Articles by "স্বভিমানের স্বদেশ"
Showing posts with label স্বভিমানের স্বদেশ. Show all posts

বেবি চক্রবর্তী, সাংবাদিক ও লেখিকা, কলকাতা:

পথের ধারে অজস্র রক্তপাত বয়ে ছিল মৃত্যুর ঢল উঠেছিল স্লোগান, ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায় - লাখো ইনসান্ ভুখা হ্যায়।

মাতৃভূমির বুকে বেজে ছিল শঙ্খ ধ্বনি - উড়েছিল পতাকা মধ্যরাতের অন্ধকারে রাত্রি বারোটায় অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা।

সূর্যালোকে আসেনি ভারতের স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম মধ্যরাতের অন্ধকারে। ঘড়িতে তখন রাত বারোটা| অখন্ড ভারতের বারোটা বাজিয়ে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছিল| মাঝরাতে দু’টুকরো হয়ে গেল দেশ| কিন্তু ভারত ভেঙে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম নেয়নি| জন্মেছিল দু’টি পৃথক ডোমিনিয়ন| ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসের ঠিক মাঝামাঝি ১৪ – ১৫ ই আগষ্ট বাস্তবে কি ঘটেছিল তাঁর ছোট একটা বিবরণ ইংরেজিতে তুলে দিলাম —

New Delhi, Aug 15 :- Two new Dominions , India and Pakistan , were born at zero hour today, ushering in political freedom to 400 million people constituting one – fifth of the human race. At a special session of the Indian Constituent Assembly, the House assumed full powers for the administration of the Indian Dominion.

সূর্যডোবা সেই রাতে এসেছিল ভারতের বুক চিরে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান নামে আলাদা দুই ডোমিনিয়নের জন্ম| সেইসঙ্গে ক্ষমতার হস্তান্তর|

মুক্তিযুদ্ধে দুই প্রধান নায়কই ছিলেন ওই দৃশ্যে অনুপস্থিত| ১. মহাত্মা গান্ধী, যিনি কলকাতার বেলেঘাটায় বস্তি এলাকায় মুখ লুকিয়ে ওই রাতটি কাটিয়েছিলেন| ২. নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (নেতাজি স্বয়ং থাকলে বোধ হয় এটি হত না)|

স্বাধীনতা দেশভাগ একসঙ্গে জড়িয়ে গেল। কিন্তু দেশভাগ ছিল যতটা নিরেট সত্য, স্বাধীনতা ততটা নয়| দেশভাগের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল কোটি কোটি মানুষের চোখের জল| রক্তের স্রোত বয়েছিল| জাতির চেয়ে বড় হয়েছিল সম্প্রদায়| যেখানে সম্প্রদায় বিশেষ জেহাদ ছাপিয়ে গিয়েছিল জাতীয় সংগ্রামকে। শুরুতেই গড়ার চেয়ে ভাঙাই পেল মর্যাদা| দেশপ্রেমকে বিদায় জানিয়ে মান্যতা দেওয়া হল ক্ষমতার কাড়াকাড়িকে|

কে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হবেন!

সেইরাতে গান্ধিজিও নাকি নিরবে কেঁদেছেন। পরে স্বীকার করছিলেন ১৫ ই আগষ্ট ছিল তাঁর পরাজয়ের দিন| গ্লানিভারে নুয়ে পড়েছিলেন তিনি| গান্ধিজি বলেন –“জওহরলাল, সর্দার প্যাটেল, মৌলানা আজাদ সবাই তাঁর দূরের মানুষ| এরা এতকাল আমাকে মই হিসেবে ব্যবহার করেছে| কাজ ফুরোলে ছুঁড়ে ফেলেও দিয়েছে| গান্ধিজি পরে স্বীকার করেন যে “যদি সুভাষ ফিরত তবে দেশভাগ হত না|”

স্বাধীনতা ও দেশভাগ একই সময়ে ব্রিটিশ আইনের আওতায়| আইনের নাম The Indian Independence Act, 1947 …

কিন্তু ৫নং ধারায় এসে থলির বেড়াল বেড়িয়ে পড়েছিল|

For each of the new Dominions, there shall be a Governor General who shall be appointed by His Majesty and shall represent His Majesty for the purposes of the Govenment of the Dominion.

ব্রিটিশ যে ভারত থেকে বিদায় নেবে সুভাষচন্দ্র তা জানতেন। যাবার আগে তারা যে অখন্ড ভারতকে খন্ডিত করে দিয়ে যাবে তা তিনি যুদ্ধ শুরু হবার আগেই বুঝেছিলেন| কংগ্রেস সভাপতির ভাষণে সে বিষয়ে তিনি জনসাধারণ ও শিক্ষামন্ডলীকে হুঁশিয়ার করেও দিয়েছিলেন| তারপর যখন তিনি দেশের বাইরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় স্বাধীনতার যুদ্ধ চলা কালীন তখন বেতার ভাষণে গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল প্রমুখ নেতৃমন্ডলীর কাছে বারবার তিনি আবেদন জানিয়েছিলেন, মাতৃভূমিকে দ্বিখন্ডিত হতে দেবেন না| কেউ শোনেনি তাঁর কথা। তাই আজ সমগ্র ভারতবর্ষের রাজনীতি যেন জাতির অন্ধ বিবেচিত নির্বাচিত প্রার্থী কূটনীতিকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে দুর্নীতির দিকে ক্রমশ অগ্রসর হয়েছে| অর্থনীতি সাম্যতা কমে দিনে দিনে বেকারত্বের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে| স্বাধীনতার নতুন সূর্য কখনও দেখতে চায়নি ক্ষুধার্ত অসহায় শিশুর কান্না আর বেকারত্বের অবহেলিত নীরব নোনাজল!

