Articles by "রূপালী উষ্ণউড"
Showing posts with label রূপালী উষ্ণউড. Show all posts

মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও লেকচারার, আহমেদাবাদ:

অতি সম্প্রতি কাগজে একটা খবর দেখে চমকে গেলাম, এখান থেকে খানিক দূরে নাদিয়াড নামে এক জায়গায় এক দম্পতি (জাতে সোনার, পদবী সোনি) প্রতিবেশী ২৯ বছরের মেয়েটিকে খুন  করেছেন, গলার সাত ভরি ওজনের একটা সোনার চেইনের লোভে। মেয়েটি সাউথের, স্বামীর বাসনের ব্যবসা, ঘুরে ঘুরে কাজ। অনেক রাতে বাসায় আসেন। সোনি দম্পতি রান্নার ব্যবসা করে, হোম ডেলিভারি, কভিডের পরে কাজ ভালো চলছে না।সম্প্রতি ধার দেনা করে জর্জরিত।

মেয়েটি মাঝে মাঝে রান্না শিখতে আসত, সেদিন তাকে সন্ধ্যের পর ডেকে পাঠায় সোনিরা। তারপরে মাথায় আঘাত করে জলে বডি ফেলে আসে। 

পুরো ঘটনার মধ্যে নতুনত্ব সোনি দম্পতি "দৃশ্যম" মুভি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ঠিক সেভাবেই ঘটনা সাজিয়েছেন। খুনের দিন তারা বাড়ি ছিলেন না, সপরিবারে ঘুরছিলেন, টিকিট আছে, সাক্ষী আছে। পুলিশ থমকে গেছিল ঠিকই কিন্তু বডি ভেসে উঠল তিন দিনের মাথায়, মাটিতে পুঁতে দিতে পারেনি। 

মেয়েটির স্বামী পুলিশে রিপোর্ট লিখিয়েছিল, তারপর জলে ডুবে আত্মহত্যা করেছে ভেবে মনের দুঃখে সাউথে ফিরে যায়। কিন্তু পুলিশ তো আর মুভির পুলিশ নয়, ধরা পরে গেছে সোনি দম্পতি।

আমার প্রশ্ন মুভি থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া নতুন কথা নয়, কিন্তু ক্রাইম মুভি দেখে ক্রাইম করতে উৎসাহিত হলে কিন্তু সেটা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। 

আমি নিজে ক্রাইম থ্রিলারের ভক্ত, সমস্যার সমাধান করতে ভালই লাগে, দৃশ্যমেও সহানুভূতি ছিল নায়কের ওপর, লাচার বাবা! কিন্তু পুলিশকে বোকা বানানো অবধি ঠিক আছে কিন্তু ক্রাইম করে পার পাওয়া যায় এই মেসেজ যদি নিম্ন মধ্যবিত্ত, অর্থকষ্টে জর্জরিত মানুষরা খড় কুটোর মত আঁকড়ে ধরে, তবে সেটা বোধহয় ঠিক নয়। এক্ষেত্রে মুভি বানানোর সময় পরিচালক থেকে গল্পকার সবারই সেটা মাথায় রাখা উচিৎ। 

আমি বলছি না রাজা হরিশ্চন্দ্র দেখাতে, "কিন্তু চুরি করা মহাবিদ্যা যদি না পড়ো ধরা অথবা খুন করতেও পারও কিন্তু প্রমাণ লোপাট করতে হবে সঠিক ভাবে।" এমন মেসেজ ছড়ালে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে কিন্তু আকছার। 

স্বল্প বুদ্ধির মানুষ মুভিটি কোন মানের, তার গুণগত মান কত খানি এসব তলিয়ে ভাবেন না, মরাল অফ দি স্টোরিটুকুই গ্রহণ করে বোধহয়, তাই এই ট্রেন্ডটা মুভির মত গণ মাধ্যমে বেশি না আসাই ভালো মনে হয়। 

আসলে মুভির চরিত্রটি অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের হওয়ায় বোধ হয়, দর্শক একটু বেশিই একাত্মতা অনুভব করে ফেলেছেন। মনে পড়ে গেল থ্রি ইডিয়টসের পরে কি পরিমাণ ছাত্র ছাত্রীর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছিল।

সুন্দর মুভি বানিয়ে দর্শককে উপহার দিতে চায় সব পরিচালকরাই, তবে সমাজের প্রতি একটা দায়িত্বও যে থেকে যায় তাঁদের! 

বহুরূপী ছবিটি দেখলাম, বেশ ভালো লাগল, গ্রামবাংলার কথা, হারিয়ে যাওয়া বহুরূপীদের কথা শিবপ্রসাদ, নন্দিতরাই তুলে আনলেন কিন্তু কাগজে ওই মর্মান্তিক ঘটনা পড়ে ভাবছিলাম কেউ না আবার ভাবে ব্যাঙ্ক ডাকাতি দোষের নয়, সরকারের টাকাই তো। আসলে ক্রম বর্ধমান খরচ সামলে উঠতে হিমশিম খেতে খেতে এমন কিছু ঘটনা নিয়ে মুভি দেখলে সাধারণ মানুষ সেটাকেই সমাধান ভেবে নিতেই পারে। তাই শুধু জনপ্রিয় বানাতে গিয়ে অজান্তে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে কিনা ভাবার সময়ও আসছে কিন্তু।

সুস্থ সমাজ গড়ার কাজ তো সব শিল্পীদেরই, বর্তমানে লেখা থেকে মুভি সবেতে অশ্লীল শব্দের কদর্য ব্যবহার এত বেশি বেড়ে গেছে যে তার প্রতিফলন চারপাশের কথোপকথন থেকেও বেশ টের পাওয়া যায়। কিন্তু সেই সব লেখা বা মুভি কি কালজয়ী হতে পারছে? আজও তো ক্লাসিকের পর্যায়ে তারা উন্নীত হতে পারছে না। 

আমাদের বোধহয় একটু সাবধানে কলম চালানো বা মুভি তৈরি করার সময় এসেছে।

(www.theoffnews.com Nadiad murder film)


চন্দ্রিমা দত্ত (সাঁজবাতি), লেখিকা ও শিক্ষিকা, শ্রীরামপুর, হুগলি:

অপর্ণা সেনের কথা লিখতে বসে যে কথাটা সর্বপ্রথম মনে আসে - তা হলো - অপর্ণা সেন- একজন একশো বছর এগিয়ে থাকা মানুষের নাম। এই ক্ষয়ে যাওয়া আধুনিকতার ধ্বজাধারী সমাজ যখন পোশাকে আর বাতেলার হাওয়াবাজি করে করে নিজের বুদবুদ সমান আধুনিকতা বহন করে আত্মশ্লাঘা আর সন্তুষ্টি নিয়ে কমপ্লেক্সে ভোগে এবং সেই কমপ্লেক্স কখনো ইনফিরিওরিটি কখনো সুপিরিওরিটির অন্ধকার -- তখন অপর্ণা সেনের সৃষ্টিগুলি একটা খোলা বড় জানলা দিয়ে নিঃশ্বাস নেবার মতো বাতাস ও দৃষ্টিকোণে আলোকপাত করে যায় - যা আগে খুব কম মানুষই ভেবেছেন! 

ভাবুন তো 'পরমা' সিনেমাটির কথা! ওটা যে সময় রিলিজ হয়েছিল...সেই সময় তা দেখা বা বোঝবার বয়স আমার ছিল না! কিন্তু বড় হয়ে বারবার দেখেছি! পরমার (রাখি গুলজার) মিডিল্ এজ ক্রাইসিস এবং একটি গৃহবধূকে ঘানি টানবার জন্য বা তথাকথিত 'ভালো'র মোড়কে ঠুসে রাখবার জন্য যতটা ভুয়ো প্রশংসার খাঁচায় বন্দী করে তার স্বপ্নের সমাধি সৌধ নির্মাণ করা হয়--তার কি আশ্চর্য বর্ণনা ওই কয়েক ঘন্টায় তিনি যে সময়ে দেখিয়েছেন - তা আজকে এসে খানিকটা উপলব্ধি করা যায়! 

ব্যক্তিগত ভাবে বলি, প্রত্যেকটি মানুষের একটি বা দুটি গর্বের জায়গা থাকে - আমার তালিকাটি সৌভাগ্যবশত একটু বড় এবং সেই তালিকার প্রথম নামটি অপর্ণা সেনের অর্থাৎ রীণা মাসির। তাঁর সম্পর্কে যা যা তথ্য লিখছি তা নব্বই শতাংশ মানুষের জানা, যেটা অজানা বা অদেখা দিতে পারলাম, সেটা পারিবারিক ছবি - যেমন এর আগে ওনার পিতা শ্রী চিদানন্দ দাশগুপ্তকে নিয়ে লেখা ফিচারে দিয়েছিলাম।

অপর্ণা সেন, কলকাতার এক বিখ্যাত বৈদ্য, ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ২৫শে অক্টোবর ১৯৪৫ সালে। তাঁর পরিবার পূর্ববঙ্গের বরিশাল থেকে এসেছিলেন। পিতা - বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শ্রী চিদানন্দ দাশগুপ্ত, মাতা কবি জীবনানন্দ দাশের দাদা শ্রী ব্রহ্মানন্দ দাসের কন্যা সুপ্রিয়া দাশ। অপর্ণা সেন বিবাহ করেন ব্যারিষ্টার সঞ্জয় সেনকে এবং তাঁদের কন্যা কমলিনী। সঞ্জয় সেনকে হারানোর পর তিনি বিবাহ করেন মুকুল শর্মাকে ও তাঁদেরই কন্যা অভিনেত্রী কঙ্কনা সেন শর্মা। অপর্ণা সেনের বর্তমান স্বামী - ইন্ডিয়ান আমেরিকান লেখক কল্যাণ রায়। 

তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়েছিল হাজারিবাগ ও কলকাতায়। কলকাতার মডার্ণ হাই স্কুল ফর গার্লস এ লেখাপড়া শুরু করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়েছিলেন। 

১৯৬১ সালে পিতৃবন্ধু সত্যজিৎ রায়ের 'তিন কন্যা' সিনেমায় অভিনয় করে অভিনয় জগতে প্রথম পদার্পণ করেন। ১৯৬৯ সালের পর যথাক্রমে 'অপরিচিত' ও 'অরণ্যের দিনরাত্রি' সিনেমায় অভিনয় করে নিজের অসামান্য অভিনয় - দক্ষতার প্রকাশ ঘটান এবং বাংলা চলচ্চিত্রের একজন প্রথম সারির নায়িকা হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৮১ সালের পর থেকে অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমা পরিচালনাতেও যোগ্যতার সঙ্গে আগ্রহী হয়ে ওঠেন । তাঁর পরিচালিত প্রথম সিনেমা '36 চৌরঙ্গী লেন '। এই সিনেমাটির জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পান শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে। তারপর আসে সতী, পরমা, পারমিতার একদিন, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার, ১৫ পার্ক অ্যাভিনিউ, দি জাপানিজ ওয়াইফ, গয়নার বাক্স ইত্যাদি ইত্যাদি। মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার এর জন্য দ্বিতীয় বার শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার পান। 

তাঁর অভিনীত কিছু সিনেমার নাম আমি দিয়ে দিচ্ছি যদিও সে তালিকা খুবই দীর্ঘ! যেমন - তিনকন্যা, মেমসাহেব, আকাশ কুসুম, বসন্ত বিলাপ, অরণ্যের দিনরাত্রি, জীবন সৈকতে, নায়িকার ভূমিকায়, রাতের রজনীগন্ধা, যদুবংশ, ইতি মৃণালিনী, চতুষ্কোণ, তিতলি, অন্তহীন ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কার গুলি হলো - ১৯৮৭ তে পদ্মশ্রী, ১৯৭০ এ বি এফ জে। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে পুরস্কার পান- সুজাতা (১৯৭৫), একান্ত আপন (১৯৮৮), মহাপৃথিবী (১৯৯২), শ্বেত পাথরের থালা (১৯৯৩), অভিশপ্ত প্রেম (১৯৯৭), পারমিতার একদিন (২০০১)। ২০০২ সালে শ্রেষ্ঠ নামকরণের জন্য আনন্দলোক পুরস্কার পান, ১৯৯৩ তে নাট্যমঞ্চের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে পান কলাকার পুরস্কার। ২০১৩ তে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কারে সম্মানিত হন। 

আপনারা ভেবে দেখবেন - তাঁর এ বিশাল কর্মজীবনের কথা কয়েকটা বাক্যে উল্লেখ করা আমার পক্ষে কতটা দুঃসাধ্য ও স্পর্ধার কাজ! কিন্তু ভালবাসা থেকে বোধহয় সবকিছু করা যায়! 

