Articles by "না মানুষের ইতিকথা"
Showing posts with label না মানুষের ইতিকথা. Show all posts

মোনালিসা মুখোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার, হিন্দমোটর, হুগলি:

ভালোবাসার সব বাঁধন কেটে চলেই গেলি গদা। সাত বছর আগে সেই শীতের সকাল। রাস্তায় তোর কান্না শুনছিলাম রান্নাঘর থেকে। কেউ ফেলে গেছিল। অসহায় হয়ে মা কে খুঁজে চলেছিলি।

তারপর আমার কোলে চেপে ঘরে এসে একবাটি দুধ বিস্কুট খেয়ে ঘুম৷ তারপর বেড়ে ওঠা, নাকে দম করা বদমায়েশি, কখনও ২৫০ সিম একা খাওয়া, সারারাত বসে আমার কুর্তি টুকরো টুকরো করা। চেবানো,ছেঁড়া, উলটে দেয়া এগুলোই কাজ ছিল তোর। অনেককিছু মনে পড়ছে। তোর ঘরটা ভয়ে ভয়েই খুলতাম রোজ। না জানি কি কীর্তি করে রেখেছিস।  কি কি কুড়োতে হবে, কি কি ছিঁড়েছিস, চেয়ারের হাতল কতটা খেয়েছিস,আমার জামাগুলো গোটা আছে কিনা, বোরোলিনের ঢাকা আছে কিনা, ব্যাগের হ্যান্ডেলটা আছে কিনা....... 

যাক আমার চিন্তামুক্ত করে চলে গেলি। ঘুমিয়ে পড়লি আর উঠলি না। হঠাৎই এসে হঠাৎই চলে গেলি একবেলার অসুস্থতায়। একদিন আগেও ভাবিনি তুই এভাবে পালাবি। ঘরটা আজও খুলেছি যথারীতি। সব গোছানো আছে পরিপাটি কেউ কিছু ছেঁড়েনি, তোর বিস্কুটের কৌটো আছে, জলের বাটি, বিছানা সব আছে। তোকেই পেলাম না শুধু।

কোথায় বদমায়েশি করছিস কি জানি...বড় ফাঁকা লাগছে গদা। তুই আমার অভ্যেস ছিলি। তোর অত্যাচারই আমার সারাদিনের মনের খাবার ছিল। তুই ছাড়া এত নিরুপদ্রব জীবন আমি চাইনি।

আসব তোকে খুঁজে নিতে দেখা হবে।

(www.theoff.com pet dog)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

পরীক্ষার সময়, একজন অধ্যাপক একটি ভূতের মুখোশ পরেছিলেন এবং জাল দিয়ে সাতটি কাককে ধরেছিলেন। আলেকজান্দ্রে দুমা’র লেস ফ্রেস কর্সেস বা “দ্য কর্সিকান ব্রাদার্স” নিশ্চয়ই মনে আছে! নেপোলিয়নের জন্মস্থান বলে নয় আমাদের মনে কর্সিকা ছোটবেলা থেকে স্থান করে নিয়েছে ‘প্রতিহিংসার দ্বীপ’ বলে। ‘৪১ নং গেছোবাজার, কাগেয়াপটির শ্রীকাক্কেশ্বর কুচকুচে’কে তো কেউ ভুলতেই পারবে না! ‘দ্য বার্ডস’ ফিল্মে ক্যালিফোর্নিয়ার বোদিগা বে শহরের অধিবাসীদের আক্রমণে হিচকক ১০০টি শিক্ষিত কাক ব্যবহার করেছিলেন যেটি বিশ্বের হরর ফিল্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। ২০০৬ সালে নির্মিত ‘দ্য ক্রোজ’ হরর মুভিতে ল্যাব থেকে পালানো একদল কাক মানুষকে আক্রমণ করতে শুরু করে। আসল ঘটনাটা জানা এক ভেট বার্লিন শহর এবং শহরবাসীদের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। অধুনা এক অধ্যাপক বিজ্ঞানী আবার এই দুয়ের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন।  

যারা কাকের বাচ্চা পুষতে চেয়েছিলেন বা যে গাছে কাকার বাসা আছে এমন গাছে উঠতে চেয়ে মাথায় ঠোক্কর খাননি বা বাইরে বেরোলেই কাকেরা মাথার চারপাশে কা কা করতে করতে গোল হয়ে উড়ে ভয় দেখায়নি এমন মানুষ খুব কমই আছেন কিন্তু এই অধ্যাপক আবিষ্কার করেছেন যে কর্সিকার দ্বীপবাসীদের মতো কাকেরাও দীর্ঘদিন জিঘাংসা পুষে রাখতে পারে এবং সেটা এক আধ বছর নয় – পাক্কা সতেরটি বছর – রামের বনবাস আর পাণ্ডবদের বনবাস-অজ্ঞাত বাসের থেকেও বেশি।

যদিও মনুষ্য জাতির মধ্যে  প্রতিশোধ নেওয়া একটি অতি সাধারণ বৈশিষ্ট্য, আপনি কি কখনও পাখি বা পশুদের প্রতিশোধ নিতে শুনেছেন?  আমাদের দেশের গল্পে বা সিনেমায় এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে, লোককথায় এসবের অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে তার হদিশ পাওয়া শক্ত। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে সাপের জোড়ার একটাকে মেরে ফেললে অন্যটা এসে হত্যাকারীর ওপর প্রতিশোধ নেয়, যদিও এর কোনও প্রামাণ্য নথি নেই। শঙ্খচূড় সাপ ছাড়া আর কোন সাপের মানুষকে চেনার ক্ষমতা নেই বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কিন্তু পাখি বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন যে কাক সত্যিই বিদ্বেষ পোষণ করে। একটি সমীক্ষা অনুসারে, কাকেদের যদি কোনও মানুষের সাথে শত্রুতা হয় তবে তারা সেটা ১৭ বছর পর্যন্ত মনে রাখতে পারে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। 

