের হদিশ জানা এই গণিকাপল্লি নিয়ে তাই নিশ্চুপ ছিলেন অনেকেই। রাধারমণ মিত্রর ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এ তাই সোনাগাছির নামটাই নেই। ১৯১৫ সালে লেখা হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ বইতেও সোনাগাছির হদিশ মিলবে না। প্রাণকৃষ্ণ দত্তর মতো কলকাতাবিদও ছিলেন অবশ্য। সোনাগাজী তথা সোনাগাছির নামকরণের ইতিহাসটির ওপরেও স্পষ্ট আলো ফেলেছেন তিনি। পরে এই অঞ্চল নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। যৌনতা, যৌন পেশা নিয়ে অনেক খোলামেলা কথা বলতে শিখেছে শহর। কিন্তু, ওই ফিসফিসানিটা যে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে, তা বলা যাবে না। 

এহেন সোনাগাছির নামকরণের ইতিহাস নিয়ে কিন্তু কোনও দ্বন্দ্বের ফিসফিসানিও নেই। প্রায় সবাই একমত, সোনাগাজীর মাজার সন্নিহিত অঞ্চল বলেই এমন নাম। প্রাণকৃষ্ণ দত্ত লিখছেন, “ঐ স্থানে সোণাউল্লা নামক এক দুর্দান্ত মুসলমান বাস করিতেন। লাঠালাঠি, মারামারি, রাহাজানি-লুঠতরাজই তাঁহার উপজীবিকা ছিল। সোণাউল্লার বাটীর সম্মুখস্থ পুষ্করিণী পাড়ে তাঁহার কবর হইয়াছিল। অবশ্য মৃত্যুর আগেই তিনি পীর বা গাজী হইয়াছিলেন।” (মূল বানান অপরিবর্তিত)।

যদিও, সোনাগাজীর চরিত্র নিয়ে প্রাণকৃষ্ণ দত্তর মন্তব্যে অতি আরোপ চোখ এড়ায় না। সে যাহোক, সোনাগাজী থেকেই সোনাগাছি নামোদ্ভবের তত্ত্ব খারিজ করেননি প্রায় কেউই। অসিত দাস অবশ্য বলছেন, ‘সোনা’ শব্দটি ‘শণ’ থেকেও আসতে পারে। শণগাছি ক্রমে শোনাগাছি হয়ে লোকমুখে সোনাগাছি হয়েছে। সোনাগাজীর নাম শণগাছি একাকার হয়ে গেছে এই নামে—হতে পারে এমনটাও। তবে, নামকরণের মূলে সোনাগাজীর মাজারের অস্তিত্বটাই বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

সোনাগাজীর মাজার ছাড়িয়ে সোনাগাছি পল্লির পরিধি ক্রমে বেড়েছে। এখন তার অবস্থান চিত্তরঞ্জন এভিনিউ, শোভাবাজার ও বিডন স্ট্রিট ক্রসিং-এর কাছে। এমনিতে, সম্ভ্রান্ত বাইজিদের পাড়া হিসেবে বৌবাজারের খ্যাতিও বেশ পুরোনো। বৌবাজারে বাইজি-কোঠির পাশাপাশি ছিল বে^...শ্যাপল্লিও। কিন্তু, তারপরেও সোনাগাছি গড়ে উঠল কলকাতার সবচাইতে বড়ো গণিকাপল্লি হিসেবে। অনেকে বলেন, এই অঞ্চল সম্ভ্রান্ত গণিকাদের ঠিকানা ছিল না কোনদিনই। গরিব, শ্রমজীবী মানুষদের কামনাকেই সে নির্বিচারে গ্রহণ করেছে বরাবর। আর সেটাই নির্মাণ করেছে সোনাগাছির ‘শ্রেণিচরিত্র’। 

যদিও, এই ইতিহাসেও খানিক সরলীকরণ রয়েছে। আঠারো ও উনিশ শতকের বাঙালি বাবুরা নিজেদের উপপত্নী তথা রক্ষিতাদের থাকার ব্যবস্থা করতেন সোনাগাছিতেই। উচ্চবিত্ত, সম্ভ্রান্ত মানুষদের জন্য পৃথক ঠিকানাও ছিল এই পল্লিতে। সাহেবদের আনাগোনাও ছিল ভালোই। এই অঞ্চলের বেশকিছু বাড়ির বাহারি স্থাপত্য চোখ এড়ায় না। সেইসব পুরোনো প্রাচুর্যের দলিল। এবং এরই পাশে ছড়িয়ে রয়েছে অবশিষ্ট বিশাল পল্লি। বাংলার প্রতিটি দুর্ভিক্ষ, মড়ক, প্রাণঘাতী বন্যায় জনসংখ্যা বাড়ে সেখানে। অন্য প্রদেশ থেকেও উজিয়ে আসে অনেকে। শিকড়হীন, অভাবে ধুঁকতে থাকা, পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েগুলি এরপর এই পল্লির ইতিহাসের পাতা বাড়িয়ে তুলতে থাকে। আর ইতিহাসবিদরা সেই পাতা উলটে দেখান, একসময়ে ফ্রান্সের সম্ভ্রান্ত গণিকামহলেও কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল সোনাগাছির খ্যাতি।       

কলকাতা বাড়তে বাড়তে প্রায় মেগালোপলিস। শহর বাড়লে ক্ষুধাও বাড়ে। ক্ষুধার উল্টোপিঠেই অভাব। ক্ষুধারও রকমফের। এই বেড়ে চলার নামতা বেশ ভালো বোঝে সোনাগাছি। এই শহরের অনেক গোপন ইতিহাস লিখতে পারে সেও।

