Articles by "যুক্তিবাদ ও বর্ণপরিচয়"
Showing posts with label যুক্তিবাদ ও বর্ণপরিচয়. Show all posts

সুকন্যা পাল, ম্যানেজিং এডিটর, দ্য অফনিউজ, কলকাতা:

দেশ অনেক। ভাষা, মতামত ভিন্ন। কিন্তু আমাদের পৃথিবী একটাই। এই পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে দরকার সচেতনতা। আর ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে কনটেন্ট ক্রিয়েটার্সরাই হয়ে উঠতে পারে পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির অন্যতম হোতা। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত IAMCR 2025 কনফারেন্সে‌ অংশগ্রহণ করে এমনই মতামত তুলে ধরলেন তন্ময় সামন্ত। বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে ওঠা তন্ময় সামন্ত বর্তমানে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স ইউনিভার্সিটির একজন ফ্যাকাল্টি মেম্বার। তিনি সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত IAMCR 2025 কনফারেন্সে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করলেন। পরিবেশ ন্যায় (Environmental Justice) নিয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করে তিনি কেবল প্রশংসা নয়, বরং বিশ্বের নানা দেশের খ্যাতনামা প্রফেসর ও মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আন্তরিক স্বীকৃতি অর্জন করেন। বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে বড় হয়ে ওঠা তন্ময় নিজের আত্মবিশ্বাস ও স্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন ও যোগাযোগ বিষয়ক বৈশ্বিক আলোচনায় নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

১৩ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের নামী নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয় International Association for Media and Communication Research (IAMCR) 2025। এবারের সম্মেলনের মূল থিম ছিল— “Communicating Environmental Justice: Many Voices, One Planet”। সম্মেলনে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ১৫০০ জন গবেষক, শিক্ষাবিদ ও মিডিয়া পেশাজীবী অংশগ্রহণ করেন। বিভিন্ন কী-নোট বক্তৃতা, থিমেটিক প্যানেল ও রাউন্ডটেবিল আলোচনার মাধ্যমে জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ ও ন্যায্যতার বার্তা তুলে ধরা হয়।

তন্ময় সামন্ত সম্মেলনে দুটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। তাঁর প্রথম পত্র “Digital Greenwashing: Analysing the Role of Content Creators in Sustainability Narratives”, যেখানে তিনি দেখান কিভাবে কিছু সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট ক্রিয়েটর পরিবেশবান্ধবতার মুখোশ পরে মূলত ভ্রান্ত বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার কিছুজন কিভাবে পরিবেশ সচেতনতায় অগ্রণীর ভূমিকা পালন করছেন। দ্বিতীয় গবেষণাপত্র “Championing the Fight Against Climate Change: A Thematic Dissection of Selected Indian Films on Environmental Issues”—এই প্রবন্ধে তিনি বিশ্লেষণ করেন ভারতীয় মূলধারার চলচ্চিত্র কীভাবে পরিবেশ সংকট ও জলবায়ু আন্দোলনের বার্তা বহন করে। উভয় প্রবন্ধই আন্তর্জাতিক গবেষকদের মধ্যে গভীর আলোচনার জন্ম দেয় এবং ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বকে বৈশ্বিক অঙ্গনে তুলে ধরে।

নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তন্ময় সামন্ত বলেন, “একটি গ্রামীণ পটভূমি থেকে উঠে এসে এবং বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে আমি যখন আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে নানা দেশের বর্ষীয়ান গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা করছিলাম, তখন নিজেকে অসম্ভব গর্বিত ও অনুপ্রাণিত মনে হচ্ছিল। এই কনফারেন্স প্রমাণ করেছে, চিন্তাশীল গবেষণা ভাষা বা ভৌগোলিক সীমার তোয়াক্কা করে না।"  তিনি আরও বলেন, “IAMCR 2025 শুধুমাত্র একাডেমিক অর্জন নয়, বরং এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক বিনিময়ও ছিল। এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারা আমার কাছে এক বড় সাফল্য।”

শুধু গবেষণাপত্র উপস্থাপন নয়, তন্ময় অংশ নিয়েছিলেন গ্রিন কমিউনিকেশন এথিক্স, যুব সমাজের জলবায়ু আন্দোলন এবং ডিজিটাল স্টোরিটেলিং নিয়ে নানা আলোচনা সভায়ও। তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল, ছোট শহর ও আঞ্চলিক শিক্ষার পটভূমি থেকেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব। সম্মেলনে তিনি যুক্তরাজ্য, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেন।

IAMCR 2025 শুধু একটি গবেষণা প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলকতা, বৈচিত্র্য এবং জ্ঞানবিনিময়ের এক অনন্য উদাহরণ। তন্ময় সামন্তের জন্য এটি ছিল এক ব্যক্তিগত ও প্রফেশনাল মাইলস্টোন—একটি মুহূর্ত যা বাংলা তথা ভারতের গর্বের।

(www.theoffnews.com Tanmay Samanta)


