Articles by "লালকেল্লার ঠিকানা"
Showing posts with label লালকেল্লার ঠিকানা. Show all posts
কাজল ভট্টাচার্য, সিনিয়র জার্নালিষ্ট, কলকাতা:

"যার শিল যার নোড়া
তারই ভাঙি দাঁতের গোড়া।"
এটাই মন্ত্রগুপ্তি অরবিন্দ কেজরিওয়ালের।
ধুরন্ধর রাজনীতিকদের যা শিখতে বছরের পর বছর লেগে যায়, 'আপ' সুপ্রিমো তা শিখে ফেলেছিলেন মাত্র কয়েকমাসেই।

এবার মোদি অমিত শাহর রাস্তায় হেঁটে, তাদের হাত থেকেই বাজি কেড়ে নিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
ন'বছর আগে দিল্লির রাস্তায়, কেজরিওয়াল হেঁটেছিলেন আন্না হাজারের আঙুল ধরে। অঙ্ক কষে ঠিক সময়মতো, সেই আন্নার আঙুল ছেড়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করেননি কেজরিওয়াল।
"কেউ কথা রাখেনি।" কবি শক্তি চাটুজ্জের সেই কলি সেদিনের মতো আজও সমানভাবে জীবন্ত। প্রাসঙ্গিক, কেজরিওয়ালের মতো মানুষদের সুবাদে।

ভোটপ্রচার ময়দানে গৈরিক শিবির তখন পাকিস্তান, কাশ্মীর, শাহিনবাগ ফাটাচ্ছে। আর ঝাঁড়ু সুপ্রিমো তখন হত্যে দিচ্ছিলেন হনুমানজির দরবারে। বজরংবলি পার করেগা। হলোও তাই। পাকিস্তান কাশ্মীর শাহিনবাগের ঘেঁটি ধরে পগার পার করে দিলো পবননন্দন। কেজরিওয়াল ঝড়ে উড়েই গেল বিজেপি। আর ভোটের গন্ধমাদন নিয়ে দিল্লির গদিতে জাঁকিয়ে বসলেন কেজরিওয়াল।

তবে হনুমানজিকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি তিনি। জেতার খবর পেয়েই পাবলিকলি সেই জিত হনুমানজিকে উৎসর্গ করেছিলেন কেজরিওয়াল। কয়েকঘণ্টার মধ্যেই সপরিবার হাজির হয়ে গেছিলেন কনাট প্লেসের এক প্রাচীন হনুমানজির মন্দিরে। সেখানে গিয়ে বললেন, "হনুমানজি সবার মঙ্গল করবেন।"
মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল।
রাজ্যবাসীর মঙ্গল করার ভার হনুমানজির।

বিজেপির বিরুদ্ধে বারেবারেই অভিযোগ ওঠে হিন্দু তাস খেলার। রামমন্দির তৈরির গল্প শুনিয়েই নাকি দিল্লির মসনদ দখল। অভিযোগে সত্যতা নেই, এমনটা মোটেই নয়।
কিন্তু কেজরিওয়াল কী করলেন?
তিনিও তো সেই তাস খেলেই পদ্মশিবিরকে একেবারে পথে বসালেন। নির্বাচনী ময়দানে নামার আগেই হনুমানজির শরনে। জয়মালা গলায় উঠতেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফের সপরিবার হনুমানজির দরবারে ছোটা। সেই নরম হিন্দুত্বের মোড়কে উন্নয়নের অঙ্গীকার।
মোদি অমিত শাহ রামভক্ত হলে, হনুমানভক্ত কেজরিওয়াল। তারপরেও কেজরিওয়ালের জয়ে সেকুলার বাম ডানপন্থীরা বিজয়োৎসব পালন করেন কোন যুক্তিতে?
আড়ালের গল্পটা অন্য। এই আনন্দ 'আপ'- এর জেতার জন্য নয়। 'বিজেপি'র হারার জন্য।
যে অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে নিয়ে আজ এতো নাচানাচি, তিনি কিন্তু জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিশ্রুতিভঙ্গের বাদশাহ। বলা ভালো, 'আম আদমি পার্টি'র জন্মটাই বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়ে।
সবেতো মাত্র ন'বছর আগের কথা।
আন্না হাজারের কথা মনে পড়ে। গাঁধিজির মতাদর্শের এক প্রবীণ পূজারি। দিল্লির রাজপথে সেই আন্নার আঙুল ধরেই হাঁটতে শিখেছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তখন তিনি রাজনৈতিক অজ্ঞাতকুলশীল। চারপাশে এমন একটাও মানুষ ছিলো না, যে চেনাতো দূরের কথা, নামটাও শুনেছিলো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের।

সাল ২০১১। দিল্লির বুকে আন্না সূচনা করলেন 'দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন'। দাবি লোকপাল বিল চাই। রাজনীতিকে দুর্নীতিমুক্ত করার দাবিতে 'হমকো চাহিয়ে আজাদি" ধাঁচের ঝাঁজালো কোনও আন্দোলন না। গাঁধিজির দেখানো পথেই অনশন শুরু করলেন আন্না। আর ওই আন্দোলনেই আন্নার বিশ্বস্ত সৈনিকের মুখোশ পরে সেদিন উঠে এসেছিলেন কেজরিওয়াল।

তবে মুখোশ খসে পড়তেও দেরি লাগেনি। অসাধারণ সময়জ্ঞান কেজরিওয়ালের। ঝোপ বুঝে কোপ মারায় বিশেষজ্ঞ।
আন্দোলনের শুরুতেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন আন্না, একোনও রাজনীতির ক্ষমতা হাতানো মতলববাজদের মঞ্চ নয়। সুতরাং সবাই সেদিন আন্নার কাছে শপথ করেই আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন, তাঁদের কেউ প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে দলীয় রাজনীতিতে নাম লেখাবেন না।
ঠিক একবছরের মধ্যেই বেইমানি করলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কোনও দলটলে নাম লেখানোর মধ্যে গেলেন না তিনি। সরাসরি নিজেই একটা দল বানিয়ে ফেললেন- আম আদমি কা পার্টি। ২০১২ সালে জন্ম নিয়েই পরের বছর দিল্লির নির্বাচনী ময়দানে নেমে পড়লো 'আপ'।

আন্না যখন কেজরিওয়ালের স্বরূপ বুঝতে পারলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আন্না আক্ষেপ করলেন, মানুষ চিনতে ভুল করেছিলেন তিনি। সেদিনের আন্দোলনে কিছু মানুষ পেটে কূবুদ্ধি নিয়েই এসেছিলেন।
গাঁধি অগাঁধিবাদীরাও আজকাল যেমন বলেন, "আর যেন কোনও নাথুরাম গডসে তৈরি না হয়।" ঠিক সেভাবেই গাঁধিভক্ত বর্ষীয়ান আন্না হাজারে সেদিন বলেছিলেন, "আর যেন কোনও কেজরিওয়াল তৈরি না হয়।" সেই সঙ্গে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, কেজরিওয়াল বা তাঁর দলের কারুর সঙ্গে আন্নার কোনরকম সম্পর্ক নেই।

কপাল ভালো কেজরিওয়ালের।
২০১৩ সালের দিল্লি নির্বাচন। আঠাশটা আসন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এলো 'আপ'। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনও দলের কাছেই ছিলো না। শেষপর্যন্ত কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার তৈরি করে ফেলেছিলেন ধুরন্ধর অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তবে মাত্র উনপঞ্চাশ দিনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর মুকুট নামিয়ে ফের নির্বাচনে যেতে হয়েছিলো কেজরিওয়ালকে।

২০১৫ তে কেজরিওয়াল ফিরলেন ক্ষমতা বাড়িয়ে। হাতে সাতষট্টিটা আসন। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাননি তিনি। তাঁর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু আন্না হাজারে ততদিনে চাপা পড়ে গেছেন অতীতে। রাজনীতি মনে রাখে শাসককেই। সেই শাসক হওয়ার কায়দাটা নিজগুণে, দারুনভাবে রপ্ত করে ফেলেছিলেন কেজরিওয়াল। খুব ভালো ভাবে ধরে ফেলেছিলেন, কোন ফুলে কোন দেবতা তুষ্ট। আর তাই এবারের ভোটে শুরু করেছিলেন হনুমানজিকে দিয়ে। শেষেও সেই হনুমানজি।
ফের সেই মুখোশ। আন্নার সময় ছিলো আন্নাভক্তের মুখোশ। এবার তা বদলে হনুমানজির ভক্তের মুখোশ। বেশ একটা নরম হিন্দুত্বের প্রতীক, যা অনায়াসে পাল্লা দিতে পারে মোদি অমিত শাহ জুটির হিন্দুত্বকে।

