শেখ ফরিদ, প্রগতিশীল লেখক, বাংলাদেশ:

পড়ুয়াদের সংখ্যা কমে গেছে কি না তা বিতর্কের বিষয়। লেখকের সংখ্যাও দিনে দিনে কি কমে যাচ্ছে? তা আমি বলতে পারবো না। প্রকাশকদের এ প্রশ্নটা করা যেতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত যে, সমালোচকের সংখ্যা কমে গেছে। যদিও সমাজে পরশ্রীকাতরতা, মিথ্যাবাদীতা, দুর্নাম, ইতিহাস বিকৃতি হু হু করে বাড়ছে। সমালোচনা একটি শিল্পকলা ও বিজ্ঞান। পরশ্রীকাতরতা, মিথ্যাবাদীতা, দুর্নাম, ইতিহাস বিকৃতি এসব নৈতিকতা বিরোধী এবং ফৌজদারী অপরাধ। দুর্নাম ও ইতিহাস বিকৃতির জন্য কাউকে বই পড়তে হয় না। মনে যা আসে একটু রং মেখে বলে দিতে পারলেই হলো। আর যদি কিছু তৈল মর্দনকারী ও অন্ধ ভক্ত থাকে। তাহলে তো সোনায় সোহাগা। তারা সেই ঢোল পেটাতে থাকবে হৈ হৈ করে। সমালোচনা করতে চাইলে বা একজন সমালোচক হতে চাইলে, প্রচুর পড়তে হয়, জানতে হয়। শিখতে হয়। এবং সেই সাথে বাকস্বাধীনতায়ও বিশ্বাসী হতে হয়। দুর্নামকারী ইতিহাস বিকৃতিকারীরা বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয় না। হতে পারেও না। কেননা, বাকস্বাধীনতা থাকলে মিথ্যুক ও ইতিহাস বিকৃতিকারীরা পরজিত হবে। তারা তা জানে। মিথ্যুক ও ইতিহাস বিকৃতিকারীরা যখন একজন সমালোচককে ঠেকাতে না পারে, তখন তারা 'স্পেশাল' আইনের আশ্রয় নেয়। তাতেও হেরে গেলে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। যা, যে কোন রাষ্ট্রের আইনের মারপ্যাঁচ থেকে শতভাগ বেশি বিপদজনক। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানবাধিকার, শিল্পকলা ও বিজ্ঞান, বিশ্বাসের মুখোমুখি দাঁড়ালে, আদালত আইন তো দুরের কথা সংবিধানকেও নিষ্ক্রিয় করে রাখে! যা মানুষ ও মানবতার জন্য বিপদজনক। আজ বাংলাদেশে বিশ্বাস ও সংবিধান মুখোমুখি। আমি নিশ্চিত সংবিধান স্থবির থাকবে, বিশ্বাস জয়ী হবে। গত কয়েক দশকে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা ভয়বহ রকমের বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। সত্য বলতে, বিশ্বাসী করে গড়ে তোলা হয়েছে। বিশ্বাস মানুষকে সৎ করে না, সভ্য তো করেই না। বিশ্বাস একটি ভয়ংকর রোগ। এ রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ নিজের সন্তানকে বলি দিয়ে দেয়, মাকেও খুন করতে পারে! যে কোন সাম্প্রদায়িক বিশ্বাসে বিশ্বাসীরা সংবিধানে অবিশ্বাসী। আর যা কিছু কেউ বিশ্বাস করে না, তাতে কারো শ্রদ্ধা থাকার কথা নয়। অথচ সংবিধান ব্যতীত কোন রাষ্ট্র চলতেই পারে না। 

