Articles by "উত্তরকন্যা"
Showing posts with label উত্তরকন্যা. Show all posts

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

দিন কয়েক আগে গায়িকা জোজোর একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে রীতি মত শোরগোল। সেই পোস্টে জোজো উত্তরবঙ্গে পাহাড়ে ছুটি কাটাতে গিয়ে রিশপ থেকে যে ছবি পোস্ট করেছেন সেই ছবির লোকেশনে জ্বলজ্বল করছে গোর্খাল্যান্ড কথাটি। সেই দেখে তো বাঙালিকুলের বেজায় রাগ, যার ফলে জোজো দেবীকেও বেশ কিছু কথা শোনাতে কেউ ছাড়েননি। জোজো যে এতে পুরোটাই দোষী সেটা বলা মুশকিল আবার দোষ যে নেই সেটাও বলা যাবে না। এই হেয়ালিটা একটু স্পষ্ট করা দরকার। ফেসবুকে লোকেশন ট্যাগ করবার সময়  রিশপ দিলে যে বিকল্পগুলি দেখায় তাতে প্রথমটিই হল রিশপ, গোর্খাল্যান্ড, ইন্ডিয়া তার পরে ওয়েস্ট বেঙ্গল আসে। অর্থাৎ গোর্খাল্যান্ড কথাটি প্রথমে আসে। জোজো এখানেই ভুলটি করেছিলেন। লোকেশন ট্যাগ করবার সময় খেয়াল করেননি হয়তো। কিন্তু একটু সতর্ক হলে এই ভুলটা হত না, কারন এর পরে লোকেশনে যে বিকল্পগুলি আসে তাতে অবশ্য রিশপের পরে কোথাও কালিম্পং, কোথাও ওয়েস্ট বেঙ্গল কথাটিই আসে। পরেরগুলি নিলেই তাকে এত কথা শুনতে হত না। আরও একটা কথা না বললেই নয় গুগল ম্যাপেও কিন্তু বাংলার পাহাড়ে গেলেই ইংরেজির সঙ্গে হিন্দি লেখা দেখায়। পশ্চিমবঙ্গের সীমাতে থাকা স্বত্বেও বাংলা গুগলও অফ করে রেখেছে পাহাড়ের ম্যাপে। 

জোজোর মত আমিও কদিন আগেই ঘুরে এলাম পাহাড় থেকে। কিন্তু শিলিগুড়ি ছেড়ে গাড়ি সামান্য ওঠার পর থেকেই মনে হয়নি আমি পশ্চিমবঙ্গের কোথাও বেড়াতে এসেছি। ভূপ্রকৃতিগত পার্থক্য তো আছেই, ভাষা সংস্কৃতি সভ্যতা সবেতেই আমাদের থেকে অনেকটা ফারাক। পাহাড়ের মানুষগুলি ভাল না মন্দ সেটা নিয়ে কিন্তু এই আলোচনা নয়। কথাটা হচ্ছে বাংলার রানি বলে প্রচুর বিজ্ঞাপন দেওয়া হলেও বাংলা সেখানে কতটুকু আছে? দার্জিলিং সহ পাহাড়ে কেউই বাংলায় তেমন কথা বলতে চান না। আমাদের বাঙালিদের যদিও এতে তেমন সমস্যা কিছু হয় না, কারন তারা যে কোনও ছুতোয় হিন্দি বলতে পারলে বেঁচে যান। তাই তাদের অসুবিধে না হলেও আমার একটু দৃষ্টিকটু লেগেছে। আমি পাহাড়ে এই প্রথম গেলাম এমনটা নয়, আর আগেও বেশ কয়েকবার পাহাড়ে গেছি, এবার অবশ্য বছর তিনেক পরে গেলাম। কিন্তু হিন্দি ভাষার আধিক্য এবার যেন বেশি করে চোখে পড়ল। এর আগে কিন্তু পাহাড়ের মানুষকে দেখেছি বাংলা বলার চেষ্টা করতে, এবারে সেই আন্তরিক ইচ্ছেটা অনুপস্থিত মনে হল। কেউ কেউ বলতেই পারেন তাদের অন্য অভিজ্ঞতা, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমি জানালাম মাত্র। 

পাহাড়ের অন্য কোথাও তো দূরস্ত, খোদ দার্জিলিঙেও কিন্তু বাংলায় লেখা সাইন বোর্ড খুঁজে বের করা কঠিন। যে দু একটি বাংলা বোর্ড আপনি পাবেন সেগুলি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক স্বার্থে, যেমন “এখানে বাঙালি খাবার পাওয়া যায়”, “বাম্পার সেল” ইত্যাদি কিছু কথা। সরকারি বোর্ডেও বাংলা নেই বললেই চলে। একমাত্র বিশ্ববাংলার স্টলে দেখলাম বাংলায় কথাটা লেখা। এমন দুচারটি বাংলা বোর্ড আপনি কাশ্মীর, হিমাচল, হরিদ্বার গেলেও পাবেন। সেখানকার কিছু মানুষও ব্যবসায়িক স্বার্থে বাংলা শিখে নিয়েছে। কিন্তু বাংলার পাহাড়ে যেখানে সিংহভাগ বাঙালি যান সেখানেই বাংলায় কথা বলার বা শোনার প্রবণতা কমছে। আরও একটা জিনিস খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলাম কোনও দোকানের সাইনবোর্ডে পশ্চিমবঙ্গ কথাটি নেই। দার্জিলিং পর্যন্ত এসেই পিন কোড দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ আবার একটু এগিয়ে গোর্খাল্যান্ড কথাটি লিখে রেখেছেন তার দোকানের  বোর্ডে। যারা জোজোকে ট্রোল করেছেন, তারা কি এই দোকান মালিকদের কিছু বলতে পারবেন? হয়তো তারাই জোজোকে কটাক্ষ করেছেন যারা পশ্চিমবঙ্গ কথাটি বেমালুম হজম করে গোর্খাল্যান্ড লেখা বোর্ড থাকা দোকানগুলি থেকে মনপ্রাণ ভরে বাজার সেরেছেন।

পাহাড়ে গিয়ে যেটা দেখে একটু হলেও পশ্চিমবঙ্গ মনে হচ্ছিল তা হল আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর কিছু ছবি। গ্রামের দিকে খুব না হলেও দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং এর মত শহরে মাঝে মধ্যেই দেখা মিলবে হাসিমুখে মুখ্যমন্ত্রীর। পাহাড় হাসছে কিনা জানি না, তবে মুখ্যমন্ত্রী পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গাতেই হাসছেন। কিন্তু মজার কথা বিভিন্ন গাড়িচালক, হোটেল কর্মী, স্থানীয় দোকানদার, ব্যবসায়ী, বাসিন্দা অনেকের সঙ্গেই কথা বলার পরেও এমন কাউকে পাইনি যিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পছন্দ করেন। প্রায় সকলেরই এক কথা, মমতাজি এখানে নাটক করতে আসেন। ভাবুন তাহলে। জানি তৃণমূল কর্মীরা মোটেই খুশি হবেন না, কিন্তু আমার অনুরোধ থাকবে আপনারাও পাহাড় বেড়াতে গিয়ে নিজস্ব পরিচিতি না ব্যক্ত করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন। একটা আশার কথাও এক্ষেত্রে আছে। বিমল গুরুংকেও কিন্তু এই সকল মানুষ আর পছন্দ করছেন না। তারা সাফ জানালেন বিমল চোর, বিশ্বাসঘাতক, তাই তাকে ভরসা করবার প্রশ্নই ওঠে না। তাই পাহাড়ের মানুষ এখন নেতা নির্বাচনে বেশ সাবধান। সামনে জিটিএ ভোট নিয়েও দেখলাম তারা বেশ দ্বিধাবিভক্ত। মোট কথা পাহাড়ের রাজনীতি এখন ঝড়ের আগে থমথমে অবস্থার মত। সেখানেই ঘোলা জলে মাছ ধরছে বিজেপি। মমতা বার বার পাহাড়ে গিয়েও সেখানকার মানুষের মন যে জয় করে উঠতে পারেননি তা বেশ অনুভব করলাম, পাশাপাশি এটাও বুঝলাম পাহাড়ের মানুষ এখন রাজনৈতিক অভিভাবকহীন।

পাহাড় বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাহাড়কে আমাদের থেকে আলাদা করতে পারবে না কেউই। এসব কথা শুনতে বেশ ভাল লাগে। কিন্তু তলে তলে পাহাড় যে আমাদের থেকে অনেকটাই দূরে সরে গিয়েছে তা বোধহয় জানেন প্রশাসনিক কর্তা বা নেতারাও। তাই তো তারাও সমাধানের নামে গোর্খাল্যান্ড ( জিটিএ ) কথাটিতে সিলমোহর দিয়েছেন অনেক আগেই। পাহাড়ে রোজগারের ভরসা পর্যটন, যার সিংহ ভাগটাই বাঙালিরা ভরিয়ে রেখেছেন। কিন্তু বাংলা বিহীন পাহাড়কে বাংলার রানি বলে কতদিন মনকে স্বান্তনা দেওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় দানা বাঁধতে শুরু করেছে ফল্গুধারায়।

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Gorkhaland Darjeeling)

রিয়া সরকার, ফিচার রাইটার, জলপাইগুড়ি:

করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯, যাকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তথা ভারতের মতো প্রায় 138 কোটি জনসংখ্যার মতো জনবহুল দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সংখ্যা খুব দ্রুত গতিতে বাড়ছে। দীর্ঘ লকডাউনের পরেও আক্রান্তের সংখ্যা  ঊর্ধ্বমুখী। আক্রান্তের বিশ্ব তালিকায় ভারতের স্থান যেখানে তৃতীয় সেখানে অন্য নজির গড়ল আরব সাগরে অবস্থিত, ভারতীয় উপমহাদেশের একটি অংশ এবং ভারতের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাক্ষাদ্বীপ।
   
    এই লাক্ষাদ্বীপ হলো ৩৬টি দ্বীপপুঞ্জের সমষ্টি এবং যার মোট আয়তন হল প্রায় ৩২ বর্গ কিলোমিটার। এটি ভারতের একমাত্র অঞ্চল, যেখানে এখনও পর্যন্ত একটিও কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা সামনে আসেনি।
    
     এই সাফল্যের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রায় প্রথম থেকেই যাতায়াতের কড়াকড়ি নিয়ম আরোপ করা হয়েছে এবং এই মারণ ভাইরাস যাতে ছড়িয়ে না পড়ে তার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ সঠিক সময়ে সঠিক ভাবে নেওয়ার ফলেই এই দ্বীপপুঞ্জটি এইপ্রকার সাফল্য পেয়েছে।
     
     এখনও পর্যন্ত ভারতে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা যখন দশ লক্ষেরও অধিক এবং এই সংখ্যা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী তখন কেবলমাত্র লাক্ষাদ্বীপ এই ভাইরাসের প্রকোপ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত আছে।
    
     প্রতিদিনের কোভিড আপডেটে ভারতের বিভিন্ন স্থানের নাম বারে বারে উঠে আসছে শিরোনামে। এই তালিকায় লাক্ষাদ্বীপের নামটি আজ পর্যন্ত আসেনি।

    সম্পূর্ণ ভারতে এই মহামারির কারণে স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর দরজায় তালা ঝুলছে বহুদিন হলো। বর্তমানে লাক্ষাদ্বীপে করোনা পজেটিভ কোনো কেস না থাকার জন্য সেখানকার সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে আবার স্কুলমুখী করার জন্যও সম্প্রতি অনুমোদন চেয়েছে কেন্দ্রের কাছে।

     এই অঞ্চলের এমপি মহম্মদ ফয়জল জানিয়েছেন, প্রথম থেকেই লাক্ষাদ্বীপের প্রশাসন খুব কড়া ও সতর্কতা মূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে বহিরাগতদের এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশ আটকে দেওয়া হয়।
    লকডাউনের সময় ১৪৪ ধারা বা কারফিউ খুব কঠোর ভাবে বলবৎ করা হয়েছিল এবং সেখানকার নাগরিকেরাও অযথা বাড়ির বাইরে বের হয়নি। করোনা ভাইরাস ঠেকাতে সরকারি বিধি-নিষেধগুলোকে অত্যন্ত সচেতন ভাবে পালন করেছে।

