Articles by "সাপলুডোর কুটনীতি"
Showing posts with label সাপলুডোর কুটনীতি. Show all posts

বেবি চক্রবর্তী, সাংবাদিক ও লেখিকা, কলকাতা:

ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শত শত বিপ্লবীদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ। কোটি মানুষের রক্তের ওপর দেশভাগ। কথায় আছে গোড়ায় গলদ স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসন নিয়েও দলাদলি ছিল খোদ কংগ্রেসের অন্দরমহলে, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং জওহরলাল নেহরুর মধ্যে। যখন কংগ্রেসের ওয়াকিং কমিটির ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১২ টা ভোট পেয়েছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আর বাকি তিনটে ভোট ঝুলিতে ছিল জহরলাল নেহরুর। সেই দিন গান্ধীজি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে আসার জন্য বাধ্য করেন। এবং গান্ধীজি নিজে প্যাটেল এর পদত্যাগপত্র লিখে তাতে স্বাক্ষর করার জন্য প্যাটেলকে বললে তিনি বলেন, "স্বাধীনতার শুরুতেই গণতান্ত্রের গলা টিপে তাঁকে হ্রাস করা হল।" সেই সময় এটি একটি তৎকালীন ইংরেজি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির অনুমোদন ছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদ নির্বাচন করা যায় না কিন্তু সেখানে গান্ধীজি সবকিছু উপেক্ষা করে খোদ স্বয়ং ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নাম ঘোষণা করেন পন্ডিত জহরলাল নেহরু'কে। আজ‌ও তাঁর জন্মদিন শিশু দিবস হিসাবে পালিত হয়। 

ভারতের রাজনীতির মঞ্চ যেন এক চিরকালীন নাট্যগৃহ। যেখানে সিংহাসন নিয়ে চলে চরম কৌশল দ্বন্দ এবং প্রতিযোগিতা। আজও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে আজ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার কেবল একটি প্রশাসনিক পদ নয় বরং হয়ে উঠেছে শক্তির প্রভাব ও আর্দশের প্রতীক। স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু ছিলেন গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রবক্তা। তাঁর শাসনে ভারতের পরিকল্পিত উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়। সিংহাসন ছিল তাঁর কাছে দায়িত্ব, দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার মঞ্চ।পন্ডিত জহরলাল নেহরুর মৃত্যুর পর ভারতের রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটে ইন্দিরা গান্ধীর। তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা স্পষ্ট ভাষী একরকম স্বৈরাচারী। তাঁর আমলে ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ছিল এক ভয়াবহ অধ্যায় যেখানে দেশীয় গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কন্ঠরোধ ঘটেছিল। এরপর রাজীব গান্ধী - সোনিয়া গান্ধী এবং রাহুল গান্ধীর হাত ধরে গান্ধী পরিবার রাজনৈতিক সিংহাসনের মূল দাবিদার হয়ে ওঠে। কংগ্রেস এই ধারাকে "ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার" হিসাবে দেখতে চেয়েছে অথচ বিরোধীরা একে পরিবার তন্ত্রীয় রাজনীতি বলে কটাক্ষ করে।

ভারতের রাজনীতিতে সিংহাসন কেবল পদ নয়। এ যেন এক নীতিগত প্রতিশ্রুতি ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। এরপর নব্বইয়ের দশকে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ক্ষমতায়নের অলিন্দে ঢোকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তৈরি হয় জোট সরকার। এখানে একে একে ক্ষমতায় আসেন ভিপি সিং, চন্দ্রশেখর, দেবগৌড়া, আই কে গুজরাল এবং পরবর্তীতে একই পদাঙ্ক অনুসরণ করেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। এই সময় সিংহাসনের খেলা হয়ে দাঁড়ায় বিরামহীন বোঝাপড়া ও সামঝোতার চর্চা। যেখানে স্থায়ী নীতি ও পরিকল্পনা থেকে রাজনৈতিক সুবিধাইত অবস্থানটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তাঁর শাসনাধীন সরকার আত্মবিশ্বাসী আক্রমনাত্মক ও এক ধরনের ব্যক্তি কেন্দ্রিক প্রতিচ্ছবি। তিনি জনসংযোগকে মূল হাতিয়ার বানিয়ে এক নিরঙ্কুশ শাসনের মডেল গড়ে তোলেন। যদিও অনেকে এই সময়কে গণতন্ত্রের সংকোচন হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। আবার অনেকেই একে বলেন উন্নয়নের যুগান্তকারী ধারা। ভারতের রাজনীতি আজও একটি চিরন্তন দ্বন্দ্ব আদর্শ বনাম ক্ষমতা নেতৃত্ব বনাম দম্ভ। জনসেবা বনাম ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা। প্রথম প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আজকের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এই সিংহাসন ভিন্ন সময় ভিন্ন চেহারার রূপ নিয়েছে কিন্তু একটা বিষয় সব সময় স্পষ্ট থেকেছে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় বরং সাধারণ মানুষের আস্থা এবং গণতন্ত্রের ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। ভারতের রাজনীতির এই সিংহাসন শুধু একটা পদ নয়। এটা একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে যারা এই সিংহাসনকে প্রকৃত জনসেবার হাতিয়ার বানিয়েছেন তাঁরাই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। পাশাপাশি ভোট প্রচারের আগে বাড়ি বাড়ি ঘুরে যে জনপ্রতিনিধিরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট ভিক্ষা করেন পরে তাঁদের কাছে কোনও প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করিয়ে জুতোর সোল খুইয়েছেন। তাঁরাই আবার পরে ক্ষমতাকে নিজস্ব হাতিয়ার করে। সময় তাঁদের সরিয়ে দিয়েছে ইতিহাসের প্রান্তে। তাই আজকের প্রজন্মের উচিত রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার খেলা না ভেবে সমাজে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা তবেই সত্যিকারের গণতন্ত্রের নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। বর্তমান ভারতের প্রয়োজন আর্দশবান নেতৃত্ব গণতান্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনীতির আঙিনায় এই সিংহাসনের খেলা আজও চলছে। সময়ের ধারা পরিবর্তনশীল কিন্তু এখানে মানুষের আশা নেতৃত্ববোধ জনকেন্দ্রিক মানবিক এবং নৈতিকতায় ঋদ্ধ।

(www.theoffnews.com Prime Minister India)


দেবর্ষি মজুমদার, সিনিয়র জার্নালিস্ট, বীরভূম: 

অনুব্রতদের কখন অক্সিজেন যায়, আর কখন‌ যায় না, এটা চিকিৎসক নয়, দল ঠিক করে দেয়। অনস্বীকার্য যে, অনুব্রত মণ্ডল একজন পুলিশ আধিকারিক অর্থাৎ থানার বড়ো বাবুকে অত্যন্ত নিন্দনীয় ভাষায় কথা বলেছেন। কিন্তু এর আগে যে উনি বলেননি, এমনটা তো কাউকে বলতে শুনিনি। আর এটা যদি তার প্রথম অপরাধ হয়, দল তার বিরুদ্ধে চটজলদি ব্যবস্থা নিচ্ছে কেন? 

বিরোধীরা বলছে, ক্ষমা চাইলেই হলো? গণমাধ্যম বলছে, অনুব্রত দিদির ভাই, কোনও ব্যবস্থায় নেবে না পুলিশ। ধীরে রাধে ধীরে! সাত মণ তেল ও পুড়বে, রাধাও নাচবে? কেউ ভাবতে পেরেছিলেন, অনুব্রত মণ্ডলের বিরুদ্ধে পুলিশ এফআইআর দায়ের করবে? ২০১৪ সালে ৩রা সেপ্টেম্বর বোলপুর থানায় ঢুকে ডিউটি অফিসারকে অনুব্রত অনুগামীদের মারধরের ঘটনা ঘটেনি? পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নিয়েছিল? 

একটু ভেবে দেখুন, পুলিশ বলছে কে অনুব্রত ও আইসির ফোনালাপের অডিও ভাইরাল করলো তদন্ত করে দেখবে। কিন্তু ওই দুজনের অডিও ক্লিপস প্রকাশ কে করলো? অনুব্রত? নিশ্চয়ই না। আইসি? এতো কদর্য ভাষায় কথা, নিজের স্ত্রীকে নিয়ে? উচ্চ কর্তারা কী অনুব্রতর ফোন ট্যাপ করে? না, অনুব্রতকে উচিত শিক্ষা দিতে যত অসম্মানজনক হোক এই অডিও ফাঁস? সবটাই অনুমেয়। ছাব্বিশে পুলিশকে আরও কাছে টানতে, রাজনৈতিক বার্তা? স্বর্গের সিঁড়ি ভেঙে চোদ্দো তলায় কী জানা যাবে? 

অনুব্রত মনে পড়ে? শিবপুরে বিরোধীদের জমি বিরোধী আন্দোলনে সটান ঘটনাস্থলে গিয়ে ডিএসপি কাশীনাথ মিশ্রকে বলে ছিলেন, 'কটা বাজে? ২ ঘণ্টার মধ্যে সব কিছু খালি না হলে আমি ঢুকে যাব ৷ সব চাড়িয়ে দেব।' পুলিশকে প্রকাশ্যে এই নিদানেও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয় ৷ এর পিছনে কোনও নোংরা কথা বার্তা হয়নি মনে করেন? 

২০১২ সালে নানুরের ওসিকে হুমকির পর ২০১৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর অনুব্রত মণ্ডলকে রাজ্য গ্রামন্নোয়ন পর্ষদের সভাপতি করা হয় ৷ সেই থেকে লালবাতি ব্যবহার করতে শুরু করেন তিনি৷ ২০১৪ লোকসভা, ২০১৬ বিধানসভা, ২০১৯ লোকসভা, ২০২১  বিধানসভা নির্বাচনে অনুব্রত ম্যাজিকে বীরভূমে ভালো ফল করে তৃণমূল । এই নির্বাচনগুলির প্রচারে গিয়ে কখনও গুড়-বাতাসা, নকুলদানা, কখনও পাচনের বাড়ি, কখনও চড়াম-চড়াম, কখনও শুঁটিয়ে লাল করে দেব, কখনও খেলা হবে বলে সংবাদ শিরোনামে থেকেছেন তিনি৷ নির্বাচন এলেই কমিশনের তাঁর নামে জমা পড়ে একাধিক অভিযোগ। যার জেরে অনুব্রতকে ৩ বার নজরবন্দিও করে নির্বাচন কমিশন৷ ২০১৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সভা থেকে 'পুলিশের উপর বোম মারুন, আমি বলছি বোম মারতে, বিরোধীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিন '- এ ধরনের কথা বলেছেন অনুব্রত। আর তা নিয়ে তোলপাড় হয় রাজ্য৷ এই মন্তব্যের পরেই ওই রাতে খুন হন নির্দল প্রার্থী হৃদয় ঘোষের বাবা সাগর ঘোষ৷ যে মামলায় পরে অব্যাহতি পেলেও একসময় প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন অনুব্রত মণ্ডল। তখন অনুব্রতকে চার ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ আসেনি। লাল বাতি অঞ্চলের একটা ধারণা আছে, একবার নথ ভাঙতে পারলেই...

জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক আর যায় করুন, তার একটা কথা মনে পড়ে গেল। অনুব্রত একটু খেয়াল করতে পারতেন- শাসনের মজিদ মাস্টারকে তিনি বলেছিলেন, ‘‘মজিদদের মতো লোককে দিয়ে মানুষ খুন করিয়ে শেষে ছুড়ে ফেলাই সিপিএমের রেওয়াজ!’’ তাহলে কী অনুব্রত জমানার শেষের শুরু? সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ করার পর ২০০৩ সাল থেকে জেলা সভাপতি ছিলেন অনুব্রত। এমনকি যখন গরু পাচার ও কয়লা পাচার মামলায় জেলে ছিলেন, তখনও যে কোনও বৈঠকে তার চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়। নিজের জেলার বাইরেও অনুব্রত মডেল কাজে লাগাতো দল। অনুব্রতর ছবিও কাজে লেগেছিল ২০২৪ ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে। চলতি বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফেরার পর অনুব্রত বুঝতে পারলেন ময়ুরাক্ষী নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। তার গড় আর নেই। অনুব্রত নিজেই বলছেন, বোলপুর আইসি তাঁর অনুসারীদের এফআইআর নিচ্ছে না। এসব কারণেই তার অনুগামীরা ঘর ফিরতে গেলেই মার খাচ্ছে। মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহাকে দিয়ে আইসিকে বলতে হচ্ছে, আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করুন। এসবের বিরুদ্ধে দল এখনও পর্যন্ত নিশ্চুপ। রাজনীতিতে না বলা কথা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাকিটা ক্লাইম্যাক্স!

(www.theoffnews.com Anubrata Mondal audio clip phone TMC)


মোনালিসা মুখোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার, হিন্দমোটর, হুগলি:

বামপন্থীদের কাল প্যালেস্টাইন নিয়ে কান্নাকাটি করতে দেখলাম একটি জায়গায় স্টেজ বেঁধে।  আমার আসা যাওয়ার পথের আসে পাশেই।  

স্টেজে বড় বড় করে লেখা, 

প্যালেস্টাইন নিয়ে আমাদের প্রতিবাদ আজ। যথারীতি গলা ফাটানো বক্তৃতা। জ্ঞানগর্ভ কথার ফুলঝুরি। 

বিশ্বাস করুন, কাল থাকতে না পেরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জ্ঞানী কমরেডকে জিজ্ঞেস করে বসলাম -

বলছি, বাংলাদেশ নিয়ে কবে কান্নাকাটি করবেন? আপনার হিন্দু ভাইদের রক্ত কি জল? দেশের পতাকার অবমাননা নিয়ে কথা নেই?

উত্তর এল -

হ্যাঁ হ্যাঁ, এই পথসভায় বলা হবে একটু পরে। (যেন দয়া করবে বলে)। মূল বক্তব্য শেষ হোক তারপর। 

বাহ, এটা মূল নয়।

আবার জিজ্ঞেস করলাম -

তাহলে লেখেননি কেন প্যালেস্টাইনের পাশে বড় বড় করে? কিসের ভয় কিসের দোটানা? সাহস নেই?দেশের সম্মান পায়ের তলায় পিষছে যারা তাদের নিয়ে একটা কথা নেই? হিন্দুদের নিয়ে কথা এলেই চুপ?

ভদ্রলোক কিছু না বলে, আসছি একটু ম্যাডাম বলে সরে পড়লেন। ওদের একটা নতুন বাপ হয়েছে মণিপুর। কিছু বললেই বলছে মণিপুর নিয়ে চুপ কেন? ছিঃ ছিঃ। আর কত ধান্দাবাজী করবেন?

ওদিকে  শুনছি স্টেজে কোনও এক করিম শেখ নামে কমরেড মানবতার জ্ঞান দিয়ে বলছে আমরা ভ্রাতৃত্ব ছড়াব ভারত জুড়ে। ভাবলাম স্টেজে উঠে পড়েই বলি ওনায় -

এখানে নয় আমাদের নয়। নিজের জাতভাইদের শেখান আগে। আমরা অনেক সয়ে যাই তাই আজ এই হাল আমাদের। নিজেকে সামলে চলে এলাম অতি কষ্টে। মানুষের রায় তো বারবার পাচ্ছেন লজ্জা নেই?