সোনাগাছি উত্তর কলকাতার মার্বেল প্যালেসের উত্তরে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, শোভাবাজার ও বিডন স্ট্রিটের সংযোগস্থলের নিকটে অবস্থিত। ... তবে সোনাগাছির পথ চলা প্রথম শুরু হয়েছিল বোধহয় উনিশ শতকেই। তখন সময় ছিল ইংরেজদের শাসনের। ইতিহাস বলছে গোটা ভারতকেই তখন আস্তে আস্তে দখল করার পথে এগোচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

সোনাগাজীর নাম থেকেই নামকরণ সোনাগাছির, চিৎপুরের গাজী ও এক বিলুপ্ত মসজিদের গল্প সোনাগাজীর জীবনকাল কেটেছে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে। লাঠালাঠি আর মারামারি করে। মৃত্যুর পর গাজী হয়েছিলেন। আর সেই গাজীর স্মৃতিতেই তাঁর বৃদ্ধা মা তৈরি করেছিলেন একটি মসজিদ। সোনাগাজীর মসজিদ। সোনাগাজীর কাছ থেকে ওষুধ পেতে ভিড় করতেন অন্ধ, খোঁড়া, কুষ্ঠরোগী ধনী, দরিদ্র সকলেই। পুরনো কলকাতার চিৎপুর অঞ্চলে রীতিমতো বিখ্যাত ছিল এই মসজিদ। তাঁর থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়ে উঠেছিল সোনাগাজী। পরে বিকৃত হয়ে দাঁড়ায় সোনাগাছি। কলকাতার সবচেয়ে বড়ো নিষিদ্ধপল্লি। সরস্বতী পুজোর ধুমধাম শুরু নিষিদ্ধপল্লীতেই, বঙ্কিম-হুতোমের ব্যঙ্গের শিকার কলকাতার বাবুরা এই গল্পের সময়কাল সঠিক বলতে পারেন না কেউই। কবে মসজিদ তৈরি হয়েছিল, সোনাগাজী কবে কলকাতায় এসেছিলেন তার কোনও সময়ের হিসাব নেই। কলকাতা এবং সুতানটি দুই পরগনাতেই তখন বহু মুসলমানের বাস। তার মধ্যেই ছিল সোনাগাজীর বাড়ি। আসল নাম সোনাউল্লা শাহ চুস্তি রহমতুল্লাহ আলে। সেই দস্যু সোনা একদিন মারা গেলেন। শোকে বিহ্বল তাঁর বৃদ্ধা মা। সোনা কিন্তু মাকে ছেড়ে গেলেন না। একদিন মাকে এসে বললেন, মৃত্যুর পর গাজী হয়েছেন তিনি। এখন থেকে ওষুধ দিয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচাবেন। আর যে তার দরগায় সিন্নি চড়াবে, তার উপকার হবে।

দ্রুত এই কথা ছড়িয়ে গেল। ভিড় জমতে শুরু করল সোনাগাজীর বাড়িতে। আর বন্ধ দরজার ভিতর থেকে অদৃশ্য সোনাগাজী প্রত্যেকের জন্য ওষুধ বলে দিতে লাগলেন। কারোর ওষুধ পাওয়া গেল পুকুরের জলে, কারোর ওষুধ বাড়ির পিছনে।কারোর কারোর উপর আবার ভারি চটে যেতেন তিনি। মাকে বলতেন তার সিন্নি ছুঁড়ে ফেলে দিতে। এভাবেই দিন কাটতে লাগল। সোনাগাজীর নামে বিরাট এক মসজিদ তৈরি করলেন তাঁর বৃদ্ধা মা। চিৎপুর এলাকার ল্যান্ডমার্ক হয়ে উঠল সেই মসজিদ। এখন অবশ্য সেই পুরনো মসজিদ আর নেই। তবে মসজিদের নামেই রাস্তার নাম মসজিদবাড়ি স্ট্রিট। সোনাগাজীর মা মারা যাওয়ার পর সব অলৌকিক কাণ্ড থেমে গেল। তবে সোনাগাজীর নাম থেকে গেছে। কিছুটা বিকৃত হয়ে এখন সোনাগাছি।

এমনই সব মিথ জড়িয়ে আছে সোনাগাজীর নামের সঙ্গে। কিন্তু সোনাগাজীর এসব কিংবদন্তি অনেকেই বিশ্বাস করেন না। এমনকি মসজিদের অনেক ইমামও বিশ্বাস করতেন না। তার দাঙ্গা-হাঙ্গামার যে সব গল্প শোনা যায়, তাতেও অবশ্য অতি-আরোপ চোখে পড়ে। অনেকের মতে, সোনাউল্লা শাহ এসেছিলেন ইরান থেকে। তিনি ছিলেন একজন দরবেশ। সুদর্শন মানুষ। অসাধারণ ঘোড়সওয়ার ছিলেন। আর ইরান থেকে নিয়ে এসেছিলেন প্রচুর সোনা আর টাকা পয়সা। এদেশে এসেছিলেন ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য। নানা জায়গায় ঘুরে বেছে নিয়েছিলেন এই পুরনো কলকাতাকেই। চিৎপুর অঞ্চলে তখন কয়েক ঘর মুসলমানের বাস। সেইসঙ্গে ছিল একটি পুকুর ও তার পাশে কবরস্থান। সেই পুকুরের পাড়েই মসজিদ তৈরি করেন তিনি। একটা বিরাট গম্বুজকে ঘিরে চারটে সুদৃশ্য মিনার। ভিতরে প্রচুর সূক্ষ্ম কারুকার্য। সারা গায়ে ইরানি স্থাপত্যের প্রভাব। সেই মসজিদেই ছিল তাঁর কবর।