ব্রিটিশ ভারতকে দীর্ঘদিনের  নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের পর ১৯৪৭ এর ১৫ ই আগষ্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত (India) - পাকিস্তান (Pakistan) নামে দুটি স্বাধীন অধিরাজ্যে বিভক্ত হয়| সারা দেশ যখন মুক্তির আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছে, তখন দেশে একটি নতুন শ্লোগান ওঠে ---- "ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় | ভুলো মাৎ ভুলো মাৎ" এই স্বাধীনতা মিথ্যা, ভুলো না, ভুলো না। বলা বাহুল্য, এ অভিযোগ যথার্থ নয়, বরং বলা য়ায় ---- অর্ধ - সত্য | ড. অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন, "এ আজাদি একেবারে ঝুটা না হলেও জন্মসূত্রে প্রতিবন্ধী|" আসলে স্বাধীনতা লাভের ফলে ভারত দু- টুকরো হয়ে যায়| ভারতের দুটি সমৃদ্ধিশালী প্রদেশ ---- বাংলা ও পাঞ্জাব দ্বিখন্ডিত হয়| দেশজুড়ে শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, লুন্ঠন, নারী নির্যাতন, ধর্মান্তর এবং লাখ লাখ ছিন্নমূল মানুষের দেশান্তর গমন| ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ায় পাকিস্তান ভারত - ভুক্ত পাঞ্জাব থেকে লাখ লাখ মানুষ ভারতে চলে আসতে থাকে| এইসব দেশত্যাগী মানুষদের জন্য বাসস্থান, খাদ্য ও কাজের ব্যবস্থা করা কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়| দেশ ভাগের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিও বিভক্ত হয়ে যায়| ভারতে দেখা যায় চরম বেকার সমস্যা| ১৯৪৭ এর অখন্ড ভারত ভাগ নতুন দেশের গৃহহীন ও বাস্তুুচ্যুত| ১৯৪৭ সালের এপ্রিলেও বোঝা যায়নি আগষ্টে দেশভাগ হবে| এপারের মানুষ ওপারে যাবে। ওপারে মানুষ এপারে| মুর্শিদাবাদ, খুলনার মানুষ বিভ্রান্ত হবে তাদের অংশে ভারত না পাকিস্তানের পতাকা উড়বে। সিলেটের করিমগঞ্জে পাকিস্তানের পতাকা উড়েও নেমে যাবে| প্রাক্তন এক ইংরেজ বিচারক স্যার সেরিল র‍্যার্ডক্লিফ যিনি আগে কোনদিন ভারতবর্ষে আসেনি, ভালো করে ম্যাপ পড়ার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা (Cartographic Knowledge) যার নেই, প্রত্যক্ষ কোনও অভিজ্ঞতা নেই এ অঞ্চলের মানুষের জীবন সংস্কৃতি, ভাষা ও আনন্দ - বেদনার তাকে কিনা দায়িত্ব দেওয়া হল বাংলাকে বিভক্ত করার বাউন্ডারি কমিশনের| স্যার লর্ড মাউন্টব্যাটেন দেশভাগের জন্য তাড়াতাড়ি করে ধরে এনেছিল তখনকার রাজনৈতিক চাপের পরিস্থিতি সামাল দিতে তার আঁকিবুকি ও নানা কূটকৌশলের রাজনৈতিক সমীকরণে কোটি কোটি মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা আর বিপর্যয় নেমে আসবে| অনেকের নতুন পরিচয় হবে উদ্বাস্তু| ছেড়ে যেতে হবে সাত পুরুষের বসতি, স্মৃতি ও সংগ্রামের ভূমি, নদী -মাঠ- ঘাট, আশৈশব, হেঁটে যাওয়া চেনা পথ, প্রান্তর। পেছনে পড়ে থাকবে ধূ-ধূ স্মৃতির ভূমি, স্বজনের কবর আর শশ্মান| অসহায় অজস্র মানুষের স্থান হবে রিফিউজি ক্যাম্প| কেউ যাবে দূর পৌরাণিক কাহিনীর অনুর্বর দেশ -দণ্ডকারণ্যে। তাদের সংগ্রাম ও গভীর বেদনা ফুরাবে না একজীবনে। আজ যেন সব স্মৃতির পাতা।

(www.theoffnews.com fractured freedom India)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

দক্ষিণ গারো পাহাড়ের টলেগ্রে গ্রামে আবিষ্কৃত ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও প্রচারিত মেঘালয়ের গর্বের জীবাশ্মটি চুরি হয়ে গেছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা এই কুকর্মকাণ্ডের জন্য হতবাক এবং ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ।

গত বছরের মে মাসে, কোর জিও অভিযান দলের নেতৃত্বে একটি অভিযান এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এলাকাটি ঘোরাঘুরি করার পরে গ্রামে জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছিল। প্রারম্ভিক অনুমান অনুসারে জীবাশ্মটি প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ কোটি বছর আগের এবং রোডোসেটাস বা অ্যামুলোসেটাস (এখন বিলুপ্ত) গণের অন্তর্গত। এই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীটিকে তিমিদের স্থল পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়।