    ১৯৬৭ সালের নির্ধারিত আইন, রেস্টিকশন অফ এন্ট্রি এন্ড রেসিডেন্ট অনুযায়ী যাত্রীদের দ্বীপে প্রবেশের জন্য কোচি থেকে যে এন্ট্রি পারমিট নিতে হয়, তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
 
    বিশেষ কোনো প্রয়োজনে বা চিকিৎসা জনিত কোনো কারণে যাদের বাইরে যেতে হয়েছে তাদের জন্য কোচিতে কোয়ারেন্টিন সেন্টার চালু করা হয়েছে। সেখানে সাত দিন থেকে কোভিড টেস্ট নেগেটিভ এলে তবেই ফিরে আসার অনুমতি পেয়েছে।

    লাক্ষাদ্বীপের যে সমস্ত স্থানীয়রা অন্য দেশে থেকে ফিরে এসেছেন তাদের প্রথমে কোচিতে ১৪দিন এবং দ্বীপে ফিরে এসেও আরও ১৪দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়েছে।

    লাক্ষাদ্বীপের বাড়তি সুবিধা ছিল তার ভৌগোলিক অবস্থান অর্থাৎ এটি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপপুঞ্জ যা ৩৬টি দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত। আবার এই ৩৬টি দ্বীপের মধ্যে মাত্র ১০টিতে লোকজন বসবাস করে এবং জনসংখ্যাও খুব কম। ফলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখারও আলাদা করে কোনো প্রয়োজন পড়েনি।

    ভারতের অন্যান্য স্থানে যেখানে কঠোরভাবে লকডাউন প্রয়োগ করা যায়নি এবং অসচেতন ভাবে মানুষ সরকার প্রদত্ত নিয়মের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। লাক্ষাদ্বীপ সেখানে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত রাখে।

   প্রথম থেকেই আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রচন্ড কড়াকড়ি ব্যবস্থা নিয়েছে সেখানকার প্রশাসন। তারপর নির্দিষ্ট শর্ত মেনে কোয়ারেন্টিনে থেকে তবে দ্বীপে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাকি দেশে যখন কোয়ারেন্টিনে থাকার প্রায় সমস্ত খরচ নিজেদেরকেই বহন করতে হচ্ছে লাক্ষাদ্বীপের ক্ষেত্রে সেখানকার সরকার সেই ব্যয়টি বহন করছে। ফলে দীর্ঘ কোয়ারেন্টিনে থাকার খরচ বহন করতে হচ্ছে না বলে সেখানকার জনগণ কোয়ারেন্টিনে থাকার সমস্ত নিয়মকে মেনে নিয়েছে সহজভাবে।

   এমপি মহম্মদ ফয়জল অবশ্য একথা অস্বীকার করেননি যে, পর্যটন নির্ভর এই দ্বীপটিতে নানা কড়াকড়ির কারণে অর্থনীতিতে বিরাট ধাক্কা খেয়েছে। তিনি জানান, সেই মার্চ মাস থেকে পর্যটন ব্যবস্থা যেহেতু পুরোপুরি বন্ধ ফলে লাক্ষাদ্বীপের উপার্জনেও বিরাট টান পড়েছে। তবে বর্তমানে দ্বীপের অভ্যন্তরীণ স্থানীয় শিল্পগুলোই ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

    কোচি থেকে বিমান পরিষেবা, যাত্রীবাহী জাহাজের সার্ভিস এবং প্রথম থেকেই দ্বীপের অভ্যন্তরে যাতায়াতে কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা থাকার ফলে লাক্ষাদ্বীপ এখনও করোনা মুক্ত।

রিয়া সরকার, ফিচার রাইটার, জলপাইগুড়ি:

সময়টা ছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি। একসময়ের স্বাভাবিক নিয়মে বয়ে চলা একটি একান্নবর্তী পরিবারের অনেকেই চলে গেছে এ বাড়ি ছেড়ে। আর বাদবাকি যারা ছিল তাদেরও হঠাৎ একদিন রাতারাতি ছেড়ে আসতে হয়েছিল ঢাকা জেলার জয়দেবপুরের সাধের বাড়ি। সেদিন ছেড়ে এসেছিল বাড়ির পাশের পুকুর, বাঁধানো ঘাট, সর্ষে ক্ষেত, ধৈঞ্চা বন, সুপরি গাছে বাবুই পাখিদের নতুন বাসা, বন্ধু অমিত, মইনুল,  আলম, শেখর আর সদা অলস পোষা বেড়াল মিনিকে। বাস্তবের মাটির টানে আটকে থাকতে পারেনি। তবে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই যতটা সম্ভব হয়েছিল তিল তিল করে গড়ে তোলা ক্ষেতের জমি-জায়গা, কাঁসা পিতলের ঘটি-বাটি, বাসন-কোসন বিক্রিবাট্টা করা হয়েছিল কিন্তু অনেক জায়গাই এমনি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে। ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায়। সেদিন ফেলে এসেছিল নিকোনো তুলসী মঞ্চ যেখানে যত্ন করে মা-ঠাকুমা প্রদীপ দিত। ফেলে আসতে হয়েছিল ঘরের কোণের  প্রাচীন আম গাছটিকে। যে গাছের ডালে বসে বাড়ির অনেক ছোটরাই নুন তেঁতুল খেতে খেতে বড় হবার স্বপ্ন দেখতো। যেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে কত পাখি এসে বসত। কিচিরমিচির শব্দে বাড়ি মাতিয়ে রাখতো। যে বাড়ির আর এক কোনের লিচু গাছের নিচের বাঁশের মাচায় বসে ক্ষীপ্ত দুপুর শীতল হতো, সেই ছায়াগাছকেও ছেড়ে এসেছিল। পৌষ সংক্রান্তি, নবান্নের নতুন চাল, পিঠে পুলি পায়েসের গন্ধ, ঢেঁকির শব্দ, উঠোন জুড়ে সেদ্ধ ধানের গন্ধের সুখস্মৃতিকে বিদায় জানাতে হয়েছিল চিরতরে।
            শুধু নিয়ে এসেছিল জং পড়া একটি টিনের বাক্সে কিছু কাপড়, প্রিয়জনদের পাঠানো হলদে হয়ে যাওয়া পুরোনো কয়েকটি চিঠি, ফুটবল খেলায় পাওয়া তিনটে রুপোর মেডেল আর ফিরে না পাওয়া মুহূর্তের স্মৃতিকে।
          নতুন করে জীবন গড়ার আশায় সেইসময় ওদের হাটতে হয়েছিল যোজন যোজন পথ। সদ্য হাটতে শেখা মায়ের কোলের ছোট্ট শিশুটি হাঁপিয়ে উঠেছিল একনাগাড়ে কোলে থাকতে থাকতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদের সাথে থাকা সাত বছরের ছেলেটিও পায়ের তালে তালে মিলিয়ে ছিলো বড়দের সাথে। সে বুঝতেও পারেনি ওর ডাংগুলি খেলার বন্ধুদের সাথে, রূপকথার গল্প বলা ফুল দিদা আর গান গাইতে গাইতে ঘুরে বেড়ানো রবিচাচার সাথে হয়ত আর কখনই দেখা হবে না। প্রিয় বন্ধু মাইনুরের সাথে ঘাটে বসে শান্ত পুকুরে ঢিল ছোড়া হবে না আর কখনও। 
   
    সময়ের স্রোতে কতকিছু হারিয়ে গেছে, নতুন অনেক কিছুকে সামনে দাঁড় করিয়ে। নতুন জায়গায় নতুন ভাবে ঘর-দোর, গোয়ালঘর, কুয়োতলা তৈরি হয়েছে। ব্যস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি উঠোন। সেখানে শ্যাওলা পড়েছে আবার পরিষ্কারও হয়েছে। রোদ উঠেছে, ছায়া পড়েছে। রান্নাঘরের ছাউনি লাউয়ের ডগায় ভরে গেছে। বাড়ির পোষ্য কুকুর  বুলবুলির মেয়ের ঘরের মেয়ে হয়েছে। আস্তে আস্তে দলমার বেড়া বদলে ইটের গাঁথনি হয়েছে। সব আবার ঠিক আগের মতোই স্বাভাবিক।
      সাত বছর বয়সের সেই ছেলেটির জীবনের অন্বেষণের আরো প্রায় পঞ্চাশটি বছর কেটে গেছে। কেটে গেছে কতগুলো পনেরই আগস্ট, ছাব্বিশে জানুয়ারি। ইতিহাস, সংবিধানের ধারা উপধারা, মানচিত্রের অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংস আয়ত্ত করেছে যত্ন করে। জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও অল্প বিস্তর যে নিজের সাথে সময় কাটানো তখন যেন স্মৃতিতে ভেসে আসে শতাব্দী প্রাচীন কোনো এক আগের জীবনের নানা কথা। তার ছেলে মেয়েদের সেসব মায়া ভরা দিনের গল্প শোনায়। নেতাজী, বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম, বিরসামুন্ডার বীরগাথা বলতে গিয়ে চোখ-মুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। আর বেশ কিছু স্মৃতিগন্ধ যা  শুধু আত্মোপলব্ধি করা যায়, যা কোনো ভাবেই বর্ণনা করা যায় না, তা কেবল থেকে যায় মনের গভীরে।
      এত বছর পর এই বছরের প্রথম দিকে টিভির পর্দায় চোখ রেখে জানতে পারে 'পরিযায়ী' মানুষদের কথা। তারা সকাল-দুপুর-রাত হাঁটছে ক্রমাগত। বাড়ি ফিরে আসতে চাইছে। সেই মানুষগুলোর মধ্যেই যেন সে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়। মাটির টান, পেটের টান আর জীবনের টানের সংজ্ঞায় এলোমেলো হয়ে যায় সমস্ত ভাবনা। 
         বিদেশে গেলে নিজের জায়গার মানুষদের দেখলে যেমন ছটপট করে মন, মনে হয় খুব আপনজন। তেমনি ভাবেই ওপার বাংলার খুব প্রিয় জায়গা ভবানীপুর, জয়দেবপুরের কথা শুনলেই ছুটে যেতে ইচ্ছে হয়। খুব দেখতে ইচ্ছে হয়, যেখানে সে প্রথম হাটতে শিখেছিলো সেই মাটিকে। সারা শরীরে সেই মাটি জড়িয়ে খুব বসে থাকতে ইচ্ছে হয়।
       তবে খুব ইচ্ছে থাকলেও ওপার বাংলায় আর যাওয়া হয়নি। আর যা হয়নি তা নিয়ে চুপচাপ নীরবে আপসোস করতে হয় একটু। খড় কুটো দিয়ে তাকে ঢাকা খুব কঠিন। তাইতো কতজনকে জয়দেবপুরের প্রাক্তন বাড়ির ঠিকানা দিয়ে খোঁজ নিতে বলেছে। সেখান থেকে একটু মাটি আনতে বলেছে। যদিও সে শুনেছিল সেখানে নাকি অনেকদিন হলো পাকা রাস্তা হয়েছে, আকাশ ছোঁয়া বহুতল বাড়ি তৈরি হয়েছে। তবুও যদি একমুঠো মাটি পেতো সেখানকার তাহলে মনটা হয়তো আরো একটু আরাম পেতো। কিন্তু তা আর হয়নি। উনি চলে গেলেন চিরদিনের মতো। গান স্যালুট করে তেরঙায় মুড়ে দাহ করা হলো। একটা গোটা জীবনের সমস্ত ওঠা নামা, ছন্দপতন, প্রাপ্তি, সমস্ত কিছুর সাক্ষী থেকে গেলো এক ও অবিভক্ত আকাশ।

শৌভিক রায়, লেখক ও শিক্ষক, কোচবিহার:

করোনার প্রকোপ যত বাড়ছে, তত আমরা অমানবিক হচ্ছি। আর এই অমানবিকতার ছাপ পড়ছে আমাদের নিত্য ব্যবহার ও যাপনে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। দিনদিন আমরা বড় বেশি স্বার্থপর হয়ে উঠছি। চিন্তা করছি শুধুমাত্র নিজেদের নিয়ে। হয়ত করোনাকালীন পরিস্থিতিতে এরকম হওয়া ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু আদতে তা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিপন্থি নয়।

'অতিথি দেব ভবো' যে দেশের অন্যতম শ্লোগান, সে দেশে ভিন প্রদেশ থেকে নিজের ঘরে ফেরা মানুষেরা, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে এরকম 'তফাত যাও দূর হটো' ব্যবহার পাবেন, সেটা একদমই অকল্পনীয়! করোনা মহামারী সেই অভাবনীয় ব্যাপারটিও ক'রে দেখালো। এখানেই বোধহয় মানবতাকে হারিয়ে মহামারীর বিজয়যাত্রার সদম্ভ নিনাদ ঘোষিত হচ্ছে! 

