তপন সান্যাল, কবি, গীতিকার ও গবেষক, পাইকপাড়া, কলকাতা:

জাতপাত ও বর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইতে শুধু উদ্যোগ নেন তা নয়, উনি ভক্তি আন্দোলনকে গণ আন্দোলনে রূপান্তরিত করলেন। এটাই বাংলার প্রথম গণ আন্দোলন। বাংলার প্রথম স্লোগান ছিলো হরি বল। তিনি আর কেউ নয়, তিনি হলেন স্বয়ং মহাপ্রভু চৈতন্য।

পিতা জগন্নাথ মিশ্রের শাস্ত্রচর্চা ও জ্ঞান অর্জনের অসীম গুণ যে পুত্র বিশ্বম্ভর পেয়েছিলেন, তা তিনি অতি অল্প বয়সেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন সময়ের দিগ্বিজয়ী তার্কিক পণ্ডিত কেশব কাশ্মিরীকে তর্কশাস্ত্রে পরাজিত করার মাধ্যমে। পিতৃ পিণ্ডদান উপলক্ষে তাঁর গয়া গমন এবং সেখানে ঈশ্বরপুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও গোপাল মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ নিমাইয়ের জীবনে বিস্ময়কর পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। নবদ্বীপে তিনি ফিরে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শিক্ষাভিমানী পণ্ডিত থেকে কৃষ্ণভাবময় ভক্ত রূপে তার মনোজগতের অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন নবদ্বীপের বৈষ্ণব সমাজ অত্যন্ত চমকিত হন। টোল চতুষ্পাঠী ছেড়ে হরিভক্তদের নিয়ে তিনি কৃষ্ণ নামসংকীর্তনে মেতে ওঠেন। কঠোর বৈরাগ্য সাধনের প্ররোচনায় কাটোয়ার কেশব ভারতীর কাছে সন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হন, সংসার ধর্ম ত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম ধারণ করেন। হিন্দুধর্মের জাতিভেদ উপেক্ষা করে সমাজের তথাকথিত নিন্ম বর্গের মানুষদের বুকে জড়িয়ে ধরে আপন করে নেন। হিন্দু -অহিন্দু, পণ্ডিত-মূর্খ, উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ না করে হরিবোল ও কীর্তনের মাধ্যমে ভক্তিধর্ম প্রচার শুরু করেন। এই ধর্ম আন্দোলন চৈতন্য বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম নামে পরিচিতি পায়।

এই আন্দোলনের তাত্বিক ভিত্তি করেছিলেন বিপ্রদাস ও চণ্ডীদাস যাকে সার্থক রূপ দিয়েছিলেন চৈতন্য। চৈতন্য প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিম যবন হরিদাস বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন। মহাপ্রভু যখন প্রবল হরিনাম আন্দোলন শুরু করেছেন কিছু গোঁড়া ব্রাহ্মণ ধর্ম ভয়ে ভীত হয়ে নবদ্বীপের শাসক চাঁদ কাজীর কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। কাজী উচ্চস্বরে নাম-সংকীর্তনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য সেই নির্দেশ অমান্য করে সংকীর্তন চালিয়ে যেতে থাকেন। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভারতে প্রথম আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা এখান থেকেই হয়েছিল। কাজীর আইন অমান্য করে লক্ষ লক্ষ ভক্ত সহযোগে বিশাল শোভাযাত্রা শ্রীচৈতন্যের নেতৃত্বে নবদ্বীপের রাজপথে হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে কাজীর বাড়ির দিকে এগিয়ে আসে। ভীতসন্ত্রস্ত কাজী শ্রীচৈতন্যের আশ্বাস পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলে দু’জনের মধ্যে হিন্দু শাস্ত্র ও কোরান সম্পর্কে আলোচনা হয়। শুধু তাই নয়, সেই সময়ে জগাই-মাধাইকেও কৃষ্ণ নাম দ্বারা উদ্ধার করেন। পতিতপাবন শ্রীচৈতন্যের ভক্তি ডোরে বাঁধা পড়ে বাঙালি জাতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। তার কীর্তনের গীতপ্রবাহ বহুধাবিভক্ত বাঙালির ধর্মকারার প্রাচীরে আঘাত হানে, ভক্তির এক অভিন্ন ধারায় মিলিয়ে দেয় বৃহত্তর বাঙালি জনসমাজকে। ভক্তি মার্গের প্রতি আকৃষ্ট মানুষ ভক্তিগীতের অভিন্ন মিছিলে অংশগ্রহণের ফলে কীর্তন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। শ্রীচৈতন্যের নগর সংকীর্তন বৈষ্ণবদের কাছে একটি অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর্ম হিসেবে পরিগণিত হয়। ঢোল, করতাল মৃদঙ্গ, মন্দিরা সহযোগে নৃত্যগীত ও কৃষ্ণভক্তি মিছিলে নবদ্বীপের পথঘাট মুখরিত হয়ে ওঠে। এই পন্থায় সমাজের সব ধর্মের মানুষ গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের কীর্তন মিছিলের সদস্যে পরিণত হয়ে উঠেছিল অচিরেই।