সুমিত তালুকদার, সিনিয়র জার্নালিস্ট, নৈহাটি, উত্তর ২৪পরগনা:

বর্তমানে ছাত্রছাত্রীরা অনায়াসে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়ারা নানাভাবে এর সুফল ভোগ করছে যা এক দশক আগেও কল্পনা করা যেত না। সরকার যেন প্রতিটা পরিবারের সর্বময় কর্তা অভিভাবক হিসেবে পরিবারের সদস্যদের লেখাপড়া শেখানোর পাশাপাশি যাতে অন্য কোনও সমস্যা (বিশেষ করে আর্থিক) না হয়, স্কুলছুটের সংখ্যা বৃদ্ধি না পায় সেদিকে কড়া নজরদারি চালিয়ে সময়োচিত দায়িত্ব পালন করে চলেছে। আর তাই স্কুলে একবার নাম নথিভুক্ত করতে পারলে, ভর্তি হতে পারলে আর ফিরে দেখার সমস্যা নেই। সব দায়িত্ব তখন সরকারের কাঁধে। শিক্ষা মন্ত্রক থেকে শিক্ষা দপ্তর নানাবিধ সুযোগ সুবিধা, প্রকল্পের আকর্ষণীয় ডালা সাজিয়ে পড়ুয়াদের বৈতরণী পার করানোর দায়িত্বে অবিচল। ছাত্রীদের পড়াশোনার টাকা নেই, বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যাশিক্ষা চালিয়ে যেতে চায় আছে কন্যাশ্রী প্রকল্পের সুবিধা। ছাত্রদের জন্য যুবশ্রী। দূরদূরান্ত থেকে স্কুলে আসতে সমস্যা, আছে দ্বিচক্র যানের সুবিধাযুক্ত সবুজসাথী। সংখ্যালঘুদের জন্যও আছে বিশেষ সুবিধাযুক্ত ঐক্যশ্রী। অনলাইনে ক্লাস করার জন্য স্মার্টফোন নেই? দরাজ সেখানেও সরকার, ট্যাব কেনার জন্য ১০,০০০ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। স্টুডেন্টস ক্রেডিট কার্ডেরও ব্যবস্থা আছে। এছাড়া পুষ্টিকর আহারের জন্য রয়েছে মিড ডে মিলের ঢালাও বন্দোবস্ত। চাল, আলু, চিনি, ডাল, ছোলার পাশপাশি প্রোটিন সমৃদ্ধ সয়াবিন। করোনা সংক্রমণ রোধ করার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং মাস্ক বিলি তো আছেই। এই ভয়ঙ্কর করোনা অতিমারীর সময়েও তা অব্যাহত থেকেছে এবং শিক্ষক শিক্ষিকারা ঝুঁকি নিয়েও সরকারি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।

বাস্তবিকই এ প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা সত্যি ভাগ্যবান। সবকিছুই ফ্রিতে পাচ্ছে। পড়াশোনার বিপুল ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে যখন বহু পরিবারের ছেলে মেয়েরা সামান্য সাক্ষরতা থেকে বঞ্চিত, স্কুলছুট হয়ে পড়া, বাধ্য হয়ে পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য অন্য পেশায় নিযুক্ত হওয়া তখন এই সব সরকারি প্রকল্পের সুযোগ সুবিধা লাভ করে তারা নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। তাই স্কুলে একবার ভর্তি হতে পারলে আর কোনও আর্থিক সমস্যা, বিদ্যাশিক্ষা লাভ থেকে বঞ্চিত বা নিরাশ হওয়ার কারণ নেই। বিদ্যালয়ের দুয়ারে আছে সরকার।

এ পর্যন্ত ভাবলে সব ঠিকঠাক আছে বলেই মনে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে সরকারি প্রকল্পের এতসব আকর্ষণীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করার পর, মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ কি? শিক্ষিত বেকার হয়ে বসে থাকলে তো পেট চলবে না, আয়ের উৎসের অভিমুখ তখন বদলে যাবে। বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে তা সমাজের কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। সুতরাং চাকরি চাই, চাই যোগ্য কর্ম সংস্থান। সেই স্বপ্নপূরণ হবে কি করে, তার প্রকৃত সমাধান কোথায়? কোটি কোটি টাকা খরচ করে এইসব অপ্রত্যাশিত সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া, প্রকল্প রূপায়ণের পিছনে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে কি? এইসব সরকারি সুযোগ সুবিধা যখন আগে ছিল না তখন কি ছাত্রছাত্রীরা দলে দলে স্কুলছুট হয়েছে, আর্থিক অনটনে আক্রান্ত হয়ে মাঝপথে পড়াশোনা হঠাৎ থামিয়ে দিয়েছে নাকি পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয়নি, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারেনি? এভাবে বিচার করলে অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি ও অসংগতি চোখে পড়তে পারে। যাহোক তবু কিছু তো হচ্ছে, এই প্রত্যাশা নিয়ে, এই সুযোগ সুবিধার সদ্ব্যবহার করে এগিয়ে চলুক বর্তমান প্রজন্মের ভাগ্যবান পড়ুয়ারা।