নিজেদের ঘরে ফেরা শ্রমিকেরা-সহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ, কিছু সংখ্যক আতঙ্কিত মানুষের কাছে যে ব্যবহার পাচ্ছেন, তা শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, একান্তই ন্যক্কারজনক। মানছি যে, আতঙ্কিত মানুষেরা খানিকটা দায়ে পড়েই এই ব্যবহার করছেন, কিন্তু এটা তো বোঝা উচিত যে, এই মানুষগুলি যাবেন কোথায়! ভিন প্রদেশ থেকে নিজেদের বাড়িতে ফেরা ছাড়া তাদের বিকল্প আর কোন্ পথই বা খোলা রয়েছে! 

ভিন প্রদেশ থেকে ফেরত আসা মানুষদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার যারা করছেন তাদের যুক্তি হল যে, অন্য রাজ্য থেকে এসে এরা করোনা ভাইরাস ছড়াচ্ছেন। তাদের কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। উল্টে বহুলাংশেই তাদের কথা ঠিক। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, যারা অন্য রাজ্য থেকে ঘরে ফিরছেন তারা সকলেই করোনা ভাইরাস বহন করছেন না। হয়তো তাদের মধ্যে কেউ কেউ সংক্রামিত হয়েছেন। তাই কিছু কিছু মানুষের জন্য সবাইকে দায়ী করা ঠিক নয়। অথচ সেটাই করা হচ্ছে। আবার, কেউ করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হলেই তাকে ও তার পরিবারকে গণশত্রু ভাবার কোনও কারণ নেই। আক্রান্ত ব্যক্তিটি চিকিৎসায় ঠিক হবেন না, এমনটিও নয়। বরং তথ্য বলছে যে, এই রোগে সেরে উঠবার হার, মৃত্যুহারের চাইতে অনেক বেশি। আমরা অনেকেই বোধহয় এটা ভুলে গেছি। একটা অদ্ভুত 'গেল গেল' রব উঠেছে চারদিকে। এমন কি, করোনা সংক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ সেরে ওঠা কেউ কেউ সামাজিক প্রতিরোধের সামনে পড়ছেন। এ এক অস্বস্তিকর অবস্থা। এই সমাজ কি আদৌ আমাদের চেনা?  আমরা কি ভুলে যাচ্ছি যে, রোগ কেউ ইচ্ছে করে বাঁধায় না! কে চায় অসুস্থ হতে? তাও আবার করোনার মতো অতিমারী রোগের হাতে! তাই, কেউ করোনা আক্রান্ত হলেই তার সঙ্গে একজন সমাজবিরোধীর মতো আচরণটি কখনই সমর্থন করা যায় না। বরং ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, রাস্তাঘাটে যত্রতত্র যারা নির্বিচারে থুতু ফেলে চলেছেন, তারাই আসল অপরাধী। বারংবার বলা সত্বেও মুখে মাস্ক না পড়ে, সামাজিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাবিধি না মেনে, যারা বিনা প্রয়োজনে সর্বত্র বিরাজমান তারাই আসল কালপ্রিট। কিন্তু চিত্রটা ঠিক উল্টো। ভাবতে বিষন্ন হতে হয় যে, যারা জীবন ও জীবিকার স্বার্থে দিনের পর দিন বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পড়েছিলেন, আজ তারাই 'নিজবাসভূমে পরবাসি' হয়ে গেলেন! মহামারীর মার একেই বলে! 
শুধুই কি ভিন রাজ্য থেকে ফিরে আসা মানুষেরা এই দুর্ব্যবহারের মুখোমুখি হচ্ছেন? স্বীকার করতে ভীষণ লজ্জা লাগছে যে, আমরা ছাড় দিচ্ছি না সেইসব মানুষদের, যারা প্রত্যক্ষ লড়াই করছেন করোনার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন হাসপাতাল বা নার্সিং হোমে কর্মরত নার্সদেরকে পাড়ায় বা নিজের বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও কিন্তু উঠেছে। বিশেষ করে যারা বাড়ি ভাড়া করে থাকেন, তাদের বোধহয় বেশি করে সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। এটা কি আদৌ কাম্য? যাদের হাতে আমাদের সুরক্ষা তারাই যদি সামাজিক বয়কটের মুখে পড়েন, তবে আর যা হ'ক সেই সমাজকে বিবেচক বলা চলে না। বলতে দ্বিধা নেই যে, অন্য রাজ্য থেকে এই রাজ্যে কাজ করতে আসা নার্সরাই বেশি পরিমাণে এই ব্যবহার পাচ্ছেন। অথচ তাদের ওপর এই রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো অনেকটা নির্ভরশীল। তাদেরকে এভাবে অচ্ছুৎ করে দেওয়া মানে প্রকারন্তরে নিজের বিপদ ডেকে আনা।  

আসলে বিগত মাস তিনেকের মধ্যে করোনা আমাদের ভাবনা-চিন্তা থেকে শুরু করে সবকিছু পাল্টে দিতে পেরেছে। তাই বোধহয় আতঙ্কের এক অদেখা চেহারা প্রতি মুহূর্তে আমাদের সঙ্গী হয়ে গেছে। আমরা আমাদের মানসিক স্থৈর্য্য চটজলদি হারিয়ে ফেলছি। আর তার ছায়া পড়ছে আমাদের নিত্য ব্যবহারে। করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে এটাই 'অ্যাডভান্টেজ করোনা' এই মুহূর্তে। তা না হলে বিশ্বাস করা কঠিন হয় যে, প্রিয়তম বন্ধুটিও ঘরে ফেরা তথাকথিত শ্রমিকটির বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে গ্রামছাড়া করতে উদ্যোগী হয়েছে। ভাবতে মন চায় না যে, করোনা থেকে সেরে ওঠা যুবককে বাড়ি তো দূরে, পাড়াতেই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না! 

অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইটি সম্মিলিত। সামাজিক ও দৈহিক দূরত্বের মাধ্যমে সকলে মিলে এমন এক বৃত্ত সৃষ্টি করা, যেখানে করোনা তুচ্ছ প্রমাণিত হবে। কোনভাবেই এই দূরত্ব কাউকে বয়কট করা বা একঘরে করে দেওয়া হতে পারে না। তাকে গণশত্রু প্রতিপন্ন করাও হতে পারে না। মনে রাখতে হবে যে, করোনা সংক্রামিত ব্যক্তিটিও সমাজের অন্তর্ভূক্ত। তার সংক্রমণের বা আক্রান্ত হওয়ার দায় কিন্তু শুধুমাত্র তার একার নয়। বৃহত্তর সমাজও সেই দায়িত্ব এড়াতে পারে না। তাকে সম্পূর্ণ বয়কটের মাধ্যমে রোগ উপশমের কথা ভাবলে, একদিন এমনও আসতে পারে যেদিন হয়ত নিজেকেও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হবে! 

বরং করোনা প্রশমনে অনুপস্থিতির মধ্যে দরকার এমন এক উপস্থিতি, যা পারস্পারিক সাহচর্য ও প্রত্যয়কে বৃদ্ধি করবে। এভাবে সামাজিক বয়কট পরিস্থিতিকে কেবল জটিল করবে, লাভের লাভ কিছু হবে না। প্রয়োজনে অবশ্যই কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন ইত্যাদি সব করতে হবে, কিন্তু শুধুমাত্র আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে মরবার আগে বারবার মরলে ও মারলে সামাজিক সুস্থিতি যেমন নষ্ট হয়, তেমনি মনুষ্যত্বেরও অবমাননা হয়। বিপদের এই সময়ে, আমরা যদি এই বোধটুকুও হারাই তবে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না! করোনার বিপদ একদিন ঠিকই কেটে যাবে, কিন্তু মনুষ্যত্বহীন জীবন নিয়ে কি হবে?

অবিলম্বে এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে আগামী দিন ভয়ঙ্কর হতে চলেছে। এমনও হতে পারে যে, এরপর আমরা নিজেদের মানুষকেও চিনব না, জানব না।

শেরী ঘোষ, ফিচার রাইটার, কোচবিহার:

করোনা ভাইরাসের করাল গ্ৰাসে আচ্ছন্ন গোটা পৃথিবী। বিশ্বজুড়ে মানুষ চেষ্টা করছে কীভাবে কত দ্রুত মুক্তি মেলে এই করোনা নামক রাহুগ্ৰাস থেকে। মানুষের জীবন এক নিদারুণ প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে। জীবিকা নির্বাহের পথ বন্ধ হয়ে আজ সঙ্কটে বহু মানুষ। এই পরিস্থিতিতে সব মানুষের উচিত একজোট হওয়া। একে অপরের পাশে দাঁড়ানো। সহায় হয়ে ওঠা।
এক্ষেত্রে দরকার সদিচ্ছার। সেই লক্ষ‍্য নিয়েই
গতকাল মাথাভাঙ্গার, দক্ষিণ পচাগড়ের সতীর্থ ইউনিট ক্লাবের পক্ষ থেকে প্রায় ৮০টি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হল নিত‍্য প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্ৰী।
 ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়েও সিন্ধু পার সম্ভব। শিব জ্ঞানে জীব সেবার সেই বানী স্মরণ করে এর আগেও বহু সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে এই ক্লাব। এবারেও এঁরা  এলাকার সেইসব মানুষের পাশে দাঁড়ালেন, যাতে নিজেদের অতি প্রিয় এলাকাবাসীর কিছুটা সমস‍্যা , কষ্ট হয়ত এর মধ‍্য দিয়ে লাঘব করা সম্ভব হয়।
সরকারি নির্দেশিকা মেনে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সম্প্রতি ৮০টি পরিবারের প্রত‍্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হল চাল, ডাল, সয়াবিন, তেল , সাবানছাড়াও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খাদ‍্য সামগ্ৰী।

ত্রাণ সামগ্রী পাওয়ার পর একজন আমাদের সংবাদ প্রতিনিধিকে জানান, '' এই সময় এটা ভীষণ জরুরি ছিল। সতীর্থ ইউনিট ক্লাব এর আগেও বহুবার দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে না পারা অসহায়ের পাশে, রক্তদানের মতো মহৎ কাজে , আবার কখনো মেয়ের বিয়েতে আর্থিক সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে এঁরাই।"

ক্লাব কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য জানান, "আমাদের গ্ৰামে দারিদ্যসীমার নিচে বসবাস কারী মানুষের সংখ্যা বেশি। অধিকাংশ মানুষের জীবিকাই দৈনিক রুজিভিত্তিক। করোনা সংক্রমণ এবং লকডাউনের ফলে সেই জীবিকায় টান পড়েছে। স্বাভাবিক ছন্দ ভুলেছেন সবাই। তাই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস যাতে তাঁদের পাশে কিছুটা হলেও দাঁড়াতে পারি। এঁরা আমাদেরই স্বজন- বন্ধু। এভাবেই হয়ত আমরা অনেক সমস‍্যা কাটিয়ে উঠতে পারব। যদিও আমাদের সামর্থ্য সীমিত। তবু আগামী দিনে যেন এভাবেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি।"

শাঁওলি দে, লেখিকা, জলপাইগুড়ি:

দৃশ্য একঃ  “তিনটি প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হচ্ছে রঙিন বাংলা ছবি   ‘লাঠি’ , শ্রেষ্ঠাংশে  ভিক্টর ব্যানার্জী ...” দূর থেকে ভেসে আসছে আধা শহর , আধা মফস্বলের একমাত্র সিনেমা হলে প্রতি শুক্রবার করে পালটে যাওয়া নতুন সিনেমার বিজ্ঞাপন। হাফ প্যান্ট ,ফুলছাপ টেপ জামা পড়া কতগুলো ছেলেমেয়ে খেলা থামিয়ে তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। রিক্সাটা কাছে আসতেই তারা ছুঁড়ে ফেলা লাল হলুদ কম দামি কাগজগুলো কুড়িয়ে নিল অনাবিল আনন্দে।