পুরনো সেই মসজিদ ভেঙে পড়ে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায়। পাশের পুকুরটিও আর নেই। সেই পুকুর বুজিয়ে তৈরি হয়েছিল আস্তাবল। এখন সেখানে বাজার। চিৎপুরের পরিচিত অ্যালেন মার্কেট। তবে এসবের মধ্যেও সোনাগাজীর কিংবদন্তি কিন্তু থেকে গেছে। কতদিন থাকবে, তা অবশ্য বলা যাচ্ছে না। কলকাতার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা এমনই সব ইতিহাস ও জনশ্রুতিকে আজকাল আমরা আর কতটুকুই বা মর্যাদা দিই? তবে এসবের মধ্যেই তো খুঁজে পাওয়া যায় কলকাতাকে, তার পুরনো হৃদস্পন্দনকে…

বাই বারঙ্গনা গাঁথা বইটিতে দেবজিত বন্দোপাধ্যায় বলছেন, "গান শেখাতে এসে ‘শিক্ষিতা পতিতা’ মানদা দেবীকে ওস্তাদ বলেছিলেন, “তোমার ব্রহ্ম সঙ্গীত অথবা স্বদেশী গান তো এখানে চলবে না। লপেটা, হিন্দি গজল অথবা উচ্চ অঙ্গের খেয়াল ঠুংরি এ সব হল বেশ্যা মহলের রেওয়াজ। কীর্তনও শিখতে পার।”

আঠারো শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের গোড়ার দুই-তিনটি দশক, প্রায় দেড়শো বছর কলকাতায় বে^...শ্যা-বাইজিরা ছিলেন সঙ্গীত-সংস্কৃতির ধারক বাহক। তাঁদের গানের ভাণ্ডার ছিল ধ্রুপদ থেকে খ্যামটা, বাউলাঙ্গ থেকে কৌতুকগীতি। মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের বহু গীতিকার ব্যবহার করেছেন সোনাগাজী তথা সোনাগাছি থেকে পাওয়া গানের পংক্তি। এই বইটিতে সংকলিত ছ’শোরও বেশি গান এই বিস্তারের নিদর্শন। সমাজ সম্মান করেনি, কিন্তু তাঁদের পারদর্শিতাকে কাজে লাগিয়েছে বিনোদনে, শিল্পের নির্মাণে। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, কে না মুগ্ধ হয়েছেন এঁদের প্রতিভায়।

(www.theoffnews.com - Sonagachi Sonagazi)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রতেও দেবদাসীদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। কৌটিল্য দেবদাসী প্রথা পর্যবেক্ষণের পর স্পষ্টভাবে বলেন যে, দেবদাসীদের মধ্যে যারা মন্দিরে সেবিকার কাজ থেকে ইস্তফা দিয়েছে বা অব্যাহতি নিয়েছে তাদের এবং সেই সঙ্গে বিধবা, পঙ্গু মহিলা, সন্ন্যাসিনী বা ভিখারিনী, শাস্তিপণ পরিশোধে ব্যর্থ মহিলা, গণিকার মা এবং পশম, তুলা, শণ ইত্যাদি বাছাই-এর কাজে নিয়োজিত মেয়েদের মন্দির উপাধ্যক্ষগণ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করত। কোনো কোনো নৃবিজ্ঞানীর মতে গর্ভধারণ ও পুনঃপ্রজননের দেবীর পূজাকে ভিত্তি করে দেবদাসী শ্রেণির উদ্ভব হয়। মধ্যযুগীয় লৌকিক বিবরণ থেকে জানা যায়, গুজরাটের চার হাজার মন্দিরে দেবদাসী ছিল কুড়ি হাজার, অনেক জায়গায় এদের নাচনি বলা হতো।

সে সময়ের রাজারা নিজ স্ত্রী বাদে রক্ষিতা রাখাটা প্রায় নিয়ম করে ফেলে। এসব দেবদাসীদের কাউকে পছন্দ হলে, রাজারা চাইলেই তাকে নিজের করে নিয়ে আসতে পারতেন। নিঃসন্তান কোনো দম্পতির যখন বাচ্চা হত না তখন খোঁজ পড়ত দেবদাসীর। তাদের পছন্দ অনুযায়ী দেবদাসীকে নিঃসন্তান পরিবারে নিয়োজিত করা হতো পরিবার এবং পারিবারিক সম্পত্তি বিলোপের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এক্ষেত্রে মেয়েদের ঈশ্বরের নিকট উৎসর্গ করে তাদেরকে উচ্চতর সম্প্রদায়ের বা অভিজাত লোকের সন্তান ধারণের জন্য যৌনমিলনের কাজে ব্যবহার করা হতো। এসব সন্তানরা পরবর্তীকালে ঠাকুরদাদার নাম ধারণ করে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতো।

ঐতিহাসিক রমেশ মজুমদার এবং ইউ. এন. ঘোষালের মতে, মধ্যযুগে গরীব ঘরের নীচু জাতির মেয়েদের শোষণের উৎস ছিল এই দেবদাসী সম্প্রদায়৷ সে সময় দেবদাসীদের সংখ্যা ছিল সব থেকে বেশি, যার সিংহভাগ ছিল দক্ষিণ ভারতে৷ অনেকের মতে, ভারতে দেবদাসী প্রথার প্রচলন শুরু হয় ভারতে বৌদ্ধধর্মের পতনের সঙ্গে৷ বৌদ্ধমঠগুলোতে সন্ন্যাসিনীরাই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরবর্তীকালে হিন্দু মন্দিরের দেবদাসী হয়ে ওঠে। ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রবিদ যোগাশঙ্কর এই প্রথার বিবর্তনের প্রধান যে সব কারণ উল্লেখ করেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নরবলির বিকল্প, জমির উর্বরতা বৃদ্ধি, জনসংখ্যা বাড়ানো, প্রাচীন দ্রাবিড় ধর্মসংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে লিঙ্গ উপাসনা, অতিথিদের আপ্যায়নের অঙ্গ হিসেবে পুরুষ অতিথির যৌনসুখ চরিতার্থ করা এবং ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মতো উঁচু জাতের লোকেদের দ্বারা নীচুজাতের শোষণ ইত্যাদি।