অভয়ার ঘোলা জলে মাছ ধরার স্বপ্নতেও গুড়ে বালি। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে প্যালেস্টাইন নিয়ে কাঁদছেন। লজ্জা পান একটু।

এই হল বাম রাজনীতি। ঘর জ্বালানি পর ভোলানি। বেহায়াপনা চরমে।

তবে এরপর থেকে যেখানেই এখন এদের পথসভা দেখব এই একই প্রশ্ন থাকবে আমার। 

পারলে আপনারাও এদের নাটক রাস্তাঘাটে দেখলে সপাটে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিন। জিজ্ঞেস করুন। এদের আর সুযোগ নয়। 

এদের ভণ্ডামির প্রতিবাদ করুন। এরা দেশের শত্রু কারণ -

দেশের অপমানে, দেশের মানুষের বিপদে এরা চুপ চিরকালই। (তবে আমার কিছু দুই একজন কমরেড বন্ধু ব্যতিক্রমী) 

এদের এবার কোথাও অন্য ইস্যু নিয়ে গলা ফাটাতে দেখলেই জবাব চান তাদের নাটকের। 

চুপ থাকলে সবেতে চুপ থাকুন কমরেড, আর যদি বলেন সাহস নিয়ে বলুন সবেতেই। শত্রুকে তোল্লা অনেক দিয়েছেন আর নয়। 

বুকে বসে দাড়ি ওপড়ানোর দিন শেষ। আমি একা নয় কিন্তু, কাল আমার পাশে পেয়ে গিয়েছিলাম পথ চলতি আরও একজন মহিলা ও পুরুষকে। দেশের রাস্তা দখল করে বিদেশের জন্য গলা ফাটাতে দেখলেই প্রশ্ন যাবে এবার। এক থেকেই দশ হবে। 

এবার অনেকেই প্রশ্ন রাস্তায় খোলাখুলি করবে আপনাদের। উত্তর রেডি রাখুন।

(www.theoffnews.com Bangladesh Indian left movment)


পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

ওষুধের দোকানে ওষুধ নেওয়ার পরে বিলটা খতিয়ে দেখছি। হঠাতই কানে এল একটা হাহাকার। “এত কিছুর পরেও সবকটাতেই জিতে গেল তৃণমূল। ছিঃ ছিঃ মানুষ কি কিছুই দেখে না। কি করে ভোট দেয় এদের?” বুঝতেই পারলাম সদ্য প্রকাশিত উপনির্বাচনের ফলের কথা বলেই তিনি এই ক্ষেদ বা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। দোকানে উপস্থিত আরও দুই তিনজন তার কথাতেই সায় দিলেন প্রকাশ্যেই। এত দিনে একটা বিষয় পরিস্কার, এ রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী মানুষের অভাব নেই। রাস্তা ঘাটে নানান আলোচনা থেকে সোস্যাল মিডিয়ায় অসংখ্য মমতাকে কটাক্ষ করে মিম দেখে তা বোঝা যায়। আরও বোঝা যায় ইউটিউবে মমতা বা তৃণমূল বিরোধিতা করে ভিডিওগুলির চুড়ান্ত জনপ্রিয়তা দেখে। শুধু মমতা বিরোধীতা করেই এখন অসংখ্য ইউটিউবার রীতিমত সেলিব্রিটি হয়ে গিয়েছে। এগুলি শুধু বিজেপির আইটি সেলের কেরামতি বলে মানা যায় না। মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ না হলে তারা এভাবে এই ভিডিওগুলিকে গ্রহণ করতেন না।

এবারেই আসে আসল প্রশ্ন। এত মানুষ মমতা বা তৃণমূল বিরোধী, তা স্বত্বেও একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূল নিরঙ্কুশ জয় পাচ্ছে কি করে? মমতাই বোধহয় দেশের একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যাকে নিয়ে, যার কথাকে নিয়ে উপহাস, না না ঠিক উপহাস নয় বলা ভাল খিল্লি করেন, সবচেয়ে বেশি মানুষ। এত দুর্নীতি, এত অভিযোগ, এত ঘৃণা, তা স্বত্বেও পটাপট নির্বাচন এলেই জিতে যাচ্ছে তৃণমূল, কেন? অনেকেই বলবেন মহিলা ভোট ব্যাঙ্কের উপরে ভিত্তি করে। আমাদের রাজ্যে গত বিধানসভা থেকে সদ্য হওয়া ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র বিধানসভা সবেতেই প্রমাণিত হয়েছে যে মহিলারা তাদের অনুদান পাওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ভোটে ভরিয়ে দিয়ে। আগামীতে এটাই হয়তো নিয়ম হয়ে যাবে, ভাতা দাও ভোট নাও। তুমি চুরি কর, ডাকাতি কর, লুট কর, কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু আমাদেরও তোলা দিয়ে থুড়ি ভাতা পৌঁছে দিয়ে যা খুশি করতেই পারো। গত কয়েক বছরে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভোট গণনার প্রথম দিকে শাসক দল মূলত পিছিয়ে থাকছে। গত লোকসভাতেও তাই দেখলাম, আমাদের রাজ্যে বিধানসভাতেও তাই দেখেছি। অর্থাৎ প্রথম দিকে মূলত পোস্টাল ব্যালট গোনা হয়। পোস্টাল ব্যালটে ভোট কারা দেন? মূলত সরকারী কর্মী, খুবই অসুস্থ মানুষ, যারা ভোটের কাজে ব্যস্ত থাকেন তারা। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত সরকারী কর্মী। তারা তথাকথিত শিক্ষিত, কিছুটা সচেতন তাই তাদের ভোট প্রতিষ্ঠান বিরোধী হয়েছে। এদের অধিকাংশই কিন্তু ভাতা পান না। কিন্তু তার পরেই আসে অনুদান প্রাপকদের ভোট। সেখানেই উল্টে যায় পাশা। শাসককে কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে দেন মানুষ। এর থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নেই, যদি না আগামীতে কেউ আরও বেশি করে ঘুষ দেওয়ার থুড়ি অনুদান দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। অর্থাৎ শাসক বা শাসিত, সকলেই এখন ঘুষের ভক্ত।

অনেকেরই আশা ছিল আরজিকর কাণ্ডের পরে এই উপনির্বাচনে তৃণমূল গো হারা হেরে যাবে। এমন স্বতঃস্ফুর্ত গণ আন্দোলন তৃণমূলের ভিত নড়িয়ে দেবে। কিন্তু তারা আবেগে ভেসে এই আশা করেছিলেন, যুক্তিতে নয়। আচ্ছা বলুন তো রোজই পালং শাক ভাত খেয়ে খেয়ে আপনি ক্লান্ত, বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। এমন সময় আপনাকে কেউ আপনাকে নটে শাক নিয়ে এসে বলল দারুণ পরিবর্তন এনে দিলাম। আপনি কি খুশি হবেন। আপনি তো চাইছিলেন, মাছ ভাত বা মাংস ভাত নিদেন পক্ষে পনিরের তরকারি। কিন্তু সেই বিকল্প আপনার কাছে নেই, অতএব পালং শাকই ভাল। বাংলার হাল এমনই, তৃণমূলকে হারাতে চাই ভাল বিকল্প, সেটা কোথায়? আপাতত প্রমাণিত বিজেপিকে বাংলার মানুষ তৃণমূলের ভাল বিকল্প ভাবে না। সিপিএম বা কংগ্রেস তো আলোচনাতেই আসে না। তাহলে? হাতে রইল পেনসিল। অগত্যা নিরঙ্কুশ জয় শোষকের, থুড়ি শাসকের। উপ নির্বাচনে আরও একটা বিষয় কাজ করে। এই উপনির্বাচনে ছটি আসনে তৃণমূল যদি হেরেও যেত তাহলে কিছুই যায় আসত না তাদের। সরকার যেমন চলছে তেমনই চলত। মাঝখান থেকে বিরোধীকে ভোট দিয়ে সেখানকার মানুষ প্রমাণ করে দিতেন তারা তৃণমূলের পাশে নেই। ফলে এই এলাকায় সরাসরি উন্নয়নের পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়াত তৃণমূল। ছয় বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটাররা এই ভুল করতে চাননি। অকারণ জেনেশুনে কে সরকারের চক্ষুশূল হতে চায় বলুন?

একটা বিষয় আপনি মানুন বা না মানুন অস্বীকার করবার উপায় নেই, সেটা হচ্ছে এই মুহূর্তেও মমতা একজন জনপ্রিয় নেতা বা নেত্রী। কেরালা গিয়ে কিম্বা গুজরাট গিয়ে অথবা উত্তরাখণ্ড গিয়ে কাউকে জিজ্ঞাসা করুন পশ্চিমবঙ্গের কোনও নেতা বা নেত্রীর নাম। সে একবাক্যে মমতার নাম ঠিক বলে দেবে। বাকি আর কোনও নেতার নাম শোনার আশাও করবেন না। অন্য রাজ্যে কেন, এ রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামে যান, সেখানেও মমতা ছাড়া আর কোনও দলেরই রাজ্যস্তরের নেতার নাম অনেকেই জানেন না। শুভেন্দুর বিরোধী দলনেতা তার নামও বহু মানুষ শোনেননি। মমতার এই ক্যারিশমাকে কমিয়ে দেওয়ার মত কোনও নেতা আপাতত এই বাংলাতে চোখে পড়ছে না। সেই জন্যই কোনও ঠিকঠাক বিকল্পও নজরে আসছে না। অর্থাৎ খাটের তলা থেকে রাশি রাশি টাকা পাওয়া যাক অথবা রাতে মহিলাদের পিঠে বানাতে ডাক দেওয়াই হোক। জমি জবর দখলই হোক বা তোলাবাজিই হোক। অভিযোগ যাই থাক এই মুহূর্তে পালং শাকের বিকল্প মাছ মাংস তো দূরের কথা নটে শাকও নয়। আপনি আমি খিল্লি করি, মিম দেখি, তৃণমূল বিরোধী ইউটিউবারদের বড়লোক বানাই, ওদিকে মাঠে মাঠে বেড়ে উঠুক সবুজ শাক থুড়ি ঘাসফুল। একেই বলে চুপচাপ ফুলে ছাপ, তবে খুব এক্ষেত্রে বলি চুপ থাকলেই কম চাপ।

(www.theoffnews.com Mamata Banerjee opposition TMC, BJP, CPIM, Cong)


প্রাণকৃষ্ণ মিশ্র, লেখক, কালনা, পূর্ব বর্ধমান:

জেলায় জেলায় মধ্যবিত্তের শ্রেণি সংগ্রাম চলছে। পদে টিকে থাকা, পদন্নোতির জন্য অপরকে ল্যাং মেরে নিজে এগিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে দেখে এক কমরেডের দুঃখের পোষ্টে যা লিখেছি তাই হুবহু তুলে ধরলাম। কারন সমস্যাটা কোনও একটা শহরের নয়।

সমস্যা রাজ্যের সর্বত্রই একই।

অনৈতিক, সুবিধাবাদী, অসভ্য নেতা এই সমাজেরই অংশ। সুতরাং তাঁদের কমিউনিষ্ট পার্টিতে প্রবেশের ফলে কলুষিত এই সমাজের বিষ সংগঠনকেও ধারণ করতে হয়।

আমার কমেন্ট:-

আহা, যখন সে বা তিনি বক্তৃতা করেন তখন সে/তিনি কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা। যখন চুলকায় পরস্ত্রীগামী হয় তখন সে/তিনি রক্ত মাংসের একটা সাধারণ কামুক মানুষ - আমি এমনই ভাবি। 

তাদের চিনি, কয়েকজনকে জানি অস্বীকার করছি না। 

জমি জায়গা সংক্রান্ত দালালি, চাকুরী সহ ব্যবসা, প্রমোটারি করেন কয়েকজনকে চিনি বটে। এরা তো সুসময়েও ছিল আজও আছে। আজ পার্টিকে ভালোবেসেই আছে, তবে পিঠ বাঁচাতে একটু তৃণমূলকে আগাম কর্মসূচি জানিয়ে নিজে বাঁচে-এতে অন্যায় দেখি না।

আপাতত ভাবো ২০২৬ সালে ৫% থেকে যদি ১০% মানুষকে আনা যায়। 

সমাজটাই তো শেষ হয়ে গেছে। এই সমাজের মানুষই তো কমিউনিষ্ট পার্টি করছে। সেখানে মাতাল, চরিত্রহীন, লম্পট, সুদখোর, কন্ট্রাক্টর, জমি মাফিয়া নিয়েই পার্টি গড়ে তুলতে হবে। 

মধ্যবিত্ত মানুষের চরিত্রই এমন। এরাই নেতাকে চাটে। শিক্ষিত ভদ্র দেখতে শুনতে ভালো কেউ আবার গন্ধযুক্ত। 

আপনার শহরে পার্টিতে কতজন শ্রমজীবী কৃষক, শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, দোকান কর্মচারী রয়েছে? এই অংশের প্রতিনিধিত্ব না থাকলে যা হবার তাই হবে। লেভি কেন্দ্রিক পার্টি। চামচা কেন্দ্রীক নেতা, চামচা পার্টি সদস্য। 

সর্বশেষে মেরুদন্ডহীন একটা গোষ্ঠী।

(www.theoffnews.com communist society group)


প্রাণকৃষ্ণ মিশ্র, লেখক, কালনা, পূর্ব বর্ধমান:

কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সে অভিযুক্ত। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত করার দায়িত্ব সরকারের। সরকার সেই তদন্ত যাতে না হয় তারজন্য প্রমান লোপাট করেছে। সত্য। 

অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমান হলে তিনি দোষী।

কোনও উচ্চপদস্ত অফিসার বা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে, অবশ্যই তাকে সরিয়ে দিয়েই তদন্ত হওয়া উচিত। 

সেই কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিকর্তার পদত্যাগ করা উচিত ছিল। তা সম্মানের হতো।

বিদুর, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন, মহারাজ আপনি জন্মান্ধ হতে পারেন, কিন্তু আপনি নীতিশাস্ত্র ও ধর্মশাস্ত্রে পন্ডিত। আপনি বুঝছেন দুর্যোধন অনৈতিক কাজ করছে, বিভিন্ন অনাচারে দুষ্ট। তবুও আপনি তার প্রতি কেন মোহাচ্ছন্ন? 

আপনি, ওর পিতা তাই কি? ভুলে যাচ্ছেন, আপনি হস্তিনাপুরের রাজা। 

রাজধর্মের পরিপন্থী কাজ আপনার সাজে না। 

ধৃতরাষ্ট্র বললেন, হ্যাঁ দুর্যোধন, দুঃশাসন আমার পুত্র। আমি জন্মান্ধ। ওদের ত্রুটি আমি জেনেও বুঝি না বা বুঝতে চাই না। সেই কারণেই আমি আজ স্নেহান্ধ। 

ধর্মাত্মা বিদুর, আমার মনে হয় তুমি বেদজ্ঞ পন্ডিত হয়েও পাণ্ডবদের পক্ষপাতিত্ব করছ। তুমি আমার পুত্রদের দোষ দেখো না। ওরা অনাচার, অত্যাচার, নারী ধর্ষণ, হত্যা যাই করুক; মহামন্ত্রী হয়ে ওদের সমর্থন করো।

এসময় এই তোমার কর্তব্য। 

-মহারাজ এতে হস্তিনাপুরের ক্ষতি হবে, বিদুর বললেন।

-হোক ক্ষতি। তুমি চোখ বুজে থাকো বিদুর। আমি অন্ধ, আমি দুরাচারী দুর্যোধনকে যখন সমর্থন করছি তখন তুমিও তাই মেনে নাও। তাই করো।

রাজপরিবারের সকলকে তাই মেনে নিতে হবে। মন্ত্রী, সভাসদ, পার্ষদ, সৈন্য, প্রজা সকলে দুর্যোধনের হয়ে কাজ করুক এই নির্দেশ দাও। 

যাও বিদুর যাও। 

দুর্যোধন বলেছে, সুচাগ্ৰ মেদিনী দেবে না।  অর্থাৎ হস্তিনাপুরে ন্যায় বিচার তুমি আশা করো না। 

(www.theoffnews.com Mahabharat accused West Bengal health department corruption)


সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ:

সিপিএম আরম্ভ করেছেটা কি? একটু তো উলঙ্গপনার শরম থাকা দরকার নাকি? কি অবস্থা দলটার। বাচ্চা চিকিৎসকেরা আন্দোলন করছে না খেয়ে। আর আলিমুদ্দিনবাবুরা ছক কষছেন যেনতেন প্রকারেণ ওই আন্দোলনের ঘাড়ে চেপে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তোলার চুটকি হিসেব নিকেষ। আরে হিম্মৎ থাকে তো নিজস্ব কর্মসূচী গড়ে তুলুন। নিজেদের আন্দোলনে কত মানুষ যে জড়ো হয় আজকাল তাতো আপনারাও যথেষ্টই অবহিত। তাই শকুনের মতো অনাহার আন্দোলনে আপনাদের অযাচিত পরনির্ভরতা সত্যিই বড্ড দৃষ্টিকটু।