কোর জিও টিমকে অনুসরণ করে, একটি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (জিএসআই) দলও গত বছর সাইটে পৌঁছেছিল যেখানে তারা দৃশ্যত ফলাফলগুলি যাচাই করার প্রয়াসে সাইট থেকে নমুনা নিয়েছিল। তবে জীবাশ্মের বড় অংশটি গ্রামবাসীদের দ্বারা অক্ষত এবং সুরক্ষিত ছিল। এমনকি তাঁরা এলাকায় বহিরাগতদের অযথা অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, এমনকি জেলা প্রশাসনকে সাইটটি এবং এর বিষয়বস্তু সংরক্ষণের জন্য সাইটটি পরিদর্শন না করতে বলা হয়েছিল।

তবে একটি সূত্র জানিয়েছে যে জীবাশ্মটি চুরি হয়েছিল, অভিযোগ করা হয়েছে দুই রাত আগে, কেউ জায়গাটি ভেঙে পুরো অংশটি খনন করার পরে। চুরির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দক্ষিণ গারো হিলসের পুলিশ সুপার শৈলেন্দ্র বামানিয়া।

“ফসিল চুরির গুজব আসার পর একটি দল গতকাল (চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারী) সেখানে গিয়েছিল। তবে তারা নোকমা বা গ্রামের সচিবের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি কারণ তারা তাদের মাঠে কাজ করছে। অবশ্য অন্য গ্রামবাসীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গ্রামবাসীরা বর্তমানে চুরির বিষয়ে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করার কথা ভাবছে,” এসপি জানিয়েছেন।

সূত্রের মতে, চুরিটি অনেক দিন আগে ঘটে থাকতে পারে তবে ঘটনাটি পরিদর্শন করতে গ্রামে পরিদর্শন করা একজন সিনিয়র অফিসারের সাম্প্রতিক পরিদর্শনের পরেই এটি আবিষ্কার করা হয়েছিল। সাইটটি টলেগ্রের বাসিন্দাদের দ্বারা সুরক্ষিত ছিল এবং পরিদর্শন নিষিদ্ধ ছিল।

“এটি সত্যিই দুঃখজনক এবং মেঘালয় একটি মূল্যবান নিদর্শন হারিয়েছে। আমরা সাইটটিকে সংরক্ষণ করার জন্য চাপ দিয়েছিলাম কারণ এটি অঞ্চলের জন্য একটি সম্পদ ছিল। এত চেষ্টার পরও যে শেষ পরিণতি এই হবে তা কে জানত। আমি এই ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম,” নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বাসিন্দা এমনটা জানিয়েছেন।

গারো পাহাড় জুড়ে তার অনুভূতি প্রতিধ্বনিত হয়।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিজু থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ অপরাধীদের খুঁজছে।

মেঘালয়ের শিক্ষামন্ত্রী রাক্কাম সাংমার মতে, রাজ্য সরকার ওই জায়গায় একটি জাদুঘর তৈরির পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেছেন, "গ্রামবাসীরা আমাকে জানিয়েছে...তারা একটি এফআইআর দায়ের করেছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এটা হওয়া উচিত হয়নি...ফসিলের একটি অংশ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই জীবাশ্মটি রাজ্য ও দেশের একটি সম্পদ। আমরা অপরাধীকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করব। এই সাইটটি মেঘালয়ের দক্ষিণ গারো হিলসের সিজু থানার অধীনে আমার নির্বাচনী এলাকা টোলেগ্রেতে অবস্থিত। বিদেশ থেকে ভূতাত্ত্বিকরা এটি আবিষ্কার করেছিলেন। রাজ্য সরকার এই জায়গায় একটি জাদুঘর নির্মাণের কথা ভাবছিল, এবং স্থানীয় বিধায়ক হিসাবে আমি পরিকল্পনা করছিলাম।" এটির জন্য চাপ দেওয়ার জন্য, পুলিশ কীভাবে তদন্ত করবে তা দেখতে হবে।”

(www.theoffnews.com Rodhocetus fossil stolen Meghalaya)


দেবর্ষি মজুমদার, সিনিয়র জার্নালিস্ট, বীরভূম:

আমাদের দেশে বিশ্বের বলিষ্ঠতম গণতন্ত্র বিরাজমান। রাজতন্ত্র কবে বিদায় নিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। তাহলে প্রজা কোথা থেকে এলো? অথচ আজকের এই বিশেষ দিনে আখছার ভাষণে কিম্বা শুভেচ্ছা বার্তায় জেনে না বুঝে প্রজাতন্ত্র দিবস বলা হয়। ভাববার বিষয়। যারা জেনে ইচ্ছে করে ভুল বলেন অর্থাৎ প্রজাতন্ত্র দিবস বলেন, তাদের জন্য এই লেখা নয়। তারা অসংশোধনীয়। এটা অবশ্যই ঠিক যে আমার উপর নেই ভুবনের ভার। তাই তাদের কথা বাদ থাক। যারা জানেন না, তারা বুঝলেও বুঝতে পারেন। 

