Articles by "প্রবাসের জলছবি"
Showing posts with label প্রবাসের জলছবি. Show all posts

সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

এতদিন ধারণা ছিল যে প্রাগৈতিহাসিক মানুষরা প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে প্রাচীন গুহার দেওয়াল বা ছাদে তাদের অভিজ্ঞতা আঁকার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিল। কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অতি সম্প্রতি প্রত্নবিদরা একটি সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের মারোস-পাংকেপ অঞ্চলের লেয়াং কারামপুয়াং-এর চুনাপাথর গুহায় আবিষ্কৃত একটি বুনো শুয়োরের সঙ্গে তিনটি মানুষের মিথস্ক্রিয়ার ছবির প্রাচীনত্ব কমপক্ষে ৫১,২০০ বছর বলে নির্ধারণ করেছেন। লাল রঞ্জক দিয়ে আঁকা গুহাচিত্রটিতে একটি শুয়োরের মুখ খানিকটা খোলা এবং তিনটি আধা মানুষ, আধা-প্রাণীর লাঠি মূর্তি বা থেরিয়ানথ্রোপ দেখা যাচ্ছে। ২০১৭ সালে এই গুহায় প্রত্নবস্তুগুলি সংগ্রহ করা হলেও এই বছরের শুরুর মাসগুলিতেও এগুলির বয়েস নির্ধারিত হয়নি। ২০২০ সালে ইন্দোনেশিয়ার লেয়াং টেডঙ্গেতে আবিষ্কৃত যে বুনো শুয়োরের ছবিটি এতদিন সবচেয়ে প্রাচীন বলে মনে করা হতো, এটি তার থেকে ৫০০০ বছরেরও বেশি আগের।

'৫১,২০০ বছর আগে ইন্দোনেশিয়ায় ন্যারেটিভ কেভ আর্ট' নামের এই গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটি, সাদার্ন ক্রস ইউনিভার্সিটি এবং ইন্দোনেশিয়ান ন্যাশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন এজেন্সির ২৩ জন গবেষকের একটি দল এটি সম্পন্ন করেছে।

‘দ্য কনভারসেশন’ পত্রিকায় এই গবেষকরা লিখেছেন - “একটি অর্ধেক মানুষের অবয়ব একটি শুয়োরের গলার কাছে একটি হাতিয়ার ধরে আছে বলে মনে হচ্ছে। আরেকজন শুয়োরের মাথার ঠিক ওপরে উল্টো হয়ে পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছবির তৃতীয় জন অন্যদের তুলনায় চেহারায় অনেক বড় আর হাবভাব রাজকীয় এবং সম্ভবত মাথায় জমকালো একটা উষ্ণীষ রয়েছে … যেভাবে এই মানুষের মতো আকৃতিগুলি শুয়োরের চারপাশে আঁকা হয়েছে তাতে একটা গতিশীল কর্মকান্ডের আভাস পাওয়া যায়। এই ছবিটিতে কিছু একটা ঘটছে - একটা গল্প বলা হচ্ছে। আমাদের আবিষ্কারগুলি থেকে ধারণা করা যায় যে আধুনিক মানুষের অ্যানথ্রোমরফিক বা মানুষরূপী প্রাণী এবং প্রাণীদের রূপক ছবি আঁকার ইতিহাস যতটা প্রাচীন বলে মনে করা হতো এই অ্যাকশনধর্মী ছবিটি প্রমাণ করছে যে সে ইতিহাস আরও অনেক পুরনো।”

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে নিয়ান্ডারথালরা (যাদেরকে আধুনিক মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রাচীন মানব আত্মীয় হিসেবে দেখা হয়) ৭৫,০০০ বছর আগে গুহাতে আঁকিবুকি কাটা শুরু করেছিল, কিন্তু এই চিহ্নগুলি সাধারণত বিমূর্ত ছিল, কোন পশু বা মানুষকে আঁকা হয়নি। গবেষকরা আরও বলেছেন - “আমরা আঁকাগুলোর যে ডেটিং-এর কাজ করলাম তার ভিত্তিতে এখন মনে হচ্ছে যে মানুষের ছবিগুলোর (থেরিয়নথ্রোপ বা না-মানুষ প্রাণী সমেত) প্রাণীদের সাথে মিথস্ক্রিয়া করার ছবিগুলি সুলাওয়েসির লেট প্লেইস্টোসিন গুহা শিল্পে এতো বেশি সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে যা পরের কয়েক হাজার বছরে ইউরোপের অন্য কোথাও দেখা যায়নি। এর থেকে বোঝা যায় যে এই অঞ্চলে হোমো স্যাপিয়েন্সের লম্বা ইতিহাসের প্রথম দিকেই গল্প বলার একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল - বিশেষ করে, মানব-প্রাণী সম্পর্কের সম্পর্কে চাক্ষুষ গল্প বলার জন্য নাটকীয় উপস্থাপনার ব্যবহার।"

অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ইতিহাসের অধ্যাপক নয়নজোত লাহিড়ী বলেছেন, "এটা একটা বলবার মত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।"

নতুন ডেটিং-এর কৌশল কি?

চুনাপাথরের গুহায় গুহাচিত্রগুলির ওপর যে ক্যালসাইট জমা হয়েছে তার ইউরেনিয়াম সিরিজ (ইউ-সিরিজ) বিশ্লেষণ করে এই ছবিগুলির কালনির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষণার সময় লেজার রশ্মি ব্যবহার করা হয়েছিল এবং প্যারেন্ট আইসোটোপ (ইউরেনিয়াম) এবং ডটার আইসোটোপ (থোরিয়াম)-এর মধ্যে অনুপাত তুলনা করে গবেষকরা ছবিগুলির তারিখ নির্ধারণ করতে সফল হন।

একই পদ্ধতি ব্যবহার করে, গবেষকরা লিয়াং বুলু' সিপং ৪-এ একটি গুহা চিত্রে আরেকটি শিকারের ছবিরও ডেটিং করেছেন, যা আগে ৪৩,৯০০ বছরের পুরনো বলে মনে করা হয়েছিল। তাঁদের পরীক্ষার ফলাফলে জানা গেছে যে ছবিটি আগে যা ভাবা হয়েছিল তার থেকে কম করে ৪,০০০ বছরের বেশি পুরনো।

গবেষকরা বলেছেন - "এই পদ্ধতিটি আমাদের ডেটিং-এর জন্য ব্যবহৃত ক্যালসিয়াম কার্বনেট উপাদান এবং রক আর্ট পিগমেন্ট স্তরগুলির ক্যালসিয়াম কার্বনেট উপাদানের মধ্যে স্পষ্ট সম্পর্ককে আরও সহজে দেখাতে পারে।"

অধ্যাপক লাহিড়ী বলেছেন যে ভারতে সোজাসুজি ডেটিং করা গুহাচিত্রের সংখ্যা খুবই কম। "ভারতে, মধ্যপ্রদেশের মতো জায়গায় প্রচুর রক আর্ট আছে, কিন্তু এগুলির এই ধরনের ডেটিং করা হয়নি।" তিনি যোগ করেছেন, "এই আবিষ্কারটি প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাজের সাথে জড়িত হওয়া বিজ্ঞানের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝায়। আমরা যে এতো আগের সময়কাল পেয়েছি যে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে সেই সময়ে কীভাবে এটির কল্পনা করা হয়েছিল এবং আরও অনেক কিছু।”

অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যাক্সিম আউবার্ট বলেছেন, “এই আবিষ্কার মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাল্টে দেবে। ছবিটির থেকে একটা জটিল গল্পের আভাস পাওয়া যায়। মানুষের গল্প বলার এটা এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ। সেই সময়ে মানুষের যে বিমূর্ত বিষয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা ছিল এই ছবিটি তারও প্রমাণ।"

বিজ্ঞানীদের দলটির নেতৃত্বে ছিলেন জাকার্তায় ন্যাশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন এজেন্সি (BRIN) এর ইন্দোনেশিয়ান রক আর্ট বিশেষজ্ঞ আদি আগুস ওকতাভিয়ানা। তিনি বলেছেন যে ইন্দোনেশিয়ায় বহু যুগ আগে থেকেই আদি মানব সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কোন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গল্প বলার রীতি। তাঁর মতে “অবশ্যই মানুষ ৫১,২০০ বছরেরও অনেক আগে থেকে গল্প বলে আসছে, কিন্তু শব্দের যেহেতু জীবাশ্ম হয় না তাই আমাদেরকে পরোক্ষ প্রমাণ যেমন ছবির দৃশ্যাবলীর ওপর নির্ভর করতে হবে আর সেক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে সুলাওয়েসি চিত্র এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ।

(www.theoffnews.com Archaeology oldest European Rock Art)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

কাজাখস্তানের সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ল্যান্ডস্কেপ প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে আকর্ষণীয় বিবরণ প্রকাশ করে চলেছে। আকমোলা এবং পাভলোদারের সাম্প্রতিক গবেষণায় একটি পাথরের খোদাই প্রকাশ করা হয়েছে যা ব্রোঞ্জ যুগে একটি মানুষের মুখ এবং সমাধিস্থলের চিত্র তুলে ধরেছে।

কাজাখ প্রত্নতত্ত্ব তার অসাধারণ আবিষ্কারের মাধ্যমে শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক জগতকে সমৃদ্ধ করে না উপর্যুপরি কাজাখস্তান সমাজের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বিকাশের প্রধান পর্যায়গুলিও প্রকাশ করে। কাজাখস্তানের স্যান্ডিকটাউ জেলায় আকমোলা অঞ্চলে প্রতিরোধমূলক ওরমান অভিযানের অংশ হিসাবে একটি রুটিন পরিদর্শনের সময় আঞ্চলিক জরুরী পরিস্থিতি বিভাগের কর্মীরা পাথরে খোদাই করা একটি মানব মুখের আকারে একটি রহস্যময় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান পেয়ে আস্তানার প্রত্নতাত্ত্বিকদের সেটি পরীক্ষা করার জন্য আমন্ত্রণ জানান৷ তাঁদের থেকে বিদেশী প্রত্নতাত্ত্বিকরাও এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের বিষয়ে জানতে পেরেছিলেন। একটি গ্রানাইট বোল্ডারের গায়ে খোদাই করা এই নিদর্শনটির মাপ ২৭ সেমি x ২১  সেমি এবং এটি পশ্চিম - দক্ষিণপশ্চিম দিকে অভিমুখী। এই রিলিফের পাশে একটি হরিণের ভগ্ন দশায় খোদাই মূর্তি এবং কাছাকাছি একটি পাথরের ছাদ একটি আচার-অনুষ্ঠানের স্থান বলে অনুমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, খোদাই ভাস্কর্যটি কোন যুগের তা নির্ধারণ করা বেশ সমস্যার। বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত। একটি পক্ষ দাবি করছেন যে ব্রোঞ্জ যুগে এটির সৃষ্টি, অন্যরা অনেক পরের তুর্কি যুগে এটি তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন। 