একেতো রাজ্যের সংসদীয় রাজনীতিতে শূন্যে গিয়ে ঠেকেছে পরপর বহু বছর। যখন জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনে বিজেপি ও কংগ্রেস নেতৃত্ব গিয়েছিলেন তখন চিকিৎসকরা গো ব্যাক স্লোগান তুলেছিলেন। তখন তো আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে পরশ্রীকাতরতার কড়া ছিলিমে সিপিএম নেতৃত্বের সুখটান ছিল দেখার মতো। কিন্তু দুর্গোৎসবের আবহে ডাক্তারদের অনশন মঞ্চে সিপিএম সমর্থকদের আগ বাড়িয়ে ভিড় জমানোর যেই বিরোধিতা করলো জুনিয়র চিকিৎসকেরা, অমনি রে রে করে উঠেছে বাম লবি। ব্যাস গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল সম সিপিএমের লাগলো আঁতে ঘা। সিপিএমের কর্মী সমর্থকদের শুরু হলো অনর্গল গালমন্দ। অনশনরত চিকিৎসকদের বাপবাপান্ত করে। 

আমি বরাবরই বলে এসেছি সিপিএম হলো দেশের মধ্যে সবচেয়ে নির্লজ্জ সুবিধাবাদী দল। সিপিএম মিথ্যা প্রলাপ বকছে। সেদিন সিপিএমের আন্দোলনরত মিনাক্ষী যেমন সেখানে ছিল তেমন একই ইস্যুতে তুঙ্গ প্রতিবাদী বিজেপির অগ্নিমিত্রার উপস্থিতি অস্বীকার করা হচ্ছে পরিকল্পিত অসভ্যতামিতে। মিনাক্ষী মৃতদেহ আটকাতে চেষ্টা করেছিল অবশ্যই সত্য। তাই বলে চিকিৎসকদের আন্দোলনে সিপিএমকে ডুগডুগি বাজাতে দিতে হবে, আর বিজেপি, কংগ্রেসকে দূরে রাখতে হবে, এটা তো ব্ল্যাকমেইলিংয়ের আব্দার। মৃতদেহ আটকাবার চেষ্টা করে কি সংশ্লিষ্ট সবার কর্মসূচির ইজারা আদায়ের শর্ত সিপিএমকে দিতে হবে নাকি? ব্রাত্য হলে সব রাজনৈতিক দল অচ্ছুত হোক। অন্যথায় সব রাজনৈতিক দলকেই সরাসরি পাশে থাকার আবেদন জানানো হোক। জনসমাগমের মধু আছে তাই সিপিএম চিকিৎসকদের হাঙ্গার স্ট্রাইক নিয়ে অসভ্য বায়না আরম্ভ করেছে। অতোই যখন মৃতদেহ আটকানোর শর্ত দাবি করা হচ্ছে তো মৃতার মা বাবাও তো হাঙ্গার স্ট্রাইক পুজোয় করেছেন, সেখানে তো সিপিএমের কোনও নেতার ছুঁকছুঁকানি দেখলাম না। কেন সেখানে মধু নেই নাকি? ৩৪ বছর ধরে সিপিএমের বজ্জাতির শাসন দেখেছি। এই বজ্জাতির ট্র্যাডিশন থেকে সিপিএম যে এখনও সরে আসতে পারেনি তা ফের স্পষ্ট হয়ে গেল। মৃতদেহ আটকানো নিয়ে সিপিএম যা করছে তা আদতে ফোর টোয়েন্টি ব্ল্যাকমেইলিং রাজনীতির সমার্থক।

(www.theoffnews.com junior doctors hunger strike CPM)


সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ: 

'বিপ্লব' ও 'সন্ত্রাস'

উপরের দুটি শব্দের মধ্যে ফারাকটা কি?

ফারাক হয়তো এটাই:

সংঘটিত হতেই হবে শাসকের বিরুদ্ধে জঙ্গি আন্দোলন। লুঠপাটের অধিকার। অবাধ রক্তহোলি। ভাঙচুরের যথেচ্ছ লাইসেন্স। অগ্নি সংযোগে উল্লাস। খুনের আত্মশ্লাঘা। সড়কে লাগামহীন অবরোধ। বিকল্প কন্ঠের টুঁটি চেপে ধরা, কাঙ্খিত স্তব্ধ প্রশাসন।

এহেন আন্দোলন বামপন্থীরা পরিচালিত করলে তার সংজ্ঞা 'বিপ্লব'। তাই তো?

এরূপ আন্দোলন দক্ষিণপন্থীরা সংঘটিত করলে তাকে বলে 'সন্ত্রাস'। ঠিক তো?

জীবনের চৌত্রিশটা বছর ধরে দেখেছি বাম জমানা। ভরপুর জেনেছি বামপন্থার মৌতাত। তবে দূরত্ব বজায় রেখে।

ট্রাম পোড়ানোর বিপ্লব পরখ করেছি। টাটার সিঙ্গুরে সন্ত্রাসও উপলব্ধি করেছি। হোলটাইমার কমরেডদের ঘরে ঘরে জনপিছু গৃহিণীর ছাপ্পা ভোট স্টাইলে নিরঙ্কুশ শিক্ষিকার চাকরি হতে দেখেছি। দেখেছি তাঁদের পরিজনদের সরকারি চাকরি পাওয়ার একচেটিয়া আস্ফালন। আসলে এটাইতো বঙ্গীয় বিপ্লবীদের নৈতিক অধিকার বলে কথা। এসব চিরকুট অধিকারের প্রমাণ আবার কি? প্রমাণ নেই তো বাছাধন। আরে এটাইতো সাংগঠনিক বিপ্লবের আসলি ভেল্কি। মানে রাজনৈতিক বেশাতির নির্লজ্জ যাদুটোনা।

তাই বামসূত্র মতে বঙ্গের একদা বিরোধী নেত্রীর তদানীন্তন আন্দোলন তো সন্ত্রাসের তকমা পাবেই পাবে তখন। তা স্বয়ং বসুবাবু থেকে ভট্টাচার্য মহাশয়ের ধারাবাহিক উবাচেই এসব প্রতিষ্ঠিত।

তবে এটাও এক আশ্চর্য রূপান্তরের উল্টোগাঁথা। সেদিনের বিরোধী নেত্রী তথা অধুনা বঙ্গেশ্বরীর কন্ঠেও আজকাল কেন যেন অগ্রজের শেখানো 'তোতা কাহিনী' কবিতার আবৃত্তি লাগাতার শোনা যায়। হয়তো এটা হতেই পারে 'যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ' ব্যাকটেরিয়ায় বন্দ্যোপাধ্যায় ম্যাম প্রবলভাবে সংক্রামিত হয়ে পড়েছেন ইতিমধ্যেই। তবে একটা অনুরোধ, ভুল বললে নিজ গুনে ক্ষমা করে দেবেন কেমন, এই কলমচি অধমকে।

শৈশব কাল থেকে এই ষাটোর্ধ্ব বয়সেও একটা জিনিসের কিন্তু পরিবর্তন দেখলাম না। আজও না। পাড়ায় পাড়ায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে। পয়লা মে দিবস পালন অনুষ্ঠান। কোথার থেকে হাজির হয়ে যায় বিপ্লবী কুলপতিরা সেদিন। দলে দলে। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। মাঝখানে একটি বাঁধানো লাল রঙের বেদী। তার কেন্দ্রে আকাশ মুখী একটা লোহার সরু পাইপ। তাতে পতপত করে উড়ছে লাল নিশান। পাইপের ঠিক নিচে একটা টেবিলে কোথাও থাকে মার্কস বা লেনিনের ছবি ফ্রেমে বাঁধানো অবস্থায়। আবার কোথাও ফুলের মালায় শোভিত হয় চে থেকে ফিদেলের প্রতিচ্ছবি। মাইকে গান তো যথা নিয়মে ট্র্যাডিশনালি বাজবেই, 'ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না পল রবসন'। উপস্থিত ওই মহাগুরুগণের বাংলা ক্লোন শাবকেরা তখন সব শেয়ালের এক হুক্কা হুয়ার মতো সমস্বরে বলতে শুরু করে, 'কমরেড তোমায় আমরা ভুলিনি ভুলবো না'। অথচ এমন ক্লোন কমরেডরাই যে এই পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জনপদে সাধারণ মানুষকে তাঁদের মনের গান গাইতে দেয়নি। একদিন বা এক মাস নয়। টানা চৌত্রিশ বছর ধরে কোনও বেসুরো একচিলতে আওয়াজও তুলতে দেয়নি। অন্য গান কাউকে গাইতে দেওয়া হতো না ওই ক্লোন চারা পোনাদের শাসনকালে। শুনে রাখুন সদা শ্রদ্ধেয় রবসন, আপনার গান যাদের মেকি গলায় গাওয়ার স্বঘোষিত একমাত্র পেটেন্ট একদা বিলি হয়েছিল, ওই তারাই অন্য কাউকে অন্য গান গাইতে দেখলে চালাতো বারুদে ঠাসা তাজা কার্তুজ। নির্বিচারে। তা না হলে আজও ২১ শে জুলাই শহীদ দিবস হিসেবে কেন পালিত হয় ধর্মতলার বুকে? বিপ্লবের পরিণতির কি মহিমা বলুন তো!

এ মহিমার না আছে আদি না রয়েছে অন্ত। এ যে অনন্ত। তখন আমি স্কুলের ছাত্র। আজও স্পষ্ট মনে আছে। কত কত নানান এলাকায় একচেটিয়া দেওয়াল লিখন। সেই তথাকথিত বামেদের দৃশ্য দুষণের এক তরফা দৃষ্টান্ত ছাড়া এগুলোকে আর কিইবা বলি। সে যাই হোক। ওই দেওয়াল লিখনের ভাষাগুলো আজও স্পষ্ট মনে আছে। কোনটাতে লেখা থাকতো, 'ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের নায়ক সাম্প্রদায়িক কংগ্রেস নিপাত যাক।'  আরেকটি দেওয়াল লিখনে দেখতাম 'প্রধানমন্ত্রী ডাইনি ইন্দিরা গান্ধীর কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও।' বিপ্লবীরা ভাবতেই পারেন, জনগণের স্মৃতি ক্ষণিকের। ভুল ভুল ভুল। ইতিহাসের সবকিছু কিন্তু ঠিক মনে রাখে এই জনগণ। অনন্তকাল যাবৎ। তবে বিপ্লবীরা বারে বারে ভুলে যায় তাঁদের অবস্থানের ছদ্মবেশ ধারণ কথা। যুগ যুগ ধরে। স্বার্থের সার্কাসের উলঙ্গ তাগিদে। আজকে এই বঙ্গভূমিতে একি অপরূপ পরিহাস উদযাপন চলছে নৈতিকতার মাথা মুন্ডু বিসর্জন দিয়ে। দেশভাগের জনক কংগ্রেস এখন তাঁদের ভোটের প্রিয়তমা সম প্রিয় আসনসঙ্গী। কালের ধান্দাবাজি তুলসীপাতার ছোঁয়ায় এখন আর সাম্প্রদায়িক হিসেবে অস্পৃশ্য নয় কংগ্রেস। অন্তত তাদের হাবেভাবে সেটাই প্রকট। ছোট্টু রাহুল নিজেকে পর্যায়ক্রমে বিদেশে খ্রিস্টান, স্বদেশে হিন্দু ঘোষণা করলেও, সম্প্রতি অবশ্য তাদের নিরিখে, কংগ্রেস সম্প্রীতি বহনকারী দল। এমনকি ডাইনি ইন্দিরা হয়ে উঠেছেন তাদের কাছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আদর্শগত আইকন। ভোট যে বড়ই বালাই। নাতো আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের কুশীলবদের মুর্শিদাবাদের একদা রবিনহুডের পা এখনও চাটতে হয়! 

তা ফলাফল যা প্রত্যাশিত তাই হলো? গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিপ্লবীদের ভিক্ষের ঝুলিতে একটিও পরিষদীয় আসন ছিটকেও পড়লো না। কি হাস্যকর, অনিলায়নের আমলে একটা ডায়লগ খুব চলতো একসময়ে, দরকারে বিরোধীদের আমরা ভোট প্রার্থী ধার দিতে পারি। আর এখন তারাই ভোট ময়দানে অসহায় করুণ করুণার পাত্র। তবু এদের আজও এতো কিছুর পরেও শিক্ষা হলো না। আসলে স্বভাব যায় না মলে। এতো কিছুর পরেও এরা আব্বাসের সঙ্গে বিগ্রেডে হাত মিলিয়েও অন্যকে উচ্চকন্ঠে সাম্প্রদায়িক বলে। কারণটা হলো, এরা যে বিদেশী বিপ্লবীর লেবাররুম থেকে খালাস হওয়া দেশীয় আঁতুরঘরে লালিত ছানাপোনার দল। এরাই তো আবার ভারতের একমাত্র বিপ্লবের স্বঘোষিত কারিগর।

তাইতো নবতম রাজনৈতিক অভিধানে বিপ্লব শব্দের সমার্থক হলো 'ধান্দাবাজি', 'সুবিধাবাদী', 'স্বার্থপর', 'রঙ পাল্টানো গিরগিটি', 'যখন যেমন তখন তেমন', 'নীতিহীন'...

(www.theoffnews.com politics CPM left movments)


সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ:

নন্দীগ্রাম তখন রক্তস্নাত। বুদ্ধদেব তখন ওরা আমরার রনংদেহী স্রষ্টা। মমতাও যে বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদেনী। বুদ্ধ বলতে বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভ্রাতুষ্পুত্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। যিনি গতকাল প্রয়াত হয়েছেন। আর মমতা বলতে বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।  যিনি বর্তমান বঙ্গের প্রশাসনিক প্রধান। মাঝের সময় ভূমিতে বয়ে গেছে কত কত ঘটনা প্রবাহের উথালপাথাল অনিবার্য রাজনৈতিক স্রোত।

সেই সময় আমি কর্মরত আনন্দবাজারে। দুর্গাপুর ব্যুরোর সাংবাদিক হিসেবে। আমাদের উপর কড়া অলিখিত নির্দেশ ছিল পত্রিকার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের, যা ঘটবে ঘটুক, যত রক্ত ঝড়বে ঝড়ুক, কিন্তু কোনও ভাবেই বামফ্রন্টের চলমান শিল্পনীতির বিরুদ্ধে একটা অক্ষরও লেখা যাবে না খবর লেখার সময়। আনন্দবাজারের এই 'সত্যকে অস্বীকার করে খবর পরিবেশন' এর মাশুলও গুনতে হয়েছে অনেক। তাৎক্ষণিক ভাবে। এক ধাক্কায় পেপারের সার্কুলেশন নেমে আসে কল্পনাতীত পর্যায়ে। রাতারাতি। আমাদের অভ্যন্তরীণ মিটিংয়ে খবর বিভাগের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক থেকে স্বীকারও করে নেওয়া হয়েছিল, আমাদের গৃহীত লাইন ভুল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের নার্ভ নিরপেক্ষ সংবাদ প্রত্যাশা করছে আনন্দবাজারের মতো গৌরবান্বিত পত্রিকার কাছ থেকে। তবুও বাংলার পুঁজিনিবেশের কথা ভেবে সেই সময় বামফ্রন্টকে খুল্লাম খুল্লা অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে ছিল আনন্দবাজার। সেই নির্ভেজাল সমর্থন এতোটাই গভীরে পৌঁছে ছিল যে বুদ্ধদেবকেও ক্ষেত্র বিশেষে সেন্সরড করতে দ্বিধা করেনি তখনকার পত্রিকা সম্পাদকের নিজস্ব কোটারী।

সেই অপ্রকাশিত ঘটনার কথা আজকে প্রথম প্রকাশ্যে বলতে খুব ইচ্ছে করছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই গোপন কাহিনী হঠাৎ এতকাল পরে এখনইবা কেন প্রকাশের বাসনা?