দৃশ্য দুইঃ  ছুটির দিনগুলোতে চটজলদি হাতের কাজ , রান্নাবাড়ি সেরে তৈরি হয়ে নিচ্ছে আশপাশের বাড়ির মহিলারা। সকাল থেকেই  ব্যস্ততা যেন বেড়ে গেছে অন্যান্য দিনের চাইতে আরও কয়েক’শগুন। দুপুরের খাওয়ার সময়টা একটু এগিয়ে এনে , বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে একদল পাড়াতুতো বৌদি কাকিমা লাইন দিয়েছে সিনেমা হলের সামনে।

দৃশ্য তিনঃ বাড়িতে ছোট কাকু বা পিসির বিয়ে উপলক্ষে হই হট্টগোল। নতুন কাকীমা বা পিসেমশাইকে নিয়ে বসেছে আসর। অন্তাক্ষ্যরী , ঘন ঘন চা ...এসবের মাঝেই প্ল্যান হয়ে গেল ম্যাটিনি শো’তে সবাই মিলে সিনেমা হল। কী সিনেমা ? কুছ পরোয়া নেহি। প্রায় উনিশ কুড়ি জন মিলে চলল পাশের হলে। উপচে পড়া ভিড়ে হইহই করে সিনেমা দেখার মধ্যে যে উৎসাহ  ছিল তা এখন কোথায় ? বিরতির সময় কাকু বা পিসেমশাই’এর ঘাড় ভেঙে বাদাম খাওয়া ? সেই চিনে বাদাম ভেঙে ভেঙে জামা নোংরা করা আর আঙুলের ডগায় লেগে থাকা বীটনুন একটু একটু চেটে খাওয়ার স্বাদ যেকোনো হালফিলের ‘স্ট্রীটফুড’এর চাইতে কম কি?

  আমরা যারা নয়ের শেষের দিকে কিম্বা এই দশকের শুরুতে একটু একটু করে বেড়ে উঠছি তাদের জন্য সিনেমা হলটা ছিল কেমন যেন অক্সিজেনের মত। স্কুলে থাকাকালীন যখন কালে ভদ্রে মা ,কাকীমার সঙ্গে সিনেমা হলে যাওয়ার সুযোগ মিলত তখন নিজেকে মনে হত যেন পৌঁছে গিয়েছি সব পেয়েছির দেশে। এইভাবেই দেখা হয়েছিল বেশ কিছু সিনেমা। কলেজ পালিয়ে নতুন শুরু হওয়া বন্ধুত্বকে ভালোবাসার মোহর লাগাতেও ঠিকানা ছিল সেই সিনেমা হল। যে সময়ের কথা লিখছি তখনও সিনেমা বা ফিল্ম না বলে ‘বই’ দেখতে যাওয়াই ছিল অন্যতম অবসর যাপন। টিকিট ব্ল্যাক করে হলেও ‘বই’ দেখতে যেতেই হবে সদলবলে কিম্বা ‘শুধু দু‘জনে’।

   সব জায়গায় যে সিনেমা হল ছিল তাও নয়।  যেসব জায়গায়  ছিল না ,সেখানে ভিডিও হলই সই। ‘গুরুদক্ষিণা’ কিম্বা ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’র মতো সিনেমার টিকিট বিকোত রমরমিয়ে। আবার টাউনে ‘বই’ দেখতে যাওয়ারও চল ছিল। পরীক্ষার শেষে মা’এর সঙ্গে কিম্বা দু’চারজন ছোটবেলার বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে দেখা হয়ে গিয়েছিল বেশ কিছু সিনেমা।  দেখা শেষে হাতের নাগালের রেস্টুরেন্টে মোগলাই পরোটা বা পুরি তরকারি খেয়েই ছুটতে ছুটতে আবার বাস ধরা। সেই উত্তেজনাই বা এখন আর কোথায় ?

  সিনেমা হল ‘কালচার’টা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পালটাতে পালটাতে একেবারেই বদলে গেছে। বড় বড় শহর তো বটেও গ্রাম বা জেলা শহরগুলিতেও হাতে গোনা সিনেমা হল আর তাতে দর্শক সংখ্যা আরও কম। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা শপিং মলের মতোই এখন সিনেপ্লেক্স  , মাল্টিপেক্সের ছড়াছড়ি। তিন চারটে স্ক্রিণের ঝা চকচকে এসিতে দুটো তিনটে সিনেমা চলছে একসঙ্গে। আমরা সিনেমার আগের ট্রেইলর দেখার জন্যও মুখিয়ে থেকেছি একসময় আর এখন সেই সময়টুকু কেড়ে নিয়েছে ‘সেলফি’ আর ফেসবুক স্ট্যাটাস । মুহূর্তে এক’শ লাইক আর কমেন্টের ছড়াছড়ি, দেখা শেষ হতে না হতেই গরম গরম ‘রিয়্যাকশন’। সবেতেই এক চূড়ান্ত ব্যস্ততা , যান্ত্রিকতা। মাঝখান থেকে হারিয়ে গেল আন্তরিকতা , সম্পর্কের উষ্ণতা , অবসর যাপনের অনাবিল আমেজ , ছেলেমানুষী আরও কত কী!
    দক্ষিণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উত্তরেও এখন ‘দখিন হাওয়া।’ সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে বসেছে। হল মালিকেরা মন দিয়েছেন অন্য ব্যবসায়। শিলিগুড়ি শহরের বিখ্যাত ‘ঊর্বশী’ হল যেমন বন্ধ  হয়ে গিয়েছে তেমনি কোচবিহারের প্রান্তিক শহর হলদিবাড়ির শ্রীমা সিনেমা হল ,যেখানে ‘নাচ নাগিন নাচ’এর মতো সিনেমার টিকিট ব্ল্যাকেও পাওয়া যেত না ,সেটিও বন্ধ হয়ে গিয়েছে বহুবছর। বন্ধ হলটিতে এখন আগাছা ভর্তি ,বাইরের লোহার গেটে মরচে পড়ে প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম। সামনে চপ সিঙ্গাড়ার দোকান। সন্ধেবেলায় খারাপ ছেলেদের আড্ডা। এই প্রজন্ম জানেই না ওখানে এককালে একটা , চারটে, সাতটার শো’গুলো কেমন হাউসফুল থাকত!

   সদর জলপাইগুড়ির ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল রূপশ্রী ভেঙে তার জায়গায় বিরাট মার্কেট কমপ্লেক্স হয়েছে তাও অনেক বছর হয়ে গেল। বাকী দু’তিনটে হলেও হাতে গোনা দর্শক। যে ছেলেটি টিকিট ব্ল্যাক করত অন্য কাজে মন দিয়েছে । জানি না ওই কমপ্লেক্সের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ওর বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে কি না?  বাথরুমের সামনে বসে থাকা মহিলাটা আজকাল বেশি পয়সা চায় । জিজ্ঞেস করলে বলে ,’আগে লাইন লেগে থাকত, এখন কেউ আসে না। কামাই একেবারে নেই।এই কাজ করে সংসার চলে না আর। ’ রায়গঞ্জ ,মালদা , বালুরঘাট , ইসলামপুর যে জায়গার নামই বলি না কেন ,অবস্থা একই !

  আজকাল শিক্ষিত রুচিশীল মানুষেরা সিনেমা হল শুনলেই নাক কোঁচকায়। বরং তার চেয়েও অনেকগুণ বেশি টাকায় টিকিট কেটে পৌঁছে যায় মাল্টিপ্লেক্সে। চিনে বাদাম ,মোগলাই’এর জায়গা নিয়ে নিয়েছে পপকর্ণ কিম্বা পনির টিক্কার মতো খাবার।

   সব জায়গাতেই প্রায় একই অবস্থা। উত্তরের সিনেমা হলগুলো ধুঁকছে। আর এই ধুঁকতে ধুঁকতেই কখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আমরা কেউই টের পাব না। যেমন করে একে একে সব পুরোনো কিছুকে ছেড়ে আসছি আর এক পা এক পা করে এগোচ্ছি বিশ্বায়নের দিকে, তেমনি করেই একদিন সব শেষ হয়ে যাবে ,থেকে যাবে টুকরো কিছু স্মৃতি ।আর এই স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে বেঁচে থাকবে কিছু মানুষ যারা সাক্ষী এমনই ঐতিহ্যবাহী কতকিছুর !

   উত্তরেও আজকাল আকাশ দেখা যায় না। বড় বড় বিল্ডিং যেন একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। মাঠগুলো হা পিত্যেশ করে বসে থাকে কচি কচি পা’এর দামাল দৌড়ের  জন্য। সদ্য কিশোর কিশোরী এখন আর মা’এর হাত ধরে সিনেমা হলে যাওয়ার অপেক্ষা করে না। সময় ওদের মুঠোয় ভরে দিয়েছে সব কিছু।

যা চাই সবই হাতের মুঠোয়। পাড়ার কাকিমা বৌদিরা একসঙ্গে দলবেঁধে সিনেমা হলে যাওয়ার কথাই বা ভাবে কি ? ওরা তো একে অন্যকে ঠিকমতো চেনেই না ! বিয়ে উপলক্ষে এখন বসে ডিজে জোন সঙ্গে সেলফি ম্যানিয়া।  সব সবকিছু বদলে গেছে। বদলে গেছি সেই সময়ের আমরা,  আমিও।

  তবু আজও অবসরে বা কোনো অলস ফাগুন দুপুরে যখন পেছনে তাকাই দেখতে পাই হাফ প্যান্ট ,ফুলছাপ টেপ জামা পড়া ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েগুলোকে। কান পাতলে শুনতে পাই পাড়ার এক কাকু রিক্সা করে বলে যাচ্ছে তিনটি প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত সিনেমার কথা। সেই কাকুও মারা গেছেন বহুদিন। ওঁর সঙ্গে সঙ্গেই যেন হারিয়ে গেছে সেই সোনালি বিকেল , হলুদ বসন্তের দিনগুলি। 

  চোখ বুজলে সামনে ভেসে ওঠে বদ্ধ টিকিট কাউন্টারের ছোট্ট ফুটোয় হাত ঢুকিয়ে হালকা সবুজ অথবা গোলাপি টিকিট নেওয়া আর ওর লাগে লেগে থাকা কাঁচা রঙের গন্ধ। গাঢ় অন্ধকারে হলের ভেতর দিশাহীন ঢুকে পড়া ,তারপর ছয় ব্যাটারির টর্চ হাতে নিয়ে থাকা কাকুর দেখিয়ে দেওয়া সিটে নিজেকে নির্দ্ধিধায় সঁপে দেওয়া তিনঘন্টার জন্য। নারকেলের ছিবড়ে দিয়ে তৈরি ছেঁড়া ফাঁটা এবড়োখেবড়ো গদিতে বসার যুত ছিল না ঠিকই মনের শান্তি ছিল প্রচুর। সিনেমা শেষে ছাড়পোকার কামড়ে ফুলে যাওয়া পা নিয়ে চিন্তা ছিল না একচুলও।

   এসব এখন আর কোথায় ? পাঁচ ছয় ইঞ্চির মুঠো ফোনে কিম্বা কোলে নিয়ে রাখা ল্যাপটপে সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত ছেলেমেয়েদের কাছে এসব কিছু অধরাই। জীবন তাদের আরাম দিয়েছে ঠিকই ,সঞ্চয় করে রাখার মতো কিছুই কি দিতে পারছে ? দশ জিবি নেট ডেটা দিয়েছে , ঐতিহ্য ধরে রাখার মতো হৃদয় দিয়েছে কি ?

   কলকাতা বা অন্যান্য মেট্রো শহরগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে দিতে উত্তরবাংলা তার নিজস্বতা হারাচ্ছে বা বলা ভালো হারিয়ে ফেলেছে। তাই শুধু সিনেমা হলই নয় যাত্রাপালা , পালাটিয়া ,পাবলিসিটি , পুতুলনাচের মতো সবকিছু মুছে যাচ্ছে উত্তরের গা থেকে ,আর এই সাফ সুতরো উত্তরকে বড়ো অচেনা লাগে আজকাল । নিজের বলে মনে হয় না।

  শুধু ই-টিকিট হাতে নিয়ে মাল্টিপ্লেক্সে ঢোকার সময় কানে বাজে দুটো ব্যালকনি ,সাইড দেবেন।

  আমি তো শুনতে পাই । আপনারা পান না ,তাই না ?