‘আস্তানা টাইমস’’ জানিয়েছে যে অ্যালকি মার্গুলান ইনস্টিটিউট অফ আর্কিওলজির বিশিষ্ট বিজ্ঞানী সের্গেই ইয়ারিগিন মনে করেন যে খোদাইটি সম্ভবত ব্রোঞ্জ যুগের। ইয়ারিগিন বর্ণনা করেছেন, "মুখটি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, বড় চোখ, একটি দীর্ঘ সোজা নাক এবং পুরু ঠোঁট।” তিনি উল্লেখ করেছেন যে মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের ব্রোঞ্জ যুগের বসতিগুলিতে একই রকম খোদাই পাওয়া গেছে। তিনি অবশ্য দক্ষিণ সাইবেরিয়ার প্রারম্ভিক লৌহ যুগে এবং মধ্যযুগীয় তুর্কি সংস্কৃতিতে একইরকম খোদাই ভাস্কর্যের উপস্থিতির কথাও বলেছেন যা ইউরেশীয় স্টেপস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সমান্তরালতা সত্ত্বেও, ইয়ারিগিন জোর দিয়েছিলেন যে নিদর্শনটির সঠিক সময়কাল অনিশ্চিত রয়ে গেছে, কারণ এটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের অন্তর্গত হতে পারে, এমনকি সাম্প্রতিক কালের হওয়াও অসম্ভব নয়। 

স্যান্ডিকটাউ জেলা ফায়ার সার্ভিসের কর্মচারী নুরসুলতান আশকেনভ এবং আখমেত জারিপভ এই অসামান্য আবিষ্কারটি করেছিলেন। জরুরী পরিস্থিতি বিভাগ পাথরে খোদাই মানব মুখটিকে তখন থেকে তার নিজের সুরক্ষায় রেখেছেন। স্যান্ডিকটাউ জেলার জরুরী পরিস্থিতি বিভাগের প্রধান আসাট ঝাংগোজিন বলেছেন - “আমাদের প্রাথমিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাকালীন এইরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করা অত্যন্ত সন্তুষ্টির কারণ। তাছাড়াও, আমি বিশ্বাস করি যে এই আবিষ্কার শুধুমাত্র আমাদের জেলাতেই নয়, সমগ্র দেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে”৷ এই অঞ্চলের সকলেই আশা করছেন যে এই আবিষ্কারটি অন্যান্য প্রত্নবিদদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং এই অঞ্চলে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের উৎসাহ দিতে সক্ষম হবে।

পাভলোদার অঞ্চলে ব্রোঞ্জ যুগের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার - পাভলোদার অঞ্চলের কোকটাস কমপ্লেক্সে, পাভলোদার পেডাগোজিকাল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় প্রচুর সংখ্যক বিরল এবং মূল্যবান নিদর্শন পেয়েছেন। কোকটাস সাইটে ২০টিরও বেশি কবরের ঢিবি রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি সাকা যুগের। নিদর্শনগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, খ্রিস্টপূর্ব মধ্য-১৩শ থেকে ৮ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের একটি ব্রোঞ্জ বর্শা যা সারগারিন-আলেক্সিয়েভ সংস্কৃতি থেকে এসেছে বলে জানা যায়। অ্যাসিলবেক ইয়েলমান, একজন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, এই বর্শাটি খুঁজে পেয়েছেন, যা এলাকাটির জন্য অনন্য এক আবিষ্কার। বর্শা ছাড়াও রান্নাঘরের মৃৎপাত্রের বেশ কিছু টুকরোও আবিষ্কৃত হয়েছে। 

(www.theoffnews.com human face sculpture Kazakhstan)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

মধ্য এশিয়ার স্টেপস থেকে একটি উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের সন্ধান মিলেছে – ৩,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি পিরামিডের কাঠামো। "কারাজহার্তাসের পিরামিড" নামে এই স্মৃতিস্তম্ভটি মধ্য কাজাখস্তানের কারাগান্ডা অঞ্চলে তালডি নদীর তীরে পাওয়া গেছে। বেগাজি-ডান্ডিবে সংস্কৃতির মানুষদের তৈরি এই পিরামিডটি ব্রঞ্জ যুগের শেষের দিকের একটি সমৃদ্ধ সভ্যতার প্রমাণ দেয়।

বেগাজি-ডান্ডিবে সংস্কৃতি

ব্রঞ্জ যুগের শেষের দিকে বেগাজি-ডান্ডিবে সংস্কৃতি মধ্য কাজাখস্তানে বিকশিত হয়। এই সমাজের মানুষরা সেমি-সেডএনটারি ছিল যার মানে তারা বছরের কিছু সময় একজায়গায় বাস করত আর বাকী সময় যাযাবর বৃত্তি পালন করত। তারা প্রধানত ধাতুবিদ্যা এবং পশুপালনের ওপর সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিত। এই সংস্কৃতির  সম্প্রদায়গুলি ইউরেশিয়া জুড়ে ধাতু ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল, যা তাদের সংস্কৃতির মধ্যে একটি নতুন অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল।

কারাজহার্টাসের পিরামিড এই অভিজাত শ্রেণীর সদস্যদের জন্য একটি সমাধি হিসাবে কাজ করেছিল।

কাজাখ জাতীয় জাদুঘরের সঙ্গে খনন প্রকল্পের সমন্বয়কারী ইতিহাসবিদ সেরহান সিনার এবং প্রত্নতাত্ত্বিক আয়বার কাসেনালি দাবি করেছেন যে কারাজহার্তাসের পিরামিড এই অভিজাত ব্যক্তির জমকালো সমাধি ছিল। এই পিরামিড সমাধিটি বেগাজি-ডান্ডিবে সংস্কৃতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে।

কারাজহার্টাস পিরামিড

এই যুগান্তকারী খননের উদ্যোক্তা কারাগান্ডা ইউনিভার্সিটির ‘সারি আরকা প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান’ কারাজহার্টাসের পিরামিডকে সুস্পষ্ট ধাপ সমেত একটি বর্গাকার পিরামিড সমাধি হিসাবে প্রকাশিত করেছে। এই বিশাল কাঠামোটি প্রায় ৬৫ ফুট বাই ৯৮ ফুট মাপের এবং এটির চূড়া প্রায় ৫ ফুট উঁচু। উল্লেখযোগ্যভাবে, কারাজহার্তাসের পিরামিডটি বেগাজি-ডান্ডিবে অভিজাতদের এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত সমাধি মন্দিরগুলির মধ্যে বৃহত্তম। সিনার উল্লেখ করেছেন যে ব্রঞ্জ যুগে এই ধরনের একটি বিশাল পিরামিড নির্মাণ, বিশেষত ঊষর স্তেপ অঞ্চলে, বেগাজি-ডান্ডিবে সমাজের উন্নত শৈল্পিক কীর্তি এবং আধ্যাত্মিক সিদ্ধির পাথুরে প্রমাণ। পিরামিডটির জটিল নির্মাণ এবং কাটা পাথরের ব্যবহার একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নির্ভেজাল প্রদর্শন।

পিরামিডের অভ্যন্তরে আশ্চর্য আবিষ্কার

কারাজহার্টাস পিরামিডের ভেতরে অন্বেষণকারী প্রত্নতাত্ত্বিকরা বেশ কিছু চমকপ্রদ আবিষ্কার করেছেন। সমাধির কেন্দ্রস্থলে গ্রানাইট পাথর দিয়ে ঘেরা একটি সারকোফ্যাগাস রয়েছে, যেটির ভেতরে গবেষকরা স্থানীয় শাসকের মাথার খুলি আবিষ্কার করেছিলেন, যেটির থেকে সমাহিত ব্যক্তির সম্বন্ধে একটি আকর্ষণীয় আভাস পাওয়া যায়।

সমাধি কক্ষের ওপরের একটি অংশে প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি ব্রোঞ্জ তীরের মাথা এবং একটি রহস্যময় মৃৎপাত্রের টুকরো দেখতে পান। এছাড়াও, কবরের ঘর এবং পিরামিডের ধাপের মতো স্তর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাওয়া গেছে পশুদের অজস্র হাড়, যেগুলি সম্ভবত পরম্পরাগত স্টেপে উপজাতীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হত। এই নিদর্শনগুলি এখানে সমাহিত ব্যক্তির উচ্চ সামাজিক মর্যাদা্র খাঁটি প্রমাণ।

কারাজহার্টাসের পিরামিডের বয়স নির্ধারণ করতে, যুক্তরাজ্যের কুইন্স ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা সাইটে পাওয়া জৈব পদার্থের বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন যার থেকে জানা যায় যে পিরামিডটি খ্রিস্টপূর্ব ১৫-১৪ শতকের অর্থাৎ নিঃসন্দেহে এটি ব্রোঞ্জ যুগের শেষের দিকে অবস্থিত ছিল।

কেন্ট প্রোটো-সিটি সেটেলমেন্ট

পিরামিডের চিত্তাকর্ষক স্থাপত্যের বাইরে, প্রত্নতাত্ত্বিক দলটি সমাধির কাছাকাছি কেন্ট নামে একটি প্রোটো-শহর বসতির প্রমাণ উন্মুক্ত করেছে। এই বসতি, ১৫ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, বেগাজি-ডান্ডিবে সংস্কৃতির নগরায়ণের একটি আকর্ষণীয় প্রদর্শন।

কারাজহার্টাসে আবিষ্কৃত পিরামিডাল -ধাপ সমাধিগুলি সিথিয়ান যুগের সমাধি কাঠামোর প্রাথমিক সংস্করণ হতে পারে। 

কেন্টের বৈশিষ্ট্যমূলক গোলকধাঁধা দ্বারসমূহ, পরিখা এবং প্রতিরক্ষামূলক দেওয়াল একটি সুপরিকল্পিত শহুরে বিন্যাসকে প্রমাণিত করে। বসতিটিতে গর্ব করার মতো একটি সংগঠিত রাস্তার নেটওয়ার্ক এবং কার্যকরী জল সংগ্রহের ব্যবস্থা ছিল যা একটি উন্নত সমাজের ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা কেন্টের সংলগ্ন স্থানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিক নৈবেদ্য প্রদানের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ বলিদানের বেদিগুলি আকস্মিকভাবে আবিষ্কার করেছিলেন।

বেগাজি-ডান্ডিবে সংস্কৃতির ধর্মীয় অনুশীলন

আশ্চর্যজনকভাবে, সিনার ব্যাখ্যা করেছেন যে কাজাখস্তানের ব্রোঞ্জ যুগের বাসিন্দাদের আচার-অনুষ্ঠানে সূর্য এবং চাঁদের মতো মহাকাশীয় বস্তুর সঙ্গে আগুন এবং প্রতিরক্ষামূলক "অঙ্গুন" আত্মাকে অর্ঘ্য দেওয়া রেওয়াজ ছিল। এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি বেগাজি-ডান্ডিবে সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জানতে সাহায্য করে।

মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ সোপানগুলিতে ৩,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি পিরামিড কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গেছে‌।

কারাজহার্তাসের পিরামিডের আবিষ্কারগুলি বেগাজি-ডান্ডিবে সংস্কৃতির ঐতিহাসিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক সংযোগ এবং আর্থ-সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে প্রচুর তথ্য সরবরাহ করে। একসময় কালের গহ্বরে লুকিয়ে থাকা এই রহস্যময় সমাজ এখন মধ্য এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