আসলে বুদ্ধদেববাবু গতকাল মারা গেছেন। ওই সময়ের সিপিএমের দাম্ভিকতার তীব্র বিরোধিতা করলেও তথাপি আমি বুদ্ধদেববাবুর শিল্পনীতির চরম সমর্থক ছিলাম। কারণ বাংলার হাল যখন তিনি ধরেন তখন সিপিএমের জঙ্গি আন্দোলনের কুফলে বঙ্গ জুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল শিল্প বন্ধ্যা। এটা এককথায় মানতেই হবে রাজ্যবাসীকে, বুদ্ধদেবের জমানায় যা শিল্পধর্মী পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছিল তা বিধানচন্দ্র রায়ের শাসনকালের পরবর্তী সময়ে, এই কৃতিত্বের দৃষ্টান্ত আর দ্বিতীয়বার ঘটেনি এযাবৎ। তাই বুদ্ধদেব ছিলেন আমার মনের শ্রদ্ধার আসনের এক অনন্য আইকন। চোখের সামনে দেখেছি মৃত শিল্পনগরী দুর্গাপুরকে কিভাবে তিনি পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। একদম নিজস্ব মুন্সীয়ানায়। তাই তাঁকে একদা সবার অলক্ষ্যে সেন্সর করা হয়েছিল এটা আমি সেদিন কেন আজও মেনে নিতে পারিনি। আজ তিনি নেই আমাদের মাঝে। তবু তাঁর নিখাদ সততার স্বপ্নময় শিল্পনীতির বিষয়ে কিছু একটা অক্ষর চাষ করতে আজ মনটা খুব ছটপট করছে। কি লিখি তাই ভাবছি সকাল থেকে। সবই তো সবার জানা। নতুন আর কিইবা লিখি, এমনটাই ভেবে কূল পাচ্ছি না। হঠাৎ মনে পরে গেল এই সেন্সরডের কথাটা। তাই আগোছালো ভাবেই আর দ্বিতীয় কিছু না ভেবেই আমার এই লেখার প্রচেষ্টা মাত্র।

সময়টা ২০১০ সাল। তখনও বিধানসভা নির্বাচন হতে এক বছর বাকি। বিভিন্ন শিল্প বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মযোগ্যে তিনি তখন এই শিল্পতালুকে হরদম যাতায়াত করতেন খানিকটা ডেলি প্যাসেঞ্জারের মতো। আমরাও তাঁকে প্রায় প্রতিবারই ছেঁকে ধরতাম। স্কুপ খবরের তাগিদে। এদিকে রাজ্য জুড়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। মমতার সিঙুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তোলপাড় সারা রাজ্য। সত্যকে অস্বীকার না করেই বলবো, সেদিন আমিও মনেপ্রাণে ব্যক্তিস্তরে পরিবর্তনপন্থী ছিলাম। একইসঙ্গে বুদ্ধদেবের শিল্পায়ণের অন্ধ সমর্থকও ছিলাম একজন সাংবাদিক হিসেবে।

এমনই একদিন সকালে বুদ্ধদেববাবুর কলকাতা থেকে সড়কপথে দুর্গাপুর আসার কথাও। আমরা সব সাংবাদিকেরা নির্দিষ্ট গেস্ট হাউসে অপেক্ষা করছি। একাংশ প্রশাসনিক আধিকারিকেরাও যথারীতি হাজির সেখানে। তখন আমার সঙ্গে দুজন সহকর্মী চিত্র সাংবাদিকও সেখানে অপেক্ষারত। হঠাৎ আমার ফোন বেজে উঠলো। মোবাইলে ভেসে উঠলো রাজ্য পুলিশের এক অন্যতম উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তার নাম। ফোন ধরতেই তিনি আমাকে অফ দি রেকর্ড বললেন, "মুখ্যমন্ত্রী ট্রেনে আসছেন। একদম শেষ মুহূর্তে উনার গাড়ির সফর বাতিল করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে। চ্যাপ্টারটা কিন্তু খুবই গোপনীয়।" ফোন বন্ধ করতেই বুঝলাম ট্রেন দুর্গাপুর আসতে মিনিট কুড়ি বাকি। এটাও অনুধাবন করেছিলাম, উপস্থিত কোনও সাংবাদিক উনার ট্রেনে আসার খবরটা এখনও কেউ পায়নি। আমি তাই সবার কাছে টয়লেট যাবার নাম করে একটু দূরে সরে গিয়ে আনন্দবাজারে কর্মরত একজন চিত্র সাংবাদিককে সেখানে স্ট্যান্ড বাই রেখে অন্যজনকে ইশারায় কাছে ডেকে নিলাম। চুপচাপ কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে চললাম রেলস্টেশন দুজনে। নিজস্ব গাড়িতে। বিষয়টা এতোটাই গোপনীয়তা রক্ষা করেছিলাম তখন যে সঙ্গের সঙ্গীকেও পথিমধ্যে কিছু বলিনি। যদিও সে হতবাক হয়ে আমার কাছে বারবার জানতে চাইছিল, আমরা কোথায় ও কেন চলেছি এভাবে।

যাইহোক, অবশেষে সকাল নটার কাছাকাছি সময়ে দুর্গাপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বুদ্ধদেববাবু পা রাখলেন। আমিও তাঁর কাছে যাবার চেষ্টা করছি। কিছুটা জবরদস্তি করেই। এদিকে নাছোড় উনাকে বৃত্তাকারে ঘিরে থাকা কর্মরত সুরক্ষাকর্মীরা। এটা দেখেই আমাকে উনি চিনতে পারলেন। এর আগে বহুবার উনার প্রেস ব্রিফিংয়ে সামনাসামনি উপস্থিত থাকার সুবাদে। বললেন, "আপনি তো আনন্দবাজারের সাংবাদিক। উনাকে আসতে দিন।" যতক্ষণে কাছে এলাম তখন আমরা সবাই সিঁড়ি বেয়ে উঠছি। উনিও তরতরিয়ে উঠছেন। বুঝলাম হাতে সময় নেই সাংবাদিক হিসেবে উনাকে একা এভাবে পাওয়ার। মওকা বুঝে সরাসরি তাই প্রশ্ন করলাম। কাটোয়ার প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কি? উনি তখন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বললেন, "স্থানীয় মানুষ জমি না দিলে বিদ্যুৎ কারখানা হবে না। চেষ্টা চলছে প্রশাসনের তরফে। জমি মালিকদের বোঝানোর। কিন্তু নেতিবাচক রাজনীতি মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছে। যাঁরা আত্মঘাতী হতে চায় সেখানে কিছু হবে না। কাটোয়াকে বাদ দিয়েই শিল্পায়ন চলবে। স্থানীয় মানুষ না চাইলে কাটোয়াতে বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়বো না।"

এমন এক্সক্লুসিভ ক্যাচলাইন বুদ্ধদেববাবুর কাছে পাবো, আমি ঘুণাক্ষরেও আশা করিনি। খুব খুশি মনেই আমি খবরটা লিখেছিলাম যে কাটোয়ার বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সরে আসতে আগ্রহী হতাশ বুদ্ধদেব। ভাবলাম পরের দিন সবাইকে হতবাক করে খবরটা প্রকাশিত হবে। কিন্তু সন্ধ্যা গড়াতেই আশার থালায় পড়লো নিরাশার ভাত। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ আমাকে কলকাতা অফিস থেকে আমার উর্ধ্বতন বস্ (যিনি গত বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর হয়ে কিছু ভিডিও ইন্টারভিউ নিয়ে ছিলেন একাধিক সেলিব্রেটিদের।) ফোন করে বললেন, "সুবীর তুমি একি কপি পাঠিয়েছো। এর জন্য তোমার চাকরি তো যাবেই একইসঙ্গে আমার চাকরিও আর থাকবে না কাল সকাল থেকে। এই খবর ছাপা সম্ভব নয়।" তৎক্ষণাৎ আমি বিণীত প্রতিবাদ করে বললাম, "এটা আমার বহু কষ্টের অর্জিত এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ। খবরটা এযাবৎ কোনও মিডিয়া পায়নি। এটা তো আক্ষরিক অর্থেই নির্ভেজাল খবর।" প্রতুত্তরে বললেন, "আজ সন্ধ্যাতেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে প্রেস কনফারেন্স করেছেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু। তিনি বলেছেন, "কাটোয়াতে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে হলেও বিদ্যুৎ কারখানা নির্মাণ করা হবেই।" সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম, "তাতে কি হয়েছে দুটো খবরই ছাপা হোক। কিন্তু আমার অনুরোধে সায় দিলেন না আমার বস্ সেদিন। তিনি বললেন, "মানছি খবরে যা লিখেছো তা তোমাকে বুদ্ধদেববাবু অক্ষরে অক্ষরে সেটাই বলেছেন। কিন্তু এটাতো সিপিএমের পার্টি লাইন বিরোধী বক্তব্য। বিমানবাবুর বক্তব্যে তা পরিস্কার। কাল খবর প্রকাশিত হবার পর পার্টির চাপে মুখ্যমন্ত্রী যদি পাল্টি খান তখন তুমি কি জবাব দেবে? যদি উনি আগামীকাল ব্রিফ দেন, আমার বক্তব্যকে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তখন তো পেপারের সম্পাদকের মুখ পুড়বে।" আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, "তাই বলে বুদ্ধদেববাবু প্রকাশ্যে মিথ্যা কথা বলবেন, এটা আমি কল্পনাও করতে পারছি না। আমি সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আপনারা খবরটা প্রকাশ করার জন্য আরও একবার রিথিঙ্ক করুন। ফোনের ওপার থেকে এবার ভেসে এলো, "খবরটা অভীকবাবু নিজে দেখেছেন। উনি বারণ করেছেন এটা ছাপতে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী এমন কথাই তোমাকে বলেছেন মানছি, তবু তাঁর বক্তব্য পার্টি লাইনের বিরুদ্ধে। তাই শিল্পায়ন বিরোধী কোনও খবর আনন্দবাজার এই মুহূর্তে প্রকাশ করবে না। আমাদের স্ট্যান্ড তো তুমি ভালো ভাবেই জানো।" রাগে দুঃখে আমি বলেই দিলাম, "আমি এমন একটা পেপারে কাজ করছি যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর এক্সক্লুসিভ বক্তব্য সম্বলিত সত্য খবরের কোনও মূল্য নেই। আমাদের পেপারটা কি সিপিএম পার্টির মুখপত্র? শেষে আপনারাও কিনা বুদ্ধবাবুকে সেন্সরড করলেন?" ফোন ছিন্ন হবার আগে বস্ স্বগতোক্তি করলেন, "তোমার মতো একজন সাংবাদিক হয়ে আমারও এসব বলতে খারাপ লাগছে। আমার কিছুই এখানে বলার নেই। হুকুম যে আমাকে মানতেই হবে। সরি সুবীর।"

সরি বুদ্ধদেববাবু আপনার কাছেও। সেদিন ভরসা করে কাছে ডেকে আমাকে একান্তে একটা স্কুপ লাইন দিয়েছিলেন। যেটা কর্মসূত্রে আমার আবদ্ধ তদানীন্তন পত্রিকা ছাপলো না ওইদিন। আপনার ঘোর সমর্থক হয়েও আপনাকে বিশ্বাস করতে পারেননি পত্রিকা কর্তৃপক্ষ। আপনাকেও সেন্সরশিপ থেকে তাই রেহাইও দেননি সেদিনের আনন্দবাজারের কর্তাব্যক্তিরা। অথচ সেদিন যে আপনি কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সত্য নির্ভর ছিলেন তা কাটোয়ার ওই জনপদ আজও চুড়ান্ত সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে নির্জন একলব্যের অনুকরণেই।

(www.theoffnews.com Buddhadeb Bhattacharjee Anandabazar Patrika)


সুবীর পাল, এডিটর, দ্য অফনিউজ:

"আমি বাবা আর ডাকলেও রাজভবনে যাব না, যা কীর্তি-কেলেঙ্কারি শুনছি।"

এই বক্তব্যের বক্তা কে? বক্তা হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এবার আমার একটা প্রশ্ন আছে। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। 

মাননীয়া আপনার অধীনেই পুলিশ দফতর। স্বাস্থ্য দফতরও আপনার অধীনে। ভুল বলিনি তো গণদিদি?

তাহলে যে কারণে (?) একজন মহিলা হয়ে রাজভবণে যেতে আপনি নিজে আগ্রহী নন, ঠিক একই কারণে বরং অতিরিক্ত নারকীয় জিঘাংসার কারণে মহিলা চিকিৎসা, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা আরজিকর হাসপাতালে নিজ নিজ কর্মে যোগ দেবেন কোন সাহসে? আরজিকর হাসপাতাল তো আপনার অধীনেই। ঠিক তো?

অথচ আপনার অধীনস্থ হাসপাতালে আপনিই আবার আন্দোলনকারীদের কাজে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেই চলেছেন পর্যায়ক্রমে। এটা কি আপনার দ্বিচারিতা নয়?

রাজভবণ প্রসঙ্গে আপনার ইজ্জতের ভয় সঙ্গত অথচ আরজিকর হাসপাতালে কর্মে নিযুক্ত নারীদের ইজ্জতের ভয় অসঙ্গত! কি বলতে চান আপনি বাংলার মানুষকে!

আগে আপনি রাজভবণে নিজে একাকী যান আরজিকর হাসপাতাল সম্পর্কে রাজ্যপালকে অবহিত করতে, তারপর না হয় আন্দোলনকারীদের কাজে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানাবেন। আপনি তো রাজ্যের প্রশাসনিক অভিভাবিকা। আপনিই না হয় প্রথম দৃষ্টান্তটা তৈরি করুন। রাজ্যের স্বার্থে একটু উদারতা দেখাতে আপনার আপত্তি কোথায়?

অন্যথায় আপনার নিরপেক্ষ নৈতিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাবেই। যা আপনার পক্ষে মোটেই সুখকর পরিস্থিতি যে হবে না আগত সময়ের নিরিখে, এটা একজন সাংবাদিক হিসেবে নিশ্চিত করে বলতেই পারি।

নিশ্চয়ই আপনার স্মরণে আছে, সময়টা ২০১১ সালের ১৯ মে। যেদিন মহাকরণের অভিমুখে আপনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে এগোচ্ছিলেন। মহানগরের রাজপথে। তখন আপনার পায়ে পায়ে তাল মিলিয়ে ছিল জনসমুদ্র। যা ছিল তদানীন্তন সততার প্রতীকের প্রতি এক গভীর আস্থার জয়গান। কি মনে পড়ছে ম্যাডাম? আর মাত্র কয়েক দিন আগে, ২০২৪ সালের ১৪ অগাষ্টের রাতটার কথা একবার ভাবুন। সারা দুনিয়া কি দেখল? মধ্যরাতের দখলদারী। বঙ্গললনার। সারা বাংলার প্রতিটি অলিতে গলিতে। না জনসমুদ্র বলি কি করে এই দখলদারীকে? এতো মহাজনসমুদ্রের মহাগণবিস্ফোরণ। ভাবতে পেরেছিলেন কি এমন রাত দখলের কথা!

বিশ্বাস করুন সত্যের অপলাপ না করেই বলছি, সেদিনের জনসমুদ্র যে ম্লান হয়ে গেল এক লহমায় এদিনের মহাজনসমুদ্রের বৈশ্বিক উচ্ছ্বাসের তুল্য বিচারে। যে উচ্ছ্বাসে নিহিত ছিল আপনার স্বৈরাচারী অনাচার দুঃশাসনের প্রতি একাধিক নামার চুড়ান্ত অনাস্থা।

আশাকরি আগামীর আশু দেওয়াল লিখনটা আপনি অনুধাবন করতে পারছেন!

