ইসহাক খান, মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ:

জঙ্গল ট্রেনিং শেষে বিকেল নাগাদ ক্যাম্পে ফিরে এলাম আমরা। আমাদের অবর্তমানে ক্যাম্পের তাঁবুগুলো যেন বিষণ্ণতায় ঝিমুচ্ছিল। আমাদের পেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো পরিবেশ। 

তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে আমরা হেঁটে এসেছি। শরীর ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত। সেই অবস্থায়, কাপড় না পালটিয়ে, হাতেমুখে পানি না দিয়ে আমরা বিছানায় টান হয়ে শুয়ে পড়লাম। তিনদিন ভাত খাইনি। মনে হচ্ছে কতকাল কপালে ভাত জোটেনি। প্রকৃতই আমরা ‘ভাইতা’ বাঙালি। একদিনও ভাত ছাড়া আমাদের চলে না। 

ভেতরে ভেতরে আমরা নতুন উত্তেজনায় ভুগছি। ট্রেনিং শেষ। এখন আমাদের যুদ্ধের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ার পালা। অস্ত্রহাতে আমরা পাকিস্তানিদের উপর বিপুল বিক্রমে ঝাপিয়ে পড়বো। আমরা ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেব। মায়ের সম্ভ্রমের বদলা নেব। ব্যাটাদের বুঝিয়ে দেব বাঙালি মরতে জানে, মারতেও জানে কিন্তু মাথা নত করতে জানে না। 

রাতে ভাত খাওয়ার পর আড্ডা গান কোনটাই শোনার কিংবা কারও গাওয়ার অবস্থা ছিল না। খেয়ে দেয়ে সবাই নিঃশব্দে বিছানায় আশ্রয় নিলো এবং কিছু ভাবার আগে সবাই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল। 

সকালে নাস্তার পর লাইনে দাঁড়াতে হলো। ট্রেনিংয়ের ভাষায় বলে ‘ফলোইন’। ওস্তাদের হুইসেল শুনে ফলোইনে দাঁড়ানোর পর বলা হলো, দুদিন পর আমাদের শপথ অনুষ্ঠান। তার জন্য মহড়া দিতে হবে। একদম সামরিক কায়দায়। মহড়া চলবে টানা দু’দিন।  

আমরা প্রায় হাজার পাঁচেক মুক্তিযোদ্ধা শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেব। প্রথম দিন মহড়ায় বুঝতে পারলাম শুরুতে মার্চপাসট করতে হবে। সেটা হতে হবে প্রশিক্ষিত সৈনিকের মতো। পায়ে-পায়ে হাতে-হাতে তালে তাল মিলতে হবে। মার্চপাস্তে কোন বেতাল হলে চলবে না। খুব কড়া ভাবে মহড়া চলতে থাকে। এ ট্রেনিংটাও কম কষ্ট না। মার্চপাস্তের পর পতাকা এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ করতে হবে। তারপর মার্চপাস্ত করে প্রধান অতিথিকে সালাম করে আবার নিজের জায়গায় কোম্পানি এসে অবস্থান নেবে। তারপর প্রধান অতিথি আমাদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন। সবশেষে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান শেষ হবে। আমাদের জানানো হলো প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অর্থ, বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম, মনসুর আলী আসবেন আমাদের শপথ অনুষ্ঠানে। 