আজকের এই বিশেষ দিন আমাদের কাছে গর্বের। কারণ আজকের দিনে আমরা আমাদেরকে অর্থাৎ নিজেদেরকে দেশের সংবিধান প্রদান করি। শপথ নিই সংবিধানের মর্যাদা সর্বদা রক্ষা করবো। 

এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাধারণতন্ত্র দিবসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত গানের লাইন খুবই প্রাসঙ্গিক হবে। "-- আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে--" আমাদের আলাদা করে কোনও রাজা নেই। অনেকেই ভুল করে "রিপাবলিক ডেই" এর বাংলা তর্জমা করে বলে থাকেন প্রজাতন্ত্র দিবস।" কিন্তু আমরা কেউ প্রজা নই। গণতন্ত্রে জনসাধারণ সর্বেসর্বা। তাই আমরা সাধারণতন্ত্রের জয়গান গাই। 

আমাদের প্রথম সাধারণতন্ত্র দিবস পালিত হয় ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫১ সালে। এই বছর ২০২৫ সালে সংবিধান গৃহীত হওয়ার ৭৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে, যা ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলা যায়। এই বছর ভারত ৭৬তম সাধারণ তন্ত্র দিবস উদযাপন করছে। 

প্রতি বছর কেন্দ্র সরকার এই উপলক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট থিম নির্বাচন করে থাকে। এবছরের থিম 'স্বর্ণিম ভারত'। যা দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং উন্নয়নের যাত্রাকে তুলে ধরেছে বা ধরবে।

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ এ ভারত স্বাধীন হলেও দেশের প্রশাসক প্রধান হিসেবে তখনও বহাল ছিলেন ষষ্ঠ জর্জ। লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ছিলেন গভর্ণর জেনারেল। তখন আমাদের হাতে কোনও স্থায়ী সংবিধান ছিল না। ঔপনিবেশিক ভারত শাসন আইনে কিছু রদবদল ঘটিয়েই দেশ শাসনের কাজ চলছিল। বলে রাখা ভালো, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ আগস্ট একটি স্থায়ী সংবিধান রচনার জন্য খসড়া কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। শান্তিনিকেতনের কলাভবনের অধ্যক্ষ শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুকে ভারতের সংবিধানের সচিত্র অলংকরণ বা নকশা চিত্রিত করার দায়িত্ব দেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। সেই কাজে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ভারতের স্বকীয় সত্ত্বা তুলে ধরতে সংবিধানের পাতায় তিনি যেমন এঁকেছেন বুদ্ধ মূর্তি, তেমনি এঁকেছেন গান্ধীজীর ডাণ্ডি অভিযান, নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজ, জাতীয় প্রতীক সারনাথের অশোক স্তম্ভের সিংহ। সারা ভারতের প্রতীক হুবহু সাদৃশ্য রেখে একত্রিত করে তিনি চিত্রিত করেছেন। জাতীয় সংহতি হিসেবে ৪ নভেম্বর ১৯৪৭ তারিখে কমিটি একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করে গণপরিষদে জমা দেয়। চুড়ান্তভাবে সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে ২ বছর, ১১ মাস, ১৮ দিন ব্যাপী সময়ে গণপরিষদ এই খসড়া সংবিধান আলোচনার জন্য ১৬৬ বার অধিবেশন ডাকে। এই সমস্ত অধিবেশনে জনসাধারণের প্রবেশের অধিকার ছিল। শেষে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর স্বাধীন ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়। যেহেতু ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারিতে, প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালন হয়, সেহেতু ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ভারতের সংবিধান কার্যকর করা হয়। সেদিন থেকে আমরা ভারতবাসীরা এই দিনটিকে যথাযথ মর্যাদার সাথে পালন করে আসছি।

(www.theoffnews.com Republic day Indian Constitution)


রণজিৎ গুহ, লেখক ও সমাজকর্মী, দুর্গাপুর:

(লেখক একজন গর্বিত প্রাক্তন ইস্পাত কর্মী)

৩৯৫টি ধারা এবং ৮টি তপশিল সম্বলিত ভারতীয় সংবিধান সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ সংবিধান। ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর, এই তিন বছরের মধ্যে তা রচিত হয়। যা কার্য্যকরী হয় ১৯৫০ সালে ২৬শে জানুয়ারি। রচনা পর্বে এর বিভিন্ন মুসাবিদাগুলির প্রত্যেকটি ধারা ভারতের গণপরিষদে আলোচিত হয়। সব মিলিয়ে গণ পরিষদের ১১টি অধিবেশন বসেছিলো। মোট সময় লেগেছিলো ১৬৫ দিন। এইসব অধিবেশনের মাঝেই বিভিন্ন কমিটি ও উপকমিটির মুসাবিদাগুলির সংশোধন আর পরিমার্জনের কাজ চলতো। গণপরিষদে তিনশোর বেশী সদস্য ছিলেন। 

উইনষ্টন চার্চিল বিষ-ঢালা ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলেন -"এই গণপরিষদ কেবলমাত্র একটি প্রধান সম্প্রদায়ের (হিন্দু সম্প্রদায়ের) ক্ষমতা দখলের কমিটি ...।" কিন্তু গণপরিষদ সংবিধান রচনার এই প্রক্রিয়াটিকে আরও বেশী করে অংশগ্রহণমূলক করে তোলার জন্য সাধারন মানুষের কাছ থেকেও মতামত চাওয়া হয়েছিল, সেই আবেদনে সারাও মিলেছিল ভালোই ¦ 