কারাজহার্তাসের পিরামিডটি বেগাজি-ডান্ডিবে সংস্কৃতির অসাধারণ সাফল্যের প্রমাণ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে, যা তাদের পরিশীলিত সমাধি প্রথা এবং নগরায়নকে প্রকাশ করে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক সন্ধান শুধুমাত্র একটি প্রাচীন সভ্যতার রহস্য উন্মোচন করেনি বরং মধ্য এশিয়ার অতীতের সমৃদ্ধ ট্যাপেস্ট্রিতে একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।

যেহেতু গবেষকরা এই প্রাচীন সংস্কৃতির রহস্যের গভীরে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন, আমরা এই চিত্তাকর্ষক অঞ্চলের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করবে এমন আরও উন্মোচনের আশা করতে পারি।

(www.theoffnews.com pyramid)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

৪৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজারের হত্যার পর, ব্রুটাস তাঁর নিজের ভাবমূর্তির উন্নতির জন্য এবং তাঁর সামরিক বিজয় উদযাপনের জন্য সোনার অরিয়াস (মুদ্রা) তৈরি করিয়েছিলেন।

মার্কাস জুনিয়াস ব্রুটাসের ছবি সমেত একটি স্বর্ণমুদ্রা — যিনি রোমান সিনেটর জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করেছিলেন, তাঁকে ২৩ বার সহ-ষড়যন্ত্রকারীর সঙ্গে ছুরিকাঘাত করেছিলেন — সেটি ২০ লক্ষ ডলার বা ১৭ কোটি ভারতীয় টাকায় নিলাম হয়েছে, যা তার প্রাক্-নিলামের অনুমানের প্রায় দ্বিগুণ।

মুদ্রার সামনের অংশে একটি লরেল পুষ্পস্তবক দিয়ে বর্ডার দেওয়া ব্রুটাসের প্রোফাইল রয়েছে। পিছনে একটি ব্রেস্টপ্লেট, শিরস্ত্রাণ, ঢাল এবং বর্শা চিত্রিত করা হয়েছে যা সামরিক বিজয় উদযাপনকারী সরঞ্জামের একটি সংগ্রহ।

প্রাচীন রোমে ব্যবহৃত অরিয়াস নামে পরিচিত এক ধরনের সোনার মুদ্রা, ৪৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে সিজারের হত্যার পরপরই, ৪৩ বা ৪২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে জারি করা হয়েছিল। 

নিলাম ঘর  নিউমিসমেটিকা জেনেভেনসিস এসএ- এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেন ব্যারন আর্টনেটের ভেরিটি ব্যাবসকে বলেছেন, "সমস্ত প্রাচীন মুদ্রার মধ্যে ব্রুটাসের এই অরিয়াস বিরলতম এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুদ্রাগুলির মধ্যে একটি এবং রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসের গতিপথকে বদলে দেওয়া  একটি মুহূর্তের এটি একটি প্রামাণ্য নিদর্শন।" 

হত্যার আগে, ব্রুটাস এবং সিজার পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সেই ব্রুটাস যখন সিজারকে ছুরিকাঘাত করেন, সিজারের আহত বিস্ময় এবং বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতিগুলি পরে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ১৫৯৯ সালের বিখ্যাত সৃষ্টি “দ্য ট্র্যাজেডি অফ জুলিয়াস সিজার” নাটকে চরম নাট্যরূপ পায়: মৃত্যুর আগে শেষ কথাটি তিনি উচ্চারণ করেন "এত তু, ব্রুট?" (ল্যাটিন ভাষায় "তুমিও, ব্রুটাস?")।

এর আগে নিলাম ঘরের প্রধান ফ্রাঙ্ক বলদাচি এজেন্স ফ্রান্স-প্রেসকে বলেছিলেন, স্বর্ণমুদ্রাটি "রোমে নয় বরং ব্রুটাস এবং তার সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ একটি টাকশালে তৈরি করা হয়েছিল যখন তিনি জুলিয়াস সিজারকে হত্যার পরে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছিলেন।"

তিনি আরও বলেছেন যে অরিয়াসের একটি "প্রোপাগান্ডা ভ্যালু" ছিল এবং লরেল পুষ্পস্তবকের চিত্র থেকে বোঝা যায় যে ব্রুটাস ছিলেন "এমন একজন ব্যক্তি যিনি নিজেকে সম্রাট হিসাবে প্রচার করতে চান।" ব্রুটাস ‘সম্রা্ট’ উপাধি ধারণ করেননি, যদিও তাঁর মুখের পাশে "IMP" - "ইম্পারেটর"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ খোদাই করা আছে।

লাইভ সায়েন্সের ক্রিস্টিনা কিলগ্রোভ অনুমান করেছেন যে ব্রুটাস তাঁর সৈন্যদের অর্থ প্রদানের জন্য এই মুদ্রাগুলি ব্যবহার করেছিলেন এবং সোনার অরিয়াস একজন সৈনিকের বেতনের প্রায় এক মাসের মূল্য ছিল। ব্রুটাসের দুর্ভাগ্য যে মুদ্রাটি খুব কম দিন সার্কুলেশনে ছিল। সিজারের এই ঘৃণ্য এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ড রোমান জনগণকে ক্ষুব্ধ করে এবং ব্রুটাস অবশেষে নির্বাসনে চলে যান। ৪২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে গ্রিসের ফিলিপিতে একটি যুদ্ধের সময় তিনি মারা যান।

এই বিশেষ সোনার অরিয়াস বিংশ শতাব্দীর ইতালীয় রাজনীতিবিদ জিউসেপ ম্যাজিনির সংগ্রহ থেকে এসেছে। এই ধরণের মুদ্রাটির যে ১৭টি নমুনা মাত্র টিকে আছে বলে জানা গেছে, নিলামকৃত মুদ্রাটি তাদের মধ্যে একটি। নিলামের আগে, বালদাচ্চি এএফপিকে বলেছিলেন যে বিডিং বা নিলামের ডাক "বেশ উঁচু মাত্রায় যেতে পারে।"

তিনি মন্তব্য করেছেন যে ছোট সোনার শিল্পকর্মটি "রোমান মুদ্রার দা ভিঞ্চির" মতো।

সম্প্রতি যখন নিলাম শুরু হয়েছিল, আটটি দল একটি চরম অনলাইন বিডিং যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। মুদ্রাটি শেষ পর্যন্ত একজন নামহীন ইউরোপীয় সংগ্রাহকের কাছে গিয়েছিল।

অরিয়াসের দাম আকাশছোঁয়া হলেও এর নির্ভেজালত্ব বিতর্কের বিষয়। প্রায় এক দশক আগে, নিউমিসম্যাটিক ক্রনিকল নামে একটি জার্নাল বিরল মুদ্রার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল - এবং এর নকশার সারিবদ্ধকরণে কিছু অসঙ্গতি লক্ষ্য করেছিল।

ব্যারন লাইভ সায়েন্সকে বলেছেন যে অরিয়াসকে নিয়ে "কোনও বিশেষজ্ঞ সন্দেহ প্রকাশ করেননি যাঁরা মুদ্রাটিকে বাস্তবে স্পর্শ করে দেখেছিলেন এবং এটি নিউমিসমেটিক গ্যারান্টি কোম্পানি দ্বারা প্রত্যয়িত হয়েছে।”

(www.theoffnews.com auction gold coin Brutus)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

(কানাডার উত্তরপশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষা আপার ইউকন অঞ্চলের আথাবাসকান ভাষায় কথিত এস্কিমো লোকগল্প)

অনেকদিন আগে একদিন হঠাৎ দাঁড়কাকের অন্তরে একটা বাসনার উদয় হল যে, সব পাখিদেরকে দেখতে যেন খুব সুন্দর লাগে, তাই সে সবাইকে রঙে রঙে রাঙিয়ে দিতে শুরু করল। দাঁড়কাক কুট হাঁসকে সব থেকে শেষে রঙ করল। তারপরে কুট দাঁড়কাককে রঙ করতে শুরু করলো যার খুব উজ্জ্বল রঙের শখ ছিল। তাই কুট একহাতে টকটকে রগরগে রঙ দিয়ে দাঁড়কাককে সাজাতে লাগল, কিন্তু অন্য হাতে কাঠকয়লা লুকিয়ে রাখল। দাঁড়কাক যেই একবার অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়েছে কুট নিমেষের মধ্যে দাঁড়কাকের সব উজ্জ্বল রঙগুলোকে চারকোল দিয়ে কালো করে দিল। দাঁড়কাক তো খেপে বাদামী হয়ে গেল আর কুটের পেছনে ধাওয়া করল। কিন্তু কুট বড্ড দ্রুত ছুটে পালাতে লাগল, তাই জন্য দাঁড়কাক তাকে সাদা কাদা ছুঁড়ে মারল, কুটের গায়ে সাদা কাদা ছিটকিয়ে লাগল। সেইজন্যই কুট হাঁসের মাথায় আর পেছনে সাদা সাদা দাগ আছে। কিন্তু কুট তো পগাড় পার হয়ে গেল, দাঁড়কাকও চিরকালের মত কুচকুচে কালো হয়ে রয়ে গেল।

(www.theoffnews.com Eskimo folk tales Athabaskan language)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

(ইংরেজি অনুবাদ: RAVEN AND THE SEALS. Tsimshian Folk Tales)

(আলাস্কার সিমশিয়ান উপজাতির লোকগল্প)

উড়তে উড়তে দাঁড়কাক একেবারে জলের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাড়িতে এসে পৌঁছল যেখানে একজন মানুষ বাস করত।

দাঁড়কাক তাকে বলল, “আমি তোমার বন্ধু হবো।”

লোকটি বলল, “সে তো ভালই।”

এদিকে বাড়িটার সামনের সমুদ্র সৈকত সীল মাছে ভর্তি ছিল। দাঁড়কাক দুই রাত্তিরেই সেগুলোকে সব সাবাড় করে ফেলল। বাড়ির সামনে যত সীল ছিল সেগুলোকেও সব খেয়ে ফেলল। তারপর তার আবার খিদে পেয়ে গেল। দাঁড়কাক লোকটাকে মেরে ফেলল। তারপরে সে তার ক্যানো (শালতি, ডিঙি নৌকা) আর হার্পুনটা নিয়ে মাছ ধরতে বেরল। সে চারটে সীল মাছকে গেঁথে ফেলল। তারপরে সে তীরে ফিরে এল। সেখানে সীল মাছগুলোকে ক্যানো থেকে নামাল আর কাঠ কাটতে শুরু করল। তারপর সে এক জায়গায় আগুন ধরাল আর তার মধ্যে কিছু পাথর ফেলে দিল সেগুলোকে গরম করার জন্য। এরপর সে গরম পাথরের পাঁজার ওপর সীল মাছগুলোকে রাখল। চারটে সীল মাছকে সে ঝলসে নিল আর সেগুলোকে মানকচুর পাতা দিয়ে ঢেকে রাখল।

তারপর দাঁড়কাক পাতার ঢাকা তুলে একটা সীল বের করে আনল। সেটাকে খেল। তারপরে সে হাত বাড়িয়ে আর একটা সীল মাছকে তুলে নিল।