(www.theoffnews.com - education)

সাজিয়া আক্তার, রেসিডেন্সিয়াল এডিটর (বাংলাদেশ), দ্য অফনিউজ:

সূর্যের শরীর ঝলসে দেওয়া তাপে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাওয়া আর সাগর, মহাসাগরের সবটুকু পানি উবে যাওয়ার আগেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে ফুরিয়ে যাবে অক্সিজেন। ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে যাবে পৃথিবীর চারপাশের ওজোন গ্যাসের চাদর। সব ধরনের সৌর বিকিরণ ও মহাজাগতিক রশ্মির আক্রমণ থেকে যা বাঁচিয়ে রাখে আমাদের।

সৌর বিকিরণ আর মহাজাগতিক রশ্মি ভেঙে চুরমার করে দেবে এই নীলাভ গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে। কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো যে গ্রিনহাউজ গ্যাসের বাতাসে নির্গমনের মাত্রা বৃদ্ধিতে আমরা এখন উদ্বিগ্ন, সেই গ্যাসই তখন আর থাকবে না বায়ুমণ্ডলে। ফলে, অক্সিজেন নির্ভর প্রাণের পক্ষে টিকে থাকা যেমন সম্ভব হবে না, তেমনই অসম্ভব হয়ে পড়বে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষও।

২৪০ কোটি বছরেরও আগে পৃথিবীর পরিস্থিতি যে রকম ছিল আবার ফিরে যাবে সেই অবস্থায়। তখন পৃথিবী ভরে যাবে অত্যন্ত বিষাক্ত মিথেন গ্যাসে। বিভিন্ন তাত্ত্বিক মডেল খতিয়ে দেখে করা সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই অশনিসংকেত দিয়েছে। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকা ‘নেচার জিওসায়েন্স’ এ।

গবেষকরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের ঔজ্জ্বল্যের বাড়া-কমার প্রবণতা এবং তার প্রেক্ষিতে বায়ুমণ্ডলে কিভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ কমে-বাড়ে, সেই সবকিছুর যাবতীয় তথ্যও বিশ্লেষণ করেছেন।

ভিন গ্রহে কী প্রকৃতির প্রাণের খোঁজ মিলতে পারে, সেই প্রাণ বেঁচে থাকে কোন কোন প্রাকৃতিক উপাদানের উপর নির্ভর করে তা জানার লক্ষ্যে নাসার একটি বিশেষ প্রকল্প ‘নেক্সাস ফর এক্সোপ্ল্যানেট সিস্টেম সায়েন্স’র অংশ এই গবেষণাটি।

এই গবেষণার দুই মূল গবেষক আমেরিকার জর্জিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক ক্রিস রেনহার্ড ও জাপানের তোহো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী অধ্যাপক কাজুমি ওজাকি দাবি করেছেন, এমন পরিস্থিতি আসবে সূর্যের তাপে পৃথিবী জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার আগেই। সেই সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভরে যাবে শুধুই বিষাক্ত মিথেন গ্যাসে। যে গ্যাসে নির্ভর করে বাঁচতে পারে বিশেষ কয়েকটি অণুজীব। তখন মানুষ, অক্সিজেনের উপর নির্ভরশীল কোনও প্রাণী বা সালোকসংশ্লেষ নির্ভর কোনও উদ্ভিদই আর টিকে থাকতে পারবে না পৃথিবীতে। ২৪০ কোটি বছরেরও আগে এমনই অবস্থা ছিল পৃথিবীর। এই গ্রহ আবার সেই পরিবেশে ফিরে যাবে। সেটা আর ১০০ থেকে ২০০ কোটি বছরের মধ্যেই হতে পারে।

গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, গবেষণার এই ফলাফল বুঝিয়ে দিচ্ছে, মিথেন বা অন্য কোনও গ্যাস নির্ভর প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে ভিনগ্রহে। এ বার সেই ধরনের প্রাণের খোঁজার সময় এসে গেছে।

(www.theoffnews.com - oxigenless earth)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

বছর দুয়েক আগের কথা। বাংলার অন্যতম পরিচিত পর্যটন স্থল বড়ন্তি গ্রামের শেষ প্রান্তে থেমেছি সামনের জলাধারে থাকা পদ্মের ছবি তুলব বলে। জলের ধারেই সুন্দর পরিবেশে একটি ছোটখাটো প্রাথমিক স্কুল। ঘন্টা পড়তেই হৈ হৈ করে স্কুল থেকে বেরিয়ে এল শ'খানেক শিক্ষার্থী। তাদের পিছনে তিন জন শিক্ষক শিক্ষিকা। ওইটুকু স্কুলে এত ছেলেমেয়ে আশা করিনি। শিক্ষক শিক্ষিকাও গ্রামের মানুষ, আলাপী। আমায় দেখে কোথা থেকে আসছি, কি করি এসব নানা কথার মাঝে আমি জিজ্ঞাসা করলাম আপনাদের স্কুলে তো অনেক ছাত্র ছাত্রী। ওরা জানালেন গ্রামের স্কুলে এমনিতেই ছাত্র ছাত্রী বেশিই থাকে। কারন একবেলা খাবারের এই সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। তার উপরে আজ ডিম ছিল, ডিম থাকলে সেদিন উপস্থিতিও অন্যদিনের তুলনায় বেশিই থাকে। বাড়ি ফেরা ছেলেমেয়েদের মুখেও দেখলাম বেশ তৃপ্তির খুশি।