সেই নরম হিন্দুত্বের মোড়কেই ঝাঁড়ু ব্রিগেডের উন্নয়নের অঙ্গীকার। ঠিক পাঁচবছর আগের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের কথা মনে করুন তো। আপ সুপ্রিমোর মুখে কি একবারও কি হনুমানজি, বজরংবলির নাম শুনতে পেয়েছিলেন? নাকি ভোটে জেতার পর কোনও হনুমানজির মন্দিরে ছুটতে দেখতে গেছিলো? কোনটাই হয়নি।
আসলে ওই যে বললাম, ঝোপ বুঝে কোপ মারাতেই সিদ্ধহস্ত কেজরিওয়াল।

ইফতার পার্টির দিন শেষ। দিন শুরু বিজেপি'র রামমন্দির, রাহুল গাঁধির উপবীত ধারনের নয়া রাজনীতির। কেজরিওয়াল আবার শরন নিলেন বজরংবলির। তারসঙ্গে সমানতালে মেলবন্ধন করলেন মাগনার জনপরিষেবার মতো তুষ্টিকরণ রাজনীতির। সবমিলিয়ে বাজিমাত আপের। হ্যাটট্রিক অরবিন্দ কেজরিওয়ালের। বজরংবলিকে এই জয় উৎসর্গ করে, এবার রাজপাট সামলানোয় বসলেন তিনি।

প্রশান্ত সেন, ফিচার রাইটার, নয়াদিল্লি:

'হ্যানামাসি-ই-ই -ই ----?' বলে ট্যারা চোখে গুবগুবে গাল নিয়ে হাসতে হাসতে  উপস্থিত হয় ছোট্ট 'কাজল' তার মেজদিদার দুয়ারে, সঙ্গে ভাই বোন চঞ্চল ও ঘেঁটু। পৌষ সংক্রান্তির সূর্য ওঠার আগেই ওরা এক ঝলক পাড়ার কটা ঘরে বাঁধনছেঁড়া-ঘোরা ঘুরে নেয় শীতের সকালে ঠান্ডার তোয়াক্কা না করে।
সুদূর রানীগঞ্জ থেকে 'কাজল'রা মামাবাড়ি বেড়াতে আসে শীতের ছুটিতে প্রায় প্রতি বছর, আর হেনামাসি তার খুব প্রিয়।তাই কাজলকে পেয়ে হেনামাসিও  বেশ আনন্দে গদগদ পিঠে সংক্রান্তিতে পিঠে ভাগ করে খেতে।
'ও---- মা, কাজল, এসো  মা আমার, বোসো সবাই বোসো' ---মেজদিদা মামাবাড়ি-আদরের সবটুকু উজাড় করে দিযে আপ্পায়ন করে বাচ্ছাগুলোকে। এ বাড়িতে ওদের ডবল আনন্দ ---এটা ওদের মায়ের মামাবাড়ি, আর ওদেরও মামা-মাসিদের বাড়ি।

'দিদাও বানাচ্ছে, রাঙাদিদা, ছোটদিদাদের ঘরেও বসিয়েছে' ----- স্পষ্ট-অস্পষ্ট অনর্গল বকবক করা কাজল খবর দেয়।

 ওদিকে  থালা বাটিতে খেজুর গুড় ও গরম পিঠে ধরিয়ে দেয় হেনামাসি মায়ের নির্দেশে। এখন খাওয়া, পাড়ার আরও সবাইকে এক এক করে ডেকে নিয়ে এসে চলতে থাকে খাওয়ানো, পরে নিজেরাই গুনে ঘোষণা করবে  কে কতগুলো পিঠে খেলো। বেলা বাড়লে যে যার গন্ডা-পণএর হিসাব জাহির করবে হাটতলার হট্টগোলে।

ইতিমধ্যে প্রায় চার ঝুলি পিঠে নেমে গেছে মেজদিদার। সিদ্ধ পিঠে --দু রকমের--নারকোলের পুর আর চাঁচির পুর দেওয়া। সাথে আছে খেজুরগুর দিয়ে ক্ষীরপিঠে। বাচ্ছাদের দিয়ে  পিঠে খাওয়ার শুরু হয় একরকম ভোর থেকে।  আগেপিছে  পিঠে বানানোর হুড়োহুড়ি প্রায় প্রত্যেক ঘরে ঘরে পাড়ায়। যেন একটা কম্পেটিশন, আর তা কেন এতো সকাল থেকে শুরু হয় খাওয়া ও খাওযানো বুঝতাম না, আজও বুঝি না।  আর কী-ই বা দরকার বোঝার, আমার তো পিঠে খাওয়া নিয়ে কথা।

তাই আর একবার পিঠের আস্বাদে  পাল্টি খেয়ে যাই সাড়ে-পাঁচ দশকেরও বেশি পিছনে (একঘেয়ে  ক্যা ক্যা আর জে জে জে-র নিউজ ঝেড়ে)।

তখন কাজল'দেরও আসা যাওয়া শুরু হয়নি। সেনবংশের ঐতিহাসিক চার-কুঠুরি মাটির একচালা প্রাসাদ। আর তারই পুবদিকে নিচের ঘরটাকে আমরা মাঝের ঘর বলে জেনে এসেছি।প্রায় মাঝরাত অবধি সংসারের সব কাজ মিটিয়ে মাঝের ঘরের মেঝেয় তাল ও খেজুর পাতার চাটাই-এর ওপর তোশক পেতে দিয়ে বিছানা করে মা শুয়ে দিতো আমাদিকে।  ভোর বেলায় পিঠে খেতে উঠতে হবে, মনে এই আনন্দ নিয়ে শালুর লেপের তলায় কখন ঘুমিয়ে পড়তাম কে জানে । কাকভোরে ঘুম ভাঙতো মায়ের টুংটাং  আওয়াজে । বাইরে কনকনে ঠান্ডা। ততক্ষনে বাইরে তোলা উনুনে আঁচ গনগনে করে নিয়ে মাঝের ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে মা । উনুনে অ্যালুমিনিয়াম এর হাঁড়িতে জল গরম হয়ে চলেছে।  হাঁড়ির ঢাকায় পিরামিডএর  মতন পিঠে সাজিয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে ঝুলিয়ে দিতো হাঁড়ির মুখে। ভাপে সিদ্ধ হবার অদ্ভুত সময়-আন্দাজে পিঠের পিরামিডের ঝুঁটি ধরে তুলে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চুবিয়ে দিতো পাশেই রাখা ডেকচির ঠান্ডা জলে। গড়ে চলতো মা পিঠে, মানা সত্ত্বেও আমরা মায়ের সাথে কাঁচা হাতের কেরামতি দেখাতে গড়তে লেগে যেতাম পুতুল গড়তে।  আর একটু ঠান্ডা হতে না হতে শুরু হয়ে যেত 'আমাকে চাঁচির, আমাকে নারকোলের টা দাও' বলে।
পিঠেপরবের  সাদামাটা গ্রামীণ আনন্দের নেপথ্যে  যার ও যাদের নিস্কলুষ অবদান, যাদের নিরলস পরিশ্রমে পৌষের পিঠে সংক্রান্তি হয়ে উঠতো সার্থক, তাদের কথা আজ বেশি করে ভেসে আসে। তাদেরই  একজন হলো 'কল্যাণীদি'। 'সাঙাৎমা' আমাদের পরিবারের অবিচ্ছেদ্য ধাত্রী পান্না, মায়ের হোলটাইমের  সাহায্যকারী ছিল বটে, কিন্তু কল্যাণীদির সাহচর্য আমাদের শিশুমনকে বেশি করে টানতো। ছিল সে একমাত্র সন্তান।শুনেছিলাম ছোটবেলায় তার মা-বাবাকে হারিয়েছিল। আর নেহাত অল্প বয়েসে বিয়ে দিয়েছিলো তার খুড়তুতো-জাড়তুতো  ভাইয়েরা।তাও আবার টেকেনি।স্বামী পরিত্যাক্ত হয়ে ফিরে  এসেছিলো জীবনের মুখ্য সময়ে বাপ্-ভাইদের ভিটেয়। কিন্তু তারাও তাকে কেন বসে খাওয়াবে ? তাই সে বেছে নিয়েছিল সেন পাড়ার পাঁচটা ঘরকে নিজের বাপের ঘরের মতন। আর নেবেই না কেন, পাড়ার এমন কোনো কেউ নেই যে তাকে ভালো বাসতো না । পিসি, জ্যাঠাইমা, কাকিমা আর আমাদের মা সবাই কল্যাণীর জন্য থাকতো কমবেশি উৎকণ্ঠিত।  কোনো এক কালে  'সয়লা' উৎসবে কল্যাণীদি আমাদের দিদিকে সই পাতিয়ে ছিল--- তাই সে মা-কে 'সই-মা' বলে ডাকতো। অদ্ভুতভাবে মায়েরও নাম 'কল্যাণী'। তাই কোথায় যেন একটা মা-মেয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আর কল্যাণীদি ছিল আমাদের অনেক কাছের--কারণ সে ছিল আমাদের ঘুম পাড়ানো গল্প-কথিকা, রাতের ভূত-ভয় কাটানোর পাহারাদার।