ওর পাশেই একটা কাটা গাছের গুঁড়ি থেবড়ি গেদে বসেছিল। দাঁড়কাক সীল মাছটাকে হাতে তুলে গুঁড়িটাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলল, “গুঁড়িবাবু, খুব হিংসে হচ্ছে আমাকে, না?” তারপরে সে জঙ্গলে উড়ে গেল। নিমেষের মধ্যে গুঁড়ি উঠে পড়ল আর যে গর্তটায় সীল মাছগুলো ভাপে রান্না হচ্ছিল সেই গর্তটার কাছে গিয়ে সটান হাজির হয়ে গেল। গুঁড়ির ঠিক নীচেই ছিল সীল মাছগুলো। তখনই একরাশ কচুপাতা নিয়ে দাঁড়কাক উড়ে ফিরে এল। তার সীল মাছগুলোর কাছে গুঁড়িকে দেখেই সে কা কা করে চীৎকার করে উঠল। তার ভীষণ কষ্ট হলো কারণ তার খুব খিদে পেয়েছিল। তারপরে সে একটা ডাল নিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। যতক্ষণ সে মাটি খুঁড়ছিল সারাক্ষণ সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাঁদতে লাগল। মাংসের একটা কুচি খুঁজে পেয়ে সেটাই সে খেয়ে নিল। কিন্তু সে আর কিছুই করতে পারল না। তারপর থেকে দাঁড়কাক কেবলি কা কা করে কেঁদে বেড়ায় কারণ সে সারাক্ষণ ভুখা থাকে।

(www.theoffnews.com Tsimshian folk tales)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

মূল লেখা: THE LAND OTTER Tlingit (Wrangell)

[আলাস্কার ওয়ার্ঞ্জেল শহরের ক্লিংকিট জাতির আখ্যান]

দাঁড়কাক ভূমি ভোঁদড়কে বলল, “তুমি জলে আর ডাঙায় একইরকম ভাবে থাকতে পারবে।”

দাঁড়কাক আর ডাঙার ভোঁদড় হরিহর আত্মা ছিল, তাই তারা একসঙ্গে হালিবেট মাছ শিকারে যেত। ভূমি ভোঁদড় একজন দক্ষ মাছ শিকারী ছিল। দাঁড়কাক ভোঁদড়কে বলল, “সব সময় এমন জায়গায় তোমার ঘর হবে যেখানে সব দিক থেকে হাওয়া বইবে। যখনই কোনও ডিঙি নৌকো পাল্টি খাবে তুমি লোকদেরকে বাঁচাবে আর তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবে।” এইভাবেই ‘ভূমি ভোঁদড় মানুষ’ বা “কুষ্টক”-এর সৃষ্টি হল কারণ দাঁড়কাক ভূমি ভোঁদড়কে এইরকমটাই নির্দেশ দিয়েছিল।   

ভূমি ভোঁদড়রা যে সব মানুষকে নিয়ে চলে যায় তাদেরকে যদি তাদের বন্ধুরা ফিরিয়ে নিয়ে আসে তাহলে তারা ‘শামান’ বা ওঝা হয়ে ওঠে। ভূমি ভোঁদড়দের মাধ্যমেই শামানদের কথা প্রথম জানা গিয়েছিল। ‘শামান’ বা ওঝারা ভূমি ভোঁদড়দের আত্মার মাধ্যমে একে অপরকে দেখতে পায় কিন্তু অন্য আর কেউ পায় না।  

অনুবাদকের সংযোজনঃ [হালিবেট মাছ ভারতে আয়রাম পল্লী বলে পরিচিত এবং চিতল মাছের মতো দেখতে, পাওয়া যায় অ্যাটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তরে। ডান-চোখী ফ্লাউন্ডারদের পরিবারে তিনটি প্রজাতির ফ্ল্যাটফিশের সাধারণ নাম হলিবেট। কিছু অঞ্চলে বড় ফ্ল্যাটফিশের অন্যান্য প্রজাতিকে হ্যালিবেট হিসাবেও উল্লেখ করা হয়। ক্যাথলিক পবিত্র দিনগুলিতে জনপ্রিয়তার জন্য হ্যালি (পবিত্র) এবং বাট (ফ্ল্যাট ফিশ) থেকে শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে]

[ভূমি ভোঁদড় মানুষ বা “কুষ্টক” ক্লিংকিট এবং প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর পশ্চিমের অন্যান্য দেশীয় মানুষদের পৌরাণিক কাহিনীর একটি চরিত্র। এরা চেহারার পরিবর্তনে দক্ষ আত্মা যারা মানুষ এবং ভূমি ভোঁদড়ের মধ্যে চেহারা বদল করতে পারে। মানুষের বেশে এদেরকে সাধারণ মানুষ বলেই মনে হয় কিন্তু যখন তারা আসল ভোঁদড়ের চেহারায় ফিরে যায় তখনই এদের আসল পরিচয় বেরিয়ে পড়ে।

“কুষ্টক” শব্দটি দুটি কথা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে – “কুষ্ট”, মানে ভূমি ভোঁদড়, আর “কা” মানে মানুষ। এই আত্মারা গহীন বনে বাস করে বলে জানা গেছে আর মনে করা হয় যে এরা একাকী এবং অসুখী ব্যক্তিরা যারা নিরাপদ আশ্রয় থেকে বহু দূরে চলে যায় তাদেরকে লোভ দেখিয়ে বা বিভ্রান্ত করে পাকড়াও করার জন্য খুঁজে বেড়ায়। কোনও কুষ্টকের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলিকে প্রায়শই অশুভ বা বিপজ্জনক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু অনেকে এদের উপকারী আত্মা বলেও মনে করেন।]

(www.theoffnews.com Alaska Wrangell klinkit folk tales)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

ইংরেজি অনুবাদ (নাম): HOW RAVEN TAUGHT THE CHILKATS

(আলাস্কার ওয়ার্ঞ্জেল শহরের ক্লিংকিট জাতির আখ্যান)

[এই জাতি উত্তর আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিম উপকূলের আদিবাসী। অধিকাংশ ক্লিংকিট আলাস্কার আদিবাসী হলেও কিছু কানাডার নাগরিকও আছেন।

স্টিকাইন নদীর মুখের কাছে অবস্থিত, ওয়ার্ঞ্জেল আলাস্কার প্রাচীনতম শহরগুলির মধ্যে একটি। ওয়ার্ঞ্জেল এখন প্রায় ২,৫০০ বাসিন্দার ঠিকানা। আলাস্কার ওয়ার্ঞ্জেল একমাত্র শহর যা তিনটি দেশ, রাশিয়া, ইংল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা শাসিত ছিল। ক্লিংকিট লোকেরা হাজার হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলে বসবাস করছে এবং তাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উদাহরণ ওয়ার্ঞ্জেল এখনও বিদ্যমান।]

আলাস্কার সেই দাঁড়কাকের কথা তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে গ্রাউন্ড-হগদের বোকা বানিয়ে মায়ের শ্রাদ্ধের সময় এলাহি ভুঁড়িভোজের ব্যবস্থা করেছিল আর পৃথিবীর আদি বাসিন্দাদের আগুনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল! সেই দাঁড়কাক চিলকিটদের শিখিয়েছিল যে (আলাস্কার) একটা দেশে আথাবাসকান ইন্ডিয়ানরা বাস করে। সে ওই দেশে ফিরে গিয়েছিল। তাই রোজগারের ধান্দায় এখনও চিলকিটরা ওই দেশে যায়। দাঁড়কাক তাদেরকে আরও শিখিয়েছিল তাদের গ্রামের বাইরে কি করে গোপন ভাঁড়ার বানাতে হবে আর শিখিয়েছিল কিভাবে স্যামন মাছকে ওই গোপন ভাঁড়ারে রেখে শীতের মরশুমে সেগুলোকে জমিয়ে রাখতে হবে। এই থেকেই চিলকিটদের নাম চিলকিট হলো – “টইল”(toil) – ভাঁড়ার, আর “এক্সট” (xat) – স্যামন।       

দাঁড়কাকই প্রথম চিলকিটদেরকে রেড ইন্ডিয়ানদের তামাকের বীজ দেখায় আর তাদেরকে বীজ থেকে গাছ করতেও শেখায়। তামাক গাছ বড় হলে সে তামাকের পাতা শুকিয়ে নেয় আর ঝিনুক-ভস্মর সঙ্গে মিশিয়ে থেঁতো করে। আথাবাসকানদের সঙ্গে তামাকের ব্যবসা করে চিলকিটদের আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়।  

পরের দিকে দাঁড়কাক কপার রিভার পেরিয়ে ইয়ুকাতাত চলে যায়। সেখানে সে লোকদের শেখায় কিভাবে চামড়া দিয়ে ক্যানো বানাতে হয়।

(www.theoffnews.com Alaska Wrangell folk tales)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন সৌদি আরবের মরুভূমিতে উটের জীবন্ত-আকারের খোদাই করা প্রাচীন ভাস্কর্য আবিষ্কার করেছিলেন তখন তাঁদের মনের মধ্যে 'হাসিখুসি'র 'উট চলেছে মুখটি তুলে’ ছড়াটি গুনগুনিয়ে উঠেছিল কিনা জানা নেই তবে,  তাঁদেরও নিশ্চিত করে জানা নেই এগুলো কে এবং কখন তৈরি করেছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা সৌদি আরবের নাফুদ মরুভূমির দক্ষিণ সীমান্তে বালি ওপর উঠে থাকা একটি পাথরের গায়ে এক পাল উটের খোদাই ছবি লক্ষ্য করেছেন। “আর্কিয়োলজিক্যাল রিসার্চ ইন এশিয়া” জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র অনুসারে এই বিস্ময়কর খোদাই ছবিটিতে এক ডজন প্রমাণ আকারের বন্য উটকে দেখা যাচ্ছে যেটি এখন বিলুপ্তপ্রায় একটি প্রজাতি যা হাজার হাজার বছর আগে আরব উপদ্বীপের মরুভূমিতে বিচরণ করতো কিন্তু কখনও বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়নি। যদিও সাহাউট নামের প্রত্নস্থলটি কোনও না কোনও সময়ে অন্য প্রত্নতাত্ত্বিকরা পরিদর্শন করছিলেন কিন্তু পাথরের ওপর উটের খোদাইটি লক্ষ্য করা হল এই প্রথমবার।

গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ও জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ জিওএনথ্রোপলজির একজন পোস্টডক্টরাল গবেষক মারিয়া গুয়াগনিন, লাইভ সায়েন্সকে জানিয়েছেন - "আমরা অন্য একটি গবেষণাপত্র থেকে সাইটটি সম্বন্ধে জানতে পারলেও প্যানেলটি খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল কারণ এটির অবস্থান সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া ছিল না, আর মরুভূমি কিছু সহজ জায়গা নয়।" কিন্তু বালিয়াড়িতে ওই পাথরটিকে খুঁজে পাওয়াই একমাত্র সমস্যা ছিল না। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত উটের খোদাই ছবির ওপর বারবার নতুন খোদাই ছবির আবির্ভাব হয়ে কোন আঁচড়গুলি কোন সংস্কৃতির এবং কখন তৈরি করা হয়েছে তা নিয়ে নতুন রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ভীমবেটকার গুহাচিত্রগুলির মত এই পাথরটিতেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ ভিন্ন ভিন্ন শৈলীতে পুরনোর ওপর নতুন খোদাই করে পাথরটিকে ভরিয়ে দিয়েছে যেগুলির থেকে ছবিগুলি আলাদা করা বা তাদের সময়কাল নির্ণয় করা খুব কঠিন। গুয়াগনিন এও বলেছেন যে খোদাইগুলির বেশিরভাগই যেহেতু ফাটলের মধ্যে করা হয়েছিল তাই সেগুলোর ভেতরে ঢুকে রেডিওকার্বন ডেটিং করতে যাওয়া অত্যন্ত দুরূহ।