(www.theoffnews.com Mamata Banerjee Bengali women night capture)


পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

আজ এক নির্যাতিতার পাশে দাঁড়িয়ে কলকাতা সহ গোটা রাজ্য, দেশ এমনকি বিদেশের মাটিতেও আন্দোলনের অনুরণন ছড়িয়ে দিতে পেরেছে বাঙালি। নারীত্বের এই অবমাননার প্রতিবাদে একই গণআন্দোলন বছর খানেক আগেই ছড়িয়ে দিতে পারত দিল্লী। সেটা হয়নি, আমাদের দুর্ভাগ্য, ভারতের দুর্ভাগ্য। না আমি অভয়া কাণ্ডের কথা বলছি না। বলছি ভারতীয় কুস্তিগিরদের কথা। এক বিজেপি নেতা তথা ভারতীয় কুস্তি সংস্থার কর্তা ব্রিজভূষণ সিং দিনের পর দিন মহিলা কুস্তিগিরদের শ্লীলতাহানি করেছেন, এই অভিযোগে প্রতিবাদে নামে কুস্তিগিরেররা। সেই প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন যারা তারা কেউ সাধারণ মানুষ নন। তাদের মধ্যে অলিম্পিক পদক জয়ীর পাশাপাশি এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে মেডেলজয়ী একাধিক কুস্তিগির ছিলেন। যারা আক্ষরিক অর্থেই দেশের গর্ব। যারা নিজেদের কৃতিত্বে বহুবার হেডলাইনে এসেছেন। দেশবাসী এই ঘটনার নিন্দে করেছে, সহানুভূতি দেখিয়েছে কুস্তিগিরিদের প্রতি। কিন্তু আন্দোলনকারীদের পাশে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে সামিল হয়নি। দিল্লীর মানুষ পথে নামেননি এর প্রতিবাদে। সেভাবে গণ আন্দোলন তৈরিই হয়নি। অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ইস্যু, স্পর্শকাতর বিষয়। এত গুণী মানুষ পথে নেমেছেন দেখেও দিল্লী নীরবই ছিল। না হলে কলকাতার মতই একটা গণ আন্দোলন বছর খানেক আগেই উপহার পেত দেশ। 

এই আন্দোলনেই পুলিশের হাতে মার খেয়েছেন ভিনেশ ফোগট, সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়া। কি নামগুলি মনে পড়ছে। একশো ত্রিশ কোটির দেশে দুই চারটে যা অলিম্পিক পদক এসেছে তাঁর অধিকাংশটাই এই কুস্তিগিরিদের হাত ধরে। তার পরেও এদের মর্যাদা কোথায়? কেন আগামী প্রজন্ম খেলাধূলায় উৎসাহ পাবে? কেন ভারতে মেডেল আসবে? যখন দেখা যায় অলিম্পিক মেডেল জয়ীদের শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ করতে গেলে পুলিশের লাঠির বাড়ি খেতে হয়। এই লজ্জার বিরুদ্ধে গর্জে উঠতেই পারত দিল্লী, সোচ্চার হয়ে উঠতে পারত গোটা দেশ। কিন্তু তা হয়নি। ভিনেশ যখন অলিম্পিকে পদক জয়ের দোরগোড়ায় তখন ভারতবাসীর প্রবল সমর্থন, সহানুভূতি, আক্ষেপ চুড়ান্ত আদিখ্যেতা। কিন্তু এই মেয়েটিই যখন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে মার খাচ্ছে তখন দেশ নীরব। সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ। 

সম্প্রতি হরিয়ানায় নির্বাচনে কংগ্রেসের ভাল ফলের ইঙ্গিত মিলেছে। বিভিন্ন সমীক্ষায়। আমি একেবারেই কংগ্রেসের ভক্ত নই, রাহুল গান্ধী বা অন্য কোনও কংগ্রেস নেতা আমার সামান্যতমও প্রিয় ব্যক্তি নন। কিন্তু বিজেপির এই পরাজয়টা খুব প্রয়োজন। আমরা বাংলার মানুষ, দেখেছি আমাদের রাজ্যের সরকার কিভাবে তার দলের কর্মী বা নেতাদের বাঁচাতে পক্ষপাত নেয়, একই ভাবে দিল্লীতে বিজেপিও বরাবর এই ইস্যুতে নীরব থেকে ব্রিজভূষণকে সমর্থন করে গিয়েছে। এতগুলি ছেলেমেয়ে একযোগে অভিযোগ করছে, তাতে সামান্যতম বিচলিত হয়নি বিজেপি নেতৃত্ব। গোটা ঘটনায় আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কুস্তিগিরিদের সিংহ ভাগই হরিয়ানার মানুষ। তাদের আত্মীয় পরিজন, শুভানুধ্যায়ী পরিচিত সকলেই দেখেছেন বিজেপির এই একচোখোমি। সেই সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কৃষক আন্দোলনেও বিজেপির অসহযোগিতার স্মৃতি। তাই এবারের নির্বাচনেও যদি হরিয়ানা বিজেপিকেই ফের নির্বাচিত করে তাহলে বোধহয় তারা ঘরের ছেলেমেয়েদের কাছেই মুখ দেখাতে পারবে না। 

ক্ষমতায় এলে কংগ্রেসের শাসন কেমন হবে তা অনুমেয়। রাজনৈতিক দল মোটামুটি একই ধরনের হয়, মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ভিনেশ এবারে কংগ্রেসের প্রার্থী, তিনি জিতলে মন্ত্রী হতে পারেন বলেও শোনা যাচ্ছে। সে যাই হোক, তাদের শাসনকাল নিয়ে আলোচনা সমালোচনা আগামীতে উপজীব্য। কিন্তু যে আন্দোলন এক বছর আগেই বিজেপির ভিত নড়িয়ে দিতে পারত, সেই আন্দোলনকে মর্যাদা দিতে হরিয়ানায় বিজেপির পরাজয় কাঙ্ক্ষিত অবশ্যই। এই লড়াইয়ে তাই হরিয়ানার মানুষ, দেশের গর্ব কুস্তিগিরেরা তাই নিজেদের জয় দেখছেন। কংগ্রেস উপলক্ষ মাত্র।

(www.theoffnews.com wrestling molestation Hariyana election BJP Congress)


মোনালিসা মুখোপাধ্যায়, ফিচার রাইটার, হুগলি:

পেরিয়ে এসেছি অনেকগুলো দিন৷ রইলাম অনেক ঘটনার সাক্ষী৷ কিছু সুখের কিছু দুঃখের কিছু অভিমানের পথ বেয়ে আজ মনের কোণে ঝড় আপনাকে নিয়ে মাননীয়া। 

চুলের মুঠি ধরে শাড়ি ছিঁড়ে বীরাঙ্গনা আপনাকে কেউ বা কারা রাস্তায় বার করে দিয়েছিল (কোথা থেকে সবার জানা)। মাথা ফাটিয়ে আধমরা করে দিয়েছিল। চেয়েছিল আপনার গতি চিরকালের জন্য স্তব্ধ করে দিতে। যদিও পারেনি। কিন্তু দু বেলা আজও তারা অশ্রাব্য ভাষা বলে আপনার নামে। আপনার ভালো চায় না। তবুও তারা আজ আপনার উদ্ধারকার্যে লাগছে। ভাবা যায় না ভাবতে ভালো লাগছে না। আপনার একটা কথায় প্রাণ দিতে রাজি ছিল কিছু তরতাজা প্রাণ কত কত নারী পুরুষ ছেলে বুড়ো - কিন্তু তাদের আপনি চেনেননি যদিও সেভাবে। চেনার তাগিদও অনুভব করেননি বাস্তবে। তাদের মত অনেকেই আজ হতবাক। তারা ভরসা হারিয়ে সরে গেছে দূরে অনেকদিন। তবে ভালোবেসেছে আপনায় গোপনে। অবশ্য এটা আশা করেনি যে দেশের শত্রুরা আজ আপনার আপন হবে। সেই খুনী আত্মাগুলো আপনার হাত শক্ত করতে কাজে লাগবে। প্রশ্ন আপনি চাইলে একাই তো পারতেন তবে কেন?

যাদের আবার কথায় কথায় বিপ্লব আর ফিদেল কাস্ত্রো বা চে গুয়েভারা। তাদের সব রোয়াব আজ খোয়াব হয়ে গেছে। বিকিয়ে গেছে লোভে। এত গলাবাজি বিপ্লব, এত  নিন্দে, দুবেলা চোর চোর করে চেল্লানো তথাকথিত শিক্ষিত কমুরা আজ তারই হাত ধরে চরিত্র বদল করছেন বাঁচতে। 

চটির ঘায়ে উজাড় হয়ে আবার চটির নিচে এলেন তো অস্তিত্ব সংকটে পড়ে? বাকি চুনোপুঁটিসহ এলেবেলেদের সাথে একঘাটে জল খাচ্ছেন প্রবল ভয়ে। কিসের ভয়? আপনারা তো কোথাও নেই। চিরকাল অন্য দেশের দালালী করলেন। ভারতের প্রতি ভালোবাসা কই? তো এখন ভালো লাগছে কমরেট? রেট বড়ই কম আপনাদের। মিছিল টিছিল আর করবেন না লজ্জা থাকলে। মুখ লোকান। পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে কোন লজ্জায় মিটিং করবেন?

নিজের স্বার্থে শত্রুর পা চাটেন এর নাম বিপ্লব বুঝি? কোথায় আপনাদের আবার মানসম্মান। দেশপ্রেমীর মুখোশ পরছেন স্বার্থসিদ্ধির জন্য। ছিঃ। ওই মার খাওয়া ছবিটা ইন্সপিরেশন ছিল, রেখে দিয়েছিলাম লড়াকু মানসিকতার একজন ভেবে এতদিন।একদিন হাত ভরে সবুজ আবীর উড়িয়ে বেড়াতাম আপনি জিতলেই। আজ সে ছবি কুচিয়ে ফেলে দিলাম ভীষণ যন্ত্রণায় অভিমানে।

ভয় তাহলে আপনাকেও এইভাবে নিচে নামালো। হা হা। ভুল বা অন্যায় না করলে ভয় পাবেন কেন? আপনার চারপাশ বেইমানে ভর্তি মানছি কিন্তু আপনি লাগাম ধরলেন না কেন?

তবে মানছেন যে সিংহাসন টলছে ওই একজনের জন্য। মনে হয় একা লড়তে আর জীবনে আপনাকে দেখব না। আপনি ফুরিয়ে গেছেন। সে তেজের সেই আগুণে কেউ জল ঢেলে দিয়েছে। আপনি একা লড়লে ভালো লাগত। সত্যি বলছি ভালো লাগত।চৌত্রিশ বছরের ওই আগাছা শেকড় আপনি একাই তো উপড়ে ছিলেন। হারিয়ে গেলেন। ফিরে আসুন সেই চেনা মেজাজে একাই সব বদলে দেবার অঙ্গীকার নিয়ে। আমাদের স্বপ্ন ছিল অনেক। সেগুলো পূর্ণতা পাক।

(www.theoffnews.com - ekushe)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

“আগে কেবা প্রাণ, করিবেক দান”। আচ্ছা কবি কি আগে থেকেই দেখেছিলেন মানুষের সেবা করবার জন্য মানুষের এই আকুতিকে? কি জানি তখনও কি এভাবেই ভোট হত? ভোট তো জনগনের সেবা করবার জন্য স্বীকৃত পন্থা, অন্তত রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের তো তাই মত। এবারে বলুন তো নির্বাচনের জেতার জন্য অর্থাৎ মানব সেবার একটু সুযোগ পাওয়ার জন্য এই আকুলতার গুঢ় রহস্য কি? সম্প্রতি একজন বিচারপতি এই নিরীহ প্রশ্ন তুলেছেন আদালতে। “এত হানাহানি, এত হিংসা কিসের জন্য? ভোট কি তাহলে পাঁচ বছরের চাকরি? যেখান থেকে টাকা উপার্জনই মূল উদ্দেশ্য।“ আসলে মাননীয় বিচারপতিও এই উত্তরটা সম্যক জানেন। দিনের শেষে তিনিও এই রাজ্যের একজন বাসিন্দা। তার বাড়িতেও টিভি চলে, তার বাড়িতেও খবরের কাগজ আসে। বন্ধু বান্ধব আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে তারও কথা হয়, রাজ্যের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনিও খুব ভাল করেই জানেন। তাই তো আদালতে তার এই প্রশ্ন শুধু প্রশ্ন নয়, উত্তরও। 

আমাদেরকে বেছে নিতে হবে, ভুল বললাম আসলে আমাদেরকে মেনে নিতে হবে সামান্য কিছু উন্নয়ন এবং তার বিনিময়ে কিছু প্রাণ বিসর্জন। এটাই এখনকার রীতি। উন্নয়ন বলছি কেন? ভোট এলেই আমাদের এখানে কিছু কাজ হয়, এই ধরুন রাস্তাঘাট মেরামত, নতুন কালভার্ট বা সেতু তৈরি, কোথাও কোথাও বিদ্যুতায়ন ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সময় দেখা মেলে মানবসেবায় ব্রতী হওয়া সারা বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা নেতারও। এটুকুই লাভ ভোটের আগে। আবার ভোট এলেই এই মানবসেবা করবার অত্যুৎসাহে জীবন যায় কিছু তুচ্ছ মানবের। তো বৃহৎ স্বার্থে এই গোটা পঞ্চাশেক প্রাণ তো দেওয়াই যায়, কি বলুন। স্বাধীনতা সংগ্রামে তো কত প্রাণই গেছে, এটাও তেমনই একটা মহৎ কাজে প্রাণদান ধরে নিলেই ল্যাঠা চুকে যায়।  

কোন দলের কে মারা গেলেন তার তথ্য তলাশ এখানে করব না। কারণ সব দলই তো মানুষের সেবা ছাড়া আর কিছু বোঝেই না। তাই দল না গুনে, বরং দেহ গুনি। মৃতদের কারও বাবা, কাকা, মামা, ভাই এসব না ভেবে বরং ভাবি বীর, মহৎ, যোদ্ধা। তাহলে দেখবেন আর মন খারাপ লাগবে না। সেদিন দেখলাম চায়ের দোকানে কয়েকজন খুব খুশি আরাবুলের ভাঙ্গড়ে আই এস এফ কর্মীদের বোমাবাজিতে। সংবাদ মাধ্যমেই জানলাম আরাবুল ইসলাম নাকি ভয়ে একটি ঘরে সারারাত লুকিয়ে ছিলেন। মানুষ খুশি, আরাবুলের একছত্র আধিপত্য এভাবে চলে যেতে দেখে। কিন্তু যাদের ভয়ে আরাবুল ভিত তাদের হাতেও যে বোমা বন্দুক এ কথা ভুলে গেলে মুশকিলে পড়বেন। এক সময় বামেদের বলা ভাল সিপিএমের প্রবল অত্যাচারে জর্জরিত মানুষ তৃণমূলের জয় দেখে বা দাপট দেখে খুশি হতেন। সেই তৃণমূল এসে কি অবস্থা তা তারা নিজেরাই অনুভব করতে পারছেন। কিন্তু তৃণমূলের বিকল্পও যদি বোমা বন্দুক নিয়েই ক্ষমতায় আসে তারাও যে ধোয়া তুলসিপাতা হবে না সেটা বোঝার জন্য দূরদর্শিতার প্রয়োজন পড়ে না। 

গ্রামে গঞ্জে ঘুরে বেড়ানোর সূত্রে একটা বিষয় বেশ বুঝতে পেরেছিলাম এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের বিশেষ অসুবিধার কোনও কারণ ছিল না। প্রবল দুর্নীতি, অসৎ লোকের ভিড়, বহু নেতার হাজতে থাকা, নেতৃত্বের ঔদ্ধত্য স্বত্বেও মানুষের কাছে এই মুহূর্তে কোনও ঠিকঠাক বিকল্প ছিল না। বিজেপি কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিন, তাদের কাজকর্ম দেখে ইতিমধ্যেই মানুষ খুব ভাল করেই চিনে গিয়েছে। সিপিএমকে এর আগেই দেখে নিয়েছে, তাই নতুন ভোটার বাদ দিলে সকলেই জানেন তারাও কতটা ভয়ঙ্কর ছিল। রইল কংগ্রেস, সে এ রাজ্যে আলোচনাতেই আসে না, এখন তো আবার তারা বামেদের সঙ্গে জোটে। আর কে আছে বলুন? আই এস এফকে আমি ধরছি না কারণ দুই একটি এলাকা ছাড়া গোটা রাজ্যে তাদের প্রভাব নেই বললেই চলে। অর্থাৎ তৃণমূল কর্মীরা অতি উৎসাহী না হলেও দল জিততো। তবে এবারে যেটা লক্ষণীয় সেটা হল এই নির্বাচন কালের মৃত্যুমিছিলে শাসকদলের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। এবারে কিন্তু তৃণমূলের বেশ কয়েকজন কর্মী এই নির্বাচনে প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ কারো কারো মতে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। মানুষ শাসক দলের থেকে ভরষা হারাচ্ছেন। কিন্তু এই প্রতিরোধের কায়দাটাই অস্বস্তিকর। ইতিহাস বলছে হিংসাকে হিংসা দ্বারা জয় করে পরে হিংসাহীন থাকাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই তো আমাদের জীবনে হিংসা ধারাবাহিক।