'ও কল্যাণীদি, তুমি 'তোসোলা' (টুসু পুজো) করবে না?'
'হ্যাঁ, করবো বৈকি, যাই জ্যাঠাইমার ঘরে কাজ আছে'---হাঁসি মুখে মুখ ঘুরিয়ে নেয় আর  তটস্থ হয়ে উধাও হয়ে যায় এবাড়ি থেকে ওবাড়ি।

তখন না ছিল কোনো গাড়ি ঘোড়া, না ইলেক্ট্রিকের আলো অথবা রেডিও, টিভি, ফোন মোবাইলের দাপাদাপি। কল্যাণীদি ছিল আমাদের শিশুমন বিনোদনের মাধ্যম। সূর্য ডোবার সাথে পৌষের শিশিরপড়া  সন্ধ্যা যখন ধীরে ধীরে নিঝুম হয়ে আসতো, ঘরে ঘরে জ্বলে উঠতো হারিকেন লণ্ঠন আর লম্ফোর টিমটিম আলো,  ভেসে আসতো কানে টুসু গাওয়ার সুরেলা কোরাস গ্রামটাকে চারিদিকে ঘিরে রাখা উপজাতি পাড়া গুলো থেকে। কল্যাণীদিও বসতো তার তোসোলা সাজিয়ে আমাদের উঠোনের তুলসী তলায়। একটা মাটির সরা। তাতে থাকতো মাটি ও ধান ছড়ানো, গাঁদা ফুল, সর্ষে ফুল, মূলো ফুল আরো কতরকমের বুনোফুলে ঢাকা। আমরা উঠোনে হাত গেড়ে গোল হয়ে বসতাম তার তুসুগান শুনবো বলে। মুচকি হেসে শুরু করতো, প্রথমে বিড়বিড় করে আমাদের-অবোধ্য মন্ত্র পড়ার মতন উচ্চারণ দিয়ে:
"আম কাঁঠালের পিঁড়ে খানি মা ঘি মৌ মৌ করে
তাতে বসে রাই ঠাকরুন কন্যা দান করে ।
কন্যা দেন করতে করতে------" ইত্যাদি ইত্যাদি।
কয়েক মিনিটের পুরো পাঁচালি আওড়ানো শেষ করার সাথে সাথে শুরু করতো গলা ছেড়ে গান ----'টুসুমনি গণগনানি ভাঙা ঘরে থাকে না -------", যাতে তার গানের আওয়াজ ভেসে আসা আওয়াজগুলোকে ছাপিয়ে যায়। এরকম করেই পৌষের সবকটা সন্ধে কাটিয়ে সংক্রান্তির সকালে বিদায়ীমনে সরা হাতে যেতো টুসু ভাসাতে ঈশান-দীঘির জলে। চাদরমুড়ি দিয়ে আমরাও যেতাম পিছু পিছু দেখতে কেমন করে দীঘির স্থির বরফ জলে ডুব দিয়ে এসে খড়ের আঁঠি জ্বেলে গরম সেকতো ভাসানীরা।
পৌষের একরকম  প্রথম  থেকেই শুরু হয়ে যেত পিঠে-পার্বনের জোগাড়।  জোগাড় আর কি, চালগুঁড়ি বানানো।আমাদের বাড়ির মধ্যেই পুব দিকে পাঁচিল ঘেঁষে ছিল আমাদের একটা ঢেঁকিচালা । আর সেই ঢেঁকিচালা প্রায় প্রত্যেকদিন বুক হয়ে থাকতো। ঘন্টার পর ঘন্টা ঢেঁকিতে পাড় দেবার মতন আর কে থাকবে ?-- -কল্যাণীদি । ঢেঁকিচালার এককোনে একটা কাঠের জ্বালের উনুন ছিল। সেখানে সারাদিন কিছু না কিছু রান্নার পর চারিদিকটা গরম থাকতো।আমরা সবাই সেই উনুন ঘিরে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে থাকতুম।

"আজকে তুমি সুকু-দুকুর গল্পটা বলবে না, 'সোনার আতা' গল্পটা বলবে"।
'আচ্ছা ঠিক আছে'- কল্যাণীদি দোক্তামুখে  মুচকে  হেঁসে ঢেঁকিতে পাড় দিতে ওঠে, আর শুরু হয় 'এক ছিল রাজকন্যা---'

'পা চালা মা, এখনো এক সোলি চাল বাকি আছে' --ওদিকে ঢেঁকির গড়ে জ্যাঠাইমা, অথবা কাকিমা, অথবা মা, মানে যাদের যেদিন চাল কোটা হয় --- গুঁড়ি চালুনি চালাতে চালাতে বলতে থাকে।

এদিকে কল্যাণীদির পাড়ের তালের সাথে সাথে চলতে থাকে তার রূপকথার কথামালা । কি দারুন ছিল তার গল্পের ভান্ডার। কোথায়, কেমন করে কার কাছে এতো গল্প যে তার মাথায় গেঁথে ছিল কে জানে। তার গল্পের হাতীশালের হাতি, ঘোড়াশালের ঘোড়া নিয়ে  রাজকুমার যখন তার পক্ষীরাজ ঘরে করে আকাশপথে উড়ে যায় রাজকুমারীর উদ্ধারে, তখন তার শ্রোতারাও একে একে ঢুলতে ঢুলতে চলে যায় আপন আপন স্বপ্নের জগতে।

'তুই এবার মুখটা বন্দো কর কল্যাণী, সব কটা ঢুলছে।'
'মুচকি হেঁসে সে এবার তার মুখকে বিরাম দিয়ে বলে 'আমার কথাটি ফুরুলো, নোটে গাছটি মুরুলো।
আর ততক্ষনে প্রায় এক চাঙারি চালগুঁড়িও তৈরী ।

নিখাদ কল্যাণীদিরা আসে আর চলে যায় নিঃস্বার্থ যোগদান দিয়ে। সময়ের চাকা এগোতে থাকে আর যুগ  হয়ে যায় ফেলে আসা কত ভালো মন্দ উদযাপন। চলে গেছে আজ অনেকে যারা কল্যাণীদির মতো শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল আমার (কোলে)পিঠেবেলায়। তাই পিঠেপরবের ছুতো নিয়ে একটু স্মৃতির শীষকুড়ানো কেবলমাত্র।

আবার পাল্টি সিধা করে সবাইকে জানাই 'হ্যাপি মকর সংক্রান্তি' ---তা একটু দেরিতে হলেও।

কাজল ভট্টাচার্য, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

হতেই পারে তিনি নির্দোষ।
কোনও দুর্নীতির সঙ্গে আপোস করেননি।
দেশের হাই প্রোফাইল রাজনীতিবিদদের অন্যতম। পালান্নিয়াম চিদাম্বরম।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই যে প্রশ্নটা ঘুরে বেড়িয়েছে তা হলো, জেল নাকি বেল?
দুপুর তিনটে দশ। সিবিআই অফিসাররা চিদাম্বরমকে নিয়ে পৌঁছে গেলেন রাউজ অ্যাভিনিউয়ের বিশেষ আদালতে। দু'পক্ষের আইনি লড়াইয়ের পর, কিছুক্ষণের জন্য রায়দান স্থগিত রাখল আদালত। ঘড়িতে তখন প্রায় সন্ধ্যা পৌনে সাতটা। সিবিআইয়ের আর্জি মঞ্জুর করলো আদালত। আগামী ছাব্বিশ অগাস্ট পর্যন্ত সিবিআই হেফাজতে গেলেন চিদাম্বরম।
তবে খাতা- কলমে এখনও চিদাম্বরম অপরাধী না, অভিযুক্ত মাত্র।

প্রায় চল্লিশ বছরের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। দায়িত্ব সামলেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। বুধবার রাতে সেই প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী চিদাম্বরম ক্ষমতা অপব্যবহার, আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগেই সিবিআই- এর হাতে গ্রেপ্তার হলেন। যে তদন্তকারী দল একসময় তাঁর ইশারায় চলতো, সেই সিবিআইয়ের হাতেই গ্রেপ্তার হলেন তিনি। বুধবার রাত থেকেই এই মাননীয় প্রাক্তন মন্ত্রীকে নিয়ে চললো এক জমজমাট নাটক।

প্রশ্ন একটাই। চিদাম্বরম যখন সত্যিই নির্দোষ, তখন তিনি সাতাশ ঘণ্টা গা-ঢাকা দিয়ে কাটালেন কোন যুক্তিতে? মঙ্গলবার দিল্লি হাইকোর্ট তাঁর আগাম জামিনের আবেদন নাকচ করে দেয়। নাকচ করার কারণ, সিবিআইয়ের তদন্তে অসহযোগিতা। ঠিক সে মুহূর্তেই সিবিআইয়ের চোখে ধুলো দিয়ে আত্মগোপন করেন হাই প্রোফাইল এই নেতা। আর ঠিক এখানেই ফের আরেকবার তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করে ফেললেন চিদাম্বরম।
এ ব্যাপারে চিদাম্বরমের যুক্তি, শীর্ষ আদালতের যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন তিনি। রাতভর কাটিয়েছিলেন নিজের বিশ্বস্ত  আইনজীবীদের সঙ্গে। অভিযোগ, তিনি নিজের মোবাইলের সুইচ অফ রেখেছিলেন। কেন? কিসের আশঙ্কায়? জবাব পরিষ্কার, সিবিআইয়ের হাতে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায়। এত আশঙ্কার কারণ কী? তাহলে কি কংগ্রেসের এই হেভিওয়েট নেতাও শেষ পর্যন্ত অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েছিলেন?