আনন্দের সাথে একটা পারিবারিক ছবি দিয়ে দিলাম লেখার সাথে । ছবিতে রীণা মাসি এবং তাঁর সাথে তাঁর একমাত্র পিসি মীরা দাশগুপ্ত (দত্তরায় ) ও একমাত্র ভাই স্বর্গীয় সুশোভন দত্তরায়ের কন্যা অবতীর্ণা (ভাইঝি)।

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Aparna Sen)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

মাইশোর শহরটি খুব বিরাট নয়, কিন্তু বেশ ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন, হাঁটতে ভালই লাগে। ভোরবেলা বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কিছু দূরে দেখি একটা জটলা। প্রায় শ'খানেক লোকের হইচই। কৌতূহলী মজাপিপাসু মধ্যবিত্ত মন নিয়ে এগোতেই স্পষ্ট হল ব্যাপারটা। সামনেই একটি সিনেমা হল, সঙ্গম। সেদিনই মুক্তি পাচ্ছে একটি কন্নড় ছবি, সকলেই চলচ্চিত্রপ্রেমী তারা তাদের প্রিয় নায়ক নায়িকার পোস্টার ব্যানার ফুলের মালা দিয়ে সাজাতে ব্যস্ত। সেই পোস্টারও বিশাল। এই ভোরবেলাতেও বেশ ভাল লাগল। পরে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, মাইশোরে আমি যেখানে ছিলাম তার এক দেড় কিলোমিটারের মধ্যে একটি দুটি নয়, ১০টি সিনেমাহল রয়েছে। যাদের মধ্যে আইনক্স বা পিভিআরের মত হাল আমলের মাল্টিপ্লেক্সও আছে। মাইশোর শহরে কমবেশি ২০ টি সিনেমা হল। অর্থাৎ মাল্টিপ্লেক্সের পাশাপাশি এখানে সমান উৎসাহ এবং ভালবাসা দিয়ে মানুষ সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলগুলিকেও বাঁচিয়ে রেখেছেন।

পরে কর্ণাটকের বিভিন্ন মফঃস্বল, গ্রাম দিয়ে যখন গিয়েছি, তখন দেখেছি সেখানে সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলগুলি কেমন রমরমিয়ে চলছে। চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষ উৎসাহ ভরে ভিড় জমিয়েছেন সেখানে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে সুদীপ, যশ, দর্শন বা সদ্যপ্রয়াত পুনিত রাজকুমারের মত কন্নড় তারকাদের পুস্পশোভিত বিশাল বিশাল কাটআউট। আবার বলছি শুধু শহরে নয়, এ ছবি প্রত্যন্ত গ্রামেও। আমার যেমন ভাল লেগেছে তেমন খারাপও লেগেছে নিজেদের অবস্থার কথা ভেবে। চলচ্চিত্রপ্রেমী হিসেবে আমাদেরও সুনাম আছে। বহু বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার তাদের কাজের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রকে দেশ তথা বিশ্ববরেণ্য করেছেন। কিন্তু আজ আমাদের অবস্থাটা মোটেই সুখকর নয়। কলকাতা তো বটেই বাংলা জুড়েই একের পর এক বন্ধ হয়ে গিয়েছে সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলগুলি। একসময়ে রমরমিয়ে চলা সিনেমা হলগুলিতে আজ কোথাও বাদুড়ের বাসা, কোথাও বা ভেঙে শপিং মলের উজ্জ্বলতা। আমাদের বাবা মায়ের নস্টালজিয়া, আমাদের ছেলেবেলার স্মৃতির অধিকাংশ সিনেমা হলই আজ ইতিহাস।

যেটা কর্ণাটক পেরেছে আমরা তা পারিনি। তারা মাল্টিপ্লেক্সগুলিকে যেমন স্বাগত জানিয়েছে ঠিক তেমনই তাদের ঐতিহ্যকেও সযত্নে লালন করে চলেছে। আমাদের ঠিক উল্টো দশা। শহরের পাশাপাশি মফঃস্বলগুলিতেও ক্রমশ গজিয়ে উঠেছে মাল্টিপ্লেক্স। একের পর এক বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেখানকার নামী সিনেমা হলগুলি। মানুষ তিরিশ টাকার টিকিট তিনশো টাকায় কিনে সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন। পাঁচ টাকার বাদাম ভাজার বদলে এখন একশো টাকার পপকর্ন খাচ্ছেন সিনেমা দেখার ফাঁকে। গ্রামগুলির অবস্থা আরও খারাপ, সেখানে সিনেমা হলগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু কোনও মাল্টিপ্লেক্সও গড়ে ওঠেনি। অর্থাৎ সেখানকার মানুষের ছবি দেখার মাধ্যম এখন টিভি বা মোবাইল।

আমরাই পারিনি। একের পর এক সিনেমা হলগুলি যখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে আমরা কেউই প্রতিবাদ করিনি, কারণ খুঁজিনি। চলচ্চিত্র যে সংস্কৃতির অঙ্গ সেটা একশ্রেণীর মধ্যবিত্ত সমাজ মানতেই চাননি। তাই প্রকাশ্যে সিনেমা হল বন্ধের প্রতিবাদ বা সহমর্মিতা প্রকাশ করতে দ্বিধায় অনেকেই। কিন্তু কর্ণাটকের মানুষ ভোরবেলাতেও তাদের ভালবাসার কারনে সিনেমা হলের সামনে ভিড় জমান। আচ্ছা বলুন তো? আমাদের বাংলাতেও তো অনেক স্টার এসেছেন গিয়েছেন। মানুষ তাদের জন্য পাগল হয়েছে, তাদের ভালবেসেছেন। কিন্তু প্রিয় নায়ক বা নায়িকার মৃত্যুতে তার ফ্যান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন বা গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন এমনটা বাংলায় কখনও শুনেছেন। কিন্তু ওরা পারে, সম্প্রতি পুনিত রাজকুমারের মৃত্যুতেও তার পাঁচজন ভক্ত মারা গিয়েছেন শোকে আত্মহত্যা করে বা হৃদরোগে। দক্ষিনী চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন উদাহরণ এর আগেও ভুরিভুরি আছে।

সংস্কৃতিপ্রেমী বলে আমাদের বাঙালিদের খুব অহংকার। অন্যদের আমরা এ ব্যাপারে পাত্তা দিতেই চাই না। কিন্তু বুকে হাত রেখে বলুন তো দক্ষিনী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আজ কোথায় পৌঁছে গিয়েছে। তাদের ছবির বাজেট, তাদের নির্মান কৌশল, তাদের অন্য ধরনের গল্প বলার ধরন, এসবই আজ বিশ্বব্যাপী সমীহ আদায় করে নিয়েছে। আমাদের কিছু ভাল ছবি হয় নিশ্চয়, পুরস্কারও কিছু মেলে। কিন্তু বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কি দক্ষিণের ধারে কাছে পৌঁছতে পেরেছে, কিছু নকল করা ছাড়া। দু একটি ব্যতিক্রমী ঘটনার উদাহরণে কেউ বিতর্ক করতেই পারেন কিন্তু সত্যিটা চাপা থাকে না। দক্ষিণে এখনও হিন্দি ছবি তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। আমি দিন পনেরো ঘুরে কর্ণাটকে একটা হলেও কোনও হিন্দি ছবি পাইনি। দক্ষিণের অন্যত্রও ছবিটা অনেকটাই এক। হিন্দি বা হলিউডি ছবি রিলিজ করলেও তা সেখানকার ভাষাতে ডাব করে দেখানো হয়। কিন্তু আমাদের বাংলাতে সেই সমস্যা নেই। কারণ আমাদের মত উদার সংস্কৃতিপ্রেমী আর কে আছে? নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টিকে ছেড়ে অন্যকে জায়গা দিতে আমাদের জুড়ি নেই। আমাদের এখানে কেউ বলেন না, হিন্দি বা ইংরেজি ছবি এখানে বাংলায় ডাব করে চালাতে হবে। প্রেস্টিজ চলে যাবে যে। আমাদের এখানে কেউ বলেন না, বেশির ভাগ হলে বাংলা ছবি চালাতে হবে। কারণ আমরা সিনেমা হলগুলিই তুলে দিয়েছি যে। মাল্টিপ্লেক্স চেইনগুলির মালিক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবাঙালি। তাদের তো মুনাফাই লক্ষ্য, আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি নিয়ে ভাবার দরকার তাদের নেই, কেউ কিছু বলেও না। কিন্তু দক্ষিনীরা সেটা করতে পেরেছেন, সেখানে ছবি মুক্তির সময় স্থানীয় ভাষায় ডাবিং এর জোর দেন মাল্টিপ্লেক্স কর্তৃপক্ষই।

আমরা কতটা সংস্কৃতিপ্রেমী তা বিতর্কের বিষয়। কিন্তু আমরা যে ভাল দর্শক নই তা প্রমাণ করে দিয়েছি হলের সংখ্যা কমিয়ে। কারণ এক একটা সিনেমাহলে পাঁচশো থেকে দেড় হাজার পর্যন্ত লোক ধরত। সেখানে একটা মাল্টিপ্লেক্সে আড়াইশো থেকে তিনশো লোক ধরে, খুব বেশি হলে পাঁচশো। অর্থাৎ বাংলায় সিনেমার দর্শক সংখ্যা কমে গিয়েছে উল্লেখজনক ভাবে। আগে টিকিটের দাম কম ছিল তাই পারিবারিক ভাবে সিনেমা দেখার চল ছিল। এক সঙ্গে দশ পনেরো জন সিনেমা দেখতে যেতেন। এখন টিকিটের দাম দশ থেকে পনেরো গুণ বেড়ে গিয়েছে,  তাই এক পরিবারে দুজন সিনেমা দেখতে গেলেও চিন্তা করেন পাঁচবার। গোটা বাংলা জুড়ে কয়েকটা সিনেমা হল শিবরাত্রির সলতের মত বেঁচে আছে। ধুঁকছে তারাও। আমরা কি পারি না, ওই সিনেমা হলগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে? আমাদের সকলের সামান্য একটু মনোযোগই কিন্তু এই হলগুলির ক্ষেত্রে সঞ্জীবনীর কাজ করবে। দক্ষিণের মানুষগুলি যদি পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না, আমাদের নস্টালজিকে সযত্নে, সগর্বে লালন করতে…?

(www.theoffnews.com - cinema hall Karnataka West Bengal)

কাজী নূর, কবি, সাহিত্যিক ও ফিচার রাইটার, বাংলাদেশ:

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং পুরনো সিনেমা  হল হিসেবে পরিচিত যশোরের 'মণিহার সিনেমা'। আসন সংখ্যার দিক থেকে সর্ববৃহৎ এই সিনেমা হলটিতে এক সময় রাজধানী ঢাকার সঙ্গে প্রতিযোগীতা করে সিনেমা রিলিজ দেওয়া হতো। নতুন কোন ছবি রিলিজ হলে সে ছবির নায়ক নায়িকা 'মণিহার' এ আসতেন, এমনকি দর্শকদের পাশে বসে সিনেমা দেখতেন, অটোগ্রাফ দিতেন। সে সময় হলে প্রবেশে  দর্শকদের দীর্ঘ লাইন পড়তো যা ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্ল্যাকে টিকিট পাওয়াও ছিল দুষ্কর।  দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে রীতিমতো বেগ পোহাতে হতো আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বহু পর্যটক আসতেন ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল 'মণিহার' দর্শনে। রুপালী জগতের এমন স্বর্ণালী যুগ এখন ধুলো পড়া ইতিহাস। 'মণিহার' এর সেই জৌলুশ এখন আর নেই। নেই দর্শকদের বাঁধ ভাঙা উচ্ছাস আর সেই ঠাঁসা ভিড়।

'মণিহার সিনেমা' প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ঘেটে জানা যায় ১৯৮২ সালে একটি সিনেমা হলের জন্য নান্দনিক এবং শ্রুতিমধুর নাম আহ্বান করে দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোঃ সিরাজুল ইসলাম। পরবর্তীতে জমা পড়া কয়েকশো নামের মধ্যে 'মণিহার' নামটিই চুড়ান্ত করেন 'মণিহার সিনেমা' র প্রতিষ্ঠাতা মোঃ সিরাজুল ইসলাম। এর দেড় বছর পর ১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে 'মণিহার সিনেমা'।

পরদিন ৯ ডিসেম্বর প্রথম শো-তে টিকিটের দাম ৫, ১০ এবং ১৫ টাকা নির্ধারণ করে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় 'মণিহার'। বর্তমানে এসব টিকিটের মূল্য ৬০, ৭০ এবং ৮০ (শীততাপ নিয়ন্ত্রিত) টাকা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। 'মণিহার' এর রুপালী পর্দায় প্রথম প্রদর্শিত হয় দেওয়ান নজরুল পরিচালিত জসিম, সোহেল রানা, সুচরিতা এবং রোজিনা অভিনীত ব্যবসা সফল ছবি 'জনি'। 'মণিহার সিনেমা'র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী ব্যবসা করেছে তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ইলিয়াস কাঞ্চন এবং অঞ্জু ঘোষ অভিনীত 'বেদের মেয়ে জোসনা' ছবিটি দিয়ে। ১৯৮৯ সালে রিলিজ পাওয়া 'বেদের মেয়ে জোসনা' ছবিটি টানা তিন মাস চলে 'মণিহার'র পর্দায়।