ইংরেজ আমলেও ছিল এই প্রথার অস্তিত্ব। ইংরেজ রাজ-পুরুষদের মনোরঞ্জনের জন্য তৎকালে চেষ্টার কোন ক্রটি ছিল না। দেশে তখন চলতি প্রবাদ—"খুলক-ই-খুদা, মুলুক-ই-সিরকার, হুকুম-ই-সাহিবান আলিসান" অর্থাৎ নরকুল ঈশ্বরের, মাটি সরকারের, আর ক্ষমতা বলতে যা বোঝায় তা সব সাহেবদের। ১৭৯১ সনে কর্ণাটকের নবাব মাদ্রাজের লাট-বাহাদুরকে ভোজের পরে নাচ সহযোগে আপ্যায়ন করেছিলেন। স্যার গ্রান্ট ডাফ-এর সম্মানে আয়োজিত এক ভোজসভায় ভারতীয় নর্তকীরা ও দেবদাসীরা অতিথির আবাহন করেছিলেন পশ্চিমী গীতবাদ্যে।

আধুনিক যুগেও ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ভারতের কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের ইয়াল্লামা, হনুমান এবং শিবমন্দিরে আড়াই লাখ মেয়ে নিয়োগ করা হয়। নেপালে বিশেষ করে দোতি, বাইতাদি এবং দাদেলধুরা জেলাসমূহে দেবদাসীদের এসব প্রতিষ্ঠান ছিল সনাতন প্রথা হিসেবে অতি প্রচলিত। ঊনবিংশ শতকের সূচনায় ফ্রান্সিস বুকানন নামে এক ইংরেজ অভিযাত্রী দক্ষিণ ভারতে আসেন। তিনি লিখে গেছেন, ‘কাঞ্চিপুরমের মন্দিরে দেবদাসী আছে কমপক্ষে একশ’। বিখ্যাত ভারতশাস্ত্রবিদ স্যার মনিয়ের উইলিয়ামস তাঞ্জোর মন্দির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন গত শতকের শেষ দিকে । তখনও সেখানে ছিলেন ১৫ জন দেবদাসী।

প্রথাটি যে নারীদের জন্য চরম অবমাননাকর, তা আস্তে আস্তে মানুষ বুঝতে পারে। ১৯০৬ থেকে ৭ সালের দিকে ভারত সরকারকে পতিত মেয়েদের রক্ষা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সনদে সঁই করতে হয়। এই সনদের ফলেই দেবদাসীও আলোচনায় চলে আসে। ১৯১২ সালে পুরানো দিনের ইম্পেরিয়াল কাউন্সিলে হঠাৎ নতুন ধরনের বিল উত্থাপিত হয়। তাও একটি নয়, পরপর তিনটি। তিনটির আবেদন একই– “দেবদাসী প্রথার উচ্ছেদ চাই”। ভারত সরকার জনসাধারণের ধর্মানুভূতি নিয়ে তখন বেশ সতর্ক ছিল। তাদের মতামত ছিল এ প্রথার সঙ্গে দক্ষিণ ভারত বিশেষভাবে জড়িত। তাই কোনো আইন প্রণয়নের আগে সেখানকার অভিমত জানা প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে নিযুক্ত সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া হল তাদের জনগণের এ ব্যাপারে কি মতামত তা জানতে। তাদের পাঠানো মতামতের ভিত্তিতে ১৯১৩ সনে নিযুক্ত হলো কেন্দ্রীয় সিলেক্ট কমিটি। তারা রিপোর্ট জমা দেয় পরের বছর মার্চে। সেপ্টেম্বরে উত্থাপিত হয় সরকারি বিল কিন্তু ভাগ্য দেবদাসীদের খুব একটা সহায়তা করতে পারেনি। ‘বিল’ ভাল করে জানাজানি হতে না হতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। মন্দিরের অঙ্গণের চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র তখন সরকারের জন্য অনেক জরুরি। দেবদাসীকে নাচের আসরে ছেড়ে তারা লড়াইয়ে মনোযোগ দিলেন।

কয়েক বছর পরে আবার আলোচনায় আসে দেবদাসী। ডাঃ হরিসিং গৌর মাদ্রাজ বিধানসভায় ১৯২২ সনে তাদের সম্পর্কে আইন দাবি করে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯২৭ সনে কেন্দ্রীয় পরিষদে একই প্রস্তাব পেশ করলেন রামদাস পানতুলু। দু’জনের প্রস্তাবই গৃহীত হলো কিন্তু আইন পাস হলো না কোথাও। সরকার পক্ষ কখনো সংশোধিত প্যানেল কোড দেখালেন তো কখনো সারদা আইনের (১৯২৭) দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। তখন পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য এই প্রথার বিরুদ্ধে অভিমত প্রকাশ করে বলেছিলেন– "কেউ কি দেখাতে পারেন হিন্দুর ধর্মশাস্ত্রে দেবদাসীর বিধান?" কোনো শাস্ত্রজ্ঞ তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি। একই প্রশ্ন তুলেছেন গান্ধীজিও, দক্ষিণ ভারত ভ্রমণে এসে তিনি এই প্রথার বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন।