ভারতের অন্য কোনও ভক্তি সংগীতে এই অভিনব মাধ্যমের উপস্থিতি ছিল না শ্রীচৈতন্যের দর্শনের বাহ্যিক প্রকাশ ছিল এই নগর সংকীর্তন। ঈশ্বর প্রেমের ভিত্তিভূমি ছাড়া মানবপ্রীতি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না— এই উদারবাদী চেতনার মূল ভিত্তিকে সম্বল করে তৎকালীন হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের তীব্র বেড়াজালকে চূর্ণ করে দিয়ে সাম্যের ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। চৈতন্যের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন সমাজের বেশির ভাগ পিছিয়ে পড়া নিঃসহায় মানুষ। তথাকথিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির পিছনে সমাজের বিত্তবান শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতা থাকলেও চৈতন্যদেব তেমন কোনও সহযোগিতা লাভ করেননি। বরং তিনি ছিলেন সে সময়কার সমাজপতি ব্রাহ্মণ্য ধর্মের রক্ষক ও ধনী বিষয়ভোগীদের চক্ষুশূল। চৈতন্যের মানবতাবাদ প্রচারকে তারা কখনওই ভাল চোখে দেখেনি, প্রতি পদে পদে তারা চৈতন্যের চলার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলতে সর্ব সচেষ্ট ছিলেন। সমাজপতিরা নিম্ন শ্রেণির অন্ত্যজ মানুষদের অস্পৃশ্য করে রাখার কৌশল অবলম্বন করতেন। কোনও রকম ধর্মাচরণের সুযোগ অস্পৃশ্যরা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন না। কিন্তু শ্রীচৈতন্যের নাম সংকীর্তন দীর্ঘদিনের অবহেলিত শূদ্র জনগোষ্ঠীকে কৃষ্ণ নামে আপ্লুত হতে সাহায্য করেছিল।

ফলে ধর্মীয় নেতৃত্বকারী উচ্চবর্ণের সমাজপতিরা শ্রীচৈতন্যের প্রতি প্রবল ক্ষুব্ধ হন। চৈতন্যদেব যে একজন উঁচু স্তরের সমাজ সংস্কারক ছিলেন, তাতে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। বাংলার নৃপতিতিলক গৌড়াধীশ আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সময় কালে চৈতনের আবির্ভাব। শক্তিশালী ও উদারচেতনা সম্পন্ন হুসেন শাহের আমলে বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নব দিগন্ত উন্মোচিত হয়। কিন্তু আভিজাত্যের অহংকার ও রক্ষণশীলতার গোঁড়ামি ভেঙে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা বেরিয়ে আসতে পারেননি। শ্রীচৈতন্য বুঝতে পেরেছিলেন, হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন একটা সার্বিক ধর্মীয়-সামাজিক আন্দোলন। যা জাত্যাভিমানের প্রাচীর চূর্ণ করে দিয়ে মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হতে শিক্ষা দেবে। তার নব্য বৈষ্ণব দর্শন সেই ভাব বিপ্লব নিয়ে উপস্থিত হল।

তিনি ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে নিম্ন বর্ণের মানুষদের এক পঙক্তিতে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন, যা ছিল এক সমাজবিপ্লব। মহাপ্রভু তাঁর গীত প্রবাহের দ্বারা মানবতার স্বরূপ উন্মোচন করে হিন্দু সমাজ ও ধর্মীয় কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। মহামিলনের এই ক্ষেত্র ভূমিকে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করতে চৈতন্যদেব জাত্যাভিমানের দেওয়াল ভেঙে দিতে পেরেছিলেন সহজ ভাবেই। সর্বজনীন আদর্শের অনুগত তাঁর ধর্মের ভিত্তি ভূমি ছিল জীবে দয়া। সমস্ত সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যে ভাবে তিনি অস্পৃশ্যতা বর্জনের আহ্বান জানান, সে কালের পক্ষে তা ছিল রীতিমতো বৈপ্লবিক। তাঁর মানবতাবাদ যদিও ধর্মীয় মানবতাবাদ, তবু তার ধারা বেয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় নবজাগরণ ও মানবতাবাদ বিকশিত হতে দেখা যায়। বাংলার এই ইতিহাসকে আমরা যেন ভুলে না যাই। সবাই হরির অংশ হিন্দু মুসলমান এমন কি নিম্ন বর্গের মানুষরাও। এই একই আঘাত করেছিলেন  রামচরিত মানসের কবি ও লেখক তুলসীদাস। সবাই রামের অংশ।