যাইহোক, পাথরটির কাছাকাছি দুটো পরিখা আর দুটো উনুনের রেডিওকার্বন ডেটিং করে মোটামুটি আঁচ পাওয়া গেছে যে সাহাউট প্রত্নস্থলটি প্লাইস্টোসিন যুগ (২৬ লক্ষ বছর থেকে ১১,৭০০ বছর আগে) থেকে মধ্য হলোসিন যুগ (৭০০০ থেকে ৫০০০ বছর আগে) পর্যন্ত এখানে প্রায়শই মানুষের বসবাস ছিল।

গুয়াগনিন জানিয়েছেন - “এই প্রত্নস্থলের তাৎপর্য বোঝার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন। কাছাকাছি কোনও জলের প্রাকৃতিক উৎস নেই, তাই এমন কিছু ছিল যা প্রাচীন যুগে মানুষকে এখানে আকৃষ্ট করেছিল। সম্ভবত তাদের লম্বা সফরের রাস্তায় এটা একটা বিশ্রামের ভালো জায়গা ছিল। কিন্তু যুগের পরে যুগ কেন এটা এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল সে বিষয়ে আমরা এই মুহূর্তে একেবারেই নিশ্চিত নই”।

সৌদি আরবে সাহাউটই একমাত্র প্রত্নস্থল নয় যেখানে উটের খোদাই পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে পশ্চিম সৌদি মরুভূমির আল-জউফ প্রদেশে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ২০০০ বছরের পুরনো প্রমাণ আকারের উটের দলের একটি খোদাই শিল্পকর্ম আবিষ্কার করেছিলেন।

“উট কি কাঁটা বেছে খায়?” - লালমোহনবাবুর এই আইকনিক অথচ বেসিক প্রশ্ন নিয়ে হয়তো গবেষকদের মাথা ব্যাথা নেই কিন্তু প্রমাণ সাইজের এই খোদাই করা উটের পাল নিয়ে তাদের গবেষণায় যেতে হবে বহু দূর! বহু দূর!

(www.theoffnews.com camel archaeology Soudi Arabia Nafud Desert)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

আমরা জানি না, মেসোপটেমিয়ার লারসা শহরের (বর্তমান ইরাকের উরুকের প্রায় ১৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে) বসবাসকারী জিনু নাম্নী মহিলা প্রায় ৪,০০০ বছর আগে তাঁর ছেলে ইদ্দিন-সিনের কাছ থেকে চিঠিটি পেয়ে কী ভেবেছিলেন। যেমন আমরা জানি না অপুর কলকাতা থেকে পাঠানো পোস্টকার্ড পেয়ে মনসাপোতায় একা থাকা সর্বজয়ার মনের অবস্থা কী হয়েছিল। মা যখন ছেলের সান্নিধ্যের জন্য তড়পে তড়পে মরছেন, আক্ষরিক অর্থেই মারা যাচ্ছেন, তখন অপুর চিঠি এসে পৌঁছায়, চিঠিটা পড়ার পর সর্বজয়ার হাত থেকে ঝুপ্পুস করে পড়ে যায়, অপু লিখেছে পরীক্ষা আছে, আসতে পারবে না। যেমন আমরা জানি না অপুর পাঠানো দু’টাকার মানিঅর্ডার পেয়ে সর্বজয়ার মনে কী আলোড়ন হয়েছিল। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে আধশোয়া অপুকে অনিল জিজ্ঞেস করে “মনসাপোতা গেলি না? তোর মা রাগ করবেন না?” অপু বলে, “উঁহু, ওটা ম্যানেজ করে নিয়েছি। মাকে আজ মানিঅর্ডারে দুটো টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি।” 

ইদ্দিন-সিন ছোকরা সম্ভবত বিখ্যাত হামুরাবির রাজ্যের একটি ইস্কুলে পাঠরত ছিল এবং সে অত্যন্ত রাগান্বিত এবং অসন্তুষ্ট ভাবে অভিযোগ করেছিল যে তার মা তাকে যে জামাকাপড় পাঠিয়েছিলেন তা "খ্রিস্টপূর্ব ১৯ শতকের" ছিল, যখন তার বন্ধুরা সবাই ১৭৯০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের স্টাইলে ফ্যাশনেবল পোশাকে সুসজ্জিত ছিল।

রসিকতা থাক, লারসার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পাওয়া প্রথম ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের সময় (১৭৯২ এবং ১৭৫০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের মধ্যে) লেখা একটি মাটির ট্যাবলেটে এই চিঠিটি পড়া যায়।

এটি কখন আবিষ্কৃত হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়, তবে ১৯২২ সালের মধ্যে ট্যাবলেটটি ল্যুভর মিউজিয়াম অধিগ্রহণ করেছিল এবং সেখানেই এটি বর্তমানে রাখা আছে। এটিতে খোদাই করা চিঠিটি বেলজিয়ান প্রত্নতাত্ত্বিক জর্জেস ডসিন ১৯৩৪ সালে  প্রথম প্রকাশ করেন, তখনই ইদ্দিন-সিন তার মা জিনুকে উদ্দেশ্য করে যে তিক্ত শব্দগুলি প্রয়োগ করেছিল সেগুলি জানা যায়।

ইদ্দিন-সিন লারসার অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিল, কারণ তার বাবা শামাশ-হাজির প্রশাসনের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। প্রথা অনুসারে, তাকে একটি মন্দিরে কিউনিফর্মে পড়তে এবং লিখতে শেখার জন্য এবং একজন আমলা, পুরোহিত বা লেখক হিসাবে কর্মজীবনের জন্য তৈরি হতে আবাসিক হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। চিঠিটিতে প্রাসঙ্গিক কোনও তথ্য না থাকলেও  গবেষকরা অনুমান করেছেন যে এই কারণেই ইদ্দিন-সিন বাড়ি থেকে দূরে থাকত।

১৯৬৭ সালে অ্যাসিরিওলজিস্ট অ্যাডলফ লিও ওপেনহেইম চিঠিটি অনুবাদ করেছিলেন যেখানে ইদ্দিন-সিন তার মাকে নতুন পোশাক না পাঠানোর জন্য অপরাধী বোধ করাবার চেষ্টা করেছে:

“শ্রীমতী জিনুকে বলুন যে ইদ্দিন-সিন নিম্নলিখিত বার্তা পাঠিয়েছে: দেবতা শামাশ, মারদুক এবং ইলাব্রত আমার জন্য আপনাকে সর্বদা ভাল রাখুন। বছরের পর বছর, এখানকার ভদ্র যুবকদের পোশাকের উন্নতি হয়, কিন্তু তুমি বছরের পর বছর আমার পোশাকের অবস্থা খারাপ হতে দিয়েছ। আসলে, তুমি আমার জামাকাপড়কে আরও ছেঁড়াখোড়া এবং গুটিকয়েকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করে যাচ্ছ। যে সময়ে আমাদের ঘরে রুটির মতো (যথেচ্ছ) উলের ব্যবহার করা হয়, (সেই সময়ে) তুমি আমাকে হতদরিদ্র পোশাক বানিয়ে দিয়েছ। আদাদ-ইদ্দিনামের ছেলে, যার বাবা আমার বাবার একজন সহকারী মাত্র, তার কাছেও দু’সেট নতুন জামাকাপড় রয়েছে, আর আমাকে এক সেট (নতুন পোশাক) দিতেও তোমার ইচ্ছে করে না। যদিও তুমি আমার জন্ম দিয়েছিলে এবং তার মা তাকে দত্তক নিয়েছিল, (তবু) তার মা তাকে ভালবাসে আর তুমি আমাকে ভালবাস না!”

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দৈনন্দিন জীবন বোঝার জন্য এই চিঠিটি একটি অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভাণ্ডার। এর থেকে বোঝা যায় যে জিনু তাঁর ভেড়ার পালের লোম থেকে তৈরি উল বা বাজারে কেনা উল দিয়ে তাঁর পরিবারের পোশাক তৈরি করতেন। তিনি সেগুলি কাটতেন, বুনতেন, রং করতেন এবং সেলাই করতেন যা কাপড়ের মানের ওপর নির্ভর করে প্রায় তিন মাস বা এমনকি পুরো এক বছর সময় নিতে পারত।

খুব সম্ভবত, জিনু হয়তো পড়তে জানতেন না, কারণ চিঠির শুরুতে "শ্রীমতী জিনুকে বলুন" থেকে বোঝা যায় এটি একজন অক্ষরজীবীর জোরে জোরে পড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল।

আমরা জানি না ইদ্দিন-সিন চিঠিটি নিজে লিখেছিল নাকি কোন লিপিকারকে দিয়ে শ্রুতিলিখন করিয়েছিলেন। "ইদ্দিন-সিন নিম্নোক্ত বার্তা পাঠায়" মেসোপটেমিয়ার চিঠিগুলিতে একটি স্ট্যান্ডার্ড ধাঁচা, যার থেকে বোঝা যায় এটি ডিক্টেশন দিয়ে লেখান হয়েছিল। অবশ্য, অ্যাসিরিওলজিস্টরা যেসব ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করেছেন আর কিছুটা আনাড়ি লেখনী থেকে ধারণা করা হয় যে শ্রুতিলেখক অনভিজ্ঞ ছিলেন, সম্ভবত ইদ্দীন-সিনের মতোই একজন ছাত্র।

তার ওপর, যেহেতু ব্যবহৃত ট্যাবলেটের সামনে এবং পেছনের জায়গা ভরাট করার পরেও চিঠিটি শেষ হয়নি, তাই লেখক মার্জিনে লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তবে সে জায়গাও পূর্ণ হয়ে গেলে ট্যাবলেটের একেবারে নীচের দিকে শেষ করতে হয়েছিল।

ইদ্দিন-সিন তার সমবয়সীদের তুলনায় তার পোশাকের উৎকৃষ্টতা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ছিল, কারণ তার সামাজিক মর্যাদা ধনী দেখানোর ওপর বেশ খানিকটা  নির্ভর করত। এই কারণেই সে তার মাকে বিভিন্ন উপায়ে চালিত করার চেষ্টা করেছিল যার মধ্যে একটা তার দুর্ভাগ্যের জন্য মাকে দোষী বোধ করান ।

ঘটনা হল যে ৩,৮০০ বছরের পুরনো এই চিঠিটি থেকে বোঝা যায় যে কিছু জিনিসের কখনই পরিবর্তন হয় না।

(www.theoffnews.com letter Iddin Sin Louvre Museum)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