সেই ডিম এখন আর মিড ডে মিলে থাকে না। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে ডিম সরে গিয়েছে বছর খানেক হল। এর পিছনেও একটা গল্প আছে। হুগলির একটা স্কুলে মিড ডে মিলে নুন ভাত খাওয়ানোর ছবি প্রকাশ করেন বিজেপি সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়। তার পরেই হুগলির তৎকালীন জেলাশাসক তৎপর হন, জেলার সব স্কুলে মিড ডে মিলে সাত দিন সাত রকম পদের কথা জানান। যেখানে মাছ, মাংস এবং ডিম তিনটেই দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এটা দেখে উৎসাহিত হয়ে পূর্ব মেদিনীপুর সহ আরও কয়েকটি জেলাও একই ঘোষণা করে। ব্যস এতেই চটে যান মুখ্যমন্ত্রী, পূর্ব বর্ধমানের প্রশাসনিক সভায় তিনি সাফ জানিয়ে দেন এই নির্দেশ তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়নি, সুতরাং এটা বাতিল। মিড ডে মিলে ডিম দেওয়ার মত অর্থ তাদের নেই। মন্ত্রী আমলার যুদ্ধে বঞ্চিত হল শিশুরা। বিতর্ক উস্কে দিয়ে কেউ বলতেই পারেন যে পুজো কমিটিকে না চাইতেই টাকা দেওয়া যায়। ক্লাবগুলিকে দান করা যায় প্রচুর টাকা। কিন্তু নতুন প্রজন্মের পুষ্টির জন্য মুখ্যমন্ত্রীর নিদান “আমি বলছি, মিড ডে মিলে ভাত-ডাল আরেকটা তরকারি পেট ভরে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করুন”।

আর একটা মজার কথা বলি। বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে আগে হঠাৎ মিড ডে মিলের পরিমান মাথাপিছু বেড়ে যায়। কোভিড সতর্কতায় গত বছর স্কুল বন্ধ হওয়ার পর মিড ডে মিলের খাদ্য সামগ্রী বিতরণ শুরু করে রাজ্য। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদের হাতেই তা তুলে দেওয়া হচ্ছে। গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত চাল, আলু, এবং সাবান দেওয়া হলেও। মার্চ থেকে অভিভাবকদের প্যাকেটে যোগ হয় এক কিলো ছোলা, ৫০০ গ্রাম চিনি, ২৫০ গ্রাম ডাল, এবং ২০০ গ্রাম সোয়াবিনের প্যাকেট। এবার আসল মজা হল ভোট মিটে যেতেই জুন মাস থেকে ফের কমে গিয়েছে এই পরিমান। চিনির পরিমাণ ৫০০ গ্রাম থেকে কমিয়ে আড়াইশো গ্রাম করা হয়েছে। সোয়াবিন এর পরিমান কমিয়ে করা হয় ১০০ গ্রাম। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ছোলা। সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ সয়াবিনও। এবার যদি নিন্দুকেরা বলেন যে ভোট পেতেই মিড ডে মিলের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছিল, খুব ভুল হবে কি? 

এ তো গেল আমাদের রাজ্যের কথা। ধোয়া তুলসি পাতা নয় কেন্দ্রের সরকারও। মিড ডে মিলে কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথ ভাবে খরচ করে। ২০১৪ সালে যখন মোদি সরকার ক্ষমতায় আসে তখন এই প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছিল ১৩,২১৫ কোটি টাকা। পরের বছরই তা কমিয়ে প্রায় অর্ধেক, ৭৭৭৫ কোটি টাকা করে দেওয়া হয়। তার পরে তা আর খুব একটা বাড়েনি। বোঝাই যাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টি বা বিকাশে মোদি সরকারের সদিচ্ছা কতটা। এখন মিড ডে মিলের নাম বদলে পি এম পোষণ রেখে সেই মিড-ডে মিল প্রকল্পেরই কৃতিত্ব নিতে চাইছেন মোদি। সেন্ট্রাল ভিস্তার জন্য টাকার অভাব হবে না, জোর গলায় জানিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রের সরকার। কিন্তু সেন্ট্রাল ভিস্তার মত প্রকল্প যারা পরে এসে ভোগ করবে তাদের স্বাস্থ্য বা পুষ্টির বিকাশে সামান্য অর্থও বৃদ্ধিও বাজেটে দেখা যায় না। শিশুদের পুষ্টির জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বার বার বলে এসেছেন বিভিন্ন সংগঠনের মানুষ, শিক্ষক শিক্ষিকারা। কিন্তু একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করেই দায় এড়িয়েছে দুই সরকার। অথচ ১৯৮০ সাল থেকে এই প্রকল্প সার্থক ভাবে নিজেদের দায়িত্বে পালন করে এসেছে তামিলনাড়ু। তাদের সঙ্গেই আসবে কেরলের নামও। আমাদের রাজ্য যথেষ্ট পিছিয়ে ছিল এ ব্যাপারে, এখনও আছে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী দয়ালু, কন্যাশ্রী, সবুজসাথীর মত এক রাশ প্রকল্পে প্রচুর অর্থ খরচ করছেন তিনি। অথচ শিশুদের সপ্তাহে অন্তত দুটি করে ডিম দিতে হলে খুব সাংঘাতিক কিছু খরচ কি বেড়ে যেতো? কিন্তু সামান্য ইগোর লড়াইয়ে আজ আমাদের শিশুরা বঞ্চিত। 