অবশেষে দেবতার নামে নারীদের ‘উৎসর্গ' করার কুপ্রথা ১৯৮৮ সালে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু তা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয় না। পরবর্তীতে, ২০১৫ সালে এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের আবেদনের ভিত্তিতে কর্ণাটক রাজ্যকে এই প্রথা তুলে দিতে নির্দেশ দেয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও এ প্রথা নিয়ে অভিযোগ করে। বর্তমানে ভারতের প্রায় সব রাজ্যই আইন করে দেবদাসী প্রথা নিষিদ্ধ করেছে। এসব আইনের মধ্যে বোম্বে দেবদাসী আইন ১৯৩৪, দেবদাসী মাদ্রাজ আইন ১৯৪৭, কর্ণাটক দেবদাসী আইন ১৯৮২, অন্ধ্রপ্রদেশ দেবদাসী আইন ১৯৮৮ অন্যতম। তাও সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা যায়, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক এবং মহারাষ্ট্রের কিছু এলাকায় আজও রয়েছে অন্ততপক্ষে ৩৫ হাজার দেবদাসী৷ এদের মধ্যে যৌবন-উত্তীর্ণ অনেকের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা শোচনীয়৷ এদের অনেকেই আজ রাস্তার ভিখারি৷ রূপ-যৌবন হারানোর পর, এদের যেন কোথাও ঠাঁই নেই – না মন্দিরে, না ধনীদের ঘরে।অ ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির অধঃপতন হতে শুরু করে বুদ্ধ সংস্কৃতির অবসানের পর কারণ বুদ্ধ সংস্কৃতি বা জীবন বোধ ছিল সনাতন হিন্দু সংস্কৃতির যুক্তিগ্রাহ্য পরিণতি। (সমাপ্ত)

(www.theoffnews.com - prostitution)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

কিন্তু ফিনিশীয় সভ্যতার হেলিওপোলিস এর মন্দিরে সমবেত হত শুধুমাত্র অক্ষতযোনি কুমারীর দল। তারা তাদের কৌমার্যদান করে বিবাহিত জীবন যাপনের অনুমতি লাভ করত। ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে সিরিয়ার মন্দিরেও এই প্রথা দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল। মধ্যযুগের প্রারম্ভে সম্রাট কনস্ট্যানটাইন সেই মন্দিরটি ধূলিসাৎ করে সেখানে একটি গীর্জা নির্মাণ করে এ প্রথা রদ করিয়েছিলেন।

গ্রীসের ইতিহাসে দেবদাসীর উল্লেখ পাই নানাভাবে। চিরতরুণ সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর মন্দিরে সর্বত্রই দেবদাসী নিযুক্ত ছিল। লক্ষ্য করলে দেখা যায় এর পূর্বে ও পরেও সর্বত্র সূর্যদেবের দেবদাসী নিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রীসের মন্দিরবালাদের বলা হত Hierodule। এদের দেখা যেত গ্রীসের প্রতিটি দেবমন্দিরেই। গ্রীস সভ্যতার পর রোমান সভ্যতাতে দেবদাসীদের উল্লেখ পাওয়া যায়। মন্দিরদাসীরা যে কার্যত পুরোহিতদের মনোরঞ্জন করতেন সে সম্বন্ধে ইতিহাস বহুবিধ তথ্য প্রমাণ দিয়েছে। এই দেবদাসীদের সাথেই রাজনটী ও নগরনটীদের আবির্ভাবের কথা জানতে পারা যায়। তবে দেবদাসী ও নগরনটীরা সকলেই যে ক্রীতদাসী ছিলেন না এর পিছনে কতগুলো ধারণা দেখানো যায়, তা হল ক্রীতদাসীদের কোন রকম সামাজিক বা নৈতিক অধিকার ছিল না। এদের কোন রকম সম্মান বা স্বাধীনতা ছিল না। অপরদিকে, নগরনটীদের সম্মান আর প্রতিপত্তি ছিল যথেষ্ট। এই নগরনটীদের গ্রীসে Hataera বলা হত। এদের গৃহে দেশের জ্ঞানী গুণীরা আসতেন। নানা বিষয়ে, আলাপ আলোচনা করতেন এবং এদের মতামত শোনা হত অর্থাৎ সমাজে এদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বাইজান্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ানের পত্নী থিওডোরা নিজে একজন Hataera ছিলেন। দেবদাসীদের সম্মানিত অস্তিত্বের প্রমাণ থাকলেও তারা Hataera-দের সমতুল্য ছিল না কারণ তাদের আশেপাশে সর্বদা ধর্মের বাতাবরণ থাকত। খ্রীস্টপূর্ব ৪৬৪ বছর আগে গ্রীসে জেনোফন নামের একজন অলিম্পিক বিজয়ী অ্যাফ্রোডাইটি দেবীর মন্দিরে ১০০ জনের মতো তরুণীকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ উপহার হিসেবে দান করেন। কোরিন্থ শহরেও দেবী অ্যাফ্রোডাইটির মন্দির ছিল। রোমান যুগে ওই মন্দিরে প্রায় হাজারের উপর দেবদাসী ছিল।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বালি, জাভা, সুমাত্রা, থাইল্যান্ড ও মায়ানমারেও দেবদাসীদের বিপুল সমাবেশ ছিল। দক্ষিণ আমেরিকার ইন্‌কা সভ্যতার ইতিহাসে দেবদাসীদের উল্লেখ আমরা পাই। ইনকা সম্রাটরা সকলেই ‘সূর্যের সন্তান’ বলে পরিচিত ছিল। এদের ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। ইন্‌কা রাজ্যে সূর্যের মন্দির তত্ত্বাবধানের কাজ করতেন পুরোহিতগণ। সুন্দরী মেয়েদের অল্প বয়সেই বেছে নিয়ে Cuzco বা শিক্ষালয়ে নিয়ে যাওয়া হত শিক্ষা দেওয়ার জন্য। তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হলে হয় স্বয়ং রাজার উপপত্নী হতো অথবা "সূর্যকুমারী" রূপে মন্দিরবাসিনী হতো। এদের কাজ ছিল পুরোহিত, রাজা ,রাজবংশীয় পুরুষদের মনোরঞ্জন এবং অন্যান্য শিল্পকর্ম।