কেউ কেউ "গান্ধীবাদী আদর্শে" সংবিধান রচনার পরামর্শ দিয়েছিলেন... আবার কলকাতা থেকে "নিখিল ভারত বর্ণাশ্রম স্বরাজ্য সমিতি"- প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রীয় মত ভিত্তিক সংবিধান রচনার পরামর্শ দেয়... নিন্মবর্ণের গোষ্ঠীগুলোর দাবি ছিল, "উচ্চবর্ণের অত্যাচার বন্ধ করতে তাদের জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হোক,... ভাষা সংখ্যালঘু , ধর্মীয় সংখ্যালঘু, মহিলা সমাজ, শিক্ষক সঙ্ঘ, আদিবাসী সঙ্ঘ থেকে "কেন্দ্রীয় ইহুদি পরিষদ" শত শত সংগঠন এবং ব্যক্তি বিশেষের প্রস্তাব দেখলেই বোঝা যায় সংবিধান রচয়িতাদের কতো রকম স্বার্থের কথা মাথায় রাখতে হয়েছিল।

গণপরিষদের প্রতিবেদনগুলি ১১টি মোটা মোটা খন্ডে ছাপা হয়। এইসব খন্ডগুলি পড়লে - যার কতকগুলোর পৃষ্ঠা সংখ্যা ১০০০ বেশী ও ভারতীয়দের বচন পটুত্বের নমুনা ছাড়াও তাঁদের অন্তদৃষ্টি, বুদ্ধি, আবেগ আর রসবোধেরও নমুনা পাওয়া যায়। এই খন্ডগুলো একেকটি সোনার খনি, কিন্তু অল্প লোকই তার খবর রাখে। ইতিহাসবিদের কাছে এর মূল্য অসীম এবং আগ্রহী নাগরিকদের কাছে জ্ঞানলাভের সাম্ভাব্য এক উৎস। 

১৯৪৬ সালের ৩১শে ডিসেম্বর জহরলাল নেহেরু গণপরিষদের লক্ষ্য সংক্রান্ত বিষয়ে প্রথম ভাষণে -ভারতকে "স্বাধীন, সার্বভৌম, প্রজাতন্ত্র" বোলে ঘোষনা করেন, নাগরিকদের সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সমমর্যাদা, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ, সংখ্যালঘু এবং পিছিয়ে পরা উপজাতিদের রক্ষাকবচের ব্যবস্থা সংবিধানে রাখার কথা ঘোষনা করেন ...।" 

১৯৪৯ সালের ২৫শে নভেম্বর অর্থাৎ গণপরিষদের কাজের শেষ দিন ডা. আম্বেদকর এক মর্মস্পর্শী ভাষণে - প্রথমে ধন্যবাদ জানান গণপরিষদের মুসাবিদা কমিটির সব সদস্যদের। ধন্যবাদ জানালেন সাহায্যকারী কর্মীদের এবং ধন্যবাদ জানালেন সেই পার্টিকে, তিনি সারা জীবন ধরে যার বিরোধিতা করেছেন। পরিষদ কক্ষের ভিতরে ও বাইরে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব সহযোগিতা না করলে তাঁর পক্ষে এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে সুশৃঙ্খলভাবে সংবিধান রচনা সম্ভব ছিল না, কংগ্রেস পার্টির এই শৃংখলার সুবাদেই মুসাবিদা কমিটির পক্ষে প্রতিটি ধারা ও প্রত্যেকটি সংশোধনীর পরিণতি সম্বন্ধে সুনিশ্চিত হয়ে সংবিধানকে পরিষদে ঠিকমত চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে...।"

১৯৪৬ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে যখন গণপরিষদের অধিবেশনগুলো বসে, চারদিকে তখন ছেয়ে রয়েছে খাদ্যের অভাব, ধর্মীয় দাঙ্গা, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, শ্রেনী যুদ্ধ, সীমান্তে যুদ্ধ এবং সামন্ততান্ত্রিক বিরুদ্ধতার এক পরিবেশ। এক ইতিহাসবিদের ভাষায়, "মৌলিক অধিকারগুলি রচনা করতে হলো মৌলিক অনধিকারের ভয়াবহ এক বাতাবরণে!"

(www.theoffnews.com Baba Ambedkar Indian Constitution)


রণজিৎ গুহ, লেখক ও সমাজকর্মী, দুর্গাপুর: 

(লেখক একজন গর্বিত প্রাক্তন ইস্পাত কর্মী)

স্বাধীনতার পর সামান্য কয়েকটা বছর কেটেছে তখন। ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে বেরিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টায় নতুন ভারত। কিন্তু এরপর? আইনকানুন দৃঢ় করার জন্য, স্বাধীন দেশে দরকার নতুন সংবিধান। দেশের নেতারা এবার মন দিলেন সেই কাজেই। কিন্তু এমন ঐতিহ্যশালী দেশের সংবিধান ও তার গড়ন, গঠন, নকশা তো যেমন-তেমন করে হওয়ার নয়! হাতে লিখতে হবে। শুধু তাই নয়, সেই হাতে লেখা পৃষ্ঠার পাতায় পাতায় চাই ছবি ও নকশার বৈভব। ঠিক যেমনটি থাকত মুঘল পুঁথিচিত্রে কিম্বা পাল ও জৈন পুঁথি চিত্রকলায়।