সমালোচকদের সংখ্যা কমে গেছে ভয়ে। কিসের ভয়? কেবল ব্যবসা, চাকুরী হারানোর ভয়? বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী হারানোর ভয়? জেলের ঘানি টানার ভয়? এ সব তো রয়েছেই। সাথে রয়েছে প্রাণ হারানোর ভয়। রাষ্ট্র সংবিধান দিয়ে চলে। সংবিধান যখন তার নিজস্ব গতি হারায় তখন কেবল একজন সমালোচকের জীবনই ঝুঁকিতে পারে না। সকল নাগরিকেরই জন্যই জীবন ঝুঁকিপুর্ন হয়ে উঠতে পারে। বিজয়ের ৫০বর্ষ পরেও এ বোধ আমাদের তৈরী হয়নি। সত্য আরো নির্মম, তৈরী হতে দেয়নি। এ দায় সকল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, এ দায় রাষ্ট্রের।  বুদ্ধিজীবীরাও এ দায় থেকে মুক্ত নন। এ জাতির 'কপাল' খারাপ, খুবই খারাপ। কারন হাতে গোনা দু চারজন ছাড়া সকলেই দলদাস! এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা বিদ্যান তাতে সন্দেহ নেই। তবে তারা ভীতু, ধূর্ত ও সুবিধাবাদী। তারা সব সময় সরকার ও বিরোধী দলীয় বৃত্তে বন্দি থাকেন। দলীয় বৃত্তে আবদ্ধ থাকলে আমজনতা আর বুদ্ধিজীবীর মধ্যে কি কোন পার্থক্য থাকে! থাকে না। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে যে সকল বুদ্ধিজীবীরা কোন দল ও সরকারের ভুল ও অন্যায়ের সমালোচনা করতে সাহস পায় না, তারা সমাজ থেকে কুসংস্কার অপবিজ্ঞান, অবিশ্বাস, কুপ্রথা উচ্ছেদ করবেন কি ভাবে? যে কোন রাষ্ট্রের সরকার, বিরোধীদল তো চাইবে জনগন অসচেতন থাকুক। কেন না, যে দেশে জনগন যত বেশি অসচেতন সরকার ও বিরোধীদলের সুবিধা তত বেশি। তাহলে দলীয় ফোরাম ও সংসদে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় না। 

বাংলাদেশের একজন বিরোধী দলীয় বুদ্ধিজীবীকে বলতে শুনেছি, বাংলাদেশে এ সময় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য নাকি ভারত দায়ী! আওয়ামী সরকারের বিরোধিতা করে করে হয়তো তিনি ক্লান্ত। তাই এবার সরাসরি ভারতকেই দায়ী করলেন। এক ঢিলে তিনি দুই পাখি মারার চেষ্টা করলেন। যেহেতু তার দলের প্রধান 'অস্ত্র' ভারত বিরোধীতা। তাই ভারত ও  আওয়ামী লীগের সমালোচনার কাজ এক বাক্য সেরে দিলেন। যাক, এটা অন্তত জ্বালাও পোড়াও থেকে ভালো। 

আরেকজন বুদ্ধিজীবী সলিমুল্লাহ্ খান, অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস এর সঞ্চালনায়  দীপ্তটিভির এক টক শোতে বলেছেন, তার মাদরাসায় পড়ার 'সৌভাগ্য' হয়নি! ভাগ্যিস বলেননি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে 'পাপ' করেছেন। এবং ইহুদি খৃস্টানের দেশ থেকে উচ্চডিগ্রী নিয়ে করেছেন 'মহাপাপ'! সম্ভবত তিনি সাইদী, আব্বাসী ও আজাহারি গংদের ওয়াজের শ্রোতা, ফেসবুক ফলোয়ার এবং  মুরিদদের সংখ্যা দেখে আফসোস করছেন। হয়তো ভাবছেন, আহা কেন ভারতের দেওবন্দ  ও মিশরের আল আজাহার থেকে দু একটা  ডিগ্রী হাসিল করলাম না! তিনি হয়তো ভুলে গেছেন, এখনো তার যতটুকু গ্রহনযোগ্যতা অবশিষ্ট রয়েছে তা ঐ আধুনিক শিক্ষার কারনেই। সলিমুল্লাহ খানের মত 'মার্কসবাদীর' এমন অধঃপতনে আমি বিস্মিত হইনি। শুনেছি, আহাম্মদ ছফার সংস্পর্শে আসলে নাকি সমাজতন্ত্রীদের চেতনায় ভেজাল ঢুকে যায়। এখন তা বিশ্বাস করলাম। আরো বিশ্বাস করতে চাই, তিনি তার সন্তান, নাতি-নাতনী ও আত্মীয় স্বজনকে মাদরাসায় পড়ালেখা করিয়ে 'ভাগ্যবান' করবেন। এমন হতভাগা বুদ্ধিজীবীর দেশ আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশ!   

(www.theoffnews.com - Bangladesh intellectual)

Share To:

THE OFFNEWS

Post A Comment:

0 comments so far,add yours