দেশসেরা স্থপতি কাজী মোঃ হানিফের করা নকশায় চার বিঘা জমির উপর নির্মিত আধুনিক সুযোগ সু্বিধা সম্বলিত চারতলা বিশিষ্ট ভবনে রাজকীয় স্থাপত্যশৈলী, অভ্যন্তরীণ নানা বৈচিত্র্যময়তা এবং নির্মাণ পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের তত্ত্বাবধানে দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ 'মণিহার সিনেমা'কে দিয়েছে স্বাতন্ত্রতা। শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়কে তৎকালীন যশোর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন 'মণিহার সিনেমা'র আসন সংখ্যা এক হাজার চারশো তিরিশটি। করোনা পরিস্থিতি, মানসম্মত ছবির অভাব এবং সর্বোপরি দর্শকের হল বিমুখতার কারনে বারবার লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে 'মণিহার' কতৃপক্ষকে। 'মণিহার সিনেমা'কে সংস্কার করে শীঘ্রই 'মাল্টিপ্লেক্স'এ রূপান্তরের ঘোষণা করেছেন  প্রতিষ্ঠাতা পুত্র এবং হলটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মিঠু।

(www.theoffnews.com - Bangladesh cinema hall manihar)

কাজী নূর, কবি, সাহিত্যিক ও ফিচার রাইটার, বাংলাদেশ:

বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম  সালমান শাহ। ৯০ এর দশকে অনেকটা হুট করেই  বাংলা চলচ্চিত্রে এসে অগণিত দর্শকের মন জয়  করে নিয়েছিলেন সালমান। নামী পরিচালক  সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে ১৯৯৩ সালে  ঢালিউডে পা রাখেন সালমান। ঢালিউড চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ধুমকেতু হয়ে আসা তুমুল জনপ্রিয় নায়ক  সালমানকে বলা হতো ঢাকাই ছবির 'রাজপুত্র'। চলচ্চিত্রের রুপালী জগতে সালমান শাহ নামে  পরিচিত হলেও জনপ্রিয় এই অভিনেতার পুরো নাম  শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। 

সালমান শাহ'র জন্ম ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর  বাংলাদেশের সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায়। তার  বাবার নাম কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী। সালমান ছিলেন বাংলা ছবির ফ্যাশন আইকন।  গ্ল্যামার, স্টাইল আর অভিনয় দক্ষতায় যিনি হয়ে  উঠেন সবার প্রিয় নায়ক। নিজের অভিনীত চলচ্চিত্রে নিজের পছন্দের পোশাকই পরতেন  সালমান। সালমান এতটাই ফ্যাশন সচেতন ছিলেন  যে, চলে যাওয়ার দুই যুগ পরও বাংলাদেশের কোনো নায়ক তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। অভিনয়গুণ আর ফ্যাশন সচেতনতায় হয়ে উঠেছিলেন কোটি তরুণীর স্বপ্নের নায়ক। খুব অল্প  সময়েই দর্শকদের হৃদয় জয় করে একের পর এক  সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন সালমান।ক্ষণজন্মা সালমান তার অভিনয় জীবনের চার বছরে মোট ২৭ টি সিনেমায় কাজ করেছেন।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ সবাইকে  কাঁদিয়ে চলে যান না ফেয়ার দেশে। সালমান নেই  দুই যুগেরও অধিক সময়। অথচ তার জনপ্রিয়তা ও আবেদন কমেনি এতটুকু। হয়তোবা অল্প সময়ের  জন্য এসেছিলেন বলেই এত দ্যুতি ছড়াতে পেরেছিলেন সালমান, অগণিত দর্শক ভক্ত হৃদয়ে  কেটে গেছেন দাগ। যে দাগটা তার প্রস্থানের দুই  যুগ পরেও জ্বলজ্বলে। মৃত্যুর এত বছর পরও সালমান  অভিনীত ছবি এখনও দর্শক ভক্তদের কাছে সমান  জনপ্রিয়। আজও কোনো সিনেমা হলে সালমান শাহ'র ছবি মুক্তি পেলে সেখানে দর্শকের ভিড় জমে।

আজ ৬ সেপ্টেম্বর। সালমানের চলে যাওয়ার ২৫ তম বার্ষিকী। এখনো ভক্তদের অন্তরে চিরসবুজ  হয়ে আছেন এই স্বপ্নের নায়ক। সালমান ছিলেন  অভিনয়ে, আছেন মানুষের হৃদয়পটে, থাকবেনও  অনন্তকাল ধরে। কারন সালমানদের কখনও মৃত্যু  হয় না।

(www.theoffnews.com - salman Shah)


সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ:

এবার না সত্যি বিরক্ত লাগছে। একটু আগে একটা জরুরি ছবির ফটো ফিনিশের কাজ করছিলাম। হঠাৎ মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে নোটিফিকেশন ভেসে উঠল, "হাসপাতাল থেকে ছুটি পেলেন নুসরত জাহান।" খবরের সৌজন্যে কলকাতার একটি প্রথম শ্রেণির সংবাদ মাধ্যম। যারা আবার কোনও সীমানা মানে না, অন্তত তাদের এমনই দাবি। তবে তীব্র চাটুকতায় যে তারা অধুনা অভ্যস্থ তা জনগণের সমালোচনায় স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় অহরহ। ব্রেকিং নিউজের বেলায় তো অষ্টরম্ভা। সেই কত যুগ আগে বাংলার সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিল বঙ্গের শেষতম প্রকৃত ব্রেকিং নিউজ 'ট্রাম কেলেঙ্কারি' ও 'বেঙ্গল ল্যাম্প কেলেঙ্কারি'। তার পরবর্তী 'আমলাশোল' কাহিনী। ব্যাস বাঙালি সাংবাদিকতার লম্ফঝম্ফ করার দিন আপাতত শেষ। তাই আপোষের মসনদে বসে তারা আজ আমাদের ব্রেকিং নিউজ পরিবেশন করে, হাসপাতাল থেকে ছুটি পেলেন নুসরত জাহান। সত্যি ডিসগাস্টিং।

ভেবেছিলাম, এসব নিয়ে কিছু লিখবো না। কিন্তু একাধিক তথাকথিত সংবাদ মাধ্যমের অতি প্রয়োজনহীন বাচালতা আমাকে সেই কলম ধরতে বাধ্য করালো। কাউকে ব্যক্তি আক্রমন করা যেমন আমার উদ্দেশ্য নয়, তেমনি আমার লেখায় কেউ আঘাত পেলে আমি আগাম দুঃখ প্রকাশ করছি তারজন্য। আবার নব্য জেন্ডার বিভাজনকারী সমর্থকদের বলবো, অনুরোধ করে আমার লেখাটির বাকি অংশটি আর না পড়লে আমি খুশি হবো। আরও একটি বিশেষতম আবেদন, লেখার মধ্যে ধর্মের ও রাজনীতির কোনও রসায়ন অনুগ্রহ করে খুঁজতে যাবেন না।

গত ২৬ অগস্ট। কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন বাংলার অভিনেত্রী তথা সাংসদ নুসরত জাহান। এযাবৎ সবটাই ঠিক। একজন সাংবাদিক হিসেবে এই নতুন মাকে সেলাম জানাই। অবশ্যই সাধুবাদ জানাই এই কারণেও যে, তিনি নানা বিতর্কের মধ্যে ভ্রুণহত্যার রাস্তায় পা বাড়াননি বলে। তাঁর নব মাতৃত্বের কারণে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেছেন। এই পর্যন্ত সবই তো সুন্দর।

কিন্তু তাই বলে, এই জন্মপর্ব ইস্যুটাকে নিয়ে বাংলার বহুল সংবাদমাধ্যমের এমন নির্লজ্জ হ্যাংলামি প্রচার দিনরাত এক করে চলবে তা ভাবিনি। অন্যদিকে, সোস্যাল মাধ্যমের কিছু লেখালেখি পড়ে এটাই মনে হলো, নুসরত বোধ হয় এই প্রসবান্তে চলতি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম মহান মায়ের তকমা পেয়েছেন। আমি ফের বলি, নুসরতের নতুন মাতৃত্ব নিয়ে আমি একটিও নেতিবাচক মন্তব্যে রাজি নন। বরং কামনা করি নুসরত ও তাঁর নবজাতক সুন্দর ও সুস্থ থাকুক। পাশাপাশি একাংশ হুজুগে বাঙালির আদেখলাপনা শ্রেষ্ঠ মাতৃত্বকরণ দাবিরও আমি ঘোর বিরোধী। 

একটা বিতর্ক সম্প্রতি বাজার মাত করেছে। নুসরতের নব্য সন্তানের পিতা কে তা নিয়ে। এই বিতর্কের সৃষ্টি অবশ্যই করেছেন নুসরত নিজেই। কারণ তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, নিখিল জৈনকে বিয়ে করেননি। উভয়ে সহবাস করেছিলেন মাত্র। আবার সাম্প্রতিক কালে বিশেষ বন্ধু যশ দাসগুপ্তের সঙ্গে অভিনেত্রীর অন্তরঙ্গতা তো ফিসফিস গসিপের শিরোনামে। অতএব নুসরাতের নিঃসন্দেহে জানার কথা তাঁর পুত্র সন্তানের জৈবিক পিতা কে? এছাড়া প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষা তো নির্ণায়ক উত্তর সহজেই দিতে পারে । তবে এই পিতৃত্বের নাম পরিচয় প্রকাশ করা বা না করাটা সম্পূর্ণ অভিনেত্রীর নিজস্ব ব্যক্তিগত বিষয়। এখানে কারও খবরদারি বর্তমান সুসভ্য সমাজ মান্যতা দেয় না।

আবার প্রকৃতিগতভাবে গর্ভধারণ করলে স্বাভাবিক নিয়মে পশু পাখি জলজ প্রাণি থেকে মানবী সবাই প্রসব করবেই, এটাই তো জাগতিক নিয়ম। ঠিক এই পরিস্থিতিতে বিশেষতঃ এই ইস্যুতে এমনতর মহান পর্বের সিংহাসনে আসীন কেন তিনি আচমকা হয়ে গেলেন, এটা আমার মাথায় ঢুকলো না। ভাগ্যিস আগ বাড়িয়ে কোন মিডিয়া স্কুপ খবর করার জন্য তখনকার দিনের নেহরু বংশীয় যুগের নার্গিসের মায়ের সাহসিকতার সঙ্গে হালফিল এই মাতৃতের তুলনা করে বসেনি, এটাই আমাদের রক্ষে।

মনে রাখতে হবে, নুসরত কিন্তু কোনও ভাবেই কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির চাপে তাঁর সন্তানের পিতৃত্বের পরিচয় গোপন রাখতে সত্যি বাধ্য হয়েছেন কিনা তা কিন্তু কেউ জানি না। এমনকি এমনতর অভিযোগ নুসরত নিজেও এখনও পর্যন্ত করেননি। বরং তিনি যেচে বিষয়টি গোপন রেখেছেন বলে তাঁরই একদল নেটিজেন সমাজে জোরদার লোকের কান ভাঙাতে শুরু করেছেন। এটাও সত্য, এযাবৎ নুসরাতকে কেন্দ্র করে যাঁদের নাম দিবারাত্রির ঘুরপাক খেয়েছে তাঁদের মধ্যে কেউই যেচে নবজাতকের পিতৃত্বের দায় অস্বীকার করে প্রকাশ্যে বিবৃতিও দেননি। সেক্ষেত্রে, কেউ যদি নিজের ব্যক্তি অধিকার বলে পিতৃ পরিচয়ের বিষয়টি গোপন রেখে সন্তানের জন্ম দেন, তাহলে তা নিয়ে এতো মাতোয়ারা প্রচার হইচই কিসের তাগিদে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কারণ বাংলার নানা শহরে নানা গ্রামে এহেন পিতৃ পরিচয়হীন সন্তানের জন্মগ্রহণ সাম্প্রতিক যুগে তো আকছার লেগেই রয়েছে। কই তখন তো এই মিডিয়া কুলের নব্য মাতৃত্বের ট্যাগ লাইনের হুল্লোড়বাজি বা সোস্যাল মিডিয়ায় মহৎ মায়ের দৃষ্টান্তের কাহিনী নজরে পড়ে না।

বহু কাল আগের কথা। সময়টা আশির দশক। ভারতে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে এসেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেই দলে ছিলেন ব্যাটের দানব ভিভিয়ান রিচার্ডস। সেই সফরকালে অভিনেত্রী নীনা গুপ্তের সঙ্গে ভিভিয়ান রিচার্ডসকে দেখা গেছে যত্রতত্র। এর কিছুদিনের মধ্যেই নীনা গুপ্ত গর্ভবতী হোন। তিনি কিন্তু কোনও ভনিতার আশ্রয় না নিয়ে বা কোনও ন্যাকামি না করে সরাসরি সেদিন জানিয়ে দেন, তাঁর গর্ভে থাকা সন্তানের পিতার নাম স্বয়ং ভিভিয়ান রিচার্ডস। কিন্তু দুঃখের এটাই, সেই সময় ভিভিয়ান রিচার্ডস নীনা গুপ্তর পাশে তো দাঁড়ানইনি, উল্টে স্বদেশে ফিরে গিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। বরং নীনা গুপ্ত সেদিন সমস্ত সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে পুরুষের ভোগের লালসার বিরুদ্ধে চপেটাঘাত করে জন্ম দিয়েছিলেন এক কন্যা সন্তানের। নুসরতের সঙ্গে কিন্তু কোনও কেটে পড়া পুরুষের যৌন লালসার মতো তো তেমন কোনও নালিশ বা প্রতারণা ঘটেনি যার ফলে তিনি গর্ভবতী হয়েছিলেন। তাই নীনা গুপ্তর সেদিনের দৃষ্টান্তের সঙ্গে এদিনের নুসরত কখনই একাসনে বসে মহান মাতৃত্বের সীতাভোগ খাবার অধিকারী হতে পারেন না।

