গৌতম দাস, অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার, রাজ্য আবগারি দফতর ও লেখক, কলকাতা:

প্রাচীন ভারতবর্ষে আর্যদের আগে কি কোনো সভ্য জাতির বসবাস ছিল না! এমটা অবশ্যই নয়, এবং ভাবার ও প্রয়োজন নেই! যাযাবর আর্যদের এই ভূখণ্ডে আসার অনেক আগে থেকেই এখানে সভ্য মানুষের বসবাস ছিল, তারা হয়তো বড়ো বড়ো অনেক সভ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি কিন্তু সিন্দুসভ্যতার সময়কালে তারা ছিল এই ভূখণ্ডে।  দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী ই প্রথমে সিন্ধু নদীর তীরে বসবাস করতে শুরু করেছিল, পরে আর্যদের তিব্র প্রভাবে এবং আক্রমণে তাঁরা ধীরে ধীরে দুরে অর্থাৎ দক্ষিণের দিকে সরে যেতে থাকে, বিন্দ্য পর্বতের অপর পারে নর্মদা আর কাবেরী নদীর তীরে তাদের সভ্যতা আবার নতুন করে গড়ে তোলে, যা পরে দক্ষিণাবর্ত নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর অন্য দিকে সমগ্র উত্তর আর্যদের অধিকারে চলে যায়, সুদূর পারস্য দেশ থেকে শুরু করে অরুণাচল মণিপুর ইত্যাদি পূর্বের পার্বত্য রাজ্য ও উত্তরে হেমালবর্ত আর দক্ষিণে বিন্দ্য পর্বতের আগে পর্যন্ত স্থাপিত হয়ে যায় আর্যাবর্ত। এবার একটু আর্যদের আগমন ও পরে ভারতবর্ষের প্রাচীন ধর্মাচরণ ও অনার্য-দ্রাবিড় আদি দেবতা শিব নিয়ে আলোচনা করবো।                             
একদল মানুষ আনুমানিক এক লক্ষ পঁচিশ হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে কোনো এক অজানা কারণে বেরিয়ে ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তারপর পঁচাত্তর হাজার বছর আগে এই জনগোষ্ঠীরই একটি দল বিচ্ছিন্ন হয়ে আরব উপদ্বীপে পৌঁছায়, তার ষাট হাজার বছরের ভিতরে এরাই আবার এশিয়া সংলগ্ন ইউরোপ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে, পরবর্তী চল্লিশ হাজার বছরের ভিতরে এরা ইউরোপের রাইন নদী থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।  খ্রিষ্টপূর্ব পঁয়ত্রিশ হাজার বৎসরের দিকে এদের একটি দল দানিয়ুব নদীর তীরবর্তী বিশাল তৃণভূমি অঞ্চলে চলে এসে বসবাস করা শুরু করে।  সে সময়ে এদের মূল পেশা ছিল মুলত পশুপালন, কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আন্তঃগোষ্ঠী-দ্বন্দ্বের সূত্রে এদের একটি দল শেষপর্যন্ত এই অঞ্চল ত্যাগ করে, দার্দেনেলিশ প্রণালী হয়ে এশিয়া মাইনরে প্রবেশ করে, খ্রিষ্টপূর্ব পঁচিশ হাজার বছরের দিকে এরা ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস নদী পার হয়ে মধ্য এশিয়ার বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, পরে এদেরই একটি দল চলে যায় ইউরোপের দিকে, অপর দলটি চলে আসে ইরানের দিকে। মনে হতেই পারে এতো দীর্ঘ ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করার হঠাৎ প্রয়োজন কি!  কিম্বা এরপর মনে হতে পারে এক যাযাবর জাতির কষ্টকর অভিযানের ইতিহাস !  হ্যাঁ এ তো আমাদের প্রাচীন ইতিহাস,  নিজেদের ইতিহাস জানতে আরও একবার প্রয়োজনে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যেতেই পারে!  ঠিকই, আর্যদের ইতিহাস অবশ্যই সুপ্রাচীন আর দীর্ঘ, আর এই মূহুর্তে আর্যরা কিন্তু এখনও ভারত ভূখণ্ডে প্রবেশ করেনি! ভারতবর্ষ থেকে সামান্য দুরে অপেক্ষায় যাযাবর আর্যরা!   খ্রিষ্টপূর্ব 1800 অব্দের দিকে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসীরা আস্তে আস্তে ভারতে প্রবেশ করে বসবাস শুরু করতে শুরু করে, এদের মধ্যে ইরানে যারা থেকে গিয়েছিল তাদেরকে বলা হয় ইন্দো-ইরানীয়, আর যারা ভারতে প্রবেশ করেছিল তাদেরকে বলা হয় 'আর্য' অর্থাৎ যাদের মনে করা হয় সনাতন হিন্দুদের পূর্বসূরি!  এই আর্যদের ছোটো ছোটো দলে ভারতে প্রবেশের প্রক্রিয়াটি ছিল কিন্তু বেশ দীর্ঘ, প্রায় 1800 থেকে 1500 অব্দ পর্যন্ত চলেছিল এই অনুপ্রবেশ হ্যাঁ ঠিকঠাকই পড়েছেন 'অনুপ্রবেশ' !  এই Migration এর সপক্ষে বহু যুক্তি আছে, যেমন আর্যদের রচিত ঋগবেদের ভাষার সাথে জেন্দভেস্তা ভাষার অদ্ভুদ মিল খুঁজে পাওয়া যায়, ধারণা করা হয়, ইরানের প্রাচীন ভাষা এবং আর্যদের ভাষা হয়তো একই ছিল, তারপর হাজার হাজার বছর অতিক্রম করে উভয় ভাষাই নিজের স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছিল একটা সময়ে, এছাড়াও উল্খেযোগ্য যে উভয় ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত দেব-দেবীদের মধ্যেও অনেক মিল আছে, জেন্দভেস্তায় বরুণ দেবকে দেবরাজ আর ইন্দ্রদেবকে মন্দ দেবতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু ঋগবেদে বরুণ দেবকে জল ও মেঘের দেবতা আর ইন্দ্র-দেবকেই দেবরাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ কেউ এমনও বলেছেনে যে কশ্যপ মুণির নামানুসারেই হয়তো কাস্পিয়ান হ্রদের নামকরণ করা হয়েছিল, কয়েকজন পশ্চিমা নৃবিজ্ঞানিও এই মতবাদকে সমর্থন করেছেন।  এই মতবাদকে আউট অব ইন্ডিয়া (Out of India) হিসাবে অভিহিত করা হয়।
এই আর্যরা এসে প্রথমে ভারতের সিন্ধুনদের অববাহিকা জুড়ে বসবাসকারী স্থানীয় আদিবাসী দ্রাবিড়দের বিতাড়িত করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিল!  আর্যদের আগমনের পূর্বে বাংলা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সুবিশাল অঞ্চলে যে দ্রাবিড়ীয়রা বসবাস করতো তারা হয়তো সবাই এক এবং অবিভাজ্য জাতিগোষ্ঠী ছিলো না, সকল দ্রাবিড়ীয়দের ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জাতিগত বৈশিষ্ট্যও এক এবং অভিন্ন হয়তো ছিলো না,  কিন্তু এই সমগ্র অঞ্চলের দ্রাবিড়ীয়দের মধ্যে অঞ্চল ভেদে কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও জাতিগত বৈচিত্র অবশ্যই ছিল।  জাতিগত উৎপত্তির নিরিখে বাঙালিদের ইন্দো-আর্য বা  আর্য-দ্রাবিড়ীয়ও বলা যায়, অর্থাৎ আর্য আর দ্রাবিড়ীয়দের সংমিশ্রণ ও সংকরায়নে বাঙালী জাতিস্বত্তার উদ্ভব হয়েছে!
জাতিগত উৎপত্তির ভিত্তিতে পাঞ্জাবী, কাশ্মিরী, সিন্ধিরা আবার ইন্দো-আর্য, আবার আমরা বাঙ্গালীরাও ইন্দো-আর্য কিন্তু শারীরিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে পাঞ্জাবী, কাশ্মিরী রা অনেক লম্বা, ফর্সা, স্বাস্থ্যবান ও বলিষ্ঠ কিন্তু আমরা বাঙালিরা শারীরিক দিক দিয়ে ওদের মতো অতটা সুঠাম সবল নয়, এর থেকে একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে পাঞ্জাবী-কাশ্মিরীদের মধ্যে আর্য বৈশিষ্ট্য-পরম্পরা বেশী ও দ্রাবিড়ীয় বৈশিষ্ট্য বা পরম্পরা কম এবং বাঙালিদের মধ্যে আর্য বৈশিষ্ট্য বা পরম্পরা কম এবং দ্রাবিড়ীয় বৈশিষ্ট্য বা পরম্পরা বেশী!  আর এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণও আছে, পরে এই আলোচনায় আবার আসছি।
ঋগবেদ থেকেই জানা যায় আর্যরা প্রথমে আফগানিস্তান থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করেছিল, এই 'ঋগবেদ গ্রন্থে' যদিও যমুনা বা গঙ্গা নদীর নাম নেই! এরও সন্তোষজনক ভাবে বিশ্লষণ করেছেন গবেষকরা, ঋগ্বেদের আমলে এই আর্যরা শুধুমাত্র হিমালয় পর্বতমালা সংলগ্ন উত্তরভারতের সাথেই পরিচিত হয়েছিল আর এই কারণেই হিমালয় পর্বতের নাম পাওয়া যায় ঋগবেদে কিন্তু বিন্ধ্যপর্বতের নাম পাওয়া যায় না, এই বিচারে ধারণা করাহয়, ঋগ্বেদের আমলে বিন্ধ্যপর্বত পর্যন্ত আর্যরা পৌঁছাতে পারে নি। আবার হিংস্র জীবজন্তুর বর্ণনার মধ্যে ঋগবেদে বাঘের নামও নেই, কারণটা হয়তো পরিস্কার, ভারতবর্ষে বাঘের দেখা পাওয়া যায় মুলত ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে, সে কারণেই স্পষ্ট ধারণা করা যায়, ভারতের পূর্বাঞ্চলের বঙ্গদেশ থেকে এই আর্যরা সেই যুগে অনেকটা দূরেই ছিল।  এই সময় পাঞ্জাব অঞ্চলের সিন্ধুনদ সহ অন্যান্য নদী-তীরবর্তী অঞ্চলে আর্যরা বসতি স্থাপন করেছিল।  মনে করা হয় ঋগবেদ খ্রিষ্টপূর্ব 1200 বা 1100 অব্দের দিকে রচিত হয়, এই সূত্র থেকে বলাই যায় যে আফগানিস্তান থেকে পাঞ্জাব অঞ্চলের ভিতরেই আর্যদের বিচরণ সীমাবদ্ধ ছিল।  ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের উপর আর্যদের প্রভাব তখনো (বৈদিক যুগে) তেমন ভাবে পড়ে নি। আর্যরা পাঞ্জাব এবং তার আশেপাশের কিছু অংশে বসতি স্থাপন করেই নিজেদেরকে প্রাথমিক ভাবে সুস্থির অবস্থায় আনতে সক্ষম হয়েছিল। এই সময় এরা পাথর, ব্রোঞ্জ এবং তামার তৈরি কুঠার কোদাল ইত্যাদি ব্যবহার করতে জানতো। এই সব অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সেকালের বিশাল বনজঙ্গল পরিষ্কার করে ধীরে ধীরে গঙ্গানদীর অববাহিকা পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে গিয়েছিলো আর্যদের।  খ্রিষ্টপূর্ব 1000 অব্দের দিকে আর্যরা প্রথম লৌহের ব্যবহার শিখেছিল, কিন্তু ব্যাপকভাবে লৌহের ব্যবহার করতে পেরেছিল কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব 700 অব্দের দিকেই, এরপর থেকেই এদের অগ্রাসন দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে ক্রমশ, শক্ত এবং ধারালো অস্ত্র তৈরির জন্য এই 'লোহা' আর্য সভ্যতাকে আরও সুস্থির ও শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষম করেছিল। লোহার কুঠার ব্যবহার করে দ্রুত জঙ্গল পরিষ্কার করা, লোহার তৈরি লাঙ্গলের সাহায্য কৃষি কাজ করতে সক্ষম হওয়া আর্য সভ্যতায় গতি এনে দিয়েছিল, আর সেই কারণেই আর্যদের হাতে অনেক উদ্বৃত্ত সময় এসেছিল, সেই কারণেই সে সময়ের মুনি-ঋষিরা নানা রকম বিষয় নিয়ে ভাবতে সময় পেয়েছিল, নানান শৃষ্টি মুলক কাজ করার সময় পেয়েছিল। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব 700 অব্দের দিকে আর্য ঋষিরা রচনা করেছিলেন উপনিষদ, এই সময়কালে অনার্য গোষ্ঠীদের সাথে তাদের সর্বদা সংঘাত লেগেই থাকত, তাই অনার্য প্রাচীন ভারতীয়দের অনুপ্রবেশকারী আর্যরা নাম দিয়েছিলেন রাক্ষস বা দস্যু!!!  একসময় আর্যদের ছোটো ছোটো গোষ্ঠী এইসব অনার্য গোষ্ঠীদের গায়ের জোরে আর উন্নত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে দমন করে ধীরে ধীরে ছোটো ছোটো রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল।  পরবর্তীতে প্রায় 200 বছরে আর্যরা ক্রমান্বয়ে এই ভাবেই গাঙ্গেয় উপত্যকা ধরে পূর্ব ভারতের দিকে এগিয়ে এসেছিল। এই সময় অবধারিত ভাবে স্থানীয় ভাষার সাথে সংস্কৃত ভাষার সংমিশ্রণ ঘটে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, ফলতো স্থানীয় ভাষাগুলোও পরিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ লাভ করেছিল তারপর ধর্ম এবং সংস্কৃতিরও আদান প্রদান চলতে থাকে।   এই সময়কালেই  খ্রিষ্ট-পুর্ব 567 অব্দের দিকে গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয় নেপালের দক্ষিণাংশে, প্রাচীন ভারতবর্ষের এই রাজ্যের রাজধানী ছিল কপিলাবস্তু। গৌতম বুদ্ধ ছিলেন সেই রাজ্যের রাজপুত্র, গৌতম বুদ্ধের সূত্র ধরেই কিন্তু ভারতীয় আর্য দর্শনে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল। আর্য রাজারা বুদ্ধের দর্শনকে আন্তরিক ভাবেই গ্রহণ করেছিলেন এবং আর্য ঋষিদের ভিতরেও বৌদ্ধ দর্শনের চর্চা ছিল। মহাভারতের আদি পর্বে আমরা দেখতে পাই, রাজা দুষ্মন্ত মৃগয়ায় গিয়ে হরিণের পিছু পিছু তাড়া করতে করতে কণ্ব মুনির আশ্রমে গিয়ে পৌছোন, সেখানে তিনি বৌদ্ধ মতাবলম্বী লোকেদের ধর্ম্মালোচনা দেখতে পেয়েছিলেন, এমনই বর্ণনা মহাভারতের আদিপর্বের  70 অধ্যায়ে আমরা পাই, মহাভারতের এই অধ্যায় অনুসরণ করে বলা যায় রাজা দুষ্মন্তের পুত্র 'ভরত' (অনেকের মতে ভারত কথার উৎপত্তি যার নাম থেকে) রাজ্য লাভ করেছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব 500 থেকে 400 অব্দের ভিতরে, আর মহাভারত রচিত হয়েছিল সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব 300 অব্দের ভিতরে.... আমাদের শিকড়ের সন্ধানে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় ধরেই ফেলেছি আমাদের নিজেদের পূর্ব-পুরুষদের মনে হয়!  এবার একটু সেই বিতর্কিত বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, শিব কি আর্যদের দেবতা না অনার্য দ্রাবিড়দের দেবতা! ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে দেবধিদেব শিব বা মহাদেব, তিনি কিন্তু অন্য সব দেবতাদের থেকে একদম আলাদা, পোশাক-আসাক, স্বভাব-চরিত্র, ব্যবহার সবকিছুই একদম আলাদা! কেন এমন শিব এর বর্ণনা! এই প্রশ্ন থেকেই উত্তর খুজতে চাওয়া, শিব কি একজন অনার্য দ্রাবিড় দেবতা!
প্রাচীন ভারতে আর্যদের আগমনের অনেক আগে থেকেই এই ভূখণ্ড অনার্য দ্রাবিড়জাতি অধ্যূষিত ছিল,  যারা আর্যপূর্ব ভারতবর্ষে এক উন্নত নগরসভ্যতা ও গড়ে তুলেছিল।  2600  খ্রিস্টপূর্বের সিন্ধুসভ্যতার সমৃদ্ধ নগরগুলি অবশ্যই দ্রাবিড় জাতিরই বিস্ময়কর কীর্তি।  বিতর্ক থাকলেও মনে করা হয় যে পরবর্তীকালে ওই  নগরগুলি হয়তো যাযাবর আর্যরাই ধ্বংস করে দিয়েছিল!  কেবল উন্নত নগর নির্মাণই নয়, দ্রাবিড় জাতি ছিল ধর্মীয় চেতনা ও আধ্যাত্মিক চেতনায় সমৃদ্ধ। অনার্য দ্রাবিড়রা ছিল রহস্যপ্রবণ, মনে করা হয় তাদের সাধন মার্গ ছিল যোগ।  দেবদেবীর কল্পনাতেও তারা সূক্ষ্ম ধর্মবোধের পরিচয় দিয়েছে।  আর এই দ্রাবিড়দের প্রধান দেবতা ছিলেন শিব।   শিব হলেন অন্যতম অনার্য দ্রাবিড় দেবতা,  যে কারণে সিন্ধুসভ্যতার সঙ্গে শিব এর সর্ম্পক খূঁজে পাওয়া যায়, মোহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত একটি সীলে ত্রিমুখ, দ্বিশৃঙ্গ, যোগাসনে উপবিষ্ট ও পশুবেষ্টিত যে মূর্তিটি অঙ্কিত দেখা যায় সেটিকে পৌরাণিক শিব পশুপতির আদিরূপ হিসাবে অনুমান করা হয়।  আগেই আলোচনা করেছি যে ভারতবর্ষে আগমনের বেশ কয়েকশো বছর পরে আর্য জাতির মধ্যে ধীরে ধীরে ধর্মীয় ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছিল, তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ রচনা হয়েছিল, বেদ সব মিলিয়ে চারটি। ঋগ্বেদ, যজুরবেদ, সামবেদ এবং অর্থববেদ। পরবর্তীকালে এই বেদের সংকলন করেছিলেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস।  চারটি বেদের মধ্যে ঋগ্বেদই হল সবথেকে প্রাচীন।  ঋগ্বেদ এর রচনাকাল, আনুমানিক  খ্রিস্টপূর্ব 1200 থেকে 900 অব্দ। বেদের উল্লেখযোগ্য দেবতারা হলেন, অগ্নি, বরুণ, মিত্র, মরুৎগণ, বৃহস্পতি, পুষন, রুদ্র এবং বিষ্ণ, লক্ষ্যণীয় যে এখানে কিন্তু শিবের কোনো উল্লেখ ই নেই! বর্তমান ভারতবর্ষে এই মূহুর্তে একমাত্র বিষ্ণু ব্যতীত আর ওই দেবতাগনের মধ্যে আর কেউই এককভাবে সেভাবে কোথাও পূজিত হন না।  বিষ্ণু অবশ্যই পূজিত হন তবে তার অবতারদের মাধ্যমেই তিনি বেশি আরাধ্য!  যেমন রাম এবং কৃষ্ণ, এঁরা দুজনই কিন্তু বিষ্ণুর অবতার।  বেদে অনার্য শিব এর উল্লেখ নেই, থাকার কথাও নয়! যদিও অনেকেই বৈদিক দেবতা রুদ্রকে শিব এর সঙ্গে তুলনা করেন, এটাও যথেষ্ট বিতর্কের বিষয়, এবং সঠিক নয়!  পরে অবশ্য কালের প্রবাহে শিব আর্য দেবমন্ডলীতে নিজগুণে স্থান করে নেন।  এটা যদিও খুব সহজে হয়নি, দীর্ঘকালীন আর্য-অনার্য ধর্মীয় মতার্দশের প্রবল ঘাতপ্রতিঘাতের পরই সম্ভব
হয়েছিল।  আগেই আলোচনা করেছি আর্যরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিল পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে, এবং  উত্তর ভারতের মধ্য দিয়ে গঙ্গা নদী বয়ে গেছে,  আর্যরা ক্রমশ এই গঙ্গার তীর ঘেঁষে পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে,  এরই এক পর্যায়ে আর্যরা উত্তর ভারতের নামেও দেয়, 'আর্যাবর্ত'  অর্থাৎ আর্যদের বাসভূমি।  ভারতবর্ষে আগমনের এক হাজার বছরের মধ্যেই আর্যরা স্থানীয় অনার্য দ্রাবিড় ভাষাকে ধীরে ধীরে অপসারিত করলেও দ্রাবিড়দের ধর্মীয় চিন্তাধারা কিন্তু বাস্তববাদী আর্যদের প্রভাবিত করতে থাকে। আর্যরা উত্তর ভারতের নাম 'আর্যবর্ত' রাখলেও উত্তর ভারতের অধিকাংশ মানুষই  ছিল অনার্য দ্রাবিড়,  তাই  অবধারিত ভাবে দ্রাবিড়দের জীবনধারার মাধ্যমে আর্যরাও প্রভাবিত হতে থাকে। এই ভাবে এক মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।  যে সংস্কৃতিকে বলা হয়, আর্য-দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি।  নবাগত আর্যরা আদিবাসী অনার্যদের সবকিছু থেকে বেশিদিন দুরে সরিয়ে রাখতে পারেনি!  ক্রমে প্রচীন ভারতবর্ষে গড়ে ওঠে এই মিশ্র সংস্কৃতি, হয়তো সেটাই   সনাতন বা হিন্দুধর্ম!  এই আর্য-দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতিই সেই সময় ধর্মীয় ভাবনায় ও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল।  হয়তো সেই কারণেই ওই সময় ভারতবর্ষের অধিবাসীদের মন থেকে ধীরে ধীরে অধিকাংশ বৈদিক দেবতারা অপসৃত হতে থাকে!  তারপর একসময় ভারতবর্ষে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর কে একত্রিত করে নিয়ে এক ত্রিমূর্তি ধারণা প্রতিষ্ঠা পায়।  আর এই মহেশ্বরই হলেন অনার্য দেবতা শিব!  যিনি পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতার আসন লাভ করেন অন্তত ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারের আগে অনার্য দেবতা শিব ই ছিলেন শ্রেষ্ঠ এবং সবথেকে জনপ্রিয় উপাস্য দেবতা।   পুরাণে এবং শাস্ত্রে যে সমস্ত অদ্ভুত ও বিশেষ গুণাবলী শিব এর ওপর আরোপিত হয়েছে তা কিন্তু অন্য কোনও দেবতার ওপর আরোপিত হয়নি, দেবধিদেব শিব বা মহাদেব অন্য সব দেবতাদের থেকে তাই বড্ড আলাদা!   তবে 'ত্রিমূর্তি'  কল্পনায় শিবকে অহেতুক প্রলয়ের দেবতা বলা হয়েছে!  যেখানে ব্রহ্মা সৃষ্টির দেবতা,  বিষ্ণু জগৎ পালন করেন এবং মহেশ্বর প্রলয়ের দেবতা।  প্রলয়ের তমোগুণে শিব রুদ্রমূর্তিতে বিশ্বসংসার হরণ করেন বলে তার আরেকটি নাম 'হর'  অবশ্য  শিব এর এই ভয়ংকর বা রুদ্র রূপ অনেক শিব ভক্তরা মেনে নেননি!   আর্যরা হয়তো অনার্য দ্রাবিড় দেবতা শিবকে গ্রহন করতে অনেকটা বাধ্যই হয়েছিল বলেই এরকমটা ঘটেছে!   আবার অপর পক্ষে অনার্য দ্রাবিড়রাও বৈদিক দেবতা বিষ্ণুকে সেভাবে গ্রহন করেনি বলেই অন্যভাবে  রাম ও কৃষ্ণকে (বিষ্ণুর অবতার) গ্রহন করেছিল!
অনার্য দ্রাবিড় জাতির কাছে শিব শব্দটির অর্থ শুভ বা মঙ্গলময়, আমরা বাংলায় যে 'শুভ' বলি, তাই হয়তো উত্তর ভারতীয় উচ্চারণে 'শিব' হয়েছে!  একথা অনস্বীকার্য যে সর্বভারতীয় দেবতা হিসেবে শিব এর প্রতিষ্ঠা বা স্বীকৃতি  অবশ্যই আর্যদের ওপর অনার্যদের এক যুগান্তকারী জয়। 
চোখ বন্ধ করে শিব-এর মূর্ত্তি কল্পনা করলে যে ছবিটা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা হলো, মাথায় জটা, হাতে ত্রিশূল, পরনে পশুচামড়ার পোশাক, তবুও প্রায় নগ্ন শরীর, গলায় বিষধর সাঁপ, সারা গায়ে ছাই ভষ্ম মাখা, গলায় ও হাতে রুদ্রাক্ষের অলঙ্কার, হাতে ডমরু ও ত্রিশাল, সব মিলিয়ে একদম আলাদা!  অন্য কোনো দেবতার রুপের সঙ্গে শিব এর কোনো রকম মিল ই নেই, সোজা কথায় বলতে গেলে আদিম এক অনার্য রূপ!  এই রূপ উন্নততর আর্যদের কল্পনায় আসতে পারে না!  বরং আদিম অনার্য দ্রাবিড়দের কল্পনার নির্ভেজাল এক দেবতার রুপের বর্ণনা যেন!   আজও অনার্য দেবতা শিব ভারতবর্ষ জুড়ে রয়েছেন স্বমহিমায়। বৈদিক দেবতা রুদ্রর সঙ্গে অনেকে শিব এর তুলনা করে থাকেন যদিও সেই প্রলঙ্করী বৈদিক দেবতা রুদ্র ছিলেন গবাদি পশুর প্রাণহন্তারক যম,  অথচ অনার্য দেবতা শিবকে আমরা বলি 'পশুপতি' , অর্থাৎ পশুদের পালন করেন যিনি।  তাই  যুদ্ধংদেহী আর্যদের দেবতা রুদ্র আর তুলনায় শান্তিপ্রিয় অনার্যদের হৃদয়ের দেবতা শিব এক হতে পারে না!   দেবতা শিব এর প্রথম উল্লেখ পাই আমরা রামায়ণে খ্রিস্টপূর্ব 600 থেকে 300 এর মধ্যে, এরপর মহাভারতে এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও দেবতা শিব এর উল্লেখ পাওয়া যায়।  এই দেবতা শিব কে কেন্দ্র করে যে ধর্মটি গড়ে উঠেছে  তার নাম শৈব ধর্ম,  যা অত্যন্ত প্রাচীন একটি ধর্ম এবং একেশ্বরবাদী এবং ভক্তিবাদী,  বর্তমানে এই ধর্ম অনেকটাই বিলুপ্তির পথে!  এই ধর্মটির ব্যবহারিক দিক হল চর্যা, ক্রিয়া, যোগ ও জ্ঞান, আর শৈবধর্মের মূলভিত্তি ই হল কপিল প্রবর্তিত সাংখ্য দর্শন, এটি একটি সম্পূর্ণ অনার্য দর্শন, যদিও বৈদিক বেদান্তের দ্বৈতবাদী এবং অদ্বৈতবাদী মতও শৈবধর্মে গুরুত্ব পেয়েছে।  একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা উল্লেখ করা অবশ্যই প্রয়োজন যে শিব মূলত পূজিত হন দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী অধ্যূষিত দক্ষিণ ভারতে আর বিষ্ণু পূজিত হন আর্যঅধ্যূষিত উত্তর ভারতে যদিও সারা ভারতবর্ষে সর্বজনগ্রাহ্য চাণক্য বা কৌটিল্যের একটি উক্তিতে সর্বভারতীয় সমাজে শিব এর গুরুত্ব ফুটে উঠেছে, তিনি এক জায়গায় বলেছেন, সংসারে চারটি মাত্র সারবস্তু আছে, কাশীবাস, সাধুজনের সঙ্গলাভ, গঙ্গা জল ও শিব পূজা।  কাশী হলো শিব এর লীলাভূমি, গঙ্গা হলেন শিব এর স্ত্রী, আর ধ্যানমগ্ন শিব তো সর্বশ্রেষ্ঠ সাধু,  এরথেকে বোঝা যায় প্রাচীন ভারতবর্ষে অনার্য-দ্রাবিড় দেবতা শিব এর কি অপরিসীম মহিমা বা গুরুত্ব ছিল।  ভারতবর্ষে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট থেকে খ্রিস্টীয় ষষ্ট শতক অবধি বৌদ্ধধর্মই ছিল অধিকাংশ মানুষের প্রধান ধর্ম,  ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই এক হাজার বছরকে বৌদ্ধযুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বৌদ্ধযুগে যেমন বুদ্ধ শিব এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন এবং ওই সময়ে শিব একটু আড়ালেই চলে যান যদিও শিব একেবারে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যান নি। তারপর খ্রিস্টীয় ষষ্ট শতকের দিকে হীনযান মহাযান মতভেদ, নিরেশ্বরবাদ ও তন্ত্রের প্রাধান্য দেখা দেয় এবং শঙ্করাচার্যের বৌদ্ধবিরোধী আন্দোলনের কারণেই  মূলত বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয় সূচিত হয়,  একই সঙ্গে সূচিত হয় পৌরানিক যুগেরও,  হিন্দুদের অস্টাদশ পুরাণ কিন্তু এই পৌরানিক যুগেই লেখা হয়েছিল।  অস্টাদশ পুরাণ অবশ্যই হিন্দুধর্মের ভিত অনেক মজবুত করেছিল, আর এই প্রেক্ষাপটেই  আর্যধর্ম বা ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থান ঘটে,  যদিও এটা খুব সহজে হয়নি, এর জন্য আর্যপূর্ব  শৈব ধর্ম এবং বৌদ্ধধর্মের মধ্যে সমঝোতা করতে হয়,  এইরকম এক অস্থির অবস্থায় দেবতা শিব পুনরায় বুদ্ধের স্থান অধিকার করে নেন, বৌদ্ধধর্ম ধীরে ধীরে অপসৃত হয় ভারতবর্ষের সমাজে, হিন্দুধর্মের শক্ত ভিত রচিত হয়।  পৌরাণিক যুগে আবার একা শিব নন তিনি তাঁর পরিবারসহ হিন্দু মনে চিরস্থায়ী শ্রদ্ধার আসন লাভ করেন, অনার্য দ্রাবিড় দেবতা শিব পরিনত হন পরিপূর্ণ দেবতায়। আবার অনেক গবেষক মনে করেন মধ্যযুগে বাংলায় যখন মঙ্গলকাব্যের রচনা শুরু হল তখনই শিবের অনার্য থেকে আর্য দেবতায় উত্তরণ ঘটে !  শৈব ধর্মের প্রভাব যে সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে ছিল এবং আর্যদের আগমনের আগে থেকেই অর্থাৎ সুপ্রাচীন কাল থেকেই উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব-ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রবল ভাবে ছিল তা আমরা ধারণা করতেই পারি, এবং দক্ষিণ ভারতেও তা ছড়িয়েছিল বলে মনে করা হয়।  তবে কোনও একটি বিশেষ শৈব সম্প্রদায়ের ধর্মানুষ্ঠান রূপে শিবপূজার কথা ছেড়ে দিলেও সাধারণভাবে এই দেবতার পূজা তামিল, তেলেগু, কানাড়ী প্রভৃতি ভাষাভাষী অঞ্চলে সুপ্রাচীনকালে থেকেই প্রচলিত ছিল। কারও কারও মতে আবার দেবতা হিসেবে শিব নামটি ‘রক্তবর্ণ’ এই অর্থবাচক তামিল শব্দ ‘শিবপ্পু’ থেকে গৃহীত।  এই ধারণা যদি সত্য হয়, শিব যে একান্তই অনার্য দ্রাবিড়গণের পূজার দেবতা ছিলেন এই তথ্য  স্বীকার করিতে আর কোনও বাধা থাকে না।


Share To:

THE OFFNEWS

Post A Comment:

0 comments so far,add yours