বারো হাত কাকুড়ের তেরো হাত বিচির মতো ঘটনা। যত বড় নেতা তত বড় অঙ্কের দুর্নীতি। বলা হচ্ছে সিবিআইয়ের অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলে কংগ্রেসের কড়া বিজেপি বিরোধিতা এক জোর ধাক্কা খাবে। 2007 সালে আইএনএক্স মেডিয়াকে তিনশো পাঁচ কোটি টাকার বিদেশী পূঁজি লগ্নিতে আইনের তোয়াক্কা করেননি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী চিদাম্বরম। তার বদলে শর্ত ছিল, ছেলে কার্তির ব্যবসায় মদত করতে হবে মামলার অন্য অভিযুক্ত মুখার্জি দম্পতিকে। সরকারি সাক্ষী হিসেবে এমনটাই বয়ান দিয়েছেন পিটার মুখার্জির স্ত্রী ইন্দ্রাণী মুখার্জি। নর্থ ব্লকে বসে পিটারের সঙ্গে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী চিদাম্বরমের সঙ্গে পিটারের রফা হয় মোট চার কোটি টাকায়।
"এক এমন মহিলা যে নিজেই খুনের মামলার অভিযুক্ত, তাঁর কথায় ভরসা করে এগোচ্ছে সিবিআই।" বৃহস্পতিবার সকালে কংগ্রেসের ডাকা প্রেস কনফারেন্সে, এমনটাই কটাক্ষ করেন কংগ্রেসের প্রবক্তা রণদীপ সুরজেওয়ালা। তাঁর কথায়, গণতন্ত্রের খুন করা হচ্ছে। কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই চিদাম্বরমকে গ্রেপ্তার করেছে সিবিআই। গোটা ঘটনার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ছবি দেখতে পেয়েছে কংগ্রেস।

বৃহস্পতিবার সকালের এই প্রেস কনফারেন্সের প্রায় চোদ্দ ঘণ্টা আগে কংগ্রেস দপ্তরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন চিদম্বরম। অন্য আরও পাঁচজন মামুলি অপরাধীর মতোই তাঁরও দাবি ছিলো, তিনি নির্দোষ। রাজনীতির শিকার হচ্ছেন। ওই ঘটনার পরেই শিকারি শিকারের সন্ধান পেয়ে তাড়া করে। ফের শুরু হয় চিদাম্বরম, সিবিআইয়ের আরেক প্রস্থ চোরপুলিশ খেলা। ঘড়িতে তখন রাত আটটা বেজে দশ মিনিট। কংগ্রেস দপ্তরে সিবিআই হানার আগেই চিদাম্বরম জোড়াবাগে তাঁর বাংলোর দিকে রওনা দেন। তাঁকে ধাওয়া করে সিবিআই ফের হাজির হয় অভিযুক্তের বাংলোতে। কিন্তু ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছিলো সদর দরজা। শেষ পর্যন্ত দেওয়াল টপকে বাংলোর ভেতরে ঢুকে পড়েন তিন সিবিআই অফিসার। তাঁরা সদর খুলে দেওয়ার পরেই বাংলোতে ঢুকে পড়ে তদন্তকারী দল। সেখান থেকেই গ্রেপ্তার হন চিদাম্বরম। রাতে তাঁকে সিজিও কমপ্লেক্সের যে সিবিআই ভবনে রাখা হয়, সেই কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেছিলেন তিনি নিজে। দিনটা ছিল 2011সালের 30 জুন। এই ঘটনার পরেই চিদাম্বরমকে মনে হচ্ছিলো, ঠিক যেন সম্রাট শাহজাহানের কংগ্রেস সংস্করণ।

বারো বছরের  পুরনো এই মামেলায় পি চিদাম্বরমকেই মূল ষড়যন্ত্রী হিসেবে চিহ্ণিত করেছে সিবিআই। ইতিমধ্যেই আইএনএক্স মেডিয়া মামলায় বাইশবার দিল্লি হাইকোর্ট চিদাম্বরমের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেছে। কিন্তু গত মঙ্গলবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়নি। এরপরেও কিন্তু নিজের রাস্তা বদলাননি তিনি। বুধবার রাতে গ্রেপ্তারের পরেও প্রাক্তন মন্ত্রী তদন্তকারী দলের জেরার কোনও উত্তর দেননি বলে অভিযোগ। প্রশ্নের জবাবে চিদাম্বরম পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন বলে সূত্রের খবর।
বৃহস্পতিবার টানটান উত্তেজনা, আর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতে তোলা হয়  চিদাম্বরমকে। সেখানে আগেই পৌঁছে গেছিলেন চিদাম্বরমের স্ত্রী নলিনী, ছেলে কার্তি। অভিযুক্ত চিদাম্বরমের হয়ে মূলত সওয়াল করেন অভিষেক মনু সিংভি। উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী কপিল সিবালও। সিবিআইকে নিশানা করে বলা হয়, চিদাম্বরমকে যেভাবে গ্রেপ্তার, জেরা করা হয়েছে তা আইনবিরুদ্ধ। মামলার কেস ডায়রিকে কটাক্ষ করে বলা হয়, ওটা নিছকই এক ডায়রি। ওতে কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণের চিহ্নমাত্র নেই।
তবে ঘটনার শেষে, শেষহাসি হাসলেন সিবিআই কর্তারাই। মামলার গুরুত্বের কারণ দেখিয়ে সিবিআই, চিদাম্বরমের পাঁচ দিন হেফাজতের অর্জি জানায়। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে। আগামী ছাব্বিশ তারিখ পর্যন্ত, পি চিদাম্বরমের ঠিকানা সিবিআই হেফাজত।






সুমনা ভট্টাচার্য বসুঠাকুর, সমাজকর্মী, কলকাতা: 

২৭ ঘণ্টা ধরে টান টান উত্তেজনা , অনেক নাটকের পর পি চিদম্বরমকে গ্রেফতার করল সিবিআই। বিভিন্নভাবে গ্রেফতারি এড়ানোর চেষ্টা করেছেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। জোড় বাগে তাঁর বাড়ি থেকে চিদম্বরমকে গ্রেফতার করলেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী আধিকারিকরা। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লিতে সিবিআই  দপ্তরে ।

গতকাল থেকে বেপাত্তা ছিলেন পি চিদম্বরম । জনসমক্ষে উধাও থাকার পর কংগ্রেসের সদর দফতরে হঠাৎ সাংবাদিকদের সামনে লিখিত বিবৃতি পাঠ এবং ঠিক  তার দু’ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লির জোরবাগ বাড়িতে পাঁচিল টপকে ঢুকে দেশের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরমকে গ্রেফতার করল সিবিআই।

দিল্লি হাইকোর্টের রক্ষাকবচ উঠে যাওয়ার পরেই, বুধবার সকালে জরুরি ভিত্তিতে শুনানির দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে পি চিদম্বরমের হয়ে প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের এজলাসে সওয়াল করার চেষ্টা করেন কংগ্রেসের আরেক নেতা কপিল সিব্বল। কিন্তু অযোধ্যা মামলার শুনানিতে ব্যস্ত থাকায় সময় দিতে পারেন নি প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি রামান্নার এজলাসেও সওয়ালের জন্য হাজির হয়ে যান সলমন খুরশিদ, অভিষেক মনু সিংভির মত কংগ্রেস নেতা আইনজীবীরা। আর তখনই ধরা পড়ে চিদম্বরমের আবেদনে প্রচুর ভুল-ত্রুটি রয়ে গেছে। ফলে দিনের শেষে রক্ষাকবচহীন চিদম্বরমকে গ্রেফতার করতে খুব একটা আইনি ঝোক্কি পোহাতে হয়নি দেশের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থাকে।





স্বপন দাস, প্রবীণ সাংবাদিক, কলকাতা:

