তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

দেবদাসী প্রথা ভক্তির আড়ালে পতিতাবৃত্তি বলতে মনে করা হয় যে এই দেবদাসী প্রথা 600 খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল। এই প্রথায় নব যুবতী কুমারী মেয়েদের ধর্মের কারনে দেবতার সাথে বিয়ে দিয়ে মন্দিরে দান করে দেওয়া হতো। ... দেবতার সাথে বিয়ে দেওয়া এই প্রকার মহিলাগণকেই দেবদাসী বলা হতো। দেবদাসী গণ মন্দিরের দেখাশোনা, পূজার সামগ্রী জোগাড় তথা মন্দিরে নৃত্য, গীত পরিবেশন করতো। এই প্রথায় নব যুবতী কুমারী মেয়েদের ধর্মের কারনে দেবতার সাথে বিয়ে দিয়ে মন্দিরে দান করে দেওয়া হতো। কিন্তু কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এই প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রায় 300 খ্রী: পূ: রচিত, এর থেকে প্রমাণ হয় দেবদাসী প্রথা এর অনেক আগে থেকেই ছিল। মনে করা হয় গৌতম বুদ্ধের সময় থেকেই এই প্রথা শুরু হয়েছিল। কিন্তু গুপ্ত আমলে ভারতবর্ষে সর্বাধিক দেবদাসী দেখা যায়।

মহাকবি কালীদাস রচিত মেঘদূতম্ কাব্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মনে করা হয় যে দেবদাসী প্রথা চরম ব্যভিচারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মন্দিরের পুরোহিত ও বিশেষ অতিথিগণ দেবদাসীদের শারীরিক শোষণ করতো বলে মনে করা হয়। কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক এই ব্যভিচারের মতবাদকে অস্বীকার করেন। প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে দেবদাসী সাত প্রকারের ছিল।

১/দত্তা - যে মন্দিরে ভক্তিভাবের কারনে স্বেচ্ছায় দেবতার সেবায় নিজেকে অর্পণ করতো তাদের দত্তা বলা হতো। এদেরকে দেবীর মর্যাদা দেওয়া হতো।

২/বীকৃতা - যে অর্থের পরিবর্তে নিজেকে বিক্রি করে দিত। এরা মন্দির পরিষ্কারের কাজ করতো।

৩/ভৃত্যা - যে পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য মন্দিরে নৃত্য, গীত পরিবেশন করতো।

৪/ভক্তা - এরা নিজের বাড়িতেই থাকতো মন্দিরে কাজের উদ্দেশ্যে যেত।

৫/হৃতা - রাজরাজারা এদেরকে অন্য রাজ্য থেকে হরণ করে মন্দিরে দান করে দিত। এরা প্রকৃত পক্ষেই দাসী ছিলো।

৬/অলংকারা - রাজরাজাগণ সর্বগুন সম্পন্ন যেসব নারীগণকে মন্দিরে উপহার দিত তাদের অলংকারা বলা হতো।

৭/নগরী - বিধবা এবং আশ্রয়হীন মহিলারা আশ্রয়ের জন্য মন্দিরে নিজেকে অর্পণ করতো। এদেরকে নগরী বলা হতো।

দেবদাসীর অর্থ মন্দিরের সেবিকা, বর্ধিত অর্থে মন্দিরাঙ্গনের বারাঙ্গনা, দেহোপজীবিনী বা গণিকা। এই রীতি আসলে "ভক্তিমূলক পতিতাবৃত্তি" (Sacred prostitution)-র পর্যায়ে পড়ে। ভক্তিমূলক পতিতাবৃত্তি হচ্ছে এক ধরনের সামাজিক রীতি যেখানে একজন মানুষ যৌন সঙ্গম করে নিজ পতি বা পত্নী ব্যতীত অন্য কারও সাথে পবিত্র বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে। এ ধরনের কাজে যে ব্যক্তি জড়িত থাকেন তাকে বলে দেবদাসী বা ধর্মীয় পতিতা। দেবদাসীরা ঈশ্বরের সেবিকা। তাদের অতীতে বলা হতো "কলাবন্তী" বা যারা শিল্পকর্মে পারদর্শিনী। অভিজাত শ্রেণি তাদেরকে মন্দির রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত করত। তাদের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল মন্দির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, প্রদীপে তেল ঢালা, পূজামন্ডপে ও ধর্মীয় শোভাযাত্রায় গান-নৃত্য করা এবং পূজার সময় প্রতিমাকে বাতাস দেওয়া। অবশ্য এইসবেরও মধ্যে ছিল, পুরোহিতদের শয্যাসঙ্গিনী, যৌন লালসার শিকার হওয়া। গরিব ঘরের মা-বাবা তাঁদের কুমারী মেয়েকে রজস্বলা হবার আগেই নিয়ে আসে মন্দিরে৷ প্রথমে কুমারী মেয়েদের নিলাম করা হয়৷ তারপর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত উৎসর্গ করার নামে বিগ্রহের সঙ্গে কুমারী মেয়েদের তথাকথিত বিয়ে দিয়ে দেন৷ 