কিন্তু অধুনা বাংলার মিডিয়ার একাংশের প্রচার সর্বস্বতা দেখে মনে হয়, পিতৃ পরিচয় হীন প্রসব অলিম্পিকে এই পরিবেশন ইস্যুটা যেন স্বর্ণপদক লাভ করেছে। যেন বাংলায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নয়া-মাতৃত্বের ইভেন্ট ঘটে গেল গত কয়েকদিনে। আমি কারও মাতৃত্বকে ছোট করে দেখতে নারাজ। প্রতিটি নতুন মাকে আমি নতমস্তকে প্রণাম করি। কিন্তু তাই বলে মিডিয়ার এহেন 'কাগুজে বাগ' মার্কা পদলেহন স্কুপ খবর পরিবেশন বড্ড অস্বস্তিরও। মনে রাখা আবশ্যক মিডিয়ারও একটা সীমানা আছে, নিজেদের সামাজিক দায়িত্ব মেনে সেটা লঙ্ঘন না করাই শ্রেয়।

(www.theoffnews.com - Nusrat Jahan Bengal media social media new baby)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

তুলসী চক্রবর্তী শুধু কেবল মাত্র অভিনেতা নন, উনি বাংলার সিনেমার তুলসী বৃক্ষ ছিলেন। যেখানে পুজো দেওয়া যায়।

'আমাকে এতো পয়সা দেবেন না আমার লোভ বেড়ে যাবে'। এইরকম পয়সা নিয়েছি শুনলে কেউ তো আমায় আর ডাকবেন না। হা ঠিক ধরেছেন, ইনি বাংলা সিনেমার এক বিরল অভাবনীয় প্রতিভাধর শিল্পী তুলসী চক্রবর্তী (১৮৯৯-১৯৬১)। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল নায়ক হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের পরশ পাথর ছবিতে অভিনীত অভিনয়।পথের পাঁচালি'তে পন্ডিতের ভূমিকায় তাঁকে দেখা যায়। চরিত্রটা ছোট্ট ছিল। এরকম অজস্র ছোট ছোট কত রোলে ওনার অভিনয় দেখে মনে হয়েছে, এটাই যেন শেষ কথা অভিনয় শিল্পে। 

‘পরশপাথরে’র সেই বিখ্যাত দৃশ্যটা মনে আছে? পাথরখানা খেলনা সেপাইয়ের গায়ে ঠেকাতেই সোনা! বিস্ফারিত চোখ নিয়ে দেখছেন পরেশচন্দ্র দত্ত। তারপর, ফেটে পড়ছেন হাসিতে। আনন্দ-লোভ- ‘সব পেয়েছির’ হাসি। পরমুহূর্তেই অজানা আতঙ্ক গ্রাস করল... কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লেন গোবেচারা কেরানি পরেশ দত্ত। এমন অদ্ভুত ট্রানজিশন হয়তো টালিগঞ্জে একটা লোকই পারেন, পারতেন। তিনি তুলসী চক্রবর্তী। 

উত্তমকুমার তো বলেই ফেলেন একদিন  “তুলসীদা যেভাবে অভিনয় করেন, আমি তো কোনো দিনই পারব না। ওঁর মতো ‘জীবন্ত’ হয়ে ওঠা আমার দ্বারা হবে না।... প্রণাম জানানোর একটাই পথ আমার কাছে। যখনই কাজ পাই, পরিচালক প্রযোজককে বলে ওঁকে ডেকে নিই। তুলসীদা থাকলে সিনটা দারুণভাবে উতরে যায়। ওঁর ঋণ শোধ তো করতে পারব না, যেটুকু পারি সাহায্য করি।”

অথচ টালিগঞ্জে ‘তুলসীবাবু’-র সঙ্গে নিয়মিত খারাপ ব্যবহার করতেন প্রযোজক, নির্দেশক মায় মেকআপ আর্টিস্টরাও। চরিত্রাভিনেতার দর অল্প। পেতেনও সামান্য। নিপাট ভালোমানুষ, কখনো কথার পিঠে কথা বলতেন না। সদ্ভাব সকলের সঙ্গে। নিজের কাজ সম্বন্ধে অত্যধিক বিনয়ী। প্রশংসা শুনলে বলতেন, “এই চরিত্র করার জন্য ভাল অভিনয় করার দরকার হয় নাকি? তোমার চারপাশে এরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, একটাকে তুলে এনে নিজের কাঁধে ভর করাও।” অনেক ফিল্ম সমালোচক চ্যাপলিনের সঙ্গে তুলনা টেনেছেন তুলসিবাবুর। কিন্তু তাঁর অভিনয় নিতান্তই দেশজ।

বাবার অকালমৃত্যুর পর মা-কে নিয়ে কাজের সন্ধানে চলে আসেন কলকাতায়। জ্যাঠামশাই, প্রসাদ চক্রবর্তীর ছিল অর্কেস্ট্রা পার্টি। কিশোর তুলসীর কীর্তনের গলাটিও খাসা। যে ক্ষমতার অনেকটাই দেখা যায় ‘পরশপাথরে’র সেই বিখ্যাত ‘ককটেল পার্টি’-তে। চাকরি মেলে না কোথাও। প্রথম বয়সে হেন কাজ নেই যা করেননি। মদের দোকানে বয়ের চাকরি থেকে সার্কাসের জোকার। শেষে ‘জানোয়ারের দুর্গন্ধ’ সইতে না পেরে পালিয়ে আসেন। ছাপাখানায় কম্পোজিটরের কাজ করতে করতে হাতে আসে থিয়েটারের হ্যান্ডবিল। মাথায় চাপল অভিনয়ের ভূত। অভিনয় করবেন বলে ৩২ টাকা মাইনের চাকরি ছেড়ে মাসিক ৮ টাকা মাইনেতে স্টার থিয়েটারে ঢুকলেন।

বাস্তবিকই জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—সবই পারতেন তুলসী চক্রবর্তী। নাটকে কখনো মোজায় চোখ এঁকে নাগরা জুতো বানিয়ে ফেলতেন। ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ নাটকে তবলিয়া হঠাৎ কলেরায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় দিব্বি তাঁর বদলে তবলায় সঙ্গত করে দিলেন তুলসী চক্রবর্তীই। 

শেষ জীবনটা অবধি ছিলেন নিঃস্বার্থ, পরোপকারী একজন মানুষ। তাঁরই চেষ্টায় থিয়েটারে চাকরি পান জহর গঙ্গোপাধ্যায়। বড়ো বড়ো নায়কেরা পাগলের মতো ভক্তি করতেন এই  আমুদে মানুষটাকে। শীতে কষ্ট পাচ্ছেন শুনে অভিনেতা অনুপকুমার কিনে দিয়েছিলেন একটা কোট। আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন তুলসী চক্রবর্তী। নিঃসন্তান মানুষটি ‘ছেলে’ বলে ডাকতেন উত্তমকুমার, তরুণকুমারকে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ভালোবেসে বলতেন ‘সৌমিত্তির’। 

অভাব থাকলেও অভিনয়ের জন্য নূন্যতম টাকা নিতেন তুলসী চক্রবর্তী। উত্তমকুমার থেকে সত্যজিৎ, সকলকেই টাকা হাতে দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন। ‘অবাক পৃথিবী’-র সময় একবেলা কাজের জন্য তাঁকে দেওয়া হল তিনশো টাকা। তিনি কিছুতেই তা নেবেন না। কারণ, তখন তাঁর রেট দিনে একশো পঁচিশ টাকা। দলের অনেকের জামা-জুতো ছিঁড়ে গেলে নিজের হাতে সেলাই করে দিতেন তুলসীবাবু। অবসর সময়ে পৌরোহিত্য করে দুজনের সংসার চালাতেন। 

প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। নিজেকে তুলনা করতেন বাড়ির হেঁশেলের হলুদ হিসাবে। তাকে না পেলে সত্যজিৎ রায় যে ‘পরশপাথর’ বানাতে পারতেন না, তা তাঁর অন্তিমজীবনেও স্পষ্ট করে বলে গেছেন। প্রবাদপ্রতিম সেই ব্যক্তিত্ব তুলসী চক্রবর্তী। উত্তমকুমার অভিনীত প্রায় তিন ডজন সিনেমায় চুটিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি। যদিও ‘পরশপাথর’ ছাড়া আর সে ভাবে কোনও সিনেমায় মুখ্য চরিত্র পাননি। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘একটি রাত’ ইত্যাদি ছবিতে কোথাও তিনি মেস মালিক, কোথাও হোটেল মালিক, কোথাও বাসরাইখানা-ধর্মশালার মালিক হলেও সবকটি চরিত্রে তার স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন। একমাত্র সত্যজিৎ রায়ই বোধ হয় তাঁর অভিনয় প্রতিভা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন।

কোনো বিকল্প নেই এই মহান শিল্পীর। সাংবাদিক রবি বসু লিখছেন, “পরশপাথর ছবি রিলিজের সময় তুলসীদা কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। একদিন আমাকে বললেন, এইবারে আমি নির্ঘাৎ পাগল হয়ে যাব। বড় বড় হোর্ডিংয়ে ইয়া বড় বড় মুখ আমার। জীবনে তো কখনও এত বড় বড় মুখ হোর্ডিংয়ে দেখিনি। এর আগে যাও বা দু-চারবার হয়েছে, তা সে সব মুখ তো দূরবিন দিয়ে খুঁজে বার করতে হত। এ আমি কী হনু রে!”

হাওড়ার ২নং কৈলাস বসু থার্ড লেনে দু’কামরার বাড়িতে থাকতেন স্বামী-স্ত্রী। সুযোগ পেলেই সেই ঘরে বসাতেন গানের আসর। একটি গান বিশেষ প্রিয় ছিল তাঁর—

‘শিবরাত্রির পরের দিন

শিবের হল সর্দিকাশি

ঘটি ঘটি জল ঢেলেছে

জেঠি, কাকী, মামী, মাসি

তাই শিবের হল সর্দিকাশি।

আদা দিয়ে চা করে

দুগ্গা এসে সামনে ধরে,

‘সিদ্ধি আজকে খেও না, বাপু’

বললে শিবে মুচকি হাসি

শিবের হল সর্দিকাশি।’

তুলসীবাবু মারা যাওয়ার পর দু’মুঠোর জন্য দরজায় দরজায় ফিরেছেন স্ত্রী উষারানী দেবী। সামান্য সঞ্চয় যা ফুরিয়ে গিয়েছিল অল্পদিনেই। বিক্রি করতে হয়েছিল তুলসী চক্রবর্তীর সবকটি মেডেলও।

সত্যজিৎ তাঁকে বলতেন, ভারতের মরিস শিভ্যালিয়র। ছবি বিশ্বাস এবং সত্যজিৎ রায়  দুজনেই নাকি বলেছিলেন, তুলসী চক্রবর্তী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মালে অস্কার পেতেন। কিন্তু, বাংলা সিনেপাড়া পরশপাথরের ছোঁয়া পেয়েছিল অনেকবার। সেইসব ছোটো ছোটো ছোঁয়াতেই সোনা হয়ে থেকে গেছে কত সাদামাটা দৃশ্যও। সবাই সংক্রামিত ছিল ওইসময় অনেকটা করোনা ভাইরাস এর মতো। উনি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আজও একটা মিথ হয়ে আমাদের মাঝে আছেন।

(www.theoffnews.com - Tulsi Chakraborty)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

সেটা ১৯৫৪-১৯৭৫ সালের মধ্যে উত্তমকে দেখলেই বোঝা যায়, কারণ ব্যক্তি উত্তম সেখানে অনেকাংশেই তারকা বা অভিনেতা উত্তমের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াননি। তার প্রমাণ, বছরে অন্তত দুটো অসাধারণ ছবি। অন্তত, এক বা দুই নয়, কুড়ি বছর ধরে। পৃথিবীর ইতিহাসে যে সমস্ত তাবড় অভিনেতা আছেন, যাঁরা একই সঙ্গে ভীষণ রকম জনপ্রিয় তারকাও বটে, তাঁদের ক্ষেত্রে খুব চেষ্টা করেও দশটা উল্লেখনীয় ছবি পাওয়া যাবে। খুব সহৃদয় হলে পনেরো। সেগুলি সাঙ্ঘাতিক ছবি, সন্দেহ নেই। কিন্তু সংখ্যায় অল্প। সে ক্যারি গ্রান্ট বা হামফ্রে বোগার্ট হোন অথবা মার্লন ব্রান্ডো বা অ্যালেন দিলোঁ। উত্তমের ক্ষেত্রে মনে রাখার মতো ছবি অন্তত পঞ্চাশটা। তার সব ক’টাতেই উত্তম প্রোটাগনিস্ট। এর মধ্যে হাতে গোনা সত্যজিৎ রায়, তপন সিংহ। বাকিটা উত্তম, শুধুই উত্তম।