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী প্রফেসর জন মার্জলফের গবেষণা থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ২০০৬ সালে, কাকের প্রতিশোধস্পৃহা আছে কিনা তা বোঝার জন্য তিনি একটি পরীক্ষা করেছিলেন। পরীক্ষার সময়, তিনি একটি ভূতের মুখোশ পরেছিলেন এবং জাল দিয়ে সাতটি কাককে ধরেছিলেন। শনাক্ত করার জন্য তিনি তাদের ডানায় চিহ্ন দিয়ে রাখেন এবং তারপর তাদের অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেন। তবে তাদের মুক্তির পরও কাকগুলো তাঁকে অনুসরণ করতে থাকে। ক্যাম্পাসে যতবার তিনি মুখোশটা পরেছিলেন, ততবার তারা তাঁকে আক্রমণ করেছিল।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, অন্যান্য কাকও এই বিক্ষোভে যোগদান করে এবং এই আক্রমণগুলি সাত বছর ধরে চলতে থাকে। ২০১৩ সালের পর ধীরে ধীরে কাকের আগ্রাসন কমতে থাকে। তারপরে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে, পরীক্ষার ১৭ বছর পরে, প্রফেসর মারজলফ মুখোশ পরে বাইরে হাঁটছিলেন এবং প্রথমবারের মতো, কাকগুলি তাঁকে আক্রমণ করেনি বা চীৎকার করেনি। প্রফেসর মার্জলফ এখন এই চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার উপর তার গবেষণা প্রকাশ করার পরিকল্পনা করেছেন।

প্রফেসর মার্জলফ তাঁর গবেষণার মাধ্যমে  দেখতে পান যে কাকের মধ্যে স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো অ্যামিগডালা (মস্তিষ্কের একটি অঞ্চল যা প্রাথমিকভাবে আবেগগত প্রক্রিয়াগুলি বিশেষ করে ভয় এবং উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত) বা লিম্বিক তন্ত্র আছে। তিনি অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছিলেন যে কাকগুলি কেবল মানুষের আচরণই ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে না, এমনকি মুখগুলিও চিনতে পারে।

যেসব কাক কারও কাছ থেকে বিপদের আশঙ্কা করে তাকে তারা মনে রাখতে পারে এবং মনের মধ্যে একটি ক্ষোভ পুষে রাখতে পারে, কখনও কখনও এটির বার্তা গোষ্ঠীর অন্যান্য কাকের কাছে পৌঁছে দেয়। রাগান্বিত কাকের সাথে মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা ‘দ্য বার্ডস’ বা ‘দ্য ক্রোজ’ হরর সিনেমার দৃশ্যের মতো মনে হতে পারে। সিয়াটেলের একজন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ জিন কার্টার, হাতেনাতে এটি শিক্ষা পেয়েছিলেন, যখন কাকরা তাঁকে তাঁর জানালার বাইরে থেকে প্রায় এক বছর ধরে নজরদারি চালিয়েছিল।

প্রফেসর শঙ্কুর ‘কর্ভাস’ সত্যিই অনন্য কাক ছিল কারণ মন্দ ম্যাজিসিয়ান আর্গাসের হাতে কিডন্যাপড হয়েও সে ‘ভেনডেটা’ বা প্রতিহিংসা নেয়নি – “উপরে চেয়ে দেখলাম— সত্যিই তো—আমার বন্ধু, আমার শিষ্য, আমার প্রিয় কর্ভাস গাছটার সবচেয়ে উঁচু ডালে বসে নিশ্চিন্তভাবে আমাদের দিকে ঘাড় নিচু করে দেখছে।

তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতেই সে অক্লেশে গোঁত খাওয়া ঘুড়ির মতো গাছের মাথা থেকে নেমে এসে বসল আমাদের মারসেডিসের ছাদের উপর। তারপর অতি সন্তর্পণে—যেন জিনিসটার মূল্য সে ভালোভাবেই জানে—তার ঠোঁট থেকে তার সামনেই নামিয়ে রাখল আর্গাসের মাইনাস বিশ পাওয়ারের সোনার চশমাটা।” সাবাস প্রোফেসর শঙ্কু – সত্যজিৎ রায়  কর্ভাস (প্রোফেসর শঙ্কু)

(www.theoffnews.com crow revenge)



 

সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

জুলজিক্যাল সার্ভে (জেডএসআই) এবং ওড়িশা বন বিভাগ ওড়িশা উপকূলে হর্সশ্যু ক্র্যাব বা রাজকাঁকড়াকে ট্যাগ বা লেবেলিং করার জন্য একটি প্রকল্প শুরু করেছে। উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পাওয়া এই কাঁকড়াগুলিকে রক্ষা করতে ভারত এই প্রথম এমন উদ্যোগ নিয়েছে।

রাজকাঁকড়া পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম এবং মানুষের ওষুধ শিল্পের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের রক্ত চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য উৎপাদিত পণ্যের নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে ব্যবহার করা হয়, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।

বর্তমানে পৃথিবীতে মাত্র চারটি রাজকাঁকড়ার প্রজাতি বর্তমান, তার মধ্যে ভারতে পাওয়া যায় দুটি - ট্যাকিপলিয়াস গিগাস যা ওড়িশা উপকূলে পাওয়া যায় এবং কার্সিনোস্কোরপিয়াস রোটুন্ডিকাউডা যা পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভে পাওয়া যায়। উভয় প্রজাতিই ভারতের ১৯৭২-এর বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের বলে সুরক্ষিত।

রাজকাঁকড়া অনেক প্রাণঘাতী বিপদের সম্মুখীন হয়, বিশেষ করে ক্ষতিকারক মাছ ধরার রেওয়াজ এবং অবৈধ চোরাচালান থেকে, যার কারণে তাদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। তাদের রক্ষা করার জন্য অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরী।