১৪,০০০ বছর আগে শিকারীদের একটি দল একটি হরিণের শিঙের ওপর এই ছোট্ট খোদাই কর্মটি করেছিল যাতে প্রায় জীবন্ত একটি বাইসনের প্রতিমূর্তিকে পাশ ফিরে তার গায়ের ওপর পোকার কামড়ের জায়গা চাটতে দেখা যাচ্ছে।

ফ্রান্সের সেন্ট রেমেজ-এর আব্রি দে লা ম্যাডেলিন বা ম্যাগডালিন শেল্টার নামের একটি গুহার ভেতরে আবিষ্কৃত “পোকার কামড় চাটা বাইসন” নামে খ্যাত এই প্রাগৈতিহাসিক খোদাই মূর্তিটি একটি স্তেপ উইজেন্ট (Bison priscus) বা স্তেপ বাইসনের যা বর্তমানে বিলুপ্ত। ব্র্যাডশ ফাউন্ডেশনের মতে, এটি রেইনডিয়ার বা বল্গা হরিণের শিঙের একটি টুকরো থেকে প্রায় ১৪,০০০ বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল যা আগে শিকারের জন্য বর্শা নিক্ষেপকারী হিসেবে আদিম মানুষেরা ব্যবহার করেছিল। 

মাত্র ১০.৫ সেমি বা প্রায় ৪ ইঞ্চি চওড়া ক্ষুদ্র মূর্তি হওয়া স্বত্বেও এটিতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রচুর সূক্ষ্ম ডিটেইল ফুটিয়ে তুলে এটিকে প্রায় জীবন্ত রূপ দেওয়া হয়েছে, যেমন পশুটির শরীর জুড়ে সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা আলাদা আলাদা লোম এবং এটির মাথা থেকে নির্গত এক জোড়া শিং।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা নিশ্চিত যে এই নিদর্শনটির নির্মাতারা ছিলেন ম্যাগডালেনিয়ান সংস্কৃতির মানুষ। এটি একটি প্যালিওলিথিক সংস্কৃতি, যার অস্তিত্ব ছিল ২৩,০০০ থেকে ১৪,০০০ বছর আগে, ইউরোপের শেষ বরফ যুগে। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মতে, এই সংস্কৃতির মানুষেরা বিশেষ ভাবে পরিচিত তাদের বিস্তৃত শিল্পকর্মের জন্য, যার মধ্যে আছে কাঠকয়লায় আঁকা গুহা চিত্র এবং পাথর এবং হাড়ের সরঞ্জাম ব্যবহার করে খোদাই শিল্প।

তারা শুধু দক্ষ কারিগরই ছিলেন না, ম্যাগডালেনিয়ান সংস্কৃতির লোকেরা বিগ-গেম শিকারেও পারদর্শী ছিলেন যারা ঘোড়া এবং বাইসন শিকারে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন। গবেষকরা মনে করেন যে যেহেতু খাবারের অভাব না থাকায় ওই সংস্কৃতির সদস্যদের শিল্প সমেত অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করার জন্য যথেষ্ট অবসর সময় ছিল।

এই প্রত্ননিদর্শনটি বর্তমানে ফ্রান্সের লেস আইজিসের প্রাগৈতিহাসিক জাতীয় জাদুঘরে (ন্যাশনাল ম্যুজিয়াম অভ প্রিহিস্ট্রি) রাখা হয়েছে।

(www.theoffnews.com Prehistoric Bison Abri De La Madeleine)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

অতি সম্প্রতি (৮ আগস্ট, ২০২৪) ইতালির একটি হ্রদের তলায় একটি মহিলার লৌহ যুগের একটি অসমাপ্ত মাটির ছলন বা ক্ষুদ্র ভোটিভ মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। ইতালির আইওলার আগ্নেয়গিরির গ্রান ক্যারো ডি বলসেনা লেকের জলের তলায় প্রত্ন স্থলে খনন কাজ চলার সময় এই ছলনটির সন্ধান পেয়ে সেটিকে ডাঙায় তুলে আনা হয়েছিল। এটি খ্রিস্টপূর্ব ১০তম এবং ৯ম শতাব্দীর মধ্যে কোনও এক সময়ে তৈরি হয়েছিল। একটি ফিনিশড্ শিল্পের চেয়ে মূর্তিটিকে প্রাথমিক চেষ্টার মতো দেখায়। কিন্তু এর স্রষ্টা মূর্তিটি সম্পূর্ণরূপে শেষ না করার অর্থ এই নয় যে লৌহ যুগে এটি কীভাবে ইতালীয় জীবনের সাথে খাপ খায় তা দেখানোর জন্য যথেষ্ট তথ্য এতে নেই। বিশেষজ্ঞরা আশা করেন যে কাঁচা হাতে তৈরি মূর্তিটি থেকে তাঁরা লৌহ যুগে ইতালীয় জীবন সম্পর্কে বিশদে জানতে পারবেন।

ইতালির আর্কিওলজি, ফাইন আর্টস এবং ল্যান্ডস্কেপের সুপারিনটেনডেন্সির বিবৃতি অনুসারে, মাটির মূর্তিটি এতই তাজা যে এটার গায়ে মূর্তিকারের “আঙুলের ছাপ এখনও দেখা যাচ্ছে"। এই মূর্তিটি সম্ভবত কাঁচা অবস্থায় কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল কারণ এর বুকের নিচের অংশে কাপড়ের ছাপ রয়েছে। সম্ভবত এটি ছিল তার ‘পোশাক’। মাটির মূর্তিটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় হাজার বছর কাটিয়েছে, দীর্ঘদিন আগে মৃত মূর্তিকারের লৌহ যুগের মূর্তিটি শেষ করার জন্য একটি হ্রদের তলায় অপেক্ষা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ছলন সাধারণত মৃতদের দেহাবশেষ সংরক্ষণের জায়গায় রাখা হতো। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাড়ির আচার-অনুষ্ঠানে এটি ব্যবহার করা যেত না। কারণ, ডুবুরিরা যে জায়গায় মূর্তিটি খুঁজে পেয়েছিল তা একসময় আবাসিক এলাকা ছিল। ছলনটিকে নিরাপদে জল থেকে বের করে আনা নিশ্চিত করতে ইটালিয়ান কালচারাল প্রপার্টি রেস্টোরেশন টিম সরকারী ডুবুরিদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করেছে। 

ক্যারো ডি বলসেনার ঐতিহাসিক তাৎপর্য - ১৯৯১ সালের আগে পর্যন্ত গ্রান ক্যারো ডি বলসেনা প্রত্নতাত্ত্বিক আগ্রহের একটি স্থান হয়ে ওঠেনি। গ্রান ক্যারো ডি বলসেনার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি আইওলা কমপ্লেক্সের জন্য বিখ্যাত যেটি আংশিকভাবে বিশ্লেষণ করা একটি স্মৃতিস্তম্ভ যা এখনও একটি প্রত্নতাত্ত্বিক রহস্য। কাঠামোর কোনও গাঁথনি ছাড়াই এই পাথরের স্তূপটি একটি ডিম্বাকার বেদীর ওপর একটি ছোট মোচাকৃতি স্থাপত্য যার নীচে মাটির একটি ঢিবি লুকানো আছে। গবেষকরা মনে করেন যে এই আকৃতিহীন পাথরের স্তূপ উষ্ণ প্রস্রবণের তাপপ্রবাহের কারণে তৈরি হয়। ২০২০ সালে আরেকটি অনুসন্ধান থেকে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হন যে নির্ধারণ করতে পরিচালিত করেছিল যে আইওলা প্রাথমিক লৌহ যুগে একটি গ্রামের স্তূপ-আবাসিক বসতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কাঠের খুঁটি এবং সিরামিক খণ্ডগুলি হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিমে মাটির ঢিবির নীচে ২০২০ সালে পাওয়া গিয়েছিল। কনস্টানটিন যুগের মুদ্রা এবং পাত্রগুলি পরে প্রমাণ করে যে রোমান সাম্রাজ্যের শেষ অবধি মানুষ এই স্থানে বাস করত।

(www.theoffnews.com pond underwater statue finger print Carro Di Bolsena Itali)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন ঐতিহ্যশালী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম বলা হয় কম্বোডিয়াকে। এখানে থাকা আঙ্কোরভাট মন্দিরকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম মন্দির। নব্বইয়ের দশক থেকে সেই কম্বোডিয়া ও আঙ্কোরভাটকে নিয়ে গবেষণা করেছেন পুরাতাত্ত্বিক ড্যামিয়েন ইভান্স। গবেষণা করতে গিয়ে আঙ্কোরভাটের কাছে একের পর এক মধ্যযুগীয় শহরও আবিষ্কার করেছিলেন অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার এই গবেষক। পুরাতাত্ত্বিক গবেষণায় লেজার স্পেস টেকনোলজির প্রয়োগের অন্যতম পথিকৃৎও বলা হয় তাঁকে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১২ তারিখে ব্রেন লিম্ফোমায় আক্রান্ত হয়ে প্যারিসে প্রয়াত হন তিনি। 

গবেষকেরা জানান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সম্পর্কে এত দিনের প্রচলিত ধারণা অনেকটাই বদলে গিয়েছিল ড্যামিয়েন ইভান্সের একের পর এক আবিষ্কারে। আঙ্কোরভাটের অদূরে ৯০০ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গড়ে ওঠা অনেকগুলি প্রাচীন শহরও আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। ইভান্সের গবেষণায় সুপারভাইজ়ার হিসাবে ছিলেন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রোলান্ড ফ্লেচার। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফ্লেচার জানিয়েছেন, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সময়ে বৃহত্তর আঙ্কোরভাটের বিস্তৃত মানচিত্র পেশ করেছিলেন ইভান্স। তার পরে ফ্লেচার ও ইভান্সের পরিচালনায় শুরু হয়েছিল ‘গ্রেটার আঙ্কোরভাট প্রজেক্ট’-এর। পরে সেই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিলেন ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক ক্রিস্টোফ পটিয়ের। তাঁদের সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় ওই অঞ্চলের একটি নতুন সামগ্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়েছিল।

ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অ্যালিসন কার্টারের সঙ্গে ড্যামিয়ানের দেখা হয়েছিল ২০০৮ সালে। অ্যালিসন ইভান্সের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘‘ড্যামিয়ান অসাধারণ লেখক ও সম্পাদকও ছিলেন।"

সিয়েম রিপ-আঙ্কোর নামক স্থানে ‘ওভারিজ রিসার্চ সেন্টার’ তৈরি করেছিল সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও ডিরেক্টর ছিলেন ইভান্স। ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইভান্স ওই দায়িত্ব সামলেছেন। এই সময়েই আকাশ থেকে ছবি তোলা ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির ব্যবহার করে আঙ্কোরভাটের মানচিত্র তৈরি হয়েছিল। তার পরে পর ইভান্স প্রত্নতত্ত্ব গবেষণায় সর্বপ্রথম আকাশ থেকে অত্যাধুনিক লেজার স্ক্যানিং প্রযুক্তি (লিডার) ব্যবহার করেন। এই প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে বৃহত্তর আঙ্কোরের মাটির তলায় অনেক প্রাচীন শহর ও কৃষি বসতির মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।