আরও খারাপ অবস্থা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রেরও। যে শিশুদের প্রতি দিন খিচুড়ি, অন্তত আধখানা ডিম, সব্জি-সয়াবিন, ছাতু-গুড়ের লাড্ডু পাওয়ার কথা, তাদের জন্য অতিমারি কালে ‘আইসিডিএস ডিরেক্টরেট’ বরাদ্দ করেছে গোটা মাসে দু’কেজি চাল, দু’কিলো আলু আর তিনশো গ্রাম মুসুর ডাল। গত জানুয়ারি মাস থেকে তাও বন্ধ। গ্রামাঞ্চলে যে স্কুলগুলি খিচুড়ি স্কুল নামেই পরিচিত ছিল সেই স্কুলে এখন খিচুড়ি দেওয়া তো দূরে থাক, বহু জায়গায় তালাই খুলছে না। 

বড়ন্তির সেই স্কুলের মতই আমাদের রাজ্যে হাজার হাজার স্কুলের শিশুদের সহায় মিড ডে মিল। শহরাঞ্চলে কিছু কিছু স্কুলে মিড ডে মিল তেমন জনপ্রিয় না হলেও একটু গ্রামের দিকে বহু পরিবারের শিশুদের দুপুরের খাবারের প্রধান বা একমাত্র সম্বল এই মিড ডে মিল। কারও কারও হয় তো ওই একবেলাই খাবার জোটে। সেই খাবারটুকু থেকেও ডিম সয়াবিন প্রভৃতি কেড়ে নেওয়া হলে এই সব শিশুদের পুষ্টি থাকে না বললেই চলে। অতিমারির এই সময়ে বরং তাদের বেশি করে এখন পুষ্টিকর খাবার দরকার। কিন্তু শিশুরা ভোট দেয় না, এদের অতিসাধারণ বাবা মায়েরাও উচ্চস্বরে রা কাড়েন না কখনই। তাই অনেকটা উপেক্ষিত আমাদের এই ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য ভাবার কেউ নেই। এগুলি নিয়ে বিধানসভা বা লোকসভায় কোনও হৈচৈ হয় না। কোনও রাজনৈতিক নেতা এই সব সামান্য কারন নিয়ে কিছু বলেন না। তাই নীরবে নিঃশব্দেই অপুষ্টির আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছে কলকাতার… থুড়ি পশ্চিমবঙ্গের যিশুরা।

(www.theoffnews.com midday meal Mamata Banerjee Narendra Modi)

সুকন্যা পাল, ম্যানেজিং এডিটর, দ্য অফনিউজ, কলকাতা:

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য নিমাই সাধন বসু একদা আক্ষেপ করে বলতেন, "মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় এতো যে স্টার পড়ুয়ার ছড়াছড়ি, বাস্তবে এরা যায় কোথায়? আগামী জীবনে এদের তো খুঁজেই পাওয়া যায় না। তবু এই স্টার ছাত্রছাত্রীদের নিয়েই মাতামাতি সমাজের সর্বস্তরে।"

কথাটা কি সাম্প্রতিক কালেও খুব ভুল? আংশিক ভাবে মোটেও না। উচ্চমাধ্যমিকের পর NEET ও JEE'র মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষায় সেই স্টারের গণ-সমাহার রাতারাতি বনে যায় সাধারণ পড়ুয়ায়। অন্যদিকে, ব্যতিক্রমের উদাহরণ বাদ দিলে বরাবরের সাধারণ মানের ছাত্রছাত্রীরা তো উপেক্ষার সাক্ষী থেকেছে এযাবৎকালে বরাবরই।

উপরিউক্ত প্রবেশিকা পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থীর মাত্র পাঁচ শতাংশ পড়ুয়া শুধুমাত্র সাফল্যের সিঁড়ি টপকাতে পারে। আর সেই পাঁচ শতাংশের সিংহভাগ পরীক্ষার্থীদের সাফল্যকে নিজেদের সার্থকতার পুঁজি বানিয়ে চলে বেদম দামামা প্রচার। সৌজন্যে তথাকথিত সো কলড ট্রেনিং সেন্টার। সঙ্গে বোনাস হিসেবে লোভনীয় স্কলারশিপের টোপ। বছরের পর বছর এক শ্রেণির নামীদামী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে মেধা বিপননের ধারাবাহিক ট্রেনিং নেটওয়ার্ক।