ট্যাগিং প্রোগ্রামে তাদের জনসংখ্যা এবং তারা কোথায় থাকে সে সম্পর্কে আরও জানতে রাজকাঁকড়ার সঙ্গে ছোট ট্যাগ সংযুক্ত করা হয়। এখন পর্যন্ত, ৭০টি কাঁকড়াকে ট্যাগ করা হয়েছে এবং আগামী তিন বছরে আরও শতাধিক কাঁকড়াকে ট্যাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বালাসোরের ফকির মোহন বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য গবেষণা সংস্থার বিশেষজ্ঞরা এই সংরক্ষণ প্রকল্পে সহায়তা করছেন। তাঁরা ক্ষতিকারক মাছ ধরার অভ্যাস কমানোর উপায় খুঁজছেন, যেমন মারণ জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, যা রাজকাঁকড়াকে ধ্বংস করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের জন্য বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা একটি ‘প্রজাতি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা’র উন্নয়নের জন্য চাপ দিচ্ছেন। এই পরিকল্পনা ভারতে হর্সশ্যু ক্র্যাব বা রাজকাঁকড়ার বেঁচে থাকা এবং সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

হর্সশু কাঁকড়া সম্পর্কে আকর্ষণীয় তথ্য

রাজকাঁকড়া কাঁকড়ার চেয়ে মাকড়সার বেশি কাছাকাছি।

রাজকাঁকড়ার নীল রক্ত আছে কারণ এতে হিমোসায়ানিন নামক একটি বিশেষ পদার্থ রয়েছে যা অক্সিজেন বহন করতে সাহায্য করে।

রাজকাঁকড়া প্রায় ৪৫ কোটি বছরেরও বেশি সময় পৃথিবীতে টিকে আছে এবং পাঁচটি গণবিলুপ্তি থেকে বেঁচে গেছে।

তাদের চোয়াল নেই; তারা তাদের খাবার চিবনোর জন্য বিশেষ উপাঙ্গ ব্যবহার করে।

তাদের চোখ অতিবেগুনি রশ্মি দেখতে পায়।

তারা নষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুনরুৎপাদন করতে পারে।

রাজকাঁকড়ার রক্ত ব্যাকটেরিয়ার জন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম পরীক্ষা করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই আধুনিক ওষুধের জন্য এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণিদের সংরক্ষণের ইতিহাস খুব উৎসাহব্যাঞ্জক না হলেও এবার অন্তত আশা করা যায় যে ভারতবর্ষ থেকে রাজকাঁকড়া চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবার আগে অন্তত একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

(www.theoffnews.com Horseshoe crab tag Orissa tag)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

ব্লবফিশ দেখতে কেমন? এমন একটা মাছ কল্পনা করো যেটা মাছের থেকে বরং খোলা থেকে বেরিয়ে আসা থলথলে ঝিনুকের মত দেখতে। তার ওপর আবার মুখের ওপর ঝুলে থাকে বিশাল একটা থ্যাবড়া নাক! এই অদ্ভুতদর্শন মাছ অল্পদিনের মধ্যেই “বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত মাছ” তকমা পেয়ে গেছে কিন্তু আবার সমুদ্র সংরক্ষণের জন্য ‘পোস্টার চাইল্ড’ হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের তলায় থাকা এই নতুন আবিষ্কৃত মাছটি খুব অল্পদিনের মধ্যেই নেটিজেনদের মধ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছে আর মিম, সফট টয়েজ আর ইমোজিতে অমর হয়ে গেছে।

ব্লবফিশের বিজ্ঞানসম্মত নাম হল সাইক্রোলুটিস মাইক্রোপোরোস, যা মাছের সাইক্রোলুটিডে ফ্যামিলির অন্তর্গত। যাইহোক, 'ব্লবফিশ' শব্দটি কখনও কখনও সাইক্রোলুটিডি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বর্ণনা করার জন্য আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহৃত হয় যেমন পি. মার্সিডাস।

পি. মাইক্রোপোরোসের প্রথম নমুনাটি নিউজিল্যান্ডের তটভূমির কাছে ১৯৮৩ সালে একটি গবেষণা জাহাজ খুঁজে পায় কিন্তু তারও একযুগ পরে আনুষ্ঠানিক ভাবে এটির বর্ণনা এবং বিজ্ঞানসম্মত নাম দেওয়া হয়। যদিও এরমধ্যে মাছধরা ট্রলারের জালে আরও কিছু ব্লবফিশ উঠে এসেছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই রহস্যময় সামুদ্রিক প্রাণীটির সম্বন্ধে আমাদের জানার মধ্যে বিশাল বিশাল ফাঁক থেকে গেছে। 

ব্লবফিশ সম্বন্ধে অনেক কিছু অজানা থাকা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে আরেকটি নমুনা ছবি তোলার পর ব্লবফিশ ব্যাপকভাবে কুখ্যাতি পেয়েছে। এই লেখার প্রথমেই যে ছবি দেওয়া আছে সেটা এতই বিখ্যাত যে সর্বত্র তোমরা এটা দেখতে পাবে।

এর থলথলে জেলির মত চেহারা প্রথম দিকের ইন্টারনেট কালচারের জন্য একটা দারুণ মওকা ছিল। কাদাকাদা, হড়হড়ে এই প্রাণীটিকে যে কোনও আকারে কল্পনা করা খুব সহজ। এই মাছটিকে কিছুদিন পরে ‘আগলি অ্যানিমাল প্রিজারভেশন সোসাইটি’ দ্বারা পরিচালিত একটি ভোটে বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত প্রাণী হিসাবে ঘোষণা করা হয়, যারা যুক্তি দেখায় যে কেবল সুন্দর প্রাণীদেরই সুরক্ষার প্রয়োজন।

ব্রিটিশ টিভির একটি চরিত্রের নামানুসারে ২০০৩ সালে এই মাছের নমুনাটির ডাকনাম ছিল মিস্টার ব্লবি।

ব্লবফিশ কী?