একটা পঞ্চায়েত হোক বা পুরসভা, বিধানসভা হোক বা লোকসভা। জেতা মানেই ক্ষমতা। এখন ক্ষমতা মানেই অর্থ, প্রতিপত্তি। এই নেশা ছেড়ে দেওয়া কঠিন নয় অসম্ভব। তাই তো মৃত্যু আছে জেনেও জাটিঙ্গা পাখির মত ভোটের আগুনে এসে ঝাঁপ দেয় রাজনীতির কারবারিরা। তবে এখানে কিন্তু ওই প্রবাদটাই বেশি করে নজরে পড়ে “রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়”। যারা মারা যান তারা অধিকাংশই গরীব মানুষ, একজন বড়লোককে আরও বড়লোক বানাতে গিয়ে তারা প্রাণ দেন। তাদের ছেড়ে যাওয়া পরিবার গরীব থেকে আরও গরীব হয়। তবুও চলতেই থাকে এই ভোটের খেলা, মৃত্যুর মেলা, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ।

(www.theoffnews.com - Bengal election death)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

একটু মন মরা, বেশ যেন দুশ্চিন্তায়। আমার খুব কাছের ভাই, বন্ধু, নিকটাত্মীয় সে। খুবই ভাল সম্পর্ক আমার সঙ্গে। দুশ্চিন্তার কারণ জিজ্ঞাসা করে জানলাম আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনে তার ডিউটি পড়বার কথা ভেবেই আতঙ্কিত সে। পেশায় শিক্ষক, খুবই বিনয়ী, মিতভাষী মানুষটির এই ভয় দেখে একটু চিন্তা জাগল আমারও। এ নিয়ে পরিচিত মহলে কথা বাড়াতেই দেখলাম জাতি, ধর্ম, চাকুরী নির্বিশেষে প্রায় সকলেই পঞ্চায়েত ভোটে ডিউটি নিয়ে আতঙ্কিত।  

আসলে এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন কেমন হতে চলেছে তার ট্রেলার কিন্তু রোজই দেখতে পাচ্ছি আমরা। শাসক দলের অতি উচ্চ পদস্থ নেতা ইতিমধ্যেই হিংসাহীন, শান্তিপূর্ণ পঞ্চায়েত নির্বাচন উপহার দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। সেই ঘোষণা তিনি কলকাতা পুরনির্বাচনের আগেও করেছিলেন। তার পরে কি হয়েছে সকলেরই জানা। এবারেও পঞ্চায়েত নির্বাচনে স্বচ্ছ ভাবমুর্তি এবং সর্বজনগ্রাহ্য প্রার্থী দিতে চেয়ে তার উদ্যোগ বেশ প্রশংসনীয়। কিন্তু নবীন এই নেতার এখনও ঠিক ভাবে জানা হয়নি তিনি ঠিক কাদের নিয়ে এই দলটি চালান। দলে নবজোয়ারের নামে যে আত্মশুদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা এখন রীতিমত ব্যুমেরাং। পঞ্চায়েত নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী কে হবে তা ভোটাভুটির মাধ্যমে স্থির করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেখানেই বাধে গোল। এই সামান্য প্রার্থী বাছাইয়ের নিজেদের মধ্যে হওয়া নির্বাচনেও প্রতিদিন গোলমাল লেগেই আছে। না, ছোটখাটো কোনও মনোমালিন্য নয়। রীতিমত মারামারি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ব্যালট ছেঁড়া, গালিগালাজ কি নেই এই গোলমালে।

আচ্ছা ভাবুন তো, যারা নিজেদের মধ্যে হওয়া নিতান্ত ঘরোয়া একটা নির্বাচনে তাদের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সামনে এমন হিংসা ঘটাতে পারে, তারা পঞ্চায়েত নির্বাচনে জিততে কি কি করতে পারে? ভাবার দরকার নেই, এর আগে এগুলি ঘটেছে, এবার তারই ড্রেস রিহার্সাল চলছে। এটা কিন্তু ধারাবাহিক, মানে এক আধবার ঘটেছে এমনটা কিন্তু নয়। যবে থেকে এই নবজোয়ারের নামে প্রহসন শুরু হয়েছে, তবে থেকেই কোনও না কোনও জায়গাতে প্রার্থী বাছাইয়ের নামে গোলমাল, অশান্তি লেগেই আছে। এইসব অবাধ্য কর্মীদের খুব যে কড়া শাস্তি হয়েছে এমনটাও এখনও শোনা যায়নি। তাই তো কোচবিহার থেকে মুর্শিদাবাদ প্রার্থী বাছাই ঘিরে এই ব্যালট ছিনতাই এর রিহার্সাল অব্যাহত ফি দিনই। শাস্তির ভয় যখন নেই তখন ধরে নিতেই হয় এই কাণ্ডে দলের নেতৃত্বেরও হয়তো আলগা প্রশ্রয় রয়েছে। 

সরকারী এই ছাপোষা কর্মীদের এমন ধারাবাহিক ঘটনাক্রম দেখে কি ভয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়? শাসক দলের কথা রেখে এবার বিরোধীদের কথায় আসা যাক। আগামী পঞ্চায়েত ভোটে ঠিক কি ইস্যু সামনে রেখে লড়াই হবে তা এখনও তাদের কাছে পরিস্কার নয়। তারা দুর্নীতি ইস্যুতে গলা ফাটাবেন না কি গ্রামে না হওয়া কাজের জিগির তুলবেন তা নিয়ে স্পটতই দ্বিধাবিভক্ত। প্রধান বিরোধী দল বিজেপি তাদের রাজ্যের বহু জায়গাতে বুথ কমিটি গঠনের লোক নেই। বিরোধী দলনেতা যা বলেন, দলের রাজ্য সভাপতি বা অন্য নেতারা সেটাকেই নস্যাৎ করে দেন। অর্থাৎ এখানেও সমন্বয়ের বড় অভাব। কংগ্রেস এবং বামেরা সাম্প্রতিক একটু উপনির্বাচনে জিতে প্রাসঙ্গিক হওয়ার চেষ্টা করলেও, এখনও গ্রামে তাদের ভিত্তি সেভাবে মজবুত হয়নি। বামেদের আধুনিক বা এই প্রজন্মের নেতারা এখনও গ্রামের গভীরে গিয়ে কাজ করতে স্বচ্ছন্দ নন। সব মিলিয়ে খুবই ভজঘট একটা অবস্থায় রাজ্যের রাজনৈতিক চালচিত্র। 

নয়তো এমন ভাবে বিভিন্ন বিষয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকা একটি সরকারের বিরুদ্ধে সেভাবে জনমত গড়ে তুলতে বিরোধীরা পারছে কই? শাসক দলের সর্বোচ্চ নের্তৃত্ব যখন কাটমানি ফেরৎ দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন তখন পঞ্চায়েত স্তরে রীতিমত শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। স্থানীয় বহু নেতা কিছু কিছু টাকা ফেরতও দিয়েছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছিল এই সরকার বা তার চালকরা কাটমানি খেয়ে থাকেন। ফুলে ফেঁপে উঠেছিলেন না খেতে পাওয়া গরীব পঞ্চায়েত সদস্য থেকে প্রধান সকলেই। এতটা নগ্নভাবে না হলেও হতদরিদ্র সর্বহারা পঞ্চায়েত সদস্যদের ফুলে ওঠার নজির বাম আমলেও অজস্র আছে। ভাবুন তো এই যে মধুর ভাণ্ডার এ কি কেউ ছেড়ে দিতে চায়? যারা এই সুখ পেয়েছেন তারাও ছাড়তে চাইবেন না, আবার যারা কাছে থেকে দেখছেন কি মধু আছে এতে তারাও তা হাতাতে মরিয়া হবেনই। ঘটেও তাই। তাই তো দলের প্রার্থী বাছাই থেকেই মরিয়া সকলে। যেনতেন প্রকারেণ পঞ্চায়েত প্রার্থী হতেই হবে। আর প্রার্থী হলে তো জিততেই হবে যেভাবেই হোক। দলের নের্তৃত্বও সব জানেন বৈকি। তাই তো তারাও দূর থেকেই মজা দেখেন। আর এই মজা দেখে শিউরে ওঠেন সাধারণ ছাপোষা মানুষগুলি। যাদের চাকরির দোহাই দিয়ে, পরিবার পরিজন রেখে প্রাণ হাতে করেই যেতে হয় ভোটের ডিউটিতে।

(www.theoffnews.com - ballots looted West Bengal)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

খবরের কাগজে পড়ে বেশ একটু উত্তেজিতই হয়ে পড়েছিলাম। সত্যিই তো আমাদের হকের টাকা আটকে রাখার অধিকার তো কেন্দ্রের নেই। আমাদের প্রাপ্য টাকা আমাদের দিতেই হবে। পাশাপাশি টাকা না দিলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রে এক কোটি মানুষের সই সম্বলিত চিঠি পাঠানোর কথা বলেছেন সেটাও আমার দারুণ মনে ধরেছে। এটা দারুণ দাওয়াই। কিন্তু স্বল্প শিক্ষিত মানুষ তো আমি, তাই একটা প্রশ্ন ছিল। আচ্ছা এই চিঠি পাঠানোয় কাজ হয়? সরকার এতে নড়েচড়ে বসে? কেউ কি একবারও ওই চিঠি খুলে পড়েন? একটা চিঠিরও উত্তর দেওয়া হয়? না আমি তথ্য জানার অধিকারের ভিত্তিতে পাঠানো চিঠির কথা বলছি না, তাতে যা হোক একটা উত্তর বোধ হয় আসে, কিন্তু এই যে সরকারের কাছে চিঠি পাঠানো হয়, তার কোনও উত্তর সরকার বাহাদুর দেন? কে জানে। কিন্তু অভিষেকের চিঠি পাঠানোর এই দমদম দাওয়াইটা খুব কাজে আসবে, কি বলুন? 

কিন্তু এই ওষুধটা গোবরডাঙার মানুষের কোনও কাজে আসেনি, জানেন তো? বুঝলেন না, আসলে গোবরডাঙা হাসপাতাল খোলার দাবি বা অনুরোধ জানিয়ে সেখানকার মানুষ নিজেদের সই করে আট হাজারেরও বেশি চিঠি নবান্নে পাঠিয়েছিলেন। খোলা পোস্ট কার্ডেই সেই চিঠি পাঠানো হয়েছিল, একটাই কথা লেখা ছিল বন্ধ হয়ে থাকা হাসপাতালটি স্থানীয় বহু মানুষের স্বার্থে খোলা হোক। কিন্তু না, সেই চিঠিতে কাজ কিছু হয়েছে কিনা গোবরডাঙার মানুষ তা টের পাননি। অবশ্য টের পাননি বলাটা বোধহয় ঠিক হল না। কারন হাসপাতালের অন্য পরিষেবা তো প্রায় দশ বছর ধরে বন্ধই ছিল, এ বছরের শুরুতে টিম টিম করে চলা আউটডোরটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেকটা জায়গা জমি, বড় বড় বাড়ি নিয়ে এখনও খোলার আশায় দাঁড়িয়ে সেই হাসপাতাল। কি চিঠিতে কি কাজ হয় তাহলে? 

আপনাদের একটু খুলেই বলি তাহলে। এই হাসপাতাল কিন্তু হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনও হাসপাতাল নয়। এর বয়স নয় নয় করেও আশি বছর। ১৯৪৩ সালে তৎকালীন গোবরডাঙা টাউনহলে সূচনা হয় এই হাসপাতালের, তখন নাম ছিল ফেমিনিন এমারজেন্সি রিলিফ হাসপাতাল। দেশ স্বাধীন হলে গৈপুরে মিত্র ও বসু পরিবার হাসপাতাল স্থাপনের জন্য জমি দেয়। সেই জমিতে ১৯৫৭ সালে এটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসাবে পথ চলা শুরু করেছিল, ২০০১ সালে বাম আমলে রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দফতরের হাত থেকে এই গ্রামীণ হাসপাতালের দায়িত্ব নেয় উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ। তার পর থেকেই ধীরে ধীরে হাসপাতালটির অবস্থা খারাপ হতে থাকে। অবশেষে ২০১৪ সালে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের তরফ থেকে নোটিস দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়, হাসপাতালে শুধুমাত্র আউটডোরে কিছু পরিষেবা চালু থাকবে। রোগী ভর্তি-সহ অন্যান্য সব পরিষেবাও বন্ধ থাকবে। এরপরেই গোবরডাঙা একাধিক রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন প্রতিবাদ জানায় ও সরকারি মহলে ডেপুটেশন দেয়। কিন্তু লাভ হয়নি। চল্লিশ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি চালু হলে গোবরডাঙা পুর এলাকা এবং বেশ কয়েকটি পঞ্চায়েত এলাকার লক্ষাধিক মানুষ উপকৃত হবেন।   

কিন্তু ২০১৭ সালের ৩১ মে ব্যারাকপুরের প্রশাসনিক বৈঠকে বন্ধ থাকা গোবরডাঙা হাসপাতাল ফের চালু করার আর্জি জানিয়েছিলেন তৎকালীন পুরপ্রধান সুভাষ দত্ত। সঙ্গে গলা মিলিয়েছিলেন স্থানীয় বিধায়ক পুলিন বিহারী রায়ও। কিন্তু প্রকাশ্য সভাতেই সুভাষবাবুর উচ্চারণভঙ্গিকে নকল করে ব্যঙ্গ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি জানিয়ে দেন গোবরডাঙায় হাসপাতাল হবে না। তাদের প্রয়োজন হলে ৩০ কিলোমিটার দূরের বনগাঁ হাসপাতালে যেতে হবে। না হলে ৫০ কিলোমিটার দূরে কল্যানীতে এইমস হচ্ছে সেখানেও যাওয়া যেতে পারে। প্রকাশ্য সভায় সর্বজনশ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যানকে ব্যঙ্গ করাটা গোবরডাঙার মানুষ ভালোভাবে নেননি। ভালো ভাবে নেননি রাজ্যের প্রধান অভিভাবক তথা একজন মুখ্যমন্ত্রীর হাসপাতালের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা দাবি এমন ভাবে নাকচ করে দেওয়াটাকেও। এই হাসপাতালকে বাঁচাতে গণতন্ত্রের শেষ হাতিয়ার বনধের রাস্তাও বেছে নেন গোবরডাঙাবাসী৷ ‘গোবরডাঙা পৌর উন্নয়ন পরিষদের’ ডাকে ১৪ জুন বনধ পালন করে গোবরডাঙা৷ এমন সর্বাত্মক বনধ গোবরডাঙাবাসী কেন গোটা বাংলাও বোধহয় সাম্প্রতিক কালে দেখেনি। ১২ ঘন্টা গোটা গোবরডাঙাই যেন স্তব্ধ ছিল। ট্রেন চলেছে কিন্তু গোবরডাঙা রেল স্টেশন ফাঁকা, স্কুল, ব্যাঙ্ক, দোকানপাট সব ছিল বন্ধ। ভ্যান রিক্সা চালকেরাও এদিন পথে নামেননি। যেখানে বন্ধ সফল করতে সমর্থকদের পথে নামতে হয়, বলপ্রয়োগ করতে হয়, হিংসার আশ্রয় নিতে হয়, সেখানে কিন্তু গোবরডাঙায় অরাজনৈতিক সংগঠনের ডাকা এই বনধে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়েছিলেন সব শ্রেণীর মানুষ।