কিন্তু এই কঠিন কাজের দায়িত্ব কে নেবে? নকশাদার হাতের লেখার জন্য তলব পড়ল প্রেমবিহারী নারায়ণ রায়জাদা'র (সাক্সেনা)। তিনি ব্রিজবিহারী নারায়ণ রায়জাদা'র পুত্র। রায়জাদা'রা দিল্লির বাসিন্দা। কিন্তু ব্যবসা রামপুরে। ইংরেজি রোমান ঢং-এর হাতের লেখার সুদক্ষ ক্যালিগ্রাফার প্রেমবিহারী। গোটা সংবিধানটি হাতে লেখার দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হল তাঁর ওপর। আর হাতের লেখার পাশাপাশি ছবি ও নকশা দিয়ে সংবিধানের পাতাগুলিকে সাজানোর বিষয়টি নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবতে সময় নেননি ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। তাঁর কন্যা ইন্দিরার শান্তিনিকেতনের কলা ভবনের মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু ছাড়া আর কেই বা সামলাতে পারেন এই গুরুভার!

খবর গেল শান্তিনিকেতনে। এমন দায়িত্ব পেয়ে নন্দলাল বসু তৎপর হলেন সঙ্গে সঙ্গে। তাঁর নেতৃত্বে শান্তিনিকেতনের কলাভবনের শিল্পীরা শুরু করলেন ভারতের সংবিধানের অলঙ্করণের কাজ। পুরো সংবিধানটি ছাপা হয় ফোটো লিথোগ্রাফ পদ্ধতিতে, দেরাদুনের সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে। এমন নকশামণ্ডিত সংবিধানের পৃষ্ঠা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যে যে বিষয় নিয়ে ছবি আঁকা হয়েছে সেগুলি হল - মহেঞ্জোদারের সিল, গুরুকুল বা বৈদিক আশ্রমের দৃশ্য, রামায়ণের দৃশ্য, মহাভারতের দৃশ্য, বুদ্ধের জীবনী, মহাবীরের জীবনী, বৌদ্ধধর্মের প্রসার ও সম্রাট অশোকের ভূমিকা, গুপ্ত যুগের শিল্পধারার বিবিধ পর্যায়, বিক্রমাদিত্যে রাজসভা, ওড়িশার ভাস্কর্য শিল্প, নালন্দা, নটরাজের নৃত্য, মহাবলীপুরম ভাস্কর্য দৃশ্য, আকবর ও মুঘল স্থাপত্য, শিবাজি ও গুরু গোবিন্দ সিং, টিপু সুলতান ও ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, জাতির পিতা গান্ধী ও তাঁর ডান্ডি মার্চ, গান্ধিজির নোয়াখালি ভ্রমণ, দাঙ্গার সময়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, ভারতের বাইরে থেকে ভারত, হিমালয়ের দৃশ্য, মরুভূমির দৃশ্য, সমুদ্রের দৃশ্য। সব মিলিয়ে মোট বাইশটি ছবি।

ভারতের ঐতিহ্যের ছবি সংবিধানের পাতায় পাতায়। ধর্ম, ঐক্য, বোধ, সমাজ, ত্যাগ, জাতীয়তাবাদ, দেশের গঠন, জাতির স্বপ্ন সবকিছুর সম্পর্ক রয়েছে এই ছবিগুলির সঙ্গে।

আরও আকর্ষণীয় বিষয় হল, সংবিধানের বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আঁকা হয়েছে সে-পাতার ছবি। যেমন, যে-পাতায় রয়েছে ইমার্জেন্সি প্রভিশনের কথা, সেই ১৫৪ নম্বর পৃষ্ঠার ছবির বিষয় হলো গান্ধিজীর নোয়াখালির দাঙ্গা কবলিত এলাকা ভ্রমণ। যেখানে রয়েছে কর্মোদ্যম দিয়ে দেশ গঠনের প্রসঙ্গ। সেখানে এসেছে সম্রাট আকবরের ছবি। বাণিজ্যের প্রসঙ্গে এসেছে মহাবলীপুরমের ছবি, যেখানে রয়েছে গঙ্গা অবতারণের দৃশ্য। এরকমই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে, তার সঙ্গে ইতিহাস ও পুরাণের প্রসঙ্গ মিলিয়ে ভারতের সংবিধান চিত্রিত। যার মূল অবদান নন্দলাল বসু’র।

(www.theoffnews.com Indian Constitution Nandalal Basu Prembihari Narayan Royjada)


মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও লেকচারার, আহমেদাবাদ:

ছোট বেলায় মায়ের মুখে গল্প শুনে পরিচয়, গোল গোল চশমার নীচে চোখ দুটো ছোট হলেও কি শান্ত আর তেজী মনে হয়েছিল। মাকে নাকি আড়ালে কলেজের ছেলেরা সুভাষ চন্দ্র বলতো, কারণটা মেয়ের স্পর্ধা, সবাই মিলে কোনও প্রফেসরের ক্লাস বয়কট করলে, একা মা ক্লাস করতে যায়, আর তিনিও একাই একজন ছাত্রী নিয়ে পড়াতে শুরু করেন, আস্তে আস্তে একটি দুটি মেয়ে এসে যোগ দেয়, তারপর অর্ধেক ক্লাস। 