ইন্টারনেট মিম হিসাবে খ্যাতিমান হওয়ার আগে ব্লবফিশ বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে একটি কৌতূহলের বিষয় ছিল। সাইক্রোলুটিডি পরিবারের এই সদস্যটিকে কখনও কখনও একটি স্কাল্পিন বা ফ্যাটহেড (কারণ স্পষ্ট) বলে উল্লেখ করা হয়। গভীর সমুদ্রের এই প্রাণীটিকে ইন্টারনেটে যেরকম থলথলে বোরোগোবে টাইপের দেখা যায়, বাস্তবে ব্লবফিশ আদপেই সেরকম দেখতে নয়। এর  প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে সরিয়ে জলের ওপরে নিয়ে এলে আশির দশকের ডেজার্টের মত দেখায়।

ব্লবফিশের চেহারা অমন কেন? 

ব্লবফিশ প্রজাতি সমুদ্রের গভীরতম গহ্বরে ৬০০ থেকে ১,২০০ মিটার গভীরতায় বাস করে। আমরা এই মুহূর্তে ডাঙ্গায় যে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ অনুভব করছি ওই গভীরতায় সেটার থেকে ১০০ গুণ বেশি হতে পারে। এই উচ্চ চাপের পরিমণ্ডলে বাস করার ফলে ব্লবফিশের বিভিন্ন ধরণের অভিযোজন হয়েছে যেমন নরম থলথলে, খুব কম পেশীযুক্ত শরীর আর নরম হাড়। 

যখন কোনও ব্লবফিশকে জল থেকে তোলা হয়, চাপ কমে যাওয়ার ফলে এটা আকারে বেড়ে যেতে পারে আর এর চামড়া শিথিল হয়ে গিয়ে এর স্বাভাবিক আকার পালটে গিয়ে একটা বড় নাকের মত দেখায়। ডাঙ্গাতে বা নৌকার পাটাতনে ব্লবফিশের জেলাটিনাস টিস্যু তার আসল গঠন ধরে রাখতে পারে না আর তাকে দেখে একটা ভেসে আসা জেলিফিশ মনে হয়।

জীববিজ্ঞানী, কৌতুকাভিনেতা ও ‘আগলি অ্যানিমাল প্রিজারভেশন সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সাইমন ওয়াট বলেছেন ব্লবফিশের যে চেহারাটা সবাই জানেন সেটি সত্যিই খুব জঘন্য কারণ সেটি একটি মরা ব্লবফিশের ছবি। প্রকৃতিতে তারা অবশ্যই সৌন্দর্যের রাজা বা রানী নয় তবে তাদেরকে দেখতে এতটা মন খারাপ করার মতোও নয়”।

মানুষের সঙ্গে এটা সেইরকমই ঘটত যদি এর উল্টোটা করা হতো অর্থাৎ কোনও সুরক্ষা সামগ্রী বা শ্বাস যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই আমাদেরকে হঠাৎ ১২০০ মিটার জলের নীচে টেনে নিয়ে যাওয়া হত। আমাদেরকেও তাহলে খুব জঘন্য দেখাত! ব্লবফিশকে জলের নীচে অন্যরকম দেখায় কেন না তাদের ডাঙ্গায় থাকার কথা নয়। 

ব্লবফিশকে জলের নীচে কেমন দেখায়?

গভীর জলে একটা ব্লবফিশকে দেখতে একটা মাছের মতই। তাদের ঢিপ মাথা, ড্যাবড্যাবে কালো চোখ আর বুকের কাছে পালকের মত পাখনা। তাদের গায়ের রঙ গোলাপী-ধূসর রঙের, ব্যাঙাচির মত লেজের দিকটা সরু হয়ে গেছে। ব্লবফিশ সাধারণত লম্বায় ৩০ সেমির থেকে কম আর ওজনে ২ কেজির কম।

ব্লবফিশ কি বিপজ্জনক?

মোটেই না। ব্লবফিশ ৩০ সেন্টিমিটারের কম লম্বা, নরম শরীর এবং দাঁত নেই। 

কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কখনই ব্লবফিশের মুখোমুখি হবে না, যদি না কেউ একটি জাদুঘরে বা মাছ ধরার জালে মৃত নমুনা দেখতে পাওয়ার মত যথেষ্ট ভাগ্যবান হয়। এই প্রাণীগুলি সমুদ্রের গভীরে বাস করে, তাই তাদের জীবন্ত দেখতে তোমার একটি সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজের প্রয়োজন।

২০১৯ সালে ডেইলি মেইল অস্ট্রেলিয়ায় একটা খবর বেরোয় যে সিডনি ফিশ মার্কেটের একজন কর্মচারী একটি ব্লবফিশ খেয়েছিল কিন্তু তার কোনরকম বিষক্রিয়া হয়নি। কিন্তু এটা খাওয়া নিরাপদ হলেও এই মাছ বাণিজ্যিকভাবে লভ্য প্রায় কখনই হবে না। তবে ভুল করে যে এদের মাঝে মাঝে ধরে ফেলা হচ্ছে তাতে এদের কতটা ক্ষতি হচ্ছে সেটা এখনও অজানা।

ব্লবফিশ কিভাবে সাঁতার কাটে?

যতটা সম্ভব কম গা ঘামিয়ে! অধিকাংশ গভীর সমুদ্রের মাছের মতো ব্লবফিশের সাঁতারের ব্লাডার নেই যেটা মাছেদেরকে জলের ওপর দিকে উঠতে সাহায্য করে। এর বদলে ব্লবফিশের চর্বিতে ভরা শরীর তাদের সাঁতার কাটতে সাহায্য করে। তারা যে জলে বাস করে তার থেকে এই চর্বির ঘনত্ব কম। তেল যেভাবে জলে ভাসে এরাও চর্বির সাহায্যে সেভাবে জলের ভেসে থাকে। ব্লবফিশ জলের মধ্যে বা সমুদ্রের তলায় গোঁত্তা দিয়ে দিয়ে সাঁতরায়, তবে জীবনী শক্তি বাঁচাবার জন্য বেশিরভাগ সময় এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে। ওয়াট বলেছেন - “এটা পরিশ্রম করা থেকে বাঁচায়। অলস হওয়া বেঁচে থাকার একটা কৌশল। আর অলস হওয়ার জন্য মোটা হওয়া বেঁচে থাকার আর একটা কৌশল।” আমরা অল্পবিস্তর সবাই এটা জানি, তাই না?