প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পি চিদাম্বরম গ্রেফতার হবার পর দেশের রাজনৈতিক মহলে একটাই প্রশ্ন উঠে আসছে , এটা কি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিহিংসার রাজনীতি ? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোন কারণ ? 
ইউ পি এ’র এই প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ,অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন , আই এন এক্স মিডিয়া কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়েন। সেই সময়ে বিদেশী বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে , ছেলে কার্তি চিদাম্বরম কে বিশেষ কমিশন পাইয়ে দেবার বিষয়টি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৭ সালের ঘটনার এফ আই আর হয় ২০১৭য়। আর গ্রেফতার ২০১৯ এর অগাস্ট। এখানেও প্রশ্ন উঠেছে , যদি দুর্নিতীই প্রমাণিত হয়ে থাকে , তাহলে তাঁকে গ্রেফতার করতে এত সময় কেন নিল সি বি আই ?
এসব তোকা থাক আইনের জন্য । উত্তর পাওয়া যাবে ঝুব শিগিগিরি, দিল্লীর রাজনৈতিক মহলের একাংশের কথায়, পি চিদাম্বরম বেশ কিছুদিন ধরেই দেশের শাসক দলের নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে শুরু করেছিলেন যুক্তি সহযোগে। সেই যুক্তিকে খন্ডাতে পারছিলেন না শাসক দলের নেতৃত্ব। সেই দিক থেকে মুখ বন্ধ করতে এই পথ নিতে হল বলেও মনে করছেন একাংশ।
অনেক দিক দিয়ে পি চিদামবরম গ্রেফতারের বিষয় দেশের রাজনীতিতে একটা প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। যেমন এর পর কোন বিরোধী নেতাকে সি বি আই নিজেরদের হেফাজতে নেবে , সেই নিয়ে আশঙ্কার দোলাচলে রয়াছে বিরোধী সব নেতৃত্ব। 
রাজনৈতিক মহলের একটি মহল মনে করছে , বিপুল জনসমর্থনে কেন্দ্রে শাসন ক্ষমতায় দ্বিতীয় বারের জন্য এসে, একদিকে যেমন নিজেদের ক্লীন ইমেজ প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধ পরিকর হয়েছে শাসক দল। তেমনি বিরোধীদের সমস্ত দুর্নীতিকে সামনে এনে, অস্বচ্ছতার বিষয়টাকে জনস্বমক্ষে প্রকাশ করতেই পুরোন সব ঘোটালার বিষয়গুলিকে সামনে আনতে চলেছে শাসক দল। এভাবেই বিরোধীদের একদিকে যেমন চাপে রাখা ,অন্য দিকে কোমর ভাঙ্গার খেলায় মেতেছে বিজেপি।এমনটাই মত জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের।
তবে পি চিদাম্বরম ও তাঁর পরিবার যে ধোয়া তুলসি পাতা নন, একথা বারে বারে প্রকাশ পেয়েছে,একথা রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করেছেন। তাই দেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশ পি চিদাম্বরম যে গ্রেফতার হতে পারেন , সেটা তাঁরা আগে থেকেই জানতেন বলেও জানাতে দ্বিধা করছেন না।
শাসক দল অবশ্য সরাসরি এই বিষয়ে মুখ না খুললেও , তাঁরা বলছে যে আইন তাঁর নিজের পথেই চল্বে,এক্ষেত্রে তাঁরা কিছু বলবেন না। তাই রাজনৈতিক মহল মনে করছে , এই নিশ্চুপ থাকার মধ্যে দিয়ে , বড় ঝড়ের ইঙ্গিত দিয়ে চলেছে দেশের কেন্দ্রের শাসক দল।


Politics
বিজন কুমার সরকার, সিনিওর জার্নালিস্ট, নয়াদিল্লিঃ সাবধান বিজেপি সাবধান! বাংলার মানুষ একদা পরিবর্তন চেয়েছিলেন। ফের এক বৃহৎ অংশের বঙ্গবাসী ফেলে আসা পরিবর্তনের নব্য পরিবর্তন চাইতে শুরু করেছেন। ভারতীয় জনতা পার্টির কাঁধে ভর করে। আর এখানেই আশঙ্কা। আপনারাও না আবার এই মুদ্রার এপিঠ থেকে ওপিঠে পালটে যান। বঙ্গ রাজনীতির জেন ওয়াইয়ের লেটেস্ট ট্রেন্ডে দল বদলুর হালফিল দোলনায় দোলদোল গুলো কেমন কেমন যেন সন্দেহ হয় হয়। আসলে এই বাঙালী তো আবার সেদিনের পরিবর্তনের ঠেলায় পড়া সিঁদুরে পোড়া গরু হয়েছে কিনা! বিজেপি তো ইতিমধ্যেই স্লোগান তুলেছে ‘একুশে ফিনিশ।’ বং ভাজপা নেতাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ যেন হঠাৎ পালটে গেছে রাতারাতি সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের পর। তাঁরা তো এখনই গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল ডলতে শুরু করে দিয়েছেন যেন ২০২১ সালের রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের পর রাজভবন থেকে সরকার গঠণের আমন্ত্রন পেয়েই গেছেন, এই ভেবে। আবার বলি বিজেপি বাবুবিবিরা, সাবধান। দেখবেন তোলাবাজ ও কাট মানি খেকোর জার্সি বদলকারী লুঠেরা সম্প্রদায় আবার সবুজ জার্সি বলদ করে গেরুয়া নামাবলী না গায়ে চড়ায়। আসলে এই লুঠেরা শ্রেণিসমাজ বাম আমলেও ছিল চোরাগোপ্তা মারিতং জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ লাল ছত্রছায়ায়। তারাই আবার নীল সাদা ভেকধারীর মন্ত্রে দিক্ষিত হয়ে নব্য তৃণমূলী হয়েছিলেন। তারপর তো সেই ঝোপ বুঝে কোপ মারা গোষ্ঠী বাংলায় সমাজবিরোধীতার উদারীকরণে যথার্থ ব্র্যান্ড নেম হয়ে গেলেন নিজ নিজ এলাকায়। উফফফ, এ যেন গোটা রাজ্য জুড়ে সিন্ডিকেটের মহামারি। আর সেই এলাকা ভিত্তিক সিন্ডেকেটের দরজায় শোভা পাচ্ছে সেই সব দলের সম্পদ তথা ওই ব্র্যান্ডেড নাম গুলো। এরাই এখন তৃণমূলের সম্পদ। দলের মনি মানিক্য। সুতরাং এই বেতাজ বাদশার যৎসামান্য একটু তো বায়না থাকবেই। তোলাবাজি থেকে কাট মানির আবদার আর কি। নরেন্দ্র মোদী বলেছেন এই বায়নার নাম হল ‘ট্রিপিল টি’। অর্থাৎ ‘তৃণমূলী তোলাবাজি ট্যাক্স’। তা বাবা, এই বেতাজ বাদশাদের এলাকায় সাধারণ হকার, ছোট বড় ব্যবসায়ী, বাড়ি নির্মাণকারীরা করে কম্মে খাবেন আর দলের সম্পদদের এই একটু আধটু খাজনা (কাট মানি ও তোলা) দেবেন না, তা কি মানা যায় নাকি?
সমাজবিরোধীতার উদারীকরণে এই মান্যতা কিন্তু ইতিমধ্যেই মেনেও নিয়েছেন অনেকে। কিন্তু কি যে হল, এই লোকসভা ভোটটাই কেমন যেন হিসেব নিকেশ উলোট পালোট করে দিল অবুঝ বঙ্গবাসী। তাঁরা আসলে চপ শিল্পের উন্নয়নের মাহাত্ম্যে সায় না দিয়ে বড্ড দুর্বোধ্য হয়ে গেলেন। তাই ফুটো নৌকায় নাবিকের হালে নিয়ন্ত্রণও যে ক্রমহ্রাসমান দর্শণীয়। ব্যাস, এলাকায় কায়েমবাজি বজায় রাখতে নিশ্চিন্তের ঘুম শয্যা থেকে উঠে সেই সব সম্পদের দল এখন ব্যস্ত শিবির বদলের। আসলে নিজে বাঁচলে বাপের নাম। আর এখানেই আতঙ্ক বিজেপির খোলা ময়দানে। দলবদলের প্রবল স্রোতে বেনো জল না ঢুকে যায় এই সম্পদের দাপটে। আবার বলি সাবধান বিজেপি, সাবধান সঙ্ঘ পরিবার। আপনাদের তো কত শাখা সংগঠন। কি সব নাম শুনি। বজরং দল, বিজেপি, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। রাজ্য শাসনের স্বপ্ন দেখতেই পারেন। গণতন্ত্রে এটা অবশ্যই সবার মতো আপানাদের জন্যও দস্তুর। কিন্তু মনে রাখবেন এই রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ। একটি পরিবর্তন ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে কি ভাবেই না আয়ারাম গয়ারাম সম্পদ এই রাজ্যের যে যার নিজস্ব এলাকায় শাহেনশা হয়ে থাকতে পারেন শাসকের পরম স্নেহাশীষে। এখনও সময় আছে। ২০২১ এর নির্বাচন কাল যত এগোবে ততই আপনাদের দাম্ভিক ব্যস্ততা বৃদ্ধি পাবেই। তাই এখনই আপানাদের বিভিন্ন শাখা সংগঠন থেকে ছাকনির আয়োজন করুন। চালু করুন স্ক্রীনিং কমিটি। কারণ পশ্চিমবঙ্গে ডন কালচার থেকে অপরাধীদের মুক্তাঞ্চল যে বাস্তবিক অর্থেই প্রবল সক্রিয় তা নির্বাচনের রক্তপাতের পরিসংখ্যানই জানান দেয়। তাই ফিল্টারাইজেশনের লিটমশ পেপারের অভাব ঘটলে কাট মানি থেকে তোলাবাজির ঋতুস্রাবের ছোপ গেরুয়া পতাকায় লাগতে বাধ্য। বিজেপির জাতীয় নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সংঘস্তরের নেতাদের এখনই অনুধাবন করতে হবে যে এই রাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে অপরাধী উপাদানগুলির স্থান কিভাবে অ্যাম্পুট করা যায়। নচেৎ, ফেলে আসা পরিবর্তনে তিতিবিরক্ত হয়ে বাংলা হয়তো নব্য পরিবর্তনের উইন্ডফলে সামিল হতেই পারে। কিন্তু তথাকথিত সম্পদের ঋতুস্রাবের সঠিক ট্রিটমেন্ট না করলে আপনাদের প্রতিও অচিড়েই ঘেন্না উগড়াতে বাধ্য হবে দুধে ভাতে বাঙালিরা। অন্যদিকে ‘জয় শ্রী রাম’ মার্কা শুধু হিন্দু আনার জিগির তুলেও যে রাজ্য দখলে নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব, সেই দিবাস্বপ্ন না দেখাই ভাল। রাজ্যের বিধানসভায় ২৯৮ টি আসনের মধ্যে ৭৪ টি এমন আসন যেখানে সংখ্যালঘুরাই যে সংখ্যাগুরু। বিজেপি যদি ভেবে বসে থাকে বাকি ২২০ টি আসনে নজর দিলেই কেল্লা ফতে মুখ্যমন্ত্রীর আসনের জন্য তবে সেটা হবে চরম মুর্খামি। অন্তত বিজেপির ভোলা উচিৎ নয় একটি আসনের গুরুত্ব কত মাহাত্ম্য। মনে পরে, ১৯৯৯ সালে সংসদের অনাস্থা প্রস্তাবে কেন্দ্রের বাজপেয়ী সরকার উলটে যায় মাত্র একটি ভোট কম পাওয়ার কারণে? তাই আবার বলি সাবধান! শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সংখ্যাগুরু থেকে সংখ্যালঘু সব সম্প্রদায়ের পাশে থেকে অহং বর্জন করে দল হয়ে উঠুক সকল ধর্ম, সর্ব বর্ণ, সমস্ত শ্রেণির কাছে সমগ্রহনীয়। আর সরকার গঠনের প্রয়োজনে সংগঠন হোক উদার নিরপেক্ষ, সৎ মানসিকতার ও শিল্প কৃষি ভিত্তিক উন্নয়নের শরীক। অন্যথায়, গোঁফে যতই তা দিন গাছের কাঠাল গাছেই থেকে যাবে। কারণ পরির্বতনের ক্ষত বাঙ্গালি এখনও ভুলে যায়নি কিন্তু। কথা গুলো একটু ভাববেন, সাবধান!