ওই কুড়ি বছরে বাংলার বা বাঙালির জীবনে একের পর এক বদল এসেছে, ইতিহাসের নিয়মে যেটা স্বাভাবিক। এবং ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই বদলগুলোর সঙ্গে উত্তমের স্টার এবং স্ক্রিন-পার্সোনালিটি বদলেছে। এর কারণ ব্যক্তি উত্তম নয়, অভিনেতা উত্তম। আরও ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে রোম্যান্টিক উত্তম, অভিনেতা উত্তম, আগের মার্কামারা উত্তম, সত্যজিৎ-পরবর্তী ‘বিকশিত’ উত্তম— এই কালানুক্রমিক ধারাবিবরণী উত্তমের ক্ষেত্রে খাটে না। কারণ ‘শাপমোচন’ আর ‘সবার ওপরে’-এর মতো ফর্মুলা মেলোড্রামা ঘেঁষা ছবির ১৯৫৫ সালেই আছে ‘উপহার’ বা ‘হ্রদ’; ১৯৫৭-র ‘হারানো সুর’ বা ‘ইন্দ্রাণী’-র পাশেই ‘বড়দিদি’ বা ‘ডাক্তারবাবু’; এবং উল্লেখ্য ১৯৫৯, যেখানে পাশাপাশি ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ আর ‘বিচারক’। তুলনাহীন ব্যপ্তি। এবং সেটা চলতেই থাকে। ১৯৬২-তে ‘শিউলিবাড়ি’-র নেহরুভিয়ান ‘মিট্টি’ বাবুর পাশেই ‘কান্না’-র বলিষ্ঠ, কামুক জন; ১৯৬৩-তে ফুরফুরে ‘দেয়া নেয়া’-র পাশেই ‘শেষ অঙ্ক’; ১৯৬৪-র তেজি ‘লালপাথর’-এর পাশেই একাকী ‘জতুগৃহ’। এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। অন্তত সত্তরের দশকের শুরু অবধি।

এক কথায়, অভিনেতা আর তারকা উত্তমকে আলাদা করা যায় না। আর ব্যক্তি উত্তম তো অনেকটাই পিছনে। এ কথা বললে অন্যায় হবে না যে যতই সত্যজিৎ রায় দাবি করুন যে স্টার উত্তম অভিনেতা কি না, তা পরখ করতেই ‘নায়ক’-এর সূচনা, আসল কথা হল যে উত্তম অত্যন্ত উঁচু দরের অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ না করে থাকলে মধ্যগগনের সত্যজিৎ এ ঝুঁকি নিতেন না। আর সেটা নিয়ে তিনি যে এতটুকুও ঠকেননি, সে কথা বলতেও উনি কার্পণ্য করেননি। ‘নায়ক’ নিয়ে গল্পকথার অন্ত নেই, যার একটি এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে। বংশী চন্দ্রগুপ্তর করা ওই ছবির নিখুঁত ট্রেনের সেট দেখে প্রত্যেকের মতো উত্তমও হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন। “কী করে করেন এ রকম সেট, একটু বলবেন বংশীদা?”, উত্তম জানতে চাইলেন। বংশীর উত্তরটা মনে রাখার মতো। উনি বললেন, “উত্তম, তুমি এ রকম আশ্চর্য ন্যাচারাল অভিনয় কী করে করো, যদি বুঝিয়ে দিতে পারো, আমিও তা হলে বোঝাতে পারব সেট-এর রহস্য।” এই দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর হয় না।

ভুল হল। এই প্রশ্নের উত্তর হয়। দু’ভাবে এর উত্তর হয়। উত্তম একা উত্তম হননি, এক দিনে তো নয় বটেই। উত্তম-পূর্ববর্তী বাংলা ছবির মধ্যে বহু কিছু ছিল যা একসঙ্গে, একজোটে, দেশভাগ-উত্তর বাংলা ছবিকে একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড় করায়, স্টুডিয়ো-প্রথা বিলুপ্ত হয়, আর উত্তমের স্টারডম হয়ে ওঠে তার ধারক। কিন্তু কালক্রমে সেই একজোট আর একজোট থাকে না, সেই নান্দনিক আর শৈল্পিক সূক্ষ্মতাতেও ফাটল ধরে। এর অন্যতম বড় কারণ, উত্তমের স্টারডম বাংলা ছবিকে শুধু যশ আর অর্থই দেয়নি, উত্তমের স্টারডম বাংলা ছবির আফিমে পরিণত হয়েছিল। এ এক ভয়ঙ্কর সত্য। তাই সত্তরের দশকে এসে বাংলা ছবির স্থাপত্যে যখন ঘুণ ধরতে শুরু করল, উত্তম হয়ে উঠলেন তার একমাত্র ভরসা। ও দিকে রাজনীতির ছায়া, ব্যক্তিগত জীবনে টানাপড়েন, ইন্ডাস্ট্রির করুণ অবস্থা, হিন্দি ছবির সঙ্গে অসম লড়াইয়ে বার বার বাংলা ছবির পক্ষে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ক্লান্ত, বিরক্ত উত্তম তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে এগিয়ে দিলেন, অভিনেতা উত্তম দাঁড়িয়ে পড়লেন মাঝ রাস্তায়। বুকের জোর আর দাঁড়ানোর জায়গা হারিয়ে আফিমে অভ্যস্ত ইন্ডাস্ট্রি উত্তমের বাইরে দেখতে অস্বীকার করল। এবং ফল হল বিপরীত, যা আগেই বলেছি। উত্তম-পরবর্তী বাংলা ছবির যে করুণ অবস্থা, মনে রাখা দরকার তার শুরু কিন্তু উত্তমের সময়েই। ১৯৮০-র জুলাই তাতে অনিবার্যতার ফলক লাগিয়েছিল মাত্র।

দ্বিতীয় কারণটা এর পরিপূরক। যতই বাংলা ছবি উত্তম নামক নেশায় আবিষ্ট হোক, যতই স্টার-টেক্সটের উন্নত পাঠ্যক্রম হোন উত্তম, এ কথা অনস্বীকার্য যে উত্তমের স্টারডম ছিল বাংলা ছবির সীমিত পরিসরের তুলনায় অনেকটাই ব্যাপ্ত। যেটাকে বলা যায় উত্তমের স্টারডমের সারপ্লাস ভ্যালু। তাই বারবার বাংলা ছবি চেষ্টা করেছে উত্তমকে তার পরিসরে আটকে রাখার, আর বারবার উত্তম সেটা ভেঙে বেরিয়ে তৈরি করেছেন স্টারডম আর অভিনয়ের এক অননুকরণীয় যুগলবন্দি। এই সারপ্লাস ভ্যালুই কিন্তু বলে দেয়, কেন তাঁর মৃত্যু বাংলা ছবিকে শুধু দরিদ্র করে দেয় না, নিঃস্ব করে দেয়। প্রায় সাড়ে তিন দশকের প্রাপ্তি এক ঝটকায় বিদায় করে দেওয়া হল ১৯৮০-তে এসে, কারণ উত্তমহীন বাংলা ছবি আর বাংলা ছবি রইল না, খেই হারিয়ে ফেলল।

‘নায়ক’ ছবিতে এই স্টারডমের অমোঘ সত্তা প্রকট। আর প্রকট ‘চিড়িয়াখানা’র পোস্টারে, যেখানে সাসপেন্স-ধর্মী ছবিতে সত্যজিৎ ঘটালেন এক স্বভাববিরুদ্ধ ব্যতিক্রম— ‘ব্যোমকেশ’-এর জায়গায় ধূসর অক্ষরে লিখলেন ‘উত্তম’। চরিত্রের থেকেও অভিনেতার স্বাক্ষর সত্যজিতের আর কোনও ছবির পোস্টার বহন করে কি? না।

কারণ? ওই সারপ্লাস। আর ওই সারপ্লাসই কারণ মৃত্যুর চল্লিশ বছর পরে উত্তমকুমারের জীবিত থাকার; ওই সারপ্লাসই পারে সেলুলয়েড-উত্তর পৃথিবীতে বসে সেলুলয়েডের আকর্ষণ প্রত্যক্ষ করতে; এই সারপ্লাসই কারণ হতে পারে যে এক দিন উত্তমের সব ছবি তামাদি হয়ে যাবে, শুধু উত্তম ছাড়া। (সমাপ্ত)

(www.theoffnews.com - Uttam Kumar)

তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

উত্তম কুমার মানেই পুরোনো কলকাতার ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট রাস্তা, সব পুরোনো কলকাতার অলি গলি। যাই হোক আমার বেশ মনে আছে আমাদের পাড়ায় মানে পাইকপাড়ায় থাকতেন ধীরেন দাস। সেকালের খ্যাত নামা গায়ক অভিনেতা অনুপ কুমারের বাবা। উনার মৃত্যু দিনে এসেছিলেন উত্তম কুমার। সেকি কান্ড, আমি তখন খুব ছোট। সাল ১৯৬১। রাস্তায় খুব ভীড়, আমি ছুটে গেলাম ভীড় দেখতে। গিয়ে দেখলাম উত্তম কুমার দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। হটাৎ অনুপ কুমার বাইরে এসে চিৎকার করে বললেন আমার বাবা মারা গেছেন আর আপনারা উত্তম কুমার দেখতে এসেছেন। এই কথা শোনার পর উত্তম কুমার বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেলেন।

কিছুই করার নেই এটাই জনপ্রিয়তা। উত্তম কুমারের সাথে খুব ছোট রোলে কাজ করেছেন, তাদের মুখ থেকে শুনেছি অনেক গল্প। যেমন একজনের মেয়ের বিয়ে টাকা জোগাড় করতে পারছে না। শুটিং এর ফাঁকে উত্তম কুমারকে বললেন। শুনে উত্তম কুমার বললেন আমি কি করবো? আমি কি তোমার দায়িত্ব নিয়েছি নাকি। তার পর শুটিং এর শেষে ওই লোকটাকে ডাকলেন আর বললেন আমি কাল রাত দুটোয় তোমার বাড়িতে যাচ্ছি চিন্তা করো না। আমাদের পাড়ার রামদাকে সবাই চেনে। উনি বললেন উনার অভিজ্ঞতার কথা। একদিনের কাজ ছিল উত্তম কুমারের সাথে। খাবার দেয়নি প্রোডিউসার। উনি চার অক্ষরের গালাগালি করে বললেন আমার জন্য খাবার পাঠাবে প্রোডিউসার ওটা তোকে দিয়ে দেবো কারণ আমার খাবার তো বাড়ির থেকে আসবে। এরকমও শোনা যায় বহু সময়ে খাবার টেবিল উল্টে ফেলে দিয়েছেন এক্সট্রারা খাবার পাইনি বলে। শুধু অভিনয়ের জোরে স্টার হননি। যাঁদের সাথে কাজ করছেন তাঁদের গুরুত্ব দেওয়া আর ভালোবেসে মর্যাদা দেওয়ার কথাটা উনি বুঝতেন। এখন টালিগঞ্জের খুব পুরোনো টেকনিশিয়ানরা উনাকে ভোলেননি।উনি একদিনে উত্তম কুমার হননি। উনি ছিলেন ফ্লপ মাস্টার। অনেক অপমান এবং জ্বালা যন্ত্রনা পেরিয়ে উত্তম কুমার হয়েছেন। এই উত্তম কুমার হয়ে উঠার পেছনে একজন শিল্পীর কথা বলতেই হবে, উনি হলেন পাহাড়ী সান্যাল। শুনুন পুরো গল্পটা। উত্তম কুমারের পরপর তিনটি ছবি ফ্লপ। তবুও ছেলেটি স্টুডিওপাড়ায় একটা রোলের জন্য ঘুরে বেড়ায়। ছেলেটিকে দেখলে সবাই রংতামাশা করে। ফ্লপ মাস্টার জেনারেল বলে হাসাহাসি করে। ছেলেটির চোয়াল ক্রমশ শক্ত হতে থাকে। মনে মনে আরও কঠিন প্রতিজ্ঞা করে সে। কিন্তু করলেই তো হবে না। সুযোগ পেতে হবে। কিন্তু কে দেবে সুযোগ?

কেউ না জানলেও একজন জানতেন, এই ছেলেটি পারবে। তিনি হলেন পাহাড়ী স্যান্যাল। প্রায় দিন তিনি ছেলেটিকে লক্ষ্য করেন। কিন্তু কোনও কথা বলেন না। ঠিক এমন সময় নির্মল দে তাঁর নতুন ছবি ‘বসু পরিবার’ করার জন্য নায়ক হিসেবে ঠিক করলেন কালী ব্যানার্জিকে। কালী ব্যানার্জি তখন বিখ্যাত নায়ক। কিন্তু নির্মল দে কালী ব্যানার্জির ডেট পেলেন না। নিজের ঘরে বসে ভাবছেন, এখন তাহলে কী করা! এমন সময়ে ঘরে এলেন পাহাড়ী স্যান্যাল। পাহাড়ী স্যান্যালকে সব খুলে বললেন। পাহাড়ী স্যান্যাল অল্প হেসে বললেন, ‘দূর, এত চিন্তা করছ কেন? হাতের কাছেই নায়ক রয়েছে।’

নির্মল দে লাফিয়ে উঠলেন, ‘কে?’ তারপর নায়কের নাম শুনে ধপ করে বসে পড়লেন। বললেন, ‘পাহাড়ীদা আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন? ওকে নিলে সিনেমা হলগুলিতে ঢিল পড়বে, কে সামলাবে বলুন?’