আর্মেনিয়া অথবা পারস্যে হতভাগিনীদের প্রত্যেককে একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত দেবদাসীর ভূমিকায় বন্দিনী হয়ে থাকতে হত। একাধিক পুরুষ কর্তৃক দীর্ঘকাল ধর্ষিত না হলে মুক্তি ছিল না। সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি এবং রাজারাজড়ার দলও নিজ নিজ কন্যাকে ওই রতি মন্দিরে প্রেরণ করতে বাধ্য ছিলেন। সেখানে একাধিক অপরিচিত পুরুষকে দেহদানে ধন্য করে স্ত্রীলোকেরা পুরোহিতের অনুমতিপত্র হাতে নিজ নিজ পরিবারে ফিরে আসতেন। বলা বাহুল্য, তাঁদের বিবাহ হত এবং ওই দৈহিক দেবপূজার জন্যে কেউ তাঁদের ঘৃণার চোখে দেখতেন না।

দেবদাসী প্রথার ব্যাপক প্রচলন হয় অষ্টম শতাব্দীতে, পুন্ড্রবর্ধন নগরে। পুন্ড্রবর্ধন নগরের দেবদাসীরা বিলাসী এবং কামাচারপূর্ণ জীবনযাপন করত। তাদেরকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বাৎস্যায়ন তাঁর "কামসূত্র" গ্রন্থে সমসাময়িক ভারতে দেবদাসীদের সম্পর্কে বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। দেওপাড়ায় প্রাপ্ত তাম্রফলক অনুযায়ী বিজয় সেন এবং ভট্ট ভবদেব তাদের মন্দিরে শত শত দেবদাসী নিয়োগ করেছিলেন। রামচরিত এবং পবনদূত গ্রন্থে দেবদাসীদের জীবনযাত্রার সপ্রশংস বর্ণনা দেওয়া আছে। কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যে এইরকম দেবদাসী অথবা নাচের মেয়ের উল্লেখ পাই, যারা তৎকালীন উজ্জয়িনী নগরের ‘মহাকাল মন্দিরে’ নাচ (ভারতনাট্যম) পরিবেশন করত। সেইসঙ্গে কোণারকের সূর্য মন্দির‚ দক্ষিণ ভারতের অন্য মন্দির-সহ ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে শিকড় বিস্তার করে এই প্রথা। একাদশ শতকের দক্ষিণ ভারতে অন্যতম বিখ্যাত নরপতি চোল বংশের রাজারাজ। তার এক তাম্রশাসনের বক্তব্য, রাজারাজ তাঞ্জোরের মন্দিরে সুশিক্ষিতা চারশ’ "তেলিচ্চেরি পেণ্ডুগাল" বা মন্দির-কন্যা দান করেছেন। তাদের জন্য মন্দিরের চারপাশে উত্তম বাসগৃহ নির্দিষ্ট হয়েছে। এজন্য তাদের কোন কর দিতে হয় না।

দক্ষিণ ভারতে ‘দেবদাসী’ বলা হলেও উত্তর ভারতে এই রীতির নাম ছিল ‘মুখি’। এই প্রথা যখন প্রচলিত হয়, তখন প্রথা এবং প্রথার সঙ্গে জড়িত দেবদাসীদের অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দেখা হত। তাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ, জমি বরাদ্দ থাকত। তারা হয়ে ওঠে মন্দিরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের নাচ-গান ছাড়া অসম্পূর্ণ ছিল দেবতাদের আরাধনা। সমাজের উচ্চবর্ণের মানুষ নিজেদের কন্যাকে উৎসর্গ করতেন দেবদাসী হওয়ার জন্য। বয়ঃসন্ধির আগেই করা হত উৎসর্গ। তারা যেন ভালো দেবদাসী হয়ে উঠতে পারে তাই ছোটবেলা থেকেই নিতে হত নাচ গানের কঠোর প্রশিক্ষণ। কন্যা উৎসর্গ করার রীতি দক্ষিণ ভারতে ‘মুট্টুকাট্টুভাডু’ এবং ‘দেভারিগে বিদুভাদু’ নামে পরিচিত। ‘মুট্টুকাট্টুভাডু’ মানে দেবতার সঙ্গে বিয়ে এবং ‘দেভারিগে বিদুভাদু’ এর অর্থ নিজেকে দেবতার কাছে উৎসর্গ করা। ইতিহাস খ্যাত নরপতি কৃষ্ণদেব রায়ের বিজয়নগর পরিভ্রমণের বিবরণেও (১৫২০-২২ সাল) উঠে এসেছে দেবদাসীদের বৃত্তান্ত। কৃষ্ণদেব রায় যখন রাইচুর অভিযানে যাত্রা করেন তখন তার বাহিনীতে নাকি সাত লাখ তিন হাজার পদাতিক, বত্ৰিশ হাজার ছয় শ’ অশ্বারোহী ছিল। এই বিরাট বাহিনীর সঙ্গে প্রমোদ-কন্যা দেবদাসীও ছিল প্রায় কুড়ি হাজার। কিন্তু এক ব্যাপারে কৃষ্ণদেব রায় রীতিমত সদাচারী ছিলেন বলা চলে। তার অন্দরে রানীদের বারো হাজার দাসী এবং সহচরী থাকলেও বিজয়নগর অধিপতির পত্নী ছিল মাত্র বারোজন। বলা অনাবশ্যক, তার পূর্বসূরীরা সবাই কিন্তু এমন সদাচারী নরপতি ছিলেন না।