দুইবেলা আমরা মহড়া করি। মনসুর আলী আসবেন শুনে আমাদের মহড়ার উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। জাতীয় সংগীত গাওয়ার জন্য ১০ জনের একটি টিম বাছাই করা হলো অডিশনের মাধ্যমে। সেই দশজনের একজন আমি। জাতীয় সংগীত গাওয়ার ১০জনের টিমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আমার ভেতর নতুন উত্তেজনা পাখা মেললো। সারাক্ষণই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, শপথ অনুষ্ঠানে আমি জাতীয় সংগীত গাইবো। গর্বে বুকটা ফুলে ঢোল হবার যোগাড়। আমার অত্যন্ত প্রিয় আমাদের জাতীয় সংগীত। রবি ঠাকুরের এই গানের বাণী যেন অমৃত ধারা। আবেগ চেপে রাখা কঠিন। গানের এক জায়গায় এসে যেখানে বলা হচ্ছে, ‘কি শোভা কি ছায়া গো, কি স্নেহ কি মায়া গো, কি আঁচল বিছাইয়াছ বটের মূলে নদীর কূলে কূলে, মা তোর বদন খানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি।’ আমি এই বাণী গাইতে গিয়ে নিজেকে সামলে রাখতে পারি না। আহা কি ভাষা। প্রাণ জুড়ানো কথা। শুনে মন প্রাণ দুলে ওঠে। আবেগে আমার কণ্ঠ বুজে আসে। আর দুচোখে নামে জলের ধারা।  জাতীয় সংগীত গাইতে গিয়ে আমি আবেগে শিশুর মতো কাঁদতে থাকি। যেটা এখনও হয়। সব সময় হয়। 

অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেছেন, ‘কে নির্ধারণ করলো এই গানটি হবে জাতীয় সংগীত?’ তাদের প্রশ্ন সংগত। কারণ তখন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগারে বন্দি। বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কারওতো এতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। বিশেষ করে রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত তাঁকে ছাড়া কিভাবে হয়?

যারা ব্যাপারটি জানেন না তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেই জাতীয় সংগীতের ব্যাপারটা ফয়সালা হয়েছে ১৯৭১ সালে। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে সেদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ উপলক্ষে ছাত্র জমায়েত ছিল। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে ছাত্র ছাড়াও স্বাধীনতাকামী লাখো লাখো বীর বাঙালি মিছিল নিয়ে সেই ছাত্রসভায় যোগ দিয়ে ছাত্র জমায়েতকে জনসভায় রূপ দেয়। খানিক পরে সেখানে সদলবলে বঙ্গবন্ধু এসে উপস্থিত হন। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের চোখ ছানাবড়া। বঙ্গবন্ধুর সেদিন পল্টনের ছাত্র জমায়েতে আসার কথা ছিল না। তাঁর আসার আগেই ইশ্তেহার পাঠ সমাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে আবার স্বাধীনতার ইশ্তেহার পাঠ করেন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা শাজাহান সিরাজ। সেই ইশ্তেহারে উল্লেখ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি। 

বঙ্গবন্ধু ইশ্তেহার পাঠ শুনে দাঁড়িয়ে করতালি দিলে উপস্থিত জনতা করতালি আর জয়বাংলা ধ্বনিতে ফেটে পড়ে। ৩ মার্চ পল্টন ময়দান যেন একখণ্ড বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল। সেই থেকে রবি ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ আমাদের জাতীয় সংগীত। হৃদয় দিয়ে জাতীয় সংগীতকে আমরা ভালবাসি, সম্মান করি, ভক্তি করি এবং নতমস্তকে স্যালুট করি। কিন্তু আমি পুরো গানটি গাইতে পারি না। বুক ভেসে যায় চোখের জলে। শপথের দিনও তাই হলো। দুলাইন গাওয়ার পরই আবেগে আমার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ দিয়ে জলের ধারা বইছে। 

চমৎকার ভাবে শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো। পবিত্র কোরআন এবং জাতীয় পতাকা ছুঁয়ে আমরা শপথ নিলাম। উচ্চসবরে বললাম, ‘আমরা শপথ করিতেছি যে, বাংলাদেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাব। মাতৃভূমি মুক্ত করেই তবে আমরা ঘরে ফিরবো। প্রয়োজনে মাতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গ করবো। জয়বাংলা।’ [চলবে]

(ছবি সৌজন্যে প্রতিবেদক স্বয়ং)

(www.theoffnews.com - Bangladesh muktijuddho)

Share To:

THE OFFNEWS

Post A Comment:

0 comments so far,add yours