একটু আগেই না ব্যতিক্রম শব্দের কথা কথা তুলেছিলাম! ঠিকই পড়েছেন। মেধা বিপননের ধারাবাহিক ট্রেনিং নেটওয়ার্কেরও তাই ব্যতিক্রম আছে। সেই ব্যতিক্রমের এক বলিষ্ঠতম নাম "Educlears Ai"। এই ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানের দুর্গাপুর শাখার দায়িত্বে থাকা দেবাশিস সাহা বলেন, "Educlears Ai হল এমন একটা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান যেখানে কোটা কোচিং ঘরানার সঙ্গে রেগুলার টেস্ট এবং ডাউট ক্লিয়ার মেথডের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সাধারণ মানের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মপ্রত্যয় গড়ে তোলা হয়।" তিনি আরও বলেন, "এর ফলে আমাদের এই বিশেষ পদ্ধতির ব্যতিক্রমী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অতি সাধারণ মেধার পড়ুয়ারাও NEET ও JEE পরীক্ষায় সাফল্য পাচ্ছে ও পেতে থাকবে অনায়াসেই।"

Educlears Ai সূত্রে এও জানা গিয়েছে, এই অনলাইন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মে নিরলস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় নানান আঙ্গিকে। সাধারণ মানের প্রত্যেক পড়ুয়ার আলাদা আলাদা ঘাটতি পৃথকভাবে চিহ্নিত করা এবং প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে পৃথক পর্যায়ে সেই ঘাটতি পূরণ করে তাকে প্রকৃতই মেধা সম্পন্ন করে তোলা হয় সাম্প্রতিকতম রেমিডিয়াল এডুকেশন সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে।

যোগাযোগ: www.educlears.com

(www.theoffnews.com - Educlears Ai)

সুকন্যা পাল, ম্যানেজিং এডিটর, দ্য অফনিউজ, কলকাতা:

প্রায় এক যুগেরও আগের কথা। রাজ্যের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একদা বলেছিলেন, "দুর্গাপুর বাস্তবে একটা সম্ভবনাময় এডুকেশনাল হাব হয়ে উঠেছে।" দুর্গাপুর সফরে এসে বাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বছর খানেক পূর্বে মন্তব্য করেন, "দুর্গাপুর এমন একটা শহর যেখানে শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার অগ্রগতি সমগ্র দেশের কাছে দৃষ্টান্ত স্বরূপ।"

দুর্গাপুর আক্ষরিক অর্থে ভারতের রূঢ় শিল্পাঞ্চল হিসেবে সুপরিচিত। রাজ্যে উক্ত দুই মুখ্যমন্ত্রী এই শিল্পাঞ্চলে শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে যে এতো গর্ব অনুভব করেছেন তার পরিকাঠামোগত বুনিয়াদ কিন্তু রচিত হয়েছিল প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট বছর আগেই।

এমনই এক সমসাময়িক কালে শিক্ষাসাথী জয়যাত্রার অন্যতম পুরোধা রূপে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল, দুর্গাপুর'এর আত্মপ্রকাশ ঘটে এক স্থায়ী মাইলফলক হিসেবে। এ যেন শিল্পের অন্দরমহলে শিক্ষার বাহারি ঝাড়বাতির মতো হরগৌরী সহবাস। 

শুভ দিনটা ছিল ১৯৬৩ সালের ১ মে। তদানীন্তন এমএএমসি কারখানা কর্তৃপক্ষের একান্ত সহায়তায় অপথালমিক গ্লাস প্রোজেক্টের একটি শেডে এই স্কুলটির সূচনা হয় ক্ষণস্থায়ী পর্যায়ে। একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্কুলটি স্থানান্তরিত হয় এমএএমসি কারখানার টাউনশীপের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রিন্সিপাল ছিলেন ফাদার ডুবোয়ে।

অবশেষে স্থানের অস্থিরতার ঘোর কাটিয়ে ১৯৬৪ সালে এভিবি লিমিটেড কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দশ একর জমি পাওয়া সম্ভব হয়েছিল নিজস্ব নতুন স্কুল ভবণ নির্মাণকল্পে। কর্মসূচীর প্রারম্ভিক শিলান্যাস সূচিত হয় ১৯৬৬ সালে। পরের বছরেই এমএএমসি টাউনশীপ থেকে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল, দুর্গাপুর স্থায়ীভাবে চলে আসে নবনির্মিত ভবণে।

অন্যদিকে, এই স্কুলের একটি প্রাথমিক শাখা ১৯৬৪ সালে চালু হয় ডিএসপি টাউনশীপের টেগোর হাউসে। এই শাখাটিও পর্যায়ক্রমে স্থানান্তরিত হয় একই টাউনশীপের লালা লাজপত রাই রোড থেকে মীরাবাই রোগের আরও দুটি এলাকায়। অবশেষে ২০০৬ সালে এই প্রাথমিক স্কুল শাখাটিকেও সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল, দুর্গাপুরের মূল পরিধির মধ্যে সংযুক্ত করা হয়।