২০১৪ সালে ‘কম্বোডিয়ান আর্কিয়োলজিকাল লিডার ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প শুরু করার জন্য ‘ইউরোপিয়ান রিসার্চ কাউন্সিল’ থেকে অনুদান পেয়েছিলেন ইভান্স। সেই সুবাদেই তাঁর কর্মক্ষেত্র ফ্রান্সে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরের বছর তাঁর গবেষক দল একটি হেলিকপ্টারে একটি লেজার রেডার লাগিয়ে কাম্বোডিয়ার বিস্তীর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ অংশে সমীক্ষা চালিয়েছিল। আজ পর্যন্ত আকাশপথে যতগুলি পুরাতাত্ত্বিক সমীক্ষার কাজ হয়েছে তার মধ্যে এটিকে বৃহত্তম বলা হয়।

মৃত্যুর আগে লিডার ব্যবহার করে কী ভাবে প্রাচীন শহরগুলির মানচিত্র তৈরি করা যায় সে সম্পর্কে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ইভান্স। সে জন্যও ‘একল ফ্রান্সেইস দ্য এক্সত্রেমে ওরিয়েন্ত’ এও যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

(www.theoffnews.com Damien Evans Australian Canadian archaeologist Angkor Wat Temple)


সোমনাথ রায়, প্রত্নগবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক, দুর্গাপুর:

“পুজোয় চাই নতুন জুতো” - আমাদের ছোটবেলায় দুর্গাপুজোর ঠিক কদিন আগে খবরের কাগজে পাতা জোড়া বাটা কোম্পানির জুতোর বিজ্ঞাপন বেরত, সঙ্গে থাকত বিজ্ঞাপন জগতে আলোরণ সৃষ্টিকারী এই সহজ কিন্তু সার্থক ক্যাপশন। বাড়ির বড়রা সেই বিজ্ঞাপন দেখে তাতে গোল্লা এঁকে দিতেন কোন জুতোটা আমার জন্য কেনা হবে। তারপরে সেই কাগজ সমেত বাটার দোকানে যাওয়া হতো। হর্নশু দিয়ে জুতো তো পরিয়ে দেওয়া হত - বড় হলে পরার সময় কিছুদিন কাপড় গুঁজে পরা হতো আর একটু ছোট হলে তো পুজোয় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে ফোসকা অবশ্যম্ভাবী।

রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা-আবিষ্কার’ কবিতায় ‘চামার-কুলপতি’-র অভিনব আবিষ্কারের কৃতিত্ব আত্মসাৎ করেছিল গবুচন্দ্র মন্ত্রী কিন্তু অস্ট্রিয়ায় ২২০০ বছরের পুরনো বাচ্চাদের ফিতেওলা যে জুতো গোটাগুটি অবস্থায় পাওয়া গেছে তা নিশ্চয়ই লৌহ যুগের কোনও মুচির তৈরি করা। 

জার্মানির বোচুমের ‘জার্মান মাইনিং মিউজিয়াম’ আর ‘লাইবনিজ রিসার্চ মিউজিয়াম ফর জিও রিসোর্সেস’-এর গবেষকরা একমত হয়েছেন যে ৩০ ইউরোপীয় মাপে বা ১২ আমেরিকান মাপের এই জুতোটি খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে তৈরি হয়েছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা ডুর্নবার্গের পশ্চিম গ্রামে এই প্রাচীন শিশুর জুতা খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা যে জায়গায় খনন করছিলেন সেখানেই লৌহ যুগে মানুষরা রক সল্ট বা পাথুরে নুন খনন করত।

এই এলাকার নুনের একটা গুণ হল যে এই বাচ্চার জুতোর মত অনেক জিনিসকে খুব ভাল সংরক্ষণ করে রাখে। সেই কারণেই এত বছর পরেও স্যান্ডালটি এত ভাল অবস্থায় আছে।

জার্মান মাইনিং মিউজিয়ামের গবেষণা বিভাগের নেতৃত্বদানকারী অধ্যাপক থমাস স্টোয়েলনার প্রেস রিলিজে বলেছেন যে তাঁরা বহু বছর ধরে ডুর্নবার্গে খননে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলি সনাক্ত করার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই আবিষ্কারগুলি থেকে তাঁরা বুঝতে পারেন যে অতদিন আগে খনির কাজ কীভাবে চলত, খনির শ্রমিকরা কীভাবে দৈনন্দিন জীবনযাপন করত আর কী কাজই তাদের করতে হতো।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রাচীন বাচ্চার জুতোর সঙ্গে অন্যান্য অনেক পুরনো জিনিস খুঁজে পেয়েছেন, যেমন কাঠের বেলচা আর ফারের টুকরো। এমন ফার বা উলের অংশও তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন যেটা হয়ত একটা ফার কোটের হুডের অংশ ছিল। বাচ্চার জুতোর যে ফিতেগুলি তাঁরা পেয়েছেন সেগুলি সম্ভবত শণ বা লিনেন দিয়ে তৈরি।

খনিতে বাচ্চার জুতো আবিষ্কার খুব তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এর থেকে জানা যায় যে প্রাচীন যুগে বাচ্চারাও খনিতে বড়দের সঙ্গেই থাকত।

অধ্যাপক স্টোয়েলনার আরও উল্লেখ করেছেন, "জৈব পদার্থ সাধারণত সময়ের সাথে সাথে পচে যায়। এই বাচ্চার জুতো মতই ডুর্নবার্গে পাওয়া কাপড়ের অবশিষ্টাংশ বা মলমূত্রও লৌহ যুগের খনি শ্রমিকদের জীবনধারণের বিরল অথচ সামগ্রিক ধারণা দেয়।”

যে বাচ্চার জুতোটি পাওয়া গেছে সে হয়ত কোনও দুর্গাপুজোয় সেটি উপহার পায়নি কিন্তু নতুন জুতো পাওয়ার আনন্দ নিশ্চয়ই এখনকার বাচ্চার থেকে তার কোনও অংশে কম ছিল না!

(www.theoffnews.com oldest leather Shoe ancient Dunburg)

পি আর প্ল্যাসিড, প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক, জাপান; কিছু মানুষের পাষণ্ডতা পশুকেও হার মানায়। এটাই আজকের দুনিয়ায় বাস্তব চালচিত্র। আমাদের চারপাশে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে কতো ঘটনাই না ঘটে চলেছে। সুখ - দুঃখ বা আনন্দের, মর্মান্তিক, হৃদয় বিদারক যে শব্দ দিয়েই ঘটনার বিষয় বোঝানোর চেষ্টা করি না কেন, এসবের কোনওটাই কিন্তু আমরা বেশীদিন মনে রাখি না। মনে না রাখাটাই যেন এখন বড় ঘটনা। কোনও কারণে কোনভাবে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার কটার বিষয়েই বা আমরা জানি বা এ'সম্পর্কে খবরাখবর রাখি? বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে সামাজিক সাইটে চোখ রাখলে যে দু একটা বিষয় নজর কাড়ে তা নিয়ে দুচার দিন কথা বলি বা ভাবী। ঘটনার বিষয়বস্তু ভাইরাল হলে একটু বেশী জানার আগ্রহ হয়, এটাও বাস্তব। তেমনি একটি ঘটনার সংবাদ এখন নেট দুনিয়ায় বেশ আলোড়ন তুলেছে। ঘটনা ঘটেছে আমেরিকার কোনও এক শহরে। এক মা তার ষোল মাসের সন্তানকে ঘরে তালা দিয়ে একা বন্ধ করে রেখে বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে দশ দিনের জন্য চলে যায় সাগর বিলাসে, জীবনকে উপভোগ করতে। ফিরে এসে সন্তানকে মৃত অবস্থায় পায়। বিষয়টি এরই মধ্যে আপনাদের জানা হয়েছে মনে করে বিস্তারিত আর এখানে উল্লেখ করিনি। কি সাংঘাতিক ঘটনা? কি মর্মান্তিক - হৃদয় বিদারক। পুরো বিষয় শুনলে চোখের পানি সংবরণ করা কোনও মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। যদি সে মানবিক হয়ে থাকে। এনিয়ে যারা মুখ খুলেছেন বা কলম ধরেছেন এদের সবার বক্তব্য বা লেখার শেষে একটি কথাই উল্লেখ করছেন এভাবে যে, সন্তান জন্ম দিলেই মা হয় না। কতো কষ্টের অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাদের এই ছোট একটি বাক্যর মধ্য দিয়ে, তা সহজেই অনুমেয়। আমি মনে করি জন্ম দিলেই মা হয়। তবে মায়ের কার্যকলাপে প্রমাণিত হয় সে যে কেমন মা। পৃথিবীর সকল দেশের মানুষই এক। আমি এই মানুষকে তার আচরণ দিয়ে ভাগ করি এভাবে যে, "মানুষ" আর "অমানুষ"। আমেরিকার নাগরিক অনেকেই। তারা দেখতে মানুষের মতো হলেই যে ফেরেস্তা হয়ে যাবে এমনটা কিন্তু নয়। তবে এটাও সত্য যে, আমেরিকা বলে কথা। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের মুরুব্বি হিসাবে কথিত এই আমেরিকার মানুষদের কাছে অন্য সকল দেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা থাকে। তাদের কাছে জানবে, শিখবে, ফলো করবে এমনটাই প্রত্যাশা। এর ব্যতিক্রম হলেই মানুষ তাদের ছিঃ ছিঃ করবে এটা খুবই স্বাভাবিক। আর সেই দেশে যদি এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে তাহলে সত্যিই তা দুঃখজনক। আমদের দেশেও এমন কিছু ঘটনা ঘটতে শোনা যায় মাঝে মধ্যে। হতে পারে বিষয় ভিন্ন। তবে মায়ের হাতে সন্তান খুন বা অপহৃত বা এমন কোনও ঘটনা যে ঘটে না, তেমনটা নয়। এমনকি বিশ্বের উন্নত দেশ জাপানেও মাঝে মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটতে শোনা যায় যা শুনলে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। গত কয়েকবছর আগে এক মা তার নবজাতক শিশুকে স্টেশনে কয়েন বক্সে রেখে স্বামী সহ ঘুরতে গিয়েছিল। দিন শেষে ফিরে এসে সন্তানকে সেখানে মৃত অবস্থায় পায়। এমন আরও বেশ কিছু ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। এর কোনোটাই ক্ষমার যোগ্য নয়। তবে আমার কাছে সম্প্রতি আমেরিকায় ঘটে যাওয়া নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই ঘটনার পরবর্তী আসামীর মায়ের শাস্তি ও বিচার কাজের ধরন দেখে মনে হলো এটা অনেকের বেলায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বর্তমান ইন্টারনেট ব্যবস্থা এতোটাই উন্নত এবং জনপ্রিয় হয়েছে যে, প্রয়োজন অপ্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। নেটের দৌলতে জানা অজানা অনেক কিছু সহজে চোখের সামনে পেয়ে যায়। অনেক দুর্লভ বিষয় সম্পর্কে জানতে পাই। এর মধ্যে প্রকৃতির জীব জানোয়ার সম্পর্কে বলতে পারি, এরা আমাদের মতো কথা বলতে না পারলেও এদের সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে বংশ বৃদ্ধি প্রক্রিয়াও। এদের বংশ বৃদ্ধি করা মা জাতি তাদের সন্তানদের জন্য কতোটা কি করে তা না দেখলে বুঝতে পারতাম না। কখনও কখনও মনে হয় পশু হলে কি হবে? এরা আমাদের মানবজাতির মায়েদের থেকে কোনও অংশে কম নয়। সেখানে আমেরিকার সেই মহিলা পশুদেরকেও হার মানিয়েছে। আমি ধিক্কার জানাই মা জাতির কলঙ্ক সেই মাকে। মানবজাতিকে বিতর্কিত করতে এমন মায়ের জন্ম যেন না হয়। প্রার্থনা করি কষ্টে না খেয়ে মারা যাওয়া শিশুটির জন্য, ওর আত্মা যেন স্বর্গ লাভ করে। (www.theoffnews.com - Japan America mother)