তার পরেও চালু হয়নি হাসপাতাল। মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে খসা কথা রাখতে এই হাসপাতাল চালু না হওয়ার সব রকম চেষ্টা করে গিয়েছে প্রশাসন। মাঝে কোভিডের সময় এই হাসপাতাল কোভিড হাসপাতাল বলে ব্যবহার করা হলে আশার আলো দেখতে পান স্থানীয় মানুষ। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাব কমে যেতেই ফের বন্ধ হাসপাতাল। গোবরডাঙার পুরকর্তারাও হাসপাতাল নিয়ে মানুষের ক্ষোভের কথা বিলক্ষণ জানেন। কিন্তু স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী যেখানে বলেছেন যে এই হাসপাতাল চালু হবে না, সেখানে অন্য কেউ কি করে তা চালুর উদ্যোগ নেয় বলুন দেখি। তাই তো গোবরডাঙা পুরসভা সম্প্রতি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে মিলে পাশেই থাকা শিশু হাসপাতালে কিঞ্চিৎ পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছেন। ভাবুন এলাকায় অতটা জায়গা জমি নিয়ে বিশাল হাসপাতাল থাকা স্বত্বেও কাছেই ছোট্ট একটি শিশু হাসপাতালকে ব্যবহার করতে হচ্ছে, শুধুমাত্র মুখ্যমন্ত্রীর মুখ রক্ষা করতে। ভাবুন তাহলে। 

স্থানীয় মানুষ তখন মুখ্যমন্ত্রীকে তাদের দুর্দশার কথা জানাতে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। একটি দুটি নয় আট হাজারেরও বেশি চিঠি গিয়েছে গোবরডাঙা থেকে নবান্নে। কিন্তু আরও খারাপ বৈ লাভ কিছু হয়নি। তাই বলছিলাম মাননীয় অভিষেকবাবু এক কোটি চিঠি পাঠিয়ে খুব কিছু হবে কি? আপনারাই তো কোনও চিঠি পড়েন বলে মনে হয় না, পড়লেও তার সুফল মেলে না। তাহলে মোদিবাবুরও নিশ্চয়ই চিঠি পত্র পড়বার সময় নেই। একটা লাভ হয়তো হবে, মোবাইল চলে আসার পর তো চিঠি লেখার অভ্যেস চলে গিয়েছে, কিছু গরীব মানুষ আপনার কথায় ভুলে ফের চিঠি লেখায় মন দেবেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবে কি? সে তো আপনারাই জানেন।

(www.theoffnews.com - Gobordanga hospital)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

চারদিকে শাল পিয়াল নাম না জানা আরও কত গাছ। ঘন গড় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা পথ। সামনে পথ দেখিয়ে এগিয়ে চলেছে সুষমা, আমরা পিছনে। যাচ্ছি মর্ত্যে প্রথম যেখানে দুর্গাপুজো হয়েছিল সেই জায়গাটি দেখতে। পশ্চিম বর্ধমানের এই এলাকাটিতে না এলে বোঝাই যায় না এখানেও বাঁকুড়া পুরুলিয়া বা ঝাড়গ্রামের মতই এমন ঘন জঙ্গল আছে। গলার গামছাটাকে ওড়নার মত বুকে ফেলে সেটাকেই হাত দিয়ে পেঁচাচ্ছিল সুষমা। জিজ্ঞাসা করলাম এমন নাম কে রেখেছে? একটু লজ্জা পেয়েই জবাব দিল, মা। তার পরে অবশ্য জানা গেল মা বাবা কেউই বেঁচে নেই। সুষমার এখন তিন কুলে কেউ নেই। একাই থাকে, কত আর বয়স হবে, তিরিশের আশেপাশে। কাছেই দেউল, তার পাশেই ওর বাড়ি। বাপের জমিটা ছিল, পঞ্চায়েত ঘর করে দিয়েছে, সেখানেই থাকে সুষমা। জঙ্গলে কাঠকুটো কুড়িয়ে তা বেচে দিন চলে যায়। মাঝে মধ্যে কাছের আশ্রমে টুকটাক কাজ করে সেখান থেকে কিছু মেলে। সব মিলিয়ে দিনে রোজগার এই তিরিশ থেকে চল্লিশ টাকা মত, তবে রোজ সেটা হয় না। তবে মাস গেলে লক্ষ্মীর ভান্ডার আছে। এতেই খুব খুশি সুষমা। তাই তো আমাদের এক সঙ্গী যখন ওকে কলকাতায় নিয়ে আসার প্রস্তাব দেয়, ভাল ভাল খাবার, পোশাকের লোভ দেখায়, হেলায় তা উড়িয়ে দেয় সুষমা। ও নাকি ভালই আছে? আমরা কুড়িটা টাকা দিতে, সুষমা খুশিতে কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। নিজের চটি খুলে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করছে, আবার ধন্যবাদ জানাচ্ছে। ওর খুশি দেখেই বোধ হয় একটু ভিজে এল চোখটা, মেয়েটা এত খুশি হবে জানলে বোধহয় আর কয়েকটা টাকা বেশিই দিতাম না হয়। কুড়ি টাকাতেই এত আনন্দ! 

ঐ জঙ্গলেই কাঠ কাটছিল অভয় এবং তার পোয়াতি স্ত্রী। তাদেরও একই কথা, ভালই আছে তারা। দুটাকায় চাল মেলে, এখান পাঁচশোও মিলছে। অসুবিধা নেই। এরা সকলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেনে, তাকে সরানোর কোনও ইচ্ছেই এদের কারও নেই। এই বাংলার প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপির কোনও বড় নেতার নামই তারা কেউই জানে না। এখানেই গড়ে উঠছে পার্থক্যটা। সামনেই পঞ্চায়েত ভোট। গ্রাম বাংলা একটু ঘুরলেই বোঝা যায়, আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে বাংলার বিরোধী দলগুলির প্রস্তুতি কেমন। শহরে যখন নানান দুর্নীতি, মামলায় জেরবার শাসক দল, ডিএ না দেওয়ার কারনে ক্ষোভে ফুঁসছেন সরকারি কর্মীরা, বিভিন্ন ভাতা দেওয়ার জন্য কটাক্ষের তুবড়ি ছোটাচ্ছেন শহুরে শিক্ষিত মানুষ। এসবের আঁচ কিন্তু পড়েনি এই প্রান্তিক মানুষগুলির জীবনে। তারা তাদের নিস্তরঙ্গ অভ্যাসে কিছু সামান্য সুবিধাকেই  আঁকড়ে ধরে মমতাকেই চেনে, চেনে টিএমসিকেই। হ্যাঁ গ্রামের মানুষ কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ে টিএমসিকেই বেশি চেনেন। 

এখানেই সফল মমতা। আবেগের বশে নয়, সুদক্ষ রাজনীতিক এবং চতুর শাসক হিসেবেই তিনি একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শহুরে মানুষ যখন তাকে উপহাস করছে, তার লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, মোয়াজ্জেম ভাতা প্রভৃতি প্রকল্পকে ভিক্ষার সঙ্গে তুলনা করছে। তখন এই কাজগুলিই মমতাকে আরও কাছে এনে দিয়েছে সুষমা অভয়দের। এত দিনে বিজেপির বোধোদয় হয়েছে, তাই এখন তারা বলছে ক্ষমতায় এলে তারা পাঁচশো নয়, দুই হাজার টাকা করে দেবে। কিন্তু এতে কি ভুলবে গ্রামের সরল মানুষগুলি? তারা তো এই শাসকের প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে বিজেপিকে অনেকটাই সমর্থন জানিয়েছিলেন। লোকসভা ভোটে তাই বিজেপি উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গে গ্রামীণ এলাকায়, জঙ্গল অধ্যুসিত এলাকায় বিপুল সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু তার পরে? কেন্দ্রের বিভিন্ন গরিব বিরোধী কাজ, বাংলায় সারাক্ষণ বিজেপি নেতাদের অসংলগ্ন কথাবার্তা, প্রবল গোষ্ঠীদ্বন্দ, একটা বিরোধী দলের জন্য যা সব দিক থেকে খারাপ। মানুষের সেই ভরসার জায়গাটাতেই পৌঁছাতে পারেনি বিজেপি, বামেদের তাত্বিক, উচ্চমার্গের লড়াই এখন ইতিহাস, কংগ্রেস জীবন্ত জীবাশ্ব। নিট ফল, একাই খেলছে তৃণমূল। 

আচ্ছা একটা বলুন তো? শিক্ষক নিয়োগে কজনের চাকরি হবে? প্রাথমিক, উচ্চমাধ্যমিক সব ধরেও  মেরেকেটে পঞ্চাশ হাজার? ডিএ পাওয়া সরকারী কর্মীর সংখ্যা কত? রাজ্য সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী মিলিয়ে ছয় লক্ষের বেশি মানুষ। অর্থাৎ তথাকথিত এই সরকারি কর্মী বা শিক্ষিত মানুষদের ডিএ বা চাকরি দিলে খরচ যেমন বেশি, তেমনই মাত্র সাড়ে ছয় থেকে সাত লক্ষ পরিবার এতে উপকৃত হচ্ছে। ভোটারের হিসেব ধরলে একটি পরিবারে কমবেশি তিন থেকে চার জন (শহুরে শিক্ষিত পরিবার সাধারণত ছোটই হয়) ধরলে সেটাও তিরিশ লক্ষ পার করবে না। এদিকে শহর ও গ্রাম মিলিয়ে বিভিন্ন আর্থিক অনুদান পাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটির উপরে। এই আড়াই কোটি মানুষ সরাসরি সাহায্য পাচ্ছেন বা পেয়েছেন। তাদের পরিবার ন্যুনতম চার জন করে হলেও প্রায় দশ কোটিরও বেশি। খুব চাপ হয়ে যাচ্ছে? আচ্ছা সহজ হিসেব করা যাক, কলকাতা থেকে দূরে কোনও জেলার একটি গ্রামে সরকারী চাকুরিজীবির সংখ্যা কত হয় সাধারণত? দুই থেকে দশ জন মত, কোথাও বা তাও নেই। কিন্তু গ্রামে মহিলা কত জন থাকেন? কম পক্ষে তিনশো থেকে হাজার। এবার বোঝা গেল লক্ষ্মীর ভান্ডার কেন এত কার্যকরী। 

মমতা তার ভোটের হিসেব বুঝে নিয়েছেন। কিন্তু বিরোধীরা তা এখনও করে উঠতে পারেননি। পঞ্চায়েত ভোটে জেতার জন্য বিরোধীদের মূল এজেন্ডা কি, সেটাই তাদের কাছ থেকে এখনও স্পষ্ট করে পাওয়া যায়নি। সংবাদ মাধ্যমে দেখলাম বাংলার বিজেপির হাল ধরতে আসা মিঠুন চক্রবর্তী বীরভূমে গিয়ে স্থানীয়দের বলেছেন এই এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েতে তাদের (বিজেপি) জেতালে তিনি আবার আসবেন। আরও কিছু তারকা নিয়ে এসে গান গেয়ে, সিনেমার ডায়লগ বলে ও নেচে দেখাবেন। আচ্ছা বলুন তো মিঠুনের নাচ দেখার জন্য পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপি জিতে আসবে এমন চিন্তা করা যায়? এখনও এটাই বিজেপির অস্ত্র। শুভেন্দু একবার মমতার সঙ্গে দেখা করে তার পরের এক সপ্তাহ শুধু অজুহাত দিতেই ব্যস্ত। গ্রামের মানুষের কাছে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা, নিজেদের লক্ষ্য পৌঁছবে কে? বঙ্গ বিজেপিতে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাই সুষমা অভয়রা পঞ্চায়েত ভোট দেওয়ার জন্য কোনও বিকল্পকেই সামনে পাচ্ছেন না। একা মাঠে তাই একাই খেলে যায় টিএমসি, মাঝে মধ্যে তাই অফসাইডও হয় দেদার। কিন্তু বাঁশি দেওয়ার রেফারি কই?

(www.theoffnews.com - West Bengal Panchayat election)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

সেদিন আমার এক পরিচিত খুব গর্ব করেই বলছিলেন তার মেয়েকে তিনি ইডি বা সিবিআই অফিসারই বানাবেন। এতদিন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখলেও এখন তার মনে হচ্ছে এটাই দারুণ ব্যাপার হবে। শুনে একটু মুচকি হাসলাম দেখে বেশ রেগেই গেলেন মনে হল। গলাটা একটু চড়িয়েই বললেন “এদের কি ক্ষমতা দেখছেন? বাঘা বাঘা লোকেদের কেমন ভয় পাইয়ে দিয়েছে। আর কোনও পেশায় এমন জবরদস্ত ব্যাপার স্যাপার আছে?“ হেসে না বলতেই আশ্বস্ত হলেন। আসলে রাশি রাশি টাকা উদ্ধার হচ্ছে, আর ইডি ক্রমশ সিবিআইকে পাশ কাটিয়ে বাঙালির আলোচনায় ঢুকে পড়ছে। জেগে ঘুমানো জনগণ ফের একটা নতুন দিবাস্বপ্নের আনন্দে মশগুল হচ্ছে।   

সিবিআই আমাদের পরিচিত। কিন্তু ইডি সম্পর্কে এতটা জ্ঞান আমাদের এতদিন ছিল না, যদিও ইডি বহু বছর ধরেই কাজ করছে। ইডি মূলত অর্থ মন্ত্রকের রাজস্ব বিভাগের অধীনে কাজ করে। এটি ১৯৫৭ সালে বৈদেশিক মুদ্রা-সম্পর্কিত লঙ্ঘনের মামলাগুলি দেখার জন্য গঠিত হয়েছিল। কিন্তু ২০০২ সালে, পিএমএলএ প্রবর্তনের পর, এটি আর্থিক জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের মামলাগুলি নিতে শুরু করে, যেগুলির অধিকাংশই অপরাধমূলক প্রকৃতির। কিন্তু ইডির বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, এই সংস্থা মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের হয়ে বিরোধী দলগুলির নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যই সক্রিয়। গত কয়েক বছরে ইডির নিশানায় থাকা ব্যক্তিদের তালিকায় একটু নজর দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। পি. চিদাম্বরম হোক অথবা ডি.কে-শিবকুমারের মতো কংগ্রেস নেতা, জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির শরদ পাওয়ার এবং প্রফুল প্যাটেল হোক বা সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হোক বা ঝাড়খণ্ডের হেমন্ত সোরেন, বহু বিরোধী নেতা গত কয়েক মাসে ইডি তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। 

উল্টো দিকে তাকালেই বোঝা যাবে শাসক দলের অভিযুক্ত নেতাদের প্রতি ইডির নরম মানসিকতা।  বিরোধীরা বার বার অভিযোগ করেছে যে, বিজেপির নেতাদের এবং অন্যান্য দল থেকে যারা এনডিএ-তে যোগ দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, সারদা চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির অভিযুক্ত মুকুল রায় এবং হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি৷ মুকুল তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে চলে যান, হিমন্তও কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যোগ দেন। শুভেন্দু অধিকারীর ক্ষেত্রেও কথাটি খাটে বৈকি। এটা অবশ্য নতুন নয়। ইউপিএ সরকারের আমলেও ইডি-র বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনীতিকদের হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। জগন মোহন রেড্ডির বিরুদ্ধে একটি মানি লন্ডারিং মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছিল, যখন তার ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টি অন্ধ্র প্রদেশে কংগ্রেসের বিরোধী ছিল। সিবিআই এফআইআর-এর ভিত্তিতে ইডি তার তদন্তে বলেছিল যে ২০০৪ সালের মে থেকে, যখন তার বাবা ওয়াই.এস. রাজশেখর রেড্ডি কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, জগন বেশ কয়েকটি কোম্পানি চালু করেছিলেন যেখানে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের সুবিধাভোগীরা বিনিয়োগ করেছিলেন। পরে অবশ্য তা আর এগোয়নি। 

 গত ১৭ বছরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ফৌজদারি আইন প্রণীত হওয়ার পর থেকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ৫৪০০টিরও বেশি মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের করেছে তার মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র ২৩জনের বিরুদ্ধে দোষ সাব্যস্ত হয়েছে। অভিযানের নাটকীয় বৃদ্ধির পরেও ইডির তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার ০.৫% এর মতো। এ থেকেই বোঝা যায় ইডি অভিযান প্রচুর চালালেও অভিযুক্তদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের  সাফল্যের হার কতটা। 