শৌভিক রায়, লেখক, কোচবিহার:

শব্দটি 'ডুয়ার্স' কেন? অনেকেই জানি 'দুয়ার' শব্দটি ইংরেজদের মুখে 'ডুয়ার্স' হয়ে গিয়েছিল। তাহলেও প্রশ্ন থাকছে 'দুয়ার' কেন? 
আসলে সমভূমি থেকে উত্তরে পাহাড়পথে ভূটানে যাবার জন্য ছিল আঠারোটি পথ বা দুয়ার। বহুবচনে দুয়ারগুচ্ছ। ইংরেজরা DOOARS বা ডুয়ার্স বেছে নেয়। (তথ্যসূত্র: সার্জন রেনি- BHOTAN AND THE STORY OF DOOAR WAR)। হিন্দুস্থানী 'দ্বার' বা ইংরেজি DOOR থেকেই 'দুয়ার' শব্দটির উদ্ভব। 
একটু দেখে নিই এই আঠারোটি 'দুয়ার' কি কি-
ডালিমকোট (বর্তমান দার্জ্জিলিং জেলায়), ময়নাগুড়ি বা জুমের কোর্ট , চামুর্চি বা সামচি, লক্ষ্মী বা লাককি (বর্তমান জলপাইগুড়ি জেলায়), বকসা বা পাশাখা, ভলকা বা ভুলকা (বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলায়), বরা, গুমর, রিপো ( বর্তমানে আসামের কোকড়াঝাড় জেলায়), চেরাঙ বা ছেরাঙ (আসামের গোয়ালপাড়া জেলায়), বাগ বা ছোটা বিজনি (আসামের বর্তমান বিজনি), বুড়িগুমা, কালিং ( বর্তমানে আসামের দরং জেলায়), শুরকোল্লা, বংসকা, চাপাঘোরি বা চাপাগুড়ি, চাপাঘামা, বিজনি (বর্তমানে আসামের কামরূপ জেলায়)।

প্রথম এগারোটি জায়গা পূর্বে বেঙ্গল ডুয়ার্স (তিস্তা থেকে মানস পর্যন্ত) ও বাকি সাতটিকে (মানস থেকে ধানসিরি নদী পর্যন্ত) বলা হত আসাম ডুয়ার্স। এখন অবশ্য ডুয়ার্স বলতে তিস্তা থেকে সংকোশ নদী পর্যন্ত এলাকাকেই বোঝায়। ১৮৬৯ সালের পয়লা জানুয়ারিতে জলপাইগুড়ি জেলা গঠিত হবার পর ডুয়ার্সের বেশীর ভাগ অংশই ছিল জলপাইগুড়ি জেলায়। পঁচিশে জুন, ২০১৪ জলপাইগুড়ি জেলা বিভক্ত হয়ে আলিপুরদুয়ার জেলা গঠিত হলে বর্তমানে আলিপুরদুয়ার জেলাতেও ডুয়ার্সের অনেক অঞ্চল সেই জেলার অন্তর্ভূক্ত। 

অন্যদিকে চা-বাগা হল ডুয়ার্সের প্রাণ। দিগন্তবিস্তৃত তরঙ্গায়িত চা-বাগান, চা-বাগানের মাঝে থাকা শেড ট্রি, চা-বাগান শ্রমিকদের চা পাতা ছেঁড়া...পিকচার পোস্ট কার্ড সব যেন!
কিন্তু এই জল-জংলার দেশে চা বাগান এলো কোথা থেকে? এখানে তো শুধু জঙ্গল আর হিংস্র প্রাণী ছিল। সেখানে এত সুন্দর চা-বাগান যার থেকে দৃষ্ট ফেরানো যায় না!
উত্তরটা লুকিয়ে ইতিহাসের পাতায়। 
আসলে চিনের চা মন কেড়েছিল ইউরোপবাসীর, বিশেষ করে ইংরেজদের। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীও সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়ে নি। চিনের সাথে একচেটিয়া ব্যবসায় মুনাফা লুটছিল তারা। কিন্তু অবস্থা পালটাল ক্রমে। অন্য কোম্পানীরাও চিনের সাথে নেমে পড়ল ব্যবসায়। অগত্যা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যেনতেনপ্রকারেণ চাইছিল চা চাষের ব্যবস্থা করতে। ভাগ্যও ছিল সুপ্রসন্ন। ১৮২৩ সালে মেজর রবার্ট ব্রুস আসামের জঙ্গলে আবিষ্কার করলেন চা গাছ। ব্যস বানিয়া ইংরেজ আর দেরী করে নি আসামকে কব্জা করতে। ১৮২৫ সালে আসাম চলে এলো কোম্পানীর অধীনে আর ১৮৩৮ সালে আসামের চা উঠল লন্ডনের আন্তর্জাতিক বাজারে। স্বাদে গন্ধে সেই চা অতুলনীয় হওয়ায় আসাম বা ভারতের চায়ের কদর বাড়তেই লাগল। ইংরেজরাও বুঝে গেল এই চা দিয়েই তাদের ভাগ্য গড়ে উঠতে পারে। অতএব চল ভারত চা বাগান তৈরী করতে।
১৮৪১ সালে ডঃ ক্যাম্বেল দার্জিলিঙে নিজের বাড়িতে চা গাছ পুঁতে সফল হলে দার্জিলিং পাহাড় চা-বাগানে ছেয়ে যেতে সময় নেয় নি বেশীদিন। এক্ষেত্রে মেজর গ্রামলিনের ভূমিকাও বিরাট। কিন্তু ডুয়ার্সও যে চা-বাগানের জন্য উপযুক্ত সেটা বুঝতে সময় লেগেছিল। তাই ডুয়ার্সে চা-বাগান প্রথম তৈরী হয় ১৮৭৪ সালে। অল্পদিনেই ডুয়ার্সও ছেয়ে গেল চা বাগানে আর চা বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে লাগল আজকের ডুয়ার্সে ছড়িয়ে থাকা নানা শহর......

(নিজের পড়া ও ঘাঁটাঘাটির সুবাদে এই তথ্যপ্রাপ্তি। ভুল থাকতেই পারে। অনুগ্রহ করে এই ব্যাপারে আরও কিছু জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।)

ছবি: লেখক


শৌভিক রায়, লেখক, কোচবিহার: 

'জল-জংলার দেশ, দেখবার আছে কী?'
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের এই লাইনটি উত্তরবঙ্গের, বিশেষ করে ডুয়ার্সের, ক্ষেত্রেও যেন প্রযোজ্য ছিল! যদিও 'উদ্বাস্তু` কবিতায় কবি কিন্তু ওপার বাংলাকেই বুঝিয়েছিলেন। 
কিন্তু আসলে কি সত্যিই তাই? না। এরকম ভাবা ভীষণ ভুল হবে। উত্তরবঙ্গে দেখবার এতো কিছু আছে যে, এক জন্মে তা বোধহয় দেখা শেষ হবে না। তবে সে দেখা দেখতে গেলে অবশ্যই  থাকতে হবে এমন একটা চোখ যা ঘরের পাশের শিশিরবিন্দু দেখেও যেমন মুগ্ধ হবে, তেমনি বহু ব্যয় করে বহু দূরের জায়গা দেখেও উদ্বেলিত হবে।
 
একথা ঠিক যে, অসামান্য প্রাকৃতিক পরিবেশ উত্তরবঙ্গের মূল আকর্ষণ। উত্তরে উত্তুঙ্গ হিমালয়, কাঞ্চনজঙ্ঘার ধবল সৌন্দর্য, সবুজ অরণ্যের মোহময়ী হাতছানি, হিংস্র প্রাণীদের ছমছমে সাক্ষাৎ, দিগন্তবিস্তৃত গালিচা সদৃশ চা-বাগিচা, বেগবতী নদী আর সহজ-সরল জীবনযাত্রার মানুষজন...উত্তরবঙ্গকে ভাল না বেসে থাকা যাবেই না! কিন্তু মানুষের সৃষ্টি কি কিছুই নেই? সবটাই কি প্রকৃতিনির্ভর?

আছে। আর যা আছে তা অবশ্যই বিস্ময়। কোচবিহার রাজপ্রাসাদের কথাই ধরা যাক। যারা দেখেছেন তারা জানেন বিশালত্ব, বৈভব ও সৌন্দর্যের এক অসামান্য মিশ্রণ এই রাজপ্রাসাদ। গোসানিমারির ইতিহাস তো আজও অনেকাংশেই অজানা। দার্জিলিঙে হেরিটেজ মর্যাদা পাওয়া টয়ট্রেনও তো মনুষ্যসৃষ্ট। তালিকা দীর্ঘ করা যায় অনেকটাই। তবে আজ এক অন্য কথা। আজ এক সেতুর কথা। 

উত্তরের অজস্র নদীর ওপর সুন্দর সেতুগুলির অন্যতম হল সেভকের করোনেশন ব্রীজ, যা লোকমুখে বাঘপুল নামে পরিচিত।

শিলিগুড়ি শহর থেকে বাইশ কিমি দূরের সেভকে পৌঁছতে শালুগাড়া ও মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি পার হতে হয়। পথের দু'ধারের ঝকঝকে সেনাছাউনি আর সবুজের সমারোহ মুহূর্তেই ভাল লেগে যায়। 
সেভক থেকেই শুরু হিমালয়। পাহাড়ি পথ এঁকেবেঁকে তিস্তাবাজার হয়ে পৌঁছে দেয় কালিম্পং, গ্যাংটক। তিস্তাবাজার থেকে বাঁ হাতের পথে দার্জিলিং যাওয়া যায়। এই পথে লামাহাটা আজকের অন্যতম গন্তব্য। আবার তিস্তাবাজারের আগে রাম্ভি থেকে বাঁ হাতে মংপু ছুঁয়েও পৌঁছানো যায় দার্জিলিঙে।

সেভকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নজরকাড়া। সিকিম থেকে দীর্ঘপথ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে এসে সদানীর বা দিস্তা বা ত্রিস্রোতা বা তিস্তা (এই নামকরণের পেছনের ইতিহাস বলা যাবে আর একদিন) এখানেই সমতলকে স্পর্শ করছে। সেভক থেকে তিস্তার ওপারের মংপং পর্যন্ত রেলসেতু আর পেছনের পাহাড় নিয়ে প্যানোরামা ছবিশিকারীর কাছে বিশেষ লোভনীয়।
 
সেভকের সমতলভূমি থেকে পাকদন্ডী পথে খানিকটা ওপরে করোনেশন ব্রীজের কাছে জাগ্রত সেভকেশ্বরী কালীমন্দির পুণ্যার্থীদের বিশেষ গন্তব্য। ঠিক উল্টোদিকে দেবাদিদেবের মন্দির। সিঁড়ি বেয়ে উঠে দেবদর্শনের সঙ্গে মেলে সেভকের বিস্তৃত ভিউ। কাছেই কলিঝোড়ার অপার্থিব সৌন্দর্য কোনোদিন ভোলা যায় না।

সেভকে তিস্তার  দু'প্রান্তের সংযোগরক্ষাকারী করোনেশন ব্রীজ স্থাপত্য ও নান্দনিকতার এক নিদারুণ নিদর্শন। ১৯৩৭ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জ ও রানি এলিজাবেথের করোনেশন উপলক্ষে শুরু করা এই ব্রীজটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৪১ সালে। ব্রীজের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন তদানীন্তন বাংলার গভর্ণর জন অ্যান্ডারসন। ব্রীজের নকশা করেছিলেন দার্জিলিঙের পূর্ত বিভাগের শেষ ব্রিটিশ এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার জন চেম্বারস। আর নির্মাণকাজে ছিলেন মুম্বাইয়ের মেসার্স জি সি গ্যামন। তিস্তার গভীরতা ও স্রোতের জন্য পিলার তৈরী করা সম্ভব ছিল না বলে 'আর্চ' শেপ বা আকার দিয়ে রিইনফোর্স কনক্রিটে তৈরী হয়েছিল ব্রীজটি। 