পাহাড়ী স্যান্যাল বললেন, ‘নামটা পাল্টে দাও, কেউ জানতে পারবে না। আমি কথা দিচ্ছি, ওকে নিয়ে ঠকবে না। এখন ও ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে উঠেছে। শুধু অস্ত্র তৈরি করার অপেক্ষা।’ নির্মল দে কি মনে করে, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন। পাহাড়ী স্যান্যাল বললেন, ‘বাপু, বাপের দেওয়া নামের মায়া কি ছাড়তে পারবে? তাহলে একটা সুযোগ আছে।’ ছেলেটি আস্তে আস্তে মাথা নাড়াল। পাহাড়ী স্যান্যাল বললেন, ‘অন্য নাম আছে তোমার?’ ছেলেটি একটু থেমে বলল, ‘দাদু আমাকে উত্তম বলে ডাকতেন।’ লাফিয়ে উঠলেন পাহাড়ী স্যান্যাল। বললেন, ‘নির্মল, দেরি করো না। উত্তম নামটা লাগিয়ে দাও। লেগে যাবে।’ তা-ই হলো। লেগে গেল। হিট হলো বসু পরিবার। বাঙালি পেয়ে গেল এক নতুন নায়ক—উত্তম কুমার। [তথ্যসূত্র: এক এবং অদ্বিতীয়, ডিসেম্বর, ২০১২ সংখ্যা, সাইন ইন্ডিয়া সিনেভিশন অ্যান্ড মিডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা]। এর পর তো বাকি টা তো ইতিহাস।

শুরুর সেই লড়াইটা ছিল ভয়ংকর, ফ্লপ এবং ফ্লপ। হাত থেকে কনট্রাক্টের কাগজ ছিনিয়ে নিয়েছেন প্রযোজক। মুখের ওপর বলে দিয়েছেন, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনার চেহারাটা নায়কোচিত নয়।’ তুলনাটা চলে আসত প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে। দ্বিতীয় প্রতিপক্ষও তখন নেপথ্যে দাঁড়িয়ে; সেই দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। তার ‘মাচো-হিম্যান’ ইমেজে গত শতাব্দীর পঞ্চাশোর্ধ বাঙালিরা তখনও আত্মহারা। হৃদয়ের কুঠুরিতে লেখা হয়ে গেছে দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা প্রমথেশ বড়ুয়া-এই দুই নাম। তাদের পাশে নবাগত উত্তম কুমার। ভাগ্যিস ‘বসু পরিবার’ (১৯৫২) বক্স অফিসের মুখ দেখেছিল। না হলে আজকের বাঙালি কোথায় পেত এই উত্তম কুমারকে? বঙ্কিম গ্রিবা, হৃদয়ে তোলপাড় করা হাসি আর অভিনয়ের চূড়ান্ত আধুনিকতা-এগুলোই উত্তমের সাফল্যের তাস।

যদুবংশ’ ছবির শুটিং চলছে। সাতের দশকের গোড়ার দিক। পার্থপ্রতিম চৌধুরী, পরিচালক, হেঁকে উঠেছেন, ‘‘অল লাইটস’’। পজিশন নিতে গিয়ে উত্তমকুমার খেয়াল করলেন, টপ থেকে কোনও একটা লাইট ঠিকমত তাঁর শরীরে এসে পড়েনি। তখন উপরে কাঠের পাটাতনে লাইটম্যানরা দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতেন, নির্দেশ মতো সুইচ অফ-অন করতেন। সে দিন তেমনই এক জন, নাম তাঁর কালী, হাঁক শোনার পরও ভুলে গেলেন আলো জ্বালতে। শট অবশ্য হয়ে গেল, তবে হয়ে যাওয়ার পর কালীকে ডেকে পাঠালেন উত্তম। শুনে কালী কাঁপতে কাঁপতে উত্তমের মেক-আপ রুমে এলেন। এমনিতে তাঁর কাছ থেকে মাঝেমধ্যেই বিড়ি চেয়ে খান উত্তম, কিন্তু কাজের ভুলের তো কোনও ক্ষমা নেই। কিন্তু উত্তম বকুনি না দিয়ে সস্নেহে তাঁকে বললেন, ‘‘কী হয়েছে রে কালী? অন্যমনস্ক ছিলিস মনে হল, এনি প্রবলেম?’’ হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন কালী, বলেন, ‘‘মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে দাদা, কিন্তু আমি কিছুতেই টাকা জোগাড় করে উঠতে পারছি না। তাই... এমনটা আর হবে না।’’

পরের দিন স্টুডিয়োতে বেরনোর আগে উত্তমের বাড়িতে তাঁরই নির্দেশ মতো কালীকে নিয়ে হাজির পার্থপ্রতিমের সহকারী বিমল দে। তাঁদের দুজনকে নিয়ে স্টুডিয়ো যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠে উত্তম কালীর হাতে হাজার পাঁচেক টাকার একটা খাম ধরিয়ে বললেন, ‘‘এটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখ।’’ এটাই উত্তম কুমার। সৌমিত্র চ্যাটার্জী বহুবার সাক্ষাৎকারে বলেছেন উনার থেকে প্রশংসার অপেক্ষায় থাকতাম।

কেমন ছিলেন ব্যক্তি উত্তমকুমার, মৃত্যুর চার দশক পরে সেটা নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা প্রয়োজনহীন। মানুষ উত্তম মিশুকে; বন্ধু উত্তম আড্ডাবাজ, পুত্র উত্তম মাতৃভক্ত; ইন্ডাস্ট্রির ‘বড়দা’ উত্তম দানশীল; প্রেমিক উত্তম মেদুর; শ্বশুর উত্তম স্নেহশীল; অগ্রজ উত্তম অভিভাবকসম; পেটুক উত্তম ভোজনবিলাসী ইত্যাদি অজস্র আদিখ্যেতা উত্তমকুমারকে নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। গত দু’বছর উত্তমকুমারের সিনেমা নিয়ে একটি বইয়ের গবেষণায় বারবারই চোখে পড়েছে এই রকম গদগদ অসংখ্য স্তুতি। সত্যি বলতে, ঘরে ঘরে এ রকম অনেক ব্যক্তি আছেন, যাঁরা দাদা, সন্তান, শ্বশুর, প্রেমিক হওয়ার বিভিন্ন পরীক্ষায় হয়তো সসম্মান উত্তীর্ণ হবেন। কিন্তু উত্তমকুমার একটাই হয়, একটাই। কাজেই ব্যক্তি উত্তমকুমারকে টেনেটুনে অভিনেতা বা স্টার উত্তমকুমারের সমকক্ষ করার এই যে বার্ষিক প্রকল্প বাঙালি প্রত্যেক বছর তার জন্ম আর মৃত্যুদিনে হাতে নেয়, সেটা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু না।

বরং এতে উত্তমের কিছুটা ক্ষতিই হয়, কারণ ব্যক্তি উত্তম খুবই সাধারণ— মধ্যবিত্ত, ভিতু, অনেকাংশে রক্ষণশীলও বটে। ঝুঁকি না নিতে পারার সহজাত অক্ষমতা ভাল সিনেমা বাছার ক্ষেত্রে তাঁকে ডুবিয়েছেও বেশ কিছু বার— এই নিয়ে পূর্ণেন্দু পত্রী বা অগ্রগামীর সরোজ দে’র কিছু স্পষ্ট উল্লেখও আছে। এটা বিশেষ করে চোখে পড়ে মধ্য-সত্তরের দশকে, যখন নিজের উপকথাসুলভ জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে উত্তম কিছু ভাল সিনেমা উত্তরকালকে দিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা করলেন না। বরং নিজেকে বিলিয়ে দিলেন ইন্ডাস্ট্রিকে ‘বাঁচাতে’। থুড়ি, বিলিয়ে দিলেন না, বলি দিলেন। দয়াশীল উত্তম ইন্ডাস্ট্রির জন্য কল্পতরু হলেন। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - Uttam Kumar)


চন্দ্রিমা দত্ত (সাঁজবাতি), লেখিকা ও শিক্ষিকা, শ্রীরামপুর, হুগলি:

ভারতীয় চিত্রনির্মাতা, চিত্র পরিচালক এবং লেখক ও অনুবাদক চিদানন্দ দাশগুপ্তের নাম সর্বজনবিদিত। তাঁর সম্পর্কে কয়েকটি লাইনে লিখতে গেলে সেটি উচ্চ মাধ্যমিকের রচনা হয়ে দাঁড়াবে। তবু আশা করছি নাতনি হবার সুবাদে অল্প  হলেও নতুন কিছু বলতে পারবো।

জন্ম: পরাধীন ভারতের শিলং শহরে ১৯২১ সালে।

বাবা মন্মথ দাশগুপ্ত ছিলেন হাজারীবাগের বিখ্যাত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক, মা শান্তিলতা দাশগুপ্ত সমাজসেবিকা।

নাম করা ব্রাহ্ম পরিবার। তিনভাই ও এক বোন। চিদানন্দ দাশগুপ্ত সবার বড়ো। ছোট ভাই ছোটবেলাতেই ভুল চিকিৎসায় মারা যান। মেজভাই গৌরাঙ্গ দাশগুপ্তও চলে গেছেন কয়েক বছর আগে। একমাত্র ও সবচেয়ে ছোট বোন মীরা দাশগুপ্ত বর্তমানে শিলিগুড়িতে।

চিদানন্দবাবু বিবাহ করেন ১৯৪৪ সালে কবি জীবনানন্দ দাশের দাদা ব্রহ্মানন্দ দাশগুপ্তের কন্যা সুপ্রিয়াকে। ওনার তিন কন্যা - রীনা, রত্না, লক্ষ্মী। বড় কন্যা রীনা সবার পরিচিত অভিনেত্রী ও চিত্র পরিচালিকা অপর্ণা সেন, এবং নাতনী কঙ্কনা সেন শর্মা ।

১৯৪০ সালে কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্টের সময় হাজারীবাগ সেন্ট কোলাম্বিয়া কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে চলে আসেন কলকাতায়। কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইন্সটিটিউটে প্রশান্ত চন্দ্র মহালনবীশের সহকারী হিসেবে কাজ করার পর সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন।

সত্যজিৎ রায় ছিলেন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, একেবারে হরিহর আত্মা। ১৯৪৭ সালে চিদানন্দবাবু সত্যজিৎ রায়ের সাথে প্রতিষ্ঠা করেন "ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি"। পরে ১৯৫৯ সালে ওনার সাথেই স্থাপন করেন "ফেডারেশন অব্ ফিল্ম সোসাইটিজ অব্ ইন্ডিয়া"।

অনুবাদক হিসেবে তিনি যাঁদের লেখার ইংরেজি অনুবাদ করেন তাঁরা হলেন রবিঠাকুর, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জীবনানন্দ দাশ।

ফিল্ম সমালোচক হিসেবে তাঁর লেখা ২৫০০ এরও বেশি আর্টিকেল রয়েছে, যা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসকে করেছে সমৃদ্ধ।

সিনেমা পরিচালক হিসেবে তাঁর সাতটি সিনেমা রয়েছে যেমন "দ্য স্টাফ অব্ স্টিল", "পোট্রেট অব্ আ সিটি ", "আমোদিনী " ইত্যাদি।

লেখক হিসেবে তাঁর লেখা কয়েকটি বইয়ের উদাহরণ দিই - "দ্য সিনেমা অব্ সত্যজিৎ রয়", "সিলেক্টেড পোয়েমস্: জীবনানন্দ দাশ", "দ্য পেইন্টেড ফেস", "টকিং অ্যাবাউট ফিল্মস" ইত্যাদি।

শেষ জীবনটা উনি কলকাতায় কম শান্তিনিকেতনের বাড়িতে বেশি থাকতেন। পারকিনসন্স রোগ তাঁকে পঙ্গু করে হুইলচেয়ারে এনে ফেললেও লেখালেখি থেকে বিরত করতে পারেনি। কিন্তু এই কারণেই তাঁর ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া হয়েছিল।

২০১১ সালের ২২মে তিনি আমাদের ছেড়ে আনন্দলোকে যাত্রা করেন।

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Chidananda Dasgupta)

ইরানী বিশ্বাস, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও পরিচালক, বাংলাদেশ:

চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ নেই, এমন মানুষ বিরল। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতি ভালবাসা এবং চলচ্চিত্র শিল্পকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর অনুদান প্রদান করে থাকে। আমরা সকলেই জানি, বঙ্গবন্ধু সংস্কৃতিবান্ধব ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপস কর্পোরেশন বা বিএফডিসি নির্মান করা হয়েছে। এই বিএফডিসিকে বলা হয় এ দেশের চলচ্চিত্রের সুতিকাগার। ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রের হাত ধরে এদেশে নির্মিত হয়েছে একের পর এক বিখ্যাত, কালজয়ী চলচ্চিত্র। আর এভাবেই দেশ বিদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা চলচ্চিত্রকে পৃষ্ঠপোষক করতে সরকারী অনুদানের ব্যবস্থা করা হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। মাঝখানে বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে নিয়মিত চলচ্চিত্রে অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে এই অনুদানের পরিমান করা হয়েছে পূর্নদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ৭৫ লাখ এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ২০ লাখ টাকা। 