ব্লবফিশ কি খায়?

তাদের চিরন্তন কুঁড়েমির জন্য মনে করা হয় যে ব্লবফিশ মুখের সামনে যা পায় তাই গলাধঃকরণ করে। স্বাভাবিক ভেসে থাকা মানে জল তাদেরকে বয়ে নিয়ে যায়। খোল যুক্ত প্রাণী, সামুদ্রিক শামুক বা অন্যান্য ভোজ্য খুব কাছে চলে এলে ব্লবফিশের খাদ্যে পরিণত হয়। গভীর সমুদ্রের শিকারীদের মধ্যে এই অপেক্ষা করে শিকার খুব সাধারণ কৌশল।    

ব্লবফিশ কোথায় বাস করে?

সাইক্রোলুটিডি পরিবারের প্রজাতিরা আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরে বিস্তৃত ভাবে ছড়িয়ে আছে। তবে ব্লবফিশের কয়েকটি প্রজাতি, যার মধ্যে মিস্টার ব্লবি ডাকনামের মাছটিও আছে, যা অনেক জায়গাতেই পাওয়া যায়। পি. মাইক্রোপোরোস এবং তার তুতো পি. মার্সিডাস অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মাঝে ও চারপাশের সমুদ্রে সব সময় ৫০০ মিটারের বেশী গভীরতায় বাস করে। 

ব্লবফিশের বংশবিস্তার!

ব্লবফিশের বংশবিস্তার সম্বন্ধে খুব কমই জানা গেছে গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে বসবাসকারী প্রাণীকে পর্যবেক্ষণ খুব কঠিন। কিছু সাইক্রোলুটিডি প্রজাতিকে প্রায়শই পাথরের ওপর হাজার হাজার ডিম পাড়তে দেখা গেছে যেগুলোর কাছাকাছি থেকে তারা পাহারা দেয়।

একটি ব্লবফিশ কতদিন বাঁচতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব কঠিন কেন না এই অদ্ভুত মাছ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান খুব সীমিত। তবে এটা জানি যে গভীর জলের সামুদ্রিক মাছেরা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, পরিপক্ক হতে অনেক সময় নেয় এবং এদের দীর্ঘ আয়ু হয়। যেমন রকফিশ, যারা ১৫০ থেকে ৪৫০ মিটার গভীরতায় বাস করে। ২০০ বছরেরও বেশি তাদের পরমায়ু হতে পারে।

ব্লবফিশ এবং সংরক্ষণ!

ব্লবফিশ সত্যিই আসলে বিপন্ন কিনা সেটাই স্পষ্ট নয় কারণ এরা গভীর সমুদ্রের অদ্ভুত অজানা জগতে বাস করে আর এরা আমাদের কাছে প্রায় সম্পূর্ণ অজানা। যেমন, আমরা জানি না মোট ব্লবফিশের সংখ্যা এই মুহূর্তে কত, তাদের প্রাকৃতিক খাদক কেউ আছে কিনা, সমুদ্রের দূষণের ফলে তাদের কোনও ক্ষতি হচ্ছে কিনা বা তাদের গড় আয়ুই বা কত? ওয়াট বলেছেন - “ব্লবফিশ সত্যিই আসলে বিপন্ন কিনা সেটা জানা না থাকলেও যে কোনও সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষেত্রেই এটা সত্যি। কারণ গভীর সমুদ্রের ট্রলার থেকে এদের বিপদ হতেই পারে।”

(www.theoffnews.com Blobfish)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

সৃষ্টির আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক ভাবে আর আধুনিক যুগে পরিযায়ী মানুষের জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে উদ্ভিদ এবং প্রাণী দেশ থেকে দেশে, মহাদেশ থেকে মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন পরিবেশে প্রাকৃতিক খাদক না থাকায় তাদের বাড়বৃদ্ধি হয়ে ওঠে অনিয়ন্ত্রিত এবং স্থানীয় প্রজাতির পক্ষে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর প্রতিযোগী। ১৮ শো শতাব্দীর শেষের দিকে ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল লর্ড হেস্টিংসের স্ত্রী লেডি হেস্টিংস দক্ষিণ আমেরিকার কচুরিপানার ফুলের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে গিয়ে ভারতে রোপণ করেন যা পরে রক্তবীজের ঝাড়ের মত ভারত, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার বেশিরভাগ জলাশয়কে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমেরিকা থেকে পিএল ৪৮০ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতে ৩২ বিলিয়ন টাকার বদলে যে গমের ভাণ্ডার এসেছিল তার মধ্যেই ছিল পার্থেনিয়ামের বীজ যা থেকে পার্থেনিয়াম গাছ কয়েক বছরের মধ্যেই ভারতের ৭৬% জমিতে পঙ্গপালের মত ছড়িয়ে পড়েছে, যার রেণু থেকে চুলকানি, হাঁপানি, হে ফিভার এবং ব্রঙ্কাইটিসের মত বিভিন্ন অ্যালার্জির মহামারির মত সৃষ্টি হচ্ছে। আমেরিকার ফ্লোরিডায় বার্মিজ পাইথন আর বোয়া কনস্ট্রিক্টর জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে কিন্তু এত দ্রুত তারা ছড়িয়ে পড়েছে যে কর্তৃপক্ষ পরাজিত হয়েছে। ইংল্যান্ড থেকে জাহাজের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে যাওয়া দ্রুত প্রজননকারী খরগোশও সে দেশের শাসকদের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্দামানে কাঠের ব্যবসার জন্য যে হাতিগুলি মূল ভূখণ্ড থেকে আনা হয়েছিল তাদেরকে নিয়েও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। বুনো হাতিরা সংখ্যায় কম এবং সাম্প্রতিক গবেষণার অভাবের ফলে আন্দামানের বাস্তুতন্ত্রের উপর বুনো হাতির প্রভাবগুলি অজানা।