১৯৮৮ ও ২০১৩ সালে যথাক্রমে স্কুলের সিলভার জুবিলি ও গোল্ডেন জুবিলি উৎসব পালন করা হয় মহা সমারোহে। স্কুলের তরফে ফাদার জেনিথ উইলিয়াম জানান, "আমাদের স্কুল অজস্র গরিমায় উজ্জ্বল। এরজন্য আমরা গর্বিত। ২০২৩ সালে আমাদের ডায়মন্ড জুবিলি বর্ষ। আমরা আশাবাদী, আগামীদিনেও আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আরও বৃহৎ সাফল্যের সাক্ষ্য বহণ করবে।"

স্কুলটিতে মূলতঃ ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করানো হয়। শুধুমাত্র ছাত্রদের জন্য এই স্কুলে প্রাথমিক স্তর থেকে হায়ার সেকেন্ডারির নানা বিভাগের অধ্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি এই স্কুলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বাৎসরিক ক্রীড়া উৎসব পালিত হয় সারম্ভরে। এছাড়াও, ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, টেবিল টেনিস, বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় এই স্কুলের ছাত্ররা নানা সময়ে যথেষ্ট মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছে সমাজের নানা স্তরে।

হয়তো তাই, নানা পরিস্থিতির পরিক্রমায় ও রকমারি সময়ের অগ্নিপরীক্ষায় দুর্গাপুর শিক্ষা হাবের আঙ্গিনায় সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল আজ কান্ডারীর সিংহাসনে আসীন। কিন্তু কেন? উত্তর একটাই। ধারাবাহিক নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের হিমালয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল, দুর্গাপুর আজ যে প্রকৃতই শিক্ষার মানস-সরোবরে মানুষ গড়ার নন্দনকানন।

(www.theoffnews.com - St. Xeviars School Durgapur)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

সন্ধ্যায় বসে লেখালেখির কাজ করছি হঠাৎই আমার প্রবাসী বন্ধুর ফোন। কলেজ জীবনের বন্ধু, তাই ফোনে ওর নামটা দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল। এটা ওটা নানা কথা বার্তার মধ্যেই ও জানাল ছোট্ট মেয়েকে এবার স্কুলে ভর্তি করেছে। দুবাইয়ের যেখানে ওরা থাকে সেখানে সিবিএসই বোর্ডের স্কুলও আছে। ও অবশ্য মেয়েকে দিয়েছে একটি আমেরিকান বোর্ডের স্কুলে। সেখানে নাকি পড়াশোনার চাপ খুব কম। বলে দেওয়া হয়েছে বাড়িতে এ বি সি ডি শেখানোর দরকার নেই, তারাই প্রয়োজনে শিখিয়ে নেবে। পড়াশোনায় চাপ না দিয়ে অন্যান্য বিভিন্ন বিষয় খুব সহজ করে শেখানোটাই ওদের নিয়ম বা সিলেবাস। আমার এক শ্যালিকা থাকে অস্ট্রেলিয়ায়, তার কাছেও শুনেছি প্রায় একই কথা। ওদের ওখানেও নাকি ছোট্ট বেলায় পড়াশোনাতে একেবারেই চাপ দেওয়া হয় না। বরং জোর থাকে খেলাধুলা বা অন্যান্য ভাললাগার কাজকর্মে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে। সে দেশে নাকি ক্লাস সিক্স পর্যন্ত গোটা পাঁচেক বই থাকে।

শুনেই মনে হল ওরা বোধহয় লেখাপড়াটাকে গুরুত্বই দেয় না। অথচ আমাদের দেশ অতি উন্নত, সেখানে আমার ছেলে যখন ক্লাস টু তে পড়ে তখনই তার ছাব্বিশটা বই। ব্যাগটা উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারত না। সে কি ওদের চেয়ে বেশি শিখেছে? জানি না, কিন্তু পরে যখন দেখি ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আমাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশী ছেলেমেয়েদের কাছে গোল খেয়ে যাচ্ছে তখন দেশীয় সিলেবাসের নামে ক্ষুদেদের প্রতি এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে ইচ্ছে করেই। ওদের কাছে যখন শৈশব উপভোগ করবার জন্য নির্ধারিত, আমাদের কাছে তখন শুধুই চাপিয়ে দেওয়ার সময়। ওদের কাছে যখন পড়া পড়া খেলা, আমাদের কাছে তখন খেলাটাকেও পড়া বানিয়ে ফেলার আসুরিক প্রয়াস।