Politics
বিজন কুমার সরকার, সিনিওর জার্নালিস্ট, নয়াদিল্লিঃ কাট মানি ইস্যু যে বুমেরাং ঘাস শিবিরের কাছে। লোকসভা নির্বাচনের রাজ্যে বিজেপির প্রবল উত্থানকে সামাল দিতে কাট মানি তাসকে সামনে আনতে গেলেন দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধায়। আর তা করতে গিয়ে তিনি নিজেই প্রবল পাল্টা অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছেন পুরো দলটাই। নিজের সততা ইমেজকে পুনরুদ্ধার করার প্রয়াস হয়তো করতে গিয়েছিলেন এক দলীয় সভায় গরম গরম বচনে, কিন্তু তার অবনমনের মূল্য চোকাতে হচ্ছে প্রান্তিক জোড়া ঘাসের মানিব্যাক পলিসির এজেন্টদের উষ্ণ উষ্ণ ধোলাইয়ে। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক একাংশের মতে, এই কাট মানি ইস্যুই না শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের কাছে ডুবন্ত টাইটানিকের ট্র্যাজিক উপমা হয়ে যায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আচমকা নিজে সততার নামাবলী পড়ে এই কাট মানি ইস্যু বাতাসে আন্তরিক ভাবে ভাসিয়ে দিয়েছেন এমনটা কিন্তু মোটেও নয়। অনেকেই ভাবতেই পারেন এ যেন অন্ধকার আকাশে এক পূর্ণ পূর্ণিমার চাঁদের মতো এক অপরূপ সততার স্নিগ্ধ বাণী, ‘কাট মানি ফেরত দাও’! মোটেও তা নয়। আসলে এই দুর্নীতির ইস্যুটা খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দফতরেই প্রথম সুনামির মতো আছড়ে পড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এহেন মন্তব্যের এক বছরের বেশি সময় আগে। আর সেই কাট মানি সুনামির ধাক্কাটা মুখ্যমন্ত্রীকে দিয়েছিলেন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী ২০১৮ সালের ৭ মার্চ কাট মানি সংক্রান্ত একটি গোপন রিপোর্ট হাতে পান। যে রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রধান টেবিলেও স্থান পেয়েছিল। যাতে ছত্রে ছত্রে উল্লেখ রয়েছে, রাজ্যের গ্রামীন এলাকা জুড়ে কিভাবে কাট মানির লেনদেন হয়েছে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-গ্রামীন স্কিমকে (Pradhan Mantri Awas Yojana - Gramin scheme (PMAY-G) কেন্দ্র করে। ২০১৬-১৭ সাল থেকে রাজ্যে এই প্রকল্পের অধীন নানান জায়গায় পাকা ঘর নির্মাণের প্রকল্প শুরু হয়েছিল এবং ২০১৮-১৯ নাগাদ এই প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার কথা। ৮১,৯৭৫ কোটি টাকার আনুমানিক ব্যয় বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয় প্রকল্পে। এই ঘরগুলি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সহায়তায় সমতল এলাকায় ৬০-৪০ শতাংশ অনুপাতে এবং উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলির জন্য ৯০-১০ শতাংশ অনুপাতে নির্মিত হওয়ার কথা। পশ্চিমবঙ্গেও একই বিধিকে সামনে রেখে রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চল এলাকায় এবং শহুরে ও মফঃস্বল অঞ্চলে স্থানীয় পৌরসভার মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর এখান থেকেই রাজ্যে সুচনা হয় কাট মানির সার্বজনীন উন্মুক্ত কালচার। এই স্কিমের কাঁধে ভর দিয়ে রাতারাতি সংশ্লিষ্ট সিংহভাগ পঞ্চায়েতের প্রধান, পঞ্চায়েত সদস্যরা এবং পুর এলাকার কেষ্টবিচ্ছু থেকে ক্ষমতাসীন দলের নানা গোষ্ঠীর তস্য অলিগলির নানা মাপের নেতারা যেন মুঠোয় নিয়ে ফেলেন কাট মানি সংগ্রহের গোটা এটিএম কাউন্টার। নিজের নিজের এলাকায় তাঁরা অনেকেই হাঁক দিলেন, গৃহ তৈরির মোট মূল্যের পঞ্চাশ শতাংশ কাট মানি অগ্রিম দিতে হবে তাঁদের পকেটে। তবেই মিলবে সরকারী প্রকল্পের নির্মিত ঘর। আর এই পঞ্চাশ শতাংশ হারে কাট মানি বহু দরিদ্র মানুষ তাঁদের নেতাদের হাতে তুলে দিতে পারেননি নিতান্ত আর্থিক অক্ষমতায়। ফলে বহু আর্থিক ভাবে দুর্বল মানুষ সরকারী এই আবাস প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। আর এখান থেকেই রাজ্যে শুরু হয়ে যায় তথা কথিত তৃণমূলের কাট মানি আগ্রাসন নীতি। যা রাজ্যপাল সেই সময়েই সতর্ক করে দেন রাজ্য প্রশাসনের প্রধানকে। সঙ্গে তিনি গোটা অভিযোগটি তদন্ত করে দেখতেও অনুরোধ করেন রাজ্যকে। কিন্তু সামগ্রিক বিষয়টা প্রশাসনের বদান্যতায় হিম ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কোন এক অজানা কারণে। যে দুর্নীতির তদন্ত করে দেখার জন্য রাজ্যপাল অনুরোধ করেছিলেন এক বছরেরও পূর্বে তা প্রকারন্তে লাল ফিতের ফাঁসে আটকে রাখা হয়েছিল কি পরম সযন্তেই। অথচ বিপদে পড়ে নিজের সততার ইমেজ আরও একবার প্রকাশ্যে উষ্কে দিতে মুখ্যমন্ত্রী নজরুল মঞ্চে এমন ভাব দেখালেন যেন সম্প্রতি তিনি এইসব কাট মানির অভিযোগ গুলো পেয়েছেন একেবারে নিজস্ব সুত্রে। কিন্তু হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন রাজনীতিতে কিছুটা হলেও কম ধুরন্ধর তৃণমুল সাংসদ শতাব্দী রায়। এই চলচিত্র অভিনেত্রী ফাঁস করে দিয়েছেন, এই কাট মানির টাকা শুধু সংগ্রাহক দলের নেতা কর্মী পুরোটা পাননি তার সিংহ ভাগ চলে গিয়েছে একেবারে চেন সিস্টেমে তৃণমূল বাগিচার বৃহৎ হস্তিদের টেবিলের তলায়। 
আর এই বিশ্বস্ততার শৃংখল নিশ্চয় একদিনে তৈরি হয় না, তা কোলের শিশুও বোঝে। এইখানেই যে দলের প্রান্তিক আঁতুর ঘরে বুমেরাংয়ের গৃহপ্রবেশ। দীর্ঘদিনের লড়াকু নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায় বিরোধী নেত্রী হিসেবে যতটা পরিণত প্রশাসনিক আঙ্গিকে কিন্তু ততটাই অসফল। অন্তত রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার একাংশ তো তাই বলে থাকেন আবডালে। পঞ্চায়েতের কুশীলবদের সামনে তিনি তাই যখন বলেন কাট মানি ফেরৎ দেবার কথা, ভেবেছিলেন তাঁর মুখ নিঃসৃত বানীতে বঙ্গ সমাজ গদগদ হয়ে তাঁকে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসিয়ে দেবে। আসলে এই কাট মানির চোরাগোপ্তা ইস্যুতে রাজ্যের গোটা পঞ্চায়েত প্রশাসন অক্টোপাশের মতো জড়িয়ে গিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, বিগত বছরের গোড়ায় যদি রাজ্যের অভিভাবকের পরামর্শ শুনে মুখ্যমন্ত্রী এই কাট মানি প্রসঙ্গে উদ্যোগী হতেন তবে আজকের এই অরাজক রাজ্য তৈরি হতো না। সময় নির্বাচনে তিনি ভুল চাল দিয়ে ফেলেছেন। সেদিন কিন্ত প্রশাসনের রাস পুরোটাই ছিল তাঁর মুঠোয়। কিন্তু এই লোকসভা নির্বাচনের জনমত তাঁর সেই মুষ্ঠিবদ্ধ হাত যে অনেকটাই আলগা করে দিয়েছে। তাই লাগাম ছাড়া হয়ে পড়েছে কাট মানির পালটা বিপ্লব। আসলে সেদিনের গিমিক তৈরি করা বিরোধী নেত্রী এদিন প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে কল্পনাও করতে পারেননি যে কাট মানি ফেরৎ দেওয়ার খাস্তা ভাষণের মুল্য এভাবে চোকাতে চোকাতে হবে সার্বিক দলটাকে। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই টিপ্পনী কাটছেন, মানি ব্যাক পলিসির দল হল টিএমসি। প্রশাসক মমতা বন্দ্যোপাধায়ের সময়ের কাজ ভাই করে ঠিক তত্ত্বটাকে অবজ্ঞা করায় আজ যে ডুবন্ত নৌকা! আপনি কি তাই বলেন?