ব্রীজ পার করে কিমি তিনেক এগোলেই পাহাড়ের পাদদেশে, তিস্তার ধারে মংপং। ময়না, তিতির, হরিয়ালের ডাকে মুখরিত মংপঙে যে কোনও সময় চলে আসে বন্য পশুরা। মংপংকে পেছনে ফেলে সামনে এগোলে বাগরাকোট, লিস ও ঘিস নদী পার করে ওদলাবাড়ি হয়ে মালবাজার অর্থাৎ ডুয়ার্সের খাসতালুক।

শিলিগুড়ি থেকে এলে সেভককে তাই ডুয়ার্সের পাশাপাশি দার্জিলিং-কালিম্পং-গ্যাংটকেরও প্রবেশদ্বার বলা যায়।

হিমালয়ের নিজস্ব সৌন্দর্য, গাম্ভীর্য, উদারতার ছোঁওয়া যেমন মেলে সেভকে, তেমনি রহস্যময় ডুয়ার্সের কথকতাও যেন তার সারা শরীরে.... (ছবি: লেখক)

 
শৌভিক রায়, লেখক, কোচবিহার:

ফালাকাটার গৌরী টকিজের 'কালকূট' এসেছে।স্কুল কেটে দলে দলে ছাত্রদের ভীড়। বন্ধু বিজু (ভাল নাম বিজয়, ডাকনামে কেউ ডাকতাম না, আড়ালে আবডালে সবাই বলতাম  বেজি) তালপাতার সেপাই, ঢ্যাংঢেঙে লম্বা। টিকটিকির মতো টিকিট কাউন্টারের লোহার জালিতে লেপ্টে গিয়ে ওপর থেকেই লোহার কাউন্টারের জানলায় হাত ঢোকালো। লাইনের সবাই বাধা দেবে কি, সকলেই মহা চিন্তিত। বিজু না অন্যদের টপকে এসেছে, না সাইড দিয়ে হাত ঢুকিয়েছে। তাই এটা কি হবে ভাবতে  ভাবতেই বিজুর টিকিট কাটা সারা। সেদিন সে সত্যিই বিজয়ী। আমাদের, তথাকথিত ভাল ছেলেদের, দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে টিকিট ধরিয়ে দিয়ে লাওয়ারিশ ফ্লিমের অমিতাভের মতো জামাটা বেঁধে সিনেমা হল ঢুকে প'রল, পেছন পেছন নববধূর মতো (টিকিট কাটতে না পারার গ্লানিতে) লজ্জায় আমরাও ঢুকলাম।

  গৌরী টকিজ, আসলে ড্রামাটিক হল। সাবেক জলপাইগুড়ি (বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলা) জেলার প্রথম মহকুমা ফালাকাটার নাটক, জলসা, সিনেমার কেন্দ্র ছিল সবেধন নীলমণি এই গৌরী টকিজ...আমাদের একসময়ের সব পেয়েছির আসর। ছোটবেলায় 'হীরে মানিক' (কি কান্নাটাই না কেঁদেছিলাম দেখতে দেখতে!), 'বিদ্যাসাগর' ( বিদ্যাসাগরের ছবি আঁকা একটা খাতা দিত দেখতে গেলে) 'নানহে ফরিস্তে', 'রামায়ণ' ইত্যাদি ছবি ছাড়া কোনো অনুমতিই পাওয়া যেত না অন্য ছবি দেখবার! বয়ঃসন্ধিতে 'নদিয়া কে পার' দেখে  প্রণব পড়লো নায়িকা সাধনা সিংহের প্রবল প্রেমে। আর 'দুটি পাতা'র মিতা দেবরায় আমার স্বপ্নে ঘুরে ফিরে আসতে লাগলো। যাহ'ক হ্যাংওভার কাটতেই বেশ পাকা দর্শক হয়ে উঠেছিলাম আমরা। পুটনের একটু সমস্যা হ'ত। কেননা ওর বাবা ছিলেন ম্যানেজার। একটু আড়ালে আবডালে ওকে ম্যানেজ করতে হ'ত আর কি! তবে বিটকেল কিছু ব্যাপারও হ'ত। যেমন একবার ম্যাটিনি শোতে ছবি দেখতে ঢুকে অন্ধকারে সিট বুঝতে না পেরে বাপি,  খুকু দিদিমণির কোলে ব'সে প'রেছিল। ভাগ্যিস দিদিমণি আমাদের চিনতে পেরেছিলেন, তা না হলে সেদিন আর দেখতে হ'ত না! একইরকম ভাবে বিভাস একদিন ওই ম্যাটিনি শোতে ঢুকে কিছু ঠাহর করতে না পেরে এক লোককে, 'দাদা কতক্ষণ শুরু হয়েছে?' এই প্রশ্ন করে উত্তর পেয়েছিল, 'কি রে? তুই স্কুল যাস নি? দাঁড়া আজ টের পাবি...।' লোকটা আর কেউ নন, বিভাসের ছোটমামা! আর সেদিন বিভাসের না হয়েছিল সিনেমা দেখা, না জুটেছিল খাওয়া। বনদপ্তরের পার্কটা তখন ছিল না। তাই সিনেমা হলের পিছনে ব'সে ডায়লগ শোনার জন্য বেশ ভীড় জমতো। বোধহয় সব শহরেই এটা কমবেশি ছিল। আবার ঐ ড্রামাটিক হলে নানা অনুষ্ঠানে আমরাই ব্যাজ-ট্যাজ লাগিয়ে দর্শকদের বসাতাম। মজা লাগত এটাই, যে সিটগুলোকে আমরা সিনেমা দেখার সময় পাত্তা দিতাম না, সেগুলিই নাটক বা অন্য অনুষ্ঠানে মহার্ঘ হয়ে উঠত। মনে পড়ছে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হসপিটালের চিকিৎসক শ্রী রজত ঘোষের কথা। ছোটবেলায় ওঁরা চব্বিশ কিমি দূরের বীরপাড়া থেকে ফালাকাটায় গৌরী টকিজে ছবি দেখতে আসতেন। আসলে সেসময় ডুয়ার্সের বেশির ভাগ জনপদেই সিনেমা হল বস্তুটি ছিল না। সেদিক থেকে ফালাকাটার গৌরী টকিজ ছিল বিরাট ভরসা।

গৌরী টকিজ আজও আছে। কিন্তু এই প্রজন্মের সঙ্গে সিনেমা হলের সখ্যতা  গড়ে ওঠে নি, উঠবেও না। আমাদের কাছে সিনেমা হল বড় হয়ে ওঠার চিহ্ন ছিল। জীবনের অনেকগুলি  বছর নিষিদ্ধ ছিল ব'লেই হয়তো সিনেমা হল টানত বেশি। আজকাল সবাই ছোট থেকেই বড়...বাড়ির ছোট সদস্যেরও মতামত গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়। আমাদের অভিভাবকরা? কম বেশি সকলেই ছিলেন একনায়ক। কিন্তু এই একনায়কত্বের কারণ ছিল আমাদের চরিত্রকে মজবুত করা, আর সেই মজবুত করার জগতে সিনেমা হল ছিল ব্রাত্য।

কিন্তু আদৌ কি ব্রাত্য করতে পেরেছিলেন? না মনে হয়। তাই গৌরী টকিজ রমরম ক'রে চলত তার ভাঙাচোরা চেহারা নিয়ে। আমরা আমাদের সেই গৌরী টকিজকে ভীষণ ভালবাসতাম যে!



fiture
শৌভিক রায়, লেখক, কোচবিহার:  বসন্তবৌরি যেন স্নান শেষে গা মোছেনি! আমলকীর ঝিরিঝিরি পাতায় কেউ ছিটিয়েছে জল অঞ্জলি ভরে। সবুজ মাঠে জলাশয় তৈরী হয়েছে আপনাআপনি। আকাশের কালোর সাথে বৈপরীত্য রেখে সবুজের দল অদ্ভুত রঙ এনেছে। ঝকঝকে চারিদিক। মাঝেমাঝে কালো-সবজে-সাদা পাখির আনাগোনা মাঠেঘাটে। লম্বা পায়ে হেঁটে বেড়ানো আর সতর্ক চোখে খুঁজে বেড়ানো, যদি মেলে একটা দু'টো গেড়ি-গুগলি। মিলেও যায়। বৈকুণ্ঠপুর,চিলাপাতা, জলদাপাড়া বা বক্সার অরণ্যের আদিম গাছগুলোর গা দেখলেই বোঝা যায় স্নানে তাদের কি পরিতৃপ্তি! কালো হয়ে উঠেছে গা একদম। আবলুশ কালো, জল পেয়ে পেয়ে। নদীরা সব ভয়ঙ্কর সুন্দরী যেন! কি তাদের মনোহর রূপ। থৈ থৈ যৌবন উপচে পড়ে ভেজাচ্ছে চারদিক। যে দেখছে পাগল হচ্ছে সে-ই! নদীর রূপলাবণ্যে মরণ মরণ দশা মেঘ-যুবকের। মিলনের তীব্র স্পৃহায় তাই তো কেবল সে ঝরতে চায়, মিশতে চায় নদীর সাথে। তাদের মিলনে আসছে বান। ফুঁসলে ওঠা নদীকে বিদ্ধ করছে মেঘ-যুবক তার বৃষ্টি মিলনে। মিলন শেষে ভরা সুখে বয়ে চলা। 
আপাত শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চলবে খুনসুটি আবার কখন মিলন হবে ভেবে। লজ্জায় তাই পার ভাঙবে নদী। বেহায়া মেঘ-যুবক খলখল হেসে আবার মাতবে অভিসারে! তরাই-ডুয়ার্সে নেমেছে বৃষ্টি। বৃষ্টি গাছের পাতায়, বৃষ্টি পায়ের পাতায়। কখনো পূর্ণ উদ্যমে আকাশের আলো সাথী করে ঝরছে বৃষ্টি, কখনো টুপটাপ একা একা। কখনো ঝিরিঝিরি সে, কখনো অঝোরে। বৃষ্টির গান চারিদিকে, যেন মন্ত্রোচ্চারণ, যেন এক বোবা অবুঝ কান্না। সারারাত বৃষ্টি, সারাদিন বৃষ্টি। ঋতুমতী প্রকৃতি। প্রকৃত উর্বরা। পুরুষ-প্রকৃতির ঔরসে বীজ ধারণে প্রস্তুত সে। জন্ম দেবে কিছুদিন পর তার নিজস্ব ফসল। লালন করবে সেই ফসলে তার শ্রেষ্ঠ সন্তান মানুষকে। প্রয়োজন তার তাই ঋতুমতী হবার বারবার। ঝরুক তাই বৃষ্টি। রিমঝিম ঝরুক, টুপটাপ ঝরুক, সারা দিনমান ঝরুক। বর্ষা সাথী এক সে প্রিয়া। জীবন প্রিয়া। জীবন সাথী। তাকে নিয়েই বর্ষামঙ্গল, তাকে নিয়েই বর্ষায় অবগাহন। হাত ধরে তাকে নিয়ে যাওয়া সবুজ গ্রামের ছোট্ট নীড়ের মাটির দাওয়ায়, যেখানে হাত বাড়ায় ছোট্ট শিশু বর্ষা ধরবে বলে। আর আদুরে বর্ষা সত্যি দিয়ে যায় আলতো চুমু তার ফোলা ফোলা তালুতে। প্রিয়ার সাথে পাড়ি কেবল পা ভেজানো ছোট্ট নদীতে হাত ধরাধরি করে বর্ষা মাথায়।
দে ছুট জলের মাঝে সবুজ মাঠে, হেসে গড়াগড়ি। ছলাৎছলাৎ জল, থুপথাপ জল, জলের বাদ্যে বর্ষাগান। জলই জীবন, জলই প্রাণ। বর্ষা ঝরে। আকুল বর্ষায় আনচান সব। প্রতিটা স্পন্দনে বর্ষাগীত। বর্ষার আবহে জাগে প্রাণ। বর্ষা আমার, বর্ষা তোমার। বর্ষা থাকুক গানে, বর্ষা থাকুক প্রাণে। বর্ষায় জাগুক সব। ধুয়ে যাক মলিনতা, ধুয়ে যাক কাঠিন্য। বর্ষা আসুক জীবন ভরে। বর্ষা পুরুষ হয়ে সৃষ্টি করুক প্রাণ। বর্ষা দিক ভালবাসার গান।