সুভাষচন্দ্র মানে একটাই লাইন আমার কাছে, "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।" এক কালে বাঙালিকে বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে চলতে ইনিই শিখিয়ে ছিলেন। 

শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড়ে এসে প্রথম কলকাতা চিনতাম। ঘোড়ার মুখের দিকে, লেজের দিকে কোন রাস্তা। ১৬ বছর বয়সে মফঃস্বল থেকে আসা একলা মেয়েটি প্রাক্টিক্যাল ক্লাস করতে যেত কলেজ স্ট্রীটে আপনার মূর্তির ভরসায়। 

পড়াতে পড়াতে একবার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শংকরবাবু বলেছিলেন, "সুভাষ চন্দ্র এমন মানুষ যাঁর জন্মদিন আছে, মৃত্যু দিন নেই। একটা আশার আলোর নাম সুভাষ!"

ছোট বেলায় মাঝে মাঝে দেখতাম হাওড়া স্টেশনে, বাস স্ট্যান্ডের গায়ে লেখা, "নেতাজী ফিরে আসবেন!"

বুঝতাম ইনি একজন এমন মানুষ যিনি মৃত্যুঞ্জয়ী! যাঁর অপেক্ষায় থাকে মানুষ দিনের পর দিন। মায়ের মুখে শুনেছি শোলমরীর সাধুর কথা, মায়েদের পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে নাকি ওনাকে দেখতে গিয়েছিল। বুঝতে পারতাম আজও তরুণ প্রজন্ম যুগে যুগে হন্যে হয়ে যাকে খোঁজে সেই ব্যক্তিত্ব হলেন সুভাষচন্দ্র!

এরপর বিয়ের পরে দেখি আমার স্বামীর অবসর যাপন সুভাষ চন্দ্রের ওপর পড়াশুনো, জানতে পারি শশুর মশায়ের সাথে সুভাষ চন্দ্রের দাদা সুরেশ বোস এর আলাপ পরিচয়। সুরেশ বোস বলেছিলেন "সুভাষ আমায় রাখী পাঠায়।"

এসব শোনার পরে ছাই আর তার ডিএনএ টেস্টিং বড় হাস্যকর লাগে। অনুজ ধরের back from dead, conundrum আসার পর থেকে অনেক ধোঁয়াশা কাটতে থাকে। চন্দ্রচূড় ঘোষ আর অনুজ ধরের রিসার্চ জানায় তাইওয়ানের সেই বিমান দূর্ঘটনাতে মৃত্যু হয়নি ওনার, রাশিয়ার জেলে এক মহিলা সাংবাদিক দেখেছিলেন তাঁকে। এরপর তিব্বতের দুর্গম পথ ধরে অতি কষ্টে এসে পা রাখেন নিজের দেশে, ভারতবর্ষে।

মনে মনে ভাবি এক কালে যার কণ্ঠস্বর শুনে  দেশবাসীর রক্ত চলকে উঠেছিল, মেয়েরা তার ডাকে অনায়াসে গায়ের গয়না খুলে দিয়েছিল সেই স্বাধীন ভারত বর্ষে এসে মানুষটি যখন জানলেন তিনি  নাকি জাতীয় শত্রু, তখন কতখানি কষ্ট পেয়েছিলেন!

ভাবলে ভীষণ কষ্ট অনুভব করি। নামটি ও পেলেন ভারী অদ্ভুত গুমনামি বাবা, নামটাই যার গুম হয়ে গেছে!

সত্যিই কি তথাকথিত তদানীন্তন দেশীয় পিতা, চাচা শ্রেণির চক্রান্তকারীরা পেরেছেন ওই মানুষটিকে আপামর ভারতবাসীর মন থেকে গুম করে দিতে? এতই কি সহজ ! নেতা তো হাজার হাজার কিন্তু নেতাজী তো একজনই হন!

ভরসা, বিশ্বাসের আর এক নাম সুভাষ চন্দ্র! যিনি আজ ১২৮ বছর বয়সেও শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের স্বপ্ন দেখার সাহস দেন! আজও নিশ্চয়  দেশের কোনও না কোনও মা সন্তানদের তাঁর গল্প বলে শেখাবেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে। ২৩শে জানুয়ারি  আসলে শিরদাঁড়া সোজা রেখে  অন্যায়ের সাথে আপোষ না করার বার্তাবহ একটি দিন। জয় হিন্দ।

(www.theoffnews.com Netaji Subhash Chandra Bose)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলা থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বেণীসাগর গ্রাম থেকে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (এএসআই) উৎখননে প্রাপ্ত শতাধিক প্রত্নবস্তু থেকে বোঝা গেছে যে এখানে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী থেকে ১৬-১৭ শতাব্দী পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে মানুষের বসবাস ছিল। 

প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানে পাওয়া ভাস্কর্য এবং পাথরের মূর্তিগুলি নিয়ে ক্রমাগত গবেষণা করছেন।  কৌতূহলোদ্দীপক এমন অনেক প্রত্নবস্তুও এখানে পাওয়া গেছে যেগুলির রহস্য আগামী দিনে উন্মোচিত হতে পারে।

এএসআই ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ১০০টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের তালিকায় বেণীসাগরকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ৩০০ x ৩৫০ মিটার আয়তনের একটি বিশাল পুকুরের কারণে এর নামকরণ করা হয়েছিল বেণীসাগর, যা নিয়ে স্থানীয় এলাকায় জনশ্রুতি প্রচলিত আছে যে এটি বেণী বা বেণু নামে একজন রাজা নির্মাণ করেছিলেন।