তবে, প্রচলিত অর্থে "পতিতা" বলতে যা বোঝায়, এরা কিন্তু তা ছিল না। কারণ 'পতিতা' শব্দের অভিধানিক অর্থ 'অর্থের বিনিময়ে যে দেহদান ব্যবসায় লিপ্ত '। এরা পতিতা নয় তিনটি যুক্তিতে- প্রথমত, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা অর্থের বিনিময়ে মন্দিরে দেহদান করত না। দ্বিতীয়ত, এরা সামাজিক বিধান মেনেই মন্দিরে সমবেত হত এবং সর্বোপরি, মন্দির থেকে দেহদান করে বেরিয়ে এসে নির্বিবাদে সমাজে মিশে যেত ও কারও স্ত্রী, কারও মা হয়ে সুখে জীবন অতিবাহিত করত।

শুধু ভারতেই নয়, এর শুরুটা বেশ পুরানো। প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মকে উপজীব্য করে গড়ে তোলা হয় এ প্রথা। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ানরা ধর্মীয় যৌনতার কোনো সু্যোগই হাতছাড়া করতো না। এই প্রাচীনতম প্রথার তিনটি প্রকারভেদ লক্ষ্য করা গেছে। প্রথম ক্ষেত্রে, যৌবনোদ্গমের পর কুমারী অবস্থায় তাদের মন্দিরে যেতে হত আদিরসের প্রথম পাঠ নিতে, মাত্র এক রাতের জন্য। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, তাদের মন্দির চত্বরে বেশ কিছুদিন যৌনজীবনের আদি পাঠ নিয়ে অভ্যস্ত হতে হত, স্থানভেদে কোথাও কয়েক সপ্তাহ, কোথাও বা কয়েক মাস। দুটি ক্ষেত্রেই মন্দির থেকে ফিরে তারা বিবাহ করত। সমাজে কারোর কোন আপত্তি থাকত না। তৃতীয় ক্ষেত্রে, কুমারী মন্দিরে যেত ঠিকই কিন্তু আর ফিরে আসতো না, সারাজীবনের জন্য তারা দেবদাসী হয়ে যেত।

প্রথম প্রথাটির প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া যায় হেরোডোটাস-এর বর্ণনায়। ব্যাবিলনের মাইলিট্টা-র মন্দির প্রসঙ্গে ইতিহাসকার লিপিবদ্ধ করেছেন, ব্যাবিলনীয়দের মধ্যে একটা লজ্জাকর প্রথা আছে। ব্যাবিলনের প্রতিটি রমণীকে জীবনে একবার অন্তত মন্দিরে উপস্থিত হতে হবে এবং মন্দিরের অলিন্দে সার দিয়ে বসতে হবে। অজানা অচেনা পুরুষদল ওই অলিন্দ দিয়ে পদচারণা করবার অবকাশে রমণীদের ভিতর এক একজনকে পছন্দ করে তার কোলে একটি রৌপ্যমুদ্রা ফেলে দেবে। কে দিল, তা ফিরে দেখবার অধিকার মেয়েটির নেই। যে তাকে পছন্দ করল তার হাত ধরে মেয়েটিকে চলে যেতে হবে মন্দির চত্বরের বাইরে নিভৃত নিকুঞ্জে। সেখানে সেই অপরিচিতকে সন্তষ্ট করার মাধ্যমেই মেয়েটি রতিদেবীর প্রাপ্য অর্ঘ্য মিটিয়ে দেবে৷ তারপর সে ফিরে যাবে নিজের সংসারে সংসার ধর্ম করতে। ওই প্রথম রাতের পর আর কোনভাবেই মেয়েটিকে সতীত্ব থেকে টলানো যাবে না। তবে, হেরোডোটাস কিন্তু খোলাখুলি বলেননি, ব্যাবিলনের রমণীরা কি কুমারী অবস্থায় মন্দিরে আসত নাকি জীবনের যে কোন পর্যায়ে আসত। (ক্রমশঃ)

(www.theoffnews.com - prostitution)

Share To:

THE OFFNEWS

Post A Comment:

0 comments so far,add yours