চলচ্চিত্রের অনুদানের জন্য আবেদন করার সময় গল্প, চিত্রনাট্য, দৃশ্যধারণের বিশদ বিবরণ প্রদান করতে হয়। অনুদানে প্রাপ্য টাকার সার্বিক খরচের হিসাব প্রদান করতে হয়। এরপর অনুদান কমিটি যাচাই বাছাই করার পর অনুদানের জন্য গল্প এবং চিত্রনাট্য মনোনিত করা হয়। অনুদান প্রাপ্ত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক স্টেটমেন্ট বার্ষিক আয় দরকার হয়। কিন্তু কেন? যার একাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা থাকবে বা যে প্রতিষ্ঠানের একটি চলচ্চিত্র নির্মানের পর্যাপ্ত টাকা থাকবে তিনি কেন অনুদান পাবেন? আমার জানা মতে, এই অনুদান দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, যেসব পরিচালক মেধাবী অথচ টাকার অভাবে একটি ভাল চলচ্চিত্র নির্মান করতে পারছে না। তাকে বা তার মেধাকে বিকশিত করতে সরকারী ভাবে অনুদান প্রদান করা হয়। অথচ আমাদের সরকারী অনুদান সম্পূর্ন ভুল পদ্ধতিতে প্রদান করা হয়। আবেদনের সাথে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার বিবরন প্রদান করার অর্থ কি? তাছাড়া প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নামে কেন অনুদান বরাদ্দ করা হয়? আমার প্রশ্ন হলো অনুদান প্রদানের সময় যেমন যাচাই -বাছাই কমিটি করা হয়, মুক্তির সময় কেন যাচাই বাছাই কমিটি থাকে না? একটি চলচ্চিত্রের স্ক্রিন দেখে বোঝা যায় তাতে কত টাকা লগ্নি করা হয়োছে। মাননীয় অনুদান কমিটি কখনো কি যাচাই করেছে, যে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেই মানের চলচ্চিত্র নির্মান করা হয়েছে কিনা? মাঝে মাঝে সংবাদ প্রচার হয় যথাসময়ে অনুদানের ছবি শুটিং শেষ করতে না পারায়, তথ্য মন্ত্রনালয় কর্তৃক মামলা করা হয়েছে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অনুদান পেলে কোন কথা নেই। তবে কোন পরিচালক যখন অনুদান পান, তখন ঘটে বিপত্তি। কারন অনুদানের টাকা মধ্য স্বত্বভোগীদের হাতে শর্ত অনুযায়ী চলে যায়। ফলে টাকার অভাবে শেষ পর্যন্ত ছবিটির শ্যুটিং আটকে যায। অনেকেই মনে করেন অনুদানের টাকা পরিচালক ব্যক্তিগত কাজে খরচ করেন। ধারনাটি সম্পূর্ন ভুল। এ পর্যন্ত যত পরিচালক অনুদান পেয়েছেন তারা কেউ-ই আর্থিক ভাবে রাতারাতি  লাভবান হয়নি। সুতরাং অনুদানের টাকা প্রযোজক বা পরিচালকের হাতে আসতে আসতে কমতে থাকে। নির্মানের সময় অঙ্কটা এতই ছোট হয়ে যায় যে, তা দিয়ে চলচ্চিত্রের অর্ধেক কাজ শেষ করা সম্ভব। 

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারী অনুদান প্রাপ্ত অর্ধেকেরও বেশি চলচ্চিত্র এখনো মুক্তি পায়নি। ২০০৭ থেকে ২০১৭ পযর্ন্ত মোট ৪১টি চলচ্চিত্রের মধ্যে মুক্তি পেয়েছে মাত্র ১৫টি। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সরকারী অনুদানের যেসব ছবি মুক্তি পায়নি সেগুলো হলো ১৯৭৬ সালে বেবী ইসলামের মেহেরজান। ২০০৭ সালে এনমুল করিম নির্ঝরের নমুনা। ২০০৮ সালে জুনায়েদ হালিমের স্বপ্ন ও দু:স্বপ্নের গল্প। ২০১০ সালে মির্জা সাখওয়াৎ হোসেনের ধোকা। ফারুখ হোসেনের কাক তাড়ুয়া। ২০১১ সালে মারুফ হোসেনের নেকড়ে অরন্য। সালাউদ্দিন জাকির শিশুতোষ ছবি একা একা। প্রশান্ত অধিকারীর হ্যাডসনের বন্দুক। ২০১৩ সালে ড্যানি সিডাকের কাসার থালায় রূপালী চাঁদ। ২০১৪ সালে নুরুল আলম আতিকের লাল মোরগের ঝুটি। এন রাশেদ চৌধুরীর চন্দ্রাবতী কথা। মাহমুদ দিদারের বিউটি সার্কাস। ২০১৫ সালে এসডি রুবেলের বৃদ্ধাশ্রম। কামরান আহমেদ সাইমনের শঙ্খধ্বনি। ২০১৬ সালে লোনা জলের কাব্য, রূপসা নদীর বাঁকে, আজব সুন্দর, প্রিয় জন্মভুমি, দায়মুক্তি। ২০১৭ সালে কালবেলা, আজব ছেলে, অবলম্বন। এছাড়া নার্গিস আক্তারের যৈবতী কন্যার মন এখনো মুক্তি পায়নি।

মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে বুঝতে পারি কত অবহেলা আর অনাদরে এসব সিনেমা হাতেগোনা কয়েকটি সিনেমা হলে আলোর মুখ দেখতে না দেখতেই  আবার অন্ধকারে মুখ থুবেড়ে পড়ে থাকে। প্রশ্ন হলো, এমন গল্প কেন বেছে নেওয়া হচ্ছে যা জনগন আগ্রহ নিয়ে দেখছে না। চলচ্চিত্র নির্মানের উদ্দেশ্য থাকে বাণিজ্যিক ভাবে লাভবান এবং জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য। অথবা উচ্চমার্গীয় আর্ট ফিল্ম। যা দেশে এবং বিদেশে ব্যাপক প্রশংসনীয় এবং পুরস্কার প্রাপ্ত হবে। সরকারী অনুদান প্রাপ্ত এসব চলচ্চিত্র কোন ক্যাটাগরিতে পড়ে আমার বোধগম্য নয়। সুতরাং অতিসত্বর অনুদানের নামে অর্থ আত্মসাৎ বাণিজ্য বন্ধ করা উচিত। বরং অনুদানের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ বিএফডিসি'তে বিনা সুদে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লোন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। এখান থেকে সহজ শর্তে লোন নিয়ে ভালমানের চলচ্চিত্র নির্মান করা হবে। চলচ্চিত্র মুক্তির পর লোনের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তবে যদি কেউ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা ফেরত দিতে না পারে তার জন্য বিলম্ব ফি নির্ধারন করা যেতে পারে। এভাবে সরকারী অনুদানের টাকার যথাযথ মুল্যায়ন হবে পারে। এতে বিএফডিসি আবার মুখরিত হবে চলচ্চিত্র প্রেমীদের পদচারনায়।চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বেকারত্ব ঘুচিয়ে কাজে নিয়েজিত হবে। সিনেমা হল মালিকরা লাভবান হবেন এবং দেশের জনগন পাবে ভাল মানের চলচ্চিত্র। সুতরাং মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে অনুদানের টাকা রক্ষা করতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

(www.theoffnews.com - Bangladesh film subsidies)

কাকলি সেনগুপ্ত, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

স্মৃতির পাতা উল্টে দেখা গেলে, যেভাবে তাঁকে সবাই চিনেছিল, আমার চেনা ছিল তার চে়য়ে আলাদা। আমার বয়েস, বা তার কাছাকাছি বয়েসের ছেলে বা মেয়েরা যখন তাঁকে ফেলুদা বলে চিনল, আমি তখন-ই  তাঁকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নামে চিনি। বাবা বলেছিলেন, উনি অভিনেতা। যে সময়ে দাঁড়িয়ে বাবা অভিনেতা চিনিয়ে ছিলেন, আমার সে বয়েস অবশ্য ‘অভিনেতা’ শব্দের অর্থ অনুধাবনের বয়েস ছিল না। আমার বয়েস তখন চার। অথবা তাও নয়, পাঁচ হয়ত বা। মনে নেই এখন আর। শুধু মনে আছে যে, স্টার থিয়েটারে মহা ধূমধাম। নাটক হবে, লক্ষণের শক্তিশেল। বাড়ি থেকে যাব আমি, যাবে বাবা। সাদার ওপর ভায়োলেট পোলকা ডট জামা, মাথায় ওই একই কাপড়ে তৈরি হেয়ার ব্যান্ডে সেজে চললাম বাবার হাত ধরে। নাটকের কথা বলতে, মঞ্চ জুড়ে জাম্বুবান বানর আর হনুমানের সারি। গন্ধমাদন পর্বত এনে লক্ষণের মাথায় বসিয়ে দিল হনুমান। এটুকু ফুরোনোর পরে সবাই যখন বেরিয়ে আসছে পায়ে পায়ে, তখন ভি়ড জমতে শুরু করল বাইরে। ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দেখলাম, লাল জামা আর সাদা প্যান্ট পরা একজন, আমার মতন দুটো বাচ্চার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আর তাঁকে ঘিরে অনেক মানুষ। বাবা বললেন, এই যে দেখছ, এই ভদ্রলোকের নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আর বাচ্চা দুজন ওঁর ছেলেমেয়ে। বাড়ি ফিরে মাকে গল্প বলেছিলাম। সাদা মতন লোক, অভিনেতা। বাবার থেকে উঁচু। আমার ভালো লাগেনি। 

এরও অনেক বছর পরে, ২০১৮'তে বোধহয়। মুখোমুখি দেখলাম আবার। আগেও দেখেছি, একাডেমিতে নাটক দেখতে গিয়ে। তবে, তা এমন মনে রাখার মতো কিছু নয়। ডাক্তার-নাট্যকার-নির্দেশক ও কবি অমিত রঞ্জন বিশ্বাসের কবিতার বই ‘মেত্তাবীজ’ এর প্রকাশ অনুষ্ঠান ছিল সেদিন, সে ছিল এমনই নভেম্বর। পরিণত বয়েসের অবজার্ভেশান এমনিতেই অন্যরকম হয়। আর আমি তাঁর গল্প শুনেই বড় হয়েছি। আসলে আমার মার সঙ্গে একই বছরে বি এ পরীক্ষা দিয়েছিলেন দীপা চট্টোপাধ্যায়। সিট পড়েছিল একই কলেজে। মার বন্ধু শেফু মাসি নাকি একদিন মাকে বলেছিলেন, বেশ উত্তেজিত হয়েই বলেছিলেন, উত্তম কুমার এসেছিলেন কলেজে, জানিস? মা বলেছিলেন, কী যে বলিস? শেফু মাসি বলেছিল, হ্যাঁরে, একটা মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে, তাকে পৌঁছে দিতে আসেন। সবাই বলল, গার্লফ্রেন্ড। মা হেসে বলেছিলেন, তাহলেতো হতেই পারে না। আচ্ছা, ছুটির সময়ে দেখা যাবে। ছুটির সময়ে দেখা গেল, উনি মোটেই উত্তম কুমার নন, উনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। 

এরপর, আমি তাঁকে দেখেছি পর্দায়, স্টেজে। আরও, আরও যে সব জায়গায় তাঁর বিস্তার, সেই সবটুকুর খবর রাখতাম। অন্ধত্ব ছিল না, ভালো লাগা ছিল। এবারে সেদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলি। ক্যাফেটি মুখর হয়ে উঠেছিল তাঁর উপস্থিতিতে। গমগম করে উঠছিল তাঁর শব্দচয়ন, তাঁর উজ্জ্বল উচ্চারণে। তাঁর উপস্থিতিতে কবিতা পড়তে গিয়ে, আমিও গলাত এনেছিলাম সবটুকু আত্মবিশ্বাস। তারপর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলাম, আপনাকে ছোটবেলায় একটুও পছন্দ করতাম না। উনি হেসেছিলেন। আমি বলতে পেরে কৃতার্থ হয়েছিলাম। অন্যরকম শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম সেদিন। তাঁর সবটুকুই খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিল যে।

দেবর্ষি মজুমদার, লেখক, বীরভূম:

শান্তি নিকেতন ও সোনাঝুরির মন ভালো নেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মহা প্রয়াণে। চলচ্চিত্র মাধ্যম হতে পারে। তবে যোগসূত্র অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতন, মন্দির সব মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের গন্ধে ভরপুর প্রোডাকশন হাউজের পোস্ত। এই ছায়া ছবির নাম অনেকেরই জানা। 

শিল্পী দিপালী ভট্টাচার্যের বাড়িতে হয়েছিল সুটিং। পোস্তর দাদু দিদিমার বাড়ির সেটিং ছিল সেটাই। সেখানেই দাদু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও দিদা লিলি চক্রবর্তীর বাড়িতে অভিনয় করেন বিশ্বভারতীর অধ্যাপিকা দেবলীনা দালাল মুখোপাধ্যায়। তিনি আবার বাচিক শিল্পীও। তিনি পরিচারিকার অভিনয়ে একটানা নয় দিন কাটিয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাঁর কথায়, অষ্টম দিন পর্যন্ত সম্ভ্রমে কোন কথা বলতে পারি নি। তিনি জানান,  নবম দিন তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে চান। তার উত্তরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, তুমি তো ছবিতেই আছো। আবার ছবি কেন? যাহোক শেষ পর্যন্ত ছবি তুলতে দেন। সেটা আজ তার কাছে এক অমূল্য স্মৃতি। একইভাবে, 'বেলা শুরু' সিনেমায় সোনাঝুরিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিনয় করেন। বেলা শুরু এখনও রিলিজ হয় নি। 

অন্যদিকে, বিশ্ব ভারতীর কলাভবনের নন্দনের প্রাক্তন কোঅর্ডিনেটর অধ্যাপক সুশোভন অধিকারী বলেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি কৃষ্ণ নগর সূত্রে তিনি আমার মামার বন্ধু ছিলেন। আর শান্তি নিকেতনের সাথে তাঁর নিবিড় যোগ। আর এর কেন্দ্রে ছিল রবীন্দ্রনাথ। শান্তি নিকেতনে কবিতা উৎসবে সৌমিত্র বাবু বহুবার এসেছেন। বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর মুল্যায়নে আরও প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। এক কথায় শান্তি নিকেতন আজ সুজন হারালো, হারালো তার স্বজন।

সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও শিক্ষিকা, শিবপুর, হাওড়া:

পূজোপর্ব শেষের বিষণ্নতায় আমরা মগ্ন। মা দুর্গাতো ফিরেই গেছেন কৈলাশে, দীপাবলিও যাব যাব প্রস্তুতি। মায়ের ময়ূরবাহন পুত্র তাই এবার মহামায়া মায়ের সাথে ফিরে চললেন অনন্ত ধামে? তিনি চলে গেলেন আজ। আচ্ছা এই কৈলাসের আশেপাশেই কি না ফেরার দেশ? 