১৮৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কর্নেল টিকেল এই স্থানটি প্রথম আবিষ্কার করেন এবং ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক জে.ডি. বেগলার বেণীসাগর পরিদর্শন করেন এবং এখানে কিছু ভাস্কর্য দেখতে পান। এই মূর্তির উপর ভিত্তি করে তিনি এই প্রত্নস্থলটিকে খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীর বলে নিরূপণ করেন। ইতিহাসবিদ কে সি পানিগ্রাহী এখানের প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে ১৯৫৬ সালে একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছিলেন।

এএসআই ২০০৩ সালে  প্রথমবারের মতো এখানে খনন করে। এই দীঘির দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্বের বাঁধের দিকে খননের ফলে দুটি পঞ্চায়তন মন্দির চত্বর এবং সূর্য, ভৈরব, লকুলিশ, অগ্নি, কুবের প্রভৃতি দেবতার অনেক ভাস্কর্যের ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে। 

এগুলি ছাড়াও ওখানে একটি পাথরের শিলালিপিও পাওয়া গেছে, যেটিতে "প্রিয়াঙ্গু ধেয়াম চাতুবিদ্যা (চাতুরবিদ্যা)" খোদাই করা রয়েছে, যার অর্থ ‘প্রিয়ঙ্গু নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি চারটি বেদে সুপণ্ডিত ছিলেন।' শিলালিপির লিপি ব্রাহ্মী এবং ভাষা সংস্কৃত। কিছু গবেষকের ধারণা, যে বেণীসাগর থেকে উদ্ধারকৃত শিলালিপি থেকে বোঝা যায় যে এটি একটি শিক্ষাকেন্দ্র ছিল, যেখানে চারটি বেদ পড়ানো হত। তার ওপর কাম এবং সঙ্গমের শিলামূর্তিগুলি দেখে বোঝা যায় যে সেই সময়ে যৌন শিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল না। 

ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে বেণীসাগর অবশ্যই তান্ত্রিক ও শৈবধর্মের প্রভাবাধীন এলাকা ছিল।

আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইট অনুসারে, এটিকে এপিগ্রাফিক বা শিলালিপির অধ্যয়ন থেকে ৫ম শতাব্দীর বলে মনে করা যেতে পারে। এযাবৎ কালের আবিষ্কারের ভিত্তিতে বলা যায় যে এখানে ৫ম থেকে ১৬-১৭ শতাব্দী পর্যন্ত জনবসতি ছিল।

বেণীসাগর ওডিশার ময়ূরভঞ্জ জেলার সীমান্তের কাছে অবস্থিত। ময়ূরভঞ্জের এপি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অজয় রাওয়াত বলেছেন যে ওড়িশা সংলগ্ন অঞ্চলে বহু রাজা বহু শতাব্দী ধরে রাজত্ব করেছেন। বেণীসাগরে খননকার্য ও ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করে যে এটি অবশ্যই ওডিশার রাজার অধীনে ছিল। এখানকার মন্দির স্থাপত্যকে ওডিশায় প্রচলিত রেখ দেউল ধরনের স্থাপত্যের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

২০০৯ এবং ২০১৯-২০২০ সালে এখানে পরিচালিত বৈজ্ঞানিক খননের সময় অগ্নি, গণেশ, মহিষাসুরমর্দিনী, সূর্য, ব্রহ্মা, শিরোচেদক, ভৈরব, লকুলিশ, যমুনা, শিবলিঙ্গের মূর্তি খোদাই করা পাথরের প্যানেলগুলি পাওয়া গেছে। এছাড়াও, মন্দিরের স্থাপত্যের অনেকগুলি অংশ যেমন দরজার চৌকাঠের বাজু, শাখা এবং খাড়া পিলার আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব নিদর্শন বেণীসাগরে নির্মিত একটি জাদুঘরে রাখা হয়েছে। এই জাদুঘর থেকে কিছু দূরত্বে প্রাচীন সভ্যতার কিছু ঘরের ধ্বংসাবশেষও রয়েছে। তাদের বাঁকা গঠন দেখে মনে হয় সেখানে প্রাচীন যুগে স্নানের জায়গা ছিল।

এছাড়াও ৫০ একর জায়গা জুড়ে মন্দির চত্বরের ধ্বংসাবশেষও এখানে পাওয়া গেছে। মন্দিরের কাছে একটি বিশাল পাথর, যা অন্য একটি পাথর দিয়ে আঘাত করলে ঘণ্টার শব্দ নির্গত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রক্ষীরা বলেন যে রাতে এক কিলোমিটার দূরেও এই শব্দ শোনা যায়।

৩০০ x ৩৫০ মিটারের বিশাল পুকুরটি এই জায়গার অন্যতম আকর্ষণ, যেটি গ্রামবাসীদের মতে কখনও পুরোপুরি শুকিয়ে যায় না। যদিও এই এলাকার অন্যান্য পুকুরগুলির প্রায়শই সেই দশা হয়। পর্যটকদের সুবিধার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুকুরের চারপাশে একটি ভিউপয়েন্ট তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে তারা বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

(www.theoffnews.com archeology Jharkhand Benisagar)