তবে, এটি ছিল প্রথম দিকের অবস্থা। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই সম্মানের উৎসর্গ আর এর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। বোঝা গেল‚ পাথরের বিগ্রহকে উপেক্ষা করে মানুষই ভোগ করতে পারে ‘দেবদাসীকে’। পুরোহিতদের অবক্ষয় আর যৌন-লালসার কারণে মেয়েদের কেনা বেচা শুরু হল। এমনকি লুঠ করে পর্যন্ত নিয়ে আসা হত। আর এর পেছনে দারিদ্র্যতা মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতো। হতদরিদ্র ও নীচু জাতের মা বাবা’রা তাদের কুমারী মেয়েকে ঋতুবতী হওয়ার আগেই নিয়ে আসত মন্দিরে। সেখানে প্রথমে কুমারী মেয়েদের নামমাত্র মূল্যে নিলাম করা হত। তারপর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ভগবানকে উৎসর্গের নামে কল্পিত দেবতার সঙ্গে কুমারী মেয়েদের তথাকথিত বিয়ে দিয়ে দেন। উৎসর্গের পর দেবদাসীকে ভোগ করার প্রথম অধিকার থাকত মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের। দেবতার সঙ্গে বিয়ের পর গরিব ঘরের সেই মেয়ে হয়ে যায় দেবদাসী বা যোগিনী। আক্ষরিক অর্থে সেবাদাসী বা যৌনদাসী। এরপর সারা জীবন আর অন্য কোনো পুরুষ মেয়েটিকে আর বিবাহ করতে পারত না। নামমাত্র খাওয়া-পরার বিনিময়ে মন্দিরেই কাটাতে হয় তাদের জীবন। যৌন লালসার শিকার হতে হয় মন্দিরের প্রধান পুরোহিত থেকে শুরু করে অন্যান্য পুরুষদের। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেবদাসীদের আগমন ঘটায় তাদের মধ্যে তৈরি হয় শ্রেণি। যাকে দেবতার জন্য উৎসর্গ করা হত‚ তিনি "দত্তা", লুঠ করে আনা হলে তিনি "হ্রুতা", কেনাবেচা করা হলে সেই মেয়ে "বিক্রিতা"‚ কেউ নিজেই নিজেকে দেবতার পায়ে উৎসর্গ করলে তিনি "ভক্ত দেবদাসী"‚ অলঙ্কারসহ কাউকে উৎসর্গ করা হলে তিনি "সালঙ্কারা", আর যদি কেউ দেবদাসী হয়ে নিয়মিত পারিশ্রমিক পেতেন‚ তিনি "গোপীকা" বা "রুদ্রাঙ্গিকা"। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - prostitution)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

দেবদাসী প্রথা ভক্তির আড়ালে পতিতাবৃত্তি বলতে মনে করা হয় যে এই দেবদাসী প্রথা 600 খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল। এই প্রথায় নব যুবতী কুমারী মেয়েদের ধর্মের কারনে দেবতার সাথে বিয়ে দিয়ে মন্দিরে দান করে দেওয়া হতো। ... দেবতার সাথে বিয়ে দেওয়া এই প্রকার মহিলাগণকেই দেবদাসী বলা হতো। দেবদাসী গণ মন্দিরের দেখাশোনা, পূজার সামগ্রী জোগাড় তথা মন্দিরে নৃত্য, গীত পরিবেশন করতো। এই প্রথায় নব যুবতী কুমারী মেয়েদের ধর্মের কারনে দেবতার সাথে বিয়ে দিয়ে মন্দিরে দান করে দেওয়া হতো। কিন্তু কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এই প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রায় 300 খ্রী: পূ: রচিত, এর থেকে প্রমাণ হয় দেবদাসী প্রথা এর অনেক আগে থেকেই ছিল। মনে করা হয় গৌতম বুদ্ধের সময় থেকেই এই প্রথা শুরু হয়েছিল। কিন্তু গুপ্ত আমলে ভারতবর্ষে সর্বাধিক দেবদাসী দেখা যায়।

মহাকবি কালীদাস রচিত মেঘদূতম্ কাব্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মনে করা হয় যে দেবদাসী প্রথা চরম ব্যভিচারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মন্দিরের পুরোহিত ও বিশেষ অতিথিগণ দেবদাসীদের শারীরিক শোষণ করতো বলে মনে করা হয়। কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক এই ব্যভিচারের মতবাদকে অস্বীকার করেন। প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে দেবদাসী সাত প্রকারের ছিল।

১/দত্তা - যে মন্দিরে ভক্তিভাবের কারনে স্বেচ্ছায় দেবতার সেবায় নিজেকে অর্পণ করতো তাদের দত্তা বলা হতো। এদেরকে দেবীর মর্যাদা দেওয়া হতো।

২/বীকৃতা - যে অর্থের পরিবর্তে নিজেকে বিক্রি করে দিত। এরা মন্দির পরিষ্কারের কাজ করতো।

৩/ভৃত্যা - যে পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য মন্দিরে নৃত্য, গীত পরিবেশন করতো।

৪/ভক্তা - এরা নিজের বাড়িতেই থাকতো মন্দিরে কাজের উদ্দেশ্যে যেত।

৫/হৃতা - রাজরাজারা এদেরকে অন্য রাজ্য থেকে হরণ করে মন্দিরে দান করে দিত। এরা প্রকৃত পক্ষেই দাসী ছিলো।

৬/অলংকারা - রাজরাজাগণ সর্বগুন সম্পন্ন যেসব নারীগণকে মন্দিরে উপহার দিত তাদের অলংকারা বলা হতো।

৭/নগরী - বিধবা এবং আশ্রয়হীন মহিলারা আশ্রয়ের জন্য মন্দিরে নিজেকে অর্পণ করতো। এদেরকে নগরী বলা হতো।