মা গেলেন পিছনে রয়ে গেল করোনা আক্রান্ত মানুষজন। মানুষের আবেগ আকাঙ্ক্ষা আশা আজ যেন বড়ই হতাশ। উৎসবের আতিশয‍্যে মানুষ কি বোধ বুদ্ধি লোপ পেয়েছিল নাকি করোনার হতাশায় মানুষ বড্ড বেশী দুঃসাহস দেখিয়ে ফেলল? 

বাঙালি আত্মসর্বস্ব জাত এমন নিন্দা কেউ করবেন না কিন্তু বাঙালি সত্যি কি আত্মঘাতি জাতি?

উৎসবের আনন্দে কোথাও কি নিজের জন‍্য গণমৃত‍্যু মিছিলে যোগ দিল জাতিটা? কি করেনি এই জাতিটা নোবেল দিয়েছে অস্কার দিয়েছে। ফ্রান্সের সর্ববোচ্চ পুরস্কার এনেছে। 

যার হাত ধরে এসেছে তিনিও পা রাখলেন না ফেরার দেশে। হ‍্যাঁ পুলুদার কথা বলছি। পুলুদার চলে যাওয়ার সাথে সাথে একটা যুগ শেষ হল। মহানায়ক উত্তমকুমারের সমসাময়িক নায়ক সৌমিত্র। মানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যদিও সৌমিত্র ছিলেন ছোটো। মহানায়ক তখন মধ‍্যগগনে কি তার দাপট! কি তার তেজ! মহানায়ক সূর্য হলে সৌমিত্র হলেন অন‍্য গ‍্যালাক্সির নাম না জানা কোনো এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। দুজনের আলোকছটায় কেউই কারোর চোখ ধাধা লাগাতে পারেনি। নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বমহিমায় দুজনেই ছিলেন সমভাবে উজ্জ্বল।

উত্তম কুমার চলে যাওয়ার পর বাংলা চলচ্চিত্র যিনি শিবরাত্রির সলতের মত আগলেছেন তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অভিভাবকও বটে। করোনা আবহে টলিপাড়া এমনিতেই ধুঁকছে, আজ যেন অভিভাবকহীন।  সত‍্যজিত রায়ের "অপু" তাঁর সংসারের মায়া কাটিয়ে ছায়াছবির জগৎ থেকে পাড়ি দিলেন কোন এক মায়ার দেশে। বিশ্বজুড়ে গুণমুগ্ধ মানুষজন একমনে অন্তর থেকে বলেছেন ফাইট ফেলুদা ফাইট। যেভাবে আপনি বলেছেন ফাইট কোনি ফাইট।

কোথাও কি অভিমান কাজ করেছে? জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত নিজেকে ভালবেসে অভিনয়ে যুক্ত রাখলেন। খালি মন বলছে আপনি সেই দরাজ গলায় বলে উঠবেন, "তোমরা বিহ্বল কেন তোমরা কেন হতাশ এত? কিচ্ছু দেখোনি কিছু বোঝোনি। ঠিক যেভাবে আপনাকে বলা হয়েছিল "মাষ্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছু  দেখেননি।"

মনে পড়ে ঝিন্দের বন্দি মুভির কথা? নায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে ময়ূরবাহন লম্পট ক্রূর অথচ চেহারায় কন্দর্পনারায়ন সুদর্শন। উত্তমকুমার রেইনিং কিং আর সৌমিত্র রাইজিং স্টার। "অপুর সংসার" য়ে নায়ক থেকে একেবারে খলনায়ক। চেহারা নায়কোচিত কিন্তু চোখে মুখে ক্রূরতা। একেই বলে অভিনয়ের মুন্সীয়ানা।

আপামোর বাঙালির চোখের মণি অপু কিম্বা আদরের ফেলুদার মধ‍্যে ময়ূরবাহনকে এযুগের নেক্সজেন বাঙালি চেনেই না। 

ময়ূরবাহন সেলুলয়েড ঝিন্দে বন্দি হয়েই রইলেন। 

প্রথম জীবনে আকাশবাণীর ঘোষক, তারপর শিশিরভাদুড়ির হাতধরে মঞ্চে, সেলুলয়েডে এলেন সত‍্যজিত রায়ের হাত ধরে। তারপর একে একে পরিচালকরা দিয়েছেন নানা রূপে 

নায়ককে। তপনসিনহার ক্ষুধিতপাষাণ, অজয়করে সাত পাকে বাঁধা, দিনেন গুপ্তর বসন্তবিলাপ। অপর্ণা সেন এর পারমিতার একদিন শিবপ্রসাদ নন্দিতা জুটির বেলাশেষে, প্রাক্তন পোস্ত নানা রূপে নানাভাবে। শেষের কবিতায় তার আবৃত্তি 

"ওগো বন্ধু,

সেই ধাবমান কাল

জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার

জাল.."

ময়ূরবাহন, করোনার ঘূর্ণিপাকে আটকে গেলে! আবৃত্তি কানে আসছে

...তুলে নিল দ্রুতরথে

দু’সাহসী ভ্রমনের পথে

তোমা হতে বহু দূরে।

মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে

পার হয়ে আসিলাম

আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়;

রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়।

ময়ূরবাহন ময়ূররথ তৈরি, বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন রাজার জন‍্য। কানে আসছে কালজয়ী গানটা,

যদি সব ছাড়িয়ে 

দুটি হাত বাড়িয়ে

হারাবার খুশিতে

যাই শুধু হারিয়ে 

যেতে যেতে কারো ভয়ে

থমকে দাঁড়াব না

সামনে যা দেখি, জানি না সে কি 

আসল কি নকল সোনা... 

বেলাশেষে হীরকরাজার দেশের ছাইচাপা খাঁটিহীরে "উদয়ন পন্ডিত" চলে গেলেন না ফেরার দেশে হেমন্ত বিলাপে।

কালীরূপী কৌশিকী দুর্গা কি অপুর জন‍্য অপেক্ষায়? শরৎ শেষে কাশের বনে কেমন দোলা দিচ্ছে! কু ঝিক কু ঝিক.....জীবনের শেষ ট্রেনটা চলে গেল।

ময়ূরবাহনের ময়ূররথ আজ দূরে বহুদূরে, হয়তো অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে প্রথম কদম ফুলের অপেক্ষায়।

সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার ও শিক্ষিকা, শিবপুর, হাওড়া:

(নানা চলচ্চিত্রকে স্মরণ করে প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্ট‍্যোপাধ‍্যায়ের দ্রুত আরোগ‍্য কামনায় এই প্রতিবেদন।) 

"দেবী" ফিরে গেলেন কৈলাসে, "চেনা অচেনা" মানুষের শুভ বিজয়ায় ভেসে গেলাম এই অশুভকালে। কিন্তু কিছুই তো শুভ হলো না। চারিদিকে বিষাদের লম্বা তালিকা তবু শেষে ক্রমশ..."বেলাশেষে" করুণ "স্বরলিপি"তে তানপুরা বাজিয়ে চলেছেন কোন এক শিল্পী।

তবু আমরা ভালোর আশায় "জীবন সৈকতে" "খুঁজে বেড়াই" "নতুন দিনের আলো"। কবে সেই ভালো দিন আসবে? কি এক "আতঙ্ক" গ্রাস করছে প্রতিনিয়ত। করোনার "অশনি সঙ্কেত" "ঘরেবাইরে" "হাটেবাজারে" সর্বত্র। "শাখাপ্রশাখা" বিস্তার করে এগিয়ে চলেছে এই "গণশত্রু"!  সাবধান হন সবাই। 

আজ অপুর খুব বড় "অসুখ" এক "অপরিচিত"  করোনাশত্রুর আক্রমণে। অর্ধচেতনে এখন "অপুর সংসার"। অবচেতনে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কি ভীষণ লড়াই যে করছেন!

চলচ্চিত্রের "গণদেবতা" সৌমিত্র চট্ট‍্যোপাধ‍্যায় আপনার জন‍্য অনুরাগীরা "পদ্ম গোলাপ" নিয়ে অপেক্ষা করছে আপনার পুজোর জন‍্য। 

সবার ঐকান্তিক কামনায় আপনি সাড়া দেবেন এই আশাকরি। কিছুইতে কোন অবস্থাতেই যতই আসুক "অতল জলের আহ্বান", আপনি যে আমাদেরই মনের মনিকোঠায়। 

জয়সলমীরের "সোনার কেল্লা" অপেক্ষা করছে ফেলুদার জন‍্য আজও। "সাঁঝবাতির রূপকথা"রা "নিশিযাপন" করছেন আপনার আরোগ‍্য কামনায়। এই "মহাপৃথিবী" পথ চেয়ে, আবার কবে হবে অভিযান "তিন ভুবনের পারে"?

আপনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী অপরাজিত অপ্রতিরোধ‍্য! শেষের কবিতা পাঠ এখনো হয়নি শেষ। জানি এ জীবন বহমান... তবু এখনি বলবেন না, "হে বন্ধু বিদায়..."। দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন শ‍্যামসাহেব "প্রথম কদম ফুল" দিয়ে আপনার আরোগ‍্য কামনা করি।


কাকলি সেনগুপ্ত, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

জুন মাসের চোদ্দ তারিখ মৃত্যু হয় বলিউডের অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের। অস্বাভাবিক মৃত্যু। মুম্বাই পুলিশ জানায় আত্মহত্যা করেছেন বলিউডের অভিনেতা। কোনও তদন্ত না করে, তাঁরা জানালেন। আর সরাসরি এই বয়ানই টেলিকাস্ট করা হলো। যেন  রানওয়েতে না দৌড়েই টেক অফ করল বিমান। অস্বাভাবিক লাগল অনেকের। তাঁরা চেঁচামেচি শুরু করলেন। অভিনেতার গলার দাগ ও আরও অনেক কিছু দেখে তাঁরা একজোট হলেন। বললেন, "জাস্টিসফরসুশান্ত"।

ঘটনার  চল্লিশ দিন বাদে অভিযোগ জানালেন, অভিনেতার  বাবা। জানা গেল যে, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মৃত্যুর সময় উল্লেখ করা হয়নি। এই, এইটেই কিন্তু আসল কথা। শ্রীযুক্ত রাজদীপ  সরদেশাইয়ের অভিধায় এক ছোটোখাটো স্টারকে নিয়ে সময় নষ্টের শুরু। আমার মতন করে শুনবেন একবার? সবটা একত্র করলে সেন্টেন্সটা খানিকটা এরকমই যেন দাঁড়ায়। ছোটোখাটো স্টার তার মৃত্যুর আবার সময় কী? কেমন শিরশির করে উঠল শিরদাঁড়া। আমরা যারা স্টার নই,  কিষাণ-দলিত-নিম্নবিত্ত, তারা? এই যে পথেঘাটে এত মানুষ মারা গেল তারা? 

তাদের কথা থাক। এই সমস্ত ধাঁধার বুনন যাদের তাদের প্রসঙ্গও থাক। জল এখন ঘোলা হতে হতে পাঁক। মিডিয়া জুড়ে নাটক। কী যেন বলে? উইচহান্ট। পরবর্তীতে  গ্রেফতার হয়েছেন রিয়া চক্রবর্তী। সমবেদনা জানাবো না। তাঁর অপরাধ কতটুকু তা সময় বলবে। শুধু চাইব, কোনও নিরপরাধ যেন শাস্তি না পান। অকারণে দণ্ড পেলে মানুষ অপরাধের দীক্ষা নিয়ে সংশোধনাগারের  বাইরে বেরোয়। আর  অপরাধের বৃত্তে অনায়াস  হলে, পরামর্শদাতার জয়ের অস্ত্র হতে হতে মানুষ হিসেবে নষ্ট হয়ে যায়, পচে যায়।