ইডির থেকে অবশ্য অনেকটাই ভাল অবস্থা সিবিআইয়ের। সিবিআই ডিরেক্টরের দাবি অনুযায়ী তাদের সাফল্যের হার নাকি ৬৭% এর আশেপাশে। কিন্তু অঙ্কের মারপ্যাচ এড়িয়ে দেখা যাচ্ছে সিবিআইয়ের বিভিন্ন তদন্তে ব্যর্থতার তালিকাও বেশ লম্বা এবং  সাফল্যের হার বেশ হতাশা জনক। ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবন থেকে চুরি যায় নোবেল পদক। সিবিআই ব্যর্থ হয় নোবেল চুরির কিনারা করতে।  হাইকোর্টে এক  জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি রাকেশ তিওয়ারি সিবিআইকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, “নোবেল আমাদের জাতীয় সম্পদ। অথচ তা উদ্ধারের জন্য সে অর্থে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ এখনও নিতে পারেনি সিবিআই। কেন আপনারা কিনারা করতে পারলেন না এত বছরেও?”এছাড়াও বড় বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে সিবিআইয়ের ব্যর্থতার কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথমেই আসি ২জি কাণ্ডে। প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকার ২জি কেলেঙ্কারি কাণ্ড থেকে বেকসুর খালাস হন প্রাক্তন টেলিকম মন্ত্রী এ রাজা ও ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি। কারণ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয় সিবিআই। আদালতে বিচারকের কাছে ফের তাদের অপদার্থতার জন্য ভর্ৎসিত হন সিবিআই আধিকারিকেরা। এখানেই শেষ নয় রয়েছে আরুষি হত্যা কাণ্ড, কয়লা কেলেঙ্কারি, কর্ণাটকের বেল্লারিতে অবৈধ খনি কেলেঙ্কারি সহ একাধিক তদন্তের ব্যর্থতা। সারদা, রোজভ্যালি বা অন্যান্য চিট ফান্ড তদন্তগুলির কথাই যদি ধরি তাহলে সেখানেও তো অগ্রগতির কোনও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না, এতগুলি বছরের পরেও। 

এই যে হঠাৎ তৎপর ইডি, সিবিআই। কয়লা পাচার, গরু পাচার, শিক্ষা কেলেঙ্কারিতে ব্যপক ধরপাকড়। সারদা সহ নানা চিটফান্ড কাণ্ডে হঠাৎ ঢেউ উঠেছে, রাশি রাশি টাকা মিলছে, ডেকে পাঠানো হচ্ছে নেতা নেত্রী তাদের আত্মীয়দের। এই নাটক কিন্তু নিয়মিত নিরন্তর, আপনি আমি পুলকিত হচ্ছি, সংবাদ মাধ্যম উত্তেজিত হচ্ছে। বাস্তবে কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। আপনার সাময়িক জেগে ওঠা পুলকের মজা নিন, কিন্তু ইতিহাস বলছে এতে কোনও সাংঘাতিক পরিবর্তনের আশা না করাই ভাল। যে মামলায় কেন্দ্রের বিরোধী দলের নেতাদের ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তৎপর ইডি, সিবিআই, সেই একই মামলাতে শাসক দলের নেতারা বসে থাকেন নিশ্চিন্ত মনে। বড্ড চোখে লাগে। মাঝে মধ্যে কোনও কোনও তদন্ত কোনও একটা বিশেষ কারনে জেগে ওঠে আবার তা ঘুমিয়ে পড়ে বিশেষ কোনও কারনেই। ইডি, সিবিআই তাই সিনেমা, সিরিজেই ভাল লাগে, জোশ জাগায়। বাস্তবে নয়।

(www.theoffnews.com - ED CBI politics)

পলাশ মুখোপাধ্যায়, সিনিয়র জার্নালিস্ট, কলকাতা:

গরু পাচারকারী, গরু চোর ইত্যাদি নানান শব্দে সরগরম গোটা বাংলা। কিন্তু গরু পাচার আজকেই হচ্ছে বা এই সরকারের আমলেই হচ্ছে তা কিন্তু নয়। গরু পাচার আগেও যথেষ্ট পরিমানে হয়েছে। বাম আমলে কয়লা বা গরু পাচার ছিল অন্যতম শিল্প। সেই আমলে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, দুর্গাপুর – আসানসোল বা বীরভূম এলাকায় সাংবাদিকতার সূত্রে খুব কাছ থেকে দেখেছি এই পাচারগুলি। তখন কি পুলিশ বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ধোয়া তুলসীপাতা ছিলেন? মোটেও না। তাদের প্রত্যক্ষ মদতেই চলত সেই কারবার। পার্থক্য ছিল একটাই এতটা ছড়িয়ে ফেলেননি কেউই। তাই স্থানীয় নেতাদের কাছে টাকা পৌঁছলেও তা পরবর্তীতে দৃষ্টিকটু হয়ে ধরা দেয়নি। অর্থের বিনিময়ে সুবিধা করে দেওয়ার অভিযোগ ছিল পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধেও। কিন্তু রয়ে সয়ে। এখন শাসক দলের নেতারা যেমন ছড়িয়ে ফেলছেন তেমনটা তখন হত না। 

গরুপাচারের কথাতেই যখন শুরু হল, তখন একটা ঘটনা বলি। বছর কুড়ি আগে আমি তখন বীরভূম জেলার সাংবাদিক। জেলার উপর দিয়ে প্রতিদিন শয়ে শয়ে গরু বোঝাই লরি যেত মুর্শিদাবাদের দিকে। প্রতিটি থানাই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সেই লরি থামিয়ে টাকা তুলত নিয়ম করে। নতুন এক এস পি এসে সেই ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে দেখলেন এভাবে তো স্থানীয় থানা স্তরেই গরুপাচারের টাকা লুঠ হয়ে যাচ্ছে। তাদের কাছে কিছু পৌঁছচ্ছে না। তিনি তখন একটা চিরকুটের ব্যবস্থা করলেন। সেই চিরকুট নগদ টাকা দিয়ে কিনে নিতে হবে মাসের প্রথমেই, তা দেখালেই রাস্তায় আর গাড়ি ধরবে না কোনও থানা। চিরকুটে পুলিশের কোনও নাম চিহ্ন নেই, আছে একটা কাল্পনিক সমাজসেবা মূলক প্রতিষ্ঠানের নাম। মুশকিল হল বড় সাহেবদের রোজগার বেড়ে গেলেও স্থানীয় থানাগুলির রোজগার গেল কমে। ধীরে ধীরে জমল অসন্তোষ। ক্ষুব্ধ পুলিশের একাংশের মাধ্যমেই খবর এল আমার কাছে, এল সেই চিরকুটের কপিও। বেশ কিছুদিন নজর রাখার পর, লুকিয়ে ছবি করে, গরুপাচারের লরি চালকের বাইট নিয়ে সেই খবর করলাম আমরা। সাময়িক বন্ধ হল, পাচার। কিন্তু রেগে গেলেন সেই পুলিশ সুপার, তার অফিসে ডেকে সরাসরি হুমকি দিলেন আমায়, কাজটা নাকি ভাল করিনি। আমিও জানিয়ে দিলাম খারাপ মনে হলে বা অসত্য মনে করলে প্রেস কাউন্সিলে নালিশ করতেই পারেন। সেই সময় বীরভূমে ইটিভির একটা বড় ইভেন্ট ছিল, সেই ইভেন্টে পুলিশ দিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। পরে অবশ্য পুলিশ পাঠিয়ে ছিলেন। উল্লেখ্য তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদেরও এই ব্যাপারে আশীর্বাদ থাকলেও তারা কিন্তু গোটা ঘটনায় চুপ ছিলেন। অর্থাৎ গরু পাচার কিন্তু তখনও হত। যেমন অর্থের বিনিময়ে স্কুলে চাকরি নিয়ে হইচই চার দিকে। আগে যখন স্কুল সার্ভিস কমিশন ছিল না, তখন কি টাকা ছাড়া চাকরি হত? স্কুল কমিটিগুলি তখনও তাদের পেটোয়া লোক ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিতই না, নিলেও টাকার বিনিময়েই তা নেওয়া হত। স্কুল সার্ভিস কমিশন হওয়ার পরেও কিন্তু টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ওই যে বললাম, সুশৃঙ্খল ভাবে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই এই বেনিয়মের কাজগুলি করা হত, এভাবে ছড়িয়ে ফেলে নয়। 

অনুব্রত মণ্ডলকে আমি চিনি প্রায় বছর কুড়ি আগে থেকে। একটু ভুল বললাম আমি চিনতাম কেষ্ট বা কেষ্টাকে, অনুব্রত যে ওর ভাল নাম সেটা জানলাম অনেক পরে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর। বাম আমলে সেই সময় কেষ্টদা তৃণমূল কর্মী হলেও তার বাইট নেওয়ার পরিস্থিতি তখনও আসেনি। বীরভূম বাম দূর্গ হলেও সেই সময় জেলার পুরসভাগুলির সব কটাই ছিল তৃণমূল অথবা কংগ্রেসের দখলে। তৃণমূলের নেতা বলতে তখন রামপুরহাটের আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ই পরিচিত ছিলেন। একদিন হয়েছে কি, কোনও একটা কাজে বিশ্বভারতীতে গিয়েছি। বিকেল সাড়ে তিনটে চারটে বাজে। কি মনে হল হঠাৎই বোলপুর পুরসভায় ঢুঁ দিলাম। তৃণমূল পরিচালিত ওই পুরসভায় তখন চেয়ারম্যান চন্দ্রনাথ সিংহ, যিনি বর্তমানে মন্ত্রী। হঠাৎ গিয়ে দেখি চেয়ারম্যানের ঘরে বসে চন্দ্রনাথদা সহ কয়েকজন মুড়ি সিঙ্গাড়া সহযোগে বেজায় আড্ডা চলছে। সেই আড্ডায় রয়েছেন কেষ্টদাও। আমি হঠাৎ যেতেই শশব্যস্ত সকলে। কি ব্যাপার, সিউড়ী থেকে আমি চলে এসেছি, গুরুত্বপূর্ণ কিছু আছে কিনা তা নিয়ে খুবই চিন্তায় সকলে। অভয় দিয়ে বসতেই চা সিঙ্গাড়ার অফার। খানিক গল্পগুজব করে চলে আসার পর শুনেছিলাম আমার বোলপুরের তৎকালীন সহকর্মী সুজিতকে কেষ্টদা নাকি অনুযোগ করে বলেছিলেন “পলাশদা হঠাৎ চলে এলেন, তুমি একটা ফোন তো করবে আমাদের। এই আড্ডা দেখে উনি কি ভাবলেন বল তো?” হ্যা তখন পলাশদাই বলতেন। এখন যেমন শুনেছি কেষ্টদা স্থানীয় সব সাংবাদিককেই নাম ধরে তো ডাকেনই, তুই করেই বলেন। ২০০৬ সালে আমি বীরভূম ছেড়ে আসার পর একবারই কেষ্টদার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সেও বছর পনেরো আগে, সামান্য সৌজন্য মূলক কথাবার্তা হয়েছিল। তারপরে আর দেখা বা কথাবার্তা হয়নি। তবে কেষ্টদার এই বেড়ে ওঠার পিছনে তার নিজের প্রতিভা ক্ষমতা কতটা আছে আমি ভাল জানি না কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়েছে সংবাদ মাধ্যম তাকে অনেক বেশি বিখ্যাত হতে সাহায্য করেছে। তার অদ্ভুত কথাগুলি বার বার প্রচার করা, তাকে নিয়ে নানা ধরনের মিথ ছড়িয়ে দেওয়া, তাকে দারুণ সংগঠক হিসেবে তুলে ধরা, অনেকটাই মিডিয়ার দান, যেমনটা করা হয়েছিল মুকুল রায়কে নিয়েও। মুকুল নাকি চাণক্য, তিনিই সব জয়ের কারিগর ইত্যাদি ইত্যাদি। তেমন বীরভূমেও যে কোনও নির্বাচনে তৃণমূল ভাল ফল করলেই গোটা কৃতিত্ব কেষ্টকে দিয়ে ফলাও প্রচার মিডিয়ার একটা পছন্দের বিষয়। এখনকার মিডিয়া মশলা খোঁজে, খবর রান্নায় যা কাজে লাগবে। কেষ্টদা নিয়মিত সে মশলা সাপ্লাই দিয়ে গিয়েছেন। এখনও দিচ্ছেন। তৃণমূলের আর কোনও জেলা সভাপতির ভাগ্য এমন সুপ্রসন্ন নয়, বলা ভাল বহু মন্ত্রীরও এমন ক্যারিশমা নেই। 

বার বার গরু পাচারের কথা বলা হচ্ছে। বীরভূমে শুধু কি গরুপাচারের টাকাই ওড়ে? পাথর বা বালি কি কিছু কম আছে? জেলার পশ্চিম অংশ জুড়ে ঝাড়খণ্ড সীমানা বরাবর মাইলের পর মাইল জুড়ে পাথরের খাদান। হাজার হাজার লরি সেই পাথর নিয়ে প্রতিদিন চলে যাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। লরি পিছু মোটা টাকা কে বা কারা নেয় সেটা জানেন জেলার অধিকাংশ মানুষই। একই ভাবে ময়ুরাক্ষী, অজয়, দ্বারকা, বৈধরা থেকে লরির পর লরি বালি উঠছে ফি দিন, কাদের মদতে? সেটাও জানেন সকলেই। তাই শুধু গরু পাচার থেকেই এই বিপুল সম্পদের অধিকারী তা ভাবলে চলবে না। 

বর্ধমানকে আগে ধনী জেলা বলা হত। ধান বা চালের বৈধ টাকা তো ছিলই, সঙ্গে ছিল কয়লা এবং লোহা পাচারের কালো টাকাও। কিন্তু এখন টাকা ওড়ে বীরভূমে। পাশের জেলার আর্থিক বাড়বাড়ন্তে খানিক ফিকে বর্ধমান। বছর দশেকের মধ্যে জেলায় পাথরের ডাম্পারের পরিমান কয়েকশো গুণ বেড়েছে। ওভার লোডেড সেই ডাম্পারের চাপে বীরভূমের রাস্তাঘাটের হাল খারাপ বারো মাস। এখন তো আবার বীরভূমেও কয়লা খনি মিলেছে। এবার তার টাকাও যোগ হবে। তাই রয়ে সয়ে খেতে হবে। বাম নেতাদের দেখে শিখলেও, ছাত্র হিসেবে তৃণমূল মোটেই ভাল নয়। তাই পরীক্ষায় ঠিকঠাক নকল করতে না পারায় বার বার ধরা পড়ে ল্যাজে গোবরে অবস্থা তৃণমূল নেতাদের। 

আর একটা কথা না লিখলে এই লেখাটা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। ইডি, সিবিআই আয় বহির্ভুত সম্পত্তি নিয়ে হানা দিচ্ছেন বীরভূমে নানা নেতা বা নেতা ঘনিষ্টদের বাড়ি। কিন্তু যাদের মাধ্যমে আপনি আমি এই ঘটনার কথা জানতে পারছি সেই সাংবাদিকদের একাংশও নাকি আতস কাচের তলায় বলে শুনেছি। কারন সামান্য বেতনের কয়েক জন সাংবাদিকের বিলাসবহুল সুবিশাল বাড়ি, দামী গাড়ি, একাধিক স্থাবর সম্পত্তি, উচ্চমানের জীবন যাপন নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তাদের এই জীবনযাত্রার মান মাত্র বছর দশেকের মধ্যেই এক লাফে মাটি থেকে আইফেল টাওয়ারে পৌঁছেছে কিভাবে সেটাও বেশ আলোচনার বিষয় সাধারণ মানুষের মধ্যে। সব মিলিয়ে সংস্কৃতির ঐতিহ্যে গর্বিত বীরভূম এখন অর্থের আভিজাত্যে উজ্জ্বল সব দিক থেকেই।

(www.theoffnews.com - cow Anubrata Mondal)