বঙ্গোপসাগরে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় এক হাজার মাইল পূর্বে অবস্থিত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে কয়েকশো দ্বীপ রয়েছে যেগুলি অনিন্দ্যসুন্দর সাদা সৈকত এবং অনন্য জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র্যের হটস্পটের অংশ, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৯,১৩০টি প্রাণীর প্রজাতি রয়েছে যা ডাঙ্গা এবং সমুদ্র, এই দুই জায়গাতেই বিচরণ করে। এর মধ্যে ১,০৩২টি প্রজাতি এই দ্বীপগুলির স্থানীয়। এছাড়াও বহুদিন ধরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের বনগুলিতে কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছে খুব লোভনীয় কয়েকটি গাছের প্রাচুর্য ছিল - অত্যন্ত মূল্যবান পাডাউক; গুরজান, একটি সোজা এবং লম্বা গাছ যা উচ্চ মানের কাঠের জন্য বিখ্যাত; গ্যাঙ্গাও স্লিপার তৈরির জন্য উপযুক্ত এবং চা বাক্সের জন্য ডিডু। উনিশ শতকের শেষের দিকে, ইংরেজ ঔপনিবেশিকরা এই দুর্গম দ্বীপগুলিতে একটি লাভজনক কাঠের ব্যবসা শুরু করে। ১৮৮৩ সালে ২০,০০০ ঘনমিটারের বার্ষিক কাঠের গুঁড়ি গ্রহণের ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম করাতকলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এই দ্বীপগুলি, কাঠুরিয়াদের সঙ্গে সত্বর একটি নতুন প্রজাতির আগমনও দেখেছিল - এশিয়ান হাতি (Elephas maximus)। লগিং শিল্পে কাজ করার জন্য ভারতীয় মূল ভূখণ্ড এবং বার্মা থেকে হাতিগুলিকে আন্দামানে আনা হয়েছিল। তারা গাছ কাটার জায়গা থেকে সমুদ্র উপকূলের ডকগুলিতে গুঁড়িগুলো টেনে আনবে।

ভারতের স্বাধীনতার পর আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ২০০১ সালে নিষিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রচুর পরিমাণে গাছ কাটা অব্যাহত ছিল। যদিও লগিং শিল্প অতীতের জিনিস হয়ে উঠেছে, কাঠ বয়ে আনার জন্য আন্দামানে আনা হাতিগুলি এখানেই রয়ে গেছে। ২০০৯ সাল নাগাদ, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৯৯টি বন্দী হাতি ছিল। ২০১৯ সালের মধ্যে সংখ্যাটি প্রায় ৬৩-তে নেমে এসেছে। এই হাতিগুলির বেশিরভাগই এখন ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। যারা তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং দারুশিল্প বা পর্যটন শিল্পে ব্যবহার করে।

আন্দামানে কম সংখ্যায় বুনো হাতিও আছে। টিম্বার খোঁজার প্রথম দিক থেকেই, কাজের হাতিরা মাঝে মাঝে পালিয়ে যেত বা জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হতো। কালের নিয়মে, গৃহপালিত এই হাতিগুলি ক্রমশ বুনো হয়ে ওঠে আর জঙ্গলেই প্রজনন শুরু করে।

বর্তমানে, আন্দামানের ইন্টারভিউ দ্বীপে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বুনো হাতির বসবাস। উত্তর আন্দামান থেকে মাঝে মাঝে বুনো হাতির খুব ছোট দলের খবর পাওয়া যায়। ইন্টারভিউ ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির কর্মকর্তাদের মতে আন্দামানের বুনো হাতির যদিও কোনও আদমশুমারি হয়নি, তবে অভয়ারণ্যে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় এক ডজন বলে মনে করা হয়।

অসংখ্য অনুপ্রবেশকারী প্রজাতির চাপে আন্দামানের দ্বীপের ইকোসিস্টেমগুলির দফারফা হয়ে যাচ্ছে, যেগুলির মধ্যে সবথেকে ক্ষতিকারক চিতল হরিণ (Axis axis), ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে আনা একটি তৃণভোজী প্রাণী যা আন্দামানে স্থানীয় গাছপালার ফিরে আসাকে বানচাল করছে। 

ইন্টারভিউ দ্বীপের ১০১-বর্গ-কিলোমিটার ভূভাগ প্রায়-চিরসবুজ উপকূলীয় বন এবং ম্যানগ্রোভ দিয়ে ঢাকা। এই দ্বীপটি পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত, এটা ব্রিটিশদের আমলে একটি প্রধান লগিং সাইট ছিল।

মার্কিন লেখক এবং ঔপন্যাসিক লরি উইনস্লো সার্জেন্ট জানিয়েছেন যে তাঁর দাদা জে কেনেথ পিয়ার্স, বিংশ শতকের শুরুর দিকে ইন্টারভিউ আইল্যান্ডে লগিং ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করেছিলেন। তিনি বলেছেন - “গাছ কাটার কাজে হাতিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। দাদা তার ডায়েরিতে হাতির কথা উল্লেখ করেছেন এবং হাতির কয়েকটি ছবিও তুলেছিলেন। তিনি হাতির শক্তির বিকল্প হিসাবে যান্ত্রিক লগিং প্রযুক্তি চালু করেছিলেন।"

ষাটের দশকের গোড়ার দিকে, একটি দেউলিয়া লগিং কোম্পানি দ্বীপে আনুমানিক ৫০টি হাতি ছেড়ে দেয়। এই প্রাণীগুলি তখন থেকে একটি বংশবিস্তারকারী দল তৈরি করেছে। ১৯৮৫ সালে, সরকার এই বন্য হাতিদের রক্ষার জন্য ইন্টারভিউ দ্বীপকে একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বলে ঘোষণা করে।