হিন্দু ব্রাহ্মণ্য তন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম আঘাত আনেন গৌতম বুদ্ধ, তুলসিদাস, কবীর, চৈতন্য। তারপর রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র। অন্ধকারে নবদ্বীপের এই সুতীব্র আলোকচ্ছটাকে বঙ্কিম বাঙালির প্রথম রেনেসাঁস আখ্যা দিয়েছিলেন। "আমাদিগেরও একবার সেই দিন হইয়াছিল। অকস্মাৎ নবদ্বীপে চৈতন্যচন্দ্রোদয়; তার পর রূপসনাতন প্রভৃতি অসংখ্য কবি ধৰ্ম্মতত্ত্ববিৎ পন্ডিত। এ দিকে দর্শনে রঘুনাথ শিরোমণি, গদাধর, জগদীশ; স্মৃতিতে রঘুনন্দন, এবং তৎপরগামিগণ। আবার বাঙ্গালা কাব্যের জলোচ্ছ্বাস। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, চৈতন্যের পূর্বগামী। কিন্তু তাহার পরে চৈতন্যের পরবর্ত্তিনী যে বাঙ্গালা কৃষ্ণবিষয়িণী কবিতা, তাহা অপরিমেয় তেজস্বিনী, জগতে অতুলনীয়া; সে কোথা হইতে? আমাদের এই Renaissance কোথা হইতে? কোথা হইতে সহসা এই জাতির এই মানসিক উদ্দীপ্তি হইল?"

মনে রাখবেন এই হিন্দু ব্রাহ্মণ্য তন্তের ইতিহাস চার হাজার বৎসর। চার হাজার বৎসর ধরে শুধু বাংলা নয় ভারতবর্ষকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আপনার মনের মধ্যে মন পুলিশ আছে, সেই বিচার করছে ন্যায় ও অন্যায়। ওই মন পুলিশের মধ্যে ব্রাহ্মণ্য তন্ত্র বসে আছে আপনার অজান্তে। এই জামা কাপড় পড়বে না, এই খাবার খেলে হিন্দু ধর্মের ক্ষতি হবে। এবং স্ত্রীর ওপর কর্তৃত্ত ফলাচ্ছে, পুরোটাই পুরুষ তন্ত্র যেটা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সাথে যায়। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মূল কথা হলো নীতি পুলিশগিরি। চৈতন্য আন্দোলন শুধু সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির কথা বলে না, বলে আত্মিক মুক্তির কথা। আমরা প্রবৃত্তির দাস তাই প্রবৃত্তিকে জয় করতে হবে। বৈষ্ণব আন্দোলনের মূল কথা হলো দেহাতীত প্রেম। চৈতন্য দেব তিলে তিলে তাঁর অন্তরের রাধা ভাবকে গড়ে তুলেছেন রাধা কৃষ্ণের প্রেম লীলাকে বোঝবার জন্য।

তিনি রাধা ভাবের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ছিলেন। এই ব্রাহ্মণ্য তন্ত্র আজও আছে বহাল তবিয়তে আপনার এবং আমার মনের মধ্যে, তবে অন্য রূপে, একে শেষ না করতে পারলে আধুনিক মানবতাবাদের সম্পুর্ন বিকাশ এবং বাঙালির অগ্রগতি সম্ভব নয়। ব্রাহ্মণ ধর্মের কাজ হলো ফতোয়া জারি করা। তাই চৈতন্য আজও প্রাসঙ্গিক। তাই ধর্ম ও জাতপাত নয় মূল কথা হলো প্রেম।

চণ্ডীদাস বলেছিলেন সবার ওপরে মানুষ বড় তাঁহার ওপরে কেহ নাই। ওই কথার সূত্র ধরে রবীন্দ্রনাথ বললেন, সবার ওপরে মানুষ সত্য তাঁহার ওপরে কেউ নয়।

এটাই আমাদের সংস্কৃতির বিবর্তন। আর এই বিবর্তনের ঐতিহাসিক মুখ হলো চৈতন্য। বঙ্কিম চন্দ্র সঠিক বলেছেন যে বাঙালির রেনেসাঁ চৈতন্য দেব থেকে শুরু।

এই চৈতন্য দেবই খুন হলেন পুরীতে গোড়া হিন্দুদের হাতে। শুধু তাই নয় যারা যারা এই চৈতন্য দেবের খুনের কিনারা করতে গেছেন তারাও খুন হলেন। সত্যি আশ্চর্য্য কোথায় বাস করছি আমরা?

বাংলার ইতিহাসে চৈতন্য এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং ঐতিহাসিক ভাবে প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

(www.theoffnews.com - Chaitanya mahaprabhu)

Share To:

THE OFFNEWS

Post A Comment:

0 comments so far,add yours