পি আর প্ল্যাসিড, প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক, জাপান:

উনিশ' পঁচাত্তার সালের পনেরোই আগষ্ট। আমি তখন খুব ছোট ছিলাম যদিও, তখন ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার কথাই আমার এখনও মনে আছে। সেই সময় বাড়িতে আমাদের একটি রেডিও ছিল। প্রতিদিন রেডিওতে বাবা এবং আশে পাশের অনেকে সংবাদ শুনতেন। বড় বোনেরা শুনতো গানের অনুষ্ঠান দুর্বার। মাঝে মধ্যে বাংলা নাটক শোনার কথাও মনে আছে। 

যেদিনের কথা বলছি, সেদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে রেডিওতে বড় বোনদের কেউ একজন রেডিওতে টিউনিং করছিল গান শোনার জন্য। সময় সঠিক মনে নেই। তবে সকালবেলা রেডিও অন করতেই শুনতে পাই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার সংবাদ। সাথে সাথে বোনেরা চেঁচিয়ে বলল, এই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। সেদিনের সেই চিৎকার দিয়ে বলা বোনদের দুঃসংবাদটির কথা এখনও আমার কানে বাজে। কোনো ভাবেই আমি সেদিনের অপ্রিয় সেই সত্য কথাটি ভুলতে পারছি না। 

যুদ্ধ চলাকালীন সময় আমরা প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা রেডিওতে দেশের অভ্যন্তরে কোথায় কি ঘটছে তা শুনেছি। সেই থেকে দেশ স্বাধীন হবার পরেও নিয়মিত সংবাদ শুনেছি। বাড়িতে বাবা ছিলেন সংবাদ শোনার পাগল। বোনেরা ছিল দুর্বার অনুষ্ঠান শোনার পাগল। সন্ধ্যার পর দুর্বার শুনে রেডিও বিছানায় নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত  নানা অনুষ্ঠান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তো। সকাল হলে বাবা এসে বোনদের বিছানা থেকে রেডিও চেয়ে নিতেন কিংবা আগে কেউ উঠলে বাবাকে আবার সকালের সংবাদ শোনার জন্য রেডিও নিয়ে দিত। যে কারণে সেদিন বোনেরা সংবাদ পাঠ করার সময়ের আগে রেডিও অন করে অন্য কোনো অনুষ্ঠান শুনতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা কান্ডের সংবাদটি শুনেছিল। 

ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ১৪ই আগস্ট, বাবা বাজার থেকে অনেকগুলো এরোগ্রাম কিনে এনেছিলেন। বড়ভাই তখন থাকেন লন্ডন। ছুটিতে দেশে এসে বিয়ে করে বাড়িতে নতুন বউ রেখে আবার লন্ডন ফিরে যাবার কিছুদিন পরের সেই ঘটনা। বড়ভাইকে প্রায়ই বৌদি, বাবা - মা সবাই নীল খামে (এয়ারমেইল) বা এরোগ্রামে (চিঠি লেখার নীল কাগজ) চিঠি লিখতেন। আগের দিন রাতে একটি এরোগ্রামে বৌদি, বাবা - মা অল্প কথায় চিঠি লিখে আমার জন্য কয়েক লাইন লেখার স্পেস রেখেছিলেন। আমি যেহেতু ছোট ছিলাম হয়তো আদর করার কারণেই সেই এরোগ্রামে চিঠি লেখার সুযোগ দেওয়া। সবাই বলাবলি করছিলেন, আমি লিখলেই এরোগ্রাম বন্ধ করে তা পোস্ট করবেন। 

সকাল বেলা সেই সংবাদ শোনার পর বাড়িতে শুরু হয় এক ধরনের অস্থিরতা। চারিদিকে চলতে থাকবে কানাঘুষা। অদৃশ্য কোনো কারণে সবার মনে তখন ভয় আর আতঙ্ক। ভয়ে কেউ মুখ খুলছিল না। সকালে আমি স্কুলে যাবার আগে বৌদি আমাকে বলছিলেন দাদাকে চিঠি লিখতে। সেদিনই বাবা বাজারে নিয়ে এই এরোগ্রামে লেখা চিঠি পোস্ট করার কথা। আমি বৌদির আদেশ মান্য করতে লিখে ফেললাম কয়েক লাইনের চিঠি। সেই চিঠি পড়ে বাড়িতে শুরু হয়ে গেল অন্যরকম কানাঘুষা। কোথায় আমাকে বাধ্য ছেলের মতো সবাই আদর করবে, তা না করে উল্টো রাগারাগি করতে শুরু করলেন আমার সাথে বাবা এবং অন্যরা। যতদূর মনে পড়ে, সেদিন সেই চিঠি আর লন্ডনে বসবাসরত বড়ভাইয়ের উদ্দেশ্যে পোস্ট করলেন না বাবা। তাদের সবার ভিতর নাকি প্রচন্ড এক ভয় কাজ করেছে। সবাই বলছিলেন সেই চিঠি পোস্ট করলে বাড়িতে পুলিশ এসে সবাইকে নাকি ধরে নিয়ে যাবে। বারবার বাবা বলছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার কারণে ঢাকায় জিপিওতে চিঠি খুলে পড়া হবে। এই চিঠি পড়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কথা দেখতে পেলে সবারই বিপদ হতে পারে এমন অজানা ভয়ে ভীত ছিলেন পরিবারের বড়রা।

চিঠিতে আমি লিখেছিলাম, 'দাদা তোমার প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মজিবুর রহমানকে হত্যা করেছে।' 

এটাই নাকি ছিল তখন আমার অপরাধ। এই লাইনটি লেখার কারণে সেদিন এরোগ্রামে লেখা সেই চিঠি আর পোস্ট করা হয়নি। বলা হয়েছিল আমার জন্য এত। টাকার একটা এরোগ্রাম নষ্ট করা হয়েছে। শাস্তি স্বরূপ আমাকে আর কখনও এরোগ্রামে চিঠি লিখতে দেওয়া হবে না। আমার সেইদিনের এই কষ্টের কথা পরবর্তীতে কাউকেই আর বলা সম্ভব হয়নি। আস্তে আস্তে যতই বড় হলাম কষ্ট যেন মনে জমাট বাধতে থাকলো। স্কুল জীবন শেষ এস এস সি দিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকা এসে কলেজে ভর্তি হলাম। বড়ভাই এর মধ্যে দেশে ফিরলেন। দেশে এসে ব্যবসা করার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়ালেন। যে কারণে দেশের নানা শ্রেণীর লোকদের সাথে তার যোগাযোগ, সম্পর্ক। বলা যায়, বড়ভাইয়ের দৌলতে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিবীদ এবং এমপি - মন্ত্রীদের খুব কাছ থেকে দেখার এবং কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তাদের প্রায় সকলেরই আনাগোনা ছিল বড়ভাইয়ের বাসায়।  

আমার যতটা মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড নিয়ে আমি প্রথম তর্ক করি দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ভয়েস অব আমেরিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি প্রয়াত গিয়াস কামাল চৌধূরীর সাথে। এরপর ওনার পরামর্শে বিষয়টি সম্পর্কে আরও বেশি জানার জন্য বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনীদের সাথে নানা ভাবে নানা সময় দেখা করে কথা বলেছি। কথা বলেছি তাঁর বিরোধী আদর্শের রাজনীতিবিদদের সাথেও। 

আমি আওয়ামী রাজনীতি করি না। তার মানে এই নয় যে বি এন পি কিংবা অন্য কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত। কলেজ জীবন থেকে লেখক - সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ছিলাম বদ্ধপরিকর। যে কারণে নানা সময় চলে যেতাম দেশের বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের কাছে। সেই সময় অর্থাৎ দেশে থাকা কালীন সময় আমার থেকে বয়সে বড়দের সাথে বিশেষ করে যারা স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছেন কিংবা দেশের রাজনীতির সাথে জড়িত তাদের কারো সাথে দেখা হলেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা করে নানা প্রশ্ন বানে ভাসিয়ে দিতাম তাদের। বেশির ভাগ সময় আমাকে থামিয়ে দেওয়া হতো। তারা বলতেন, বেশি করে পড়াশোনা করতে। নিজেই একসময় সত্য ঘটনা উদঘাটন করতে পারবো। এমনকি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন সময় একবার বঙ্গভবনে যাবার সুযোগ হয়েছিল। তখন রাষ্টপ্রতির হাত ধরে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, হল ঘরে বিভিন্ন জনের ছবি থাকলেও বঙ্গবন্ধুর ছবি নেই কেন। তার উত্তর ছিল একই। তুমি অনেক ছোট, বড় হও, পড়াশোনা করো একদিন তুমি নিজেই জানতে পারবে সব ঘটনা।

সেদিন আমাকে এমন প্রশ্ন করতে শুনে উনার সাথে থাকা কয়েকজন লোক (সিকিউরিটি) আমার দিকে তাকিয়ে চোখ বড় করে শাসাচ্ছিলেন। ভাগ্যভালো সেই যাত্রা আমি রক্ষা পাই। কারণ বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক প্রয়াত সমর দাস উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তাঁর নজরে বিষয়টি আসলে তিনি এগিয়ে এসে আমাকে সেভ করেন। 

১৯৯১ সাল থেকে আমি জাপান প্রবাসী। জাপানে আসার পরও চেষ্টা করেছি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কাজ করতে। কিন্তু এখানে কিংবা ওখানে (দেশে) কোথাও আমি আমার ইচ্ছের বিষয়টি উপস্থাপনের সুযোগ পাইনি। যেখানেই গিয়েছি সর্বত্রই দেখেছি প্রকৃত আওয়ামী লীগারের অভাব। তেলবাজদের জয়জয়কার। যারা প্রকৃত কাজ করার লোকদের কাজে সুযোগ করে দেওয়া তো দূরের কথা উল্টো যেন বাধাগ্রস্থ করে। তাই এখন পর্যন্ত কাজটি করতে আমি ব্যর্থ। যেকারণে আমি সরে গিয়েছি আমার ইচ্ছে পূরণের স্বপ্ন থেকে। তবে আমার খুব ইচ্ছে, আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সুযোগ পেলে বড় কোনো লেখা লিখবো। যেখানে থাকবে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার শোকাবহ স্মৃতির কথা। যেখানে লেখা হবে আমার সেই চিঠি লিখে পোস্ট না করার দুঃখের কথা।

(www.theoffnews.com - Japan Bangladesh Mujibar Rahaman Bangabandhu)

(www.theoffnews.com - Myanmar Junta dissolved San Suu Kyi party)