Politics
বিজন কুমার সরকার, সিনিওর জার্নালিস্ট, দিল্লিঃ দেশের শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রে বর্তমান কায়েমি শাসক হয়েই শুধু সন্তুষ্ট থাকতে চায় না বিজেপি। ভারতের এই দক্ষিণপন্থী দলটির মনষ্কামনায় রয়েছে এক সুদূর প্রয়াসী লক্ষ্য। তাই গৈরিক পার্টি নিঃশব্দে রচনা করে চলেছে এক রাজনৈতিক গভীর চিন্তন। যে চিন্তনের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়ার হর্স পাওয়ার হবে আপাতত পনেরো থেকে কুড়ি বছর লম্বিত। আর সেই যজ্ঞের নির্ভরযোগ্য উত্তরসুরী সাধক যে নির্দ্ধিয়ায় একজনই। তিনি অমিত শাহ। যিনি বর্তমান বিজেপির সর্বভারতীয় বিজেপি সভাপতি। দিল্লির ক্ষমতাকরণ নামক মাকড়সার জালের যাঁরা পাটিগণিত নিয়মিত কষে থাকেন তাঁরা ক্রমেই এই ধরণায় অনেকটা বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছেন। কারণ ইতিমধ্যেই সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের পর কেন্দ্রে বিজেপি সরকার অনেকটা নীরবেই এক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদী সরকারের দ্বিতীয় ইনিংসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত হলেন অমিত শাহ। পূর্বসূরী রাজনাথ সিং আপাৎকালীন অসন্তুষ্ট হলেও তাঁকে সীমান্ত পাহাড়ার দায়িত্বে কিভাবেই না পাঠানো হল তাও কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর এড়ায়নি। আর এই অমিত অভিষেক থেকেই সুচনা হয়ে গেল এক গেরুয়া ব্লুপ্রিন্টের ভিত্তিপ্রস্থর। লক্ষনীয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই একদা ঘোষণা করেছেন, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসনে অক্সিজেনে ঘাটতি যাতে না পড়ে তার জন্য ৭৫ বছরের উর্ধে কারও প্রধানমন্ত্রী থাকা উচিৎ নয়। আর সেটাই যদি মান্যতার মাইলস্টোন ধরা হয় তবে তাঁর নিজের যা বয়স তাতে পরবর্তী নির্বাচনে ফের বিজেপি জিতলেও তৃতীবারের পূর্ণ ইনিংস তাঁর পক্ষে ব্যাটিং করা অসম্ভব। তাহলে তখন লোক হাসানো নাইট ওয়াচম্যান খুঁজে কি লাভ? তাই সেই শূন্যতা ভরাটের উদ্দেশ্যে বিজেপি শিবির এখন থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আসনটিকে ঘিরে। কারণ সাধারন পর্যায়ে ক্ষমতায়নের প্রোটোকলে প্রধানমন্ত্রীর পদের পরেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মান্যতা গণতান্ত্রিক ভারতে। আসলে অমিত শাহকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আসনে বসিয়ে বিজেপি এই বার্তাই রাজনৈতিক মহলের অলিন্দে এখনই সতর্পণে ছড়িয়ে দিল আগামী অষ্টদশ নির্বাচনে তাঁদের দলের প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী বিজেপির বর্তমান সভাপতিই। এমনিতেই অমিত শাহ বয়সে যথেষ্ট তরুন। বিজেপি আড়ে বহড়ে ভারতের সবচেয়ে বড় দল। এমনকি পৃথিবীর মধ্যে সর্ব বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপি আজ পরিগণিত সারা বিশ্বের কাছে। এমন একটি বিশাল ব্যপ্তি দলের নিরঙ্কুশ রাশ কিন্তু পুরোপুরি তাঁরই মুঠোয় এখনও পর্যন্ত।
এযাবৎ তাঁর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দলে অভ্যন্তরে কোনও পরিস্থিতি সেভাবে দানা বাঁধতে পারেনি। এমনকি তাঁর ঘোষিত সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের মধ্যে ফিসফাসও করার পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়নি। এহেন চাণক্যকে ঘিরে তাই বিজেপি এখন থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছে ভারত শাসনের এক দীর্ঘ মেয়াদি আগাম ইনিংস খেলার। যেখানে ব্যাট ও বোলিং করার এমন অলরাউন্ডার আর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব কেই বা থাকতে পারে? রাজনৈতিক গেরুয়া পিচে সেই অলরাউন্ডার যে অমিত শাহ তা নিয়ে এই মূহুর্তে কোনও দ্বিমত নেই সঙ্ঘ শিবিরেও। রাজনৈতিক বৃত্তে তাঁর অতি বড় সমালোচকেরাও মানেন আবডালে, বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার ও গেরুয়া দলের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমন্বয়কারী ক্ষমতায়ন ভড় কেন্দ্রের একটি মাত্র নাম হল অমিত শাহ। এমনকি দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীরও গুডবুকে রয়েছেন তাঁর পছন্দের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাই দলের কঠিনতম নিয়ম হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়ে অমিত শাহ একাধারে শপথ বাক্য পাঠ করলেন দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পদের। তেমনি রয়েও গেলেন ব্যতিক্রমী ভাবে দলের সভাপতি পদেও। এমনকি গোঁড়ামির দেওয়াল ভেঙ্গে আরএসএসও এই অমিত বিক্রমের মান্যতায় শিলমোহর দিতে বাধ্য হল নরেন্দ্র মোদীর আগাম শূণ্যতা পূরণের স্বার্থে। সুতরাং এই মূহুর্তের ডিফ্যাক্টো পিএম অমিত শাহ আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বাজির বাজিগড় তা নিয়ে সন্দেহ নেই।