লেখাপড়া শেখা মানে শুধুই পুঁথি গত পাঠ কন্ঠস্থ করে উদরস্থ করা? আমার এক প্রাক্তন সহকর্মী জাপানে গিয়েছিলেন। প্রায় মাসে দেড়েক ছিলেন ওখানে, খুব ভাল ভাবে কাছ থেকে দেখেছিলেন ওদের জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি। তিনি জানিয়ে ছিলেন, জাপানে লেখাপড়ার চাইতেও জোর দেওয়া হয় সামাজিক দায় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে। অর্থাৎ জীবনে চলার পথে প্রতি ক্ষেত্রেই যাতে সে অন্যের অসুবিধার কারন না হয়, অথবা অন্যকে সুবিধা করে দেয় সেই পাঠই পড়ানো হয় সর্ব প্রথম। তাই তো সে দেশে কেউ প্রকাশ্যে থুতু ফেলে না, অকারনে নিজের প্রয়োজনে অন্যকে বিব্রত করে না। যার ফল পড়ে সুষ্ঠু পরিষেবার ক্ষেত্রেও। ছোট থেকেই পড়াশোনার ফাঁকে ওরা শিখেছে সঠিক জীবন পরিচালন। আমরা শুধু রাশি রাশি বই পড়েই গিয়েছি, শেখা হয়েছে কি কিছু? 

আমাদের শিক্ষা কিছু শংসাপত্র নির্ভর। তাই চারটি শংসাপত্র হাজির করলেই আমরা ভেবে নিই তিনি উচ্চশিক্ষিত। তার ব্যবহারিক জ্ঞান বা সামাজিক দায়বোধের পরিচয় খতিয়ে দেখার চল এ দেশে নেই। কাগজে পড়েছিলাম এ রাজ্যের প্রাক্তন ডিজির স্ত্রী এটিএম জালিয়াতির শিকার। কেউ একজন ব্যাঙ্কের আধিকারিকের পরিচয় দিয়ে তার কাছে এটিএম কার্ড এবং পিন নম্বর জানতে চায়, তিনি সরল বিশ্বাসে তা দিয়েও দেন। ফল? লক্ষাধিক টাকা গায়েব। রাজ্যের সর্বোচ্চ পুলিশ আধিকারিক, একজন আইপিএস অফিসার। আশা করা যায় তার স্ত্রী নিশ্চয় নিরক্ষর নন, বরং তথাকথিত বেশ কিছু শংসাপত্র তারও নিশ্চয় আছে। কিন্তু এত শিক্ষা, এত প্রচার, এত খবরের পরেও এই ন্যুনতম বোধ তার হয়নি, যে অপরিচিত ব্যক্তিকে পিন নম্বর দিতে নেই! এখানেই ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ শিক্ষা আছে, কিন্তু তার সামাজিক প্রয়োগ নেই। প্রোজেক্টের নামে নানা কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয় স্কুল পড়ুয়াদের উপরে। তার সিংহ ভাগটাই করে দেন বাড়ির লোকেরা, গৃহশিক্ষকেরা কিম্বা অর্থের বিনিময়ে প্রোজেক্ট বানিয়ে দেওয়া ব্যবসায়ীরা। কি লাভ হয়? শিক্ষার নামে অন্যদের ব্যতিব্যস্ত করা। ছোট্ট থেকে সমাজ বিজ্ঞানকে সিলেবাসে রেখে মোটা মোটা বই না পড়িয়ে খেলার ছলে সামাজিক দায়ের পাঠগুলিকে কি দেওয়া যায় না? আমাদের চেয়ে উন্নত অন্য দেশগুলি যদি তা পারে, তাতে তাদের উন্নয়ন থেমে না যায়, তাদের ছেলেমেয়েরা যদি প্রকৃত শিক্ষিত হতে পারে তবে আমাদের দেশে পড়াশোনার নামে এই অত্যাচার কেন?

পরিশেষে বলি আমি শিক্ষাবিদ নই। অন্য দেশের শিক্ষার কথা শুনে এবং তাদের সাফল্যের হার দেখে পাশাপাশি এ দেশে আমার সন্তান সহ সন্তানসমদের কষ্ট দেখে এই প্রতিবাদের কথা মনে হয়েছে। শৈশব এখন বিপন্ন, স্কুলের পরিধি টপকে এখন সর্বত্র শিক্ষার ভুত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তাই তো স্কুল থেকে ফিরে আমরা শুধু খেলতে এখন আর মাঠে যাই না। যাই খেলা শিখতে। হারিয়ে যাচ্ছে মাঠও। ছেলেবেলায় দেখা ফাঁকা খেলার জায়গা বা মাঠগুলি এখন প্রায় অধিকাংশই নেই বা সঙ্কুচিত। আমরাই দায়ী, শৈশব চুরি করে, সামাজিকতার পাঠ না দিয়ে এক একটি রোবট বানিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি এই কংক্রিটের জঙ্গলে। করোনা তো সেই গোটা কর্মযজ্ঞে আরও ধুনো দিয়ে গেল। যেটুকু যাও খেলাধূলা সামাজিকতা অবশিষ্ট ছিল, করোনার ভয়ে বা অজুহাতে তা এখন শূন্যের ঘরে। স্কুলের নামে ঘরে বসেই চলছে বুড়ো আঙুলের ব্যায়াম। ছেলেমেয়েরা এখনও আরও বেশি যন্ত্রনির্ভর। তাদের কাছে অন্য কিছু আশা করা আমাদের মানায় কি?

(www.theoffnews.com - education)