fiture
স্বরূপ গুপ্ত, লেখক, কোচবিহার: উত্তরবঙ্গকে জনজাতির দেশ বললে বোধহয় ভুল বলা হয় না। দার্জিলিঙের পাহাড় থেকে শুরু করে কোচবিহার-আলিপুরদুয়ার-জলপাইগুড়ি-সহ দুই দিনাজপুর বা মালদহতেও তাদের অস্তিত্ব। কলকাতা বা দিল্লী-মুম্বাইয়ের মতো মহানগর না থেকেও উত্তরবঙ্গ এখানেই কসমোপলিটান। বিবিধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিন্তু ধীমালরা সামান্য হলেও আলাদা। উত্তরের অন্যতম প্রাচীন এই জনগোষ্ঠীটিকে নিয়ে আমরা সকলেই কেন যেন বড্ড উদাসীন। 'অতি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী` বা ডিমিনেটিভ গ্ৰুপ যেন তাদের একমাত্র পরিচিতি। অথচ উত্তরবঙ্গের জনজাতির ইতিহাসে তাদের অবস্থান ভোলার নয়। সম্ভবত 'হিমাল' শব্দটি থেকে ধীমাল কথাটির উৎপত্তি। এদের আদি নিবাস উত্তর ও উত্তর-পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশ। অনেকের মতে খান-ডনক-বাকা নামের এক কিরাত পুরুষের প্রথম সন্তান ধীমালের নাম অনুসারেই এই জনগোষ্ঠীর পরিচিত। ভোটব্ৰহ্ম গোষ্ঠীর শাখা ও কিরাত প্রশাখার অন্তর্গত উপজাতি বলেও তারা চিহ্নিত হয়েছেন। অতি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ধীমালরা অতীতে স্থায়ীভাবে কোনো একটি জায়গায় বাস করতেন না। তিন-চার বছর পর পর স্থান ত্যাগ করে অন্য জায়গায় চলে যাওয়াটা ছিল তাদের রেওয়াজ। তবে ছেড়ে যাওয়া স্থানে ফিরে এসে আবার কিছুদিন বসবাস করার অভ্যাসও বিদ্যমান ছিল তাদের মধ্যে। আসলে একদা গভীর জঙ্গলে গৃহ নির্মাণে অভ্যস্ত ধীমালরা জঙ্গল কেটে চাষ করতে অভ্যস্ত ছিলেন। তবে এক জমিতে দুবার চাষের পদ্ধতি তাদের জানা ছিল না। তাই ফেলে আসা জমিতে জঙ্গল জন্মালে আবার ফিরে এসে তারা জঙ্গল কেটে পুড়িয়ে ফেলতেন এবং ছাই ব্যবহার করতেন সার হিসেবে। তুলাচাষে ধীমালদের দক্ষতা ছিল অনস্বীকার্য। সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ধীমালদের কোনোদিন চা-বাগানে বা বন-বিভাগের চাকরিতে দেখা যায় নি। যদিও অনেকে বলেন ধীমালদের মধ্যে আরও কিছু গোত্র বা উপগোত্র রয়েছে তবু তালিপা, নুনিয়া, যোগী, কাশের, থারু, দোংভো, লাতের, অংলাইটি, নুনিয়া, ডিং, অগ্নিয়া, রাথুম, লেবমত, তেগরে ইত্যাদি চোদ্দটি গোত্রে বিভক্ত করা যায় ধীমাল সমাজকে। তাদের মধ্যে সমগোত্রে বিবাহ যেমন নিষিদ্ধ তেমনি অন্য কোনো জনজাতির কন্যাকেও তারা বিয়ে করেন না। বিবাহের ক্ষেত্রে ধীমাল সমাজের একটি ব্যাপার উল্লেখযোগ্য যে কন্যাদের ২১-২২ বছরের আগে বিবাহ না হলেও পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে বিবাহের বয়স কিন্তু ১৬-১৭। আসলে ধীমাল সমাজে পুরুষের হার শতকরা ৬১। মহিলাদের সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকায় সম্ভবত এই প্রথাটি চালু হয়েছিল। এখানে বলা দরকার যে, ২০১০ সালের জনগণনা অনুসারে বর্তমানে ধীমালদের সংখ্যা ৯৪৮। ২০০০ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ১০৭৪। ধীমাল জনগোষ্ঠীর এই ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যা কিন্তু সত্যি উদ্বেগের কারণ।
পরিবর্তিত পরিস্থিতে হিন্দু দেবদেবীরা ক্রমশ ধীমাল সমাজে জায়গা করে নিলেও ধীমালদের 'গারাম-পূজা' সমগ্র মানব প্রজাতির মঙ্গল কামনায় করা হয়ে থাকে। এই পূজাতে নিজেদের গ্রাম তো বটেই, ডাক পান অন্যান্য জায়গার ধীমালেরাও। 'হরিয়াতা' বা তুলা ফসলকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত পূজা বর্তমানে তুলাচাষের অভাবে বন্ধ বললেই চলে। তবে বর্ষাকালের 'আষাঢ়ী-ঘাসারি পূজা ', জৈষ্ঠ্য মাসের 'জেঠ পূজা' এখনও প্রচলিত। কৃষিকেন্দ্রিক 'গাভীপুজা', অসুখবিসুখ দূরে রাখার জন্য 'পশ্চিমপাকা` ইত্যাদি পূজাও চালু ধীমাল সমাজে। 'দেওথি' বা প্রধান পুরোহিতের সাথে বয়স্ক ব্যক্তি বা 'ধামী` পূজার কাজ সামলালেও প্রধান পুরোহিতের মর্যাদা পান না। ধীমালদের আদি পুরুষ দেবতা 'দানতা বেরাং' ও দেবী নারী 'দানতা ওয়ারাং' ধীমাল সমাজ থেকে সম্পূর্ণ মুছে না গেলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে সেভাবে পরিচিত নন। এদের চাইতে দুর্গাপূজা, মনসাপূজা, গাজন ইত্যাদির আকর্ষণ বেশি বর্তমান ধীমালদের কাছে। ভোটব্ৰহ্ম গোষ্ঠীর শাখা হওয়ার সুবাদে ধীমালদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। অনেক মনে করেন যে ধীমালদের ভাষার সঙ্গে টোটো ভাষার সাদৃশ্য প্রচুর। কিন্তু কালের গতিতে সে ভাষা আজ লুপ্তপ্রায়। আজকের ধীমালেরা সাদ্রী, রাজবংশী, বাংলা ইত্যাদি ভাষায় কথা বলে অভ্যস্ত। বর্তমান প্রজন্ম ধীমাল ভাষা জানে না বলা যেতেই পারে। একটি ভাষার অপমৃত্যুর কারণ গবেষণার বিষয় হলেও বলা যেতে পারে যে, ধীমালদের যাযাবর জীবন এর জন্য দায়ী। তারা যেখানে বসতি স্থাপন করেছে সেখানে বৃহত্তর অন্য জনগোষ্ঠীর প্রভাবে নিজেদের ভাষাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। পরবর্তীতে অন্য ভাষা মাধ্যমের বিদ্যালয়ে ধীমাল শিশুরা বিদ্যাশিক্ষা লাভ করতে শুরু করলে নিজেদের ভাষা লুপ্ত হতে সময় নেয় নি। আজ হাতে গুনে বলে দেওয়া যায় কতজন ধীমাল নিজেদের ভাষা জানেন। প্রধানত দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলার কিছু অংশে ধীমালদের বাস হলেও, জলপাইগুড়ি জেলায় তাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ধীমাল জনসংখ্যার এই হ্রাসের কারণগুলি সুস্পষ্ট নয়। সম্ভবত ১৮৫০ সাল থেকে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে। ১৮৫০ সালের পূর্বে ভুটানরাজ প্রদত্ত 'মল্লিক' উপাধিধারী ধীমালেরা তহশীলদারের প্রভূত ক্ষমতা ভোগ করতেন। কিন্তু ১৮৫০ সালে তরাই অঞ্চল ইংরেজদের অধীনে এলে প্রচুর পরিমানে অন্য জনজাতির লোকেরা এসে ধীমালদের পেছনে ঠেলে দেয়। 
তরাই-ডুয়ার্সের অরণ্য থেকেও ধীমালরা সরে যেতে বাধ্য হয় কেননা অরণ্যাঞ্চল সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়েছিল। ধীমালদের বাসস্থানের সমস্যা প্রকট হয় একের পর এক চা-বাগান প্রতিষ্ঠার ফলে, কেননা চা-বাগান প্রতিষ্ঠার জন্য ক্রমাগত অরণ্য নিধন করা হলে নিজেদের জায়গা হারায় ধীমালেরা। নিজেদের জায়গা, জমি, ভাষা, ধৰ্ম সব হারালেও এক অদ্ভুত কারণে ওবিসি তকমা ছাড়া আর কিছু জোটে নি ধীমালদের কপালে। প্রখ্যাত নকশাল নেতা কদম মল্লিক ও খুদন মল্লিকের ধীমাল জনগোষ্ঠীর এই দুর্দশার কারণ ১৯৪১ সালের জনগণনায় তাদের অনুপস্থিতি। এর সুস্পষ্ট কারণ আজও অজানা এবং তা শোধরানোর কোনো প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায় না। ১৮৪৯ সালে প্রথম হজসন সাহেব ধীমালদের উল্লেখ করলেও মনে করা হয় ১৬২৮ পরবর্তী সময়ে এরা তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলে থাকতে শুরু করেন। ডাল্টন, হান্টার, রিজলি প্রমুখদের লেখাতে ধীমালদের উল্লেখ প্রমান করে এই জনগোষ্ঠীর প্রাচীনত্ব। অনেককিছু হারিয়ে, সরকারি আনুকূল্যে বঞ্চিত থেকে ধীমালরা এভাবে আর কতদিন টিঁকে থাকতে পারবেন এখন সেটাই বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। উত্তরের অন্য সব গোষ্ঠীরা যে সুযোগ-সুবিধে পাবে ধীমালরা তা পাবেন না কেন সেটা আজ লাখ টাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের সঙ্গীন অবস্থার জন্য আমাদের উদাসীনতাই দায়ী। দেওয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া এই আদিম জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা বাঁচাতে না পারি তবে কিন্তু ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। 