রউফ আলী, একজন বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, ২০০১ সালের একটি সমীক্ষায়, ইন্টারভিউ দ্বীপে ৩১টি হাতি গুণেছিলেন। তবে, তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোরের সালিম আলি ইনস্টিটিউট অফ অর্নিথোলোজি অ্যান্ড ন্যাচারাল হিস্ট্রির গবেষকরা ২০১২ সালের একটি সমীক্ষায় দেখেছেন যে ইন্টারভিউ দ্বীপে বুনো হাতির সংখ্যা মাত্র ১১টি। তাঁরা এটাও জানিয়েছেন যে বনবিভাগের কর্তারা আগের দশকগুলিতে প্রায় ১৫টি হাতির মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছেন। আন্দামান প্রশাসন ইন্টারভিউ দ্বীপের বন্য হাতিদের স্টাডি করতে সাহায্য করার জন্য আসামের একজন হাতি বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষক বিজয়নন্দনা দুদুল চৌধুরীকে আমন্ত্রণ করেছিল। তিনি ১৯৯৭ সালে ঐ দ্বীপে গিয়ে মাত্র ১১টি হাতি দেখেছিলেন। সংরক্ষণবিদদের মতে শিকারের কারণে আন্দামানের বুনো হাতির সংখ্যা কমে যেতে পারে। সারা আন্দামান জুড়ে, বছরের পর বছর, হাতির দাঁত ধরা পড়ার অসংখ্য খবর পাওয়া গেছে। 

 জীববিজ্ঞানী আলী ২০০৪ সালে দেখেছিলেন যে হাতিরা বেত, বাঁশ এবং পান্ডানুস (খেজুর জাতীয়) গাছের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। আন্দামানের বন্য হাতিদের উপর ২০১২ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে - হাতিদের উপস্থিতি ইন্টারভিউ দ্বীপের স্থানীয় গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি করছে। এমন কিছু গাছের ছাল ছাড়ানোর কারণে ক্ষতি হচ্ছে যেগুলি আগে হাতিরা খেত না, কিন্তু এখন খাবারের অভাবে খেতে বাধ্য হচ্ছে এবং হাতিদের নাগাড়ে এক জায়গায় থাকার কারণে বনের আরও ক্ষতি হবে। আন্দামানের ফরেস্ট রেঞ্জাররা একমত যে ইন্টারভিউ দ্বীপের গাছপালা গত কয়েক দশক ধরে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাঁশ, বেত, পান্ডানাসের মতো গাছপালা দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে।

তবে এটাও মানতে হবে যে সবাই মনে করেন না যে বন্য হাতি আন্দামানের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রজ্ঞা চৌতা, একজন ভারতীয় সংরক্ষণবাদী, এশিয়ান হাতি বিশেষজ্ঞ এবং ‘আনা মানে ফাউন্ডেশন’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা বলেছেন - “আগের গবেষণায় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের জীববৈচিত্র্যের ওপর ঔপনিবেশিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে জঙ্গল কেটে ফেলার ফলাফলকে বিবেচনাই করা হয়নি। তাছাড়াও বন্য হাতি এতো কম এবং অধরা যে তারা দ্বীপগুলির গাছপালাকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করতে পারে না। এছাড়াও, আন্দামানের জঙ্গলটির বার্মার সঙ্গে খুব মিল, যা হাজার বছর ধরে বৃহৎ তৃণভোজীদের ধারণ করেছে।"

(www.theoffnews.com Andaman Elephas maximus Elephant Axis axis)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:           

[টাইরানোসরের শেষ খাবার থেকে শুরু করে ডাইনো দৈত্যদের প্রাচীন বাসা, এই বছরটিতে ডাইনোসর এবং দীর্ঘকাল আগে বিলুপ্ত অন্যান্য প্রাণীদের সম্পর্কে প্রচুর নতুন  তথ্য বিশদে আবিষ্কৃত হয়েছে।

পৃথিবীতে ডাইনোসরদের রাজত্ব প্রথমে বিস্ফোরকভাবে তারপরে ধুলোয় শেষ হয়েছিল যখন প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে একটি গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। কিন্তু ডাইনোসররা এবং তাদের সহচর অন্যান্য প্রাচীন প্রাণীরা তাদের জীবাশ্মে যে বহুসংখ্যক গোপন তথ্য লুকিয়ে রেখেছে সেই রহস্যগুলি বের করার জন্য জীবাশ্মবিদরা দিবারাত্র প্রাণপাত করছেন।  ডাইনোসর এবং বহু আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণী সম্বন্ধে ২০২৩ সালে যেসব দুর্দান্ত আবিষ্কার হয়েছে তার কয়েকটি দেখা যাক।] 

৯) টাইনোসরাস রেক্সের ঠোঁট ছিল

সাম্প্রতিক কালে থেরোপড প্রজাতির টি. রেক্স এবং ভেলোসিরাপ্টরদের মতো প্রাচীন শিকারীদের নিয়ে গবেষণা করছেন এমন একটি জীবাশ্মবিদদের দল ঘোষণা করেছেন যে থেরোপডদের লম্বা, তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো আঁশযুক্ত মোটা চামড়া দিয়ে ঢাকা থাকত। গত শতাব্দীতে ডাইনোসর সংক্রান্ত বেশিরভাগ গণমাধ্যমে যে ছবি তুলে ধরা হয়েছিল এটা তার থেকে বিশাল পরিবর্তন। জনপ্রিয় সিনেমাগুলি যেমন জুরাসিক পার্ক মানুষকে ডাইনোসরের (এবং টেরোসরাস ও মোসাসরাস) চেহারা সম্বন্ধে ভুল ধারণা দিয়েছিল যেটা আধুনিক ডাইনো-গণমাধ্যম ঠিক করার চেষ্টা করছে। এই নতুন গবেষণাপত্রটি সেই অভিমুখে সাম্প্রতিকতম প্রচেষ্টা। 