বিজন কুমার সরকার, প্রবীণ সাংবাদিক, নয়াদিল্লিঃ   চিত্তরঞ্জন পার্ক। দক্ষিণ পশ্চিম দিল্লির এক বহুল পরিচিত অঞ্চল। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে সমগ্র এশিয়ার মানচিত্রে চিত্তরঞ্জন পার্ক হল বাঙালির সর্ববৃহৎ বসবাস কেন্দ্র। যা আজ এক বং ঐতিহ্যের নিরন্তন গৌরবময় অধ্যায়। অথচ এই গোরবগাথা প্রায় লুন্ঠিত হতে বসেছিল এক সংখ্যালঘু সংস্থার স্বেচ্ছাচারিতায়। সাধারণত ১৭০০ থেকে ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়কাল থেকে বাঙ্গালিরা ধীরে ধীরে খুব অল্প সংখ্যায় হলেও দিল্লির অভিমুখে যেতে শুরু করে। ব্রিটিশ রাজের যুগে ভারতের রাজধানী কলকাতার পরিবর্তে দিল্লি হলে নানান চাকরির সুবাদেও বাঙালিরা কিন্তু দিল্লিকে পছন্দের শহর হিসেবে বেছে নেন। আর ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের মূহুর্তেও প্রচুর সংখ্যায় বাঙালিরা ভিড় জমান এই দেশের রাজধানীকে কেন্দ্র করে। সেই সময় যাঁরা দিল্লিতে এসেছিলেন দেশ ভাগের যন্ত্রণাকে বুকে রেখে তাঁরা অধিকাংশই কিন্তু নিজস্ব মাতৃভূমিকে পরিত্যাগ করে আসতে বাধ্য হন বাঁচার তাগিদে। স্বদেশ ভূমি ছেড়ে আসা অসহায় বাঙালিরা তখন দিশেহারা এক নতুন ভুখন্ডে। ঠিক সেই সময়ে ত্রাতার ভুমিকায় এগিয়ে এলেন তদানীন্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শ্যামাপ্রসন্ন সেনভার্মা, এস জি বসুমল্লিক, সি কে মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ দত্ত প্রমুখ বাঙালি ব্যক্তিত্ব। মূলত তাঁদের উদ্যোগেই গঠিত হল ইষ্ট পাকিস্তান ডিসপ্লেসড পার্সনস অ্যাসোসিয়েশন (ইপিডিপি)। বাঙালিদের বসবাসের প্রাপ্যস্থল নিয়ে শুরু হয় আন্দোলন। নড়েচড়ে বসে দিল্লির সরকার। অবশেষে ১৯৭০ সালের মধ্যবর্তী সময় থেকে উদ্বাস্তু বাঙালিদের বসবাসের জন্য জমি প্রদান করা শুরু হয় সরকারি বদান্যতায়। দক্ষিণ দিল্লির এই রুক্ষ জমিতেও ভূমি প্রাপকদের বিনিময়ে দিতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রামাণ্য নথি। দেশের রাজধানীতে বাঙালিরা যেখানে নিজের বাসস্থানের ভূমির জন্য উৎকন্ঠায় অস্থির তারই মধ্যে মাথা চাড়া দেয় অনিয়মের আবর্ত। সে জমি বন্টন শুরু হয় ঠিকই, তা কিন্তু তিনটে পৃথক লটারীর মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিল। এরই মধ্যে দেখা দিল বেনিয়মের সূর্যোদয়। দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির সঙ্গে জমি বন্টন প্রসঙ্গে মিনিস্ট্রি অব হাউসিং এন্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট মন্ত্রক যোগাযোগ রেখে চলছিল। তারা যৌথভাবে ২৮৬১ টি প্লট বিলির মনস্থ করলেই এক শ্রেণির প্রভাবশালী ও বিত্তশালীরা সিংহভাগ জমি করায়ত্ব করে নেন। সেই করায়ত্বের বজ্রমুষ্ঠি এতই বেনিয়মে ভরপুর ছিল যা কালের নিয়মে গ্রাহ্যের মান্যতাই পেয়ে যায়। ক্রমেই সেই স্থান গোবিন্দপুরী এক্সটেনশন নামে খ্যাত হয়। এদিকে জমি বিলি বন্টনে কিছু অসঙ্গতি দেখা দিলেও প্রায় সমস্ত জমি আবেদনকারীর আর্জি মঞ্জুর করে সবাইকে জমি দেওয়ার পক্ষেই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় তদানীন্তন সরকার। এরপর বাকি সবাইকে দিল্লির বিভিন্ন স্থানে জমি দিতে গেলে সরকারের বিরুদ্ধেও অনেকে সোচ্চার হন। তাঁদের দাবি ছিল, বসবাসের জন্য আবেদনকারীদের জমি দিতে হবে বাঙালি অধ্যুষিত ইপিডিপি কলোনিতে বা তার সংলগ্ন এলাকার মধ্যে। পরবর্তী পর্যায়ে আবেদনকারীদের দাবিতে সবুজ সংকেত দেখিয়েই প্রস্তাবিত এলাকায় এম, এ্‌ ও, পি, কে-১, কে-২, ৪০ এবং ৫২ নামে পকেট তৈরি করা হয়। ওই সমস্ত পকেটকে কেন্দ্র করে মোট ৭১৪ টি প্লট বিলির মঞ্জুরি দেওয়া হয়েছিল। যদিও সেই প্লটগুলি ঘিরেও খানিকটা অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ বসবাস যোগ্য ওই প্লটগুলির আয়তন হবার কথা ছিল ১৬০ বর্গ গজ। কিন্তু বিলির সময় সেই আয়তন কমিয়ে দেওয়া হয় ১২৫ বর্গ গজে। অন্যদিকে, এই ইপিডিপি কলোনির আরও এক মাইলস্টোন হল কে ডি গুহ রায় ঠাকুরতার বাড়ি। এই কলোনিতে তাঁর বাড়িই যে প্রথম নির্মিত হয় জি ব্লকে। কে ডি গুহ রায় ঠাকুরতার বাড়ি নির্মাণ নিয়েও কিন্তু কম নাটকীয়তা হয়নি। ইপিডিপি কলোনিতে এই বাড়ি করতে গিয়ে তিনিও চরম নৈরাজ্যের শিকার হন। ১৯৭০ সালে তিনি তাঁর স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে নিয়ম মেনেই প্ল্যান প্রস্তুত করে নেন। এমনকি নির্মাণকর্মীও চুক্তির ভিত্তিতে ভাড়া করে ফেলেন। যে দিন বাড়ি তৈরির প্রথম কাজ শুরু হবে ঠিক তার আগের দিন নিজের জমি পরিদর্শণ করতে গিয়েই তিনি চরম সংকটে পড়েছিলেন। নিজের জমি দেখতে গিয়ে দেখেন কোথায় সেই জমি? গোটা ইপিডিপি কলোনিকে কাঁটা তার দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। এমনকি জমির মানচিত্র পালটে ফেলা হয়েছে। পরিবর্তিত মানচিত্রে বরং উল্লেখ করা হয়েছিল সংখ্যালঘু একটি গোষ্ঠীর অধীনে চলা বেসরকারি সংস্থার মালিকানায় রয়েছে পুরো জমিটি। কিন্তু সেদিন কে ডি গুহ রায় ঠাকুরতা অন্যায়ের সামনে বশ্যতা মেনে নেননি। বরং দিল্লির দরবারে সেদিন তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর ধমনীতে বইছে বাঙালির রক্ত। আর মনে অদম্য জেদ। তিনিও ছুটে যান দিল্লিতে কর্মরত এক পদস্থ পুলিশ আধিকারিকের কাছে। এমনিতে সেই পুলিশ আধিকারিক ছিলেন তাঁর অকৃত্রিম বন্ধু। মূলত সেই পুলিশ বন্ধুর পরামর্শে ও সংশ্লিষ্ট থানার সহযোগিতায় ওই রাতেই আচমকা শুরু করে দেন বাড়ির নির্মাণ কাজ। তারজন্য প্রচুর সংখ্যক ভাড়াটে নির্মাণকর্মীকে সংগঠিত করতে হয়েছিল তাঁকে। পাশাপাশি পরের দিন সকালে তিনি জমি দখলদারদের বিরুদ্ধে থানায় আইন মোতাবেক নালিশ দায়ের করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় নথি পেশ না করতে পারলে দখলদারেরা সেখান থেকে পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়। সেদিন দিল্লির ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে যায় কে ডি গুহ রায় ঠাকুরতার নাম। কারণ সেদিন তিনি রুখে না দাঁড়ালে দখলদারদের কড়াল থাবা থেকে ইপিডিপি কলোনিকে বাঁচানো যেত না। পালটে যেত ইপিডিপি কলোনির ইতিবৃত্ত। পরবর্তী পর্যায়ে এই ইপিডিপি কলোনি পরিচিত হয় পুর্বাঞ্চল নামে। যা আজকে বাঙালি সমাজের কাছে সবার মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় আরও এক বহুল প্রিয় নামে...”চিত্তরঞ্জন পার্ক।”