দেবদাসীর অর্থ মন্দিরের সেবিকা, বর্ধিত অর্থে মন্দিরাঙ্গনের বারাঙ্গনা, দেহোপজীবিনী বা গণিকা। এই রীতি আসলে "ভক্তিমূলক পতিতাবৃত্তি" (Sacred prostitution)-র পর্যায়ে পড়ে। ভক্তিমূলক পতিতাবৃত্তি হচ্ছে এক ধরনের সামাজিক রীতি যেখানে একজন মানুষ যৌন সঙ্গম করে নিজ পতি বা পত্নী ব্যতীত অন্য কারও সাথে পবিত্র বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে। এ ধরনের কাজে যে ব্যক্তি জড়িত থাকেন তাকে বলে দেবদাসী বা ধর্মীয় পতিতা। দেবদাসীরা ঈশ্বরের সেবিকা। তাদের অতীতে বলা হতো "কলাবন্তী" বা যারা শিল্পকর্মে পারদর্শিনী। অভিজাত শ্রেণি তাদেরকে মন্দির রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত করত। তাদের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল মন্দির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, প্রদীপে তেল ঢালা, পূজামন্ডপে ও ধর্মীয় শোভাযাত্রায় গান-নৃত্য করা এবং পূজার সময় প্রতিমাকে বাতাস দেওয়া। অবশ্য এইসবেরও মধ্যে ছিল, পুরোহিতদের শয্যাসঙ্গিনী, যৌন লালসার শিকার হওয়া। গরিব ঘরের মা-বাবা তাঁদের কুমারী মেয়েকে রজস্বলা হবার আগেই নিয়ে আসে মন্দিরে৷ প্রথমে কুমারী মেয়েদের নিলাম করা হয়৷ তারপর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত উৎসর্গ করার নামে বিগ্রহের সঙ্গে কুমারী মেয়েদের তথাকথিত বিয়ে দিয়ে দেন৷ 

তবে, প্রচলিত অর্থে "পতিতা" বলতে যা বোঝায়, এরা কিন্তু তা ছিল না। কারণ 'পতিতা' শব্দের অভিধানিক অর্থ 'অর্থের বিনিময়ে যে দেহদান ব্যবসায় লিপ্ত '। এরা পতিতা নয় তিনটি যুক্তিতে- প্রথমত, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা অর্থের বিনিময়ে মন্দিরে দেহদান করত না। দ্বিতীয়ত, এরা সামাজিক বিধান মেনেই মন্দিরে সমবেত হত এবং সর্বোপরি, মন্দির থেকে দেহদান করে বেরিয়ে এসে নির্বিবাদে সমাজে মিশে যেত ও কারও স্ত্রী, কারও মা হয়ে সুখে জীবন অতিবাহিত করত।

শুধু ভারতেই নয়, এর শুরুটা বেশ পুরানো। প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মকে উপজীব্য করে গড়ে তোলা হয় এ প্রথা। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ানরা ধর্মীয় যৌনতার কোনো সু্যোগই হাতছাড়া করতো না। এই প্রাচীনতম প্রথার তিনটি প্রকারভেদ লক্ষ্য করা গেছে। প্রথম ক্ষেত্রে, যৌবনোদ্গমের পর কুমারী অবস্থায় তাদের মন্দিরে যেতে হত আদিরসের প্রথম পাঠ নিতে, মাত্র এক রাতের জন্য। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, তাদের মন্দির চত্বরে বেশ কিছুদিন যৌনজীবনের আদি পাঠ নিয়ে অভ্যস্ত হতে হত, স্থানভেদে কোথাও কয়েক সপ্তাহ, কোথাও বা কয়েক মাস। দুটি ক্ষেত্রেই মন্দির থেকে ফিরে তারা বিবাহ করত। সমাজে কারোর কোন আপত্তি থাকত না। তৃতীয় ক্ষেত্রে, কুমারী মন্দিরে যেত ঠিকই কিন্তু আর ফিরে আসতো না, সারাজীবনের জন্য তারা দেবদাসী হয়ে যেত।

প্রথম প্রথাটির প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া যায় হেরোডোটাস-এর বর্ণনায়। ব্যাবিলনের মাইলিট্টা-র মন্দির প্রসঙ্গে ইতিহাসকার লিপিবদ্ধ করেছেন, ব্যাবিলনীয়দের মধ্যে একটা লজ্জাকর প্রথা আছে। ব্যাবিলনের প্রতিটি রমণীকে জীবনে একবার অন্তত মন্দিরে উপস্থিত হতে হবে এবং মন্দিরের অলিন্দে সার দিয়ে বসতে হবে। অজানা অচেনা পুরুষদল ওই অলিন্দ দিয়ে পদচারণা করবার অবকাশে রমণীদের ভিতর এক একজনকে পছন্দ করে তার কোলে একটি রৌপ্যমুদ্রা ফেলে দেবে। কে দিল, তা ফিরে দেখবার অধিকার মেয়েটির নেই। যে তাকে পছন্দ করল তার হাত ধরে মেয়েটিকে চলে যেতে হবে মন্দির চত্বরের বাইরে নিভৃত নিকুঞ্জে। সেখানে সেই অপরিচিতকে সন্তষ্ট করার মাধ্যমেই মেয়েটি রতিদেবীর প্রাপ্য অর্ঘ্য মিটিয়ে দেবে৷ তারপর সে ফিরে যাবে নিজের সংসারে সংসার ধর্ম করতে। ওই প্রথম রাতের পর আর কোনভাবেই মেয়েটিকে সতীত্ব থেকে টলানো যাবে না। তবে, হেরোডোটাস কিন্তু খোলাখুলি বলেননি, ব্যাবিলনের রমণীরা কি কুমারী অবস্থায় মন্দিরে আসত নাকি জীবনের যে কোন পর্যায়ে আসত। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - prostitution)