১০) ডাইনোসরের ভেতরে … একটি স্তন্যপায়ী

বিজ্ঞানীরা এই প্রথম একটি ডাইনোসরের পাকস্থলীর মধ্যে একটি স্তন্যপায়ী প্রাণীর পায়ের জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছেন। ডানাওলা মাইক্রোর্যাপ্টর ডাইনোসরের শেষ খাবারটি ১০ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত হয়ে রয়েছে। জীবাশ্মবিদরা যখন একটি ছোট, চার ডানাওয়ালা ডাইনোসরের ফসিলকে দ্বিতীয়বার খুঁটিয়ে দেখেন তখন তাঁরা শিকারীর পেটের মধ্যে একটি ফসিল হয়ে যাওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণীর পা খুঁজে পান। গবেষকরা মতে এটি ডাইনোসরদের স্তন্যপায়ী প্রাণী খাওয়ার প্রথম পাথুরে প্রমাণ। তাঁদের গবেষণার ফলাফলগুলি জার্নাল অফ ভার্টেব্রেট প্যালিওন্টোলজিতে প্রকাশ করেছেন।

মাইক্রোরাপ্টর ঝাওইনাস ডাইনোসরের বিভিন্ন ফসিলের নমুনায় প্রাচীন পাখি, মাছ এবং টিকটিকির অবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে, তাই স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান এই তেজী শিকারীর জন্য প্রোটিনের নবতম পরিচিত উৎস।

ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির একজন জীবাশ্মবিদ এবং গবেষণার প্রধান লেখক হ্যান্স লারসন বলেছেন, "এটি সত্যিই এই পালক যুক্ত ছোট্ট ডাইনোসরের সাধারণ খাদ্যতালিকার সন্ধান দেয়। মেনুতে স্তন্যপায়ী প্রাণী যোগ হওয়ায় দেখা যাচ্ছে যে এই ডাইনোসর কিরকম সর্বভূক ছিল।"

বৃক্ষবাসী মাইক্রোর্যাপ্টর ক্রিটেসিয়াস যুগের শুরুর দিকে বনের চারপাশে গ্লাইডিং করে ডালপালা ও মাটিতে খাবার খুঁজত যার ফসিলের নমুনাগুলি উত্তর-পূর্ব চীন জুড়ে পাওয়া গেছে। জীবাশ্ম-সমৃদ্ধ অঞ্চলটিকে জেহোল বায়োটা বলা হয় এবং এর সুসংরক্ষিত ধনভাণ্ডার ডাইনোসরের অ্যানাটমির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তারতম্য বোঝার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণী ঠিক কি পরিবেশে বাস করতো তা বোঝার জন্য এই ফসিলগুলি অপরিহার্য। (সমাপ্ত)

(www.theoffnews.com dinosaur)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:             

[টাইরানোসরের শেষ খাবার থেকে শুরু করে ডাইনো দৈত্যদের প্রাচীন বাসা, এই বছরটিতে ডাইনোসর এবং দীর্ঘকাল আগে বিলুপ্ত অন্যান্য প্রাণীদের সম্পর্কে প্রচুর নতুন  তথ্য বিশদে আবিষ্কৃত হয়েছে 

পৃথিবীতে ডাইনোসরদের রাজত্ব প্রথমে বিস্ফোরকভাবে তারপরে ধুলোয় শেষ হয়েছিল যখন প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে একটি গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। কিন্তু ডাইনোসররা এবং তাদের সহচর অন্যান্য প্রাচীন প্রাণীরা তাদের জীবাশ্মে যে বহুসংখ্যক গোপন তথ্য লুকিয়ে রেখেছে সেই রহস্যগুলি বের করার জন্য জীবাশ্মবিদরা দিবারাত্র প্রাণপাত করছেন।  ডাইনোসর এবং বহু আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণী সম্বন্ধে ২০২৩ সালে যেসব দুর্দান্ত আবিষ্কার হয়েছে তার কয়েকটি দেখা যাক।]

৭) টেরোসরের ২৩ কোটি বছরের প্রাচীন পূর্বসূরী

আগস্ট মাসে গবেষকরা ছুরির মত ধারাল নখওলা একটি অদ্ভুত সরীসৃপের জীবাশ্মের আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন। জীবাশ্মটি ২৩ কোটি বছর আগেকার লাগারপেটিড নামের এক সরীসৃপ ডাইনোসরের যারা খুব সম্ভবত উড়ন্ত টেরোসরদের পূর্বসূরী। এই জীবাশ্ম গবেষকদের ট্রায়াসিক প্রাণীদের বৈচিত্র্য অনুধাবন করতে বিরল সুযোগ দিয়েছে। 

৮) ভারতের বিভিন্ন জায়গায় টাইটানোসরের ডিম পাড়ার বাসা

আমাদের জানা বৃহত্তম ডাইনোসরদের মধ্যে কোন কোন প্রজাতি কীভাবে বংশবিস্তার করতো আর ডিম পাড়ত সে সম্বন্ধে আরও ভাল ভাবে জানা যাবে এই আশায় ভারতীয় জীবাশ্মবিদদের একটি দল ডাইনোসরের ২৫৬টি অশ্মীভূত ডিম নিয়ে গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এই ডিমগুলি ভারতের নর্মদা ভ্যালি এবং মুম্বাইয়ের উত্তর ও পূর্বে টাইটানোসরের ৯২টি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, যার প্রথম ঝাঁকটি আবিষ্কৃত হয়েছিল ২০১২ সালে। ২০২৩ সালে গবেষকরা এই ডিমের ফসিলগুলির ধরণ নিয়ে আর  ডিমগুলি যারা পেড়েছিল তাদের সম্বন্ধে যে সব ধারণা করেছেন সেগুলি তাঁরা ‘প্লাস ওয়ান’ পত্রিকায় অতি সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com dinosaur)