fiture
স্বরূপ গুপ্ত, লেখক, কোচবিহার: পর্যটন শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ডুয়ার্স-সহ উত্তরবঙ্গে প্রতি বছর বাড়ছে টুরিস্টের সংখ্যা। টুরিস্টদের পছন্দের তালিকায় দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং ইত্যাদি রয়েছে একেবারে প্রথম সারিতে। জলদাপাড়া, লাটাগুড়ি, চিলাপাতা, চাপরামারি, বক্সা, জয়ন্তী ইত্যাদিও পিছিয়ে নেই। আজকাল প্রায় সারা বছর এসব জায়গায় টুরিস্টেরা ভীড় করছে। জুনের ১৫ থেকে সেপ্টেম্বরের ১৫ পর্যন্ত বর্ষা ও বন্যপ্রাণীদের মিলনের সময় হওয়ার জন্য জঙ্গলে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও লোকজনের বেড়াতে আসার খামতি নেই। ভরা বর্ষাতেও তাই দার্জিলিং-সহ উত্তরবঙ্গের পথেঘাটে টুরিস্টদের ভীড় চোখে পড়ে আজকাল। টুরিস্টদের এই ভীড় উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। শিল্পহীন উত্তরবঙ্গে পর্যটনের এই প্রসার বহু লোককে কর্মসংস্থান যোগাচ্ছে। পর্যটনকে ঘিরে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করছে। ফলে বেড়েছে হোটেল থেকে শুরু করে হোম স্টে-এর সংখ্যা, বেড়েছে যাতায়াতের জন্য গাড়ির সংখ্যাও। নিত্য নতুন নানা জায়গা আবিষ্কার হয়ে চলেছে। টুরিস্টরা পৌঁছে যাচ্ছেন এমন সব জায়গায় যা আগে কোনোদিনই ভাবা সম্ভব ছিল না। আর এখানেই কিছু প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। উৎসাহ অতি-উৎসাহে পরিণত হয়ে আখেরে খারাপ হচ্ছে না তো? প্রশ্নটা আসছে সঙ্গত কারণেই। একটু দেখে যাক। প্রথমেই ধরা যাক দার্জিলিঙের কথা।
গত শতকের সত্তর-আশির দশকের দার্জিলিঙকেও যারা চিনতেন তারা কিন্তু আজকের দার্জিলিঙের সঙ্গে তার কোনো মিল পান না। দার্জিলিঙে হু হু করে বেড়ে চলেছে বাড়িঘরের সংখ্যা। এর মধ্যে হোটেলের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। সমতল থেকে ক্রমাগত গাড়ি ছুটছে দার্জিলিঙের দিকে। ফলে যানজটে সৃষ্টি হচ্ছে এক ভয়াবহ অবস্থা। ভুক্তভোগী মাত্র জানেন যে, কী নিদারুণ হতে পারে সে দশা! এর ওপর রয়েছে জলের সমস্যা। দিনের পর দিন টুরিস্টের সংখ্যা বৃদ্ধিতে আজকাল মিরিক পথে সীমানা, শুকিয়াপোখরি, লেপচাজগত, ঘুম ইত্যাদি সর্বত্র হোম স্টে'র ছড়াছড়ি। এককালের শুনশান নির্জন রাস্তার সেই পথ আজ কেবল স্বপ্ন। একের পর এক গাড়ির আওয়াজ, হর্ণ, চিৎকার ও অতি উৎসাহে অদ্ভুত কিছু করবার তাগিদ পাহাড়ের নির্জনতাকে একেবারেই বিনষ্ট করে দিয়েছে। ভোরের টাইগার হিল বা সকালের বাতাসিয়া লুপ দেখলে যে কেউ মেলা বসেছে ভেবে ভুল করবে। ওদিকে লেবং অবধি বাড়িঘর প্রায় ঠেকে গেছে। সন্ধ্যার ম্যালে বসবার ফাঁকা জায়গা মেলে না। কেভেনটারস বা গ্লেনারিজেও ভিড় গিজগিজ করছে। অনেকটা একই চিত্র লাটাগুড়িতে। বিখ্যাত এই অরণ্যকে ঘিরে এখন 'এক সে বড় কর এক' হোম স্টে'র ছড়াছড়ি। মজার কথা হল যে, সেগুলি খালি পাওয়া দুষ্কর, বরং বুকিং করতে হয় বহু আগে থেকে। পিছিয়ে নেই জলদাপাড়া, জয়ন্তী বা চিলাপাতাও। অত্যাধিক টুরিস্ট সমাগমে অনেক সময় হোম স্টে-গুলি প্রতিশ্রুত সেবা দিতে না পারায় বিবাদও বাঁধে এবং কখনও তা এতটাই উচ্চকিত যে, অরণ্যের শান্তি বলে কিছু আর থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু টুরিস্টের অতি আগ্রহ। এর ফলে তারা যেমন বন্যপ্রাণকে বিরক্ত করছে, তেমনি প্রকরান্তরে নিজেদের বিপদও ডেকে আনছে। আসলে জঙ্গলের একটি নিজস্ব নিয়ম আছে। সে নিয়মকে না জানলে বা না বুঝলে যা হওয়ার তাই-ই হচ্ছে। টুরিস্টদের এক শ্রেণীর মধ্যে সচেতনতার অভাব আবার অন্য বিপদের সৃষ্টি করছে। জঙ্গল বা পাহাড়ের মতো জায়গায় প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার একেবারেই উচিত না। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বন্যপ্রাণেরাও বিপদগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু আজ, পাহাড় তো বটেই, ডুয়ার্সের সবুজ অরণ্য এই দূষণের শিকার হচ্ছে নিত্যদিন। ভাবতে অবাক লাগে যে, এসবের জন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তো দূরের ব্যাপার, সামান্য সাবধান করার ব্যাপারটিও নেই। তাই জল খেয়ে প্লাস্টিক বোতলটিকে জঙ্গলে ছুঁড়ে ফেলার কাজটি করতে স্থানীয় বা বহিরাগত সকলেই একরকম। কারো কোনো হেলদোল আছে বলে মনে হয় না। বারংবার নিষেধাজ্ঞাও এক শ্রেণীর চালককে গাড়ির হর্ণ অযথা বাজানো থেকে বিরত করতে পারে নি। আবার জঙ্গল বা পাহাড় ঘেঁষা পিকনিক স্পটে তারস্বরে মাইক বাজিয়ে প্রকৃতিকে ধর্ষণ করতে দেখা যায় প্রায় সর্বস্তরের লোককে। এই শব্দ দূষণ তে অত্যন্ত ক্ষতিকারক তা বুঝবার বোধটুকুও লোপ পেয়েছে বলে মনে হয়। 
এই ব্যাপারে পিকনিক করতে আসা লোকজন যেমন দায়ী, তেমনি এই পিকনিক স্পটগুলির দায়িত্বে যারা আছেন তারাও সমান দায়ী। সাধারণত, কোনো নদী বা ঝোরার পাশে এই জায়গাগুলি বেছে নেওয়া হয় পিকনিক করবার জন্য। পিকনিক শেষে বর্জ্য ফেলা হয় সেই নদী বা ঝোরাতেই। এই বর্জ্যের মধ্যে প্লাস্টিক থাকায় নদী বা ঝোরাটিরও নাভিশ্বাস ওঠে। অদূর ভবিষ্যতে সেই প্রবাসটির কী দশা হতে পারে তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। পর্যটন প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তাই একান্ত দরকার সচেতনতা। এই সচেতনতা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বা বলে কয়ে আনা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন বোধের। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা একটা বোধহীন সমাজে বড় হচ্ছি আর আমাদের দশা হয়েছে কালিদাসেরই মতো...যে ডালে বসেছি সেই ডালটিকেই কাটছি। 


Fiture
স্বরূপ গুপ্ত লেখক,  কোচবিহার:  কবি বলেছেন 'Water water everywhere/But not a little drop to drink...' অবস্থা এতটা সঙ্গীন না হলেও কমও নয়। বলছি জয়ন্তীর কথা। বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতর থাকা অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জয়ন্তী পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। বক্সার অরণ্যে কার-সাফারি, খানিক দূরের সান্তালাবাড়ি থেকে বক্সা ফোর্ট ও পাহাড়ি হ্যামলেট চুনাভাটি বা লেপচাখা ট্রেক করতে দলে দলে পর্যটক ফি বছর ভীড় জমান জয়ন্তীতে। জয়ন্তী নিজেও কম যায় না। কার-সাফারি বাদে পুখুরি লেক অবধি ট্রেক বা স্ট্যালেগমাইটের মহাকাল গুহা দর্শনের জন্য শুধুমাত্র জয়ন্তীকেও বেছে নেন বহু লোক। এবাদেও রয়েছে নদীর ওপারে ফাসখাওয়া ও জয়ন্তী, তুড়তুড়ি চা-বাগানের সবুজ বিস্তার, হাতিপোতা, ভুটান ঘাটের অপার্থিব সৌন্দর্য। জয়ন্তী অভিমুখে বক্সা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টে ঢুকবার মুখে রাজাভাতখাওয়ার আকর্ষণও কম নয়। সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদারের উদ্বোধন করা নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার, নার্সারি, পানিঝোরা, পাম্পুবস্তী, খানিক দূরের ডিমা নদী ইত্যাদি নিয়ে রাজাভাতখাওয়াও অনন্য। তাই জয়ন্তী ও তৎসংলগ্ন এলাকাগুলি দেখবার জন্য দিনদিন বাড়ছে পর্যটকের সংখ্যা। পাশাপাশি, অত্যন্ত প্রাচীন এই জনপদগুলির নিজস্ব জনসংখ্যা সংখ্যা বিচারে বিরাট না হলেও নেহাত কম নয়। অতীতে জয়ন্তী নিজেই ছিল ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে চলত হাতি কেনাবেচা। জয়ন্তীর পিলখানা আজও সে সাক্ষ্য বহন করছে। ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই বাঁধলে ভুটানের হাত থেকে মহাকাল মন্দির এলাকাটি ছিনিয়ে নিয়েছিল ইংরেজরা। কিন্তু পবিত্র তীর্থক্ষেত্রকে নিজেদের দখলে রাখতে জয়ন্তীর সঙ্গে মহাকাল মন্দির এলাকার হাতবদল করে ভুটানিরা। তখন থেকেই জয়ন্তী ইংরেজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। জয়ন্তী-সহ বক্সার বনজ সম্পদে মোহিত ইংরেজরা যতটা পেরেছিল লুন্ঠন চালিয়েছিল দামী কাঠ ও অন্যান্য জিনিসের জন্য। গত শতকের প্রথম দিকে আলিপুরদুয়ার থেকে রেলপথও বসিয়েছিল তারা, যদিও আজ তা বিলুপ্ত। আজকের জয়ন্তী একটি ছোট্ট জনপদ। চারদিকে জঙ্গলের মধ্যে কিছু বাড়ি, কিছু হোম স্টে, নদীর ধারে টুরিস্ট লজ, বনদপ্তরের অফিস, এস এস বি ক্যাম্প, খাওয়ার একটি দু'টি হোটেল এবং প্রাইমারি ও হাই স্কুল ছাড়া আর কিছু নেই। উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা ও আধুনিক অন্যান্য যে কোন সুযোগসুবিধার জন্য জয়ন্তীবাসীকে নির্ভর করতে হয় প্রায় তিরিশ কিমি দূরের জেলা শহর আলিপুরদুয়ারের ওপর। অতীতে ব্রীজের অভাবে নদীতে জল কমবার অপেক্ষায় থাকতে হত তাদের জেলাশহরে বা রাজাভাতখাওয়ায় আসবার জন্য। আজ সে অবস্থা পালটেছে ঠিকই কিন্তু মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জলের জন্য জয়ন্তীকে প্রতিনিয়ত ভুগতে হচ্ছে।
মজা হচ্ছে এটাই যে, জয়ন্তীতে বর্ষাকালে জলের অভাব নেই। কিন্তু তা পানযোগ্য নয়। ভুটান পাহাড়ে বৃষ্টি হলেই জয়ন্তী-সহ অন্যান্য জলধারা দুকূল ছাপায়। কেননা জয়ন্তী নদীতে পাথর তোলার কাজ সরকারীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদীবক্ষ দিনদিন উঁচু হয়ে উঠছে। এই মুহূর্তে তা এতটাই উঁচু হয়ে গেছে যে, সামান্য বৃষ্টিতেও জল চলে আসছে লোকালয়ে। এর মধ্যেই আলিপুরদুয়ারে একরাতে চারশো মিমি বৃষ্টি হয়ে গেছে। বিগত এক সপ্তাহ ধরে লাগাতার বৃষ্টি চলছে। আবহাওয়া দপ্তর আগামী তিনদিন ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা করছেন। এরকম অবস্থায় জয়ন্তীর কী অবস্থা হতে পারে তা বোঝাই যাচ্ছে। আবার একদম উল্টো চিত্র দেখা যায় গ্রীষ্মকালে। জয়ন্তী নদী তখন পরিণত হয় তিরতিরে এক প্রবাহে। আদৌ জল আছে কিনা বোঝা যায় না। জয়ন্তী জনপদে পানীয় জল কোনভাবে পাওয়া গেলেও অন্যান্য কাজের জন্য যথেষ্ট জলের অভাব দেখা যায়। এই সময়ে ঠেলায় ড্রামের পর ড্রাম এনে জল বহন করার চিত্র প্রমাণ করে যে কতটা কষ্টে থাকতে হয় এখানকার মানুষকে। বন্য প্রাণীর আক্রমণের আশঙ্কা, হস্তীকূলের যখনতখন লোকালয়ে চলে আসা, মোবাইল টাওয়ার ঠিক মতো না পাওয়া, পড়াশোনা বা চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট তবু বা যা মেনে নেওয়া যায়, মানা যায় না জীবনের অন্য নাম জলের এই অভাব। তবু জয়ন্তী নিজের মতো হাসি মুখে আপ্যায়ণ করে তাদের কাছে আসা পর্যটকদের।
তাদের মুখের প্রশান্তি দেখলেই খুশী এখানকার সরল মানুষেরা। অরণ্য তাদের কষ্ট সহ্য করতে শিখিয়েছে, শিখিয়েছে নিজের কষ্ট চেপে রেখে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে।