দেবর্ষি মজুমদার, লেখক, বীরভূম:

বেআইনিভাবে পদোন্নতিতে প্রশ্নের মুখে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনা প্রকাশ‍্যে এল এক ব‍্যক্তির 2020 আরটিআই করা জবাবী নথিতে। (যার আরটিআই নং- VB/Unline RTI/083/Z020-21 dated 18.09.2020, Registratien Na.VISBH/R/2019/50015 dated 23.04.2019)   

প্রমোশন সঙ্ক্রান্ত ইউজিসির ২০১০ সালে ১ জুলাইয়ের রেগুলেশনকে কার্যত: বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক এ‍্যাসোসিয়েট প্রফেশরের পদোন্নতি ঘটানো হয় ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি, বলে সূত্রের খবর। ঐতিহ্যবাহী বিশ্বভারতীতে বিভিন্ন ইস‍্যুতে এই ধরণে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। এখন প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান উপাচার্যের বশংবদ হওয়ার কারণেই কি এই বেআইনী প্রমোশন প্রাপ্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না? অথচ একই যুক্তি খাড়া করে বর্তমান উপাচার্য অনেকের বিরুদ্ধে ব‍্যবস্থা নিয়েছেন। তাহলে এক যাত্রায় পৃথক ফল কেন?  

এব‍্যাপারে একজন প্রাক্তন উপাচার্যকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি জানি না তদানীন্তন ইন্টারন‍্যাল সিলেকশন কমিটি এই কাণ্ড ঘটিয়েছে কি না? একইভাবে স্বস্তিকা মুখোপাধ‍্যায়ের ক্ষেত্রে একই বিতর্ক ওঠে। যদিও আমার জানা নেই স্বপন কুমার ঘোষ সেই মেকদারের শিল্পী কিনা। তাঁর নাম সেরকমভাবে শুনিনি। 

স্বপন কুমার ঘোষকে এব‍্যাপারে জানতে চাওয়া হলে, তিনি বলেন, ওইটা আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি কি বলছেন। শুনেছি এই কথাটা। তবে ঠিক জানি না ওই ব‍্যাপারটা। ক‍্যাশের নিয়ম মেনেই কি আপনি প্রফেসর হয়েছেন? প্রশ্ন করতেই ফের কথা থামিয়ে তিনি বলেন, ওইগুলো ঠিক জানি না ব‍্যাপারটা। আমি সেই সময় প্রিন্সিপাল ছিলাম না। আমি জানি না। প্রতিবেদক তাঁকে বলেন, আপনার নামেই, সেজন্য  আপনার কাছে জানতে চাইছি। তখন তিনি বলেন, আমার নামে হলেও, আমি তো জানি না। আমি  ইউনিভার্সিটিকে দিয়ে দিয়েছি। ইউনিভার্সিটি বুঝবে। 

 ইউজিসির নিয়ম মোতাবেক পিএইচডি না থাকলে কোনো শিক্ষক শুধুমাত্র ক‍্যাশ বা কেরিয়ার এডভান্সমেন্ট স্কীমে পদোন্নতি হতে পারে না, অথচ  বিশ্বভারতীতে হয়েছে। এই ব‍্যাপারে জানতে চাওয়ায় তার উত্তরে বিশ্বভারতীর রেজিস্ট্রার অশোক মেহেতা বলেন, এটা আন্দাজে কি করে বলতে পারবো। তারপর তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ইউজিসির রেজ‍্যুলেশনটা কি? তার উত্তরে তিনি বলেন, না, বলতে পারবো না। এগুলো তো অফিসিয়াল ব‍্যাপার। এগুলো  আন্দাজে কি করে বলা যাবে। তখন প্রতিবেদক জানতে চান, এব‍্যাপারে তাঁর জানা আছে কিনা? তার উত্তরেও, তিনি বলেন, না, না। এখন আমার কাছে কাগজপত্র নেই। রবিবারে কি করে বলবো। তখন ফের তাঁকে  প্রশ্ন করে জানতে চাওয়া হয়, সোমবার অফিস খুললে, তিনি বলতে পারবেন কিনা? তখন তিনি বলেন, আপনি খবর নেবেন। যাঁরা কনসার্নড সেকশন তাঁরা বলতে পারবেন। এগুলো অফহ‍্যাণ্ড কিছু বলতে পারবো না।

অশোক মেহতার কাছে সদুত্তর না পেয়ে, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসচিবকে ক‍্যাশ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি উদাহরণ স্বরূপ ব‍্যাখ‍্যা করে বলেন, অগ্নিভ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়, কলোমণ্ডলম ভিঙ্কিট বা অনেকের প্রমোশন হয়নি। তাঁরা এসোসিয়েট প্রফেসর হয়ে রয়েছেন। কারণ ২০১০ সালের ইউজিসির একটি রেজগুলেশন। যেখানে বলা আছে, এ‍্যাসোসিয়েট প্রফেসর থেকে তিন বছর বাদে প্রফেসর পদে উন্নীত হতে গেলে তাঁর পিএইচডি থাকতে হবে। ইউজিসির নিয়োগ ও প্রমোশন সংক্রান্ত আইন যেহেতু পার্লামেন্টে পাশ হয়, তা সারা ভারতবর্ষে বলবৎ হয়। রাজ‍্য ও কেন্দ্র সরকারের অধীন সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় তা হুবহু অনুসরণ করতে বাধ‍্য।

উল্লেখ্য, ইউজিসির নিয়ম অনুসারে ১লা জুলাই ২০১০  থেকে যাদের পিএইচডি নেই তাদের ক্যাশ (CAS Career Advancement Scheme ) এর মাধ্যমে প্রফেসর হিসাবে পদোন্নতি দেওয়া আইন বিরুদ্ধ। ১লা জুলাই ২০১০ থেকে সারা দেশে এই নিয়ম চালু হওয়ার পর কোনো রীড়ার বা  এস্যোসিয়েট প্রফেসরকে পিএইচ ডি ছাড়া  প্রফেসর হিসাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। সারা দেশে এই সংখ্যা কম নয়। একাধিক বিখ্যাত শিল্পী যাঁরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন তাঁরাও এই তালিকায় আছেন। অথচ একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তারা কি করে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনকে ভাঙ্গলো।   

৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ র এক RTI র উওর        থেকে জানা যাচ্ছে (Pg 4,chart no 15) স্বপন ঘোষ ১৯৭৭ সালে এ ৩৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে বি,কম পার্ট ওয়ান পাশ করেছেন। শ্রী ঘোষের প্রফেসর পদে পদোন্নতি কোন আইনে হল? আরটিআই এর এই প্রশ্নের উওরে ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন (RTIএর 1pg.3 no প্রশ্ন) "As per UGC Regulations 2010" যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে   ভারত সরকারের প্রকাশিত গেজেটের ৭৮৮৯ নং পৃষ্ঠায় বিশ্বভারতী উল্লিখিত ইউজিসির রেগুলেশেনর ৪.৬.৮ ধারায় পরিষ্কার লেখা রয়েছে,  প্রফেসর পদে পদোন্নতির আবেদনের জন্য ইউজিসি নির্ধারিত প্রয়োজনীয় অন্যান্য যোগ্যতাগুলি থাকলেও পিএইচডি না থাকলে কোনো শিক্ষককেই প্রফেসর পদে উন্নীত করা যাবে না। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষাবিদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বভারতীর এই দুর্নীতির সম্বন্ধে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো ফল হয়নি। অপর দিকে, বিশ্বভারতীর আইন অনুযায়ী প্রফেসর ছাড়া ভবনের অধ্যক্ষ হতে পারে না। স্বপন ঘোষকে বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যক্ষের পদে একাধিক বার বসানো হয়েছে, এমনকি কর্মসমিতির সদস্য পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রফেসর পদে থাকায় ভবনের অধ্যক্ষ হওয়া সম্ভব হয়েছে এবং কাউন্সিল সদস্য হতে পেরেছেন। বেআইনিভাবে প্রফেসর হয়ে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন। সম্প্রতি তিন ছাত্রকে বহিষ্কার করা মতো বেআইনি সিদ্ধান্ত সুপারিশ করার ক্ষেত্রে একজন নিয়ম বহির্ভূতভাবে উন্নীত প্রফেসর কিভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পারেন, সেই প্রশ্নও উঠেছে। পরে মহামান্য হাইকোর্ট  অবশ‍্য সেই নোটিশ বাতিল করে দেয়।

(www.theoffnews.com - Visva Bharati University)

Share To:

THE OFFNEWS

Post A Comment:

0 comments so far,add yours